📄 ইউসুফের (আ.) সাথে পিতা ইয়াকুব (আ.) এবং পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলন
আসুন আমরা ইউসুফ (আ.) এই আরেকটি দু'আ পর্যালোচনা করি, তবে তাঁর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে আমাদেরকে কিছুটা পেছনে ফিরে যেতে হবে।
ইউসুফ (আ.) যেসব পরিস্থিতি পার করছেন, আসুন আমরা সেগুলোর দিকে একটু নজর দিই:
১. (বাল্যকাল) নিজের ভাইয়েরা তাকে কুয়ার মধ্যে ফেলে দেয়।
২. কুয়া থেকে উদ্ধার করে তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
৩. (তরুণ) মন্ত্রীর স্ত্রী তাকে ব্যভিচারের জন্য প্রলোভন দেখায়।
৪. এমন পরিবেশের মুখোমুখি হন, যার চতুর্দিক কামুক নারীদের পদচারণায় মুখর।
৫. (প্রাপ্তবয়স্ক) মিথ্যা অভিযোগে বছরের পর বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়।
৬. কারাগারের সাথি বিশ্বাসঘাতকতা করে, যাকে ইউসুফ (আ.) সাহায্য করেছিলেন।
ইউসুফ (আ.) শৈশব থেকে যৌবন অবধি যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান এবং পিতা ইয়াকুবের (আ.) সাথে পুনরায় মিলিত হওয়ার মাধ্যমে ইউসুফের (আ.) ঘটনাটি একটি সুন্দর পরিণতি লাভ করে। কিন্তু এই পুনর্মিলনের আগে আশ্চর্যজনক কিছু ঘটনা ঘটে, যা এই পুনর্মিলনকে বাস্তবে রূপ দিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউসুফ (আ.) তাঁর পিতা ও তাঁর পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার পর যে দু'আ করেন, তাঁর প্রকৃত হাকিকত উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকে ওই ঘটনাগুলো জানতে হবে এবং এজন্য একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে।
📄 ফিরে দেখা
উপযুক্ত সময়েই ইউসুফ (আ.)-কে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, তবে ওই সময়ে এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মিশরের বাদশাহ একটি স্বপ্ন দেখেন, যা ইউসুফ (আ.)-কে পুরো সম্মান ও মর্যাদার সাথে জেল থেকে বের করে আনার মূল কারণ হয়ে ওঠে:
وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي رُؤْيَايَ إِن كُنتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُونَ
'বাদশাহ বললো, আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভী, এদেরকে সাতটি শীর্ণ গাভী খেয়ে যাচ্ছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে পরিষদবর্গ! তোমরা আমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলো, যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাকো।' - সূরা ইউসুফ, ১২:৪৩
বাদশার সভাসদরা বাদশাহর মতোই হতবাক হয়ে যায় এবং এই স্বপ্নকে কল্পনাপ্রসূত আখ্যা দিয়ে তারা বলে, এই স্বপ্ন ব্যাখ্যার উপযোগী নয় (সূরা ইউসুফ, ১২:৪৪)। ইউসুফের (আ.) সাথে কারাগারে ছিল এমন এক মদ-পরিবেশক যখন বাদশাহর এমন স্বপ্নের কথা শুনে, তখন তাঁর মনে ইউসুফের (আ.) কথা ভেসে ওঠে, যেহেতু কারাগারে বহু বছর আগে ইউসুফ (আ.) একবার এই লোকের দেখা স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। সে নিজে থেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে এগিয়ে আসে এবং বলে তাকে যেন ইউসুফের (আ.) কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। লোকটি কারাগারে ফিরে আসেন এবং ইউসুফের (আ.) কাছে স্বপ্নটির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে এর ব্যাখ্যা দিতে অনুরোধ করেন, যাতে তিনি দরবারের লোকদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানাতে পারেন (সূরা ইউসুফ, ১২:৪৬)।
📄 ইউসুফের (আ.) দ্বারা স্বপ্নের ব্যাখ্যা
ইউসুফের (আ.) দেওয়া ব্যাখ্যা যে সঠিক, তা বাদশাহ ও তাঁর পরিষদ বুঝতে সক্ষম হয় এবং একই সাথে ইউসুফ (আ.)-কে অন্যায়ভাবে বন্দী করা যে কতটা ভুল ছিল, তা তারা উপলব্ধি করে। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের বদৌলতেই ইউসুফ (আ.) বাদশাহের দেখা এই স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হন।
قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَأَبًا فَمَا حَصَدتُّمْ فَذَرُوهُ فِي سُنبুলোহি إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تَأْكُلُونَ ﴿৪৭﴾ ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّا تُحْصِنُونَ ﴿৪৮﴾ ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ
'ইউসুফ বললো, তোমরা সাত বছর উত্তমরূপে চাষাবাদ করবে। অতপর যা কাটবে, তাঁর মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে, তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শীষসমেত রেখে দেবে। এবং এরপরে আসবে দুর্ভিক্ষের সাত বছর; তোমরা এ দিনের জন্যে যা রেখেছিলে, তা খেয়ে যাবে, কিন্তু অল্প পরিমাণ ব্যতীত, যা তোমরা তুলে রাখবে। এর পরেই আসবে একবছর, এতে মানুষের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং এতে তারা রস নিঙড়াবে (জলপাই ও আঙ্গুর)।' - সূরা ইউসুফ, ১২:৪৭-৪৯
📄 ইউসুফের (আ.) ক্ষমতা লাভ
বাদশাহ ব্যাখ্যায় মুগ্ধ হন। তিনি ইউসুফ (আ.)-কে তৎক্ষণাৎ তাঁর কাছে আনার নির্দেশ দেন। তৎক্ষণাৎ ইউসুফ (আ.)-কে কারাগার থেকে বের করে আনা হয়, কিন্তু এতে ইউসুফের (আ.) একটি শর্ত ছিল। কারাগার থেকে মুক্ত করতে আসা দূতের সাথে ইউসুফ (আ.) যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখান, তা বাদশাহর জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। ইউসুফ (আ.) কারাগার ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান, যতক্ষণ না তাঁর ও ওইসব অভিজাত নারীর সাথে যে ঘটনাটি ঘটেছিল, তাঁর মীমাংসা না করা হচ্ছে।
মুক্তিলাভের আগে ইউসুফের (আ.) নিকট দু'টো বিষয় প্রতিষ্ঠিত করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমত, মন্ত্রীর স্ত্রী ও তাঁর সহযোগী নারীদের সাথে ঘটা বিষয়টি পরিষ্কার করে নিজেকে নির্দোষ হিসেবে প্রমাণ করা। দ্বিতীয়ত, ইউসুফের (আ.) জন্য এমন আশ্বাসের প্রয়োজন ছিল যে, কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আর কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন না। যেকোনো একটি কিংবা উভয় শর্ত পূরণ না হলে তিনি কারাগারে থাকাকেই পছন্দ করবেন।
ইউসুফ (আ.) বিনয়ের সাথে নারীঘটিত বিষয়টির তদন্ত করতে বলেন। বাদশাহ বেশ কৌতূহলী হয়ে ওঠেন এবং আল-আজিজ তথা মন্ত্রীর স্ত্রী ও তাঁর সহযোগীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠান। ওই নারীরা সবকিছু স্বীকার করে নেয় এবং ইউসুফ (আ.) যে নির্দোষ ছিলেন, তা অকপটে মেনে নেয়।