📘 নবীদের দুআ 📄 ইউসুফের (আ.) সুন্দর দু’আ (৬ অংশে একটি দু’আ)

📄 ইউসুফের (আ.) সুন্দর দু’আ (৬ অংশে একটি দু’আ)


১. رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ
'হে পালনকর্তা, আপনি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন'
- আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে নিজের জীবন এবং অন্যদের উপর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দান করলেন।

২. وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ
এবং আমাকে বিভিন্ন জিনিসের তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়েছেন
- আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে বক্তব্য ও স্বপ্ন ব্যাখ্যার শক্তি দান করেছিলেন।

৩. فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
হে নভোমন্ডল ও ভূ-মণ্ডলের স্রষ্টা
- আল্লাহ তা'আলা একক, কেবলমাত্র তিনিই পারেন ক্ষমতা ও অলৌকিকতা দান করতে।

৪. أَنتَ وَلِي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
আপনিই আমার অভিভাবক ইহকাল ও পরকালে
- আল্লাহ সর্বদা ইউসুফের (আ.) সাথে আছেন।

৫. تَوَفَّنِي مُسْلِمًا
আমাকে ইসলামের উপর মৃত্যুদান করুন
- ইউসুফ (আ.) আল্লাহর কাছে বিনীত দাস হয়ে মৃত্যুবরণ করার জন্য আকুল আবেদন করেন।

৬. وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে সৎকর্মীদের সাথে মিলিত করুন
- দ্বিতীয় দু'আ, আখিরাতে ধার্মিক লোকদের সাথে থাকার জন্য।

📘 নবীদের দুআ 📄 দু’আর গূঢ় মর্ম উপলব্ধি করা

📄 দু’আর গূঢ় মর্ম উপলব্ধি করা


এই দু'আ থেকে শিক্ষা নিতে আমরা একে ৬-টি ভাগে বিভক্ত করেছি। আসুন এখন দু'আর গভীরতা এবং এর থেকে কি কি বিষয় শিক্ষা নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করি।

📘 নবীদের দুআ 📄 দু’আর প্রথম অংশ: হে পালনকর্তা, আপনি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন

📄 দু’আর প্রথম অংশ: হে পালনকর্তা, আপনি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন


শিশু হিসেবে ইউসুফের (আ.) নিজের জীবনের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং যে ভাইয়েরা তাকে কুয়াতে ফেলে দিয়েছিল, তাদের উপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কে তাকে কুয়া থেকে উদ্ধার করবে, তাঁর ব্যাপারেও তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। যখন তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়, তখনও এ বিষয়ের উপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এরপর মন্ত্রীর বাড়িতে এবং কামুক নারীদের কলাকৌশলের উপরও তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আবার যখন তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, তখনও পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তাঁর জীবনে ঘটা জিনিসগুলোর উপর তাঁর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাকে তাঁর জীবনের উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ দান করেন এবং তাকে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা দান করেন। ইউসুফ (আ.) দু'আতে নিজের শক্তিহীন থাকার বিষয়টি উল্লেখ না করে এটা স্বীকার করে নেন যে, শক্তিহীন থাকা এবং বহু বছর কষ্টে কাটানোর পর আল্লাহ তাকে যে সম্মান ও আভিজাত্য দান করেছেন, তিনি তাঁর পেছনে থাকা প্রজ্ঞাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

শিক্ষা:
ইউসুফ (আ.) বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এ বিষয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোনো অভিযোগ আনেননি, আর না তিনি এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি আল্লাহকে এই বলে প্রশ্ন করেননি যে, 'আমি এর প্রাপ্য নই, কেন আমাকে এমন পরিস্থিতিতে রাখলেন?' প্রায়শই আমরা যখন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হই এবং পরবর্তীতে আল্লাহ যখন আমাদেরকে ওই সমস্যা থেকে উদ্ধার করেন, তখন আমরা যে সমস্যায় ছিলাম তা বেমালুম ভুলে যাই এবং স্বীকার করি না যে, আল্লাহই আমাদেরকে শক্তি দিয়ে ওই সমস্যা থেকে উদ্ধার করেছেন।

একজন পিতা ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে হারান, যার কারণে তিনি চরম কষ্টে ভোগেন, কিন্তু তিনি যদি তাঁর পুত্রকে না হারাতেন, তবে মিশরের গোটা জাতি অনাহারে আহাজারি করতো এবং অগণিত মৃত শিশুর জন্য কান্না করতো। ওই একটি শিশুটি বহু কষ্ট ভোগ করে নানা ঘটনার চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে রাজপ্রাসাদে পৌঁছান এবং বাদশাহের দেখা আজব স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি তাঁর নিজ পিতা ইয়াকুব (আ.) ও তাঁর পরিবারসহ হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হন। ইউসুফের (আ.) জীবনে যদি এসব না ঘটতো, তবে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সাথে হাজারো বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবনে এমন 'খায়ের' বা কল্যাণ আসতো না। আল্লাহ কুর'আনে বলেন: 'এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন গোটা মানবজাতির জীবন রক্ষা করে।' - সূরা মায়িদাহ, ৫:৩২

📘 নবীদের দুআ 📄 দু’আর দ্বিতীয় অংশ: এবং আমাকে বিভিন্ন জিনিসের তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়েছেন

📄 দু’আর দ্বিতীয় অংশ: এবং আমাকে বিভিন্ন জিনিসের তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়েছেন


আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে বক্তব্য ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে শিখিয়েছিলেন। তিনি জানেন, আল্লাহই তাকে এসব শিখিয়েছেন এবং আল্লাহ ব্যতীত তিনি এসব জিনিসের ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষমতা রাখেন না। ইউসুফ (আ.) বাদশাহর দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারায় তিনি প্রাসাদে আস্থা ও উচ্চ মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হন। আল্লাহ তা'আলা আমাদের পিতা আদম (আ.)-কে সমস্ত ভাষা ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিয়েছিলেন যেমনটি আমরা কুর'আন থেকে জেনেছি।

ইউসুফ (আ.) জাতির জন্য যা কিছু করেছিলেন, তাঁর জন্য তিনি নিজে কোনো কৃতিত্ব গ্রহণ না করে তিনি অকপটে স্বীকার করে নিলেন যে, এসবের পেছনে আল্লাহই ছিলেন এবং কেবল তাঁর সাহায্যেই উপহার হিসেবে তাকে যেসব ক্ষমতা বা বিশেষ গুণ প্রদান করা হয়েছে, সেগুলোর উপযুক্ত ব্যবহার তিনি করতে পেরেছিলেন। কখনও কখনও যেটাকে আমরা নিজের জন্য সুবিধা ভাবি, প্রকৃতপক্ষে তা আমাদের জন্য অসুবিধার কারণে পরিণত হয়। ইউসুফ (আ.)-কে বক্তব্য ও স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার যে বিশেষ ক্ষমতা বা গুণ প্রদান করা হয়েছিল, তিনি সেটাকে আল্লাহ প্রদত্ত দান বা অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং একইসাথে সর্বোত্তম উপায়ে সে ক্ষমতাকে আশেপাশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেন।

শিক্ষা:
যখন আল্লাহ নিজেই এর কৃতিত্ব নিচ্ছেন যে, তিনিই আমাদেরকে কিভাবে লিখতে হয়, তা শিখিয়েছিলেন, তখন কিভাবে আমরা এই চিন্তা করতে পারি যে, যে কলম দিয়ে আমরা লিখছি, তাঁর শক্তি আমাদের? আল্লাহই আমাদেরকে এসব করার অনুমতি ও সামর্থ্য দিয়েছেন এবং তিনিই আমাদের পড়তে, লিখতে ও বোঝার ক্ষমতা দান করেছেন। তাই আমরা জীবনে যা কিছুই করি না কেন, আমাদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে: তাঁর জন্য আল্লাহ তা'আলাকে কৃতিত্ব প্রদান করা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px