📄 দু’আর দ্বিতীয় অংশ: এবং আমাকে বিভিন্ন জিনিসের তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়েছেন
আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে বক্তব্য ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে শিখিয়েছিলেন। তিনি জানেন, আল্লাহই তাকে এসব শিখিয়েছেন এবং আল্লাহ ব্যতীত তিনি এসব জিনিসের ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষমতা রাখেন না। ইউসুফ (আ.) বাদশাহর দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারায় তিনি প্রাসাদে আস্থা ও উচ্চ মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হন। আল্লাহ তা'আলা আমাদের পিতা আদম (আ.)-কে সমস্ত ভাষা ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিয়েছিলেন যেমনটি আমরা কুর'আন থেকে জেনেছি।
ইউসুফ (আ.) জাতির জন্য যা কিছু করেছিলেন, তাঁর জন্য তিনি নিজে কোনো কৃতিত্ব গ্রহণ না করে তিনি অকপটে স্বীকার করে নিলেন যে, এসবের পেছনে আল্লাহই ছিলেন এবং কেবল তাঁর সাহায্যেই উপহার হিসেবে তাকে যেসব ক্ষমতা বা বিশেষ গুণ প্রদান করা হয়েছে, সেগুলোর উপযুক্ত ব্যবহার তিনি করতে পেরেছিলেন। কখনও কখনও যেটাকে আমরা নিজের জন্য সুবিধা ভাবি, প্রকৃতপক্ষে তা আমাদের জন্য অসুবিধার কারণে পরিণত হয়। ইউসুফ (আ.)-কে বক্তব্য ও স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার যে বিশেষ ক্ষমতা বা গুণ প্রদান করা হয়েছিল, তিনি সেটাকে আল্লাহ প্রদত্ত দান বা অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং একইসাথে সর্বোত্তম উপায়ে সে ক্ষমতাকে আশেপাশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেন।
শিক্ষা:
যখন আল্লাহ নিজেই এর কৃতিত্ব নিচ্ছেন যে, তিনিই আমাদেরকে কিভাবে লিখতে হয়, তা শিখিয়েছিলেন, তখন কিভাবে আমরা এই চিন্তা করতে পারি যে, যে কলম দিয়ে আমরা লিখছি, তাঁর শক্তি আমাদের? আল্লাহই আমাদেরকে এসব করার অনুমতি ও সামর্থ্য দিয়েছেন এবং তিনিই আমাদের পড়তে, লিখতে ও বোঝার ক্ষমতা দান করেছেন। তাই আমরা জীবনে যা কিছুই করি না কেন, আমাদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে: তাঁর জন্য আল্লাহ তা'আলাকে কৃতিত্ব প্রদান করা।
📄 দু’আর তৃতীয় অংশ: হে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা
ইউসুফ (আ.) এই কথা বলে এই স্বীকৃতি দিচ্ছেন যে, আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলাই সমস্ত আধিপত্যের মালিক, তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই একক সত্তা, সবকিছুই যাঁর অধীন। যে মুহূর্তে তিনি উচ্চ মর্যাদায় আসীন হলেন এবং রাজপ্রাসাদে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করলেন, ঠিক সে সময় তিনি তিনি এই ঘোষণা দিচ্ছেন যে, তিনি আল্লাহর অনুগত বান্দা ছাড়া আর কিছুই নন। আল্লাহই ইউসুফ (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তাকে যাবতীয় উপহার ও অনুগ্রহ দান করেছেন। তিনিই তাকে শান-শওকত দান করেছেন এবং তিনিই তাকে তাঁর প্রিয় পিতা ও তাঁর পরিবারের সাথে আবার একত্র করেছেন। ইউসুফ (আ.) এটা অবগত যে, শক্তি কেবল আল্লাহ তা'আলার এবং তাঁর সাহায্য ছাড়া তিনি জীবনে যা কিছু লাভ করেছেন, তাঁর কিছুই সম্ভবপর ছিল না।
শিক্ষা:
আমাদেরকে সর্বদা এ কথা মনে রাখতে হবে যে, এই পৃথিবী আল্লাহর, পুরো জগৎ আল্লাহর। শক্তি-ক্ষমতা আল্লাহর এবং আমাদের জীবনের যা কিছু ঘটে, তাঁর সবই আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে ঘটে। আল্লাহই আমাদেরকে রিজিক দেন, অনুগ্রহ করেন, বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন এবং দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা সিক্ত করেন। আমরা যে পরিস্থিতিতেই থাকি না কেন, আমাদেরকে এটার স্বীকৃতি দেওয়া আবশ্যক যে, আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের রব (পালনকর্তা) এবং আমরা তাঁর দাস। এই বিশ্বাস আমাদেরকে বিনয়ী করে তোলে এবং আমাদের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধিতে সহায়তা করে।
📄 দু’আর চতুর্থ অংশ: আপনিই আমার অভিভাবক ইহকাল ও পরকালে
ওয়ালি (অভিভাবক)-এর গুণাগুণ: রক্ষাকর্তা, আপনার উপর সর্বাধিক অধিকার যার, আপনার পাশে সবসময় থাকেন যিনি, কর্তৃত্ব।
দু'আর এই অংশটি খুবই চমৎকার, কারণ ইউসুফ (আ.) ভালো করেই জানেন যে, একেবারে ছোটবেলাতেই যখন তাকে অন্ধকার কুয়াতে ফেলে দেওয়া হয়, আজও তিনি একা ছিলেন না, কারণ তাঁর ওয়ালি (অভিভাবক) আল্লাহ তাঁর সাথেই ছিলেন। মন্ত্রীর স্ত্রী যখন তাকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছিল এবং এর জের ধরে তাকে অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দী করা হয়, ঠিক তখনও আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে ছিলেন। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা তাকে রক্ষা করেন, সুরক্ষা দেন, পথ-নির্দেশনা দেন এবং ইউসুফ (আ.) যেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন, তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করেন। ইউসুফ (আ.) স্বীকার করছেন যে, বাহ্যিক পরিস্থিতি যতই খারাপ মনে হোক না কেন, আল্লাহ তা'আলা সর্বদা তাঁর সাথেই ছিলেন এবং তাকে রক্ষা করে আসছিলেন।
শিক্ষা:
আমাদের জীবনে আমরা এমন অধ্যায় পার করি, যখন আমরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকি। আমরা এতটা বেদনা ও কষ্টে আক্রান্ত থাকি যে, আমরা ভাবতে থাকি যদি কবে এই অন্ধকার পার করে একগুচ্ছ আলোর দেখা পাবো। আর ঠিক এমন মুহূর্তে আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, পরিস্থিতি আপাত দৃষ্টিতে যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হোক না কেন, আল্লাহ সর্বদা আমাদের সাথে আছেন। তিনিই আমাদের ওয়ালি তথা অভিভাবক এবং সংকটের মুহূর্তে তিনি কখনো আমাদের একা ফেলে আসেন না। যখন আমরা এমনটি করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের অন্তর প্রশান্ত হয়ে পড়ে।
আল্লাহ তা'আলা কুর'আনে বলেন: 'যারা ঈমানদার, তাদের অভিভাবক আল্লাহ। তাদেরকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।' - সূরা বাকারাহ, ২:২৫৭ (টেক্সটে ভুলবশত ২:২৮২ থাকতে পারে)
📄 দু’আর পঞ্চম অংশ: আমাকে ইসলামের উপর মৃত্যুদান করুন
মিশরের অর্থমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে এখন ইউসুফের (আ.) সব রয়েছে। তিনি ক্ষমতা, মর্যাদা ও আভিজাত্য পেয়েছেন, পুনরায় মিলিত হয়েছেন প্রিয় পিতা ও পরিবারের সাথে। তাঁর এখন আর কি চাওয়া থাকতে পারে?
কিন্তু তিনি আল্লাহর কাছে ঈমানদার হিসেবে মৃত্যুবরণ করার আর্জি পেশ করলেন। যখন সবকিছু স্বাভাবিক হতে থাকে, পরিস্থিতি অনুকূলে আসতে শুরু করে, তখন আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়াটা আমাদের জন্য বেশ সহজ হয়ে পড়ে। বিষয়টি ইউসুফ (আ.) বুঝতে পারেন, তাই তিনি এই আন্তরিক দু'আটি করেন, যেখানে তিনি চেয়েছেন ঈমানদার হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে।
শিক্ষা:
যখন সময় ভাল হতে থাকে, প্রায়শই আমরা তখন আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকি। আমরা আল্লাহকে ভুলে নিজেদের জীবন সংগ্রামে মগ্ন হয়ে পড়ি। অন্ধকারকে দূরে হটিয়ে আল্লাহ আমাদেরকে যে আলোর সন্ধান দিয়েছেন এবং আমাদের উপর তিনি প্রতিনিয়ত যে রহমত ও করুণা বর্ষণ করে যাচ্ছেন, তা ভুলে যাওয়া আমাদের জন্য চরম অকৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহর সাহায্য ও করুণার দ্বারাই আমরা আমাদের জীবনের সকল প্রতিবন্ধকতা পার করি। পরিশেষে, আমরা যদি ঈমানদার হিসেবে আল্লাহর নিকট পৌঁছাতে না পারি, তবে আমরা যত অর্জনই করি না কেন, তা মূল্যহীন।