📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 ফেরাউন-কন্যার চুল আঁচড়াত যে বাঁদি

📄 ফেরাউন-কন্যার চুল আঁচড়াত যে বাঁদি


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘মেরাজের রাতে একস্থানে এসে আমার নাকে সুঘ্রাণ লাগলে জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করি, “এই সুঘ্রাণ কীসের?” জিবরাইল বললেন, “ফেরাউন- কন্যার চুল আঁচড়াত যে বাঁদি, এই ঘ্রাণ তার ও তার সন্তানদের।” আমি বললাম, “এর কারণ কী?” তিনি বললেন, "বাঁদিটি একবার ফিরআউনের মেয়ের চুল আঁচড়াচ্ছিল, হঠাৎ তার হাত থেকে চিরুনি পড়ে যায়। (চিরুনিটি উঠানোর সময়) সে বলে, বিসমিল্লাহ। ফিরআউনের মেয়ে তাকে বলল, আমার পিতার নামে এটা উঠালে? সে বলল, না বরং আমার এবং তোমার পিতার রব আল্লাহর নামে। সে বলল, আমি কি পিতাকে বিষয়টি জানিয়ে দেব? সে বলল, হ্যাঁ জানাতে পার। মেয়ে গিয়ে পিতাকে সব জানিয়ে দিল। ফিরআউন তাকে ডেকে বলল, হে অমুক, আমি ছাড়া কি তোমার অন্য কোনো রব আছে? সে বলল, হ্যাঁ আমার এবং তোমার রব আল্লাহ। সে তখন একটি তামার পাতিলে তেল ফুটিয়ে তাতে তাকে এবং তার সন্তানকে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বাঁদি ফিরআউনকে বলল, আপনার কাছে আমার একটি আবদার আছে। ফিরআউন বলল, কী? বাঁদি বলল, আমার এবং আমার সন্তানদের হাড্ডিগুলো একটি কাপড়ে মুড়ে দাফন করবেন। ফিরআউন বলল, ঠিক আছে। এটা আমাদের ওপর তোমার অধিকার। এরপর ফিরআউন তার সামনেই সন্তানদের একজন একজন করে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। একসময় তার দুগ্ধপোষ্য ছেলের পালা আসে। তার জন্য বাঁদিটি যেন আপন সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান ছিল। শিশুটি তখন বলে ওঠে, হে আমার মা! আপনি আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ুন! কেননা, পরকালের শাস্তির তুলনায় দুনিয়ার শাস্তি অতি সামান্য। বাঁদিটি তাই করল।””

প্রথম পাঠ
কোলে থাকা অবস্থায় কতজন শিশু কথা বলেছে, এ ব্যাপারে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী তাদের সংখ্যা হল তিনজন। ঈসা আলাইহিস সালাম, আবেদ জুরাইজের ঘটনায় বিবৃত রাখালের ছেলে, আরেক শিশু, যে তার মায়ের দুয়ার প্রতিবাদ করেছিল। তার ঘটনা সামনে উল্লেখ করা হবে। [২] ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্যদাতা শিশুটিও এই তালিকায় রয়েছে। এটি ইসরাইলি বর্ণনা হলেও আমাদের শরিয়ত একে প্রত্যাখ্যান করেনি। আমাদের সাইয়েদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা বনি ইসরাইলের সূত্রে রেওয়ায়াত করতে পারো এতে কোনো সমস্যা নেই। [৩] এ ছাড়াও আসহাবুল উখদুদ বা গর্তবাসীদের শিশুও কোলে থাকাবস্থায় কথা বলেছে। সহিহ মুসলিমে তার আলোচনা এসেছে। সব মেলালে এ-জাতীয় শিশুদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়জনে।

দ্বিতীয় পাঠ
মৃত্যুর আশঙ্কা হলে ঈমান গোপন করা সমস্যাকর কিছু নয়। ফিরআউনের বংশেরই এক মুমিন ঈমান গোপন করেছিলেন। কুরআনে তার প্রশংসা করে বলা হয়েছে- ‘ফিরআউন-গোত্রের এক মুমিন ব্যক্তি, যে তার ঈমান গোপন রাখত, সে বলল, তোমরা কি একজনকে এ-জন্যে হত্যা করবেন যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ?’ [১] ওই অবস্থায় তার জন্য ঈমান গোপন করাটা কয়েক দিক থেকে উপকারী ছিল।

প্রথমত: এর মাধ্যমে তিনি নিজের জীবনকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন। কেননা ফিরআউন ঈমানের প্রশ্নে নিজের স্ত্রীকেও ছাড় দেয়নি। স্ত্রীকেও সে হত্যা করেছে। মুসা আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান আনলে সে কোনো নিকটাত্মীয়ের প্রতিও দয়া করত না। দ্বিতীয়ত: তিনি ফিরআউনের প্রাসাদের কাছে অবস্থান করতেন। প্রাসাদের সকল অবস্থা এবং চক্রান্ত সম্পর্কে জানতেন। আর এটা তো স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, তরবারির মাধ্যমে শত্রুর মুকাবিলা করার চেয়ে শত্রুর প্রাসাদে গুপ্তচর হয়ে থাকা অনেকগুণে উত্তম। তৃতীয়ত: ঈমান প্রকাশ করার মধ্যে শুধু ব্যক্তিগত কল্যাণ ছিল। অন্য কোনো কল্যাণ এতে ছিল না। কেননা তাকে হত্যা করা হলে তিনি আসিয়া এবং চুল আঁচড়ানো-বাঁদির মতো শহিদের মর্যাদা পেতেন। আর ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সফলতা ও মুক্তির ওপর দাওয়াতের সফলতা প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তবে আমাদের জন্য এটা বলা সম্ভব নয় যে, আসিয়া এবং চুল আঁচড়ানো-বাঁদি তাদের ঈমান প্রকাশের ক্ষেত্রে ভালোভাবে পরিণামের কথা চিন্তা করেননি। শহিদকুলের সরদার হলেন হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তেমনিভাবে ঐ ব্যক্তিও এ মর্যাদা লাভ করে যে কোনো জালেম শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার বিধিনিষেধের কথা বলে এবং জালেম শাসক তাকে হত্যা করে ফেলে।

চুল আঁচড়ানো-বাঁদি দৃঢ়তা, সাহসিকতা এবং ঈমানি শক্তির সওয়াব পাবে। বর্তমান যুগ অনুযায়ী সে কেবল একজন সেবিকা। আর ফিরআউন মিশরের হিসেবে একজন বাদশাহ, শাসক, নিজ দাবিতে ইলাহ ও মাবুদ। ফিরআউনের মতো ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক এমন বিশাল ব্যক্তিত্বের সামনে একজন সেবিকার এই চ্যালেঞ্জ! কসম আল্লাহর, এই সাহসিকতার ওপর আর কোনো সাহসিকতা হয় না!

তৃতীয় পাঠ
ঈমান যখন কারও অন্তরের গভীরে স্থান লাভ করে, তখন এটা তাকে রক্তমাংসে গড়া সামান্য একজন মানুষ থেকে এক পাহাড় বানিয়ে দেয়। যা কখনো নড়ে না। কখনো নরম হয় না। যুগে যুগে এটি ছিল মুমিনদের চরিত্র। কোমল এক নারী আসিয়া। তিনি শূলীতে চড়েছেন! দুর্বল নারী, যিনি চুল আঁচড়াতেন ফেরাউন-কন্যার, তিনি উত্তপ্ত তেলের সামনেও কম্পিত হননি! মক্কার উত্তপ্ত বালু বিলালকে নমনীয় করতে পারেনি! উমাইয়া ইবনে খালাফ বুকে শক্ত পাথর রেখেও তাকে টলাতে পারেনি! এইসব শাস্তির মুখেও তার জবান থেকে আহাদ... আহাদ... শব্দ বন্ধ হয়নি! জাদুকররা মুসা আলাইহিস সালাম-এর অনুসরণ করেছিলেন। এ কারণে আড়াআড়িভাবে তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে শূলীতে চড়ানো হয়েছে। তারা সেদিন ফিরআউনকে বলেছিলেন- ‘তুমি যা ইচ্ছে করতে পার। যা করবার এই পার্থিব জীবনেই তো তুমি করবে।[১]’ হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘তোমাদের আগের লোকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও ছিল, যাকে ধরে নিয়ে তার জন্য জমিনে গর্ত করা হতো। তারপর করাত এনে মাথায় আঘাত করে দুটুকরা করে ফেলা হতো। লোহার শলাকা দিয়ে তার গোশত ও হাড্ডি খসানো হতো। তা সত্ত্বেও তাকে তার দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত না।”[২]’ আপনি জান্নাতের পথে কোনো বিপদাপদের সম্মুখীন না হলে একে আল্লাহ তাআলার একান্ত অনুগ্রহ মনে করুন। তিনি জানেন, আপনি বিপদে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না, তাই তিনি তা আপনার থেকে দূর করে দিয়েছেন। আর যখন তিনি পরীক্ষা করবেন তখন আপনাকে নরম হলে চলবে না। পূর্ববর্তীদের মাধ্যমে সমবেদনা লাভ করতে হবে। প্রত্যেক অবাধ্যের মুখের উপর যেন আপনি সে কথাই বলে দিতে পারেন জাদুকররা যা ফিরআউনকে বলে দিয়েছিলেন- ‘যা করবার এই পার্থিব জীবনেই তো তুমি করবে।[৩]’

চতুর্থ পাঠ
সাদাকাহকারীর কাছেও ধন-সম্পদ পছন্দনীয় বস্তু। যে পর্দা পালন করে, ফ্যাশন-স্টাইল তার কাছে অপছন্দনীয় নয়। যে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় মৃত্যুর ঘাটে উপস্থিত হয় সেও জীবনকে ভালোবাসে। ফিরআউনের বাঁদি, যার চোখের সামনেই তার সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে, তার মাতৃত্ববোধ কম ছিল না। কিন্তু তারা জানেন আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা উত্তম এবং স্থায়ী। এই বাঁদির প্রতি লক্ষ করুন, তিনি মৃত্যু থেকে মাত্র কয়েক মুহূর্ত দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন, তার যাবতীয় চিন্তা-চেতনা সন্তানকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে, সেই মুহূর্তে তিনি ফিরআউনেকে বলছেন, যাতে তার এবং সন্তানদের হাড্ডিগুলো একসঙ্গে দাফন করা হয়। যদি তার মধ্যে মায়ের মমতাবোধ না থাকত তাহলে তিনি এমন অত্যাচারীর কাছে এই আবেদন করতেন না।

পঞ্চম পাঠ
অত্যাচারীরা অত্যাচারীই থাকে। যুগে যুগে শুধু তাদের নাম আর পরিচয়ে পরিবর্তন ঘটে। বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা একই থাকে। ফিরআউন মুমিনদেরকে হত্যা করেছে। তাদেরকে শূলীতে চড়িয়েছে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায় তাকে আগুনে নিক্ষেপ করেছে। উমাইয়া এবং আবু জেহেল উভয়েই মুমিনদেরকে শাস্তি দিয়েছে। একজনের মাল লুট করা হয়েছে তো অপরজনকে বন্দী করা হয়েছে। তৃতীয় একজনের সম্মান হরণ করা হয়েছে তো চতুর্থ জনের বাড়িঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আবার পঞ্চম কারও সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। এভাবেই অবাধ্যরা নিজের অজান্তেই একে অপরের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। প্রতি যুগে তারা একই স্থানে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। অত্যাচারী ও অবাধ্যদের এই ধারাবাহিকতা যেন শেষ হবার নয়।

টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ২৮২১। সনদ হাসান।
[২] 'দুগ্ধপোষ্য সন্তান' নামে এই বইয়েরই ১২৭ পৃষ্ঠায় রয়েছে সেই ঘটনা।
[৩] রাসুল সা. বলেছেন, "আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা করত। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল।” সহিহ বুখারি, ৩৪৬১।
[১] সুরা মুমিন, ৪০: ২৮
[১] সুরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম: ৭২
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৯৪৩
[৩] সুরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম: ৭২

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 কুষ্ঠ, টাক ও অন্ধ ব্যক্তি

📄 কুষ্ঠ, টাক ও অন্ধ ব্যক্তি


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'বনি ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই, তিনি তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেত রোগীটির কাছে এলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কাছে কোন জিনিস অধিক প্রিয়?” সে জবাব দিল, "সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা, মানুষ আমাকে ঘৃণা করে।” ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দান করা হলো। অতঃপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কোন ধরনের সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে জবাব দিল, "উট।” অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হলো। তখন ফেরেশতা বললেন, "এতে তোমার জন্য বরকত হোক।”

এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গেলেন এবং বললেন, “তোমার কাছে কোন জিনিস অধিক পছন্দনীয়?” সে বলল, "সুন্দর চুল এবং আমার থেকে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে।” ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হলো। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, "কোন সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে জবাব দিল, "গরু।” অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করলেন। এবং ফেরেশতা দুআ করলেন, "এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক।”

অতঃপর ফেরেশতা অন্ধের কাছে আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন জিনিস তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে বলল, “আল্লাহ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি।” তখন ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন, তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে বলল, “ছাগল।” অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দান করা হলো। অতঃপর পশুগুলো বাচ্চা প্রসব করল। উট ও গাভী বাচ্চা দিল। অল্পদিনের ব্যবধানে উটের মালিকের একটি মাঠ উটে ভরে গেল। গাভীর মালিকের একটি মাঠ গরুতে ভরে গেল এবং ছাগলের মালিকের একটি মাঠ ছাগলে ভরে গেল।

কিছুদিন পর ফেরেশতা তার পূর্বের সেই রূপে (দরিদ্রবেশে) কুষ্ঠ রোগীর কাছে এলেন এবং বললেন, “আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। সফরে আমার সমস্ত সম্পদ শেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাড়ি পৌঁছার কোনো উপায় নেই। তাই আমি তোমার কাছে ঐ আল্লাহর দোহাই দিয়ে একটি উট চাচ্ছি যিনি তোমাকে সুন্দর গায়ের রং, সুন্দর চামড়া এবং অনেক সম্পদ দান করেছেন, যেন আমি আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারি।” সে উত্তর দিল, “আমার ওপর মানুষের অনেক হক রয়েছে (তাই তোমাকে উট দেওয়া সম্ভব নয়)।” ফেরেশতা বললেন, “আমি মনে হয় তোমাকে চিনি। তুমি কি সেই কুষ্ঠ রোগী ছিলে না যাকে মানুষ ঘৃণা করত? তুমি কি নিঃস্ব ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ তোমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছেন?” সে বলল, “এ সম্পদ তো আমি বংশপরম্পরায় লাভ করেছি।” ফেরেশতা বললেন, “তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও তবে আল্লাহ যেন তোমাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।”

এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে তার সেই পূর্বের আকৃতিতে (টাকপড়া দরিদ্র ব্যক্তি হিসেবে) গেলেন এবং তাকেও অনুরূপ বললেন। সে-ও শ্বেতরোগী লোকটির মতো জবাব দিল। তখন ফেরেশতা বললেন, “তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও তবে আল্লাহ যেন তোমাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।” অতঃপর ফেরেশতা অন্ধ লোকটির কাছে তার সেই পূর্বের আকৃতিতে (অন্ধ ও নিঃস্ব লোক হিসেবে) এলেন এবং বললেন, “আমি এক মুসাফির ও নিঃস্ব ব্যক্তি। সফরে আমার সমস্ত সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাড়ি পৌঁছার কোনো উপায় নেই। আজ আমি তোমার কাছে ঐ আল্লাহর দোহাই দিয়ে একটি ছাগল প্রার্থনা করছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন আর আমি এ ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারব।"

সে বলল, "প্রকৃতপক্ষেই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকির ছিলাম। আল্লাহ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম, আল্লাহর জন্য তুমি যা কিছু নেবে, তার জন্যে আজ আমি তোমার কাছে কোনো প্রশংসাই দাবি করব না।" তখন ফেরেশতা বললেন, "তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিনজনের পরীক্ষা নেয়া হলো মাত্র। আল্লাহ তোমার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার অপর দুই সাথির ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন।” [১]

প্রথম পাঠ
শুধু অকল্যাণের মাধ্যমে পরীক্ষা হয় না বরং কল্যাণ দিয়েও পরীক্ষা হয়। অকল্যাণমূলক পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ হলো সফলতা। কল্যাণমূলক পরীক্ষায় শুকরিয়া তথা কৃতজ্ঞতা হলো সফলতা। এই তো সুলাইমান আলাইহিস সালাম। তিনি রানি বিলকিস আসার সংবাদ পেয়ে মানুষ ও জিন উভয় শ্রেণির সভাসদদের একত্রিত করলেন। তাদেরকে ইয়ামান থেকে বিলকিসের সিংহাসন নিয়ে আসতে বললেন। শক্তিশালী জিন তা করতে সক্ষম হয়নি। একজন মুমিন ব্যক্তি এক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ইসমে আজম জানতেন। যার মাধ্যমে তার কাছে দুআ করা হলে তিনি সাড়া দিয়ে থাকেন। চোখের পলকেই সিংহাসন তার সামনে উপস্থিত হয়ে যায়। সুলাইমান আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন, তাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাই তিনি অহংকার করেননি। শুধু বলেছেন- ‘এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, নাকি অকৃতজ্ঞতা। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিজের উপকারের জন্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত কৃপাশীল।’ [১]

প্রাচুর্যের পরীক্ষায় সফলতা হলো নিজের জন্য প্রয়োজন-মাফিক খরচ করা আর অন্যান্য মানুষের জন্য অবারিত দানের দরজা খোলা রাখা। এ পরীক্ষায় ব্যর্থতা হলো কার্পণ্য করা। ফকিরের মতো জীবনযাপন করা আর ধনীর মতো হিসাব করা। শক্তি পরীক্ষার সফলতা হলো ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। দুর্বলকে সাহায্য করা। অকৃতকার্যতা হলো সীমালংঘন করা। অন্যের ওপর জুলুম করা। মিথ্যা অপবাদ দেওয়া। আপনার শক্তি যদি আপনাকে ধোঁকা দেয়, আপনি যদি মানুষের ওপর জুলুম করেন তাহলে মনে রাখবেন, আপনার ওপর শক্তিমান আল্লাহ রয়েছেন।

বিয়ে বিলম্বিত হওয়াটাও একটা পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা দেখতে চান যে, আপনি কী করেন। আপনি কি আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করেন নাকি অশ্লীল কাজে জড়িয়ে পড়েন। দুআ কবুলে দেরি হওয়াটাও পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা দেখতে চান, এ-ক্ষেত্রে আপনি কী করেন। ধৈর্য ধারণ করেন, ইস্তেগফার পড়েন, নাকি রাগান্বিত হয়ে দাজ্জাল (তাগুতের) কাছে ধরনা দেন। স্মরণ করুন, যখন যাকারিয়া আলাইহিস সালাম-এর সন্তান হচ্ছিল না, তিনি সিজদায় লুটিয়ে দুআ করেন। মেহরাবে থাকা অবস্থায় সন্তানের সুসংবাদ আসে। আমরা তো এমন জাতি যারা সিজদায় পড়ে প্রার্থনা করে আর মেহরাবে তাদের সুসংবাদ শোনানো হয়।

দ্বিতীয় পাঠ
জিহ্বা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করতে হবে। একটি অপরটির স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আপনার জবান থেকে প্রশংসা শুনতে চান। আল্লাহ তাআলা বান্দার জবানে নিজের প্রশংসাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। দেখতে চান, তার নেয়ামত পেয়ে আপনি কী করেন? শুধু ধন-সম্পদের ক্ষেত্রেই কৃপণতা হয় না। যদিও ধন-সম্পদই কৃপণতার মূল। আপনি জানেন, কোনো একটি পরামর্শ কারও উপকার করতে পারে, তাহলে তাকে সেটা না বলা কৃপণতা। কোনো বিষয়ে সাক্ষ্য না দেওয়া হলে হয়তো কারও হক ছিনিয়ে নেওয়া হবে, তা জানা সত্ত্বেও সাক্ষ্য না দেওয়া কৃপণতা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ মিটিয়ে দিতে পারেন কিন্তু সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা না মেটানো কৃপণতা। কোনো বৃদ্ধের ভারী বোঝা বহন না করা কৃপণতা। পথহারা মুসাফিরকে গাড়িতে আরোহণ না করানো কৃপণতা। আপনার কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম স্মরণ করা হলো কিন্তু আপনি তার ওপর দুরুদ পাঠ করলেন না, এটাও কৃপণতা।

বদান্যতা সর্বক্ষেত্রেই উত্তম গুণ। চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও সহযোগিতা-সর্বক্ষেত্রে... ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে বদান্যতা সর্বোত্তম। যদিও অন্যগুলোর মূল্যও কম নয়। আলোচ্য ঘটনায় কৃপণের পরিণাম দেখুন। এই কুষ্ঠরোগীর কাছে উপত্যকা-ভর্তি উট ছিল। কিন্তু যখন তাকে বলা হলো, আল্লাহর পর আপনাকে ছাড়া আমার আর কোনো সাহায্যকারী নেই, তখন সে মাত্র একটি উট প্রদান করতেই কৃপণতা করেছে। তাই আল্লাহ তার সকল উট নিয়ে নিয়েছেন। টাকওয়ালা লোকটির প্রতি লক্ষ করে দেখুন। তার পরিণাম কী হলো! উপত্যাকা-ভর্তি গরু থাকা সত্ত্বেও সে একটি মাত্র গরু দিতে কৃপণতা করেছে, আল্লাহ তার সকল গরু নিয়ে গেছেন। কিন্তু যে নিজের পূর্বের অবস্থা স্মরণ করে ফেরেশতাকে দিতে চেয়েছে, বলা হয়েছে আল্লাহ তোমার ধন-সম্পদে বারাকাহ দান করুন! একটি ঘটনাই আপনাকে চিরদিনের জন্য উঁচুতে উঠিয়ে দিতে পারে। আবার একটি ঘটনাই আপনাকে চিরকালের জন্য নীচে নামিয়ে দিতে পারে। জীবন তো বহু ঘটনার সমষ্টি মাত্র। তাই ব্যর্থতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

তৃতীয় পাঠ
ধন-সম্পদ আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ভালোবাসার দলিল নয়। এ ব্যাপারে সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা সুলাইমান আলাইহিস সালাম ও নমরুদ উভয়কে গোটা দুনিয়া দিয়েছিলেন। যদি ধন-সম্পদ মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড হতো তাহলে একজন নবী এবং এক অবাধ্যকে সমান সম্পদ দেওয়া হতো না। রোমের রাজা-বাদশাহরা রেশমের উপর ঘুমাত। স্বর্ণের থালা-বাসনে পানাহার করত। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চুলায় কয়েকদিন পর্যন্ত আগুন জ্বলত না। খন্দকের দিন তিনি পেটে পাথর বেঁধেছিলেন। ছোটকালে ধনাঢ্য কুরাইশদের ছাগল চড়িয়েছেন। দরিদ্র অবস্থায় জীবন যাপন করেছেন। আর দরিদ্র অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সময় ঋণের কারণে তার বর্ম এক ইহুদির কাছে বন্ধক হিসেবে ছিল। অথচ আল্লাহর তাআলার কাছে তিনি ছিলেন গোটা বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি।

অতএব কোনো নেয়ামত প্রাপ্ত হলে শুকরিয়া আদায় করুন। নেয়ামত না পেলে ধৈর্য ধারণ করুন। আল্লাহ যদি আপনাকে নেয়ামত দিয়ে থাকেন তাহলে তিনি সেই নেয়ামতই দিয়েছেন যা অন্যের জন্য নয়; বরং কেবল আপনার জন্য। আর তিনি কোনো নেয়ামত না দিয়ে থাকলে তাই দেননি যা আসলেই আপনার নয়; বরং তা অন্যের জন্য। মানুষের সম্পদের দিকে তাকাবেন না। কেননা আপনি জানেন না যে, তাকে আসলে সম্পদ দেওয়া হয়েছে নাকি বড় কিছু থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যুগে যুগে কাফেরদের হাতে ধন-সম্পদ ছিল। মুমিনদের চেয়ে তাদের ধন-সম্পদ বেশি ছিল। ধনাঢ্যতা প্রকৃতপক্ষে নিন্দনীয় নয়। হালাল মাল যদি মুমিন বান্দার হাতে থাকে তাহলে তা কতই-না উত্তম! কিন্তু আপনি এই ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকুন যে আল্লাহ আপনাকে অপছন্দ করেন বলে আপনার রিজিক সংকীর্ণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে শাস্তি দিতে চান বলে আপনাকে অসুস্থ করেছেন। মনে রাখবেন, আল্লাহ তাআলা যা দেন তা হেকমতের ভিত্তিতেই দেন, আর যা থেকে বঞ্চিত করেন তাও হেকমতের ভিত্তিতেই করেন। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারব না যতক্ষণ না এই বিশ্বাস করতে পারব যে, আল্লাহ তাআলার না-দেওয়াটাও এক ধরনের দান।

চতুর্থ পাঠ
প্রকৃত চিকিৎসক তো আকাশে। বৃদ্ধা বন্ধ্যা নারীকে (ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী) আল্লাহ তাআলা মুহূর্তের মধ্যেই নবী (ইসহাক আলাইহিস সালাম)-প্রসবের যোগ্যতা দিয়ে দেন। বহু বছর তিনি (আইয়ুব আলাইহিস সালাম) রোগাক্রান্ত ছিলেন। রব তাকে বললেন— ‘তুমি পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করো। এটি তো গোসল করার এবং পানি পান করার ঠান্ডা ঝরনা। [১]’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি পূর্বের চেয়েও সুস্থ হয়ে ওঠেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার রবকে ডাক দিয়েছেন— ‘হে আমার রব! আমাকে একা রাখবেন না।'[২] তখন তাকে ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর সুসংবাদ দেয়া হয়।

কুষ্ঠ রোগী, দুনিয়ার সকল ডাক্তার মিলেও যাকে সুস্থ করতে পারেনি, আল্লাহ তাআলা শুধু বলেছেন, তুমি সুস্থ হয়ে যাও। সঙ্গে সঙ্গে সে সুস্থ হয়ে গেছে। এভাবে টাক ব্যক্তির চুল তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন, অন্ধ ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবু চিকিৎসার জন্য ডাক্তারদের কাছে যেতে হবে। কেননা আমরা এমন জাতি যাদেরকে চিকিৎসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোগ দূর করার জন্য ডাক্তারদের কাছে যাওয়াটা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। কেননা তা তো তাকদির অনুযায়ী হবে। যদি আল্লাহ চান তাহলে মানুষের হাতে মানুষকে সুস্থ করে তুলবেন। আর যদি তিনি না চান তাহলে দুনিয়ার সকল ডাক্তার মিলেও কিছু করতে পারবে না। কিন্তু তারপরও আমাদেরকে উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতে হবে। তাই চলুন, আমরা প্রকৃত ডাক্তারকে স্মরণ করি। বিশ্ব জগতের সকল কিছুর জন্য তিনি যথেষ্ট। ঔষধ সেবন করতে হবে, কেননা এটা সুস্থতা লাভের মাধ্যম। তবে এসবের পূর্বে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা পড়ুন- ‘হে আমাদের রব, আপনি রোগব্যাধি দূর করে দিন। আপনি তাকে সুস্থ করুন। আপনিই তো কেবল সুস্থ করতে পারেন। আপনি এমন সুস্থ করুন যারপর কোনো রোগ ব্যাধি হবে না’[১]।

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৬৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৯৬৪। (ঈষৎ পরিমার্জিত)।
[১] সুরা নমল, আয়াত-ক্রম: ৪০
[১] সুরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ৪২
[২] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৯
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২১৯১

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 মদ

📄 মদ


উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- 'তোমরা মাদকদ্রব্য পরিত্যাগ করো, কেননা তা নানা প্রকার অপকর্মের প্রসূতি। তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে এক আবেদ ব্যক্তি ছিল। এক চরিত্রহীনা রমণী তাকে নিজের ধোঁকাবাজির জালে আবদ্ধ করতে মনস্থ করে। এজন্য সে তার এক দাসীকে তার কাছে প্রেরণ করে তাকে সাক্ষ্যদানের জন্য ডেকে পাঠায়। তখন ঐ আবেদ ব্যক্তি ঐ দাসীর সঙ্গে গেল। সে যখনই কোনো দরজা অতিক্রম করত, দাসী পেছন থেকে সেটি বন্ধ করে দিত। এভাবে সেই আবেদ ব্যক্তি এক অতি সুন্দরী নারীর সামনে উপস্থিত হলো আর তার সামনে ছিল একটি ছেলে এবং এক পেয়ালা মদ। সেই নারী আবেদকে বলল, “আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠাইনি, বরং এজন্য ডেকে পাঠিয়েছি যে, আপনি আমার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হবেন, অথবা এই মদ পান করবেন, অথবা এই ছেলেকে হত্যা করবেন।” সেই আবেদ বলল, "আমাকে এই মদের একটি মাত্র পেয়ালা দাও। ঐ নারী তাকে এক পেয়ালা মদ পান করাল। তখন সে বলল, "আরও দাও।” মোটকথা ঐ আবেদ আর থামল না, এমনকি সে তার সঙ্গে ব্যভিচার করল এবং ঐ ছেলেকেও হত্যা করল। অতএব তোমরা মদ পরিত্যাগ করো। কেননা আল্লাহর শপথ! মদ ও ঈমান কখনো সহাবস্থান করে না। এর একটি অন্যটিকে বের করে দেয়।' [১]

প্রথম পাঠ
জীবন যদি সব সময় আমাদেরকে ভালো-মন্দের মধ্যে ইচ্ছাধিকার প্রদান করত তাহলে আমাদের ওপর অনেক অনুগ্রহ করত। তবে এই ধরনের ইচ্ছাধিকার হলো সৌখিনতা। সবসময় এর সুযোগ মেলে না। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে জীবন আমাদেরকে দুটি বিষয়ের মধ্যে ইচ্ছাধিকার প্রদান করে; যার সবচেয়ে সুমিষ্ট জিনিসও তিক্ত হয়ে থাকে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অকল্যাণ থেকে কল্যাণকে বুঝতে পারে সে জ্ঞানী নয়, বরং যে ব্যক্তি দুটি অকল্যাণের মধ্যে কোনটি তুলনামূলক কল্যাণকর তা বুঝতে পারে সেই জ্ঞানী।' কম ক্ষতিকর বিষয়টি নির্বাচন করা শরিয়তের একটি মূলনীতি। কিন্তু প্রবৃত্তির মাধ্যমে কম ক্ষতিকর বিষয়টি নির্বাচন করা যায় না; বরং পরিণাম এবং ফলাফল দেখে তা নির্ধারণ করতে হয়। যদিও দুটি মন্দের কোনোটিই না করার সুযোগ রয়েছে। কেননা যাকে অন্যের তুলনায় ছোট মনে করা হচ্ছে সেটাও কখনো প্রকৃতপক্ষে বড় অনিষ্টের এবং প্রজ্বলিত জাহান্নামের দ্বার হতে পারে। উল্লিখিত ঘটনার প্রতি লক্ষ করুন, এই আবেদ লোকটি মনে করেছিল মদপান করাটা হত্যা ও ব্যভিচার থেকে কম ক্ষতিকর। কিন্তু সে মদ পান করার পর হত্যাও করেছে আবার ব্যভিচারও করেছে। সে শুরুতে যা থেকে বিরত থাকতে চেয়েছে পরে তাতেই লিপ্ত হয়েছে।

দ্বিতীয় পাঠ
যারা আপনার সামনে বিভিন্ন সুযোগ রাখছে তারা এর মাধ্যমে আপনার চিন্তা- চেতনাকে আবদ্ধ করে ফেলছে। দুটি বিষয়ের মধ্যে আপনার বিবেককে বন্দী করে ফেলছে। তারা আপনার মধ্যে একটা ধারণা তৈরি করে দিচ্ছে যে তারা যে বিকল্পগুলো পেশ করেছে সেটাই একমাত্র সুযোগ। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এমনটি ঘটে। একটি সাধারণ উদাহরণ লক্ষ করুন। মনে করুন, আপনি কোনো বন্ধুর কাছে গেলেন আর বন্ধু আপনাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি চা খাবে না কফি? সে এর মাধ্যমে আপনার সামনে দুটি বিষয়ে ইচ্ছাধিকার প্রদান করেছে। তৃতীয় কোনো অপশন রাখেনি। কিন্তু সবসময় পেশকৃত দুটি বিকল্প লক্ষ্য পূরণ করতে পারে না। কখনো উভয়টিই ভুল হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে সে আপনাকে বুঝাতে চায় যে, এ দুটির যে কোনো একটি অপরটি তুলনায় কল্যাণকর বা কম ক্ষতিকর। তারা আপনাকে ভুল পথে হাঁটাতে চায়। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই তৃতীয় একটি পথ থাকে, যা আপনি সে মুহূর্তে দেখতে পারেন না। যা আপনার চিন্তা থেকে উবে যায়। কেননা আপনার সামনে পেশকৃত সুযোগের মধ্যে তা ছিল না। আপনি বুদ্ধিমান হোন। এ-জাতীয় সমস্যার সম্মুখীন হলে পেশকৃত বিষয় দুটি ব্যতীত তৃতীয় আরেকটি বিষয় গ্রহণ করুন। যা আপনাকে মুক্তির পথ দেখাবে।

তৃতীয় পাঠ
আল্লাহ তাআলা উদ্ভিদের মধ্যে জীবন রেখেছেন। কিন্তু তাদের কোনো জ্ঞান-বুদ্ধি ও চলৎশক্তি নেই। আর তিনি জীবজন্তুর মধ্যে জীবনীশক্তি এবং রুহ দিয়েছেন। কিন্তু তাদেরকে জ্ঞান বুদ্ধি দেননি। আর তিনি মানুষের মধ্যে জীবনীশক্তি, রুহ, জ্ঞান-বুদ্ধি-সবকিছু দিয়েছেন। জ্ঞান-বুদ্ধিবিহীন মানুষ জীবজন্তুতুল্য। কেননা সে জীবজন্তুর মতোই নিজের প্রবৃত্তির চাহিদা চরিতার্থ করে থাকে। আকলকে এই কারণে আকল বলা হয় যে, সে আকলবানকে বিভিন্ন কাজ থেকে বাধা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ মানুষের জন্য যেটা অনুপোযোগী সে তা করা থেকে বাধা প্রদান করে থাকে। এই কারণে পাগলের উপর থেকে সকল বিধি-বিধান উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। আকল তথা জ্ঞান-বুদ্ধি বিধি-বিধান আবশ্যক হওয়ার মূল। যার জ্ঞান-বুদ্ধি নেই তার কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। এটা সেই ক্ষেত্রে যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কারও জ্ঞান-বুদ্ধি হরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। যে ব্যক্তি নিজেই আপন বিবেক-বুদ্ধি বিদূরিত করে ফেলে সে জ্ঞান-বুদ্ধি না থাকা অবস্থায় যা করবে এর জন্য তাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। কেউ মদ পান করে মাতাল হয়ে কাউকে হত্যা করলে তাকে কেসাস স্বরূপ হত্যা করা হবে। আমি বুঝি না, মানুষ কেন নিজে নিজেই জীবজন্তু হয়ে যায়? আল্লাহ তাআলা তো নিজেই তাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে মানুষ হিসেবে সম্মানিত করেছেন! কুরায়েশি ঈগল আবদুর রহমান আদ-দাখিল যখন আন্দালুসে প্রবেশ করেন তখন তার কাছে এক পেয়ালা মদ আনা হয়, তিনি তাদের বলেন, 'যে জিনিস আমার জ্ঞানের প্রবৃদ্ধি ঘটাবে আমার সে জিনিসের প্রয়োজন, যা আমার জ্ঞান কমিয়ে দেবে তার কোনো প্রয়োজন নেই।' এটা সঠিক কথা যে, মদপান করা কবিরা গুনাহ, কিন্তু এই কারণে কেউ ধর্ম থেকে বের হয়ে যায় না। তবে হাদিসে মানুষের অন্তরকে ঘরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ঈমান এবং মদপান এ ঘরের ছাদের নিচে কখনো একত্রিত হতে পারে না। যদি কখনো অবস্থান করে তাহলে অচিরেই একটি অপরটিকে বের করে দেবে।

চতুর্থ পাঠ
এই দুনিয়াটা ফেতনা ও পরীক্ষায় পূর্ণ। কেননা এটি পরীক্ষাগার। মানুষ সবসময় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে থাকে। যা কখনো তার স্বভাবের অনুকূল হয় আবার কখনো প্রতিকূল। ইউসুফ আলাইহিস সালাম দুটি বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন। মারাত্মক ঘৃণার মাধ্যমে পরীক্ষা, পরম ভালোবাসার মাধ্যমে পরীক্ষা। মারাত্মক ঘৃণা তাকে কূপে নিক্ষেপ করেছিল। আর পরম ভালোবাসা ফেলে দিয়েছিল কারাগারে। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে লোকেরা এসব দুর্ব্যবহার করেছিল। কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছিলেন? যখন তিনি অপছন্দকারীদের মাধ্যমে পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছেন তখন ধৈর্য ধারণ করেছেন, যখন ভালোবাসার মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়েছেন তখনও ধৈর্যকেই অবলম্বন বানিয়েছেন। কট্টর বিদ্বেষ তাকে তার ভাইদের স্তরে নামিয়ে দিতে পারেনি। তেমনিভাবে প্রচণ্ড ভালোবাসা তাকে বাদশাহর স্ত্রীর আনুগত্যে বাধ্য করতে পারেনি। আমার মতে বিদ্বেষ ও শত্রুতাপূর্ণ পরীক্ষা ভালোবাসাময় পরীক্ষার চেয়ে সহজ। কেননা শত্রুর মাধ্যমে পরীক্ষায় নিপতিত হওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে আমাদেরকে অপছন্দনীয় বিষয়ে ইচ্ছাধিকার প্রদান করবে। কিন্তু যদি আমরা ভালোবাসার পাত্র দ্বারা পরীক্ষায় নিপতিত হই তাহলে অধিকাংশ সময়ই সে আমাদের সামনে হারাম বিষয় পেশ করবে, প্রবৃত্তির তাড়নায় তখন আমরা তাতে ধাবিত হয়ে যাব। ইউসুফ আলাইহিস সালাম একজন সুঠাম ও শক্তিশালী যুবক ছিলেন। অন্যান্য পুরুষের যেমন প্রবৃত্তি-চাহিদা ছিল তেমনই তারও ছিল। আর আল্লাহ তাআলা মানুষকে বাসনা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন। বাদশাহর স্ত্রীর আবেদনে ধৈর্যধারণ করাটা তার কাছে ভাইদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যধারণের চেয়ে কষ্টসাধ্য ছিল।

টিকাঃ
[১] সুনানে নাসায়ি, হাদিস-ক্রম: ৫৬৮২। সনদ মওকুফ সহিহ।

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 কাঠের পা

📄 কাঠের পা


নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'বনি ইসরাইলে খাটো আকৃতির এক নারী দুজন দীর্ঘাঙ্গী নারীর সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিল। সে (উঁচু হওয়ার জন্য) এবং লোকদের চোখে ধরা না পড়ার জন্যে কাঠের দুটি পা তৈরি করে নেয় এবং সোনা দিয়ে একটি বড় আংটি তৈরি করে এর ভেতরে মেশক ভরে দেয়। আর তা হলো সুগন্ধিসমূহের মধ্যে সেরা সুগন্ধি। পরে সে ঐ দুই মেয়েলোকের মধ্য থেকে চলতে লাগল এবং লোকেরা তাকে চিনতে পারল না। সে-সময় তার হাত দিয়ে এভাবে ঝাড়া দিল। (এ কথা বলে বর্ণনাকারী শু'বাহ্ রহিমাহুল্লাহ তার হাত ঝাড়া দিলেন এবং ওই নারীর হাত ঝাড়ার ধরন নকল করলেন।)'[১]

প্রথম পাঠ
এক বেদুইন বিয়ের নিকটবর্তী তার মেয়েকে উপদেশ দিয়ে বলল, 'স্বামী যেন সদা তোমার মধ্যে সুন্দর বিষয় দেখতে পায় আর যেন তোমার থেকে উত্তম ঘ্রাণ পায়। জেনে রাখো, সর্বোত্তম সুগন্ধি হলো পানি (আতর)। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ওসিয়ত; যাতে দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা নিংড়ে পড়েছে। সৌন্দর্য অবলম্বন করা উচিত। আর আতরই সর্বোত্তম সৌন্দর্য। নারী এর মাধ্যমে একজন পুরুষের চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি, চোখ-নাক এবং হৃদয়ে মোহনীয় হয়ে ওঠে। যদিও হাদিসে সুগন্ধি ব্যবহার করাকে নিন্দনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। তবে এটি সুগন্ধি খারাপ হওয়ার কারণে নয় বরং সুগন্ধি ব্যবহারের স্থান-কালের কারণে। নারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন সে একমাত্র স্বামী এবং মাহরাম ব্যতীত কারও সামনে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।

হাদিসে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘যে মহিলা সুগন্ধি লাগিয়ে এই উদ্দেশ্যে লোকের মধ্যে গমন করে যে, তারা তার সুগন্ধির ঘ্রাণ পাবে, সে ব্যভিচারিণী।[১]’ তাকে ভীতি প্রদর্শনের জন্য এমনটা বলা হয়েছে, তার ওপর ব্যভিচারের দণ্ড প্রয়োগ করার জন্য নয়। ইসলামে বিশাল একটি দরজা রয়েছে, যার নাম হল 'ছাদ্দুয যারায়ে' (অর্থাৎ বিপদ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তার দ্বার রুদ্ধ করে দেওয়া)। ইসলাম আগুন প্রজ্জ্বলিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায় না যে, আগে আগুন লাগুক পরে নেভানো হবে। বরং আগুন লাগার পূর্বে শুরুতেই ইসলাম তা বন্ধ করার চেষ্টা করে থাকে। যে জিনিস মানুষকে খারাপ কাজের দিকে নিয়ে যায় সেটাও খারাপ কাজ।

দ্বিতীয় পাঠ
বাহ্যিক অবস্থা দেখে নারীরা দুই কারণে প্রভাবিত হয়ে যায়। এক. তারমধ্যে প্রবৃত্তির বাসনা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। দুই. পুরুষের প্রতি নারীর আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি। এটি নারীর কোনো নিন্দনীয় বিষয় নয়; বরং আল্লাহ তাআলাই তাকে এ স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেক সৃষ্টিকে কোনো এক জিনিস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার আচার-ব্যবহার-চরিত্র তা দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে থাকে। প্রথম পুরুষ আদম আলাইহিস সালামকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ-কারণে পুরুষরা কম সংবেদনশীল। আর চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও উৎপাদনে তারা অধিক আগ্রহী। পক্ষান্তরে হাওয়া আলাইহাস সালাম (নারী)-কে আদম আলাইহিস সালাম থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই কারণে নারীজাতি পুরুষের প্রতি অধিক আকৃষ্ট হয়ে থাকে। সমষ্টিগত বিষয় খণ্ডিত বিষয়ের প্রতি যেভাবে আকর্ষিত হয় পুরুষও নারীর প্রতি সেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে খণ্ডিত বিষয় সমষ্টিগত বিষয়ের প্রতি যেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকে নারীও পুরুষের প্রতি সেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকে।

এই কারণে নারীরা পুরুষের তত্ত্বাবধানে জীবনযাপন করতে কোনো কষ্টবোধ করে না। পুরুষ তার দেখাশোনা করে থাকে। তার প্রতি সংবেদনশীল হয়ে থাকে। সে এক্ষেত্রে কোনো ত্রুটিবোধ করে না। কেননা তাকে কাজকর্ম এবং পরিশ্রম করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। পক্ষান্তরে নারী পুরুষের দেখাশোনা করা, তার খরচ চালানো সৃষ্টিগতভাবেই পুরুষের কাছে সমস্যাকর। স্বামী স্বভাবগত জটিল রোগাক্রান্ত হলে পরেই কেবল এই বিষয়টা মেনে নিতে পারে যে, স্ত্রীও সংসারের খরচ বহন করুক। তবে কোনো পুরুষ সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াটা বেশ মুশকিল বিষয়। কারণ, উপরে বর্ণিত সবই আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট স্বভাব। যা দিয়ে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। এই কথার অর্থ এটা নয় যে, পুরুষ নারীর প্রতি আকর্ষণবোধ করে না, কিংবা নারী তাদের চোখ ও অন্তরের কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়; বরং এ কথার উদ্দেশ্য হলো কোনো পুরুষের জীবন নারীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া অসম্ভব। কিন্তু এটা খুব সম্ভব যে, পুরুষ কোনো নারীর একমাত্র জীবন ও দুনিয়া হবে।

তৃতীয় পাঠ
নারীর জন্য তার মনোবাসনাকে ধর্মের ওপর প্রাধান্য না দেওয়া আবশ্যক। যদিও মনোবাসনাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়, ধর্ম তো মানুষের মনোবাসনাকে নিঃশেষ করে দিতে আসেনি বরং তা সংশোধন ও পরিমার্জন করার জন্য এসেছে। নারীকে পুরুষের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর অর্থ এটা নয় যে, তার এ মনোবাসনা সকল পুরুষের জন্যই নিবেদিত হবে। ইসলাম যখন পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখার বৈধতা দান করেছে এর দ্বারা নিশ্চিতভাবেই বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাকে এই কাজের সক্ষমতা দান করেছেন। এটি এমন এক বিষয় পুরুষেরা বহুচেষ্টা করলেও নারীদের কাছে তা ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারবে না। তেমনিভাবে নারীরা বহু চেষ্টা করলেও তা পুরুষদেরকে বোঝাতে পারবে না। কেননা তাদেরকে এক স্বামী নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার প্রবৃত্তি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। নারী যদি এক পুরুষের তত্ত্বাবধানে জীবনযাপন করে যায় তাহলে সে সওয়াবের উপযুক্ত হবে। যদি সে নিজের সৃষ্টিজাত প্রবৃত্তিকে নষ্ট করে বহু পুরুষের প্রবৃত্তি-বাসনা পূরণ করতে যায় তাহলে সে গুনাহগার হবে। প্রকৃত নারী হলো যে তার স্বামীকে নিয়েই জীবনযাপন করে।

চতুর্থ পাঠ
পুরুষেরা শুধু নারীর সৌন্দর্য দেখতে চায় এবং তার সুঘ্রাণ শুঁকতে চায়। তাই স্ত্রী স্বামীর জন্য এটা করলে সে সাওয়াব লাভ করবে। ফলে এতে স্বামী পরিতৃপ্ত হবে এবং তার চরিত্র পবিত্র থাকবে। পাশাপাশি স্বামী যা পছন্দ করে সেও সেটা পছন্দ করবে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তো বলেছেন, সে যেমন আমার জন্য সৌন্দর্য অবলম্বন করে আমিও তার জন্য সৌন্দর্য গ্রহণ করি। স্বামী যখন স্ত্রীর মনোবাসনা, তার ইচ্ছা ও প্রয়োজনপূরণে সাড়া দেয় তখন সে সওয়াব লাভ করে থাকে। পুরুষের দায়িত্বপালনে অবহেলা নারীকে অন্য পুরুষের প্রতি ভ্রুক্ষেপের অনুমতি দেয় না। যেমনভাবে স্ত্রীর দায়িত্বপালনে অবহেলা পুরুষকে স্ত্রী ভিন্ন কোনো হারাম ক্ষেত্রে ভ্রুক্ষেপের অনুমোদন দেয় না। আমাদেরকে গুনাহের পথ রুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। পুরুষেরা কেন নিজেদের বেশভূষা এবং সৌন্দর্যের প্রতি অধিক লক্ষ রাখবে? কারণ, আপনার স্ত্রী এমন পুরুষকে দেখলে বলবে, 'কেন আপনি তার মতো নন?' নারীরা কেন নিজেদের নারীত্বকে অধিক রূপে ফুটিয়ে তুলবে? কারণ আপনার স্বামী এমন নারীকে দেখলে আফসোস করবে, কেন তার স্ত্রী ওই নারীর মতো নয়! বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আনন্দ ভোগ করে থাকে। যার সামনে সকল সমস্যাই তুচ্ছ। বিয়ের মাধ্যমে পরিতৃপ্তকরণ অর্জিত না হলে তার কারণে বহু সমস্যা ও সংকট তৈরি হবে। প্রকৃতপক্ষে যা মনোমালিন্যের কারণেই ঘটে থাকে। আমি একটি বড় মূলনীতি বলে দিই, দেখবেন, ঘরের বড় বড় সমস্যাগুলো শোবার খাট থেকেই উদ্ভূত হয়।

পঞ্চম পাঠ
আগেকার যুগে সাধারণত কাঠ দ্বারা জুতার তলদেশ বিশেষভাবে উঁচু করা হতো। (বর্তমানে যাকে হাই হিল বলে।) আগেকার যুগে আতরের আংটি বর্তমান যুগের সুগন্ধির মতোই হতো (স্প্রেয়ারের মতো)। যা মানুষের অন্তরকে উত্তেজিত করে তোলে। যুগে যুগে মানুষ আগের মতোই রয়ে গেছে। সময়ে সময়ে শুধু তাদের উপায়-উপকরণে পরিবর্তন ঘটেছে। আগের উপকরণগুলো এ যুগের সঙ্গে অধিক কার্যকরী ও উপকারী হয়ে থাকে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্য বলেছেন- ‘অবশ্যই অবশ্যই তোমরা তোমাদের আগের লোকেদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি সাপের গর্তে ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুকরণ করবে। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম) বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, এরা কি ইহুদি-নাসারা?” তিনি বললেন, "আর কারা?”” [1]

বনি ইসরাইলের সর্বপ্রথম ফেতনা সংঘটিত হয়েছিল নারীকে কেন্দ্র করে। তাই পুরুষেরা যেন নারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে। কেননা তারা কমনীয় সত্তা। পুরুষের ওপর তাদের জন্য বহু অধিকার রয়েছে। সৌন্দর্য-উপকরণ-সুগন্ধি-সুরমা-এগুলো হারাম নয়। এগুলো তো শুধু কিছু উপকরণ, ব্যবহারের ভিত্তিতে যার হালাল-হারামের দিকটি নির্ণিত হয়। প্রত্যেক সুগন্ধি আপন স্থানে পুণ্যের কাজ। প্রত্যেক সুরমা-কাঠি আপন স্থানে গুনাহ নয়। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে (এর ব্যবহারে) সওয়াব রয়েছে। আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার কিছু লোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে ধনীরা আমলে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অনুযোগ করেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদাকাহর বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন- ‘এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকাহ রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করাও একটি সাদাকাহ। সাহাবিগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের কেউ তার কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে?" তিনি বললেন, " তোমরা বলো দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা ব্যভিচার করত তাহলে কি তার গুনাহ হতো না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে।” [১]

টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২২৫২
[১] আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৪১৭৩
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৩২০
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০০৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px