📄 দু’আর চতুর্থ অংশ: আপনিই আমার অভিভাবক ইহকাল ও পরকালে
ওয়ালি (অভিভাবক)-এর গুণাগুণ: রক্ষাকর্তা, আপনার উপর সর্বাধিক অধিকার যার, আপনার পাশে সবসময় থাকেন যিনি, কর্তৃত্ব।
দু'আর এই অংশটি খুবই চমৎকার, কারণ ইউসুফ (আ.) ভালো করেই জানেন যে, একেবারে ছোটবেলাতেই যখন তাকে অন্ধকার কুয়াতে ফেলে দেওয়া হয়, আজও তিনি একা ছিলেন না, কারণ তাঁর ওয়ালি (অভিভাবক) আল্লাহ তাঁর সাথেই ছিলেন। মন্ত্রীর স্ত্রী যখন তাকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছিল এবং এর জের ধরে তাকে অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দী করা হয়, ঠিক তখনও আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে ছিলেন। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা তাকে রক্ষা করেন, সুরক্ষা দেন, পথ-নির্দেশনা দেন এবং ইউসুফ (আ.) যেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন, তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করেন। ইউসুফ (আ.) স্বীকার করছেন যে, বাহ্যিক পরিস্থিতি যতই খারাপ মনে হোক না কেন, আল্লাহ তা'আলা সর্বদা তাঁর সাথেই ছিলেন এবং তাকে রক্ষা করে আসছিলেন।
শিক্ষা:
আমাদের জীবনে আমরা এমন অধ্যায় পার করি, যখন আমরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকি। আমরা এতটা বেদনা ও কষ্টে আক্রান্ত থাকি যে, আমরা ভাবতে থাকি যদি কবে এই অন্ধকার পার করে একগুচ্ছ আলোর দেখা পাবো। আর ঠিক এমন মুহূর্তে আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, পরিস্থিতি আপাত দৃষ্টিতে যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হোক না কেন, আল্লাহ সর্বদা আমাদের সাথে আছেন। তিনিই আমাদের ওয়ালি তথা অভিভাবক এবং সংকটের মুহূর্তে তিনি কখনো আমাদের একা ফেলে আসেন না। যখন আমরা এমনটি করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের অন্তর প্রশান্ত হয়ে পড়ে।
আল্লাহ তা'আলা কুর'আনে বলেন: 'যারা ঈমানদার, তাদের অভিভাবক আল্লাহ। তাদেরকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।' - সূরা বাকারাহ, ২:২৫৭ (টেক্সটে ভুলবশত ২:২৮২ থাকতে পারে)
📄 দু’আর পঞ্চম অংশ: আমাকে ইসলামের উপর মৃত্যুদান করুন
মিশরের অর্থমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে এখন ইউসুফের (আ.) সব রয়েছে। তিনি ক্ষমতা, মর্যাদা ও আভিজাত্য পেয়েছেন, পুনরায় মিলিত হয়েছেন প্রিয় পিতা ও পরিবারের সাথে। তাঁর এখন আর কি চাওয়া থাকতে পারে?
কিন্তু তিনি আল্লাহর কাছে ঈমানদার হিসেবে মৃত্যুবরণ করার আর্জি পেশ করলেন। যখন সবকিছু স্বাভাবিক হতে থাকে, পরিস্থিতি অনুকূলে আসতে শুরু করে, তখন আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়াটা আমাদের জন্য বেশ সহজ হয়ে পড়ে। বিষয়টি ইউসুফ (আ.) বুঝতে পারেন, তাই তিনি এই আন্তরিক দু'আটি করেন, যেখানে তিনি চেয়েছেন ঈমানদার হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে।
শিক্ষা:
যখন সময় ভাল হতে থাকে, প্রায়শই আমরা তখন আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকি। আমরা আল্লাহকে ভুলে নিজেদের জীবন সংগ্রামে মগ্ন হয়ে পড়ি। অন্ধকারকে দূরে হটিয়ে আল্লাহ আমাদেরকে যে আলোর সন্ধান দিয়েছেন এবং আমাদের উপর তিনি প্রতিনিয়ত যে রহমত ও করুণা বর্ষণ করে যাচ্ছেন, তা ভুলে যাওয়া আমাদের জন্য চরম অকৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহর সাহায্য ও করুণার দ্বারাই আমরা আমাদের জীবনের সকল প্রতিবন্ধকতা পার করি। পরিশেষে, আমরা যদি ঈমানদার হিসেবে আল্লাহর নিকট পৌঁছাতে না পারি, তবে আমরা যত অর্জনই করি না কেন, তা মূল্যহীন।
📄 দু’আর ষষ্ঠ অংশ: এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে সৎকর্মীদের সাথে মিলিত করুন
বেশিরভাগ নবী এবং তাদের অনুগত সাহাবিগণ পাপাচারে পূর্ণ পরিবেশ ও মন্দ লোকদের দ্বারা বেষ্টিত ছিলেন। ইউসুফ (আ.)-ও শৈশব থেকেই একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে গেছেন। তাকে নিয়ে তাঁর ভাইয়েরা হিংসা করতো এবং ষড়যন্ত্র করে তারা তাকে কুয়াতে ফেলে দেয়। এরপর একদল লোক তাকে উদ্ধার করে এবং নিজেদের লাভের কথা ভেবে তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। অতপর তিনি মন্ত্রীর গৃহে আশ্রয় পান এবং সেখানে মন্ত্রীর স্ত্রীর তাকে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা চালায়। কিন্তু সুবিধা করতে না পেরে সে শহরের অভিজাত নারীদের ডেকে এনে পরিস্থিতিকে আর কঠিন করার চেষ্টা করে। যার ফলে ইউসুফ (আ.) কারাগারে পর্যন্ত নিক্ষিপ্ত হন।
কিন্তু ইউসুফ (আ.) ভালোভাবেই অবগত ছিলেন যে, এসবই আল্লাহর পরিকল্পনা। আল্লাহ বিনা কারণে তাকে এমন মন্দ পরিবেশ ও নোংরা মানসিকতার মানুষদের দ্বারা বেষ্টিত করেননি। বরং এসবই ছিল তাঁর জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। তিনি দেখতে চান কিভাবে আপনি আপনার সেরাটা বের করে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন এবং সবর তথা ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জীবনে সত্য ও ন্যায়কে ধারণ করেন।
ইউসুফ (আ.) মৃত্যুর পরের জীবনে শুধু নেক ও সৎ লোকদের সাথে পুনরুত্থিত হতে চেয়েছেন। তিনি জানতেন, পৃথিবীতে তাঁর উদ্দেশ্য পূরণের জন্য খারাপ পরিবেশে থাকা অসুবিধাজনক নয়, যদি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ন্যায় ও সত্যের আলো সবদিকে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
শিক্ষা:
সূরা আন-নূরে ঈমানদার ব্যক্তিকে আলোকবর্তিকার সাথে তুলনা করা হয়েছে। তাই আমাদের জন্য আদর্শ হচ্ছে এমন ব্যক্তি হওয়া, যে কিনা অন্ধকার পরিবেশে আলো ছড়িয়ে দেবে। আশেপাশের লোকদের সাথে ভালো ব্যবহার করা, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সাথে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করার ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়াটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমাদের দায়িত্ব হবে সত্য ও ন্যায়কে ধারণ করা এবং নিজেদেরকে ওই আলোকবর্তিকায় রূপান্তরিত করা, যা অন্ধকারে আলো ছড়াবে।