📄 দু’আর দ্বিতীয় অংশ
وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
'এবং আমার কাজ সহজ করে দেন।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৬
মুসা (আ.) যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা উপলব্ধি করেছিলেন যে, এমন পরিস্থিতির মধ্যে তাঁর পক্ষে কাজ করা অসম্ভব। যেমন:
১. নির্মম অত্যাচারী সৈন্যদের দ্বারা ব্যাপকভাবে সুরক্ষিত মিশর শহরে প্রবেশ করা।
২. সেখানকার মানুষদের নতুন মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন না থাকা।
৩. ভুল করে তিনি যে হত্যাকাণ্ড করেছেন, সেজন্য তিনি একজন ফেরারি অপরাধী ছিলেন।
৪. সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা 'রাজপ্রাসাদে' প্রবেশ করতে হবে।
৫. তাঁর সাথে তাঁর আপন ভাই ছাড়া অন্য কোনো সেনাবাহিনী ছিল না।
মুসা (আ.) জানতেন, আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তা ব্যতীত এসব কাজ একেবারে অসম্ভব। কেবলমাত্র আল্লাহই পারেন মুসা (আ.)-কে সমস্ত পথ অতিক্রম করিয়ে তাঁর কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে।
শিক্ষা:
আমরা যদি কোনো ভাল কাজ করতে যাই এবং তাঁর সামনে যদি এমন প্রতিবন্ধকতা দেখতে পাই, যা দূর করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে, তখন এই দু'আ ওইসব প্রতিবন্ধকতা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। যখন আপনার অন্তরে নূর (আলো), স্বস্তি ও এই ঈমান রয়েছে যে, আল্লাহ আপনার সাথে আছেন, তখন সবকিছু আপনার সহজ ও অর্জনযোগ্য হয়ে ওঠে।
📄 দু’আর তৃতীয় অংশ
وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي
'আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দেন।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৭
মুসা (আ.) তোতলা ছিলেন, তিনি তাঁর এই ব্যক্তিগত সমস্যা সম্পর্কে জানতেন যে, এটা তাঁর সব থেকে বড় দুর্বলতা। বিশেষ করে যখন তিনি হতাশ হতেন বা রেগে যেতেন, তখনই তাঁর তোতলামির সমস্যাটি আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠতো। তাই তিনি আল্লাহর কাছে নিজের জিহ্বার জড়তা দূর করার জন্য দু'আ করেন। তিনি জানতেন, তিনি যদি স্পষ্টভাষী না হন, তবে ফেরাউন ও তার বাহিনীর কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর যে মিশন তাকে দেওয়া হয়েছে, তিনি তা সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হবেন না।
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
মুসা (আ.) ইতিমধ্যে তাঁর তোতলামির সমস্যার সমাধান করেন, যখন তিনি আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা-র কাছে স্বীয় বক্ষ প্রশস্ত করার প্রথম দু'আ করেছিলেন। যখন তাঁর অন্তর প্রশান্তি ও সাহসিকতার দিকে প্রসারিত হবে, তখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় না তিনি বিরক্ত হবেন, আর না মেজাজ হারাবেন এবং না তাঁর বক্তব্যে থাকবে জড়তা।
'উক্লদাতান' (عُقْدَةً) শব্দ নিয়ে পর্যালোচনা:
এই শব্দের বিভিন্ন অর্থের মাঝে একটি অর্থ হচ্ছে: গিঁট বা জট পাকানো, যা এখানে সন্দেহের প্রতিনিধিত্ব করছে। যখন অনেকগুলি তার একসাথে জট পাকানো অবস্থায় থাকে, তখন কোন তারটি কোথায় আছে, তা নির্ণয় করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক এমনটি বক্তব্য দেওয়ার সময় ঘটতে পারে। মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে এই দু'আ করেছিলেন যে, তিনি যেন পরিষ্কার উচ্চারণে বক্তব্য দিতে পারেন, যাতে বক্তব্যে কোনো ধরনের জট বা অস্পষ্টতা তৈরি না হয়।
📄 দু’আর চতুর্থ অংশ
يَفْقَهُوا قَوْلِي
'যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৮
নবী মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে এই দু'আ করেন, কারণ তিনি অবগত ছিলেন যে, তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বক্তব্য দিতে পারেন না এবং বক্তব্য দানে তিনি বেশ ধীর ছিলেন। তিনি জানতেন, নবী হিসেবে ফেরাউন ও তাঁর সভাসদদেরকে প্রভাবিত করতে তাঁকে অবশ্যই সাবলীলভাবে কথা বলতে হবে।
যখন আমরা কারো সাথে কথা বলি, তখন কতগুলো বিশেষ দিক রয়েছে, যা আমাদের মনে রাখা উচিত:
১. শ্রোতা (বয়স, লিঙ্গ)।
২. বোঝার ক্ষমতা (জ্ঞান, যোগ্যতা)।
৩. বক্তব্যের যথার্থতা (কাঠামো, বিন্যাস)।
৪. প্রেক্ষাপট (জাতি, ভাষা, ধর্ম)।
যখন আমাদের প্রয়োজন আমাদের এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা এবং স্পষ্ট ও বোধগম্যতার সাথে যোগাযোগ করা, তখন আমাদের উচিত নবী মুসার (আ.) করা এই অপূর্ব দু'আর সর্বোত্তম ব্যবহার।
📄 যে ঘটনা মুসা (আ.)-কে দু’আ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল
আল্লাহর আদেশ হিসেবে মুসা (আ.) যখন তাঁর জাতিকে কোনো কাজের আদেশ দিতেন, তখন কেউ কেউ তাঁর উদ্দেশ্যে নানা ধরনের অযৌক্তিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিত। এরূপ একটি ঘটনা হলো, একবার একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে এবং কে এই হত্যার সাথে জড়িত, তা জানার জন্য তারা মুসার (আ.) কাছে আসে। মুসা (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি লাভ করলেন এবং তিনি তাদেরকে একটি গাভী জবাই করার আদেশ দিলেন। যেখানে তাদের উচিত ছিল অবনত মস্তকে তাঁর আদেশ মেনে নেওয়া, সেখানে তারা অত্যন্ত অভদ্র ও অশালীনভাবে উত্তর দেয়।
তারা বলে:
وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تَذْبَحُوا بَقَرَةً ۖ قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا ۖ قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ
'মুসা যখন তাঁর নিজ সম্প্রদায়কে বলে, আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু জবাই করতে আদেশ করেছেন। তখন তারা বলে, তুমি কি আমাদের সাথে উপহাস করছো? তিনি বললেন, জাহিল বা অজ্ঞদের দলে শামিল হওয়া থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।' - সূরা বাকারাহ, ২:৬৭
মুসা (আ.) রাগী স্বভাবের ছিলেন। এখন তাঁর নিজ সম্প্রদায়ের লোক আল্লাহ তা'আলার দেওয়া আদেশগুলি নিয়ে প্রশ্ন করা ও অবজ্ঞা করা শুরু করেছে। মুসা (আ.) চাইলেই খুব সহজে তাদেরকে তাদের উপযুক্ত স্থানে নিয়ে আসতে পারতেন, কিন্তু তিনি ভালভাবেই জানতেন যে, তাদের থেকে তাঁর সুরক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন নেই, বরং তাঁর প্রয়োজন স্বীয় প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা।
শিক্ষা:
আকিল (সুস্থ ও স্বাভাবিক চিন্তার অধিকারী): যৌক্তিক প্রক্রিয়াটি আপনার মনের সঠিক জায়গায় রয়েছে, আপনি আপনার বক্তব্য এবং আপনার চিন্তন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
জাহিল (অজ্ঞ, সুস্থ চিন্তার নিয়ন্ত্রণ যে হারিয়েছে): আপনি নিজের বোধশক্তির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, কারণ আপনি আবেগ ও ক্রোধে পূর্ণ। যখন আপনি এমন হন, তখন আপনি নিজেকে হাসির পাত্রে পরিণত করেন।
যিনি খুব দ্রত নিজের মেজাজ হারিয়ে ফেলেন, তাঁর উচিত এই দু'আটি ব্যবহার করা, যেন তিনি সোজা চিন্তা ও সঠিক কর্ম সম্পাদনের ক্ষমতা না হারানোর ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে পারেন। নবী মুসার (আ.) এ সকল দু'আ থেকে আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে উত্তম উপদেশ গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমিন।