📄 দু’আর প্রথম অংশ
قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي
'মুসা বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমার বক্ষ প্রশস্ত করুন।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৫
শিক্ষা:
যেকোন কাজ সম্পাদনের আগে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের অন্তরের অবস্থা জেনে নেওয়া। অন্তর যদি সঠিক জায়গায় না থাকে, তবে আমরা যাই করি না কেন, তাঁর কোনো অর্থ বা তাৎপর্য থাকে না। অন্তর যখন সঠিক জায়গায় থাকে, তখন ওই অন্তর থেকে যা আসে, তা সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে অন্য অন্তরে প্রবেশ করে।
'শারহুস সুদুর' তথা বক্ষকে প্রশস্ত করার তাৎপর্য:
১. রাগের সময় শান্ত থাকা।
২. জালিমের সামনে শান্ত থাকা।
৩. ভয়ের সময় সাহস প্রদর্শন।
৪. বক্তব্যে স্পষ্টতা।
বিশ্লেষণ:
স্বীয় অন্তরকে সাহস দিয়ে পূর্ণ করতে মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে দু'আ করেন, যাতে রাসূলের মহান মিশনের সাথে জড়িত দায়িত্ব তিনি পূর্ণ আস্থার সাথে পালনে সক্ষম হন। মুসা (আ.) এটার জন্য দু'আ করেছিলেন, কারণ তিনি এই মহান মিশনের গুরু দায়িত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর অন্তরকে শান্ত ও স্থির করা আবশ্যক, যদি তাঁর অন্তর সঠিক জায়গায় না থাকে, তবে তিনি রিসালাতের বার্তা যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে এবং নিজের উদ্দেশ্য পূরণে সফল হবেন না। তাঁকে সাহসী হতে হবে, কারণ বহু বছর পরে তিনি মিশরে ফিরছেন এবং সেইসাথে তিনি একজন অপরাধীও ছিলেন, যাকে সবাই খুঁজে ফিরছিল।
📄 দু’আর দ্বিতীয় অংশ
وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
'এবং আমার কাজ সহজ করে দেন।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৬
মুসা (আ.) যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা উপলব্ধি করেছিলেন যে, এমন পরিস্থিতির মধ্যে তাঁর পক্ষে কাজ করা অসম্ভব। যেমন:
১. নির্মম অত্যাচারী সৈন্যদের দ্বারা ব্যাপকভাবে সুরক্ষিত মিশর শহরে প্রবেশ করা।
২. সেখানকার মানুষদের নতুন মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন না থাকা।
৩. ভুল করে তিনি যে হত্যাকাণ্ড করেছেন, সেজন্য তিনি একজন ফেরারি অপরাধী ছিলেন।
৪. সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা 'রাজপ্রাসাদে' প্রবেশ করতে হবে।
৫. তাঁর সাথে তাঁর আপন ভাই ছাড়া অন্য কোনো সেনাবাহিনী ছিল না।
মুসা (আ.) জানতেন, আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তা ব্যতীত এসব কাজ একেবারে অসম্ভব। কেবলমাত্র আল্লাহই পারেন মুসা (আ.)-কে সমস্ত পথ অতিক্রম করিয়ে তাঁর কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে।
শিক্ষা:
আমরা যদি কোনো ভাল কাজ করতে যাই এবং তাঁর সামনে যদি এমন প্রতিবন্ধকতা দেখতে পাই, যা দূর করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে, তখন এই দু'আ ওইসব প্রতিবন্ধকতা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। যখন আপনার অন্তরে নূর (আলো), স্বস্তি ও এই ঈমান রয়েছে যে, আল্লাহ আপনার সাথে আছেন, তখন সবকিছু আপনার সহজ ও অর্জনযোগ্য হয়ে ওঠে।
📄 দু’আর তৃতীয় অংশ
وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي
'আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দেন।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৭
মুসা (আ.) তোতলা ছিলেন, তিনি তাঁর এই ব্যক্তিগত সমস্যা সম্পর্কে জানতেন যে, এটা তাঁর সব থেকে বড় দুর্বলতা। বিশেষ করে যখন তিনি হতাশ হতেন বা রেগে যেতেন, তখনই তাঁর তোতলামির সমস্যাটি আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠতো। তাই তিনি আল্লাহর কাছে নিজের জিহ্বার জড়তা দূর করার জন্য দু'আ করেন। তিনি জানতেন, তিনি যদি স্পষ্টভাষী না হন, তবে ফেরাউন ও তার বাহিনীর কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর যে মিশন তাকে দেওয়া হয়েছে, তিনি তা সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হবেন না।
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
মুসা (আ.) ইতিমধ্যে তাঁর তোতলামির সমস্যার সমাধান করেন, যখন তিনি আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা-র কাছে স্বীয় বক্ষ প্রশস্ত করার প্রথম দু'আ করেছিলেন। যখন তাঁর অন্তর প্রশান্তি ও সাহসিকতার দিকে প্রসারিত হবে, তখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় না তিনি বিরক্ত হবেন, আর না মেজাজ হারাবেন এবং না তাঁর বক্তব্যে থাকবে জড়তা।
'উক্লদাতান' (عُقْدَةً) শব্দ নিয়ে পর্যালোচনা:
এই শব্দের বিভিন্ন অর্থের মাঝে একটি অর্থ হচ্ছে: গিঁট বা জট পাকানো, যা এখানে সন্দেহের প্রতিনিধিত্ব করছে। যখন অনেকগুলি তার একসাথে জট পাকানো অবস্থায় থাকে, তখন কোন তারটি কোথায় আছে, তা নির্ণয় করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক এমনটি বক্তব্য দেওয়ার সময় ঘটতে পারে। মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে এই দু'আ করেছিলেন যে, তিনি যেন পরিষ্কার উচ্চারণে বক্তব্য দিতে পারেন, যাতে বক্তব্যে কোনো ধরনের জট বা অস্পষ্টতা তৈরি না হয়।
📄 দু’আর চতুর্থ অংশ
يَفْقَهُوا قَوْلِي
'যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৮
নবী মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে এই দু'আ করেন, কারণ তিনি অবগত ছিলেন যে, তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বক্তব্য দিতে পারেন না এবং বক্তব্য দানে তিনি বেশ ধীর ছিলেন। তিনি জানতেন, নবী হিসেবে ফেরাউন ও তাঁর সভাসদদেরকে প্রভাবিত করতে তাঁকে অবশ্যই সাবলীলভাবে কথা বলতে হবে।
যখন আমরা কারো সাথে কথা বলি, তখন কতগুলো বিশেষ দিক রয়েছে, যা আমাদের মনে রাখা উচিত:
১. শ্রোতা (বয়স, লিঙ্গ)।
২. বোঝার ক্ষমতা (জ্ঞান, যোগ্যতা)।
৩. বক্তব্যের যথার্থতা (কাঠামো, বিন্যাস)।
৪. প্রেক্ষাপট (জাতি, ভাষা, ধর্ম)।
যখন আমাদের প্রয়োজন আমাদের এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা এবং স্পষ্ট ও বোধগম্যতার সাথে যোগাযোগ করা, তখন আমাদের উচিত নবী মুসার (আ.) করা এই অপূর্ব দু'আর সর্বোত্তম ব্যবহার।