📄 আইয়ুবের (আ.) দু’আ
নবী আইয়ুব (আ.) আল্লাহর একনিষ্ঠ ইবাদাতগুজার বান্দা ছিলেন। তাঁর ঘটনাতে অনেক শিক্ষা খুঁজে পাই, যা আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ককে মূল্যায়ন করতে আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে। তাঁর ঘটনা আমাদেরকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি করায় যে, আল্লাহর জন্য আমাদের যাবতীয় আন্তরিকতা ও ইবাদাত কি শুধু তাঁর অনুগ্রহ ও আশীর্বাদ লাভের উপর নির্ভরশীল কিনা!
বর্ণিত আছে, আইয়ুব (আ.) দামেস্কের নিকটবর্তী শাম অঞ্চলে বসবাস করতেন। আল্লাহ তাকে বিপুল সম্পদ দান করেছিলেন। তাঁর ছিল জমি, গবাদি পশু, দাসদাসী এবং তাঁর অনুগত পরিবার। সবকিছু মিলিয়ে তিনি অত্যন্ত পরহেজগার ছিলেন। প্রতিনিয়ত তিনি স্বীয় রবের শুকরিয়া আদায় করতেন এবং তাঁর প্রশংসায় দিন পার করতেন।
অতপর আল্লাহ তাকে নানা ধরনের বিপর্যয় দিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। কুর'আনের তাফসিরবিদদের মতে, আল্লাহ সর্বপ্রথম আইয়ুবের (আ.) সমস্ত সম্পদ হঠাৎ কেড়ে নিয়ে পরীক্ষায় ফেলেন। কিন্তু আইয়ুব (আ.) ছিলেন দৃঢ় ও অবিচল। না তিনি এই বিপর্যয়ে ভেঙ্গে পড়েছেন, আর না তিনি পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতায় স্তব্ধ হয়েছেন। বরং তিনি তাঁর আগের মতো স্বীয় প্রতিপালকের গুণগান গেয়ে যেতে থাকেন।
আল্লাহ তখন আইয়ুবের (আ.) সন্তানদের জীবন একে একে কেড়ে নিতে শুরু করলেন। কিন্তু এটাও তাঁর অবস্থাতে পরিবর্তন আনেনি, বরং তিনি আপন রবের আনুগত্যে আগের মতোই নিষ্ঠাবান থাকেন। এরপর আল্লাহ তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাতে শুরু করলেন, যা তাকে ভয়ানক যন্ত্রণা ও কষ্টে পতিত করে। রোগের ভয়াবহতায় মানুষজন তাকে ছেড়ে চলে যেতে থাকে, কিন্তু আইয়ুবের (আ.) ঈমান ও আনুগত্যে বিন্দু পরিমাণ ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়নি, বরং তাঁর অন্তর আরও বেশি করে আল্লাহর দিকে ধাবিত হতে থাকে।
বর্ণিত আছে, ওই সময় পৃথিবীতে এমন কেউ ছিল না, যিনি আইয়ুব (আ.) অপেক্ষা আল্লাহ তা'আলার নিকট সম্মানিত ছিলেন। আইয়ুবের (আ.) রোগ দিন দিন এতটাই প্রকট হতে থাকে যে, তাঁর কাছের মানুষরা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে। কেউ তাঁর সাথে দেখা করতে চাইতো না। তাকে শহর থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং লোকজন তাকে সম্পূর্ণরূপে বয়কট করে। তাঁর স্ত্রী ছাড়া তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল কেউ ছিল না। তিনি তাঁর সেবাযত্ন চালিয়ে যেতে থাকেন। মূলত অসুস্থ হওয়ার আগে আইয়ুব (আ.) তাকে যেভাবে ভালোবাসতেন ও খেয়াল রাখতেন, তা স্মরণ রেখে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে থেকে যান।
আল্লাহ আইয়ুবের (আ.) পার্থিব সবকিছু নিয়ে নেন:
১. ধনসম্পদ: আল্লাহ আইয়ুবের (আ.) সমস্ত সম্পদ কেড়ে নিলেন।
২. সন্তানাদি: আল্লাহ আইয়ুবের (আ.) সন্তানদের জীবন কেড়ে নেন।
৩. স্বাস্থ্য: আল্লাহ আইয়ুব (আ.)-কে এক কঠিন রোগে আক্রান্ত করলেন।
আইয়ুব (আ.) ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং আমরা প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানতে পারি, ওই সময় যদি কেউ এমন রোগে আক্রান্ত হতো, যার চিকিৎসা সম্পর্কে কেউ অবগত নয়, তখন তাদেরকে সবার থেকে আলাদা করে দেওয়া হতো, যাতে রোগটি আশেপাশে ছড়িয়ে না পড়ে। এ কারণে আইয়ুব (আ.)-কে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। তিনি তাঁর সবকিছু হারান - খামার, বাড়ি, সহায়-সম্পদ থেকে শুরু করে নিজের সন্তানাদি ও নিজের স্বাস্থ্য। তাঁর পাশে শুধু তাঁর অনুগত স্ত্রীই ছিল, যিনি এমন অসুস্থতার সময়টিতেও তাঁর প্রিয় স্বামীকে একা না ফেলে সেবা-শুশ্রুষা করতে থাকেন।
আইয়ুব (আ.) তাঁর স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। আমরা যদি আমাদের কোনো একটি ইন্দ্রিয়ের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলি, তবে আমরা তো নিজেদেরকে একেবারে অসহায় ও অস্তিত্বহীন ভাবতে শুরু করি। অসুস্থতার কারণে আমরা যদি কিছু করতে না পারি, তবে তা আমাদের মাঝে এক ধরনের নেতিবাচক অনুভূতির জন্ম দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে আমাদেরকে হতাশাবাদী মানুষে পরিণত করতে পারে।
যখন আপনি মানসিকভাবে তলানীতে থাকেন, তখন আপনি ভাবতে শুরু করেন যে, কেউই আপনার কথা ভাবে না। যেহেতু আপনি আর কারও কোনো প্রয়োজনে লাগছেন না, সেহেতু সকলে আপনার থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। এমনকি আপনি চিন্তা করতে শুরু করেন যে, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলাও আপনাকে পরিত্যাগ করেছেন। যেহেতু আপনি দুনিয়ার কোনো কাজে আসছেন না, সেহেতু আপনি আল্লাহর দৃষ্টিতে অর্থহীন একজন।
আইয়ুবের (আ.) সাথে আল্লাহর যে বিশেষ বন্ধন ছিল, তা আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে। তিনি সবকিছুর চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসতেন এবং তিনি বেশ ভালো করেই জানতেন যে, আল্লাহ যেভাবে তাকে রিজিক দিচ্ছেন, যত্ন নিচ্ছেন, তেমনভাবে কেউ তাকে ভালোবাসে না, আর না যত্ন নেয়।
আইয়ুব (আ.) এমন একজন নবী ছিলেন, যিনি নিজের চরম অসুস্থতার কারণে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে পারেননি, তাহলে বিছানায় শায়িত থেকে তিনি কি উদ্দেশ্য পূরণ করে যাচ্ছিলেন? বছরের পর বছর কষ্ট ভোগের পর এই অবস্থায় আইয়ুব (আ.) আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করেন।
আইয়ুবের (আ.) দু'আ:
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
'এবং স্মরণ করুন আইয়ুবের কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহবান করে বলেন, 'আমি দুঃখকষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও শ্রেষ্ঠ দয়াবান।' - সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৩
ম্যাসসানি: এর অর্থ, যখন দুটি জিনিসের মধ্যে খুব সামান্য যোগাযোগ থাকে। বহু বছর ধরে ভয়ানক রোগে ভীষণভাবে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও আইয়ুব (আ.) নিজের অবস্থা প্রকাশের জন্য ম্যাসসানি শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা খুবই আশ্চর্যজনক। তিনি পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং কাজ করার ক্ষমতা একেবারে হারিয়ে ফেলেন। আইয়ুবের (আ.) বলা উচিত ছিল এই রোগ আমাকে পুরোপুরি নিঃশেষ ও ধ্বংস করে দিয়েছে, কিন্তু তিনি তা না করে এমন শব্দ দ্বারা দু'আ করেন, যাতে মনে হচ্ছে যে, রোগটি সবেমাত্র তাকে স্পর্শ করেছে।
আইয়ুব (আ.) এই দু'আর মাধ্যমে এই বিষয়টার স্বীকৃতি দিচ্ছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে আরও বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করছেন এবং তিনি তাকে বর্তমানে যে অবস্থায় রেখেছেন, তা একটি পরীক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়। এই রোগটি যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে গেলে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে পড়বেন, তবে তা হবে তাঁর জন্য সব থেকে বড় ক্ষতি। শারীরিক কষ্ট ভোগ করা তাঁর কাছে কিছুই নয় আল্লাহর রহমত ও করুণা থেকে আশা হারানোর তুলনায়। তিনি আল্লাহর কাছে নিজের দুঃখকষ্ট লাঘব বা রোগ নিরাময়ের জন্য কোনো দু'আ করেননি, বরং তিনি আল্লাহর কাছে এই নিবেদন রাখছেন যে, তিনি তাকে এযাবত যেভাবে ভালোবেসে এসেছেন, রহমতের সাথে যেভাবে খেয়াল রেখেছেন, সেটা যেন তিনি অব্যাহত রাখেন। বস্তুত তাঁর কাছে বৈষয়িক বিষয়ের চেয়ে আত্মিক সুস্থতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে আইয়ুব (আ.) আল্লাহ তা'আলার সবচেয়ে সুন্দর নাম 'আর-রাহমান' দ্বারা তাকে আহ্বান জানাচ্ছেন এবং এর মাধ্যমে তিনি তাঁর প্রতিপালকের সাথে তাঁর যে অনন্য সম্পর্ক রয়েছে, সেটাকে সুদৃঢ় করছেন। আল্লাহ তা'আলার ভালবাসাকে বুঝতে হলে আমাদেরকে তাঁর 'আর-রহমান' নামের তাৎপর্য উপলব্ধি করা আবশ্যক। আইয়ুবের (আ.) ঠিক কি প্রয়োজন, তা উল্লেখ করার দরকার হয়নি, কারণ 'আর-রাহমান' তাঁর যাবতীয় প্রয়োজন ও চাহিদা আছে, তা ঠিকই বুঝতে পারেন। আল্লাহ আইয়ুব (আ.)-কে রহমতে সিক্ত করলেন এবং তাকে ফিরিয়ে দিলেন স্বাস্থ্য, সম্পদ এবং পরিবার।
আল্লাহ বলেন:
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِن ضُرٍّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُم مَّعَهُمْ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ
'অতপর আমরা তাঁর আহবানে সাড়া দিলাম এবং তাঁর দুঃখকষ্ট দূর করে দিলাম, তাঁর পরিবরাবর্গ ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও (নিয়ামত) দিলাম আমার পক্ষ থেকে রহমত হিসেবে। আর এসবই ইবাদাতকারীদের জন্যে (এক প্রকার) উপদেশ।' - সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৪
তাঁর রোগ নিরাময়ের ধরন সূরা সোয়াদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:
ارْكُضْ بِرِجْلِكَ هَذَا مُغْتَسَلٌ بَارِدٌ وَشَرَابٌ
'তুমি তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করো। এখানে শীতল পানি রয়েছে গোসল ও পানের জন্য।' - সূরা সোয়াদ, ৩৮:৪২
তিনি দ্রুত ভূমিতে আঘাত করেন আর সাথে সাথে ঝরনা বেরিয়ে আসে এবং তিনি তাতে গোসল করেন ও সেখান থেকে পানি পান করেন, আর এতে করে তাঁর রোগ ভালো হয়ে যায়। চিকিৎসার এই ধরন দেখে মনে হচ্ছে, তিনি খুব সম্ভবত চর্মরোগে ভুগছিলেন।
যখন আমরা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করি, তখন এই অনুভূতি হয় যে, তিনি আমাদেরকে নিঃশর্তভাবে ভালবাসেন এবং দেখভাল করেন, যা অন্য কেউ করতে সক্ষম নয়। বান্দা যখন এমন মনোভাব নিয়ে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করে, তখন আপনি যে ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যে ধরনের কষ্ট ও বিপদে রয়েছেন, তা আল্লাহ উপযুক্ত সময়ে সমাধান করে দেন। কোন সময়টি আপনার জন্য উপযুক্ত কেবল আল্লাহই ভালো জানেন, তাই তিনি আপনাকে এসব বিপদাপদ ও পরীক্ষার মাধ্যমে ভালো সময়ের জন্য প্রস্তুত করেন।
📄 বিশেষ বার্তা
যখন আল্লাহ্ তাঁর স্বাভাবিক রীতি থেকে বেরিয়ে তাঁর বান্দাদেরকে বলে দেন যে, এই দু'আটি বিশেষভাবে অমুক লোকদের জন্য, তখন আমাদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে, আল্লাহ্র কথাকে গুরুত্বের সাথে নেওয়া ও তাতে যথাযথ মনোযোগ দেওয়া।
আগের দু'আগুলোতে আল্লাহ উল্লেখ করেননি, এই দু'আটি ইবাদাতকারী বান্দাদের জন্য উপদেশস্বরূপ। কিন্তু আল্লাহ্ এখানে এই বিষয়টির উপর বিশেষ জোর দেওয়ার জন্য এমনটি করেছেন। এই দু'আর ভাষা এতই সুন্দর যে, আমরা আমাদের জীবনে যত ধরনের আর্থিক সংকট, বিপদাপদ ও বালা-মুসিবতের মধ্য দিয়ে যাই না কেন, তাঁর সবগুলোকে এই দু'আতে শামিল করে আল্লাহ্র কাছে প্রতিনিয়ত দু'আ করতে পারবো। কেবল অভিযোগ করার পরিবর্তে আল্লাহ্র সাথে আমাদেরকে এমন এক বন্ধন ও সম্পর্ক তৈরি করা প্রয়োজন, যার ভিত্তিতে জীবনে যে অবস্থার মধ্যে দিয়েই যাই না কেন, আমরা যেন বুঝতে পারি, আল্লাহ্র ভালবাসা ও যত্ন আমাদের থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
আল্লাহর উপদেশ যেন আমাদের হৃদয়কে শক্ত না করে, বরং আমাদের গোটা জীবন জুড়ে তাঁর যে ভালবাসা ও রহমত রয়েছে, আমাদের উচিত সেটাকে স্বীকৃতি দেওয়া ও অনুভব করা।