📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 মুগিস ও বারিরা

📄 মুগিস ও বারিরা


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
'বারিরার স্বামী ছিলেন একজন ক্রীতদাস। তাকে 'মুগিস' নামে ডাকা হতো। আমি যেন এখনও তাকে দেখছি-তিনি বারিরার পিছে কেঁদে কেঁদে ঘুরছেন, আর তার দাড়ি বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে) বললেন, “আব্বাস! বারিরার প্রতি মুগিসের ভালোবাসা এবং মুগিসের প্রতি বারিরার অনাসক্তি দেখে আপনি কি আশ্চর্যান্বিত হন না?” এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (বারিরাকে) বললেন, “তুমি যদি তার কাছে আবার ফিরে যেতে (তাহলে কতই-না ভালো হত)! তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আমাকে হুকুম দিচ্ছেন?” তিনি বললেন, “আমি কেবল সুপারিশ করছি।” বারিরা বললেন, “তাকে দিয়ে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”” [১]

বারিরা এক আনসারি সাহাবির বাঁদি ছিলেন। তার স্বামীর নাম ছিল মুগিস। বারিরা স্বাধীনতা লাভের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এজন্য তিনি মনিবের সঙ্গে কিতাবাত (টাকার বিনিময়ে স্বাধীনতা) চুক্তি করেন। আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কন্যা আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বাধীনতা লাভের জন্য তাকে আর্থিক সাহায্যের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বারিরা স্বাধীনতা লাভের পর স্বামীর ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেন। কারণ, বাঁদি স্বাধীন হয়ে গেলে আর স্বামী গোলাম রয়ে গেলে শরিয়ত তাকে স্বামীর সঙ্গে থাকা বা না-থাকার ইচ্ছাধিকার প্রদান করে থাকে। বারিরা তার স্বামী মুগিসকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মুগিস বারিরাকে পাওয়ার জন্য কাঁদতে কাঁদতে মদিনার অলিগলিতে তার পিছুপিছু ঘুরতেন। কিন্তু মুগিসের প্রতি তার কোনো সমবেদনা বা দয়া জাগ্রত হতো না। মুগিস এভাবে বারিরাকে পাওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে ছুটে গেলেন দয়ালু নবীজির কাছে। বারিরার কাছে তার জন্য সুপারিশ করার আবেদন করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারিরাকে বলেন, “তুমি যদি তার সঙ্গে ঘর সংসার করতে! সে তো তোমার স্বামী! তোমার সন্তানের পিতা!” বারিরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন?” তিনি বলেন, “আমি কেবল সুপারিশ করছি।” বারিরা বললেন, “তাহলে তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”

প্রথম পাঠ
এক পক্ষ থেকে ভালোবাসা অধিকাংশ সময়ই লাঞ্চনা বয়ে আনে। তবে এটাও ঠিক যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের মধ্যে এমন এক অন্তর দিয়েছেন যা কোনো প্রিয় ব্যক্তিকে দেখা মাত্রই তার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর বিপরীতে আমরা যেন নিজের সম্মানজনক অবস্থান হারিয়ে না বসি তার জন্য তিনি আমাদেরকে ইচ্ছাশক্তিও প্রদান করেছেন। আপনি যাকে ভালোবাসেন তার কাছে আপনার হৃদয়ের অভিব্যক্তি পেশ করুন, কিন্তু ভালোবাসার জন্য তাকে চাপাচাপি করবেন না। একবার পরীক্ষা করুন, আরেকবার ভালবাসুন। তবে আপনার মধ্যে বিবেচনাশক্তি থাকতে হবে। আগের যুগের মানুষজন বলতেন, কখনো কখনো দুই-এক পৃষ্ঠা উল্টানো যথেষ্ট হয় না; বরং পুরো কিতাব পরিবর্তন করতে হয়! অর্থাৎ প্রয়োজনে নিজেকে আমূল পালটে ফেলতে হবে। অথবা ভালোবাসার ঠিকানা পালটে নিতে হবে।

দ্বিতীয় পাঠ
নারীরা কোনো বিক্রয়-পণ্য নয় যে, যে ব্যক্তি মোহর প্রদান করবে তার কাছেই তাকে হস্তান্তর করতে হবে। ন্যায়সঙ্গতভাবে অন্তর কারও প্রতি আকৃষ্ট থাকা সত্ত্বেও মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে বসতে বাধ্য করাটা জুলুম। দেহ-হত্যার চেয়ে অন্তরকে হত্যা করাটা অধিক কষ্টদায়ক এবং পাপের কারণ। আপনি প্রাচীন যুগের আরবদের কুসংস্কার পরিত্যাগ করুন। তারা মেয়েদেরকে মেয়েদের পছন্দসই পুরুষের কাছে বিয়ে দিত না। তাদের, বরং আরবের সকল সম্প্রদায়ের, বরং গোটা বিশ্বের মধ্যে যিনি সর্বোত্তম তার অনুসরণ করুন। তিনি বলেছেন- 'পরস্পর ভালোবাসাময় নারী-পুরুষের জন্য বিয়ে ব্যতীত অন্য কোনো পথ নেই।' তবে এই ভালোবাসা হতে হবে দ্বীনের জন্য। দ্বীনের সীমারেখা মেনে। দুনিয়ার মোহে কিংবা নাজায়েজ পদ্ধতির ভালোবাসায় কোনো প্রকার কল্যাণ নেই। এই মোহ অল্প সময়ে কেটে যায়। জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা আল্লাহ নারাজ হন।

তৃতীয় পাঠ
আপনি সত্যিকারের পুরুষ হয়ে উঠুন। সামাজিক রীতিনীতি এবং সংস্কৃতির অনুসরণ করেন বলে আপনি ওই কোমল হৃদয়কে ধোঁকা দেবেন না যে হৃদয় আপনাকে ভালোবাসে। প্রতিটি মানুষেরই হৃদয় রয়েছে। যদি আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত প্রিয়তমাকে বিয়ে করতে না পারেন, তাহলে অচিরেই আপনি হয়তো অপর কোনো ব্যক্তির প্রিয়তমাকে বিয়ে করবেন। আমাদের অধিকাংশ রীতিনীতি ও সংস্কৃতিগুলো একটি মূর্তি। এগুলোকে ভেঙে ফেলা আবশ্যক। শুধু ইসলামি শরিয়ত মেনে বিয়ে করুন। আপনার জীবন হবে অনাবিল আনন্দে ভরপুর।

চতুর্থ পাঠ
আপনি সুপারিশ করুন। হাড্ডির চেয়ে অন্তর জোড়ানোর প্রতি অধিক মনোযোগী হোন। কেননা তা ভেঙে যাওয়াটাও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। যদি আপনি দুটি মনের মধ্যে মিলন ঘটিয়ে দিতে পারেন তাহলে অমত করবেন না। যদি আপনি পারিবারিক কোনো ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দিতে পারেন তাহলে কালবিলম্ব করবেন না। কারও হাতে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা দ্বারা প্রকৃত মর্যাদা নির্ণিত হয় না। বরং সে মানুষের জন্য কতটুকু এগিয়ে এসেছে তা দেখেই আসল মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়। ডালপালার কারণে বৃক্ষকে মূল্যায়ন করা হয় না, বরং বৃক্ষের ফলের কারণে তাকে মূল্যায়ন করা হয়। পৃষ্ঠার সংখ্যা আর মান দেখে কিতাবের মূল্যায়ন হয় না বরং তাতে লিখিত বাক্যাবলিতেই তা নির্ধারণ হয়। তেমনিভাবে আমলের মাধ্যমে একদল মানুষ অন্যদলের ওপর মর্যাদা লাভ করে থাকে। ইতিহাসে যাঁরা স্থান করে নিয়েছেন তাদের প্রতি লক্ষ করুন, তাদের সকলেই পৃথিবীকে বিভিন্ন জিনিস দিয়েছেন। কেউ কোনো ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। কেউ গ্রন্থ রচনা করেছেন। কেউ যুদ্ধ বন্ধ করেছেন। কেউ রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছেন। সমস্ত মানুষই তো পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। তারা যে সুন্দর জিনিস রেখে যায় শুধু তাই স্থায়ী হয়। তাই কোনো কৃতিত্ব না রেখে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন না।

পঞ্চম পাঠ
কবুল না হওয়ার অজুহাতে সুপারিশ করা থেকে বিরত থাকা যাবে না। চেষ্টা করাটাই যথেষ্ট। যা বাস্তবায়ন হবে শুধু তার জন্যই নয়, বরং আমরা যা করব তারও প্রতিদান পাব। এটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। হাদিসে এসেছে-কেয়ামতের দিন এমনও নবী আসবেন যাঁদের সঙ্গে কোনো উম্মত থাকবে না। আপনার সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করা হলে এটাকে অপমান মনে করবেন না। আপনি যতই উচ্চাসনের অধিকারী হন না কেন, কখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি লক্ষ করুন, তিনি একজন নারীর কাছে সুপারিশ করছেন! যে কি না বাঁদি ছিল! তবুও সে নবীর সুপারিশ কবুল করেনি! তিনি কি এটাকে অপমান মনে করেছিলেন? সুপারিশ করার পর তা রক্ষা না করায় তিনি কি সেই নারীর প্রতিপক্ষ হয়ে গিয়েছিলেন? অহংকার করে সুপারিশের সওয়াব নষ্ট করবেন না।

ষষ্ঠ পাঠ
কল্যাণমূলক কোনো কাজকে হালকা মনে করবেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সবচেয়ে ইবাদতপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। বড় বড় দিনে রোজা রাখতেন। অন্ধকার রাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু তবুও তিনি সুপারিশ করা ছেড়ে দেননি। ব্যস্ততার সময় সংকীর্ণতার অজুহাত পেশ করবেন না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন। আপনি কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়েও বেশি ব্যস্ত মানুষ? ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি উম্মতের নবী ছিলেন। রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। তবুও নগণ্য, সাধারণ মানুষদের জন্য তার কাছে সময় ছিল। স্বামীর জন্য তিনি স্ত্রীর কাছে সুপারিশ করতেন। দাসের জন্য মনিবের কাছে সুপারিশ করতেন। অথচ আমাদের কাছে সাধারণ নগণ্য কেউ এলে আমরা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই!

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫২৮৩

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 স্বর্ণের কলস

📄 স্বর্ণের কলস


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'এক লোক অপর লোক হতে একখণ্ড জমি ক্রয় করেছিল। ক্রেতা খরিদকৃত জমিতে একটা স্বর্ণ-ভর্তি কলস পেল। ক্রেতা বিক্রেতাকে তা ফেরত নিতে অনুরোধ করে বলল, "আমি জমি ক্রয় করেছি, স্বর্ণ ক্রয় করিনি।” বিক্রেতা বলল, "আমি জমি এবং এতে যা কিছু আছে সবই বেচে দিয়েছি।” অতঃপর তারা উভয়েই অপর এক লোকের কাছে এর মীমাংসা চাইল। তিনি বললেন, "তোমাদের কি ছেলে-মেয়ে আছে?” একজন বলল, “আমার একটি ছেলে আছে।” অন্য লোকটি বলল, "আমার একটি মেয়ে আছে।” মীমাংসাকারী বললেন, "তোমার মেয়েকে তার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দাও আর প্রাপ্ত স্বর্ণের মধ্যে কিছু তাদের বিয়েতে ব্যয় কোরো এবং বাকি অংশ তাদেরকে দিয়ে দাও।" [১]

প্রথম পাঠ
এ ক্রেতা-বি্রেতা উভয়ই মুত্তাকি। পূর্ববর্তী মনীষীগণ বলেছেন, হারামে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কায় হালালের ১০ ভাগের ৯ ভাগ পরিত্যাগ করা হলো তাকওয়া। আমি মনে করি এটি অত্যন্ত কঠিন। এতে হয়তো কিছুটা বাড়াবাড়িও রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহর উক্তিটি সবচেয়ে সুন্দর। তিনি বলেছেন, 'পরকালে যা উপকার করবে না তা পরিত্যাগ করার নাম হলো যুহদ তথা দুনিয়া-বিমুখতা। আর পরকালে যা ক্ষতি করতে পারে তা পরিত্যাগ করা হলো তাকওয়া। তাই মুত্তাকি হবার জন্য অধিকাংশ হালাল পরিত্যাগ করা শর্ত নয়। আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য যা হালাল করেছেন কখনোই তা পরকালের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে না। কিন্তু কোনো কোনো বিষয় সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয় না বরং ঘোলাটে ও সন্দেহপূর্ণ থেকে যায়, এমনসব ক্ষেত্রে তাকওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

উল্লিখিত ঘটনায় জমিক্রেতা স্বর্ণের কলস নেওয়ার ক্ষেত্রে পরহেজগারি অবলম্বন করেছে। সে মনে করেছে, এটা তার সম্পদ নয়। বিক্রির সময় শুধু মাটি বিক্রি হয়েছে মাটির ভেতরের জিনিস নয়। আর বিক্রেতাও কলসটি গ্রহণের ক্ষেত্রে পরহেজগারির পন্থা অবলম্বন করেছে। কেননা সে মনে করেছে, জমিটি ভেতরের সবকিছুসহ বিক্রি করা হয়েছে। শুধু কাগুজে চুক্তি নয় বরং তাকওয়ার মাধ্যমে যদি লেনদেন হতো তাহলে কতই-না ভালো হতো! ফাঁকফোকরপূর্ণ নিয়ম-কানুন নয় বরং সবাই যদি সচ্চরিত্রের মাধ্যমে লেনদেন করত তাহলে কতই-না উত্তম হতো! আমাদেরকে বুঝতে হবে, বিচারের মাধ্যমে অন্যের জিনিস পেয়ে গেলেই তা হালাল হয়ে যায় না। আমাদের সাইয়েদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বলেছেন—

'আমি মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নই। তোমরা আমার কাছে ঝগড়া-বিবাদ নিয়ে আসো। হয়তো তোমাদের কেউ অন্যজনের চেয়ে প্রমাণ পেশের ব্যাপারে অধিক বাকপটু। আর আমি তো যেমন শুনি তার ভিত্তিতেই বিচার করে থাকি। কাজেই আমি যদি কারও জন্য তার অন্য ভাইয়ের হক সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত দিই, তাহলে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা, (তার বাকপটুতা ও ধূর্ততার কারণে) আমি তার জন্য যে অংশ নির্ধারণ করলাম তা তো কেবল এক টুকরা আগুন।'[১]

দ্বিতীয় পাঠ
এই ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়—ব্যক্তি-মালিকানা মানব-সভ্যতার অতি পুরনো এক বিষয়। অথচ কমিউনিস্টরা এখন প্রচার করা শুরু করেছে যে, প্রাচীনকালে নাকি ব্যক্তি- মালিকানা বলে কিছু ছিল না। মানব-সভ্যতায় সর্বপ্রথম নাকি কমিউনিজম চালু ছিল। কেউই কোনো জিনিসের মালিক হতো না! প্রত্যেক জিনিসে সাম্যবাদ কার্যকর ছিল! ভূমি কারও ব্যক্তিমালিকানাধীন ছিল না; বরং সকলের ছিল! নারীরা যে কারও অধিকারভুক্ত ছিল! এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এক দাবি। এক্ষেত্রে তাদের কাছে ঐতিহাসিক কোনো দলিল- প্রমাণ নেই। সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে ইসলাম তা সম্পূর্ণ বাতিল বলে সাব্যস্ত করেছে।

পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানুষ হলেন আদম আলাইহিস সালাম। তার সন্তানেরা সরাসরিভাবে তার ঔরস থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন। কে স্ত্রীর অধিক হকদার এটা নিয়ে তার সন্তান— হাবিল ও কাবিল—দুই ভাইয়ের মধ্যে বিবাদ হয়েছে। এতে কাবিল হাবিলকে হত্যা করে ফেলে। তাহলে প্রাচীন মানব-সভ্যতায় থাকা কমিউনিস্টদের সাম্যবাদ কোথায় গেল? হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবার পূর্বে সেখানে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছিল। কাবিল- হাবিল উভয়ে নিজেদের মালিকানাধীন সম্পদ কুরবানি হিসেবে পেশ করেছিলেন। কাবিল ছিলেন কৃষক আর হাবিল মেষ-রাখাল। এক্ষেত্রে কৃষি-সম্পদ উভয়ের মালিকানাধীন ছিল না; বরং এটা কেবল কাবিলের অধিকারভুক্ত ছিল। তেমনিভাবে মেষ উভয়ের অধিকারভুক্ত ছিল না বরং এটা শুধু হাবিলের ছিল। মানুষ তখনও চাষাবাদ করত। পণ্যের অদল-বদল করত। যা ইদানীংকালের ক্রয়-বিক্রয়ের মতোই ছিল। ব্যক্তি-মালিকানা তখন মানুষের বিবাদ-বিসংবাদের উপলক্ষ ছিল না। সম্পদের প্রতি মানুষের লোভ ও আকর্ষণ প্রবৃত্তিগত। মালিকানাকে অবণ্টিত রাখা কোনোভাবেই এ সমস্যার সমাধান নয়। বরং এ ক্ষেত্রে প্রবৃত্তিকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। তাদের সমাধান সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এ যেন কেউ এমনটা দাবি করে বসলো, যৌন উত্তেজনার প্রতিষেধক হলো, পৃথিবীর সকল নারীকে প্রত্যেকের বৈধ সম্পদ বানিয়ে ফেলা!

তৃতীয় পাঠ
আল্লাহ তাআলা ন্যায়ানুগভাবে রিজিক বণ্টন করেছেন, সমান হারে নয়। কেননা সমতার তুলনায় ইনসাফ অধিক মর্যাদাপূর্ণ। কাউকে জ্ঞান-বুদ্ধি দেওয়া হয়েছে তো ধন-সম্পদ দেওয়া হয়নি। যেমন লুকমান আলাইহিস সালামকে দেওয়া হয়েছিল। কাউকে ধন-সম্পদ দেওয়া হয়েছে কিন্তু সুস্থতা দেওয়া হয়নি। কাউকে স্ত্রী দেওয়া হয়েছে কিন্তু সন্তান দেওয়া হয়নি। কাউকে স্বামী দেওয়া হয়েছে কিন্তু চরিত্রবান স্বামী দেওয়া হয়নি। আল্লাহ তাআলা খুব কম সংখ্যক মানুষকে দুনিয়ার সকল নেয়ামত দিয়ে থাকেন।

অভাবগ্রস্ত লোকজন ধনীদের কাছে যায়। তেমনিভাবে ঝগড়া-বিবাদের সময় মানুষকে বুদ্ধিমানের কাছে যাওয়া উচিত। উপরোল্লিখিত ঘটনায় ক্রেতা-বিক্রেতা তাকওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে স্বর্ণের কলস নিয়ে মধুর এক বিবাদে লিপ্ত হয়েছে। তাই বিচার নিয়ে তারা এক বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাছে গিয়েছে। তিনি এক চমৎকার সমাধান প্রদান করেন। যার মাধ্যমে তাদের বিবাদ নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাদের তাকওয়ারও কোনো ক্ষতি হয়নি। তাই প্রথমে বিপদের ধরন-প্রকৃতি বোঝা উচিত। কেউ আছে ছোট বিপদকে বেশ বড় করে দেখে। তাদের উদাহরণ যেন সেই বোকা লোকের মতো, যে সুরমা লাগাতে গিয়ে চোখ অন্ধ করে ফেলেছিল।

চতুর্থ পাঠ
অভিজাত লোকদের বিবাদও কত চমৎকার হয়! লোভী মানুষেরা যেমন নিজেদের অধিকার চায় তেমনি তারা অন্যদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে চায়। কিন্তু অভিজাত লোকদের বিষয়টা ভিন্ন। তাদের বিবাদ- বিসংবাদে কখনো বিচার-আচারের তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। এক ব্যক্তি মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। বৃদ্ধ হয়ে গেলে তিনি দুঃখবোধ করতে থাকেন। এই বলে তিনি আফসোস করেন যে, এ ঘরটিতে আর আগের মতো বিচার-সালিশ বসবে না। তার একটি মাত্র ছেলে ছিল। সে পিতাকে বলল, 'আমি আপনার পক্ষ থেকে বিচারকার্য পরিচালনা করব।' পিতা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'যদি তোমার কাছে একজন কৃপণ ও অভিজাত লোক বিচার নিয়ে আসে তাহলে তুমি কী করবে?' ছেলে বলল, 'আমি অভিজাত লোক থেকে নিয়ে কৃপণকে দেব।' পিতা জিজ্ঞেস করলেন, 'যদি দুজন কৃপণ বিবাদ নিয়ে আসে?' ছেলে বলল, 'আমার পক্ষ থেকে অর্থ দিয়ে তাদের মীমাংসা করে দেব।' পিতা জিজ্ঞেস করলেন, 'যদি দুজন অভিজাত লোক বিবাদ নিয়ে আসে?' ছেলে বলল, 'অভিজাত লোকদের বিচার-আচারের প্রয়োজন হয় না।' ছেলের বুদ্ধিমত্তা দেখে পিতা আনন্দিত হয়ে যান।

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৭২
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭১৬৯

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 ফেরাউন-কন্যার চুল আঁচড়াত যে বাঁদি

📄 ফেরাউন-কন্যার চুল আঁচড়াত যে বাঁদি


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘মেরাজের রাতে একস্থানে এসে আমার নাকে সুঘ্রাণ লাগলে জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করি, “এই সুঘ্রাণ কীসের?” জিবরাইল বললেন, “ফেরাউন- কন্যার চুল আঁচড়াত যে বাঁদি, এই ঘ্রাণ তার ও তার সন্তানদের।” আমি বললাম, “এর কারণ কী?” তিনি বললেন, "বাঁদিটি একবার ফিরআউনের মেয়ের চুল আঁচড়াচ্ছিল, হঠাৎ তার হাত থেকে চিরুনি পড়ে যায়। (চিরুনিটি উঠানোর সময়) সে বলে, বিসমিল্লাহ। ফিরআউনের মেয়ে তাকে বলল, আমার পিতার নামে এটা উঠালে? সে বলল, না বরং আমার এবং তোমার পিতার রব আল্লাহর নামে। সে বলল, আমি কি পিতাকে বিষয়টি জানিয়ে দেব? সে বলল, হ্যাঁ জানাতে পার। মেয়ে গিয়ে পিতাকে সব জানিয়ে দিল। ফিরআউন তাকে ডেকে বলল, হে অমুক, আমি ছাড়া কি তোমার অন্য কোনো রব আছে? সে বলল, হ্যাঁ আমার এবং তোমার রব আল্লাহ। সে তখন একটি তামার পাতিলে তেল ফুটিয়ে তাতে তাকে এবং তার সন্তানকে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বাঁদি ফিরআউনকে বলল, আপনার কাছে আমার একটি আবদার আছে। ফিরআউন বলল, কী? বাঁদি বলল, আমার এবং আমার সন্তানদের হাড্ডিগুলো একটি কাপড়ে মুড়ে দাফন করবেন। ফিরআউন বলল, ঠিক আছে। এটা আমাদের ওপর তোমার অধিকার। এরপর ফিরআউন তার সামনেই সন্তানদের একজন একজন করে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। একসময় তার দুগ্ধপোষ্য ছেলের পালা আসে। তার জন্য বাঁদিটি যেন আপন সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান ছিল। শিশুটি তখন বলে ওঠে, হে আমার মা! আপনি আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ুন! কেননা, পরকালের শাস্তির তুলনায় দুনিয়ার শাস্তি অতি সামান্য। বাঁদিটি তাই করল।””

প্রথম পাঠ
কোলে থাকা অবস্থায় কতজন শিশু কথা বলেছে, এ ব্যাপারে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী তাদের সংখ্যা হল তিনজন। ঈসা আলাইহিস সালাম, আবেদ জুরাইজের ঘটনায় বিবৃত রাখালের ছেলে, আরেক শিশু, যে তার মায়ের দুয়ার প্রতিবাদ করেছিল। তার ঘটনা সামনে উল্লেখ করা হবে। [২] ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্যদাতা শিশুটিও এই তালিকায় রয়েছে। এটি ইসরাইলি বর্ণনা হলেও আমাদের শরিয়ত একে প্রত্যাখ্যান করেনি। আমাদের সাইয়েদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা বনি ইসরাইলের সূত্রে রেওয়ায়াত করতে পারো এতে কোনো সমস্যা নেই। [৩] এ ছাড়াও আসহাবুল উখদুদ বা গর্তবাসীদের শিশুও কোলে থাকাবস্থায় কথা বলেছে। সহিহ মুসলিমে তার আলোচনা এসেছে। সব মেলালে এ-জাতীয় শিশুদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়জনে।

দ্বিতীয় পাঠ
মৃত্যুর আশঙ্কা হলে ঈমান গোপন করা সমস্যাকর কিছু নয়। ফিরআউনের বংশেরই এক মুমিন ঈমান গোপন করেছিলেন। কুরআনে তার প্রশংসা করে বলা হয়েছে- ‘ফিরআউন-গোত্রের এক মুমিন ব্যক্তি, যে তার ঈমান গোপন রাখত, সে বলল, তোমরা কি একজনকে এ-জন্যে হত্যা করবেন যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ?’ [১] ওই অবস্থায় তার জন্য ঈমান গোপন করাটা কয়েক দিক থেকে উপকারী ছিল।

প্রথমত: এর মাধ্যমে তিনি নিজের জীবনকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন। কেননা ফিরআউন ঈমানের প্রশ্নে নিজের স্ত্রীকেও ছাড় দেয়নি। স্ত্রীকেও সে হত্যা করেছে। মুসা আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান আনলে সে কোনো নিকটাত্মীয়ের প্রতিও দয়া করত না। দ্বিতীয়ত: তিনি ফিরআউনের প্রাসাদের কাছে অবস্থান করতেন। প্রাসাদের সকল অবস্থা এবং চক্রান্ত সম্পর্কে জানতেন। আর এটা তো স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, তরবারির মাধ্যমে শত্রুর মুকাবিলা করার চেয়ে শত্রুর প্রাসাদে গুপ্তচর হয়ে থাকা অনেকগুণে উত্তম। তৃতীয়ত: ঈমান প্রকাশ করার মধ্যে শুধু ব্যক্তিগত কল্যাণ ছিল। অন্য কোনো কল্যাণ এতে ছিল না। কেননা তাকে হত্যা করা হলে তিনি আসিয়া এবং চুল আঁচড়ানো-বাঁদির মতো শহিদের মর্যাদা পেতেন। আর ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সফলতা ও মুক্তির ওপর দাওয়াতের সফলতা প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তবে আমাদের জন্য এটা বলা সম্ভব নয় যে, আসিয়া এবং চুল আঁচড়ানো-বাঁদি তাদের ঈমান প্রকাশের ক্ষেত্রে ভালোভাবে পরিণামের কথা চিন্তা করেননি। শহিদকুলের সরদার হলেন হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তেমনিভাবে ঐ ব্যক্তিও এ মর্যাদা লাভ করে যে কোনো জালেম শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার বিধিনিষেধের কথা বলে এবং জালেম শাসক তাকে হত্যা করে ফেলে।

চুল আঁচড়ানো-বাঁদি দৃঢ়তা, সাহসিকতা এবং ঈমানি শক্তির সওয়াব পাবে। বর্তমান যুগ অনুযায়ী সে কেবল একজন সেবিকা। আর ফিরআউন মিশরের হিসেবে একজন বাদশাহ, শাসক, নিজ দাবিতে ইলাহ ও মাবুদ। ফিরআউনের মতো ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক এমন বিশাল ব্যক্তিত্বের সামনে একজন সেবিকার এই চ্যালেঞ্জ! কসম আল্লাহর, এই সাহসিকতার ওপর আর কোনো সাহসিকতা হয় না!

তৃতীয় পাঠ
ঈমান যখন কারও অন্তরের গভীরে স্থান লাভ করে, তখন এটা তাকে রক্তমাংসে গড়া সামান্য একজন মানুষ থেকে এক পাহাড় বানিয়ে দেয়। যা কখনো নড়ে না। কখনো নরম হয় না। যুগে যুগে এটি ছিল মুমিনদের চরিত্র। কোমল এক নারী আসিয়া। তিনি শূলীতে চড়েছেন! দুর্বল নারী, যিনি চুল আঁচড়াতেন ফেরাউন-কন্যার, তিনি উত্তপ্ত তেলের সামনেও কম্পিত হননি! মক্কার উত্তপ্ত বালু বিলালকে নমনীয় করতে পারেনি! উমাইয়া ইবনে খালাফ বুকে শক্ত পাথর রেখেও তাকে টলাতে পারেনি! এইসব শাস্তির মুখেও তার জবান থেকে আহাদ... আহাদ... শব্দ বন্ধ হয়নি! জাদুকররা মুসা আলাইহিস সালাম-এর অনুসরণ করেছিলেন। এ কারণে আড়াআড়িভাবে তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে শূলীতে চড়ানো হয়েছে। তারা সেদিন ফিরআউনকে বলেছিলেন- ‘তুমি যা ইচ্ছে করতে পার। যা করবার এই পার্থিব জীবনেই তো তুমি করবে।[১]’ হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘তোমাদের আগের লোকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও ছিল, যাকে ধরে নিয়ে তার জন্য জমিনে গর্ত করা হতো। তারপর করাত এনে মাথায় আঘাত করে দুটুকরা করে ফেলা হতো। লোহার শলাকা দিয়ে তার গোশত ও হাড্ডি খসানো হতো। তা সত্ত্বেও তাকে তার দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত না।”[২]’ আপনি জান্নাতের পথে কোনো বিপদাপদের সম্মুখীন না হলে একে আল্লাহ তাআলার একান্ত অনুগ্রহ মনে করুন। তিনি জানেন, আপনি বিপদে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না, তাই তিনি তা আপনার থেকে দূর করে দিয়েছেন। আর যখন তিনি পরীক্ষা করবেন তখন আপনাকে নরম হলে চলবে না। পূর্ববর্তীদের মাধ্যমে সমবেদনা লাভ করতে হবে। প্রত্যেক অবাধ্যের মুখের উপর যেন আপনি সে কথাই বলে দিতে পারেন জাদুকররা যা ফিরআউনকে বলে দিয়েছিলেন- ‘যা করবার এই পার্থিব জীবনেই তো তুমি করবে।[৩]’

চতুর্থ পাঠ
সাদাকাহকারীর কাছেও ধন-সম্পদ পছন্দনীয় বস্তু। যে পর্দা পালন করে, ফ্যাশন-স্টাইল তার কাছে অপছন্দনীয় নয়। যে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় মৃত্যুর ঘাটে উপস্থিত হয় সেও জীবনকে ভালোবাসে। ফিরআউনের বাঁদি, যার চোখের সামনেই তার সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে, তার মাতৃত্ববোধ কম ছিল না। কিন্তু তারা জানেন আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা উত্তম এবং স্থায়ী। এই বাঁদির প্রতি লক্ষ করুন, তিনি মৃত্যু থেকে মাত্র কয়েক মুহূর্ত দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন, তার যাবতীয় চিন্তা-চেতনা সন্তানকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে, সেই মুহূর্তে তিনি ফিরআউনেকে বলছেন, যাতে তার এবং সন্তানদের হাড্ডিগুলো একসঙ্গে দাফন করা হয়। যদি তার মধ্যে মায়ের মমতাবোধ না থাকত তাহলে তিনি এমন অত্যাচারীর কাছে এই আবেদন করতেন না।

পঞ্চম পাঠ
অত্যাচারীরা অত্যাচারীই থাকে। যুগে যুগে শুধু তাদের নাম আর পরিচয়ে পরিবর্তন ঘটে। বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা একই থাকে। ফিরআউন মুমিনদেরকে হত্যা করেছে। তাদেরকে শূলীতে চড়িয়েছে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায় তাকে আগুনে নিক্ষেপ করেছে। উমাইয়া এবং আবু জেহেল উভয়েই মুমিনদেরকে শাস্তি দিয়েছে। একজনের মাল লুট করা হয়েছে তো অপরজনকে বন্দী করা হয়েছে। তৃতীয় একজনের সম্মান হরণ করা হয়েছে তো চতুর্থ জনের বাড়িঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আবার পঞ্চম কারও সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। এভাবেই অবাধ্যরা নিজের অজান্তেই একে অপরের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। প্রতি যুগে তারা একই স্থানে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। অত্যাচারী ও অবাধ্যদের এই ধারাবাহিকতা যেন শেষ হবার নয়।

টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ২৮২১। সনদ হাসান।
[২] 'দুগ্ধপোষ্য সন্তান' নামে এই বইয়েরই ১২৭ পৃষ্ঠায় রয়েছে সেই ঘটনা।
[৩] রাসুল সা. বলেছেন, "আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা করত। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল।” সহিহ বুখারি, ৩৪৬১।
[১] সুরা মুমিন, ৪০: ২৮
[১] সুরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম: ৭২
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৯৪৩
[৩] সুরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম: ৭২

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 কুষ্ঠ, টাক ও অন্ধ ব্যক্তি

📄 কুষ্ঠ, টাক ও অন্ধ ব্যক্তি


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'বনি ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই, তিনি তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেত রোগীটির কাছে এলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কাছে কোন জিনিস অধিক প্রিয়?” সে জবাব দিল, "সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা, মানুষ আমাকে ঘৃণা করে।” ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দান করা হলো। অতঃপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কোন ধরনের সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে জবাব দিল, "উট।” অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হলো। তখন ফেরেশতা বললেন, "এতে তোমার জন্য বরকত হোক।”

এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গেলেন এবং বললেন, “তোমার কাছে কোন জিনিস অধিক পছন্দনীয়?” সে বলল, "সুন্দর চুল এবং আমার থেকে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে।” ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হলো। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, "কোন সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে জবাব দিল, "গরু।” অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করলেন। এবং ফেরেশতা দুআ করলেন, "এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক।”

অতঃপর ফেরেশতা অন্ধের কাছে আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন জিনিস তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে বলল, “আল্লাহ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি।” তখন ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন, তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে বলল, “ছাগল।” অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দান করা হলো। অতঃপর পশুগুলো বাচ্চা প্রসব করল। উট ও গাভী বাচ্চা দিল। অল্পদিনের ব্যবধানে উটের মালিকের একটি মাঠ উটে ভরে গেল। গাভীর মালিকের একটি মাঠ গরুতে ভরে গেল এবং ছাগলের মালিকের একটি মাঠ ছাগলে ভরে গেল।

কিছুদিন পর ফেরেশতা তার পূর্বের সেই রূপে (দরিদ্রবেশে) কুষ্ঠ রোগীর কাছে এলেন এবং বললেন, “আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। সফরে আমার সমস্ত সম্পদ শেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাড়ি পৌঁছার কোনো উপায় নেই। তাই আমি তোমার কাছে ঐ আল্লাহর দোহাই দিয়ে একটি উট চাচ্ছি যিনি তোমাকে সুন্দর গায়ের রং, সুন্দর চামড়া এবং অনেক সম্পদ দান করেছেন, যেন আমি আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারি।” সে উত্তর দিল, “আমার ওপর মানুষের অনেক হক রয়েছে (তাই তোমাকে উট দেওয়া সম্ভব নয়)।” ফেরেশতা বললেন, “আমি মনে হয় তোমাকে চিনি। তুমি কি সেই কুষ্ঠ রোগী ছিলে না যাকে মানুষ ঘৃণা করত? তুমি কি নিঃস্ব ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ তোমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছেন?” সে বলল, “এ সম্পদ তো আমি বংশপরম্পরায় লাভ করেছি।” ফেরেশতা বললেন, “তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও তবে আল্লাহ যেন তোমাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।”

এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে তার সেই পূর্বের আকৃতিতে (টাকপড়া দরিদ্র ব্যক্তি হিসেবে) গেলেন এবং তাকেও অনুরূপ বললেন। সে-ও শ্বেতরোগী লোকটির মতো জবাব দিল। তখন ফেরেশতা বললেন, “তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও তবে আল্লাহ যেন তোমাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।” অতঃপর ফেরেশতা অন্ধ লোকটির কাছে তার সেই পূর্বের আকৃতিতে (অন্ধ ও নিঃস্ব লোক হিসেবে) এলেন এবং বললেন, “আমি এক মুসাফির ও নিঃস্ব ব্যক্তি। সফরে আমার সমস্ত সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাড়ি পৌঁছার কোনো উপায় নেই। আজ আমি তোমার কাছে ঐ আল্লাহর দোহাই দিয়ে একটি ছাগল প্রার্থনা করছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন আর আমি এ ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারব।"

সে বলল, "প্রকৃতপক্ষেই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকির ছিলাম। আল্লাহ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম, আল্লাহর জন্য তুমি যা কিছু নেবে, তার জন্যে আজ আমি তোমার কাছে কোনো প্রশংসাই দাবি করব না।" তখন ফেরেশতা বললেন, "তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিনজনের পরীক্ষা নেয়া হলো মাত্র। আল্লাহ তোমার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার অপর দুই সাথির ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন।” [১]

প্রথম পাঠ
শুধু অকল্যাণের মাধ্যমে পরীক্ষা হয় না বরং কল্যাণ দিয়েও পরীক্ষা হয়। অকল্যাণমূলক পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ হলো সফলতা। কল্যাণমূলক পরীক্ষায় শুকরিয়া তথা কৃতজ্ঞতা হলো সফলতা। এই তো সুলাইমান আলাইহিস সালাম। তিনি রানি বিলকিস আসার সংবাদ পেয়ে মানুষ ও জিন উভয় শ্রেণির সভাসদদের একত্রিত করলেন। তাদেরকে ইয়ামান থেকে বিলকিসের সিংহাসন নিয়ে আসতে বললেন। শক্তিশালী জিন তা করতে সক্ষম হয়নি। একজন মুমিন ব্যক্তি এক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ইসমে আজম জানতেন। যার মাধ্যমে তার কাছে দুআ করা হলে তিনি সাড়া দিয়ে থাকেন। চোখের পলকেই সিংহাসন তার সামনে উপস্থিত হয়ে যায়। সুলাইমান আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন, তাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাই তিনি অহংকার করেননি। শুধু বলেছেন- ‘এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, নাকি অকৃতজ্ঞতা। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিজের উপকারের জন্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত কৃপাশীল।’ [১]

প্রাচুর্যের পরীক্ষায় সফলতা হলো নিজের জন্য প্রয়োজন-মাফিক খরচ করা আর অন্যান্য মানুষের জন্য অবারিত দানের দরজা খোলা রাখা। এ পরীক্ষায় ব্যর্থতা হলো কার্পণ্য করা। ফকিরের মতো জীবনযাপন করা আর ধনীর মতো হিসাব করা। শক্তি পরীক্ষার সফলতা হলো ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। দুর্বলকে সাহায্য করা। অকৃতকার্যতা হলো সীমালংঘন করা। অন্যের ওপর জুলুম করা। মিথ্যা অপবাদ দেওয়া। আপনার শক্তি যদি আপনাকে ধোঁকা দেয়, আপনি যদি মানুষের ওপর জুলুম করেন তাহলে মনে রাখবেন, আপনার ওপর শক্তিমান আল্লাহ রয়েছেন।

বিয়ে বিলম্বিত হওয়াটাও একটা পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা দেখতে চান যে, আপনি কী করেন। আপনি কি আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করেন নাকি অশ্লীল কাজে জড়িয়ে পড়েন। দুআ কবুলে দেরি হওয়াটাও পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা দেখতে চান, এ-ক্ষেত্রে আপনি কী করেন। ধৈর্য ধারণ করেন, ইস্তেগফার পড়েন, নাকি রাগান্বিত হয়ে দাজ্জাল (তাগুতের) কাছে ধরনা দেন। স্মরণ করুন, যখন যাকারিয়া আলাইহিস সালাম-এর সন্তান হচ্ছিল না, তিনি সিজদায় লুটিয়ে দুআ করেন। মেহরাবে থাকা অবস্থায় সন্তানের সুসংবাদ আসে। আমরা তো এমন জাতি যারা সিজদায় পড়ে প্রার্থনা করে আর মেহরাবে তাদের সুসংবাদ শোনানো হয়।

দ্বিতীয় পাঠ
জিহ্বা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করতে হবে। একটি অপরটির স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আপনার জবান থেকে প্রশংসা শুনতে চান। আল্লাহ তাআলা বান্দার জবানে নিজের প্রশংসাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। দেখতে চান, তার নেয়ামত পেয়ে আপনি কী করেন? শুধু ধন-সম্পদের ক্ষেত্রেই কৃপণতা হয় না। যদিও ধন-সম্পদই কৃপণতার মূল। আপনি জানেন, কোনো একটি পরামর্শ কারও উপকার করতে পারে, তাহলে তাকে সেটা না বলা কৃপণতা। কোনো বিষয়ে সাক্ষ্য না দেওয়া হলে হয়তো কারও হক ছিনিয়ে নেওয়া হবে, তা জানা সত্ত্বেও সাক্ষ্য না দেওয়া কৃপণতা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ মিটিয়ে দিতে পারেন কিন্তু সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা না মেটানো কৃপণতা। কোনো বৃদ্ধের ভারী বোঝা বহন না করা কৃপণতা। পথহারা মুসাফিরকে গাড়িতে আরোহণ না করানো কৃপণতা। আপনার কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম স্মরণ করা হলো কিন্তু আপনি তার ওপর দুরুদ পাঠ করলেন না, এটাও কৃপণতা।

বদান্যতা সর্বক্ষেত্রেই উত্তম গুণ। চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও সহযোগিতা-সর্বক্ষেত্রে... ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে বদান্যতা সর্বোত্তম। যদিও অন্যগুলোর মূল্যও কম নয়। আলোচ্য ঘটনায় কৃপণের পরিণাম দেখুন। এই কুষ্ঠরোগীর কাছে উপত্যকা-ভর্তি উট ছিল। কিন্তু যখন তাকে বলা হলো, আল্লাহর পর আপনাকে ছাড়া আমার আর কোনো সাহায্যকারী নেই, তখন সে মাত্র একটি উট প্রদান করতেই কৃপণতা করেছে। তাই আল্লাহ তার সকল উট নিয়ে নিয়েছেন। টাকওয়ালা লোকটির প্রতি লক্ষ করে দেখুন। তার পরিণাম কী হলো! উপত্যাকা-ভর্তি গরু থাকা সত্ত্বেও সে একটি মাত্র গরু দিতে কৃপণতা করেছে, আল্লাহ তার সকল গরু নিয়ে গেছেন। কিন্তু যে নিজের পূর্বের অবস্থা স্মরণ করে ফেরেশতাকে দিতে চেয়েছে, বলা হয়েছে আল্লাহ তোমার ধন-সম্পদে বারাকাহ দান করুন! একটি ঘটনাই আপনাকে চিরদিনের জন্য উঁচুতে উঠিয়ে দিতে পারে। আবার একটি ঘটনাই আপনাকে চিরকালের জন্য নীচে নামিয়ে দিতে পারে। জীবন তো বহু ঘটনার সমষ্টি মাত্র। তাই ব্যর্থতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

তৃতীয় পাঠ
ধন-সম্পদ আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ভালোবাসার দলিল নয়। এ ব্যাপারে সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা সুলাইমান আলাইহিস সালাম ও নমরুদ উভয়কে গোটা দুনিয়া দিয়েছিলেন। যদি ধন-সম্পদ মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড হতো তাহলে একজন নবী এবং এক অবাধ্যকে সমান সম্পদ দেওয়া হতো না। রোমের রাজা-বাদশাহরা রেশমের উপর ঘুমাত। স্বর্ণের থালা-বাসনে পানাহার করত। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চুলায় কয়েকদিন পর্যন্ত আগুন জ্বলত না। খন্দকের দিন তিনি পেটে পাথর বেঁধেছিলেন। ছোটকালে ধনাঢ্য কুরাইশদের ছাগল চড়িয়েছেন। দরিদ্র অবস্থায় জীবন যাপন করেছেন। আর দরিদ্র অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সময় ঋণের কারণে তার বর্ম এক ইহুদির কাছে বন্ধক হিসেবে ছিল। অথচ আল্লাহর তাআলার কাছে তিনি ছিলেন গোটা বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি।

অতএব কোনো নেয়ামত প্রাপ্ত হলে শুকরিয়া আদায় করুন। নেয়ামত না পেলে ধৈর্য ধারণ করুন। আল্লাহ যদি আপনাকে নেয়ামত দিয়ে থাকেন তাহলে তিনি সেই নেয়ামতই দিয়েছেন যা অন্যের জন্য নয়; বরং কেবল আপনার জন্য। আর তিনি কোনো নেয়ামত না দিয়ে থাকলে তাই দেননি যা আসলেই আপনার নয়; বরং তা অন্যের জন্য। মানুষের সম্পদের দিকে তাকাবেন না। কেননা আপনি জানেন না যে, তাকে আসলে সম্পদ দেওয়া হয়েছে নাকি বড় কিছু থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যুগে যুগে কাফেরদের হাতে ধন-সম্পদ ছিল। মুমিনদের চেয়ে তাদের ধন-সম্পদ বেশি ছিল। ধনাঢ্যতা প্রকৃতপক্ষে নিন্দনীয় নয়। হালাল মাল যদি মুমিন বান্দার হাতে থাকে তাহলে তা কতই-না উত্তম! কিন্তু আপনি এই ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকুন যে আল্লাহ আপনাকে অপছন্দ করেন বলে আপনার রিজিক সংকীর্ণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে শাস্তি দিতে চান বলে আপনাকে অসুস্থ করেছেন। মনে রাখবেন, আল্লাহ তাআলা যা দেন তা হেকমতের ভিত্তিতেই দেন, আর যা থেকে বঞ্চিত করেন তাও হেকমতের ভিত্তিতেই করেন। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারব না যতক্ষণ না এই বিশ্বাস করতে পারব যে, আল্লাহ তাআলার না-দেওয়াটাও এক ধরনের দান।

চতুর্থ পাঠ
প্রকৃত চিকিৎসক তো আকাশে। বৃদ্ধা বন্ধ্যা নারীকে (ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী) আল্লাহ তাআলা মুহূর্তের মধ্যেই নবী (ইসহাক আলাইহিস সালাম)-প্রসবের যোগ্যতা দিয়ে দেন। বহু বছর তিনি (আইয়ুব আলাইহিস সালাম) রোগাক্রান্ত ছিলেন। রব তাকে বললেন— ‘তুমি পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করো। এটি তো গোসল করার এবং পানি পান করার ঠান্ডা ঝরনা। [১]’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি পূর্বের চেয়েও সুস্থ হয়ে ওঠেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার রবকে ডাক দিয়েছেন— ‘হে আমার রব! আমাকে একা রাখবেন না।'[২] তখন তাকে ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর সুসংবাদ দেয়া হয়।

কুষ্ঠ রোগী, দুনিয়ার সকল ডাক্তার মিলেও যাকে সুস্থ করতে পারেনি, আল্লাহ তাআলা শুধু বলেছেন, তুমি সুস্থ হয়ে যাও। সঙ্গে সঙ্গে সে সুস্থ হয়ে গেছে। এভাবে টাক ব্যক্তির চুল তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন, অন্ধ ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবু চিকিৎসার জন্য ডাক্তারদের কাছে যেতে হবে। কেননা আমরা এমন জাতি যাদেরকে চিকিৎসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোগ দূর করার জন্য ডাক্তারদের কাছে যাওয়াটা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। কেননা তা তো তাকদির অনুযায়ী হবে। যদি আল্লাহ চান তাহলে মানুষের হাতে মানুষকে সুস্থ করে তুলবেন। আর যদি তিনি না চান তাহলে দুনিয়ার সকল ডাক্তার মিলেও কিছু করতে পারবে না। কিন্তু তারপরও আমাদেরকে উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতে হবে। তাই চলুন, আমরা প্রকৃত ডাক্তারকে স্মরণ করি। বিশ্ব জগতের সকল কিছুর জন্য তিনি যথেষ্ট। ঔষধ সেবন করতে হবে, কেননা এটা সুস্থতা লাভের মাধ্যম। তবে এসবের পূর্বে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা পড়ুন- ‘হে আমাদের রব, আপনি রোগব্যাধি দূর করে দিন। আপনি তাকে সুস্থ করুন। আপনিই তো কেবল সুস্থ করতে পারেন। আপনি এমন সুস্থ করুন যারপর কোনো রোগ ব্যাধি হবে না’[১]।

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৬৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৯৬৪। (ঈষৎ পরিমার্জিত)।
[১] সুরা নমল, আয়াত-ক্রম: ৪০
[১] সুরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ৪২
[২] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৯
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২১৯১

ফন্ট সাইজ
15px
17px