📘 নবীদের দুআ 📄 পরিবারের সাথে পুনর্মিলন

📄 পরিবারের সাথে পুনর্মিলন


সময় অতিবাহিত হতে থাকে, সুজলা-সুফলা সাত বছর পেরিয়ে আসে দুর্ভিক্ষ-খরার সাত বছর। প্রথম সাত বছর তিনি অত্যন্ত সফলভাবে খাদ্যশস্য মজুদ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যার ফলে তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবেই দুর্ভিক্ষকে মোকাবেলা করতে পারছিলেন। যারাই তাঁর কাছে খাদ্য সহায়তার জন্য আসতো, তিনি তাদের মধ্যে সঞ্চিত শস্য বিতরণ করতেন।

দুর্ভিক্ষের কারণে আশেপাশের অঞ্চলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফিলিস্তিন ও তাঁর নিকটস্থ এলাকাগুলোও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। ফলশ্রুতিতে ইয়াকুবের (আ.) পরিবারও খাদ্যাভাবের মুখোমুখি হয়। তারা শুনতে পায় যে, মিশরের অর্থমন্ত্রী জিনিসপত্রের বিনিময়ে খাবার দান করছেন। সে মোতাবেক বৃদ্ধ ইয়াকুব (আ.) তাঁর ছেলেদেরকে খাবার কিনতে মিশরে পাঠান।

ভাইয়েরা যখন মিশরে পৌঁছায় এবং খাবার সংগ্রহের জন্য ইউসুফের (আ.) কাছে যায়, তখনই তিনি তাদেরকে চিনতে পারেন। কিন্তু কুয়াতে ফেলে দেওয়ার পর যেহেতু তারা আর তাকে দেখেনি, তাই তারা আর ইউসুফ (আ.)-কে চিনতে পারেনি। তারা কিভাবে জানবে যে, যে ভাই তারা কুয়াতে ফেলে দিয়েছিল, আজ সেই ভাইটিই মিশরের অর্থমন্ত্রী?

এভাবে ইউসুফ (আ.) নিজের প্রজ্ঞার মাধ্যমে তাঁর ভাইদের দ্বারা নিজের পিতা ইয়াকুব (আ.)-কে প্রাসাদে নিয়ে আসেন এবং এর মাধ্যমে তিনি শেষমেশ তাঁর প্রিয় পিতার সাথে পুনরায় মিলিত হন। ইউসুফের (আ.) পরিবারের সকলে ফিলিস্তিন থেকে মিশরের দিকে যাত্রা করে এবং ইয়াকুবের (আ.) পরিবার যখন মিশরের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন ইউসুফ (আ.) তাঁর পিতামাতাকে রাজকীয় সম্মানের সাথে গ্রহণ করতে বেরিয়ে পড়েন, আর তখন তাঁর সাথে ছিল রাজা ও সভাসদবর্গ:

وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا وَقَالَ يَا أَبَتِ هَذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا

'এবং তিনি পিতামাতাকে সিংহাসনের উপর বসালেন এবং তারা সবাই তাঁর সামনে সেজদাবনত হল। এবং তিনি বললেন, (হে আমার) পিতা, এ হচ্ছে আমার ইতিপূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আমার পালনকর্তা যেটাকে সত্যে পরিণত করেছেন।' - সূরা ইউসুফ, ১২:১০০ (টেক্সটে ভুলবশত ১২:৪৭-৪৯ লেখা থাকতে পারে)

📘 নবীদের দুআ 📄 ইউসুফের (আ.) সুন্দর দু’আ (৬ অংশে একটি দু’আ)

📄 ইউসুফের (আ.) সুন্দর দু’আ (৬ অংশে একটি দু’আ)


১. رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ
'হে পালনকর্তা, আপনি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন'
- আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে নিজের জীবন এবং অন্যদের উপর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দান করলেন।

২. وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ
এবং আমাকে বিভিন্ন জিনিসের তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়েছেন
- আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে বক্তব্য ও স্বপ্ন ব্যাখ্যার শক্তি দান করেছিলেন।

৩. فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
হে নভোমন্ডল ও ভূ-মণ্ডলের স্রষ্টা
- আল্লাহ তা'আলা একক, কেবলমাত্র তিনিই পারেন ক্ষমতা ও অলৌকিকতা দান করতে।

৪. أَنتَ وَلِي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
আপনিই আমার অভিভাবক ইহকাল ও পরকালে
- আল্লাহ সর্বদা ইউসুফের (আ.) সাথে আছেন।

৫. تَوَفَّنِي مُسْلِمًا
আমাকে ইসলামের উপর মৃত্যুদান করুন
- ইউসুফ (আ.) আল্লাহর কাছে বিনীত দাস হয়ে মৃত্যুবরণ করার জন্য আকুল আবেদন করেন।

৬. وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে সৎকর্মীদের সাথে মিলিত করুন
- দ্বিতীয় দু'আ, আখিরাতে ধার্মিক লোকদের সাথে থাকার জন্য।

📘 নবীদের দুআ 📄 দু’আর গূঢ় মর্ম উপলব্ধি করা

📄 দু’আর গূঢ় মর্ম উপলব্ধি করা


এই দু'আ থেকে শিক্ষা নিতে আমরা একে ৬-টি ভাগে বিভক্ত করেছি। আসুন এখন দু'আর গভীরতা এবং এর থেকে কি কি বিষয় শিক্ষা নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করি।

📘 নবীদের দুআ 📄 দু’আর প্রথম অংশ: হে পালনকর্তা, আপনি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন

📄 দু’আর প্রথম অংশ: হে পালনকর্তা, আপনি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন


শিশু হিসেবে ইউসুফের (আ.) নিজের জীবনের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং যে ভাইয়েরা তাকে কুয়াতে ফেলে দিয়েছিল, তাদের উপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কে তাকে কুয়া থেকে উদ্ধার করবে, তাঁর ব্যাপারেও তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। যখন তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়, তখনও এ বিষয়ের উপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এরপর মন্ত্রীর বাড়িতে এবং কামুক নারীদের কলাকৌশলের উপরও তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আবার যখন তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, তখনও পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তাঁর জীবনে ঘটা জিনিসগুলোর উপর তাঁর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাকে তাঁর জীবনের উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ দান করেন এবং তাকে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা দান করেন। ইউসুফ (আ.) দু'আতে নিজের শক্তিহীন থাকার বিষয়টি উল্লেখ না করে এটা স্বীকার করে নেন যে, শক্তিহীন থাকা এবং বহু বছর কষ্টে কাটানোর পর আল্লাহ তাকে যে সম্মান ও আভিজাত্য দান করেছেন, তিনি তাঁর পেছনে থাকা প্রজ্ঞাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

শিক্ষা:
ইউসুফ (আ.) বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এ বিষয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোনো অভিযোগ আনেননি, আর না তিনি এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি আল্লাহকে এই বলে প্রশ্ন করেননি যে, 'আমি এর প্রাপ্য নই, কেন আমাকে এমন পরিস্থিতিতে রাখলেন?' প্রায়শই আমরা যখন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হই এবং পরবর্তীতে আল্লাহ যখন আমাদেরকে ওই সমস্যা থেকে উদ্ধার করেন, তখন আমরা যে সমস্যায় ছিলাম তা বেমালুম ভুলে যাই এবং স্বীকার করি না যে, আল্লাহই আমাদেরকে শক্তি দিয়ে ওই সমস্যা থেকে উদ্ধার করেছেন।

একজন পিতা ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে হারান, যার কারণে তিনি চরম কষ্টে ভোগেন, কিন্তু তিনি যদি তাঁর পুত্রকে না হারাতেন, তবে মিশরের গোটা জাতি অনাহারে আহাজারি করতো এবং অগণিত মৃত শিশুর জন্য কান্না করতো। ওই একটি শিশুটি বহু কষ্ট ভোগ করে নানা ঘটনার চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে রাজপ্রাসাদে পৌঁছান এবং বাদশাহের দেখা আজব স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি তাঁর নিজ পিতা ইয়াকুব (আ.) ও তাঁর পরিবারসহ হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হন। ইউসুফের (আ.) জীবনে যদি এসব না ঘটতো, তবে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সাথে হাজারো বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবনে এমন 'খায়ের' বা কল্যাণ আসতো না। আল্লাহ কুর'আনে বলেন: 'এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন গোটা মানবজাতির জীবন রক্ষা করে।' - সূরা মায়িদাহ, ৫:৩২

ফন্ট সাইজ
15px
17px