📄 হযরত উমর (রা.)-এর কথা শুনে নবীজীর হাসি
একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পুণ্যাত্মা স্ত্রীগণের কিছু অশোভন কথার কারণে এক মাস তাদের কাছে না যাওয়ার কসম (ঈলা) করে ফেলেন। সবাইকে রেখে তিনি আলাদা এক বাড়িতে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন।
সাহাবাদের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, নবীজী তাঁর সব স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন। হযরত উমর (রা.) এতে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি নবীজীর কাছে গমন করেন, কিন্তু ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মিলেনি। ফিরে আসেন। আবার যান। এবারও অনুমতি পাওয়া গেল না। আবার ফিরে আসেন। অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরে। তৃতীয়বার গিয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে যান।
হযরত উমর (রা.) বলেন, আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। দেখি, নবীজী শুধু একটা পাটি বিছিয়ে তাতে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আপনার স্ত্রীগণকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন? নবীজী মাথা ওঠালেন। বলেন, না।
আমি বললাম, আল্লাহু আকবার! হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো কুরাইশ গোত্রের লোক। আমরা দেখেছি আমাদের স্ত্রীরা সব সময় স্বামীর প্রতি অনুগতশীল রয়েছে। মদীনায় এসে দেখি, এখানকার আনসার সাহাবাদের স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের উপর অগ্রাধিকার ভোগ করে। এসব দেখে আমাদের স্ত্রীরাও তাদের মত আচরণ শিখে ফেলে।
একদিন আমি আমার স্ত্রীর প্রতি রাগ করলাম। যে প্রতি উত্তর দিতে শুরু করে। আমার কাছে এটা খুব অপছন্দ হলো। সে বললো, আপনার কাছে আমার জবাব কেন খারাপ লাগলো? আল্লাহর কসম! নবীজীর পুণ্যাত্মা স্ত্রীগণ নবীজীর কথায় প্রতি-উত্তর করেন এবং দিনভর (অসন্তুষ্টির কারণে) তাঁর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। আমি বললাম, এ কাজ করলে সে ক্ষতিগ্রস্ত ও লাঞ্ছিত হবে। চাই সে যে মহিলাই হোক না কেন? হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনার রাগের কারণে আল্লাহর গযব নাযিল হয়ে যায়, তবে তো ঐ মহিলারা ধ্বংস হয়ে যাবে।
এটা শুনে নবীজী হেসে দিলেন। তখন আমি বললাম, আজ আমি হাফসার কাছে গিয়েছিলাম। আমি তাকে বললাম, এ ব্যাপারটি যেন তোমাকে ধোকায় না ফেলে যে, অমুক সতীন আমার চেয়ে সুন্দর এবং অমুক আমার চেয়ে বেশি প্রিয়, নবীজীর কাছে। এ কথা শুনে নবীজী আবার হেসে দিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আরেকটু কি প্রমোদ দেব?
নবীজী বললেন, হ্যাঁ। আমি বসে পড়লাম। মাথা উঁচু করে তাঁর এ ঘরটি দেখলাম। আল্লাহর কসম! নবীজীর সাথে মাত্র তিনটি আসবাব ছিল। আমি বললাম, আপনি দুআ করুন, আল্লাহ তাআলা যেন আপনার উম্মতকে সমৃদ্ধি দান করেন। পারস্য ও রোমকে তিনি সমৃদ্ধশীল করেছেন। অথচ তারা আল্লাহর ইবাদত করে না। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোজা হয়ে বসেন। বলেন- হে খাত্তাবের ছেলে! তুমি কি এখনও সন্দেহে পড়ে আছো? এদেরকে তো ভালো জিনিস দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। আর আমাদের জন্য পরকালে আছে। [আহমদ, বুখারী, মুসলিম, হায়াতুস্ সাহাবা: ২: ৮০৫]
📄 হযরত উমর (রা.)-এর কৌশলপূর্ণ কথায় নবীজীর হাসি
হযরত জাবির (রা.) বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) এসে নবীজীর কাছে যেতে অনুমতি চাইলেন। কিন্তু অনুমতি পেলেন না। উমর (রা.) এসে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি কামনা করলে তাঁকে অনুমতি দেয়া হলো। উভয়ই ভেতরে প্রবেশ করলেন। নবীজী বসা। তাঁর আশপাশে পুণ্যাত্মা স্ত্রীগণ জামায়েত ছিলেন। নবীজী চুপচাপ বসেছিলেন।
হযরত উমর (রা.) বললেন হে আল্লাহর রাসূল আপনি যদি যায়েদের কন্যা অর্থাৎ আমার স্ত্রী তার বিভিন্ন চাহিদা পেশ করছিলেন। আমি তাকে ধরলাম এবং খুব গলা চিপে দিলাম। নবীজী হাসতে থাকেন। এমন হাসলেন যে তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা গেল। এর পর নবীজী বলেন এরা আমার আশেপাশে জমায়েত হয়েছে এবং তাদের চাহিদার কথা ব্যক্ত করছে।
এটা শুনে আবু বকর তাঁর কন্যা আয়েশার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মারতে উদ্যত হন। উভয়েই বলছিলেন তোমরা কি নবীজীর কাছে এমন এমন জিনিস চাচ্ছ যা তাঁর কাছে নেই? এ অবস্থা দেখে সব স্ত্রীগণ অঙ্গীকার করলেন যে, আমরা এর পর আর কখনো এমন জিনিস নবীজীর কাছে চাইব না যা তাঁর কাছে নেই। [আহমদ, বুখারী, মুসলিম, হায়াতুস সাহাবা: ২:৮০৮]
📄 হযরত সুহাইব (রা.)-এর জবাবে নবীজীর হাসি
হযরত সুহাইব (রা.) ও হযরত আম্মার (রা.) একই সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবী আরকাম (রা.)-এর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এ দুই হযরত আলাদা আলাদা নবীজীর দরবারের উদ্দেশে রওনা করেন। বাড়ির দরজায় এসে উভয়ে অকস্মাৎ একত্রিত হন। একে অপরের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলে দেখা গেল একই উদ্দেশ্যে উভয়ের আগমন। তা হলো ইসলাম গ্রহণ করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সান্নিধ্যের ঐশী দীপ্তি লাভে ধন্য হওয়া।
ইসলাম গ্রহণ করার পর সে যুগে মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুসলমানের উপর যে জুলুম অত্যাচার করা হতো সেভাবে এদেরকেও নির্যাতিত নিপীড়িত হতে হয়। শেষ পর্যন্ত এসব কষ্ট সহ্য করতে না পেরে হিজরত করেন। কাফেরদেরও এটা সহ্য হতো না যে, মুসলমানরা অন্য কোথাও গিয়ে শান্তিতে বসবাস করুক। তাই যার ব্যাপারে তারা জানতে পারতো যে সে হিজরত করছে তাকে তারা ধরতো। সে হিসাবে তারা এদেরও পিছু নিল। একটি দল তাদেরকে ধরতে গেল। সাহাবীরা তীর বের করলেন। তাদেরকে বললেন, দেখো তোমরা জান আমি তোমাদের চাইতে তীর চালনায় বেশি অভিজ্ঞ। যতক্ষণ পর্যন্ত একটা তীর আমার হাতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কেউ আমার কাছে আসতে পারবে না। যখন তীর শেষ হয়ে যাবে তখন তলোয়ার চালাতে থাকবো। তলোয়ার যখন হাতছাড়া হয়ে যাবে তখন তোমরা যা খুশি করো। সুতরাং তোমরা যদি চাও তাহলে আমার জীবনের বিনিময়ে আমার সম্পদের ঠিকানা বলে দিতে পারি। যা মক্কায় রয়ে গিয়েছে। সাথে দুটো দাসীও আছে। তাও তোমরা নিয়ে নাও। এতে তারা রাজি হয়ে গেল। তারা তাদের সম্পদ বিসর্জন দিয়ে জীবন বাঁচাল। এ ব্যাপারে আয়াত নাযিল হয়- وَمِنَ النَّاسِ
যখন তাঁরা মদীনা পৌঁছেন তখন নবীজী কুবায় অবস্থান করছিলেন। অবস্থা দেখে তিনি ইরশাদ করেন- তোমরা লাভজনক ব্যবসা করেছ। হযরত সুহাইব (রা) বলেন, নবীজী খেজুর খাচ্ছিলেন। আমার চোখে বেদনা ছিল। আমিও খেতে লাগলাম। নবীজী বলেন- তোমার চোখে ব্যথা আর তুমি খেজুর খাচ্ছ? আমি বললাম, হুযুর! আরেকটি চোখের পক্ষ থেকে খাচ্ছি যা ভালো আছে। এটা শুনে নবীজী হাসতে থাকেন। [উসদুল গাবাহ: ৩: ৩১, ফাযায়েলে আমাল: ২১]
📄 এক গ্রাম্য লোকের কথায় নবীজীর হাসি
নবীজীর মধ্যে মানবিক গুণাবলীর সমাহার ছিল। তন্মধ্যে একটি হলো, অন্যের প্রতি ক্ষমা। একদিন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তখন এক লোক আসলো। এসেই সে তার চাদর নবীজীর গলায় পেঁচিয়ে খুব জোরে চেপে ধরলো। ফলে নবীজীর গলায় দাগ পড়ে গেল। নবীজী বলেন- হে আল্লাহর বান্দা! কী ব্যাপার? সে বলল, যে সম্পদ আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন তা থেকে আমাকেও দাও। নবীজী বলেন- সম্পদ তো আমি দেব কিন্তু তুমি যে কষ্ট দিয়েছ তার বদলা আমি নেব।
সে বলল, না, না। আমি বদলা দেবো না। নবীজী বলেন, কেন?
সে বলল, আপনি তো মন্দ কাজের বদলা মন্দ কাজের দ্বারা নেন না।
এটা শুনে নবীজী হেসে দেন। সাহাবায়ে কেরামকে বলেন, এ লোককে এক উটে যব এবং আরেকটি উটে খেজুর তুলে দাও।