📄 মুসার (আ.) সততা ও আন্তরিকতা
মুসা (আ.) পুরো ঘটনা মেয়েদের পিতার কাছে জানান এবং তাঁর সততা ও আভিজাত্য দেখে ওই নারীদ্বয়ের পিতা সত্যিই মুগ্ধ হন। সম্ভবত, তাদের পিতা ভ্রমণকারীকে কয়েকদিন তাঁর কাছে থাকতে দেন, কিন্তু ওই সময় কোনো এক মেয়ে তাঁর পিতাকে পরামর্শ দেন। ওই পরামর্শটি এরূপ, 'বাবা, আপনি বুড়ো হয়ে গেছেন এবং তাই আমাদের মেয়েদেরকে বাইরের দায়িত্ব পালনের জন্য বাইরে যেতে হয়। আমাদের কোনো ভাই নেই, যারা এগুলো করতে পারে। অতএব, আপনি এই ব্যক্তিকে চাকর হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন। তিনি শক্তিশালী এবং সব ধরনের কঠোরতার মুখোমুখি হতে পারবেন এবং তিনি বিশ্বাসযোগ্যও বটে। তিনি তাঁর মহৎ প্রকৃতির কারণে যখন আমাদেরকে অসহায় অবস্থায় দেখেন, তখন তিনি আমাদেরকে সহায়তা করেন, কিন্তু তিনি কখনোই আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকাননি।'
অন্যদিকে মুসার (আ.) জন্য আল্লাহ তা'আলারও পরিকল্পনা ছিল এবং তিনি তাকে সর্বোত্তম উপায়ে খায়ের বা কল্যাণ দান করার সিদ্ধান্ত নেন, আর ঠিক তাই ঘটে, যখন ওই নারীদ্বয়ের পিতা তাঁর কন্যাদ্বয়ের যেকোনো একজনকে মুসার (আ.) হাতে বিবাহের মাধ্যমে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
বিবাহ:
মেয়ের পরামর্শে মুসা (আ.)-কে তাৎক্ষণিকভাবে এমন প্রস্তাব দেওয়া পিতার আবশ্যক নয়। কেউ হয়তো মনে করতে পারেন যে, যথাযথ বিবেচনার পরপরই তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি অবশ্যই ভেবেছিলেন, 'নিঃসন্দেহে সে একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, কিন্তু তাঁর মতো একজন সুস্থ ও সবল যুবককে ওই বাড়িতে চাকর হিসেবে চাকরি দেওয়া ঠিক হবে না, যেখানে উপযুক্ত মেয়ে রয়েছে। যখন তিনি কোনো এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের ভদ্র, শিক্ষিত ও সভ্য মানুষ, তখন কেন তাকে জামাই হিসেবে ঘরে রাখা হবে না?' এ সিদ্ধান্তে পৌঁছার পর তিনি মুসার (আ.) সাথে উপযুক্ত সময়ে কথা বলতে পারেন। মুসা (আ.) মেনে নেন এবং এভাবে আল্লাহর কাছে খায়ের বা কল্যাণের জন্য যে দু'আ করেন, তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে পূর্ণতা লাভ করে।
মানুষ যখন আমাদেরকে সহায়তা করে এবং নিরাপত্তা দেয়, বস্তুত তখন তা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আসে। 'খায়ের' (কল্যাণ) ও 'রিজিক' (অনুগ্রহ), যা আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে, সেগুলোকে দূরে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। বস্তুত এগুলো সরাসরি আমাদের জন্য আসমান থেকে নাজিল হওয়া বিশেষ প্যাকেজ।
মুসার (আ.) পরিস্থিতি তুলনা:
দু'আর পূর্বে:
- অপরাধী (ভুলবশত একজন সৈনিককে হত্যা করেন, কিন্তু নিজ দেশে তাকে বিশ্বাস করা হলো না)।
- শক্তি: তিনি দাস সম্প্রদায়কে সাহায্য করতে চাইতেন।
- আবাস: প্রাসাদে বসবাস (অবিশ্বাসীদের দ্বারা বেষ্টিত জায়গা)।
- নিঃসঙ্গ: তিনি পুরোপুরি একাকী ছিলেন।
দু'আর পরে:
- সততা (পিতা ও মেয়েরা তাঁর ঘটনা বিশ্বাস করে এবং তাকে বিশ্বস্ত হিসেবে গ্রহণ করে)।
- সুরক্ষা: বৃদ্ধ পিতা ও দুই মেয়ে একা থাকায় তিনি তাদেরকে রক্ষা করতেন।
- শ্বশুরবাড়িতে সাথে থাকা (মুমিনদের দ্বারা বেষ্টিত জায়গা)।
- সাথি (আল্লাহ তাকে ধার্মিক স্ত্রী ও বিশ্বাসী একটি পরিবার দিয়ে অনুগ্রহ করেন)।
- খায়ের (কল্যাণ): আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা অতি সত্ত্বর তাঁর জন্য খাদ্য, পানি, কাপড় ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন।
📄 দু’আর প্রথম অংশ
قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي
'মুসা বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমার বক্ষ প্রশস্ত করুন।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৫
শিক্ষা:
যেকোন কাজ সম্পাদনের আগে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের অন্তরের অবস্থা জেনে নেওয়া। অন্তর যদি সঠিক জায়গায় না থাকে, তবে আমরা যাই করি না কেন, তাঁর কোনো অর্থ বা তাৎপর্য থাকে না। অন্তর যখন সঠিক জায়গায় থাকে, তখন ওই অন্তর থেকে যা আসে, তা সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে অন্য অন্তরে প্রবেশ করে।
'শারহুস সুদুর' তথা বক্ষকে প্রশস্ত করার তাৎপর্য:
১. রাগের সময় শান্ত থাকা।
২. জালিমের সামনে শান্ত থাকা।
৩. ভয়ের সময় সাহস প্রদর্শন।
৪. বক্তব্যে স্পষ্টতা।
বিশ্লেষণ:
স্বীয় অন্তরকে সাহস দিয়ে পূর্ণ করতে মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে দু'আ করেন, যাতে রাসূলের মহান মিশনের সাথে জড়িত দায়িত্ব তিনি পূর্ণ আস্থার সাথে পালনে সক্ষম হন। মুসা (আ.) এটার জন্য দু'আ করেছিলেন, কারণ তিনি এই মহান মিশনের গুরু দায়িত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর অন্তরকে শান্ত ও স্থির করা আবশ্যক, যদি তাঁর অন্তর সঠিক জায়গায় না থাকে, তবে তিনি রিসালাতের বার্তা যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে এবং নিজের উদ্দেশ্য পূরণে সফল হবেন না। তাঁকে সাহসী হতে হবে, কারণ বহু বছর পরে তিনি মিশরে ফিরছেন এবং সেইসাথে তিনি একজন অপরাধীও ছিলেন, যাকে সবাই খুঁজে ফিরছিল।
📄 দু’আর দ্বিতীয় অংশ
وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
'এবং আমার কাজ সহজ করে দেন।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৬
মুসা (আ.) যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা উপলব্ধি করেছিলেন যে, এমন পরিস্থিতির মধ্যে তাঁর পক্ষে কাজ করা অসম্ভব। যেমন:
১. নির্মম অত্যাচারী সৈন্যদের দ্বারা ব্যাপকভাবে সুরক্ষিত মিশর শহরে প্রবেশ করা।
২. সেখানকার মানুষদের নতুন মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন না থাকা।
৩. ভুল করে তিনি যে হত্যাকাণ্ড করেছেন, সেজন্য তিনি একজন ফেরারি অপরাধী ছিলেন।
৪. সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা 'রাজপ্রাসাদে' প্রবেশ করতে হবে।
৫. তাঁর সাথে তাঁর আপন ভাই ছাড়া অন্য কোনো সেনাবাহিনী ছিল না।
মুসা (আ.) জানতেন, আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তা ব্যতীত এসব কাজ একেবারে অসম্ভব। কেবলমাত্র আল্লাহই পারেন মুসা (আ.)-কে সমস্ত পথ অতিক্রম করিয়ে তাঁর কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে।
শিক্ষা:
আমরা যদি কোনো ভাল কাজ করতে যাই এবং তাঁর সামনে যদি এমন প্রতিবন্ধকতা দেখতে পাই, যা দূর করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে, তখন এই দু'আ ওইসব প্রতিবন্ধকতা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। যখন আপনার অন্তরে নূর (আলো), স্বস্তি ও এই ঈমান রয়েছে যে, আল্লাহ আপনার সাথে আছেন, তখন সবকিছু আপনার সহজ ও অর্জনযোগ্য হয়ে ওঠে।
📄 দু’আর তৃতীয় অংশ
وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي
'আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দেন।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:২৭
মুসা (আ.) তোতলা ছিলেন, তিনি তাঁর এই ব্যক্তিগত সমস্যা সম্পর্কে জানতেন যে, এটা তাঁর সব থেকে বড় দুর্বলতা। বিশেষ করে যখন তিনি হতাশ হতেন বা রেগে যেতেন, তখনই তাঁর তোতলামির সমস্যাটি আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠতো। তাই তিনি আল্লাহর কাছে নিজের জিহ্বার জড়তা দূর করার জন্য দু'আ করেন। তিনি জানতেন, তিনি যদি স্পষ্টভাষী না হন, তবে ফেরাউন ও তার বাহিনীর কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর যে মিশন তাকে দেওয়া হয়েছে, তিনি তা সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হবেন না।
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
মুসা (আ.) ইতিমধ্যে তাঁর তোতলামির সমস্যার সমাধান করেন, যখন তিনি আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা-র কাছে স্বীয় বক্ষ প্রশস্ত করার প্রথম দু'আ করেছিলেন। যখন তাঁর অন্তর প্রশান্তি ও সাহসিকতার দিকে প্রসারিত হবে, তখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় না তিনি বিরক্ত হবেন, আর না মেজাজ হারাবেন এবং না তাঁর বক্তব্যে থাকবে জড়তা।
'উক্লদাতান' (عُقْدَةً) শব্দ নিয়ে পর্যালোচনা:
এই শব্দের বিভিন্ন অর্থের মাঝে একটি অর্থ হচ্ছে: গিঁট বা জট পাকানো, যা এখানে সন্দেহের প্রতিনিধিত্ব করছে। যখন অনেকগুলি তার একসাথে জট পাকানো অবস্থায় থাকে, তখন কোন তারটি কোথায় আছে, তা নির্ণয় করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক এমনটি বক্তব্য দেওয়ার সময় ঘটতে পারে। মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে এই দু'আ করেছিলেন যে, তিনি যেন পরিষ্কার উচ্চারণে বক্তব্য দিতে পারেন, যাতে বক্তব্যে কোনো ধরনের জট বা অস্পষ্টতা তৈরি না হয়।