📄 মূর্তি
ইব্রাহিম (আ.) তাঁর সন্তানদের জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করেন, যাতে তারা মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকে, আক্ষরিক অর্থে আমরা যদি আয়াতটি দেখি তাহলে বুঝতে পারবো যে, এই দু'আর উদ্দেশ্য ছিল তার সন্তানরা যেন বিপদগামী না হয় এবং বহুত্ববাদ যেন মক্কায় আর ফিরে না আসে।
আগেই বলা হয়েছে, দু'আটি যখন করা হয়, তখন মক্কা শহর মূর্তিপূজা থেকে মুক্ত ছিল, সেহেতু এই দু'আর মাঝে মূর্তি বলতে ইব্রাহিম (আ.) কি বুঝাতে চেয়েছেন, তা আমাদেরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে, যা আমাদের মাঝে ও আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে রয়েছে, তাই মূর্তি। এই মূর্তি কেবল আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং একইসাথে আমাদের জীবনকেও পরিচালনা করে। এই মূর্তিগুলিকে আমাদের অযাচিত ইচ্ছা, কামনা-বাসনা ও প্রলোভন হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। যখন আমরা সত্য পথ থেকে দূরে চলে যেতে থাকি, তখন আমরা আমাদের ভেতরে এসব প্রতিমা তৈরি করতে থাকি এবং এগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে শুরু করি।
এখানে এমনটা বোঝানো হচ্ছে না যে, আপনি আপনার ইচ্ছার উপাসনা শুরু করেন, বরং এই আকাঙ্ক্ষাগুলি পূরণের জন্য আপনার মন ও হৃদয় সবকিছুই করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। এই অভিলাষগুলি পূরণ করতে শেষমেশ আপনি হারামে লিপ্ত হতে পর্যন্ত কুণ্ঠাবোধ করেন না।
* আপনার অন্তরে এ রকম মূর্তি বাসা বাঁধলে কিভাবে আপনি কালবে সালিম অর্জন করবেন?
* আপনার অন্তরে এ রকম মূর্তি বাসা বাঁধলে কিভাবে আপনি সত্যের গৃহ তৈরি করবেন?
* আপনার অন্তরে এ রকম মূর্তি বাসা বাঁধলে কিভাবে আপনি সঠিক পথে চলবেন?
* আপনার অন্তরে এ রকম মূর্তি বাসা বাঁধলে কিভাবে আপনি আল্লাহকে প্রকৃতভাবে ভালবাসবেন?
আসুন, আমরা আল্লাহর এই বাণীতে এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেখে নিই:
بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
'(আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কারের বিষয়ে কারও বিশেষ দাবি নেই) হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পন করেছে এবং সে সৎকর্মশীল, তাঁর জন্য তাঁর পালনকর্তার কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।'- সূরা বাকারাহ, ২:১১২
এই আয়াত দ্বারা আমরা বুঝতে পারি, যারা ঈমান আনে এবং ভাল কাজ করে, তারা শান্তি ও কালবে সালিম পর্যায়ে উন্নীত হবে। কারণ, তাদের অন্তর ভয় ও দুঃখ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। আল্লাহ ঈমানদারদেরকে এক অপরূপ উপহারে সমৃদ্ধ করে রেখেছেন, যা অন্যদের আয়ত্তের বাইরে, আর সেই পুরস্কাটি হলো: আমান তথা শান্তি। এটা সাধারণ সুখের মতো নয়, কারণ বড় ধরনের ঝড়ের মাঝেও ওই ঈমানদার বান্দাগণ স্বীয় রবের শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করতে ভুলে না। তারা জানে যে, জীবন ও মৃত্যু সবই আল্লাহ তা'আলার হাতে। অন্যভাবে বললে, তাঁর অন্তরে বাস করা কোনো মূর্তি কখনও এ জাতীয় প্রশান্তি ও পবিত্র সুখ দিতে সক্ষম নয়, যা সে মহান আল্লাহর কাছ থেকে ঈমান ও শোকর আদায়ের মাধ্যমে লাভ করে।
নিম্নের আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আল্লাহ তা'আলা তাদের বিষয়টি তুলে ধরেছেন, যারা নিজেদের হাওয়া (কামনা ও বাসনা)-কে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে সেগুলো তাদের উপাস্যে পরিণত হয়েছে:
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى সায়মিহি অ কলবিহি وَجَعَلَ عَلَى بصরিহি গিশাওয়াতান ফামায়ঁ ইয়াহদিহি মিম বাদিল্লাহি أفلا تذكرون
আপনি কি তাঁর প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে নিজের খেয়াল- খুশিকে স্বীয় উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? আল্লাহ জেনে শুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন। তাঁর কান ও অন্তরে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর চোখের উপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহর পর আর কে তাকে পথ দেখাবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না?' - সূরা জাসিয়া, ৪৫:২৩
ইলাহু হুওয়াহু বলতে বোঝায়, যে তাঁর খেয়াল-খুশি, ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার দাসে পরিণত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা যা কিছু নিষেধ করেছেন, সে তা পরোয়া করে না, বরং নিজের যা পছন্দ তা করে, এমনকি আল্লাহ তা'আলা যা আবশ্যক করেছেন, তা যদি তাঁর অপছন্দ হয়, তবে সে তা থেকে বিরত থাকে।
যখন কোনো মানুষ এভাবে কারও বা কোনোকিছুর আনুগত্য শুরু করে, তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আল্লাহ তাঁর ইলাহ (উপাস্য) নন, বরং যাকে সে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই মান্য করে, সেই তাঁর ইলাহ (উপাস্য)। সে ওই ব্যক্তিকে প্রভু হিসেবে ডাকুক বা না ডাকুক, কিংবা সে ওই জিনিসটির চিত্র তৈরি করে, সেটার পূজা করুক বা না করুক, এতে কিছুই যায় আসে না। বিনা প্রশ্নে সে যখন ওই ব্যক্তির বা জিনিসের আনুগত্য করে চলছে, তখন এমন আচরণই ওই ব্যক্তি বা জিনিসকে দেবতা বানানোর জন্য যথেষ্ট। এমন আচরণকে শিরকের অপরাধ থেকে মুক্তি দেওয়া যায় না, শুধুমাত্র এই কারণে যে, সে তাঁর উপাসনার ব্যক্তি বা বস্তুটিকে নিজের দেবতা বলে অভিহিত করেনি অর্থাৎ জিহ্বা দিয়ে আহ্বান করেনি, কিংবা সেটাকে সিজদাও করেনি।
কুর'আনের শীর্ষস্থানীয় তাফসিরবিদগণ এই আয়াতের এরূপ ব্যাখ্যাই দিয়েছেন। ইবনে জারির তাবারি বলেন, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা হারাম। আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেননি, তা হালাল। যে ব্যক্তি নিজের কামনা-বাসনাকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে, সে আল্লাহ কর্তৃক হালাল করা জিনিসকে হালাল মনে করে না এবং আল্লাহ কর্তৃক হারাম করা জিনিসকে হারাম মনে করে না।
আবু বকর আল-জাসসাস এর ব্যাখ্যায় বলেন, যে ব্যক্তি নিজের কামনা- বাসনাকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে, সে তাঁর কামনা-বাসনাকে ঠিক সেভাবে মান্য করে, যেভাবে তাঁর উচিত ছিল আল্লাহকে মান্য করা।
জামাখশারী এর ব্যাখ্যায় বলেন, এ ধরনের ব্যক্তি নিজের ইচ্ছের প্রতি বাধ্য থাকে। তাঁর কামনা-বাসনা তাকে যেদিকে যেতে বলে, সে দিকেই যায়।
উপসংহার:
আমাদের সকলের উচিত নিজেদের ভিতরে থাকা প্রতিমাগুলোর উপর তদারকি জোরদার করা, যেন আমাদের কামনা-বাসনা আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু না করে। নিজেদেরকে আল্লাহ তা'আলার সাথে সংযুক্ত করা এবং কিভাবে হৃদয়ের সত্যিকার প্রশান্তি আসে, তাঁর অনুসন্ধানে নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখা।