📄 ইউসুফের (আ.) পরিস্থিতি
যুবক ইউসুফ (আ.) তাঁর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাকে দিকনির্দেশনা দেওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ করা, পথ বাতলে দেওয়া, সঠিক ও ভুল বলে দেওয়ার জন্য তাঁর কাছে তাঁর পিতামাতা ছিল না। আর না তাঁর চারপাশে কোনো ঈমানদার ছিল, যে তাকে ধর্ম সম্পর্কে শেখাবে। তিনি বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছান এবং এমন পরিস্থিতিতে যুবক হিসেবে খুব সহজে ফিতনাহ ও অন্যান্য গুনাহের কাজে পতিত হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইউসুফ (আ.)-কে তিনটি সুন্দর বৈশিষ্ট্য দিয়েছিলেন:
১. হুকমান (বিচক্ষণতা): যুক্তিযুক্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিতে তৎপর হওয়া।
২. ইলমান (জ্ঞান/শিক্ষা): বুদ্ধিমত্তার সাথে জ্ঞানের সাহায্যে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা।
৩. ইহসান (কৃতজ্ঞতা): অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
মন্ত্রীর স্ত্রী যখন তাকে পদস্খলন করানোর মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণহীন করার চেষ্টা করে, তখন ইউসুফ (আ.) এই তিনটি গুণ ব্যবহার করেন। মন্ত্রীর স্ত্রী চেষ্টা করছিলেন যেন নৈতিক স্খলনের পাশাপাশি ইউসুফ তার আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ইউসুফ (আ.) অত্যন্ত সংযত ও মার্জিত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন এবং আল্লাহর অবাধ্য হলে তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়াকে তিনি ভীষণ ভয় পেতেন। তাই তিনি নিজেকে পাপ কাজ থেকে নিরাপদ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ইউসুফের (আ.) পিতা জানিয়েছিলেন, কারো বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষমতাও আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে দিয়েছেন। যখন মন্ত্রীর স্ত্রীর কক্ষে ইউসুফ (আ.) তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত ছিলেন, তখন ওই নারী সম্ভাব্য সকল দরজা ও জানালা আটকে দেয়, যাতে ইউসুফ (আ.) পালাতে না পারে। তারপর তিনি ইউসুফ (আ.)-কে ডেকে বলেন, 'এখানে দ্রুত আসো।' এই শব্দগুচ্ছ দ্বারা তিনি বহুবার ইউসুফ (আ.)-কে ডেকে থাকলেও কারো বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষমতা থাকায় ইউসুফ (আ.) তৎক্ষণাৎ বুঝে যান যে, এবারের অর্থ অন্যরকম।
তিনি ওই নারীর কণ্ঠস্বর, শারীরিক ভাষা ও অঙ্গভঙ্গিতে যে বিপদের আলামত রয়েছে, তা বুঝে ফেলেন। তাই তিনি আল্লাহর কাছে দু'আ করেন:
قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ
'সে বললো, আল্লাহ রক্ষা করুন; আপনার স্বামী আমার মালিক। তিনি আমার আবাসের সুন্দর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই জালিমরা সফল হয় না।' - সূরা ইউসুফ, ১২:২৩
নিজের মনিবের স্ত্রীর সাথে রাত কাটানোর সামান্য চিন্তাকে মন থেকে তাড়িয়ে তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান এবং এরূপ জটিল পরিস্থিতি থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান। সম্ভবত ইউসুফ (আ.) বহুবছর ধরে ওই নারীর এমন ইচ্ছাকে প্রতিহত করে আসছিলেন। মিশরীয় সমাজের উচ্চপদস্থ ধনী সুন্দরী মহিলা এত সহজে নতি স্বীকার করবেন না। তাঁর সৌন্দর্য, মর্যাদা ও সম্পদ দ্বারা বেশিরভাগ পুরুষরাই তাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ডুবে যাবে, তা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ইউসুফ (আ.) সাধারণ মানুষের মতো ছিলেন না। তিনি আল্লাহর সাহায্য চান এবং আল্লাহ তা'আলা তাকে উদ্ধার করেন।
ইউসুফ (আ.) মন্ত্রীর স্ত্রীর হাত থেকে পালাতে চাইলেন। কারণ তাঁর এই অস্বীকৃতি ওই নারীর আবেগকে কেবল বাড়িয়েছে। মানসিক সমস্যাযুক্ত একজন নারী হিসেবে তিনি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন যে, তিনি ইউসুফকে বাগে আনার চেষ্টা ছাড়বেন না। যেহেতু বিষয়টি তাঁর ইগো বা আত্মমর্যাদায় আঘাত হেনেছে।
📄 দু’আটির মর্ম গভীরভাবে উপলব্ধি করা
ইউসুফ (আ.) তাঁর দু'আতে বলেন, 'আমার পালনকর্তা আমাকে রিজিক দিয়েছেন', এর বাক্যের মাধ্যমে ভাইদের হাতে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাঁর জন্য যা কিছু করেছেন, তাঁর সবকিছুকে স্বীকৃতি দেন। আল্লাহ তাকে সব মন্দ চক্রান্ত থেকে রক্ষা করেন এবং মন্ত্রীর প্রাসাদে নিরাপত্তার সাথে ফিরিয়ে আনেন। আল্লাহ তাঁর জন্য খাবার, আশ্রয় ও পোশাকের ব্যবস্থা করেন। সর্বোপরি আল্লাহ ইউসুফের (আ.) দেখভালের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাই তিনি এটাই ভাবলেন, কিভাবে তিনি আল্লাহর আইন ও তাঁর আস্থাকে লঙ্ঘন করতে পারেন? যেখানে আল্লাহ তাঁর প্রতি এত রহম করেছেন, সেখানে কিভাবে তিনি এমন অপরাধ করে অকৃতজ্ঞ হতে পারেন? যদি তিনি জিনার অপরাধটি করতেন, তবে তা সরাসরি তাঁর ঈমানকে আঘাত হানতো এবং আল্লাহর দেওয়া রহমত ও সুরক্ষা তাঁর থেকে তুলে নেওয়া হতো।
ইউসুফ (আ.) তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আল্লাহর প্রতি তাঁর শুকরিয়াকে কাজে লাগিয়ে মন্ত্রীর স্ত্রীর নিকট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় নিয়ে পদস্খলনের আগেই নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। তিনি জানতেন, একমাত্র আল্লাহই তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে পারেন এবং এমন অপমানজনক কাজ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারেন। আল্লাহ তাঁর দু'আ শুনেন এবং তাকে উদ্ধার করেন। কুর'আন থেকে আমরা ইউসুফের (আ.) সততা সম্পর্কে জানতে পারি এবং অপরাধী যে মন্ত্রীর স্ত্রী ছিল, তা অবগত হই।
وَاسْتَبَقَا الْبَابَ وَقَدَّتْ قَمِيصَهُ مِن دُبُرٍ وَأَلْفَيَا سَيِّدَهَا لَدَى الْبَابِ قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَادَ بِأَهْلِكَ سُوءًا إِلَّا أَن يُسْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴿২৫﴾ قَالَ هِيَ رَاوَدَتْنِي عَن نَّفْسِي وَشَهِডَ شَاهِدٌ مِّنْ أَهْلِهَا إِن كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِن قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ ﴿২৬﴾ وَإِن كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِن دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ ﴿২৭﴾ فَلَمَّا رَأَى قَمِيصَهُ قُدَّ مِن دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ كَيْدَكُنَّ إِنَّ كَيْদَকُنَّ عَظِيمٌ ﴿২৮﴾ يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ إِنَّكِ كُنتِ مِنَ الْخَاطِئِينَ
তারা দুজন দরজার দিকে দৌড়ে গেল এবং মহিলা ইউসুফের জামা পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে ফেললো। তারা মহিলার স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলা বললো, যে ব্যক্তি তোমার স্ত্রীর সাথে কুকর্মের ইচ্ছা করে, তাকে কারাগারে পাঠানো কিংবা অন্য কোনো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেয়া ছাড়া তার আর কি প্রতিফল হতে পারে?
ইউসুফ বললেন, সে আমাকে দৈহিক মিলনে প্ররোচনা দিয়েছিল এবং মহিলার পরিবারের একজন সাক্ষী দিল, যদি তাঁর জামা সামনের দিক থেকে ছিন্ন থাকে, তবে মহিলা সত্যবাদিনী এবং সে মিথ্যাবাদী। আর যদি তাঁর জামা পেছনের দিক থেকে ছিন্ন থাকে, তবে মহিলা মিথ্যাবাদিনী এবং সে সত্যবাদী।
অতপর গৃহস্বামী যখন দেখলো যে, তাঁর জামা পেছনের দিক থেকে ছিন্ন, তখন সে বললো, নিশ্চয় এটা তোমাদের ছলনা। নিঃসন্দেহে তোমাদের ছলনা খুবই মারাত্মক। ইউসুফ এ প্রসঙ্গ ছাড়! আর হে নারী, এ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিঃসন্দেহে তুমি-ই পাপাচারিনী।' - সূরা ইউসুফ, ১২:২৫-২৯
তথাপি সত্যিকারের বিশ্বাসঘাতক কে এবং ওই মন্ত্রী কাকে বিশ্বাস করবেন, তা ভেবে উঠতে পারেননি। যদিও তিনি তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তথাপি ইউসুফের (আ.) সততা ও মহৎ চরিত্রের বিষয়টিও তাঁর ভালভাবে জানা ছিল। তাহলে দুজনের মধ্যে কে সত্য বলছে?
মন্ত্রীর পরিবারের একজন ইউসুফের (আ.) সত্যবাদিতার দিকে ইশারা করে সাক্ষ্য দিয়েছিল। ইউসুফ (আ.) নবী ছিলেন এবং তাঁর বংশও নবীবংশ ছিল। তাই তাঁর পালনকর্তা তাকে অশ্লীল কাজ এবং ওই নারীর মন্দ পরিকল্পনা থেকে রক্ষা করেন। বিচার দিবসে যারা আরশের ছায়াতলে থাকবে, তাদের মধ্যে ইউসুফ (আ.) অন্যতম। নবী মুহাম্মদ (ﷺ) ব্যাখ্যা করেন, কিয়ামতের দিন সূর্যের উত্তাপ আরও ভয়ানক হবে এবং মানুষেরা সেই উত্তাপের মধ্যে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আল্লাহর তা'আলার নিকট বিচারের জন্য অপেক্ষা করবে। সেখানে সাত শ্রেণির মানুষ এই অসহনীয় উত্তাপ থেকে রক্ষা পেয়ে আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে। তাদের একজন হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর ভয়ে সুন্দরী নারীর প্রলোভন উপেক্ষা করেছিলেন। (বুখারি)
প্রমাণ ছিল একেবারে ভুলহীন। ইউসুফের (আ.) মনিব (মন্ত্রী) একজন জ্ঞানী ও ন্যায়বান মানুষ ছিলেন এবং ওই নারীটি যেহেতু তাঁর স্ত্রী, সে কারণে তিনি তাকে বহিষ্কার বা বিতাড়িত করার চেষ্টা করেননি। বরং তিনি সত্যতা যাচাই করতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং যখন দেখলেন যে, ইউসুফের (আ.) জামা পেছন থেকে ছেঁড়া, তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলেন, 'নিশ্চয় এটা তোমাদের ষড়যন্ত্র। নিশ্চয় তোমাদের ষড়যন্ত্র ভয়ানক' (সূরা ইউসুফ, ১২:২৮) এবং তিনি তাঁর যুবক দাসের দিকে ফিরে গিয়ে তাকে ঘটনাটি গোপন রাখতে বলেন, যাতে কেউ যেন না জানে যে, এমন কিছু ঘটেছিল। এরপর আবারও তিনি তাঁর স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলেন, 'আর (আমার স্ত্রী) তুমি তোমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয় তুমি পাপীদের অন্তর্ভুক্ত।' (সূরা ইউসুফ, ১২:২৯)
এই পর্বটি ইউসুফের (আ.) জীবনে সংঘটিত বড় বড় বিষয়গুলির সূচনা ছিল মাত্র।
শিক্ষা:
১. আমাদের যখন এমন পরিস্থিতিতে থাকবো এবং আমাদের পক্ষে লড়াই করার মতো কেউ নেই, তখন আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, আমরা অপরাধকে (পাপ) আমাদের ঈমানকে আঘাত করার সুযোগ দেবো না। আমাদেরকে অবশ্যই ন্যায়ের জন্য দাঁড়াতে হবে। জ্ঞান, প্রজ্ঞাবিশিষ্ট যেসব দু'আ আমরা আমাদের নবী-রাসূলদের থেকে শিখেছি, তা ব্যবহার করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে এবং প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের উচিত আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।
২. আমাদেরকে অবশ্যই সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর অনুগ্রহগুলি স্মরণে রাখতে হবে। আল্লাহ আমাদের যে অনুগ্রহ দান করেছেন, তা মনে রেখে আমরা যখন তাঁর আনুগত্য বিরোধী কিছু করার প্রবণতা বোধ করি, তখন তা আমাদেরকে পেছনে টেনে নিয়ে যায়। কিভাবে আমরা আল্লাহর রজ্জুকে ছেড়ে দিতে পারি, যেখানে আমাদের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাদেরকে ছেড়ে দেন না?
৩. যারা এই জীবনে ভুল করে, তারা কখনই এই জীবনে সফলতা পাবে না, যতই তারা এখন ভাল অনুভব করুক না কেন। তরুণদের উচিত আল্লাহকে আঁকড়ে ধরা ও তাঁর কাছে প্রতিনিয়ত আশ্রয় কামনা করা, বিশেষ করে ওইসব পরিস্থিতিতে যখন আল্লাহর অবাধ্য হওয়াটা বেশি সম্ভাবনাময়। যত কষ্টকর মনে হোক না কেন, জীবনে সফল হতে গেলে তাদেরকে অবশ্যই এমন পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ থাকতে হবে, যেখানে তারা জিনা-ব্যভিচারের মতো পাপে জড়িয়ে পড়তে পারে কিংবা এমন কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তাদেরকে জিনা-ব্যভিচারের দিকে ধাবিত করে।
৪. আপনি যদি সত্যিই কাউকে ভালোবাসেন এবং সে ভালোবাসা যদি হালাল সম্পর্ক না হয়, তাহলে ওই সম্পর্ক থেকে ফিরে আসুন এবং ওই মানুষটি ও আপনার নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনের কল্যাণের জন্য এই হারাম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসুন। প্রকৃত ও সত্যিকারের ভালবাসার তো সেটাই, যখন আপনি চাইবেন না যে, আপনার ভালবাসার মানুষ আল্লাহর ক্রোধে পতিত হয়েছে। আপনি তাদেরকে ছেড়ে দেবেন এই কারণে যে, আপনি তাদের আখিরাতকে ধ্বংস করতে চান না এবং চান না যে, তারা জাহান্নামের আগুনে জ্বলুক।
৫. যদি একজন নবী এত জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও সুরক্ষিত হওয়ার পরেও শয়তানের প্রতারণার ফাঁদ থেকে রক্ষা না পান, তাহলে এখান থেকে আমাদের সবার শিক্ষা নেওয়া দরকার যে, আমরা তো কিছুই নই। এটি খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার, তাই আমাদেরকে কুর'আনের সাথে সংযুক্ত হয়ে নিজেদেরকে রক্ষা করা এবং আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রার্থনা করা।
📄 ইউসুফের (আ.) সাথে নারীদের সাক্ষাৎ
ইউসুফ (আ.) ও মন্ত্রীর সুন্দরী ও অভিজাত স্ত্রীর মধ্যে যা ঘটেছিল, ওই বিষয়টি অতিশীঘ্রই ফাঁস হয়ে যায় এবং শহরের অভিজাত নারীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ চালাতে থাকে যে, কিভাবে সে নিজের খ্যাতি, মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে একজন দাসের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে?
এই আলোচনা শীঘ্রই মন্ত্রীর স্ত্রীর কানে পৌঁছায়। একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ নারী হিসেবে শহরের রাজনীতির কলা-কৌশলের ব্যাপারে পারদর্শী হওয়ায় তিনি ওইসব অভিজাত নারীর সমালোচনা দ্বারা দমে যাওয়ার কেউ ছিলেন না। তাই তিনি তাদেরকে শিক্ষা দেবার জন্য একটি সুক্ষ্ম পরিকল্পনা তৈরি করেন। তিনি তাদেরকে নিজ প্রাসাদে ভোজ উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য নিমন্ত্রণ জানান। যখন তারা তাঁর প্রাসাদে উপস্থিত হয়, তখন তিনি তাদের প্রত্যেকের হাতে ফল কাটার জন্য একটি ছুরি দিয়ে দেন।
فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّكَةً وَآتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِّنْهُنَّ سِكِّينًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَذَا بَشَرًا إِنْ হাযা إِلَّا مَلَكٌ كَرِيمٌ
'যখন সে তাদের চক্রান্ত শুনলো, তখন তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্যে একটি ভোজসভার আয়োজন করলো। সে তাদের প্রত্যেককে একটি ছুরি দিয়ে বললো, ইউসুফ এদের সামনে চলে এসো। যখন তারা তাকে দেখলো, হতভম্ব হয়ে গেল এবং আপন হাত কেটে ফেললো। তারা বললো, কখনই নয়! এ ব্যক্তি মানব নয়। এ তো কোনো মহান ফেরেশতা।' - সূরা ইউসুফ, ১২:৩১
ইউসুফ (আ.)-কে তাদের সামনে আসতে বলা হয় এবং তাঁর এ আদেশ মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তারা তাকিয়ে তাকিয়ে তাঁর সৌন্দর্য দেখছিল এবং ভুলে গিয়েছিল যে, তাদের হাতে ছুরি আছে। ওই নারীরা তাঁর আকৃতি ও রূপ দ্বারা এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, তারা ফল কাটার বদলে নিজেদের হাত কেটে ফেলে এবং তারা ইউসুফ (আ.)-কে ফেরেশতা হিসেবে বর্ণনা দিতে শুরু করে। আত্মবিশ্বাসী ও অহংকারী আজিজের স্ত্রী তাঁর অতিথিদের দিকে উল্লসিত হয়ে বলেন:
قَالَتْ فَذَلِكُنَّ الَّذِي لُمْتُنَّنِي فِيهِ وَلَقَدْ رَاوَدتُّهُ عَن نَّفْسِهِ فَاسْتَعْصَمَ وَلَئِن لَّمْ يَفْعَلْ مَا آمُرُهُ لَيُসْجَنَنَّ وَلَيَكُونًا مِّنَ الصَّاغِرِينَ
'এ তো ওই ব্যক্তি, যার জন্যে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনা করছিলে। আমি ওরই মন জয় করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে। আর আমি যা আদেশ দেই, সে যদি তা না করে, তবে অবশ্যই সে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হবে এবং হবে লাঞ্ছিত।' - সূরা ইউসুফ, ১২:৩২
ইউসুফ (আ.) নিজের পবিত্র তারুণ্যসহ রাজধানীর অভিজাত নারীদের সামনে এমন এক সুন্দর বদনখানা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যা এই দুনিয়ার সকল সৌন্দর্যকে হার মানায়। এই পরিস্থিতিতে তিনি আল্লাহ তা'আলাকে আহ্বান করেন এবং দু'আ করেন:
قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَاهِلِينَ
'ইউসুফ বললো, হে (আমার) পালনকর্তা! তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহবান করছে, তাঁর চাইতে আমি কারাগারকেই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার উপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো' - সূরা ইউসুফ, ১২:৩৩
হযরত ইউসুফের (আ.) এই দু'আটির পূর্ণ তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে, ইউসুফ (আ.)-কে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তাঁর একটি দৃশ্যপট নিজেদের কল্পনাতে ফুটিয়ে তুলতে হবে। কুর'আনের এই আয়াতগুলোর আলোকে দৃশ্যপটটি এরূপ হবে:
বিশ বছরের সুদর্শন যুবক, যিনি জোরপূর্বক দাসত্ব ও নির্বাসনের অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে যৌবনের স্বাস্থ্য ও তেজ নিয়ে মরুভূমি থেকে মিশরে প্রবেশ করেছেন। ভাগ্য তাকে ওই সময়ের সর্বাধিক সভ্য দেশের রাজধানীর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেয়। ওই পরিবেশে সুদর্শন এই তরুণটি জীবনের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। যে বাড়িতে তাকে থাকতে হবে, সেই বাড়ির নারী গৃহকর্ত্রী প্রেমে পড়ে যায় এবং তাকে প্রলুব্ধ করতে শুরু করে। পরবর্তীতে তাঁর সৌন্দর্য্যের খ্যাতি পুরো রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং শহরের অন্যান্য অভিজাত নারীও তাঁর সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়। আর এভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠে। লালসার ফাঁদ তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সব ধরনের কৌশল তাঁর আবেগকে উত্তেজিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সে যেখানেই যায় সেখানেই যেন লালসার পাপ তাকে আক্রমণের জন্য ওৎ পেতে আছে।
কিন্তু ঈমানদার এই যুবক শয়তানের সৃষ্ট এসব অগ্নিপরীক্ষা সফলতার সাথে পাড়ি দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের এক উজ্জ্বল নিদর্শন প্রদর্শন করে, যা সত্যই প্রশংসনীয়। তবে এখানে প্রশংসার সবচেয়ে বড় দিকটি হচ্ছে: এমন লালসাময় পরিস্থিতিতে নিজের ঈমানকে অটুট রাখার পাশাপাশি তিনি নিজের ঈমান নিয়ে কোনো ধরনের গর্ব বা আত্ম-অহমিকায় ভেসে যাচ্ছেন না। বরং তিনি বিনীতভাবে আল্লাহ তা'আলার নিকট এই বলে দু'আ করেন যে, হে আমার রব, আমি দুর্বল, আমি আশঙ্কা করি এই প্রলোভনগুলি আমাকে আয়ত্ত করে ফেলতে পারে। আর এমন পাপে জড়ানোর চেয়ে আমি তো জেলখানাকে উত্তম হিসেবে বেছে নেবো। প্রকৃতপক্ষে, এটা ছিল ইউসুফের (আ.) প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এই অগ্নিপরীক্ষা তাঁর সুপ্ত গুণগুলোকে বের করে আনে, যেগুলো সম্পর্কে তিনি নিজেও অজ্ঞাত ছিলেন। এরপরই তিনি বুঝতে পারেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে সততা, বিশ্বস্ততা, ধর্মভীরুতা, দানশীলতা, ন্যায়নিষ্ঠা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, মানসিক ভারসাম্যের মতো উচ্চ গুণাবলী দান করেছেন এবং যখন তিনি মিশরে ক্ষমতা লাভ করেন, তখন তিনি এসব গুণের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন।
শিক্ষা:
যখন আমরা নিজেদেরকে সঠিক পরিবেশ ও সৎকর্মপরায়ণদের দ্বারা ঘিরে রাখি, তখন আমাদের জন্য এই পথে নিজেদেরকে সমুন্নত রাখাটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, কারণ আমাদেরকে যে দ্বীন তথা ইসলাম দেওয়া হয়েছে, তা মূলত ফিতরাত বা স্বভাব ধর্ম, আর তাই সহজাতভাবেই আমাদের থেকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য চলে আসে। অন্যদিকে আমরা যদি নিজেদেরকে মন্দ পরিবেশ ও অসৎ মানুষের সহচর্যে রাখি, তবে আমাদের সহজাত প্রকৃতি দূষিত হয়ে পড়ে এবং সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই আমাদের জন্য এমন মানুষদের সঙ্গ ত্যাগ করা আবশ্যক, যাদের সঙ্গ আমাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে গাফেল রাখে। আমাদের উচিত এমন মানুষদের আশেপাশে থাকা, যারা আমাদেরকে ফিতরাতের পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করে।
ইউসুফ (আ.) জানতেন, তাঁর সকল মর্যাদা আল্লাহ তা'আলার হাতে এবং কেবল তিনিই তা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তিনি নিজের মর্যাদার জন্য বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন, বরং তিনি তাঁর ঈমানকে এসব পাপী মানুষের কবল থেকে হেফাজতের বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাই তিনি নিজের ঈমান ও আল্লাহর আনুগত্যের স্বার্থে এমন পরিবেশে থাকার চেয়ে কারাগারে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করেন এবং সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন।
📄 ইউসুফের (আ.) সাথে পিতা ইয়াকুব (আ.) এবং পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলন
আসুন আমরা ইউসুফ (আ.) এই আরেকটি দু'আ পর্যালোচনা করি, তবে তাঁর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে আমাদেরকে কিছুটা পেছনে ফিরে যেতে হবে।
ইউসুফ (আ.) যেসব পরিস্থিতি পার করছেন, আসুন আমরা সেগুলোর দিকে একটু নজর দিই:
১. (বাল্যকাল) নিজের ভাইয়েরা তাকে কুয়ার মধ্যে ফেলে দেয়।
২. কুয়া থেকে উদ্ধার করে তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
৩. (তরুণ) মন্ত্রীর স্ত্রী তাকে ব্যভিচারের জন্য প্রলোভন দেখায়।
৪. এমন পরিবেশের মুখোমুখি হন, যার চতুর্দিক কামুক নারীদের পদচারণায় মুখর।
৫. (প্রাপ্তবয়স্ক) মিথ্যা অভিযোগে বছরের পর বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়।
৬. কারাগারের সাথি বিশ্বাসঘাতকতা করে, যাকে ইউসুফ (আ.) সাহায্য করেছিলেন।
ইউসুফ (আ.) শৈশব থেকে যৌবন অবধি যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান এবং পিতা ইয়াকুবের (আ.) সাথে পুনরায় মিলিত হওয়ার মাধ্যমে ইউসুফের (আ.) ঘটনাটি একটি সুন্দর পরিণতি লাভ করে। কিন্তু এই পুনর্মিলনের আগে আশ্চর্যজনক কিছু ঘটনা ঘটে, যা এই পুনর্মিলনকে বাস্তবে রূপ দিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউসুফ (আ.) তাঁর পিতা ও তাঁর পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার পর যে দু'আ করেন, তাঁর প্রকৃত হাকিকত উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকে ওই ঘটনাগুলো জানতে হবে এবং এজন্য একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে।