📄 মেঘখণ্ড
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'একদিন এক লোক কোনো এক মরুপ্রান্তরে সফর করছিলেন। এমন সময় অকস্মাৎ মেঘের মধ্যে একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন যে, অমুকের বাগানে পানি দাও। সঙ্গে সঙ্গে ঐ মেঘখণ্ডটি একদিকে সরে যেতে লাগল। এরপর এক প্রস্তরময় ভূমিতে বৃষ্টি বর্ষিত হলো। ঐ স্থানের নালাসমূহের একটি নালা ঐ পানিতে সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ হয়ে গেল। তখন সে লোক পানির অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। চলার পথে এক লোককে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পেলেন, যিনি কোদাল দিয়ে বাগানের সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এ দেখে তিনি তাকে বললেন, “হে আল্লাহর বান্দা, আপনার নাম কী?” তিনি বললেন, "আমার নাম অমুক” (আগন্তুক এই নামটিই মেঘখণ্ডের মধ্যে শুনতে পেয়েছিলেন)। বাগানের মালিক এবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর বান্দা! আপনি আমার নাম জানতে চাইলেন কেন?” উত্তরে তিনি বললেন, "এ পানি যে মেঘের, এর মধ্যে আমি এ আওয়াজ শুনতে পেয়েছি, আপনার নাম নিয়ে বলছে যে, অমুকের বাগানে পানি দাও।” এরপর তিনি বললেন, “আপনি এ বাগানের ব্যাপারে কী করেন?” মালিক বললেন, “যেহেতু আপনি জিজ্ঞেস করছেন, তাই বলছি, প্রথমে আমি এ বাগানের উৎপন্ন ফসলের হিসাব করি। অতঃপর এর এক তৃতীয়াংশ সাদাকাহ করি, এক তৃতীয়াংশ আমি ও আমার পরিবার-পরিজনের জন্য রাখি এবং এক তৃতীয়াংশ বাগানের উন্নয়নের কাজে খরচ করি।”” [১]
প্রথম পাঠ
যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার বিধিনিষেধ যথাযথভাবে পালন করে আল্লাহ তাআলাও তার প্রতি লক্ষ রাখেন। যে ব্যক্তি তার হাতে থাকা উপায়-উপকরণকে আল্লাহর কাজে লাগায় আল্লাহ তাআলাও নিজের মালিকানাধীন জিনিসকে তার কাজে লাগিয়ে দেন। বিশ্বজগতের সবকিছুই আল্লাহ তাআলার হাতে। তাই তিনি যেমন চান আপনি তেমন হয়ে যান। তাহলে আপনি যেমন চান আল্লাহ আপনার জন্য তেমন হয়ে যাবেন।
সবসময় বিশ্বাস রাখুন যে, দুনিয়ার নিয়ম-কানুনগুলো মানুষের ওপর চলে, আল্লাহর ওপর নয়। তিনি একজন নেককার বান্দার সুবিধার্থে গোটা বিশ্বজগত পরিচালনার জন্য প্রণীত নীতিমালায় ব্যতিক্রম করেছেন। নবুওয়াতের কারণে আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে যা দিয়ে থাকেন কখনো কখনো সততার কারণে নেককার বান্দাদেরকেও তা দিয়ে থাকেন। আপনার কি জানা নেই যে, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর জন্য জ্বলন্ত আগুন ঠান্ডা ও নিরাপদ হয়ে গিয়েছিল। ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর জন্য হিংস্র মাছ আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর গলায় ধারালো ছুরি অকেজো হয়ে গিয়েছিল। একজন মাত্র ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তাআলা এই মেঘখণ্ড পাঠিয়েছিলেন। সেদিন মানুষের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করার ইচ্ছা আল্লাহ তাআলার ছিল না। কিন্তু তিনি জানতেন যে, তার এক নেককার বান্দা রয়েছে যে অন্যদের কারণে বঞ্চিত হতে পারে না। তাই তার জন্য বিশ্বজগতের রীতি পরিবর্তন করে দিয়েছেন। মেঘ তো সকলকে বৃষ্টি বর্ষণ করে কিন্তু এই মেঘখণ্ডটি কেবল একজন ব্যক্তির জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করেছিল। সে তার দ্বীনকে বিশুদ্ধ করেছে তাই আল্লাহ তার দুনিয়াকে ঠিক করে দিয়েছেন।
দ্বিতীয় পাঠ
পৃথিবীতে প্রসিদ্ধি লাভ করা প্রকৃত প্রসিদ্ধি নয়, বরং আসমানে (আল্লাহ তাআলার দরবারে) পরিচিতি লাভ করাটাই প্রকৃত প্রসিদ্ধি লাভ। এই লোক তো সামান্য একজন কৃষক, দুনিয়ার মানুষ যাকে চেনে না, কিন্তু তিনি নেতৃস্থানীয় ফেরেশতাদের কাছে পরিচিত ছিলেন; যে কারণে এক ফেরেশতা অপর ফেরেশতাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, অমুকের বাগানে বৃষ্টি বর্ষণ করো। কোনো তারকা-শিল্পী আমাদের নাম ধরে ডাকলে আমরা আনন্দে যেন উড়তে থাকি। কোনো মন্ত্রী আমার নাম ধরে ডাকলে আমার পা যেন আর মাটিতেই পড়তে চায় না। রাষ্ট্রপতি আমাদের নাম ধরে ডাকলে সেদিন খুশির আতিশয্যে আমরা চোখে কাউকে দেখতে পাই না। ধরাকে সরা জ্ঞান করে বসি। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে ডাকছে, তাতেই এই অবস্থা! তাহলে সকল রাজাধিরাজ আল্লাহ তাআলা যখন নির্দেশ পাঠান যে, আমার অমুক বান্দার বাগানে বৃষ্টি বর্ষণ করো, তখন সে ব্যক্তির অবস্থা কেমন হতে পারে!
তৃতীয় পাঠ
মানুষ বলে থাকে কাজকর্মও ইবাদত। হ্যাঁ, এটা সঠিক কথা। কিন্তু যে কাজকর্মের কারণে আল্লাহর হক ছুটে যায় তা শয়তানের ইবাদত। কিছু মানুষ ফজর-নামাজের জন্য অ্যালার্ম দিয়ে রাখে আবার কিছু মানুষ অফিস-টাইমের জন্য অ্যালার্ম দিয়ে রাখে। দুই ব্যক্তির মধ্যে কত তফাত! একজন মনে করে, তাকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আরেকজন মনে করে, তাকে আয়-উপার্জন ও রুজি-রোজগারের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবাদতের জন্য যেমন সময় রয়েছে তেমনি কাজকর্মের জন্যও সময় রয়েছে। যে ব্যক্তি কাজকর্মের কারণে ইবাদতকে পিছিয়ে রাখে সে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে শিষ্টাচার-বহির্ভূত কাজ করে থাকে। এর মাধ্যমে সে বিশ্বাস করে যে, সে নিজেই নিজের রিজিকের ব্যবস্থা করে। অথচ কর্মের মাধ্যমে আমরা যে রিজিক তালাশ করি সেটা তো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে। তাহলে আমরা আল্লাহ তাআলার অপছন্দনীয় কাজ করে তার থেকে কীভাবে আমাদের পছন্দনীয় জিনিস আশা করতে পারি! তিনি বলেন-
'শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অধিক অনুগ্রহের ওয়াদা করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সুবিজ্ঞ।' [১]
মালিকের কাজ করার পূর্বে যদি আমরা আল্লাহ তাআলার কাজ করি তাহলে আমাদের কাজকর্ম ইবাদত হবে। তবে ইবাদতের অজুহাতে যে অন্যের উপার্জনের ওপর ভরসা করে বসে থাকে, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম নয় যে কাজকর্মের কারণে নামাজ ছেড়ে দেয়।
আমাদের সাইয়িদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।' [২] আরেক হাদিসে তিনি বলেন- 'যার হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার কসম! তোমাদের মধ্যে কারও রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে পিঠে করে বয়ে আনা, কোনো লোকের কাছে এসে চাওয়া অপেক্ষা অনেক ভালো, চাই সে দিক বা না দিক।'[১]
যে ব্যক্তি মসজিদে অবস্থান করে আর ভাই তার খরচ চালায় তার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তার ভাই, (যে খরচ চালায়) তার চেয়ে উত্তম। এই তুলনার মধ্যে জীবন-সফলতার রহস্য নিহিত। বিষয়টি এমন নয় যে আপনি বলবেন, আমি ইবাদত করব নাকি কাজ করব? ঈসা আলাইহিস সালাম মহাসম্মানিত নবী ও রাসুল হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তালার জমিনে একজন কাঠমিস্ত্রি হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। শুআইব আলাইহিস সালাম ছাগল চড়াতেন। তিনি বার্ধক্যে উপনীত হবার পর তার কন্যাগণ সেগুলো চড়িয়েছেন। মুসা আলাইহিস সালাম তার এক মেয়েকে বিয়ে করার পর ছাগল চরানোই ছিল তার বিয়ের মোহর। এই ছিল নবী ও রাসুলগণের চিত্র। তাহলে তাদের তুলনায় সাধারণ লোকজনের অবস্থা কী হতে পারে!
চতুর্থ পাঠ
মানুষ তার কর্ম-অনুপাতেই প্রতিদান পেয়ে থাকে। যে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য জমিতে কাজ করে আল্লাহ তাআলা অন্যদের শাস্তি প্রদানের ফায়সালা করলেও তার জমি রক্ষা করে থাকেন। তাই আপনি নিশ্চিত থাকুন, আল্লাহর জন্য আপনি যে সম্পদ ব্যয় করছেন আল্লাহ অবশ্যই তা বৃদ্ধি করবেন। সাদাকাহর কারণে মালে কখনো ঘাটতি দেখা দেয় না। রাত্রি-জাগরণের জন্য আপনি যে সময়টুকু ব্যয় করেছেন এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা আপনার মধ্যে সেই উদ্দীপনা তৈরি করে দেবেন যা অন্যরা দীর্ঘ ঘুমের মাধ্যমে অর্জন করে থাকে। বরকত বলেও যে একটা কিছু আছে আমরা সে দিকে ভ্রুক্ষেপই করি না। পৃথিবীর সকল জিনিস একদিনেই হয়ে যায়নি। আমরা দেখি অনেকেই হারাম উপায়ে সম্পদ জমা করে, তারপরও তারা অভাব-অনটনের অভিযোগ করে থাকে। আবার এমন ব্যক্তি সম্পর্কেও আমরা জানি যে, তারা হালাল উপার্জন করে। আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই যে, এই সামান্য উপার্জনেও তার দিব্যি কেটে যাচ্ছে! কিভাবে সম্ভব হয়? উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রিজিক চাই না, কেননা তা তো ইতিমধ্যে বন্টিত হয়ে গেছে; বরং আমি তাতে বরকত চাই।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৯৮৪
[১] সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৬৮
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২০৭২
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪৭০
📄 মুগিস ও বারিরা
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
'বারিরার স্বামী ছিলেন একজন ক্রীতদাস। তাকে 'মুগিস' নামে ডাকা হতো। আমি যেন এখনও তাকে দেখছি-তিনি বারিরার পিছে কেঁদে কেঁদে ঘুরছেন, আর তার দাড়ি বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে) বললেন, “আব্বাস! বারিরার প্রতি মুগিসের ভালোবাসা এবং মুগিসের প্রতি বারিরার অনাসক্তি দেখে আপনি কি আশ্চর্যান্বিত হন না?” এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (বারিরাকে) বললেন, “তুমি যদি তার কাছে আবার ফিরে যেতে (তাহলে কতই-না ভালো হত)! তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আমাকে হুকুম দিচ্ছেন?” তিনি বললেন, “আমি কেবল সুপারিশ করছি।” বারিরা বললেন, “তাকে দিয়ে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”” [১]
বারিরা এক আনসারি সাহাবির বাঁদি ছিলেন। তার স্বামীর নাম ছিল মুগিস। বারিরা স্বাধীনতা লাভের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এজন্য তিনি মনিবের সঙ্গে কিতাবাত (টাকার বিনিময়ে স্বাধীনতা) চুক্তি করেন। আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কন্যা আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বাধীনতা লাভের জন্য তাকে আর্থিক সাহায্যের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বারিরা স্বাধীনতা লাভের পর স্বামীর ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেন। কারণ, বাঁদি স্বাধীন হয়ে গেলে আর স্বামী গোলাম রয়ে গেলে শরিয়ত তাকে স্বামীর সঙ্গে থাকা বা না-থাকার ইচ্ছাধিকার প্রদান করে থাকে। বারিরা তার স্বামী মুগিসকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মুগিস বারিরাকে পাওয়ার জন্য কাঁদতে কাঁদতে মদিনার অলিগলিতে তার পিছুপিছু ঘুরতেন। কিন্তু মুগিসের প্রতি তার কোনো সমবেদনা বা দয়া জাগ্রত হতো না। মুগিস এভাবে বারিরাকে পাওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে ছুটে গেলেন দয়ালু নবীজির কাছে। বারিরার কাছে তার জন্য সুপারিশ করার আবেদন করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারিরাকে বলেন, “তুমি যদি তার সঙ্গে ঘর সংসার করতে! সে তো তোমার স্বামী! তোমার সন্তানের পিতা!” বারিরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন?” তিনি বলেন, “আমি কেবল সুপারিশ করছি।” বারিরা বললেন, “তাহলে তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”
প্রথম পাঠ
এক পক্ষ থেকে ভালোবাসা অধিকাংশ সময়ই লাঞ্চনা বয়ে আনে। তবে এটাও ঠিক যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের মধ্যে এমন এক অন্তর দিয়েছেন যা কোনো প্রিয় ব্যক্তিকে দেখা মাত্রই তার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর বিপরীতে আমরা যেন নিজের সম্মানজনক অবস্থান হারিয়ে না বসি তার জন্য তিনি আমাদেরকে ইচ্ছাশক্তিও প্রদান করেছেন। আপনি যাকে ভালোবাসেন তার কাছে আপনার হৃদয়ের অভিব্যক্তি পেশ করুন, কিন্তু ভালোবাসার জন্য তাকে চাপাচাপি করবেন না। একবার পরীক্ষা করুন, আরেকবার ভালবাসুন। তবে আপনার মধ্যে বিবেচনাশক্তি থাকতে হবে। আগের যুগের মানুষজন বলতেন, কখনো কখনো দুই-এক পৃষ্ঠা উল্টানো যথেষ্ট হয় না; বরং পুরো কিতাব পরিবর্তন করতে হয়! অর্থাৎ প্রয়োজনে নিজেকে আমূল পালটে ফেলতে হবে। অথবা ভালোবাসার ঠিকানা পালটে নিতে হবে।
দ্বিতীয় পাঠ
নারীরা কোনো বিক্রয়-পণ্য নয় যে, যে ব্যক্তি মোহর প্রদান করবে তার কাছেই তাকে হস্তান্তর করতে হবে। ন্যায়সঙ্গতভাবে অন্তর কারও প্রতি আকৃষ্ট থাকা সত্ত্বেও মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে বসতে বাধ্য করাটা জুলুম। দেহ-হত্যার চেয়ে অন্তরকে হত্যা করাটা অধিক কষ্টদায়ক এবং পাপের কারণ। আপনি প্রাচীন যুগের আরবদের কুসংস্কার পরিত্যাগ করুন। তারা মেয়েদেরকে মেয়েদের পছন্দসই পুরুষের কাছে বিয়ে দিত না। তাদের, বরং আরবের সকল সম্প্রদায়ের, বরং গোটা বিশ্বের মধ্যে যিনি সর্বোত্তম তার অনুসরণ করুন। তিনি বলেছেন- 'পরস্পর ভালোবাসাময় নারী-পুরুষের জন্য বিয়ে ব্যতীত অন্য কোনো পথ নেই।' তবে এই ভালোবাসা হতে হবে দ্বীনের জন্য। দ্বীনের সীমারেখা মেনে। দুনিয়ার মোহে কিংবা নাজায়েজ পদ্ধতির ভালোবাসায় কোনো প্রকার কল্যাণ নেই। এই মোহ অল্প সময়ে কেটে যায়। জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা আল্লাহ নারাজ হন।
তৃতীয় পাঠ
আপনি সত্যিকারের পুরুষ হয়ে উঠুন। সামাজিক রীতিনীতি এবং সংস্কৃতির অনুসরণ করেন বলে আপনি ওই কোমল হৃদয়কে ধোঁকা দেবেন না যে হৃদয় আপনাকে ভালোবাসে। প্রতিটি মানুষেরই হৃদয় রয়েছে। যদি আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত প্রিয়তমাকে বিয়ে করতে না পারেন, তাহলে অচিরেই আপনি হয়তো অপর কোনো ব্যক্তির প্রিয়তমাকে বিয়ে করবেন। আমাদের অধিকাংশ রীতিনীতি ও সংস্কৃতিগুলো একটি মূর্তি। এগুলোকে ভেঙে ফেলা আবশ্যক। শুধু ইসলামি শরিয়ত মেনে বিয়ে করুন। আপনার জীবন হবে অনাবিল আনন্দে ভরপুর।
চতুর্থ পাঠ
আপনি সুপারিশ করুন। হাড্ডির চেয়ে অন্তর জোড়ানোর প্রতি অধিক মনোযোগী হোন। কেননা তা ভেঙে যাওয়াটাও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। যদি আপনি দুটি মনের মধ্যে মিলন ঘটিয়ে দিতে পারেন তাহলে অমত করবেন না। যদি আপনি পারিবারিক কোনো ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দিতে পারেন তাহলে কালবিলম্ব করবেন না। কারও হাতে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা দ্বারা প্রকৃত মর্যাদা নির্ণিত হয় না। বরং সে মানুষের জন্য কতটুকু এগিয়ে এসেছে তা দেখেই আসল মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়। ডালপালার কারণে বৃক্ষকে মূল্যায়ন করা হয় না, বরং বৃক্ষের ফলের কারণে তাকে মূল্যায়ন করা হয়। পৃষ্ঠার সংখ্যা আর মান দেখে কিতাবের মূল্যায়ন হয় না বরং তাতে লিখিত বাক্যাবলিতেই তা নির্ধারণ হয়। তেমনিভাবে আমলের মাধ্যমে একদল মানুষ অন্যদলের ওপর মর্যাদা লাভ করে থাকে। ইতিহাসে যাঁরা স্থান করে নিয়েছেন তাদের প্রতি লক্ষ করুন, তাদের সকলেই পৃথিবীকে বিভিন্ন জিনিস দিয়েছেন। কেউ কোনো ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। কেউ গ্রন্থ রচনা করেছেন। কেউ যুদ্ধ বন্ধ করেছেন। কেউ রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছেন। সমস্ত মানুষই তো পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। তারা যে সুন্দর জিনিস রেখে যায় শুধু তাই স্থায়ী হয়। তাই কোনো কৃতিত্ব না রেখে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন না।
পঞ্চম পাঠ
কবুল না হওয়ার অজুহাতে সুপারিশ করা থেকে বিরত থাকা যাবে না। চেষ্টা করাটাই যথেষ্ট। যা বাস্তবায়ন হবে শুধু তার জন্যই নয়, বরং আমরা যা করব তারও প্রতিদান পাব। এটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। হাদিসে এসেছে-কেয়ামতের দিন এমনও নবী আসবেন যাঁদের সঙ্গে কোনো উম্মত থাকবে না। আপনার সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করা হলে এটাকে অপমান মনে করবেন না। আপনি যতই উচ্চাসনের অধিকারী হন না কেন, কখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি লক্ষ করুন, তিনি একজন নারীর কাছে সুপারিশ করছেন! যে কি না বাঁদি ছিল! তবুও সে নবীর সুপারিশ কবুল করেনি! তিনি কি এটাকে অপমান মনে করেছিলেন? সুপারিশ করার পর তা রক্ষা না করায় তিনি কি সেই নারীর প্রতিপক্ষ হয়ে গিয়েছিলেন? অহংকার করে সুপারিশের সওয়াব নষ্ট করবেন না।
ষষ্ঠ পাঠ
কল্যাণমূলক কোনো কাজকে হালকা মনে করবেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সবচেয়ে ইবাদতপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। বড় বড় দিনে রোজা রাখতেন। অন্ধকার রাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু তবুও তিনি সুপারিশ করা ছেড়ে দেননি। ব্যস্ততার সময় সংকীর্ণতার অজুহাত পেশ করবেন না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন। আপনি কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়েও বেশি ব্যস্ত মানুষ? ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি উম্মতের নবী ছিলেন। রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। তবুও নগণ্য, সাধারণ মানুষদের জন্য তার কাছে সময় ছিল। স্বামীর জন্য তিনি স্ত্রীর কাছে সুপারিশ করতেন। দাসের জন্য মনিবের কাছে সুপারিশ করতেন। অথচ আমাদের কাছে সাধারণ নগণ্য কেউ এলে আমরা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই!
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫২৮৩
📄 স্বর্ণের কলস
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'এক লোক অপর লোক হতে একখণ্ড জমি ক্রয় করেছিল। ক্রেতা খরিদকৃত জমিতে একটা স্বর্ণ-ভর্তি কলস পেল। ক্রেতা বিক্রেতাকে তা ফেরত নিতে অনুরোধ করে বলল, "আমি জমি ক্রয় করেছি, স্বর্ণ ক্রয় করিনি।” বিক্রেতা বলল, "আমি জমি এবং এতে যা কিছু আছে সবই বেচে দিয়েছি।” অতঃপর তারা উভয়েই অপর এক লোকের কাছে এর মীমাংসা চাইল। তিনি বললেন, "তোমাদের কি ছেলে-মেয়ে আছে?” একজন বলল, “আমার একটি ছেলে আছে।” অন্য লোকটি বলল, "আমার একটি মেয়ে আছে।” মীমাংসাকারী বললেন, "তোমার মেয়েকে তার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দাও আর প্রাপ্ত স্বর্ণের মধ্যে কিছু তাদের বিয়েতে ব্যয় কোরো এবং বাকি অংশ তাদেরকে দিয়ে দাও।" [১]
প্রথম পাঠ
এ ক্রেতা-বি্রেতা উভয়ই মুত্তাকি। পূর্ববর্তী মনীষীগণ বলেছেন, হারামে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কায় হালালের ১০ ভাগের ৯ ভাগ পরিত্যাগ করা হলো তাকওয়া। আমি মনে করি এটি অত্যন্ত কঠিন। এতে হয়তো কিছুটা বাড়াবাড়িও রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহর উক্তিটি সবচেয়ে সুন্দর। তিনি বলেছেন, 'পরকালে যা উপকার করবে না তা পরিত্যাগ করার নাম হলো যুহদ তথা দুনিয়া-বিমুখতা। আর পরকালে যা ক্ষতি করতে পারে তা পরিত্যাগ করা হলো তাকওয়া। তাই মুত্তাকি হবার জন্য অধিকাংশ হালাল পরিত্যাগ করা শর্ত নয়। আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য যা হালাল করেছেন কখনোই তা পরকালের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে না। কিন্তু কোনো কোনো বিষয় সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয় না বরং ঘোলাটে ও সন্দেহপূর্ণ থেকে যায়, এমনসব ক্ষেত্রে তাকওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
উল্লিখিত ঘটনায় জমিক্রেতা স্বর্ণের কলস নেওয়ার ক্ষেত্রে পরহেজগারি অবলম্বন করেছে। সে মনে করেছে, এটা তার সম্পদ নয়। বিক্রির সময় শুধু মাটি বিক্রি হয়েছে মাটির ভেতরের জিনিস নয়। আর বিক্রেতাও কলসটি গ্রহণের ক্ষেত্রে পরহেজগারির পন্থা অবলম্বন করেছে। কেননা সে মনে করেছে, জমিটি ভেতরের সবকিছুসহ বিক্রি করা হয়েছে। শুধু কাগুজে চুক্তি নয় বরং তাকওয়ার মাধ্যমে যদি লেনদেন হতো তাহলে কতই-না ভালো হতো! ফাঁকফোকরপূর্ণ নিয়ম-কানুন নয় বরং সবাই যদি সচ্চরিত্রের মাধ্যমে লেনদেন করত তাহলে কতই-না উত্তম হতো! আমাদেরকে বুঝতে হবে, বিচারের মাধ্যমে অন্যের জিনিস পেয়ে গেলেই তা হালাল হয়ে যায় না। আমাদের সাইয়েদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বলেছেন—
'আমি মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নই। তোমরা আমার কাছে ঝগড়া-বিবাদ নিয়ে আসো। হয়তো তোমাদের কেউ অন্যজনের চেয়ে প্রমাণ পেশের ব্যাপারে অধিক বাকপটু। আর আমি তো যেমন শুনি তার ভিত্তিতেই বিচার করে থাকি। কাজেই আমি যদি কারও জন্য তার অন্য ভাইয়ের হক সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত দিই, তাহলে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা, (তার বাকপটুতা ও ধূর্ততার কারণে) আমি তার জন্য যে অংশ নির্ধারণ করলাম তা তো কেবল এক টুকরা আগুন।'[১]
দ্বিতীয় পাঠ
এই ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়—ব্যক্তি-মালিকানা মানব-সভ্যতার অতি পুরনো এক বিষয়। অথচ কমিউনিস্টরা এখন প্রচার করা শুরু করেছে যে, প্রাচীনকালে নাকি ব্যক্তি- মালিকানা বলে কিছু ছিল না। মানব-সভ্যতায় সর্বপ্রথম নাকি কমিউনিজম চালু ছিল। কেউই কোনো জিনিসের মালিক হতো না! প্রত্যেক জিনিসে সাম্যবাদ কার্যকর ছিল! ভূমি কারও ব্যক্তিমালিকানাধীন ছিল না; বরং সকলের ছিল! নারীরা যে কারও অধিকারভুক্ত ছিল! এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এক দাবি। এক্ষেত্রে তাদের কাছে ঐতিহাসিক কোনো দলিল- প্রমাণ নেই। সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে ইসলাম তা সম্পূর্ণ বাতিল বলে সাব্যস্ত করেছে।
পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানুষ হলেন আদম আলাইহিস সালাম। তার সন্তানেরা সরাসরিভাবে তার ঔরস থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন। কে স্ত্রীর অধিক হকদার এটা নিয়ে তার সন্তান— হাবিল ও কাবিল—দুই ভাইয়ের মধ্যে বিবাদ হয়েছে। এতে কাবিল হাবিলকে হত্যা করে ফেলে। তাহলে প্রাচীন মানব-সভ্যতায় থাকা কমিউনিস্টদের সাম্যবাদ কোথায় গেল? হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবার পূর্বে সেখানে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছিল। কাবিল- হাবিল উভয়ে নিজেদের মালিকানাধীন সম্পদ কুরবানি হিসেবে পেশ করেছিলেন। কাবিল ছিলেন কৃষক আর হাবিল মেষ-রাখাল। এক্ষেত্রে কৃষি-সম্পদ উভয়ের মালিকানাধীন ছিল না; বরং এটা কেবল কাবিলের অধিকারভুক্ত ছিল। তেমনিভাবে মেষ উভয়ের অধিকারভুক্ত ছিল না বরং এটা শুধু হাবিলের ছিল। মানুষ তখনও চাষাবাদ করত। পণ্যের অদল-বদল করত। যা ইদানীংকালের ক্রয়-বিক্রয়ের মতোই ছিল। ব্যক্তি-মালিকানা তখন মানুষের বিবাদ-বিসংবাদের উপলক্ষ ছিল না। সম্পদের প্রতি মানুষের লোভ ও আকর্ষণ প্রবৃত্তিগত। মালিকানাকে অবণ্টিত রাখা কোনোভাবেই এ সমস্যার সমাধান নয়। বরং এ ক্ষেত্রে প্রবৃত্তিকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। তাদের সমাধান সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এ যেন কেউ এমনটা দাবি করে বসলো, যৌন উত্তেজনার প্রতিষেধক হলো, পৃথিবীর সকল নারীকে প্রত্যেকের বৈধ সম্পদ বানিয়ে ফেলা!
তৃতীয় পাঠ
আল্লাহ তাআলা ন্যায়ানুগভাবে রিজিক বণ্টন করেছেন, সমান হারে নয়। কেননা সমতার তুলনায় ইনসাফ অধিক মর্যাদাপূর্ণ। কাউকে জ্ঞান-বুদ্ধি দেওয়া হয়েছে তো ধন-সম্পদ দেওয়া হয়নি। যেমন লুকমান আলাইহিস সালামকে দেওয়া হয়েছিল। কাউকে ধন-সম্পদ দেওয়া হয়েছে কিন্তু সুস্থতা দেওয়া হয়নি। কাউকে স্ত্রী দেওয়া হয়েছে কিন্তু সন্তান দেওয়া হয়নি। কাউকে স্বামী দেওয়া হয়েছে কিন্তু চরিত্রবান স্বামী দেওয়া হয়নি। আল্লাহ তাআলা খুব কম সংখ্যক মানুষকে দুনিয়ার সকল নেয়ামত দিয়ে থাকেন।
অভাবগ্রস্ত লোকজন ধনীদের কাছে যায়। তেমনিভাবে ঝগড়া-বিবাদের সময় মানুষকে বুদ্ধিমানের কাছে যাওয়া উচিত। উপরোল্লিখিত ঘটনায় ক্রেতা-বিক্রেতা তাকওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে স্বর্ণের কলস নিয়ে মধুর এক বিবাদে লিপ্ত হয়েছে। তাই বিচার নিয়ে তারা এক বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাছে গিয়েছে। তিনি এক চমৎকার সমাধান প্রদান করেন। যার মাধ্যমে তাদের বিবাদ নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাদের তাকওয়ারও কোনো ক্ষতি হয়নি। তাই প্রথমে বিপদের ধরন-প্রকৃতি বোঝা উচিত। কেউ আছে ছোট বিপদকে বেশ বড় করে দেখে। তাদের উদাহরণ যেন সেই বোকা লোকের মতো, যে সুরমা লাগাতে গিয়ে চোখ অন্ধ করে ফেলেছিল।
চতুর্থ পাঠ
অভিজাত লোকদের বিবাদও কত চমৎকার হয়! লোভী মানুষেরা যেমন নিজেদের অধিকার চায় তেমনি তারা অন্যদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে চায়। কিন্তু অভিজাত লোকদের বিষয়টা ভিন্ন। তাদের বিবাদ- বিসংবাদে কখনো বিচার-আচারের তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। এক ব্যক্তি মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। বৃদ্ধ হয়ে গেলে তিনি দুঃখবোধ করতে থাকেন। এই বলে তিনি আফসোস করেন যে, এ ঘরটিতে আর আগের মতো বিচার-সালিশ বসবে না। তার একটি মাত্র ছেলে ছিল। সে পিতাকে বলল, 'আমি আপনার পক্ষ থেকে বিচারকার্য পরিচালনা করব।' পিতা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'যদি তোমার কাছে একজন কৃপণ ও অভিজাত লোক বিচার নিয়ে আসে তাহলে তুমি কী করবে?' ছেলে বলল, 'আমি অভিজাত লোক থেকে নিয়ে কৃপণকে দেব।' পিতা জিজ্ঞেস করলেন, 'যদি দুজন কৃপণ বিবাদ নিয়ে আসে?' ছেলে বলল, 'আমার পক্ষ থেকে অর্থ দিয়ে তাদের মীমাংসা করে দেব।' পিতা জিজ্ঞেস করলেন, 'যদি দুজন অভিজাত লোক বিবাদ নিয়ে আসে?' ছেলে বলল, 'অভিজাত লোকদের বিচার-আচারের প্রয়োজন হয় না।' ছেলের বুদ্ধিমত্তা দেখে পিতা আনন্দিত হয়ে যান।
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৭২
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭১৬৯
📄 ফেরাউন-কন্যার চুল আঁচড়াত যে বাঁদি
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘মেরাজের রাতে একস্থানে এসে আমার নাকে সুঘ্রাণ লাগলে জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করি, “এই সুঘ্রাণ কীসের?” জিবরাইল বললেন, “ফেরাউন- কন্যার চুল আঁচড়াত যে বাঁদি, এই ঘ্রাণ তার ও তার সন্তানদের।” আমি বললাম, “এর কারণ কী?” তিনি বললেন, "বাঁদিটি একবার ফিরআউনের মেয়ের চুল আঁচড়াচ্ছিল, হঠাৎ তার হাত থেকে চিরুনি পড়ে যায়। (চিরুনিটি উঠানোর সময়) সে বলে, বিসমিল্লাহ। ফিরআউনের মেয়ে তাকে বলল, আমার পিতার নামে এটা উঠালে? সে বলল, না বরং আমার এবং তোমার পিতার রব আল্লাহর নামে। সে বলল, আমি কি পিতাকে বিষয়টি জানিয়ে দেব? সে বলল, হ্যাঁ জানাতে পার। মেয়ে গিয়ে পিতাকে সব জানিয়ে দিল। ফিরআউন তাকে ডেকে বলল, হে অমুক, আমি ছাড়া কি তোমার অন্য কোনো রব আছে? সে বলল, হ্যাঁ আমার এবং তোমার রব আল্লাহ। সে তখন একটি তামার পাতিলে তেল ফুটিয়ে তাতে তাকে এবং তার সন্তানকে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বাঁদি ফিরআউনকে বলল, আপনার কাছে আমার একটি আবদার আছে। ফিরআউন বলল, কী? বাঁদি বলল, আমার এবং আমার সন্তানদের হাড্ডিগুলো একটি কাপড়ে মুড়ে দাফন করবেন। ফিরআউন বলল, ঠিক আছে। এটা আমাদের ওপর তোমার অধিকার। এরপর ফিরআউন তার সামনেই সন্তানদের একজন একজন করে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। একসময় তার দুগ্ধপোষ্য ছেলের পালা আসে। তার জন্য বাঁদিটি যেন আপন সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান ছিল। শিশুটি তখন বলে ওঠে, হে আমার মা! আপনি আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ুন! কেননা, পরকালের শাস্তির তুলনায় দুনিয়ার শাস্তি অতি সামান্য। বাঁদিটি তাই করল।””
প্রথম পাঠ
কোলে থাকা অবস্থায় কতজন শিশু কথা বলেছে, এ ব্যাপারে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী তাদের সংখ্যা হল তিনজন। ঈসা আলাইহিস সালাম, আবেদ জুরাইজের ঘটনায় বিবৃত রাখালের ছেলে, আরেক শিশু, যে তার মায়ের দুয়ার প্রতিবাদ করেছিল। তার ঘটনা সামনে উল্লেখ করা হবে। [২] ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্যদাতা শিশুটিও এই তালিকায় রয়েছে। এটি ইসরাইলি বর্ণনা হলেও আমাদের শরিয়ত একে প্রত্যাখ্যান করেনি। আমাদের সাইয়েদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা বনি ইসরাইলের সূত্রে রেওয়ায়াত করতে পারো এতে কোনো সমস্যা নেই। [৩] এ ছাড়াও আসহাবুল উখদুদ বা গর্তবাসীদের শিশুও কোলে থাকাবস্থায় কথা বলেছে। সহিহ মুসলিমে তার আলোচনা এসেছে। সব মেলালে এ-জাতীয় শিশুদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়জনে।
দ্বিতীয় পাঠ
মৃত্যুর আশঙ্কা হলে ঈমান গোপন করা সমস্যাকর কিছু নয়। ফিরআউনের বংশেরই এক মুমিন ঈমান গোপন করেছিলেন। কুরআনে তার প্রশংসা করে বলা হয়েছে- ‘ফিরআউন-গোত্রের এক মুমিন ব্যক্তি, যে তার ঈমান গোপন রাখত, সে বলল, তোমরা কি একজনকে এ-জন্যে হত্যা করবেন যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ?’ [১] ওই অবস্থায় তার জন্য ঈমান গোপন করাটা কয়েক দিক থেকে উপকারী ছিল।
প্রথমত: এর মাধ্যমে তিনি নিজের জীবনকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন। কেননা ফিরআউন ঈমানের প্রশ্নে নিজের স্ত্রীকেও ছাড় দেয়নি। স্ত্রীকেও সে হত্যা করেছে। মুসা আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান আনলে সে কোনো নিকটাত্মীয়ের প্রতিও দয়া করত না। দ্বিতীয়ত: তিনি ফিরআউনের প্রাসাদের কাছে অবস্থান করতেন। প্রাসাদের সকল অবস্থা এবং চক্রান্ত সম্পর্কে জানতেন। আর এটা তো স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, তরবারির মাধ্যমে শত্রুর মুকাবিলা করার চেয়ে শত্রুর প্রাসাদে গুপ্তচর হয়ে থাকা অনেকগুণে উত্তম। তৃতীয়ত: ঈমান প্রকাশ করার মধ্যে শুধু ব্যক্তিগত কল্যাণ ছিল। অন্য কোনো কল্যাণ এতে ছিল না। কেননা তাকে হত্যা করা হলে তিনি আসিয়া এবং চুল আঁচড়ানো-বাঁদির মতো শহিদের মর্যাদা পেতেন। আর ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সফলতা ও মুক্তির ওপর দাওয়াতের সফলতা প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তবে আমাদের জন্য এটা বলা সম্ভব নয় যে, আসিয়া এবং চুল আঁচড়ানো-বাঁদি তাদের ঈমান প্রকাশের ক্ষেত্রে ভালোভাবে পরিণামের কথা চিন্তা করেননি। শহিদকুলের সরদার হলেন হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তেমনিভাবে ঐ ব্যক্তিও এ মর্যাদা লাভ করে যে কোনো জালেম শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার বিধিনিষেধের কথা বলে এবং জালেম শাসক তাকে হত্যা করে ফেলে।
চুল আঁচড়ানো-বাঁদি দৃঢ়তা, সাহসিকতা এবং ঈমানি শক্তির সওয়াব পাবে। বর্তমান যুগ অনুযায়ী সে কেবল একজন সেবিকা। আর ফিরআউন মিশরের হিসেবে একজন বাদশাহ, শাসক, নিজ দাবিতে ইলাহ ও মাবুদ। ফিরআউনের মতো ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক এমন বিশাল ব্যক্তিত্বের সামনে একজন সেবিকার এই চ্যালেঞ্জ! কসম আল্লাহর, এই সাহসিকতার ওপর আর কোনো সাহসিকতা হয় না!
তৃতীয় পাঠ
ঈমান যখন কারও অন্তরের গভীরে স্থান লাভ করে, তখন এটা তাকে রক্তমাংসে গড়া সামান্য একজন মানুষ থেকে এক পাহাড় বানিয়ে দেয়। যা কখনো নড়ে না। কখনো নরম হয় না। যুগে যুগে এটি ছিল মুমিনদের চরিত্র। কোমল এক নারী আসিয়া। তিনি শূলীতে চড়েছেন! দুর্বল নারী, যিনি চুল আঁচড়াতেন ফেরাউন-কন্যার, তিনি উত্তপ্ত তেলের সামনেও কম্পিত হননি! মক্কার উত্তপ্ত বালু বিলালকে নমনীয় করতে পারেনি! উমাইয়া ইবনে খালাফ বুকে শক্ত পাথর রেখেও তাকে টলাতে পারেনি! এইসব শাস্তির মুখেও তার জবান থেকে আহাদ... আহাদ... শব্দ বন্ধ হয়নি! জাদুকররা মুসা আলাইহিস সালাম-এর অনুসরণ করেছিলেন। এ কারণে আড়াআড়িভাবে তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে শূলীতে চড়ানো হয়েছে। তারা সেদিন ফিরআউনকে বলেছিলেন- ‘তুমি যা ইচ্ছে করতে পার। যা করবার এই পার্থিব জীবনেই তো তুমি করবে।[১]’ হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘তোমাদের আগের লোকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও ছিল, যাকে ধরে নিয়ে তার জন্য জমিনে গর্ত করা হতো। তারপর করাত এনে মাথায় আঘাত করে দুটুকরা করে ফেলা হতো। লোহার শলাকা দিয়ে তার গোশত ও হাড্ডি খসানো হতো। তা সত্ত্বেও তাকে তার দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত না।”[২]’ আপনি জান্নাতের পথে কোনো বিপদাপদের সম্মুখীন না হলে একে আল্লাহ তাআলার একান্ত অনুগ্রহ মনে করুন। তিনি জানেন, আপনি বিপদে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না, তাই তিনি তা আপনার থেকে দূর করে দিয়েছেন। আর যখন তিনি পরীক্ষা করবেন তখন আপনাকে নরম হলে চলবে না। পূর্ববর্তীদের মাধ্যমে সমবেদনা লাভ করতে হবে। প্রত্যেক অবাধ্যের মুখের উপর যেন আপনি সে কথাই বলে দিতে পারেন জাদুকররা যা ফিরআউনকে বলে দিয়েছিলেন- ‘যা করবার এই পার্থিব জীবনেই তো তুমি করবে।[৩]’
চতুর্থ পাঠ
সাদাকাহকারীর কাছেও ধন-সম্পদ পছন্দনীয় বস্তু। যে পর্দা পালন করে, ফ্যাশন-স্টাইল তার কাছে অপছন্দনীয় নয়। যে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় মৃত্যুর ঘাটে উপস্থিত হয় সেও জীবনকে ভালোবাসে। ফিরআউনের বাঁদি, যার চোখের সামনেই তার সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে, তার মাতৃত্ববোধ কম ছিল না। কিন্তু তারা জানেন আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা উত্তম এবং স্থায়ী। এই বাঁদির প্রতি লক্ষ করুন, তিনি মৃত্যু থেকে মাত্র কয়েক মুহূর্ত দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন, তার যাবতীয় চিন্তা-চেতনা সন্তানকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে, সেই মুহূর্তে তিনি ফিরআউনেকে বলছেন, যাতে তার এবং সন্তানদের হাড্ডিগুলো একসঙ্গে দাফন করা হয়। যদি তার মধ্যে মায়ের মমতাবোধ না থাকত তাহলে তিনি এমন অত্যাচারীর কাছে এই আবেদন করতেন না।
পঞ্চম পাঠ
অত্যাচারীরা অত্যাচারীই থাকে। যুগে যুগে শুধু তাদের নাম আর পরিচয়ে পরিবর্তন ঘটে। বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা একই থাকে। ফিরআউন মুমিনদেরকে হত্যা করেছে। তাদেরকে শূলীতে চড়িয়েছে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায় তাকে আগুনে নিক্ষেপ করেছে। উমাইয়া এবং আবু জেহেল উভয়েই মুমিনদেরকে শাস্তি দিয়েছে। একজনের মাল লুট করা হয়েছে তো অপরজনকে বন্দী করা হয়েছে। তৃতীয় একজনের সম্মান হরণ করা হয়েছে তো চতুর্থ জনের বাড়িঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আবার পঞ্চম কারও সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। এভাবেই অবাধ্যরা নিজের অজান্তেই একে অপরের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। প্রতি যুগে তারা একই স্থানে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। অত্যাচারী ও অবাধ্যদের এই ধারাবাহিকতা যেন শেষ হবার নয়।
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ২৮২১। সনদ হাসান।
[২] 'দুগ্ধপোষ্য সন্তান' নামে এই বইয়েরই ১২৭ পৃষ্ঠায় রয়েছে সেই ঘটনা।
[৩] রাসুল সা. বলেছেন, "আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা করত। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল।” সহিহ বুখারি, ৩৪৬১।
[১] সুরা মুমিন, ৪০: ২৮
[১] সুরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম: ৭২
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৯৪৩
[৩] সুরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম: ৭২