📄 ইউসুফের (আ.) দ্বারা স্বপ্নের ব্যাখ্যা
ইউসুফের (আ.) দেওয়া ব্যাখ্যা যে সঠিক, তা বাদশাহ ও তাঁর পরিষদ বুঝতে সক্ষম হয় এবং একই সাথে ইউসুফ (আ.)-কে অন্যায়ভাবে বন্দী করা যে কতটা ভুল ছিল, তা তারা উপলব্ধি করে। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের বদৌলতেই ইউসুফ (আ.) বাদশাহের দেখা এই স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হন।
قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَأَبًا فَمَا حَصَدتُّمْ فَذَرُوهُ فِي سُنبুলোহি إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تَأْكُلُونَ ﴿৪৭﴾ ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّا تُحْصِنُونَ ﴿৪৮﴾ ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ
'ইউসুফ বললো, তোমরা সাত বছর উত্তমরূপে চাষাবাদ করবে। অতপর যা কাটবে, তাঁর মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে, তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শীষসমেত রেখে দেবে। এবং এরপরে আসবে দুর্ভিক্ষের সাত বছর; তোমরা এ দিনের জন্যে যা রেখেছিলে, তা খেয়ে যাবে, কিন্তু অল্প পরিমাণ ব্যতীত, যা তোমরা তুলে রাখবে। এর পরেই আসবে একবছর, এতে মানুষের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং এতে তারা রস নিঙড়াবে (জলপাই ও আঙ্গুর)।' - সূরা ইউসুফ, ১২:৪৭-৪৯
📄 ইউসুফের (আ.) ক্ষমতা লাভ
বাদশাহ ব্যাখ্যায় মুগ্ধ হন। তিনি ইউসুফ (আ.)-কে তৎক্ষণাৎ তাঁর কাছে আনার নির্দেশ দেন। তৎক্ষণাৎ ইউসুফ (আ.)-কে কারাগার থেকে বের করে আনা হয়, কিন্তু এতে ইউসুফের (আ.) একটি শর্ত ছিল। কারাগার থেকে মুক্ত করতে আসা দূতের সাথে ইউসুফ (আ.) যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখান, তা বাদশাহর জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। ইউসুফ (আ.) কারাগার ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান, যতক্ষণ না তাঁর ও ওইসব অভিজাত নারীর সাথে যে ঘটনাটি ঘটেছিল, তাঁর মীমাংসা না করা হচ্ছে।
মুক্তিলাভের আগে ইউসুফের (আ.) নিকট দু'টো বিষয় প্রতিষ্ঠিত করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমত, মন্ত্রীর স্ত্রী ও তাঁর সহযোগী নারীদের সাথে ঘটা বিষয়টি পরিষ্কার করে নিজেকে নির্দোষ হিসেবে প্রমাণ করা। দ্বিতীয়ত, ইউসুফের (আ.) জন্য এমন আশ্বাসের প্রয়োজন ছিল যে, কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আর কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন না। যেকোনো একটি কিংবা উভয় শর্ত পূরণ না হলে তিনি কারাগারে থাকাকেই পছন্দ করবেন।
ইউসুফ (আ.) বিনয়ের সাথে নারীঘটিত বিষয়টির তদন্ত করতে বলেন। বাদশাহ বেশ কৌতূহলী হয়ে ওঠেন এবং আল-আজিজ তথা মন্ত্রীর স্ত্রী ও তাঁর সহযোগীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠান। ওই নারীরা সবকিছু স্বীকার করে নেয় এবং ইউসুফ (আ.) যে নির্দোষ ছিলেন, তা অকপটে মেনে নেয়।
📄 অর্থমন্ত্রী হিসেবে ইউসুফ (আ.)
ইউসুফ (আ.) বাদশাহর কাছে অনুরোধ করেন যে, তাকে যেন রাজ্যের ভাণ্ডারগুলির অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তাঁর অনুরোধ মঞ্জুর হয় এবং এভাবে ইউসুফ (আ.) মিশরের অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। ইউসুফ (আ.) স্বীয় প্রতিপালকের বাণী প্রচার করতে থাকেন এবং আল্লাহর আদেশে ন্যায়বিচার দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম ৭ বছরে জনগণের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি তিনি প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য জমা করতে থাকেন।
যে ছেলেকে বিশ্বাসঘাতকতা করে কুয়াতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, আজ সেই কিনা মিশরের অর্থমন্ত্রী। ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং সর্বোপরি আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার মাধ্যমেই তিনি এমন বড় পুরস্কার লাভ করতে সক্ষম হন। ইউসুফ (আ.) এটা ভালো করেই জানতেন যে, ধৈর্য ও তাকওয়া বা আল্লাহভীতির প্রকৃত প্রতিদান আখিরাতে পাওয়া যাবে।
📄 পরিবারের সাথে পুনর্মিলন
সময় অতিবাহিত হতে থাকে, সুজলা-সুফলা সাত বছর পেরিয়ে আসে দুর্ভিক্ষ-খরার সাত বছর। প্রথম সাত বছর তিনি অত্যন্ত সফলভাবে খাদ্যশস্য মজুদ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যার ফলে তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবেই দুর্ভিক্ষকে মোকাবেলা করতে পারছিলেন। যারাই তাঁর কাছে খাদ্য সহায়তার জন্য আসতো, তিনি তাদের মধ্যে সঞ্চিত শস্য বিতরণ করতেন।
দুর্ভিক্ষের কারণে আশেপাশের অঞ্চলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফিলিস্তিন ও তাঁর নিকটস্থ এলাকাগুলোও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। ফলশ্রুতিতে ইয়াকুবের (আ.) পরিবারও খাদ্যাভাবের মুখোমুখি হয়। তারা শুনতে পায় যে, মিশরের অর্থমন্ত্রী জিনিসপত্রের বিনিময়ে খাবার দান করছেন। সে মোতাবেক বৃদ্ধ ইয়াকুব (আ.) তাঁর ছেলেদেরকে খাবার কিনতে মিশরে পাঠান।
ভাইয়েরা যখন মিশরে পৌঁছায় এবং খাবার সংগ্রহের জন্য ইউসুফের (আ.) কাছে যায়, তখনই তিনি তাদেরকে চিনতে পারেন। কিন্তু কুয়াতে ফেলে দেওয়ার পর যেহেতু তারা আর তাকে দেখেনি, তাই তারা আর ইউসুফ (আ.)-কে চিনতে পারেনি। তারা কিভাবে জানবে যে, যে ভাই তারা কুয়াতে ফেলে দিয়েছিল, আজ সেই ভাইটিই মিশরের অর্থমন্ত্রী?
এভাবে ইউসুফ (আ.) নিজের প্রজ্ঞার মাধ্যমে তাঁর ভাইদের দ্বারা নিজের পিতা ইয়াকুব (আ.)-কে প্রাসাদে নিয়ে আসেন এবং এর মাধ্যমে তিনি শেষমেশ তাঁর প্রিয় পিতার সাথে পুনরায় মিলিত হন। ইউসুফের (আ.) পরিবারের সকলে ফিলিস্তিন থেকে মিশরের দিকে যাত্রা করে এবং ইয়াকুবের (আ.) পরিবার যখন মিশরের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন ইউসুফ (আ.) তাঁর পিতামাতাকে রাজকীয় সম্মানের সাথে গ্রহণ করতে বেরিয়ে পড়েন, আর তখন তাঁর সাথে ছিল রাজা ও সভাসদবর্গ:
وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا وَقَالَ يَا أَبَتِ هَذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا
'এবং তিনি পিতামাতাকে সিংহাসনের উপর বসালেন এবং তারা সবাই তাঁর সামনে সেজদাবনত হল। এবং তিনি বললেন, (হে আমার) পিতা, এ হচ্ছে আমার ইতিপূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আমার পালনকর্তা যেটাকে সত্যে পরিণত করেছেন।' - সূরা ইউসুফ, ১২:১০০ (টেক্সটে ভুলবশত ১২:৪৭-৪৯ লেখা থাকতে পারে)