📄 সাদাকাহ
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘(পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্য থেকে) জনৈক ব্যক্তি বলল, আমি কিছু সাদাকাহ করব। অতঃপর সে সাদাকাহর মাল নিয়ে বের হয়ে (ভুলে) এক চোরের হাতে তুলে দিল। সকালে লোকেরা বলাবলি করতে লাগল-“(কাল রাতে) এক চোরকে সাদাকাহ দেয়া হয়েছে।" তা শুনে দানকারী বলল, "আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনারই জন্য, আজ আমি অবশ্যই সাদাকাহ করব।” এবার সে সাদাকাহ নিয়ে বের হয়ে (না জেনে) এক ব্যভিচারিণীর হাতে দিয়ে এল। সকালে লোকেরা বলাবলি করতে লাগল-“রাতে এক ব্যভিচারিণীকে সাদাকাহ দেয়া হয়েছে।” লোকটি বলল, "আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনারই জন্য, তবুও আমি সাদাকাহ করব।” এরপর সে সাদাকাহ নিয়ে বের হয়ে কোনো এক ধনী ব্যক্তির হাতে তুলে দিল। সকালে লোকেরা বলতে লাগল—“ধনী ব্যক্তিকে সাদাকাহ দেয়া হয়েছে।” লোকটি বলল, “আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনারই জন্য, (আমার সাদাকাহ) চোর, ব্যভিচারিণী ও ধনী ব্যক্তির হাতে গিয়ে পড়ল!” পরে স্বপ্নযোগে তাকে বলা হলো- “চোর তোমার সাদাকাহ পেয়েছে, হয়তো (এ কারণে) সে চুরি করা থেকে বিরত থাকবে; তোমার সাদাকাহ ব্যভিচারিণী পেয়েছে, হয়তো (এ কারণে) সে তার ব্যভিচার থেকে পবিত্র থাকবে; আর ধনী ব্যক্তি তোমার সাদাকাহ পেয়েছে, হয়তো (এ থেকে) সে শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং আল্লাহর দেয়া সম্পদ থেকে সাদাকাহ করবে।” [১]
প্রথম পাঠ
এটা মানুষের চিরাচরিত অভ্যাস-আপনি কোনো মন্দ কাজের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে তারা বলবে, এ তো দেখি কাপুরুষ! দান-সাদাকাহ করলে বলবে, লোক দেখিয়ে বেড়ায়! বিদগ্ধ-বিজ্ঞজনের সঙ্গে ওঠাবসা করলে বলবে, চাটুকারিতা করে! গুনাহে-লিপ্ত-ব্যক্তির সঙ্গে মুসাফাহা করলে বলবে সে তো তারই মতো! স্ত্রীর সঙ্গে ভালো আচরণ করলে বলবে, সে তো একটা গৃহপালিত মেষ-শাবক! তাদের সঙ্গে গুনাহের কাজে লিপ্ত না হলে বলবে, লোকটি রুক্ষ স্বভাবের, একেবারে রসকষহীন! তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঘুষের মতো উপরি উপার্জন গ্রহণ না করলে বলবে, এ তো দেখছি আস্ত বেকুব!
একজন নারী পর্দা করলে তারা বলবে, মেয়েটি আধুনিকতার কিছুই বুঝে না! হিজাব-নিকাবে চেহারা ধেকে রাখলে বলবে, তার চেহারা নিশ্চয় কুৎসিত! স্ত্রী স্বামীর আনুগত্য করলে বলবে, মেয়েটির আত্মমর্যাদাবোধ বলতে কিছু নেই!
আপনি তাই এদিক সেদিক না দেখে, লোকের কথায় কান না দিয়ে নিজের বেছে নেয়া সঠিক পথে অবিচল থাকুন। মানুষকে খুশি করতে নিজেকে সত্য ও সুন্দরের পথ থেকে সরিয়ে নেবেন না। ভালোভাবে যদি মানুষের অবস্থাদি খেয়াল করেন তবে দেখবেন, অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ তাআলার প্রতিই সন্তুষ্ট হতে পারেনি! মানুষের প্রতি আর কীভাবে হবে?
দ্বিতীয় পাঠ
হাতে ধরে ধরে মানুষকে আল্লাহর পথে নিয়ে আসুন! তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিন-বিপথগামী বান্দাদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। মানুষ যদি পুরোপুরি আল্লাহ তাআলার অনুগত হতো, তাহলে তো আর নবী- রাসুলের খুব কোনো প্রয়োজন হতো না। সত্য দ্বীনের পথ ছেড়ে যারা বিচ্যুতির দিকে পা বাড়িয়েছে তাদের জন্যই আল্লাহ তাআলা নবী-রাসুলগণকে পাঠিয়েছেন।
ফিরআউনের মতো দাম্ভিক দুরাচার যখন বলে বসল, ‘অ্যানা রাব্বুকুমুল আ'লা’ - 'আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় প্রভু' [১], আল্লাহ তাআলা তখন তার কাছে মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামকে পাঠিয়ে বলে দিলেন, ‘ফাক্বুলা লাহু ক্বাউলান লাইয়্যিনাল লা'আল্লাহু ইয়াতযাক্কারু আউ ইয়াখশা’ -'আর আপনারা দুজন তার সঙ্গে নম্রভাষায় কথা বলবেন। এতে হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।' [২]
যারা নিজেদের উপাস্য প্রতিমাগুলোকে আল্লাহ তাআলার কন্যা-সন্তান বলার মতো অপরাধ করেছিল তাদের কাছে তিনি সৃষ্টির সেরা ব্যক্তিকে নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন। অতএব মানুষের অপরাধের দিকে এমনভাবে তাকাবেন না যে, আপনিই তাদের পালনকর্তা; বরং এমনভাবে তাকান যে, আপনিও তাদের মতো একজন বান্দা।
হেদায়াতের পথে চলার যে নেয়ামতে আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধন্য করেছেন তার আলোকে মানুষের হাত ধরে ধরে তাদেরকে আল্লাহর দিকে নিয়ে আসুন। নিজের শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে আপনি মানুষকে হেদায়াত দান করতে পারবেন না। বরং আপনি যে হেদায়াতের পথে চলছেন তা আল্লাহ তাআলারই দেয়া অনুদান। একজন বিপদগ্রস্ত মানুষকে আপনি যতটা দয়া ও অনুগ্রহের দৃষ্টিতে দেখে থাকেন, একজন গুনাহগারকে হেদায়াতের পথে আনতে একই দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখুন। আদর্শিক বিচ্যুতির তুলনায় রোগশোক খুবই সামান্য বিষয়। একজন মানুষ শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে এর বিনিময়ে সে সওয়াব অর্জন করে বা গুনাহ থেকে মুক্তি লাভ করে। কিন্তু একজন মানুষের চিন্তা-চেতনা অসুস্থ হয়ে পড়লে, আদর্শিক বিচ্যুতি ঘটলে তার পরিণাম খুবই ভয়াবহ।
তৃতীয় পাঠ
এ কথাতে কোনো ভুল নেই যে, আমাদেরকে মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দেখে বিচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে আপনাকে হতে হবে প্রখর ধী-শক্তিসম্পন্ন চৌকষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। যাতে একজন মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দেখেই আপনি ধোঁকায় পড়ে না যান। এমন অনেক গুনাহগার বান্দা আছে যারা আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ভালোবাসে। আমাদের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধান্ধাবাজ ধর্মব্যবসায়ীদের চাইতে তারা আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বহুগুণ বেশি ভালোবেসে থাকে। তবে শয়তানের কুমন্ত্রণা আর প্রবৃত্তির তাড়নার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে তারা আজ গুনাহের গড্ডালিকায় ভেসে যাচ্ছে।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত- 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে এক লোক ছিল। যার নাম ছিল আবদুল্লাহ আর ডাকনাম হিমার। সে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হাসাত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরাব পান করার অপরাধে তাকে বেত্রাঘাত করেছিলেন। একদিন তাকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় আনা হলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চাবুক মারার আদেশ দিলেন। তাকে চাবুক মারা হলো। তখন তার গোত্রের এক লোক বলল, “হে আল্লাহ! আপনি তার উপর লানত (অভিসম্পাত) বর্ষণ করুন! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাকে কতবার যে আনা হলো!” তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তাকে লানত করো না। আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, সে আল্লাহ এবং তার রাসুলকে ভালোবাসে।” [১]
অন্তর এক গোপন রহস্যের আধার। যার ভেতরের অবস্থা জানেন একমাত্র তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা। যে পর্দা করে না সে তো আর সরাসরি ব্যভিচারিণী নয়। যে গান-বাদ্য শুনে সে তো আর কুরআন তেলাওয়াতকে অপছন্দ করে না। আমি এ কথা বলছি না যে, পাপাচারে লিপ্ত লোকজন গুনাহ করেও নির্দোষ! কিংবা তাদের পক্ষপাতিত্বও করছি না। আমি কেবল বলছি যে, তাদের ফিরে আসার পথ রুদ্ধ নয়। আপনি হাতে ধরে ধরে তাদেরকে আল্লাহর পথে নিয়ে আসুন।
চতুর্থ পাঠ
আমরা যদি মানুষের সঙ্গে বিনম্র আচরণে অভ্যস্ত হতে না পারি তবে মানুষের সামনে দ্বীনদারদের যে রুক্ষ ও মন্দ চিত্র দাঁড়াবে তার জন্য আমরাই দায়ী থাকব। এতে তারা হয়তো গুনাহের পথ ছেড়ে আমাদের মতো এমন কাঠখোট্টা ধার্মিক হওয়ার পথ ধরতে চাইবে না। আমরা যদি মানুষের জন্য আদর্শ হয়ে উঠতে না পারি তাহলে মানুষকে দোষারোপ করাও আমাদের উচিত হবে না। কারণ, তারা নিশ্চয়ই আমাদের মতো দ্বীনদার হতে চায় না। অতএব সৃষ্টির ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে আমরা যেন আবার আল্লাহ তাআলাকে ক্রুদ্ধ না করে বসি!
নিয়মিত নামাজি ব্যক্তির সামান্য মুসাফাহা একজন বেনামাজিকে মসজিদে আনতে পারে। পর্দাশীলা নারীর একটু মুচকি হাসি এবং মিষ্টি কথা একজন পর্দাহীনা নারীকে হিজাব-নিকাবের পথে আনতে পারে। একজন অনুগত বান্দার একটু সুমিষ্ট কথা আল্লাহর অবাধ্য বান্দাকে আনুগত্যের পথে টানতে পারে। যদি আপনার সদাচরণে অন্যের মধ্যে এইসব পরিবর্তন নাও ঘটে তাহলেও আপনি কমপক্ষে দাওয়াতের সওয়াব তো পেয়েই যাবেন (ইনশাআল্লাহ)।
হাদিসে উল্লেখিত ব্যক্তিটি যথাক্রমে একজন চোর, ব্যভিচারিণী ও (কৃপণ) ধনীকে সাদাকাহ দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তো তাকে এ কথা বলেননি—'যদি তুমি কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে সাদাকাহ করতে তাহলে তা অধিক ফলপ্রসূ হতো। যদি তুমি কোনো সতী-সাধ্বী নারীকে সাদাকাহ করতে তাহলে তা অধিক উত্তম হতো। যদি তুমি কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে সাদাকাহ করতে তাহলে তা অধিক উপকারী হতো!' বরং (স্বপ্নযোগে) তাকে বলা হয়েছে—আল্লাহ তার সাদাকাহ কবুল করেছেন। আর আমল কবুল হওয়ার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তার আমল কবুল হওয়ার কারণে চোর হয়তো চৌর্যবৃত্তি ছেড়ে দেবে। ব্যভিচারিণী নারী হয়তো ব্যভিচার ছেড়ে দেবে। (কৃপণ) ধনী লোকটি হয়তো তার অনুসরণ করবে (অর্থাৎ নিজের মাল থেকে দান-সাদাকাহ করতে শুরু করবে)।
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪২১
[১] সূরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম : ২৪
[২] সুরা ত্ব-হা, আয়াত-ক্রম: ৪৪
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৭৮০
📄 ইবাদতপ্রাণ জুরাইজ
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'জুরাইজ ছিলেন একজন ইবাদতপ্রাণ ব্যক্তি। তিনি একটি ইবাদতখানা তৈরি করে সেখানে অবস্থান করতেন। একদিন তার কাছে তার মা এলেন। তিনি তখন নামাজে নিমগ্ন ছিলেন। মা ডাকলেন, “হে জুরাইজ!” তখন তিনি (মনে মনে) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! (একদিকে) আমার মা আর (অন্যদিকে) আমার নামাজ। এই বলে তিনি নামাজেই নিমগ্ন রইলেন। (ডাকে সাড়া না পেয়ে) মা ফিরে গেলেন। পরের দিন তিনি আবার এলেন। জুরাইজ সেদিনও নামাজ আদায় করছিলেন। মা ডাকলেন, “হে জুরাইজ!” আজও তিনি (মনে মনে) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! একদিকে আমার মা (আমাকে ডাকছেন) আর (অন্য দিকে) আমার নামাজ। এরপর তিনি নামাজেই মশগুল রইলেন। মা ফিরে গেলেন। পরের দিন আবার এলেন। সেদিনও তিনি নামাজে নিমগ্ন ছিলেন। এবারও (মা) ডাকলেন, “হে জুরাইজ!” তিনি (মনে মনে) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! (একদিকে) আমার মা (আমাকে ডাকছেন), (অন্যদিকে) আমার নামাজ। এরপর তিনি নামাজেই নিমগ্ন রইলেন। বিরক্ত হয়ে এবার তার মা বদদুআ করলেন, “হে আল্লাহ! দুশ্চরিত্রা নারীর সম্মুখীন করার আগ পর্যন্ত তুমি তার মৃত্যু দিয়ো না।”
এরপর বনি ইসরাইলের মধ্যে জুরাইজ ও তার ইবাদত সম্পর্কে আলোচনা হতে লাগল। সেখানে (বনি ইসরাইলের মধ্যে) এক দুশ্চরিত্রা নারী ছিল যার সৌন্দর্যের উপমা দেয়া হতো। সে বলল, “যদি তোমরা চাও তাহলে আমি তোমাদের সামনে তাকে (জুরাইজকে) ফিতনায় ফেলতে পারি।” এরপর সে জুরাইজের সামনে নিজেকে মেলে ধরল। কিন্তু জুরাইজ তার প্রতি ভ্রুক্ষেপও করলেন না। অবশেষে সে এক মেষ-রাখালের কাছে গেল। লোকটি জুরাইজের ইবাদতখানার পাশ দিয়ে আসা-যাওয়া করত। দুশ্চরিত্রা নারী তাকে নিজের দিকে প্রলুব্ধ করল। ফলে সে তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে (অপকর্মে জড়িয়ে পড়ল)। এতে নারীটি গর্ভবতী হয়ে গেল। যখন সে সন্তান প্রসব করল তখন বলে দিল যে, এ সন্তান জুরাইজের। লোকেরা (এ কথা শুনে) জুরাইজের কাছে এসে জড়ো হলো এবং তাকে ইবাদতখানা বেরিয়ে আসতে থেকে বাধ্য করল। তারা তার ইবাদতখানা ভেঙে তাকে বেদম প্রহার করতে আরম্ভ করল। তিনি জানতে চাইলেন, “হয়েছেটা কী, (তোমরা আমাকে এভাবে মারছ কেন)?” তারা বলল, “তুমি তো এ দুশ্চরিত্রা নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করেছ এবং তোমার ঔরসে সে সন্তানও প্রসব করেছে।” তখন তিনি বললেন, “শিশুটি কোথায়?” তারা শিশুটিকে নিয়ে এল। এরপর তিনি বললেন, “আমাকে একটু সুযোগ দাও, আমি নামাজ আদায় করে নিই।” তারপর তিনি নামাজ আদায় করলেন। নামাজ-শেষে শিশুটির কাছে এসে তার পেটে টোকা দিয়ে বললেন, “বেটা! তোমার পিতা কে?” (কুদরতের ফায়সালায় সঙ্গে সঙ্গে) শিশুটি উত্তর করল, “অমুক রাখাল।” বর্ণনাকারী বলেন, তখন লোকেরা জুরাইজের দিকে এগিয়ে এল এবং তাকে চুম্বন করতে লাগল আর তার গায়ে হাত বুলাতে লাগল। বলতে লাগল, “আমরা আপনার ইবাদতখানা স্বর্ণ দ্বারা নির্মাণ করে দেবো।” তিনি বললেন, “না, বরং পুনরায় মাটি দিয়ে তৈরি করে দাও, পূর্বে যেমন ছিল।” লোকেরা তাই করল।' [১]
প্রথম পাঠ
অনেক সময় কথার দ্বারা মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ মুখে একটা কথা বলল আর তা কবুল হয়ে গেল। তাই সন্তানদের বিরুদ্ধে কখনো বদদুআ করা যাবে না। কেননা এ বদদুআ এমন সময় হয়ে যেতে পারে যখন দুআ কবুল হয়ে থাকে। একবার উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এক বৃদ্ধকে দেখলেন যে, তার হাত অবশ হয়ে গেছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার হাতে কী হয়েছে? লোকটি বলল, জাহেলি যুগে আমার পিতা আমার হাত অবশ হয়ে যাবার জন্য বদদুআ করেছিলেন তাই তা অবশ হয়ে গেছে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহু আকবার! জাহেলি যুগের পূর্বপুরুষদের বদদুআ ইসলামে আসার পরও কীভাবে কার্যকর হয়ে গেল! [২]
চলুন আমরা বদদুআর পরিবর্তে কল্যাণ কামনা করে দুআ করি। কী আশ্চর্যের কথা-একটি মেয়ে সামান্য একটি পাত্র ভেঙে ফেললে আমরা অবলীলায় বলে উঠি, আল্লাহ তোমার অন্তর ভেঙে দিক! কথাটি যদি দুআ কবুলের সময় বলা হয় তাহলে কী অবস্থাটা হবে! সামান্য এক পাত্র কি একটি অন্তরের সমান হতে পারে? এমন বদদুআ না করে আমরা কি এ কথা বলতে পারি না যে, আল্লাহ তোমাকে সংশোধন করে দিন?
ভাইবোন পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলে কোনো কোনো মা রাগান্বিত হয়ে বলে ফেলেন—আল্লাহ তোমাদের থেকে যেন এসবের প্রতিশোধ নেন! কথাটি যদি দুআ কবুলের সময় বলা হয়ে থাকে, তাহলে কেমন হবে? আমাদের সন্তানরা কি আল্লাহ তাআলার প্রতিশোধ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে? আমরা যদি বলতাম— আল্লাহ তোমাদের উভয়কে সংশোধন করে দিন, তাহলে কী এমন সমস্যা হতো! চলুন, 'আল্লাহ তোমাকে অন্ধ করে দিন' এ কথা না বলে বলি—'আল্লাহ তোমার হৃদয়কে প্রশস্ত করে দিন।' 'আল্লাহ তোমার ওপর রাগান্বিত হোন' এ কথা না বলে বলি—'আল্লাহ তোমাকে সঠিক বুঝ দান করুন।' চলুন, সন্তানদের ধ্বংস করার পূর্বে প্রথমে নিজের মুখখানি একটু সংশোধন করে নিই।
দ্বিতীয় পাঠ
সাধারণভাবে একজন মানুষ চায়, অন্যরাও তার মতো হয়ে যাক। ব্যভিচারী লোকের আকাঙ্ক্ষা থাকে—সকল মানুষ যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হতো! পুরুষালি স্বভাবের নারীদের আকাঙ্ক্ষা থাকে—যদি সকল নারীই তাদের মতো পুরুষের ভঙ্গিমা গ্রহণ করত! চোরদের আকাঙ্ক্ষা থাকে—সকল মানুষ যদি চুরি করত! এ কারণেই হকপন্থীদের সদাচারে বাতিলপন্থীরা সবসময় ব্যাপক অস্বস্তি বোধ করে। একজন বিশ্বস্ত লোক নিয়োগ করা মানেই চোরদের চেহারায় চপেটাঘাত করা। একজন সচ্চরিত্রবান ব্যক্তির আবির্ভাব ব্যভিচারীদের মধ্যে পিঠের চামড়া তুলে ফেলার মতো আঘাত তৈরি করে। একজন ভদ্র কর্মচারীর ব্যক্তিত্ব ঘুষখোর কর্মচারীদের মনে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি করে। আর হকপন্থীরা সবসময় বাতিলপন্থীদের ভুলত্রুটির সমালোচনা করে থাকে। এ কারণেই বাতিলপন্থীরা চায়, হকপন্থীরা সবাই যেন তাদের মতো হয়ে যায়।
ইবাদতপ্রাণ জুরাইজ রহমতুল্লাহি আলাইহি'র ইবাদত বনি ইসরাইলের পাপিষ্ঠ লোকজনকে একধরনের অস্থিরতার ভেতর ঠেলে দিয়েছিল। তাই জুরাইজকে তারা তাদের মতো বানানোর জন্য তার কাছে ব্যভিচারিণী পাঠিয়ে দেয়। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর তাওহিদি ইয়াকিন তথা একত্ববাদের ঘোষণা তৎকালীন পৌত্তলিকদের তটস্থ করে রেখেছিল। তিনি তাদের মতো হতে অস্বীকৃতি জানানোয় তারা তাকে আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। লুত আলাইহিস সালাম-এর সঠিক পন্থা তার সম্প্রদায়ের সমকামী লোকদেরকে ভীত করে তুলেছিল। ফলে তারা বলেছিল— ‘লুত-পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা শুধু পুতঃপবিত্র সাজতে চায়’।[১]
তৃতীয় পাঠ
মুমিন ব্যক্তি কোনো বিপদের গন্ধ পেলে সঙ্গে সঙ্গেই নামাজের দিকে ধাবিত হয়। কেননা সে জানে, পৃথিবীর সকল সমস্যার সমাধান আকাশে (আল্লাহ তাআলার কাছে)। জুরাইজ এর ওপর একসঙ্গে কতগুলো বিপদ আপতিত হয়েছে! ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া হয়েছে, লোকজন অন্যের সন্তানকে অবৈধভাবে তার সন্তান বলে দাবি করেছে। কিন্তু জবাবে তিনি বলেছেন, আমাকে একটু সুযোগ দাও, আমি নামাজ পড়ে নিই। মাত্র দুরাকাত নামাজের মাধ্যমে আসমান-জমিনের সকল চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছেন। দুধের শিশু তার তাকওয়া, নিষ্কলুষতা ও নির্দোষ হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছে! খুবাইব ইবনে আদি রাদিয়াল্লাহু আনহু। কুরাইশরা তাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। তারা তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে তিনি বলেন, আমাকে একটু নামাজ আদায় করার সুযোগ দাও।[২] তিনি জানতেন জীবনের অন্তিম মুহূর্তে সবচেয়ে উত্তম জিনিস হলো নামাজ। গোটা মানবজাতির সরদার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথাই ধরুন না! নামাজের সময় হলে তিনি বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতেন, 'বিলাল, আমাদেরকে একটু প্রশান্তি দাও।'[১]
একদল বলে নামাজের মাধ্যমে আমাদেরকে একটু প্রশান্তি এনে দাও। আরেকদল বলে নামাজের আহ্বান থেকে আমাদেরকে একটু প্রশান্তি দাও। অর্থাৎ নামাজের জন্য ডেকো না। দুই দলের মধ্যে কত ব্যবধান!
চতুর্থ পাঠ
যথাযথ তথ্য ও প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগকে শুরুতেই সত্য মনে করবেন না। অন্যের ওপর অপবাদ আরোপ করা মানুষের চিরাচরিত স্বভাব। তাই সরাসরি প্রত্যক্ষ না করে কারও প্রতি অবিচার করবেন না। অমুক-তমুকের কথায় কান দিয়ে কোনো নারীর ইজ্জত-আব্রু নিয়ে আলোচনা করবেন না। মনে রাখবেন, হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— 'কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে কোনো কথা শোনামাত্রই (যাচাই না করে) বলে বেড়ায়।'[২]
মানুষ মানেই যশ-খ্যাতি। তাই কারও যশ-খ্যাতি হরণ করাটা তার রক্ত ঝরানোর সমতুল্য। যদি আপনি সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে কোনো অপরাধের কথা জানতে পারেন তাহলে হাদিসের এই বাণী স্মরণ করুন- 'আল্লাহ তাআলা দোষ গোপনকারী। দোষ গোপন করাকে তিনি বিশেষ পছন্দ করেন।'[৩] বিশেষ প্রয়োজন না হলে কারও দোষ প্রকাশ করবেন না। পক্ষান্তরে যদি আপনার কাছে উপদেশ চাওয়া হয় তাহলে জানা সত্ত্বেও উপদেশ না দেওয়াটা হবে প্রতারণা। মনে রাখবেন, দোষ-ত্রুটি গোপন করা এক বিষয় আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তির কারণে সতী-সাধ্বী নারীকে বিপদে ফেলা বা পাপাচারিণী নারীর কারণে কোনো নেককার পুরুষকে বিপদে ফেলা ভিন্ন বিষয়।
পঞ্চম পাঠ
আপনি আল্লাহর সঙ্গে থাকুন, আল্লাহ আপনার সঙ্গে থাকবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে রাতের আঁধারে চুপিসারে বেরিয়েছিলেন। পরে যখন ফিরে এসেছেন তখন দিনের উজ্জ্বল আলোয় বিশাল বাহিনী সমেত সদর্পে প্রবেশ করেছেন। ইউসুফ আলাইহিস সালাম মাজলুম হয়ে কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন, আর বের হয়েছেন মিশরের শাসক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে। এবং শাসক হয়েছেনও। আসহাবে কাহফের যুবকদল দ্বীন রক্ষার জন্য পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশ থেকে বিতাড়িত অবস্থায় আল্লাহ তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে গোটা দেশকে তারা নিজেদের অনুসারী হিসেবে পেয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা না চাইলে মানুষের পক্ষে কারও ক্ষতি করা অসম্ভব। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা না হলে কেউ কারও উপকারও করতে পারে না। যে নিজের রুটি-রুজির ব্যবস্থাই নিজে করতে পারে না তার পক্ষে অন্যের রিজিকের ব্যবস্থা করা কখনোই সম্ভব নয়। এমনি যার নিজের মৃত্যুর ওপর নিজেরই কোনোরকম দখল নেই তার কাছে জীবনের মিনতি করা বড় ধরনের বোকামি। তাই আপনি বরং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলুন।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৫৫০; সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম : ৩৪৩৬
[২] ইবনু হাজার আসকালানি, আল-ইসাবাহ, ৬/২৪৬
[১] সুরা নামল, আয়াত-ক্রম: ৫৬
[২] ইবনু আবদিল বার, আল-ইসতিআব, ২/৪৪০
[১] মুসনাদু আহমাদ, ২৩০৮৮। সনদ সহিহ।
[২] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৪৯৯২। সনদ সহিহ।
[৩] বায়হাকি, সুনানুল কুবরা, ৭/১৫৭ [১৩৫৫৯]। সহিহ লিগাইরিহি।
📄 আসিয়া বিনতে মুযাহিম
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- ‘ফিরআউন তার স্ত্রীর হাতপায়ে চারটি পেরেক মেরেছিল। ফিরআউনের লোকেরা চলে গেলে ফেরেশতারা এসে তার উপর ছায়া মেলে দিলেন। তখন তিনি বললেন- "হে আমার রব! জান্নাতে আপনার কাছাকাছি একটি ঘর আমার জন্য নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং জালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন। [১] তখন তাকে জান্নাতে নির্মিত তার বাড়িটি দেখানো হয়। [২]
প্রথম পাঠ
শত্রুর ঘর থেকেই আল্লাহ তাআলা শত্রুর বিরুদ্ধে যোদ্ধা তৈরি করেন। যে বলেছিল, ‘অ্যানা রাব্বুকুমুল আ'লা' - 'আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় প্রভু' [১], তার প্রাসাদ থেকেই নবী (মুসা আলাইহিস সালাম) বের হয়েছেন। তার শয়ন-কক্ষ থেকেই উঠে এসেছেন ইতিহাসের এক মহীয়সী নারী। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন-প্রকৃতপক্ষে সে কত দুর্বল। একজন মুসার খুঁজে হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করেছে, তবুও তাকে পায়নি। অথচ তার চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই মুসা আলাইহিস সালাম তারই প্রাসাদে লালিত-পালিত হয়েছেন। হাজার হাজার নারী যে ফিরআউনকে সিজদা করত বাধ্য হয়ে সে নিজের স্ত্রীর কাছেই অক্ষম ও অধম বলে প্রমাণিত হলো। কারণ, অন্তরের নিয়ন্ত্রণ আল্লাহ তাআলার হাতে। মানুষ তো কেবল রক্ত-মাংসের দেহের ওপর ক্ষমতা রাখে।
দ্বিতীয় পাঠ
চিন্তা-চেতনা ও সত্য-অনুধাবনে রিক্তহস্ত এই জ্ঞানপাপীরা মনে করে-ধর্ম হলো আফিম। এটি এক নেশা। কপর্দকহীন-নিঃস্ব লোকজন একে আঁকড়ে ধরে জীবন কাটিয়ে দেয়। একজন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যেমন নিরাশায় আলোর ঝলক ভেবে মরুভূমিতে মরীচিকার পেছনে দৌড়ে যায় তেমনিভাবে এরা জান্নাতের আশায় বেঁচে থাকে।
অথচ আসিয়া বিনতে মুযাহিম ছিলেন মিশরের রানি। মিশর-সম্রাটের স্ত্রী। প্রবল প্রতাপ দেখে পথভ্রষ্ট লোকজন আল্লাহকে বাদ দিয়ে যে ব্যক্তির উপাসনা করত, তিনি তার স্ত্রী। তিনি (আসিয়া) আদেশ করা মাত্রই তা বাস্তবায়ন করা হতো। কাউকে ডাকলে তৎক্ষণাত ছুটে আসত। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য জান্নাতের নহর পাবার আশায় তিনি ঈমান গ্রহণ করেননি। ক্ষুধা মেটানোর জন্য জান্নাতের ফলফলাদি লাভের আশায় তিনি ঈমান গ্রহণ করেননি। দুনিয়ার বাড়িঘর সংকীর্ণ বলে জান্নাতের বালাখানার প্রত্যাশা করেননি। তিনি তো বিশাল প্রাসাদের, ঐতিহাসিক শহরের আর দেশের সকল মানুষের রানি ছিলেন। তিনি জানতেন আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা উত্তম এবং চিরস্থায়ী। অন্তরের প্রাচুর্যই আসল ঐশ্বর্য। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভই প্রকৃত সম্পদ। জান্নাতের তুলনায় দুনিয়ার সকল ঘরই অতি সংকীর্ণ। সব জেনেবুঝে স্বামী ফিরআউনকে যেন তিনি এ কথাই বলেছিলেন যে, তোমার মালিকানাধীন সবকিছু তুমি নিয়ে যাও আর আমাকে আমার রবের জন্য ছেড়ে দাও।
তৃতীয় পাঠ
ঈমান এক আশ্চর্য শক্তি। বিশ্বজুড়ে ইসলামের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ার পর একবার বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু- কে জিজ্ঞাসা করা হলো, উমাইয়া ইবনে খলাফের শাস্তির মুখে আপনি কীভাবে ধৈর্যধারণ করতেন? তিনি বলেন, নির্মম শাস্তির মুখে আমি ঈমানের স্বাদ অনুভব করে ধৈর্যধারণ করতাম। ঈমান এক আশ্চর্য শক্তি। কারও অন্তরে তা স্থান গেড়ে নিলে এটা তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়।
তর্কের খাতিরে বলা যায় যে, বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু'র পক্ষে এভাবে ধৈর্য ধারণ খুব বেশি আশ্চর্যের কিছু নয়। কারণ, বিলাল তো একজন পুরুষ। আর দৈহিকভাবে নারীর তুলনায় পুরুষ অধিক শক্তিশালী হয়ে থাকে। তাছাড়া তিনি তো ইতিপূর্বে একজন দাস ছিলেন। কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ করার অভ্যাস তার আগে থেকেই ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো একজন নারী, যিনি মান-সম্মান ও নেয়ামতের রাজ্যে বেড়ে উঠেছেন, তিনি এমন শাস্তির মুখে কীভাবে ধৈর্যধারণ করলেন! একটি কাষ্ঠ- খণ্ডে রেখে ফিরআউন তার হাত-পায়ে পেরেক মেরেছিল। সেসময় তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অবিচল; কুঠার দ্বারা যে পাহাড়ের পাথর কেটে নেওয়া হলেও সে ক্রন্দন করে না। তিনি যেন তখন এক বিশালকায় বৃক্ষ; করাতের ধারালো দাঁত দ্বারা যাকে কাটা হলেও আর্তনাদ করে না। পৃথিবীতে তার কোমল দেহকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। আর তার ঈমানে-অবিচল অন্তর ঊর্ধ্বাকাশে উড়ে বেড়াচ্ছিল। যতক্ষণ দেহে প্রাণ ছিল, ঠোঁটের কোণে তার মুচকি হাসি লেগে ছিল। যেমনটা ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে। ফিরআউন এতে পাগল হয়ে যায়। সে বলতে থাকে— এ দেখি শাস্তির খড়গে পড়েও হাসচ্ছে! সে তো আর জানত না—তিনি জান্নাতের যে বাড়ির আবেদন করেছেন আল্লাহ তাকে সে বাড়ি দেখিয়ে দিয়েছেন।
fourth পাঠ
আল্লাহ তাআলা তাকে ফিরআউনের শাস্তির হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম ছিলেন। যিনি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ফেরেশতা পাঠিয়েছেন তিনি চাইলে তাকে মুক্তির জন্যও ফেরেশতা পাঠাতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে পরীক্ষার জায়গা বানিয়েছেন। ঈমান ও আমলের প্রকৃত ভোগের জায়গা বানাননি। আসিয়া পরকালের ফসলের আশায় দুনিয়াতে (ঈমান ও আমলের) বীজ বপন করে গিয়েছেন। আর আল্লাহ তাআলাও তার ফল ও ফসলকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা করেছেন।
তাই মুমিনদের ওপর কোনো শাস্তি নেমে এলে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কোনোরকম মন্দ ধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাকুন। যেমনটা বোকার দল বলে থাকে। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে বাতিলপন্থীকে জয়ী হতে দেখলে বলে—আল্লাহ কোথায় গেলেন! দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা কিছু মানুষকে অন্যদের ওপর ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন। এটি তার কোনো অক্ষমতা নয়; বরং জালেমদেরকে তিনি সামান্য সুযোগ দিয়ে রেখেছেন মাত্র। আর এই সুযোগ প্রদানের অর্থ এই না যে, আল্লাহ তাআলার বাহিনী ক্ষুদ্র। বা তাতে সৈন্য-স্বল্পতা রয়েছে। বরং মূল বিষয় হলো, তিনি দুনিয়ার জীবনকে পরীক্ষাক্ষেত্র বানিয়েছেন। এখানে জালেমের যদি জুলুম করার স্বাধীনতা না থাকে তাহলে সে পরীক্ষায় ফেল করবেই-বা কীভাবে? আবার ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির যদি ইনসাফের স্বাধীনতা না থাকে তাহলে সে কীভাবে সফল হবে? স্বাধীনতা না থাকলে আল্লাহ তাআলার অনুগত হয়ে জান্নাতেই-বা যাবে কীভাবে? অর্থাৎ স্বাধীনতা পেয়েও যারা আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে বিলিন করে দেবে, প্রথম সুযোগে জান্নাত তো তাদের জন্যই। এই পথে নুহ আলাইহিস সালাম দীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর কষ্ট করেছেন। ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-কে করাত দ্বারা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। আর ইসমাইল আলাইহিস সালাম-কে জবাই করার জন্য ধারালো ছুরির নিচে শোয়ানো হয়েছে। নিশ্চয়ই জান্নাত অত্যন্ত মূল্যবান।
পঞ্চম পাঠ
যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারে সে মানুষের সঙ্গে ওয়াদা রক্ষা করবে, কস্মিনকালেও এমনটা ভাবতে যাবেন না। ফিরআউন আসিয়া বিনতে মুযাহিমের সঙ্গে ঘর-সংসার না করে, তার স্বভাব চরিত্র না জেনেই তাকে শূলীতে চড়িয়েছিল এমনটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। তার প্রতি তার স্ত্রীর যথাযথ ভালোবাসা, অনুরাগ ও যত্ন-আত্তি থাকা স্বত্ত্বেও সে তাকে শূলীতে চড়িয়েছিল। কারণ, সে তো আল্লাহ-প্রদত্ত ইহসানের প্রতিই লক্ষ রাখেনি। মানুষের ভালোবাসা ও ইহসানের বদলা সে কীভাবে দেবে? বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু কয়েক বছর উমাইয়া ইবনে খলফের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন। কিন্তু কঠোর শাস্তি দেওয়ার সময়ও সে তার প্রতি লক্ষ রাখেনি। কারণ গোলামের ওপর জুলুম করার পূর্বে সে আল্লাহর (বিধানের) সঙ্গে জুলুম করেছে।
জনৈক মনীষী চমৎকার কথা বলেছেন, 'যে আল্লাহকে ভয় করে না তুমি তাকে ভয় করো!' যে আল্লাহর শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ রাখে না, তার কাছে তুমি শিষ্টাচার আশা কোরো না। যে আল্লাহর হকই আদায় করে না সে মানুষের হক কীভাবে আদায় করতে পারে! এ কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'যখন তোমাদের কাছে এমন কোনো পাত্র মিলে যায় যার দ্বীন, ধর্ম ও আচার-আচরণ তোমাদের পছন্দ হয় তাহলে তোমরা তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দাও। তা না করলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়বে।’[১] কারণ, যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করা, সে অবশ্যই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিকেও (বৈধভাবে) সন্তুষ্ট রাখবে। তাই মুত্তাকি ও পরহেজগার পাত্র ছাড়া অন্যত্র মেয়ে বিয়ে দেবেন না। সে যদি তাকে ভালোবাসে তাহলে অবশ্যই তার সম্মান করবে আর যদি তাকে নাও ভালোবাসে তাহলে তাকে অন্তত অপমান করবে না।
টিকাঃ
[১] সুরা তাহরিম, আয়াত-ক্রম : ১১
[২] মুসনাদু আবি ইয়া'লা, ১১/৩১৬ [৬৪৩১]; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৯/২২১। সনদ সহিহ।
[১] সুরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম : ২৪
[১] সুনানু তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ১০৮৫। সনদ হাসান।
📄 দ্বীন এবং সঠিক পন্থা
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তির কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন—
'বনি ইসরাইলের জনৈক ব্যক্তি স্বগোত্রীয় আরেক ব্যক্তির কাছে একহাজার দিনার ঋণ চাইল। সে ঋণদাতা বলল, “কয়েকজন সাক্ষী আনো, আমি তাদেরকে সাক্ষী রাখব।” ঋণগ্রহীতা বলল, "সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।” ঋণদাতা বলল, "তা হলে একজন জামিনদার উপস্থিত করো।” ঋণগ্রহীতা বলল, “জামিনদার হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।” ঋণদাতা বলল, “তুমি সত্যই বলেছ।” এরপর নির্ধারিত সময়ে পরিশোধের শর্তে তাকে এক হাজার দিনার দিয়ে দিল। তারপর ঋণগ্রহীতা নৌপথে সফর করে নিজ প্রয়োজন সমাধা করল। অতঃপর যানবাহন খুঁজতে লাগল, যাতে নির্ধারিত সময়ের ভেতর ঋণদাতার কাছে পৌঁছতে পারে। কিন্তু কোনো যানবাহন সে পেল না। উপায়ান্তর না দেখে এক টুকরো কাঠ নিয়ে তা ছিদ্র করল এবং ঋণদাতার নামে একখানা পত্র লিখল। অতঃপর চিঠিসহ এক হাজার দিনার তার মধ্যে ভরে ছিদ্রটি বন্ধ করে সমুদ্র-তীরে এসে বলল, “হে আল্লাহ! তুমি তো জানো আমি অমুকের কাছে এক হাজার দিনার ঋণ চাইলে সে আমার কাছে জামিনদার চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম জামিন হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। এতে সে রাজি হয়। তারপর সে আমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিল, আমি বলেছিলাম সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট, তাতে সে রাজি হয়ে যায়। আমি তার ঋণ (যথাসময়ে) পরিশোধের উদ্দেশে যানবাহনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, কিন্তু পাইনি। তাই আমি তোমার কাছে সোপর্দ করলাম।” এই বলে সে কাষ্ঠখণ্ডটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে দিল। আর কাষ্ঠখণ্ডটি সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে গেল। অতঃপর লোকটি ফিরে গেল এবং নিজের শহরে যাওয়ার জন্য যানবাহন খুঁজতে লাগল।
ওদিকে ঋণদাতা এই আশায় সমুদ্র-তীরে গেল যে, হয়তো-বা ঋণগ্রহীতা কোনো নৌযানে করে তার মাল নিয়ে এসেছে। তার দৃষ্টি কাষ্ঠখণ্ডটির উপর পড়ল, যার ভেতরে মাল ছিল। সে কাষ্ঠখণ্ডটি তার পরিবারের জ্বালানির জন্য বাড়ি নিয়ে গেল। যখন সে তা ছিঁড়ল, তখন মাল ও পত্রটি পেয়ে গেল। কিছুদিন পর ঋণগ্রহীতা এক হাজার দিনার নিয়ে এসে হাজির হলো এবং বলল, “আল্লাহর কসম! আমি আপনার মাল যথাসময়ে পৌঁছিয়ে দেয়ার উদ্দেশে সবসময় যানবাহনের খুঁজে ছিলাম। কিন্তু আমি যে নৌযানে এখন আসলাম, তার আগে আর কোনো নৌযান পাইনি।” ঋণদাতা বলল, “তুমি কি আমার কাছে কিছু পাঠিয়েছিলে?” ঋণগ্রহীতা বলল, “আমি তো তোমাকে বললামই যে, এর আগে আর কোনো নৌযান আমি পাইনি।” সে বলল, “তুমি কাঠের টুকরোর ভেতরে যা পাঠিয়েছিলে, তা আল্লাহ তোমার পক্ষ থেকে আমাকে আদায় করে দিয়েছেন।” ঋণগ্রহীতা তখন আনন্দচিত্তে এক হাজার দিনার নিয়ে ফিরে গেল।'[১]
প্রথম পাঠ
মানুষ মানুষের জন্য। বর্ণিত আছে যে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে দুআ করতে শুনলেন, সে বলছে, 'হে আল্লাহ, আপনি কোনো সৃষ্টির কাছে আমার কোনো প্রয়োজন রাখবেন না।' উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আমি তো দেখছি তুমি মৃত্যু কামনা করে দুআ করছ!' বাহ্যিকভাবে মানুষ একে অন্যের কাছে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। যে আপনার কাছে কিছু চায় সে তো আপনার মধ্যে কল্যাণ আছে বলেই চায়। অন্যের প্রতি সুধারণ পোষণ করা আভিজাত্যেরই পরিচায়ক। মানুষের ধন-সম্পদই একমাত্র দানযোগ্য বস্তু নয়। হ্যাঁ, অধিকাংশ সময় ধন-সম্পদই বেশি প্রয়োজন হয়ে থাকে। শুধু ধন-সম্পদই নয়, বরং প্রতিটি বস্তু ও বিষয়েরই জাকাত রয়েছে। প্রাচুর্যের জাকাত হলো—দরিদ্রদের উপর দয়া করা। ইলমের জাকাত হলো—কেউ তা তলব করুক বা না-করুক কারও কাছেই তা গোপন না করা। বুদ্ধি-বিবেচনার জাকাত হলো—কারও প্রয়োজন হলে তাকে সদুপদেশ দেওয়া। শরীরের জাকাত হলো—কোনো খোঁড়া ব্যক্তিকে আগলে নিয়ে যাওয়া কিংবা কোনো অন্ধকে পথ পার করে দেওয়া ইত্যাদি।
দ্বিতীয় পাঠ
যে সৎ উদ্দেশ্য অন্যের মাল গ্রহণ করে আল্লাহ তাআলা তাকে তা পরিশোধ করার সুযোগ দান করেন। আর যে আত্মসাৎ করার জন্য অন্যের মাল নিয়ে নেয় আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে দেন। সৎকর্ম ছেড়ে ভিন্ন পথে চলার থেকে নির্বুদ্ধিতা আর হতে পারে না। আবার মন্দের বিনিময়ে ভালো আচরণও কখনো কখনো চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক হয়ে ওঠে। তবে এটাও লক্ষ রাখতে হবে যে আপনার মাধ্যমে যেন ভালো কাজগুলো মিটতে না থাকে। অনেকেই এখন আর অভাবী লোকজনকে ঋণ দেয় না। কারণ, ইতিমধ্যে বহু মানুষ তার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চম্পট দিয়েছে। অনেকেই অত্যধিক পরিমাণ মোহর নির্ধারণ ছাড়া মেয়ে বিয়ে দেন না। কারণ, তারা মনে করেন যে, অল্প মোহরানায় মেয়ে বিয়ে দিলে মেয়েটিকে সস্তা মনে হয়। বহু মানুষ রয়েছে, যারা পঙ্গু-ভিক্ষুকদের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করে না। কেননা এইসব পঙ্গু-ভিক্ষুক অনেক সময় ধোঁকাবাজ হয়ে থাকে। আমাদের বাপ-দাদারা চমৎকার একটি কথা বলতেন, ‘তুমি ধোঁকাবাজ হলেও তোমাকে যে বিশ্বাস করে তাকে অন্তত ধোঁকা দিয়ো না।’
তৃতীয় পাঠ
এই ঘটনায় কাকে দেখে আপনি আশ্চর্য হবেন—তা নির্ণয় করা মুশকিল; যে ব্যক্তি এটা মেনে নিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলাই তার ঋণপ্রদানের সাক্ষী এবং জামিন সেই ব্যক্তি, নাকি ঐ ব্যক্তি যে ওয়াদা ভঙ্গ হওয়ার ভয়ে হাজার দিনারকে সমুদ্রে ভাসিয়ে বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে? একেই বলে সত্যিকারের আভিজাত্য। একজন অভিজাত ব্যক্তি কোনো সাক্ষী এবং জামিন ছাড়াই ঋণ দিয়ে দিচ্ছে। আরেকজন অভিজাত ব্যক্তি এক টুকরো কাঠে ভরে ঋণ পরিশোধ করার শেষ চেষ্টা করছে।
চতুর্থ পাঠ
ভালো কাজের নিয়ত করুন, আল্লাহ তাআলাই পথ খুলে দেবেন। ঋণগ্রহীতা যখন ঋণদাতার মাল ফেরত দেওয়ার নিয়ত করেছে কাঠের টুকরোটি তখন চিঠিতে পরিণত হয়ে গেছে। আর সমুদ্র পিয়নের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আপনি ভালো স্বামী হওয়ার নিয়ত করুন ভালো স্ত্রী পাবেন। শেখার নিয়ত করুন উত্তম শিক্ষক পেয়ে যাবেন। বিশ্বস্ত হওয়ার নিয়ত করুন, এমন ব্যক্তি পাবেন যে আপনাকে বিশ্বস্ত মনে করবে। আল্লাহ তাআলা যার অন্তরে কল্যাণ দেখতে পান তার জন্য তিনি কল্যাণের দ্বার প্রশস্ত করে দেন।
পঞ্চম পাঠ
যদি কেউ আল্লাহর নামে আপনার কাছে আশ্রয় চায় তাকে আশ্রয় দান করুন। কেউ আল্লাহর নামে কিছু চাইলে তাকে সেটা প্রদান করুন। মানুষ সাধারণত অভিজাত লোকের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে না। যে আল্লাহ তাআলাকে মাধ্যম বানাচ্ছে তার অবস্থা কী হতে পারে! সাক্ষী তলব করা, চুক্তিনামায় লিখে রাখা- এগুলো নিষিদ্ধ কিছু নয় (বরং সুন্নাত)। বাস্তবতা হলো দুনিয়ার জীবনে জীবন-মৃত্যু, প্রতারণা ও ধোঁকা সবকিছুই রয়েছে। তাই নিজের লেনদেন সম্পর্কে লিখে রাখতে কোনোরূপ কার্পণ্য করা যাবে না। এমনিভাবে কেউ আপনার কাছে পাওনা থাকলে তার প্রাপ্য হক লিখে রাখতে চাইলে বিরক্ত হবেন না। কুরআনুল কারিমের সবচেয়ে দীর্ঘতর আয়াতটি ঋণ সংক্রান্ত। আল্লাহ তাআলা এতে ঋণ সংক্রান্ত বিষয় লিখে রাখতে এবং তার ওপর স্বাক্ষী রাখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এটাও বলেছেন- 'যদি একজন অপরজনকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করা।' [১]
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম : ২২৯১
[১]. সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৮৩