📘 নবীদের দুআ 📄 দু’আর প্রথম অংশ: হে পালনকর্তা, আপনি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন

📄 দু’আর প্রথম অংশ: হে পালনকর্তা, আপনি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন


শিশু হিসেবে ইউসুফের (আ.) নিজের জীবনের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং যে ভাইয়েরা তাকে কুয়াতে ফেলে দিয়েছিল, তাদের উপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কে তাকে কুয়া থেকে উদ্ধার করবে, তাঁর ব্যাপারেও তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। যখন তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়, তখনও এ বিষয়ের উপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এরপর মন্ত্রীর বাড়িতে এবং কামুক নারীদের কলাকৌশলের উপরও তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আবার যখন তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, তখনও পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তাঁর জীবনে ঘটা জিনিসগুলোর উপর তাঁর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাকে তাঁর জীবনের উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ দান করেন এবং তাকে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা দান করেন। ইউসুফ (আ.) দু'আতে নিজের শক্তিহীন থাকার বিষয়টি উল্লেখ না করে এটা স্বীকার করে নেন যে, শক্তিহীন থাকা এবং বহু বছর কষ্টে কাটানোর পর আল্লাহ তাকে যে সম্মান ও আভিজাত্য দান করেছেন, তিনি তাঁর পেছনে থাকা প্রজ্ঞাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

শিক্ষা:
ইউসুফ (আ.) বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এ বিষয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোনো অভিযোগ আনেননি, আর না তিনি এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি আল্লাহকে এই বলে প্রশ্ন করেননি যে, 'আমি এর প্রাপ্য নই, কেন আমাকে এমন পরিস্থিতিতে রাখলেন?' প্রায়শই আমরা যখন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হই এবং পরবর্তীতে আল্লাহ যখন আমাদেরকে ওই সমস্যা থেকে উদ্ধার করেন, তখন আমরা যে সমস্যায় ছিলাম তা বেমালুম ভুলে যাই এবং স্বীকার করি না যে, আল্লাহই আমাদেরকে শক্তি দিয়ে ওই সমস্যা থেকে উদ্ধার করেছেন।

একজন পিতা ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে হারান, যার কারণে তিনি চরম কষ্টে ভোগেন, কিন্তু তিনি যদি তাঁর পুত্রকে না হারাতেন, তবে মিশরের গোটা জাতি অনাহারে আহাজারি করতো এবং অগণিত মৃত শিশুর জন্য কান্না করতো। ওই একটি শিশুটি বহু কষ্ট ভোগ করে নানা ঘটনার চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে রাজপ্রাসাদে পৌঁছান এবং বাদশাহের দেখা আজব স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি তাঁর নিজ পিতা ইয়াকুব (আ.) ও তাঁর পরিবারসহ হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হন। ইউসুফের (আ.) জীবনে যদি এসব না ঘটতো, তবে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সাথে হাজারো বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবনে এমন 'খায়ের' বা কল্যাণ আসতো না। আল্লাহ কুর'আনে বলেন: 'এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন গোটা মানবজাতির জীবন রক্ষা করে।' - সূরা মায়িদাহ, ৫:৩২

📘 নবীদের দুআ 📄 দু’আর দ্বিতীয় অংশ: এবং আমাকে বিভিন্ন জিনিসের তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়েছেন

📄 দু’আর দ্বিতীয় অংশ: এবং আমাকে বিভিন্ন জিনিসের তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়েছেন


আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে বক্তব্য ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে শিখিয়েছিলেন। তিনি জানেন, আল্লাহই তাকে এসব শিখিয়েছেন এবং আল্লাহ ব্যতীত তিনি এসব জিনিসের ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষমতা রাখেন না। ইউসুফ (আ.) বাদশাহর দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারায় তিনি প্রাসাদে আস্থা ও উচ্চ মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হন। আল্লাহ তা'আলা আমাদের পিতা আদম (আ.)-কে সমস্ত ভাষা ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিয়েছিলেন যেমনটি আমরা কুর'আন থেকে জেনেছি।

ইউসুফ (আ.) জাতির জন্য যা কিছু করেছিলেন, তাঁর জন্য তিনি নিজে কোনো কৃতিত্ব গ্রহণ না করে তিনি অকপটে স্বীকার করে নিলেন যে, এসবের পেছনে আল্লাহই ছিলেন এবং কেবল তাঁর সাহায্যেই উপহার হিসেবে তাকে যেসব ক্ষমতা বা বিশেষ গুণ প্রদান করা হয়েছে, সেগুলোর উপযুক্ত ব্যবহার তিনি করতে পেরেছিলেন। কখনও কখনও যেটাকে আমরা নিজের জন্য সুবিধা ভাবি, প্রকৃতপক্ষে তা আমাদের জন্য অসুবিধার কারণে পরিণত হয়। ইউসুফ (আ.)-কে বক্তব্য ও স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার যে বিশেষ ক্ষমতা বা গুণ প্রদান করা হয়েছিল, তিনি সেটাকে আল্লাহ প্রদত্ত দান বা অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং একইসাথে সর্বোত্তম উপায়ে সে ক্ষমতাকে আশেপাশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেন।

শিক্ষা:
যখন আল্লাহ নিজেই এর কৃতিত্ব নিচ্ছেন যে, তিনিই আমাদেরকে কিভাবে লিখতে হয়, তা শিখিয়েছিলেন, তখন কিভাবে আমরা এই চিন্তা করতে পারি যে, যে কলম দিয়ে আমরা লিখছি, তাঁর শক্তি আমাদের? আল্লাহই আমাদেরকে এসব করার অনুমতি ও সামর্থ্য দিয়েছেন এবং তিনিই আমাদের পড়তে, লিখতে ও বোঝার ক্ষমতা দান করেছেন। তাই আমরা জীবনে যা কিছুই করি না কেন, আমাদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে: তাঁর জন্য আল্লাহ তা'আলাকে কৃতিত্ব প্রদান করা।

📘 নবীদের দুআ 📄 দু’আর তৃতীয় অংশ: হে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা

📄 দু’আর তৃতীয় অংশ: হে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা


ইউসুফ (আ.) এই কথা বলে এই স্বীকৃতি দিচ্ছেন যে, আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলাই সমস্ত আধিপত্যের মালিক, তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই একক সত্তা, সবকিছুই যাঁর অধীন। যে মুহূর্তে তিনি উচ্চ মর্যাদায় আসীন হলেন এবং রাজপ্রাসাদে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করলেন, ঠিক সে সময় তিনি তিনি এই ঘোষণা দিচ্ছেন যে, তিনি আল্লাহর অনুগত বান্দা ছাড়া আর কিছুই নন। আল্লাহই ইউসুফ (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তাকে যাবতীয় উপহার ও অনুগ্রহ দান করেছেন। তিনিই তাকে শান-শওকত দান করেছেন এবং তিনিই তাকে তাঁর প্রিয় পিতা ও তাঁর পরিবারের সাথে আবার একত্র করেছেন। ইউসুফ (আ.) এটা অবগত যে, শক্তি কেবল আল্লাহ তা'আলার এবং তাঁর সাহায্য ছাড়া তিনি জীবনে যা কিছু লাভ করেছেন, তাঁর কিছুই সম্ভবপর ছিল না।

শিক্ষা:
আমাদেরকে সর্বদা এ কথা মনে রাখতে হবে যে, এই পৃথিবী আল্লাহর, পুরো জগৎ আল্লাহর। শক্তি-ক্ষমতা আল্লাহর এবং আমাদের জীবনের যা কিছু ঘটে, তাঁর সবই আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে ঘটে। আল্লাহই আমাদেরকে রিজিক দেন, অনুগ্রহ করেন, বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন এবং দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা সিক্ত করেন। আমরা যে পরিস্থিতিতেই থাকি না কেন, আমাদেরকে এটার স্বীকৃতি দেওয়া আবশ্যক যে, আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের রব (পালনকর্তা) এবং আমরা তাঁর দাস। এই বিশ্বাস আমাদেরকে বিনয়ী করে তোলে এবং আমাদের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধিতে সহায়তা করে।

📘 নবীদের দুআ 📄 দু’আর চতুর্থ অংশ: আপনিই আমার অভিভাবক ইহকাল ও পরকালে

📄 দু’আর চতুর্থ অংশ: আপনিই আমার অভিভাবক ইহকাল ও পরকালে


ওয়ালি (অভিভাবক)-এর গুণাগুণ: রক্ষাকর্তা, আপনার উপর সর্বাধিক অধিকার যার, আপনার পাশে সবসময় থাকেন যিনি, কর্তৃত্ব।

দু'আর এই অংশটি খুবই চমৎকার, কারণ ইউসুফ (আ.) ভালো করেই জানেন যে, একেবারে ছোটবেলাতেই যখন তাকে অন্ধকার কুয়াতে ফেলে দেওয়া হয়, আজও তিনি একা ছিলেন না, কারণ তাঁর ওয়ালি (অভিভাবক) আল্লাহ তাঁর সাথেই ছিলেন। মন্ত্রীর স্ত্রী যখন তাকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছিল এবং এর জের ধরে তাকে অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দী করা হয়, ঠিক তখনও আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে ছিলেন। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা তাকে রক্ষা করেন, সুরক্ষা দেন, পথ-নির্দেশনা দেন এবং ইউসুফ (আ.) যেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন, তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করেন। ইউসুফ (আ.) স্বীকার করছেন যে, বাহ্যিক পরিস্থিতি যতই খারাপ মনে হোক না কেন, আল্লাহ তা'আলা সর্বদা তাঁর সাথেই ছিলেন এবং তাকে রক্ষা করে আসছিলেন।

শিক্ষা:
আমাদের জীবনে আমরা এমন অধ্যায় পার করি, যখন আমরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকি। আমরা এতটা বেদনা ও কষ্টে আক্রান্ত থাকি যে, আমরা ভাবতে থাকি যদি কবে এই অন্ধকার পার করে একগুচ্ছ আলোর দেখা পাবো। আর ঠিক এমন মুহূর্তে আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, পরিস্থিতি আপাত দৃষ্টিতে যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হোক না কেন, আল্লাহ সর্বদা আমাদের সাথে আছেন। তিনিই আমাদের ওয়ালি তথা অভিভাবক এবং সংকটের মুহূর্তে তিনি কখনো আমাদের একা ফেলে আসেন না। যখন আমরা এমনটি করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের অন্তর প্রশান্ত হয়ে পড়ে।

আল্লাহ তা'আলা কুর'আনে বলেন: 'যারা ঈমানদার, তাদের অভিভাবক আল্লাহ। তাদেরকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।' - সূরা বাকারাহ, ২:২৫৭ (টেক্সটে ভুলবশত ২:২৮২ থাকতে পারে)

ফন্ট সাইজ
15px
17px