📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 আসিয়া বিনতে মুযাহিম

📄 আসিয়া বিনতে মুযাহিম


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- ‘ফিরআউন তার স্ত্রীর হাতপায়ে চারটি পেরেক মেরেছিল। ফিরআউনের লোকেরা চলে গেলে ফেরেশতারা এসে তার উপর ছায়া মেলে দিলেন। তখন তিনি বললেন- "হে আমার রব! জান্নাতে আপনার কাছাকাছি একটি ঘর আমার জন্য নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং জালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন। [১] তখন তাকে জান্নাতে নির্মিত তার বাড়িটি দেখানো হয়। [২]

প্রথম পাঠ
শত্রুর ঘর থেকেই আল্লাহ তাআলা শত্রুর বিরুদ্ধে যোদ্ধা তৈরি করেন। যে বলেছিল, ‘অ্যানা রাব্বুকুমুল আ'লা' - 'আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় প্রভু' [১], তার প্রাসাদ থেকেই নবী (মুসা আলাইহিস সালাম) বের হয়েছেন। তার শয়ন-কক্ষ থেকেই উঠে এসেছেন ইতিহাসের এক মহীয়সী নারী। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন-প্রকৃতপক্ষে সে কত দুর্বল। একজন মুসার খুঁজে হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করেছে, তবুও তাকে পায়নি। অথচ তার চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই মুসা আলাইহিস সালাম তারই প্রাসাদে লালিত-পালিত হয়েছেন। হাজার হাজার নারী যে ফিরআউনকে সিজদা করত বাধ্য হয়ে সে নিজের স্ত্রীর কাছেই অক্ষম ও অধম বলে প্রমাণিত হলো। কারণ, অন্তরের নিয়ন্ত্রণ আল্লাহ তাআলার হাতে। মানুষ তো কেবল রক্ত-মাংসের দেহের ওপর ক্ষমতা রাখে।

দ্বিতীয় পাঠ
চিন্তা-চেতনা ও সত্য-অনুধাবনে রিক্তহস্ত এই জ্ঞানপাপীরা মনে করে-ধর্ম হলো আফিম। এটি এক নেশা। কপর্দকহীন-নিঃস্ব লোকজন একে আঁকড়ে ধরে জীবন কাটিয়ে দেয়। একজন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যেমন নিরাশায় আলোর ঝলক ভেবে মরুভূমিতে মরীচিকার পেছনে দৌড়ে যায় তেমনিভাবে এরা জান্নাতের আশায় বেঁচে থাকে।

অথচ আসিয়া বিনতে মুযাহিম ছিলেন মিশরের রানি। মিশর-সম্রাটের স্ত্রী। প্রবল প্রতাপ দেখে পথভ্রষ্ট লোকজন আল্লাহকে বাদ দিয়ে যে ব্যক্তির উপাসনা করত, তিনি তার স্ত্রী। তিনি (আসিয়া) আদেশ করা মাত্রই তা বাস্তবায়ন করা হতো। কাউকে ডাকলে তৎক্ষণাত ছুটে আসত। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য জান্নাতের নহর পাবার আশায় তিনি ঈমান গ্রহণ করেননি। ক্ষুধা মেটানোর জন্য জান্নাতের ফলফলাদি লাভের আশায় তিনি ঈমান গ্রহণ করেননি। দুনিয়ার বাড়িঘর সংকীর্ণ বলে জান্নাতের বালাখানার প্রত্যাশা করেননি। তিনি তো বিশাল প্রাসাদের, ঐতিহাসিক শহরের আর দেশের সকল মানুষের রানি ছিলেন। তিনি জানতেন আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা উত্তম এবং চিরস্থায়ী। অন্তরের প্রাচুর্যই আসল ঐশ্বর্য। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভই প্রকৃত সম্পদ। জান্নাতের তুলনায় দুনিয়ার সকল ঘরই অতি সংকীর্ণ। সব জেনেবুঝে স্বামী ফিরআউনকে যেন তিনি এ কথাই বলেছিলেন যে, তোমার মালিকানাধীন সবকিছু তুমি নিয়ে যাও আর আমাকে আমার রবের জন্য ছেড়ে দাও।

তৃতীয় পাঠ
ঈমান এক আশ্চর্য শক্তি। বিশ্বজুড়ে ইসলামের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ার পর একবার বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু- কে জিজ্ঞাসা করা হলো, উমাইয়া ইবনে খলাফের শাস্তির মুখে আপনি কীভাবে ধৈর্যধারণ করতেন? তিনি বলেন, নির্মম শাস্তির মুখে আমি ঈমানের স্বাদ অনুভব করে ধৈর্যধারণ করতাম। ঈমান এক আশ্চর্য শক্তি। কারও অন্তরে তা স্থান গেড়ে নিলে এটা তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়।

তর্কের খাতিরে বলা যায় যে, বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু'র পক্ষে এভাবে ধৈর্য ধারণ খুব বেশি আশ্চর্যের কিছু নয়। কারণ, বিলাল তো একজন পুরুষ। আর দৈহিকভাবে নারীর তুলনায় পুরুষ অধিক শক্তিশালী হয়ে থাকে। তাছাড়া তিনি তো ইতিপূর্বে একজন দাস ছিলেন। কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ করার অভ্যাস তার আগে থেকেই ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো একজন নারী, যিনি মান-সম্মান ও নেয়ামতের রাজ্যে বেড়ে উঠেছেন, তিনি এমন শাস্তির মুখে কীভাবে ধৈর্যধারণ করলেন! একটি কাষ্ঠ- খণ্ডে রেখে ফিরআউন তার হাত-পায়ে পেরেক মেরেছিল। সেসময় তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অবিচল; কুঠার দ্বারা যে পাহাড়ের পাথর কেটে নেওয়া হলেও সে ক্রন্দন করে না। তিনি যেন তখন এক বিশালকায় বৃক্ষ; করাতের ধারালো দাঁত দ্বারা যাকে কাটা হলেও আর্তনাদ করে না। পৃথিবীতে তার কোমল দেহকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। আর তার ঈমানে-অবিচল অন্তর ঊর্ধ্বাকাশে উড়ে বেড়াচ্ছিল। যতক্ষণ দেহে প্রাণ ছিল, ঠোঁটের কোণে তার মুচকি হাসি লেগে ছিল। যেমনটা ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে। ফিরআউন এতে পাগল হয়ে যায়। সে বলতে থাকে— এ দেখি শাস্তির খড়গে পড়েও হাসচ্ছে! সে তো আর জানত না—তিনি জান্নাতের যে বাড়ির আবেদন করেছেন আল্লাহ তাকে সে বাড়ি দেখিয়ে দিয়েছেন।

fourth পাঠ
আল্লাহ তাআলা তাকে ফিরআউনের শাস্তির হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম ছিলেন। যিনি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ফেরেশতা পাঠিয়েছেন তিনি চাইলে তাকে মুক্তির জন্যও ফেরেশতা পাঠাতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে পরীক্ষার জায়গা বানিয়েছেন। ঈমান ও আমলের প্রকৃত ভোগের জায়গা বানাননি। আসিয়া পরকালের ফসলের আশায় দুনিয়াতে (ঈমান ও আমলের) বীজ বপন করে গিয়েছেন। আর আল্লাহ তাআলাও তার ফল ও ফসলকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা করেছেন।

তাই মুমিনদের ওপর কোনো শাস্তি নেমে এলে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কোনোরকম মন্দ ধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাকুন। যেমনটা বোকার দল বলে থাকে। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে বাতিলপন্থীকে জয়ী হতে দেখলে বলে—আল্লাহ কোথায় গেলেন! দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা কিছু মানুষকে অন্যদের ওপর ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন। এটি তার কোনো অক্ষমতা নয়; বরং জালেমদেরকে তিনি সামান্য সুযোগ দিয়ে রেখেছেন মাত্র। আর এই সুযোগ প্রদানের অর্থ এই না যে, আল্লাহ তাআলার বাহিনী ক্ষুদ্র। বা তাতে সৈন্য-স্বল্পতা রয়েছে। বরং মূল বিষয় হলো, তিনি দুনিয়ার জীবনকে পরীক্ষাক্ষেত্র বানিয়েছেন। এখানে জালেমের যদি জুলুম করার স্বাধীনতা না থাকে তাহলে সে পরীক্ষায় ফেল করবেই-বা কীভাবে? আবার ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির যদি ইনসাফের স্বাধীনতা না থাকে তাহলে সে কীভাবে সফল হবে? স্বাধীনতা না থাকলে আল্লাহ তাআলার অনুগত হয়ে জান্নাতেই-বা যাবে কীভাবে? অর্থাৎ স্বাধীনতা পেয়েও যারা আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে বিলিন করে দেবে, প্রথম সুযোগে জান্নাত তো তাদের জন্যই। এই পথে নুহ আলাইহিস সালাম দীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর কষ্ট করেছেন। ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-কে করাত দ্বারা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। আর ইসমাইল আলাইহিস সালাম-কে জবাই করার জন্য ধারালো ছুরির নিচে শোয়ানো হয়েছে। নিশ্চয়ই জান্নাত অত্যন্ত মূল্যবান।

পঞ্চম পাঠ
যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারে সে মানুষের সঙ্গে ওয়াদা রক্ষা করবে, কস্মিনকালেও এমনটা ভাবতে যাবেন না। ফিরআউন আসিয়া বিনতে মুযাহিমের সঙ্গে ঘর-সংসার না করে, তার স্বভাব চরিত্র না জেনেই তাকে শূলীতে চড়িয়েছিল এমনটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। তার প্রতি তার স্ত্রীর যথাযথ ভালোবাসা, অনুরাগ ও যত্ন-আত্তি থাকা স্বত্ত্বেও সে তাকে শূলীতে চড়িয়েছিল। কারণ, সে তো আল্লাহ-প্রদত্ত ইহসানের প্রতিই লক্ষ রাখেনি। মানুষের ভালোবাসা ও ইহসানের বদলা সে কীভাবে দেবে? বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু কয়েক বছর উমাইয়া ইবনে খলফের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন। কিন্তু কঠোর শাস্তি দেওয়ার সময়ও সে তার প্রতি লক্ষ রাখেনি। কারণ গোলামের ওপর জুলুম করার পূর্বে সে আল্লাহর (বিধানের) সঙ্গে জুলুম করেছে।

জনৈক মনীষী চমৎকার কথা বলেছেন, 'যে আল্লাহকে ভয় করে না তুমি তাকে ভয় করো!' যে আল্লাহর শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ রাখে না, তার কাছে তুমি শিষ্টাচার আশা কোরো না। যে আল্লাহর হকই আদায় করে না সে মানুষের হক কীভাবে আদায় করতে পারে! এ কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'যখন তোমাদের কাছে এমন কোনো পাত্র মিলে যায় যার দ্বীন, ধর্ম ও আচার-আচরণ তোমাদের পছন্দ হয় তাহলে তোমরা তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দাও। তা না করলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়বে।’[১] কারণ, যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করা, সে অবশ্যই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিকেও (বৈধভাবে) সন্তুষ্ট রাখবে। তাই মুত্তাকি ও পরহেজগার পাত্র ছাড়া অন্যত্র মেয়ে বিয়ে দেবেন না। সে যদি তাকে ভালোবাসে তাহলে অবশ্যই তার সম্মান করবে আর যদি তাকে নাও ভালোবাসে তাহলে তাকে অন্তত অপমান করবে না।

টিকাঃ
[১] সুরা তাহরিম, আয়াত-ক্রম : ১১
[২] মুসনাদু আবি ইয়া'লা, ১১/৩১৬ [৬৪৩১]; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৯/২২১। সনদ সহিহ।
[১] সুরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম : ২৪
[১] সুনানু তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ১০৮৫। সনদ হাসান।

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 দ্বীন এবং সঠিক পন্থা

📄 দ্বীন এবং সঠিক পন্থা


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তির কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন—
'বনি ইসরাইলের জনৈক ব্যক্তি স্বগোত্রীয় আরেক ব্যক্তির কাছে একহাজার দিনার ঋণ চাইল। সে ঋণদাতা বলল, “কয়েকজন সাক্ষী আনো, আমি তাদেরকে সাক্ষী রাখব।” ঋণগ্রহীতা বলল, "সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।” ঋণদাতা বলল, "তা হলে একজন জামিনদার উপস্থিত করো।” ঋণগ্রহীতা বলল, “জামিনদার হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।” ঋণদাতা বলল, “তুমি সত্যই বলেছ।” এরপর নির্ধারিত সময়ে পরিশোধের শর্তে তাকে এক হাজার দিনার দিয়ে দিল। তারপর ঋণগ্রহীতা নৌপথে সফর করে নিজ প্রয়োজন সমাধা করল। অতঃপর যানবাহন খুঁজতে লাগল, যাতে নির্ধারিত সময়ের ভেতর ঋণদাতার কাছে পৌঁছতে পারে। কিন্তু কোনো যানবাহন সে পেল না। উপায়ান্তর না দেখে এক টুকরো কাঠ নিয়ে তা ছিদ্র করল এবং ঋণদাতার নামে একখানা পত্র লিখল। অতঃপর চিঠিসহ এক হাজার দিনার তার মধ্যে ভরে ছিদ্রটি বন্ধ করে সমুদ্র-তীরে এসে বলল, “হে আল্লাহ! তুমি তো জানো আমি অমুকের কাছে এক হাজার দিনার ঋণ চাইলে সে আমার কাছে জামিনদার চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম জামিন হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। এতে সে রাজি হয়। তারপর সে আমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিল, আমি বলেছিলাম সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট, তাতে সে রাজি হয়ে যায়। আমি তার ঋণ (যথাসময়ে) পরিশোধের উদ্দেশে যানবাহনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, কিন্তু পাইনি। তাই আমি তোমার কাছে সোপর্দ করলাম।” এই বলে সে কাষ্ঠখণ্ডটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে দিল। আর কাষ্ঠখণ্ডটি সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে গেল। অতঃপর লোকটি ফিরে গেল এবং নিজের শহরে যাওয়ার জন্য যানবাহন খুঁজতে লাগল।

ওদিকে ঋণদাতা এই আশায় সমুদ্র-তীরে গেল যে, হয়তো-বা ঋণগ্রহীতা কোনো নৌযানে করে তার মাল নিয়ে এসেছে। তার দৃষ্টি কাষ্ঠখণ্ডটির উপর পড়ল, যার ভেতরে মাল ছিল। সে কাষ্ঠখণ্ডটি তার পরিবারের জ্বালানির জন্য বাড়ি নিয়ে গেল। যখন সে তা ছিঁড়ল, তখন মাল ও পত্রটি পেয়ে গেল। কিছুদিন পর ঋণগ্রহীতা এক হাজার দিনার নিয়ে এসে হাজির হলো এবং বলল, “আল্লাহর কসম! আমি আপনার মাল যথাসময়ে পৌঁছিয়ে দেয়ার উদ্দেশে সবসময় যানবাহনের খুঁজে ছিলাম। কিন্তু আমি যে নৌযানে এখন আসলাম, তার আগে আর কোনো নৌযান পাইনি।” ঋণদাতা বলল, “তুমি কি আমার কাছে কিছু পাঠিয়েছিলে?” ঋণগ্রহীতা বলল, “আমি তো তোমাকে বললামই যে, এর আগে আর কোনো নৌযান আমি পাইনি।” সে বলল, “তুমি কাঠের টুকরোর ভেতরে যা পাঠিয়েছিলে, তা আল্লাহ তোমার পক্ষ থেকে আমাকে আদায় করে দিয়েছেন।” ঋণগ্রহীতা তখন আনন্দচিত্তে এক হাজার দিনার নিয়ে ফিরে গেল।'[১]

প্রথম পাঠ
মানুষ মানুষের জন্য। বর্ণিত আছে যে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে দুআ করতে শুনলেন, সে বলছে, 'হে আল্লাহ, আপনি কোনো সৃষ্টির কাছে আমার কোনো প্রয়োজন রাখবেন না।' উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আমি তো দেখছি তুমি মৃত্যু কামনা করে দুআ করছ!' বাহ্যিকভাবে মানুষ একে অন্যের কাছে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। যে আপনার কাছে কিছু চায় সে তো আপনার মধ্যে কল্যাণ আছে বলেই চায়। অন্যের প্রতি সুধারণ পোষণ করা আভিজাত্যেরই পরিচায়ক। মানুষের ধন-সম্পদই একমাত্র দানযোগ্য বস্তু নয়। হ্যাঁ, অধিকাংশ সময় ধন-সম্পদই বেশি প্রয়োজন হয়ে থাকে। শুধু ধন-সম্পদই নয়, বরং প্রতিটি বস্তু ও বিষয়েরই জাকাত রয়েছে। প্রাচুর্যের জাকাত হলো—দরিদ্রদের উপর দয়া করা। ইলমের জাকাত হলো—কেউ তা তলব করুক বা না-করুক কারও কাছেই তা গোপন না করা। বুদ্ধি-বিবেচনার জাকাত হলো—কারও প্রয়োজন হলে তাকে সদুপদেশ দেওয়া। শরীরের জাকাত হলো—কোনো খোঁড়া ব্যক্তিকে আগলে নিয়ে যাওয়া কিংবা কোনো অন্ধকে পথ পার করে দেওয়া ইত্যাদি।

দ্বিতীয় পাঠ
যে সৎ উদ্দেশ্য অন্যের মাল গ্রহণ করে আল্লাহ তাআলা তাকে তা পরিশোধ করার সুযোগ দান করেন। আর যে আত্মসাৎ করার জন্য অন্যের মাল নিয়ে নেয় আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে দেন। সৎকর্ম ছেড়ে ভিন্ন পথে চলার থেকে নির্বুদ্ধিতা আর হতে পারে না। আবার মন্দের বিনিময়ে ভালো আচরণও কখনো কখনো চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক হয়ে ওঠে। তবে এটাও লক্ষ রাখতে হবে যে আপনার মাধ্যমে যেন ভালো কাজগুলো মিটতে না থাকে। অনেকেই এখন আর অভাবী লোকজনকে ঋণ দেয় না। কারণ, ইতিমধ্যে বহু মানুষ তার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চম্পট দিয়েছে। অনেকেই অত্যধিক পরিমাণ মোহর নির্ধারণ ছাড়া মেয়ে বিয়ে দেন না। কারণ, তারা মনে করেন যে, অল্প মোহরানায় মেয়ে বিয়ে দিলে মেয়েটিকে সস্তা মনে হয়। বহু মানুষ রয়েছে, যারা পঙ্গু-ভিক্ষুকদের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করে না। কেননা এইসব পঙ্গু-ভিক্ষুক অনেক সময় ধোঁকাবাজ হয়ে থাকে। আমাদের বাপ-দাদারা চমৎকার একটি কথা বলতেন, ‘তুমি ধোঁকাবাজ হলেও তোমাকে যে বিশ্বাস করে তাকে অন্তত ধোঁকা দিয়ো না।’

তৃতীয় পাঠ
এই ঘটনায় কাকে দেখে আপনি আশ্চর্য হবেন—তা নির্ণয় করা মুশকিল; যে ব্যক্তি এটা মেনে নিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলাই তার ঋণপ্রদানের সাক্ষী এবং জামিন সেই ব্যক্তি, নাকি ঐ ব্যক্তি যে ওয়াদা ভঙ্গ হওয়ার ভয়ে হাজার দিনারকে সমুদ্রে ভাসিয়ে বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে? একেই বলে সত্যিকারের আভিজাত্য। একজন অভিজাত ব্যক্তি কোনো সাক্ষী এবং জামিন ছাড়াই ঋণ দিয়ে দিচ্ছে। আরেকজন অভিজাত ব্যক্তি এক টুকরো কাঠে ভরে ঋণ পরিশোধ করার শেষ চেষ্টা করছে।

চতুর্থ পাঠ
ভালো কাজের নিয়ত করুন, আল্লাহ তাআলাই পথ খুলে দেবেন। ঋণগ্রহীতা যখন ঋণদাতার মাল ফেরত দেওয়ার নিয়ত করেছে কাঠের টুকরোটি তখন চিঠিতে পরিণত হয়ে গেছে। আর সমুদ্র পিয়নের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আপনি ভালো স্বামী হওয়ার নিয়ত করুন ভালো স্ত্রী পাবেন। শেখার নিয়ত করুন উত্তম শিক্ষক পেয়ে যাবেন। বিশ্বস্ত হওয়ার নিয়ত করুন, এমন ব্যক্তি পাবেন যে আপনাকে বিশ্বস্ত মনে করবে। আল্লাহ তাআলা যার অন্তরে কল্যাণ দেখতে পান তার জন্য তিনি কল্যাণের দ্বার প্রশস্ত করে দেন।

পঞ্চম পাঠ
যদি কেউ আল্লাহর নামে আপনার কাছে আশ্রয় চায় তাকে আশ্রয় দান করুন। কেউ আল্লাহর নামে কিছু চাইলে তাকে সেটা প্রদান করুন। মানুষ সাধারণত অভিজাত লোকের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে না। যে আল্লাহ তাআলাকে মাধ্যম বানাচ্ছে তার অবস্থা কী হতে পারে! সাক্ষী তলব করা, চুক্তিনামায় লিখে রাখা- এগুলো নিষিদ্ধ কিছু নয় (বরং সুন্নাত)। বাস্তবতা হলো দুনিয়ার জীবনে জীবন-মৃত্যু, প্রতারণা ও ধোঁকা সবকিছুই রয়েছে। তাই নিজের লেনদেন সম্পর্কে লিখে রাখতে কোনোরূপ কার্পণ্য করা যাবে না। এমনিভাবে কেউ আপনার কাছে পাওনা থাকলে তার প্রাপ্য হক লিখে রাখতে চাইলে বিরক্ত হবেন না। কুরআনুল কারিমের সবচেয়ে দীর্ঘতর আয়াতটি ঋণ সংক্রান্ত। আল্লাহ তাআলা এতে ঋণ সংক্রান্ত বিষয় লিখে রাখতে এবং তার ওপর স্বাক্ষী রাখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এটাও বলেছেন- 'যদি একজন অপরজনকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করা।' [১]

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম : ২২৯১
[১]. সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৮৩

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 মেঘখণ্ড

📄 মেঘখণ্ড


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'একদিন এক লোক কোনো এক মরুপ্রান্তরে সফর করছিলেন। এমন সময় অকস্মাৎ মেঘের মধ্যে একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন যে, অমুকের বাগানে পানি দাও। সঙ্গে সঙ্গে ঐ মেঘখণ্ডটি একদিকে সরে যেতে লাগল। এরপর এক প্রস্তরময় ভূমিতে বৃষ্টি বর্ষিত হলো। ঐ স্থানের নালাসমূহের একটি নালা ঐ পানিতে সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ হয়ে গেল। তখন সে লোক পানির অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। চলার পথে এক লোককে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পেলেন, যিনি কোদাল দিয়ে বাগানের সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এ দেখে তিনি তাকে বললেন, “হে আল্লাহর বান্দা, আপনার নাম কী?” তিনি বললেন, "আমার নাম অমুক” (আগন্তুক এই নামটিই মেঘখণ্ডের মধ্যে শুনতে পেয়েছিলেন)। বাগানের মালিক এবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর বান্দা! আপনি আমার নাম জানতে চাইলেন কেন?” উত্তরে তিনি বললেন, "এ পানি যে মেঘের, এর মধ্যে আমি এ আওয়াজ শুনতে পেয়েছি, আপনার নাম নিয়ে বলছে যে, অমুকের বাগানে পানি দাও।” এরপর তিনি বললেন, “আপনি এ বাগানের ব্যাপারে কী করেন?” মালিক বললেন, “যেহেতু আপনি জিজ্ঞেস করছেন, তাই বলছি, প্রথমে আমি এ বাগানের উৎপন্ন ফসলের হিসাব করি। অতঃপর এর এক তৃতীয়াংশ সাদাকাহ করি, এক তৃতীয়াংশ আমি ও আমার পরিবার-পরিজনের জন্য রাখি এবং এক তৃতীয়াংশ বাগানের উন্নয়নের কাজে খরচ করি।”” [১]

প্রথম পাঠ
যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার বিধিনিষেধ যথাযথভাবে পালন করে আল্লাহ তাআলাও তার প্রতি লক্ষ রাখেন। যে ব্যক্তি তার হাতে থাকা উপায়-উপকরণকে আল্লাহর কাজে লাগায় আল্লাহ তাআলাও নিজের মালিকানাধীন জিনিসকে তার কাজে লাগিয়ে দেন। বিশ্বজগতের সবকিছুই আল্লাহ তাআলার হাতে। তাই তিনি যেমন চান আপনি তেমন হয়ে যান। তাহলে আপনি যেমন চান আল্লাহ আপনার জন্য তেমন হয়ে যাবেন।

সবসময় বিশ্বাস রাখুন যে, দুনিয়ার নিয়ম-কানুনগুলো মানুষের ওপর চলে, আল্লাহর ওপর নয়। তিনি একজন নেককার বান্দার সুবিধার্থে গোটা বিশ্বজগত পরিচালনার জন্য প্রণীত নীতিমালায় ব্যতিক্রম করেছেন। নবুওয়াতের কারণে আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে যা দিয়ে থাকেন কখনো কখনো সততার কারণে নেককার বান্দাদেরকেও তা দিয়ে থাকেন। আপনার কি জানা নেই যে, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর জন্য জ্বলন্ত আগুন ঠান্ডা ও নিরাপদ হয়ে গিয়েছিল। ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর জন্য হিংস্র মাছ আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর গলায় ধারালো ছুরি অকেজো হয়ে গিয়েছিল। একজন মাত্র ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তাআলা এই মেঘখণ্ড পাঠিয়েছিলেন। সেদিন মানুষের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করার ইচ্ছা আল্লাহ তাআলার ছিল না। কিন্তু তিনি জানতেন যে, তার এক নেককার বান্দা রয়েছে যে অন্যদের কারণে বঞ্চিত হতে পারে না। তাই তার জন্য বিশ্বজগতের রীতি পরিবর্তন করে দিয়েছেন। মেঘ তো সকলকে বৃষ্টি বর্ষণ করে কিন্তু এই মেঘখণ্ডটি কেবল একজন ব্যক্তির জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করেছিল। সে তার দ্বীনকে বিশুদ্ধ করেছে তাই আল্লাহ তার দুনিয়াকে ঠিক করে দিয়েছেন।

দ্বিতীয় পাঠ
পৃথিবীতে প্রসিদ্ধি লাভ করা প্রকৃত প্রসিদ্ধি নয়, বরং আসমানে (আল্লাহ তাআলার দরবারে) পরিচিতি লাভ করাটাই প্রকৃত প্রসিদ্ধি লাভ। এই লোক তো সামান্য একজন কৃষক, দুনিয়ার মানুষ যাকে চেনে না, কিন্তু তিনি নেতৃস্থানীয় ফেরেশতাদের কাছে পরিচিত ছিলেন; যে কারণে এক ফেরেশতা অপর ফেরেশতাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, অমুকের বাগানে বৃষ্টি বর্ষণ করো। কোনো তারকা-শিল্পী আমাদের নাম ধরে ডাকলে আমরা আনন্দে যেন উড়তে থাকি। কোনো মন্ত্রী আমার নাম ধরে ডাকলে আমার পা যেন আর মাটিতেই পড়তে চায় না। রাষ্ট্রপতি আমাদের নাম ধরে ডাকলে সেদিন খুশির আতিশয্যে আমরা চোখে কাউকে দেখতে পাই না। ধরাকে সরা জ্ঞান করে বসি। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে ডাকছে, তাতেই এই অবস্থা! তাহলে সকল রাজাধিরাজ আল্লাহ তাআলা যখন নির্দেশ পাঠান যে, আমার অমুক বান্দার বাগানে বৃষ্টি বর্ষণ করো, তখন সে ব্যক্তির অবস্থা কেমন হতে পারে!

তৃতীয় পাঠ
মানুষ বলে থাকে কাজকর্মও ইবাদত। হ্যাঁ, এটা সঠিক কথা। কিন্তু যে কাজকর্মের কারণে আল্লাহর হক ছুটে যায় তা শয়তানের ইবাদত। কিছু মানুষ ফজর-নামাজের জন্য অ্যালার্ম দিয়ে রাখে আবার কিছু মানুষ অফিস-টাইমের জন্য অ্যালার্ম দিয়ে রাখে। দুই ব্যক্তির মধ্যে কত তফাত! একজন মনে করে, তাকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আরেকজন মনে করে, তাকে আয়-উপার্জন ও রুজি-রোজগারের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবাদতের জন্য যেমন সময় রয়েছে তেমনি কাজকর্মের জন্যও সময় রয়েছে। যে ব্যক্তি কাজকর্মের কারণে ইবাদতকে পিছিয়ে রাখে সে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে শিষ্টাচার-বহির্ভূত কাজ করে থাকে। এর মাধ্যমে সে বিশ্বাস করে যে, সে নিজেই নিজের রিজিকের ব্যবস্থা করে। অথচ কর্মের মাধ্যমে আমরা যে রিজিক তালাশ করি সেটা তো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে। তাহলে আমরা আল্লাহ তাআলার অপছন্দনীয় কাজ করে তার থেকে কীভাবে আমাদের পছন্দনীয় জিনিস আশা করতে পারি! তিনি বলেন-

'শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অধিক অনুগ্রহের ওয়াদা করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সুবিজ্ঞ।' [১]

মালিকের কাজ করার পূর্বে যদি আমরা আল্লাহ তাআলার কাজ করি তাহলে আমাদের কাজকর্ম ইবাদত হবে। তবে ইবাদতের অজুহাতে যে অন্যের উপার্জনের ওপর ভরসা করে বসে থাকে, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম নয় যে কাজকর্মের কারণে নামাজ ছেড়ে দেয়।
আমাদের সাইয়িদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।' [২] আরেক হাদিসে তিনি বলেন- 'যার হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার কসম! তোমাদের মধ্যে কারও রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে পিঠে করে বয়ে আনা, কোনো লোকের কাছে এসে চাওয়া অপেক্ষা অনেক ভালো, চাই সে দিক বা না দিক।'[১]

যে ব্যক্তি মসজিদে অবস্থান করে আর ভাই তার খরচ চালায় তার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তার ভাই, (যে খরচ চালায়) তার চেয়ে উত্তম। এই তুলনার মধ্যে জীবন-সফলতার রহস্য নিহিত। বিষয়টি এমন নয় যে আপনি বলবেন, আমি ইবাদত করব নাকি কাজ করব? ঈসা আলাইহিস সালাম মহাসম্মানিত নবী ও রাসুল হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তালার জমিনে একজন কাঠমিস্ত্রি হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। শুআইব আলাইহিস সালাম ছাগল চড়াতেন। তিনি বার্ধক্যে উপনীত হবার পর তার কন্যাগণ সেগুলো চড়িয়েছেন। মুসা আলাইহিস সালাম তার এক মেয়েকে বিয়ে করার পর ছাগল চরানোই ছিল তার বিয়ের মোহর। এই ছিল নবী ও রাসুলগণের চিত্র। তাহলে তাদের তুলনায় সাধারণ লোকজনের অবস্থা কী হতে পারে!

চতুর্থ পাঠ
মানুষ তার কর্ম-অনুপাতেই প্রতিদান পেয়ে থাকে। যে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য জমিতে কাজ করে আল্লাহ তাআলা অন্যদের শাস্তি প্রদানের ফায়সালা করলেও তার জমি রক্ষা করে থাকেন। তাই আপনি নিশ্চিত থাকুন, আল্লাহর জন্য আপনি যে সম্পদ ব্যয় করছেন আল্লাহ অবশ্যই তা বৃদ্ধি করবেন। সাদাকাহর কারণে মালে কখনো ঘাটতি দেখা দেয় না। রাত্রি-জাগরণের জন্য আপনি যে সময়টুকু ব্যয় করেছেন এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা আপনার মধ্যে সেই উদ্দীপনা তৈরি করে দেবেন যা অন্যরা দীর্ঘ ঘুমের মাধ্যমে অর্জন করে থাকে। বরকত বলেও যে একটা কিছু আছে আমরা সে দিকে ভ্রুক্ষেপই করি না। পৃথিবীর সকল জিনিস একদিনেই হয়ে যায়নি। আমরা দেখি অনেকেই হারাম উপায়ে সম্পদ জমা করে, তারপরও তারা অভাব-অনটনের অভিযোগ করে থাকে। আবার এমন ব্যক্তি সম্পর্কেও আমরা জানি যে, তারা হালাল উপার্জন করে। আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই যে, এই সামান্য উপার্জনেও তার দিব্যি কেটে যাচ্ছে! কিভাবে সম্ভব হয়? উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রিজিক চাই না, কেননা তা তো ইতিমধ্যে বন্টিত হয়ে গেছে; বরং আমি তাতে বরকত চাই।

টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৯৮৪
[১] সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৬৮
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২০৭২
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪৭০

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 মুগিস ও বারিরা

📄 মুগিস ও বারিরা


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
'বারিরার স্বামী ছিলেন একজন ক্রীতদাস। তাকে 'মুগিস' নামে ডাকা হতো। আমি যেন এখনও তাকে দেখছি-তিনি বারিরার পিছে কেঁদে কেঁদে ঘুরছেন, আর তার দাড়ি বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে) বললেন, “আব্বাস! বারিরার প্রতি মুগিসের ভালোবাসা এবং মুগিসের প্রতি বারিরার অনাসক্তি দেখে আপনি কি আশ্চর্যান্বিত হন না?” এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (বারিরাকে) বললেন, “তুমি যদি তার কাছে আবার ফিরে যেতে (তাহলে কতই-না ভালো হত)! তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আমাকে হুকুম দিচ্ছেন?” তিনি বললেন, “আমি কেবল সুপারিশ করছি।” বারিরা বললেন, “তাকে দিয়ে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”” [১]

বারিরা এক আনসারি সাহাবির বাঁদি ছিলেন। তার স্বামীর নাম ছিল মুগিস। বারিরা স্বাধীনতা লাভের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এজন্য তিনি মনিবের সঙ্গে কিতাবাত (টাকার বিনিময়ে স্বাধীনতা) চুক্তি করেন। আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কন্যা আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বাধীনতা লাভের জন্য তাকে আর্থিক সাহায্যের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বারিরা স্বাধীনতা লাভের পর স্বামীর ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেন। কারণ, বাঁদি স্বাধীন হয়ে গেলে আর স্বামী গোলাম রয়ে গেলে শরিয়ত তাকে স্বামীর সঙ্গে থাকা বা না-থাকার ইচ্ছাধিকার প্রদান করে থাকে। বারিরা তার স্বামী মুগিসকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মুগিস বারিরাকে পাওয়ার জন্য কাঁদতে কাঁদতে মদিনার অলিগলিতে তার পিছুপিছু ঘুরতেন। কিন্তু মুগিসের প্রতি তার কোনো সমবেদনা বা দয়া জাগ্রত হতো না। মুগিস এভাবে বারিরাকে পাওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে ছুটে গেলেন দয়ালু নবীজির কাছে। বারিরার কাছে তার জন্য সুপারিশ করার আবেদন করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারিরাকে বলেন, “তুমি যদি তার সঙ্গে ঘর সংসার করতে! সে তো তোমার স্বামী! তোমার সন্তানের পিতা!” বারিরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন?” তিনি বলেন, “আমি কেবল সুপারিশ করছি।” বারিরা বললেন, “তাহলে তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”

প্রথম পাঠ
এক পক্ষ থেকে ভালোবাসা অধিকাংশ সময়ই লাঞ্চনা বয়ে আনে। তবে এটাও ঠিক যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের মধ্যে এমন এক অন্তর দিয়েছেন যা কোনো প্রিয় ব্যক্তিকে দেখা মাত্রই তার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর বিপরীতে আমরা যেন নিজের সম্মানজনক অবস্থান হারিয়ে না বসি তার জন্য তিনি আমাদেরকে ইচ্ছাশক্তিও প্রদান করেছেন। আপনি যাকে ভালোবাসেন তার কাছে আপনার হৃদয়ের অভিব্যক্তি পেশ করুন, কিন্তু ভালোবাসার জন্য তাকে চাপাচাপি করবেন না। একবার পরীক্ষা করুন, আরেকবার ভালবাসুন। তবে আপনার মধ্যে বিবেচনাশক্তি থাকতে হবে। আগের যুগের মানুষজন বলতেন, কখনো কখনো দুই-এক পৃষ্ঠা উল্টানো যথেষ্ট হয় না; বরং পুরো কিতাব পরিবর্তন করতে হয়! অর্থাৎ প্রয়োজনে নিজেকে আমূল পালটে ফেলতে হবে। অথবা ভালোবাসার ঠিকানা পালটে নিতে হবে।

দ্বিতীয় পাঠ
নারীরা কোনো বিক্রয়-পণ্য নয় যে, যে ব্যক্তি মোহর প্রদান করবে তার কাছেই তাকে হস্তান্তর করতে হবে। ন্যায়সঙ্গতভাবে অন্তর কারও প্রতি আকৃষ্ট থাকা সত্ত্বেও মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে বসতে বাধ্য করাটা জুলুম। দেহ-হত্যার চেয়ে অন্তরকে হত্যা করাটা অধিক কষ্টদায়ক এবং পাপের কারণ। আপনি প্রাচীন যুগের আরবদের কুসংস্কার পরিত্যাগ করুন। তারা মেয়েদেরকে মেয়েদের পছন্দসই পুরুষের কাছে বিয়ে দিত না। তাদের, বরং আরবের সকল সম্প্রদায়ের, বরং গোটা বিশ্বের মধ্যে যিনি সর্বোত্তম তার অনুসরণ করুন। তিনি বলেছেন- 'পরস্পর ভালোবাসাময় নারী-পুরুষের জন্য বিয়ে ব্যতীত অন্য কোনো পথ নেই।' তবে এই ভালোবাসা হতে হবে দ্বীনের জন্য। দ্বীনের সীমারেখা মেনে। দুনিয়ার মোহে কিংবা নাজায়েজ পদ্ধতির ভালোবাসায় কোনো প্রকার কল্যাণ নেই। এই মোহ অল্প সময়ে কেটে যায়। জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা আল্লাহ নারাজ হন।

তৃতীয় পাঠ
আপনি সত্যিকারের পুরুষ হয়ে উঠুন। সামাজিক রীতিনীতি এবং সংস্কৃতির অনুসরণ করেন বলে আপনি ওই কোমল হৃদয়কে ধোঁকা দেবেন না যে হৃদয় আপনাকে ভালোবাসে। প্রতিটি মানুষেরই হৃদয় রয়েছে। যদি আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত প্রিয়তমাকে বিয়ে করতে না পারেন, তাহলে অচিরেই আপনি হয়তো অপর কোনো ব্যক্তির প্রিয়তমাকে বিয়ে করবেন। আমাদের অধিকাংশ রীতিনীতি ও সংস্কৃতিগুলো একটি মূর্তি। এগুলোকে ভেঙে ফেলা আবশ্যক। শুধু ইসলামি শরিয়ত মেনে বিয়ে করুন। আপনার জীবন হবে অনাবিল আনন্দে ভরপুর।

চতুর্থ পাঠ
আপনি সুপারিশ করুন। হাড্ডির চেয়ে অন্তর জোড়ানোর প্রতি অধিক মনোযোগী হোন। কেননা তা ভেঙে যাওয়াটাও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। যদি আপনি দুটি মনের মধ্যে মিলন ঘটিয়ে দিতে পারেন তাহলে অমত করবেন না। যদি আপনি পারিবারিক কোনো ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দিতে পারেন তাহলে কালবিলম্ব করবেন না। কারও হাতে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা দ্বারা প্রকৃত মর্যাদা নির্ণিত হয় না। বরং সে মানুষের জন্য কতটুকু এগিয়ে এসেছে তা দেখেই আসল মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়। ডালপালার কারণে বৃক্ষকে মূল্যায়ন করা হয় না, বরং বৃক্ষের ফলের কারণে তাকে মূল্যায়ন করা হয়। পৃষ্ঠার সংখ্যা আর মান দেখে কিতাবের মূল্যায়ন হয় না বরং তাতে লিখিত বাক্যাবলিতেই তা নির্ধারণ হয়। তেমনিভাবে আমলের মাধ্যমে একদল মানুষ অন্যদলের ওপর মর্যাদা লাভ করে থাকে। ইতিহাসে যাঁরা স্থান করে নিয়েছেন তাদের প্রতি লক্ষ করুন, তাদের সকলেই পৃথিবীকে বিভিন্ন জিনিস দিয়েছেন। কেউ কোনো ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। কেউ গ্রন্থ রচনা করেছেন। কেউ যুদ্ধ বন্ধ করেছেন। কেউ রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছেন। সমস্ত মানুষই তো পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। তারা যে সুন্দর জিনিস রেখে যায় শুধু তাই স্থায়ী হয়। তাই কোনো কৃতিত্ব না রেখে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন না।

পঞ্চম পাঠ
কবুল না হওয়ার অজুহাতে সুপারিশ করা থেকে বিরত থাকা যাবে না। চেষ্টা করাটাই যথেষ্ট। যা বাস্তবায়ন হবে শুধু তার জন্যই নয়, বরং আমরা যা করব তারও প্রতিদান পাব। এটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। হাদিসে এসেছে-কেয়ামতের দিন এমনও নবী আসবেন যাঁদের সঙ্গে কোনো উম্মত থাকবে না। আপনার সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করা হলে এটাকে অপমান মনে করবেন না। আপনি যতই উচ্চাসনের অধিকারী হন না কেন, কখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি লক্ষ করুন, তিনি একজন নারীর কাছে সুপারিশ করছেন! যে কি না বাঁদি ছিল! তবুও সে নবীর সুপারিশ কবুল করেনি! তিনি কি এটাকে অপমান মনে করেছিলেন? সুপারিশ করার পর তা রক্ষা না করায় তিনি কি সেই নারীর প্রতিপক্ষ হয়ে গিয়েছিলেন? অহংকার করে সুপারিশের সওয়াব নষ্ট করবেন না।

ষষ্ঠ পাঠ
কল্যাণমূলক কোনো কাজকে হালকা মনে করবেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সবচেয়ে ইবাদতপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। বড় বড় দিনে রোজা রাখতেন। অন্ধকার রাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু তবুও তিনি সুপারিশ করা ছেড়ে দেননি। ব্যস্ততার সময় সংকীর্ণতার অজুহাত পেশ করবেন না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন। আপনি কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়েও বেশি ব্যস্ত মানুষ? ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি উম্মতের নবী ছিলেন। রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। তবুও নগণ্য, সাধারণ মানুষদের জন্য তার কাছে সময় ছিল। স্বামীর জন্য তিনি স্ত্রীর কাছে সুপারিশ করতেন। দাসের জন্য মনিবের কাছে সুপারিশ করতেন। অথচ আমাদের কাছে সাধারণ নগণ্য কেউ এলে আমরা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই!

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫২৮৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px