📄 দু’আর গঠনপ্রণালী
الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ
ভাবার্থ: আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা আমাকে সৃষ্টি করেছেন (মূর্তি সৃষ্টি করেনি)। আমাদেরকে কোথায় যেতে হবে এবং কোন পথ অনুসরণ করতে হবে, তা কেবল আল্লাহই বলে দিতে পারেন। (দু'আর পর্যায়: কোন দিকে যেতে হবে, যখন আমরা তা জানি না)
وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ
ভাবার্থ: তিনিই আল্লাহ, যিনি আমাকে খাবার জোগান দেবেন এবং পানীয় পান করাবেন। ঠিক ইব্রাহিমের (আ.) মতো, যার কোনো বাড়ি ছিল না। (দু'আর পর্যায়: যখন আমরা অনাহারে থাকি)
وَإِذَا মরিদতু ফাহুওয়া ইয়াশফিন
ভাবার্থ: যখন আমি অসুস্থ হবো, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য করবেন। যখন ইব্রাহিম (আ.) খাবার ও পানীয় ছাড়া একাই হাঁটছিলেন এবং এর ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখন আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা তাকে সুস্থতা দান করেছিলেন। (দু'আর পর্যায়: যখন আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি)
وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ
ভাবার্থ: আল্লাহই আমাকে মৃত্যু দান করবেন এবং তিনিই আমাকে আবার পুনরুত্থিত করবেন। এটা অস্তিত্বের বিনাশ নয়। (দু'আর পর্যায়: যখন আমরা নিজেদের পুরো সত্তাকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা-র নিকট সোপর্দ করি)
আল্লাহ খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করেন, তিনিই পথ প্রদর্শন করেন এবং আরোগ্য দান করেন। তিনিই জীবন ও মৃত্যু দান করেন। কিন্তু ইব্রাহিমের (আ.) জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট যে রিজিকের প্রয়োজন, তা হলো: ক্ষমা। পরের আয়াতে তিনি এই দু'আ করেন, হে আল্লাহ! যখন আপনি আমাকে পুনরুত্থিত করবেন এবং আমাকে নতুন জীবন দান করবেন, তখন আপনার ক্ষমাই আমার একান্ত প্রয়োজন।
ইব্রাহিমের (আ.) নিকট, তিনি যদি আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত লাভ করেন, তবে তিনি সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে যাবেন। তিনি যেকোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত, কিন্তু বিচার দিবসে যদি আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা লাভ না করেন, তবে তাঁর পুরো জীবন যে ব্যর্থ হয়ে যাবে, একথা তিনি ভালো করেই জানেন।
একজন যুবকের পক্ষে সব কিছু ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ কোনো কাজ নয়। কিন্তু তিনি কোনো দ্বিধা-দ্বন্দু ছাড়াই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা-র নিকট দু'আ করেন। জীবনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে গেলে আমরা ভয় ও বিরূপ পরিস্থিতির কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, তখনই আমাদের উচিত নবী ইব্রাহিমের (আ.) করা দু'আর নিকট প্রত্যাবর্তন করা এবং তিনি যে ধরনের দৃঢ়তা ও তাওয়াক্কুল দেখিয়েছেন, তাঁর অনুসরণ করা।
وَالَّذِي أَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لِي খতিয়াতি ইয়াওমাদ্দীন
ভাবার্থ: আমি আশা করি, বিচার দিবসে তিনি আমার ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা-র নিকট নিজের জন্য ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর কিছুই চাননি। প্রকৃতপক্ষে এটাই উত্তম পন্থা।
রব্বি হাবলি হুকমাওঁ অ আলহিকনি বিসসালিহীন
ভাবার্থ: হে আমার রব (প্রতিপালক), আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন। ইব্রাহিম (আ.)-কে তার নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে, এজন্য তিনি দু'আ করেন, যাতে তিনি দৃঢ় থাকেন এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তি লাভ করতে পারেন। যেহেতু তিনি তার পরিবারের সঙ্গ হারিয়েছেন, তাই তার প্রয়োজন ভাল মানুষ ও নতুন সমাজ।
وَاجْعَل لِّي লিসানা সিদকিন ফিল আখিরীন
ভাবার্থ: [ হে আল্লাহ!] আমাকে পরবর্তীদের মাঝে সত্যভাষী করুন।
ইব্রাহিম (আ.) দু'আ করেন, হে আল্লাহ! আমাকে সত্য কথা বলার সক্ষমতা দেন। হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্য যা করেছি, তা শিক্ষা হিসেবে পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন বানিয়ে দেন। (পরবর্তীকালের মানুষদেরকে অনুপ্রাণিত করতে)।
وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ
ভাবার্থ: [ হে আল্লাহ!] আমাকে জান্নাতুন নায়িম (নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতের) উত্তরাধিকার বানিয়ে দেন।
পিতার কাছ থেকে যে উত্তরাধিকার আসে, তা ইব্রাহিম (আ.) একেবারেই চাননি। তিনি জান্নাতের উত্তরাধিকার চেয়েছেন। বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্য পূর্ণ জান্নাত, কারণ তিনি দুনিয়ার সবকিছু ত্যাগ করেছেন।
وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ
ভাবার্থ: [ হে আল্লাহ!] আমার পিতাকে ক্ষমা করো, (যদিও) সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্গত।
ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পিতার উত্তরাধিকার হারিয়েছিলেন। তিনি শিরকের উত্তরাধিকার চাননি, চাননি পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া মিথ্যা উত্তরাধিকার, বরং তিনি জান্নাতের উত্তরাধিকার চেয়েছেন। আমরা দুনিয়াতে সর্বদা বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের অনুসন্ধান করি, চাকচিক্যময় জীবন ও খ্যাতির পিছনে ছুটতে থাকি এবং সেটাকে আমরা মুষ্টিবদ্ধ করতে চাই। আমরা দান করতে অনিচ্ছুক, এমনকি বস্তুবাদী জগতের স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশ ছেড়ে দিয়ে সরলতা ও নম্রতা অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে রাজি নই।
আমাদের পিতা ইব্রাহিমের (আ.) এসবই থাকতে পারতো, কিন্তু তিনি সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, তিনি জানতেন, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। তিনি জানতেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং তাঁকে বন্ধু হিসেবে পাওয়ার থেকে বড় আর কিছুই নেই। তিনি আল্লাহ তা'আলার কাছে জান্নাতের উত্তরাধিকার চেয়েছেন, এটাই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হওয়া উচিত।
وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ
ভাবার্থ: [হে আল্লাহ!] আমাকে পরকালে অপমানিত করবেন না।
এটা অপমানজনক, যখন আপনার পিতার অপরাধের কথা ঘোষণা করা হবে। তিনি দুনিয়াতে অপমানের ভয় পান না, কিন্তু আখিরাতের অপমানকে ভয় পান।
يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ
ভাবার্থ: ওই দিন না ধনসম্পদ আর না সন্তানাদি কোনো কাজে আসবে।
ইব্রাহিম (আ.) সর্বশ্রেষ্ঠ সাদকায়ে জারিয়া ছিলেন, তবুও তার পিতা পুত্র হিসেবে ইব্রাহিমের (আ.) থেকে আখিরাতে কোনো সুবিধা লাভ করতে পারেননি।
إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
ভাবার্থ: কিন্তু (ওই দিন) যে কালবে সালিম (পরিশুদ্ধ আত্মা) নিয়ে উপস্থিত হবে (তার বিষয়টি ভিন্ন হবে)।
ইব্রাহিম (আ.) অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করা সত্ত্বেও তিনি সহজ ও সাবলীলভাবে 'কালবে সালিম' (পরিশুদ্ধ আত্মা) নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হন। এটা সেই উচ্চ মাকাম, যা আমাদেরকে অর্জন করতে হবে।
বিচার দিবসে একমাত্র পবিত্র হৃদয়, পরিপূর্ণ বিশ্বাস এবং অবাধ্যতা ও পাপমুক্ত থাকার মাঝেই মানুষের উপকার নিহিত। ওইদিন সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না। সম্পদ তখনই উপকারে আসবে, যখন তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যথাযথ স্থানে ব্যয় করা হয়। অন্যথায়, দুনিয়াতে কোটিপতি হলেও আখিরাতে তার কোনো মূল্য থাকবে না। সন্তানাদিও কেবল তখনই উপকারে আসবে, যখন কোনো ব্যক্তি তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের সন্তানদেরকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী বানায় এবং তাদেরকে সদাচারে দীক্ষিত করে তোলে। অন্যথায়, ওই সন্তান যদি একজন নবীও হয়, তথাপি তিনি তাঁর অবিশ্বাসী পিতামাতাকে আখিরাতের আজাব থেকে বাঁচাতে পারবেন না।
যখন আমরা ঈমানের এই সুন্দর স্তরে পৌঁছে যাই এবং আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে যা বলেছেন, তাতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি, তখন আমরা আমাদের জাতির পিতা ইব্রাহিমের (আ.) করা এই দু'আর স্বাদ আস্বাদন করতে সক্ষম হই।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে তাদের মতো বানান, যারা আপনার সামনে 'কালবে সালিম' (পরিশুদ্ধ আত্মা) নিয়ে বিচার দিবসে উপস্থিত হবে। আমীন।
২.
ইব্রাহিম (আ.) অনেক পরীক্ষা ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
তিনি যখন শিশু অবস্থায় চোখ খুলেন, তখন তাঁর চারপাশ বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তি দ্বারা বেষ্টিত ছিল। তাঁর বাবা ছিলেন এসব স্মৃতি-প্রতিমার প্রধান কারিগর। আল্লাহ তা'আলা ইব্রাহিম (আ.)-কে প্রখর বুদ্ধি ও পরিপক্কতা দান করেন। তিনি ছিলেন ওই সময়কার সকল নির্বোধ মানুষের মাঝে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি। শৈশবকাল থেকেই তিনি যেসব পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেগুলো নিয়ে আমাদের গভীর চিন্তা করা উচিত। এগুলোর আমাদেরকে আমাদের পিতার জ্ঞান ও ত্যাগকে উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে।
- জন্মগ্রহণ এবং বহু-ঈশ্বরবাদের মুখোমুখি হওয়া [ইব্রাহিমের (আ.) পিতা মূর্তি নির্মাতা ছিলেন]।
- কিশোর বয়স থেকেই তিনি প্রশ্ন করা শুরু করেন এবং তাওহিদ ও শিরক নিয়ে লড়া আরম্ভ করেন।
- যখন তিনি সত্যের সন্ধান পেলেন, নিজের দাবিকে প্রমাণের পথ পেলেন, তখন তিনি প্রতিমা ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন এবং এজন্য তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার শাস্তি দেওয়া হয়।
- যেহেতু তার গ্রামে কেবল তিনিই এই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আল্লাহই একমাত্র সত্য ও প্রকৃত উপাস্য, তাই তাকে তার গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হয়।
- তিনি সারাহ নামক এক নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, কিন্তু ৮৬ বছর হলেও তিনি কোনো সন্তান-সন্ততির মুখ দেখেননি, যা তার জন্যে অন্যতম বড় একটি পরীক্ষা ছিল।
- স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে এক বন্ধ্যা মরুভূমিতে ফেলে আসার নির্দেশের মাধ্যমে তিনি আবার পরীক্ষার মুখোমুখি হন।
- প্রিয়তম পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করার আদেশে লাভের মাধ্যমে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হন।
নবী ইব্রাহিম (আ.) বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছান এবং এ পর্যন্ত তিনি যেসব পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন, তাতে সফল হন। ইসমাইল (আ.)-কে মক্কায় আনার পর ইব্রাহিম (আ.) দু'আ করেন। আরব মুশরিকদের বিরুদ্ধে আরও প্রমাণ পেশ করার সময় আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেন, মক্কার পবিত্র গৃহটি কেবল লা শরিক (অংশীবিহীন) আল্লাহর ইবাদাতের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই শহরের প্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহিম (আ.) ওইসব লোকদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন, যারা এক আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদাত করে এবং সেইসাথে তিনি মক্কা নগরীকে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ করার জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে বিনয়ের সাথে দু'আ করেন।
নবী ইব্রাহিমের (আ.) ওই দু'আর দিকে লক্ষ্য করা যাক,
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا
ভাবার্থ: হে আমার পালনকর্তা, এ শহরকে (মক্কা) শান্তিময় ও নিরাপদ করে দেন।
وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ
ভাবার্থ: এবং আমাকে ও আমার সন্তানাদিকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন। - (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৩৫)
যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, তার জন্য তাঁর পিতামাতা ও বংশধর এমনকি নিজের জন্যও অনুরোধ করা যথাযথ।
أَمَنُ( আমান - শান্তি): বাংলা পরিভাষা মোতাবেক শান্তি বলতে বুঝি, শান্ত ও সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থা, যেখানে কোনো লড়াই বা যুদ্ধ নেই। কোনো কিছুর উপদ্রব নেই, স্থির পুকুরের মতো, যেখানে কোনো ঢেউ নেই।
কুর'আনে যখন আমান শব্দটি কি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা আমরা এখন পর্যালোচনা করবো।
أَمَنُ: যখন আপনি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত থাকবেন না, তখনই আমান অর্জিত হবে। আপনার অতীতে যা ঘটেছে, বর্তমানে যা ঘটছে কিংবা যা ঘটবে, তার সবকিছু আল্লাহ তা'আলার উপরে ন্যস্ত করলে আপনি শান্তি ও প্রশান্তিময় জীবনে পৌঁছতে পারবেন।
আপনি আপনার যাবতীয় বিষয় আল্লাহ তা'আলার কাছে সমর্পণ করুন, এবং আপনাকে পথ দেখানোর দায়িত্বটুকুও তাঁরই হাতে সোপর্দ করুন। যখনই এমনটি করবেন, তখনই কুর'আনের পরিভাষা মোতাবেক আপনি আমান অর্জন করবেন।
শান্তি:
- সুখ
- কাবা
- প্রসন্নতা
- কালবে সালিম
ইব্রাহিম (আ.) এক সুদুরপ্রসারী দু'আ করেছিলেন, তিনি কেবল নিজের হৃদয়ের প্রশান্তির জন্য দু'আ করেননি, বরং তিনি এর থেকেও মহান কিছুর জন্য আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আ করেছিলেন, যেন মক্কা শহরটি নিরাপদ ও শান্তিতে পরিপূর্ণ এক স্থানে পরিণত হয়।
এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, এই মক্কা শহরে পৌঁছানোর আগে আপনার মনে অনেক কিছুরই উদয় ঘটে। যে মুহূর্তে আপনি সেখানে পৌঁছান এবং শহরের ভিতরে যখন প্রবেশ করেন, তখন আপনার হৃদয়ে শান্তির এক অনুভূতি ও প্রশান্তি বিরাজ করতে শুরু করে। প্রথমবারের মতো যখন কাবার দিকে তাকাবেন, তখন আপনার হৃদয় 'কালবে সালিমে' তথা প্রশান্তি আত্মায় রূপান্তরিত হবে। মক্কার পরিবেশ খুবই কঠিন ও অসহনীয়, তথাপি সেখানে পৌঁছানোর সাথে সাথে আপনি এক প্রকারের শান্তি অনুভব করতে শুরু করবেন।
স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিম বললো, হে পালনকর্তা, এ শহরকে শান্তিময় করে দেন এবং আমাকে ও আমার সন্তানসন্ততিকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন। - সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৩৫
📄 যে প্রশ্নটি ভাবায়
যখন ইব্রাহিম (আ.) এই দু'আ করেন, তখন মক্কা শহর মূর্তি ও মূর্তিপূজারীদের থেকে মুক্ত ছিল, তাহলে তিনি দু'আর দ্বিতীয় অংশে কেন মূর্তিদের দিকে ইশারা করলেন?
📄 মূর্তি
ইব্রাহিম (আ.) তাঁর সন্তানদের জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করেন, যাতে তারা মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকে, আক্ষরিক অর্থে আমরা যদি আয়াতটি দেখি তাহলে বুঝতে পারবো যে, এই দু'আর উদ্দেশ্য ছিল তার সন্তানরা যেন বিপদগামী না হয় এবং বহুত্ববাদ যেন মক্কায় আর ফিরে না আসে।
আগেই বলা হয়েছে, দু'আটি যখন করা হয়, তখন মক্কা শহর মূর্তিপূজা থেকে মুক্ত ছিল, সেহেতু এই দু'আর মাঝে মূর্তি বলতে ইব্রাহিম (আ.) কি বুঝাতে চেয়েছেন, তা আমাদেরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে, যা আমাদের মাঝে ও আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে রয়েছে, তাই মূর্তি। এই মূর্তি কেবল আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং একইসাথে আমাদের জীবনকেও পরিচালনা করে। এই মূর্তিগুলিকে আমাদের অযাচিত ইচ্ছা, কামনা-বাসনা ও প্রলোভন হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। যখন আমরা সত্য পথ থেকে দূরে চলে যেতে থাকি, তখন আমরা আমাদের ভেতরে এসব প্রতিমা তৈরি করতে থাকি এবং এগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে শুরু করি।
এখানে এমনটা বোঝানো হচ্ছে না যে, আপনি আপনার ইচ্ছার উপাসনা শুরু করেন, বরং এই আকাঙ্ক্ষাগুলি পূরণের জন্য আপনার মন ও হৃদয় সবকিছুই করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। এই অভিলাষগুলি পূরণ করতে শেষমেশ আপনি হারামে লিপ্ত হতে পর্যন্ত কুণ্ঠাবোধ করেন না।
* আপনার অন্তরে এ রকম মূর্তি বাসা বাঁধলে কিভাবে আপনি কালবে সালিম অর্জন করবেন?
* আপনার অন্তরে এ রকম মূর্তি বাসা বাঁধলে কিভাবে আপনি সত্যের গৃহ তৈরি করবেন?
* আপনার অন্তরে এ রকম মূর্তি বাসা বাঁধলে কিভাবে আপনি সঠিক পথে চলবেন?
* আপনার অন্তরে এ রকম মূর্তি বাসা বাঁধলে কিভাবে আপনি আল্লাহকে প্রকৃতভাবে ভালবাসবেন?
আসুন, আমরা আল্লাহর এই বাণীতে এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেখে নিই:
بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
'(আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কারের বিষয়ে কারও বিশেষ দাবি নেই) হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পন করেছে এবং সে সৎকর্মশীল, তাঁর জন্য তাঁর পালনকর্তার কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।'- সূরা বাকারাহ, ২:১১২
এই আয়াত দ্বারা আমরা বুঝতে পারি, যারা ঈমান আনে এবং ভাল কাজ করে, তারা শান্তি ও কালবে সালিম পর্যায়ে উন্নীত হবে। কারণ, তাদের অন্তর ভয় ও দুঃখ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। আল্লাহ ঈমানদারদেরকে এক অপরূপ উপহারে সমৃদ্ধ করে রেখেছেন, যা অন্যদের আয়ত্তের বাইরে, আর সেই পুরস্কাটি হলো: আমান তথা শান্তি। এটা সাধারণ সুখের মতো নয়, কারণ বড় ধরনের ঝড়ের মাঝেও ওই ঈমানদার বান্দাগণ স্বীয় রবের শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করতে ভুলে না। তারা জানে যে, জীবন ও মৃত্যু সবই আল্লাহ তা'আলার হাতে। অন্যভাবে বললে, তাঁর অন্তরে বাস করা কোনো মূর্তি কখনও এ জাতীয় প্রশান্তি ও পবিত্র সুখ দিতে সক্ষম নয়, যা সে মহান আল্লাহর কাছ থেকে ঈমান ও শোকর আদায়ের মাধ্যমে লাভ করে।
নিম্নের আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আল্লাহ তা'আলা তাদের বিষয়টি তুলে ধরেছেন, যারা নিজেদের হাওয়া (কামনা ও বাসনা)-কে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে সেগুলো তাদের উপাস্যে পরিণত হয়েছে:
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى সায়মিহি অ কলবিহি وَجَعَلَ عَلَى بصরিহি গিশাওয়াতান ফামায়ঁ ইয়াহদিহি মিম বাদিল্লাহি أفلا تذكرون
আপনি কি তাঁর প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে নিজের খেয়াল- খুশিকে স্বীয় উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? আল্লাহ জেনে শুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন। তাঁর কান ও অন্তরে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর চোখের উপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহর পর আর কে তাকে পথ দেখাবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না?' - সূরা জাসিয়া, ৪৫:২৩
ইলাহু হুওয়াহু বলতে বোঝায়, যে তাঁর খেয়াল-খুশি, ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার দাসে পরিণত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা যা কিছু নিষেধ করেছেন, সে তা পরোয়া করে না, বরং নিজের যা পছন্দ তা করে, এমনকি আল্লাহ তা'আলা যা আবশ্যক করেছেন, তা যদি তাঁর অপছন্দ হয়, তবে সে তা থেকে বিরত থাকে।
যখন কোনো মানুষ এভাবে কারও বা কোনোকিছুর আনুগত্য শুরু করে, তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আল্লাহ তাঁর ইলাহ (উপাস্য) নন, বরং যাকে সে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই মান্য করে, সেই তাঁর ইলাহ (উপাস্য)। সে ওই ব্যক্তিকে প্রভু হিসেবে ডাকুক বা না ডাকুক, কিংবা সে ওই জিনিসটির চিত্র তৈরি করে, সেটার পূজা করুক বা না করুক, এতে কিছুই যায় আসে না। বিনা প্রশ্নে সে যখন ওই ব্যক্তির বা জিনিসের আনুগত্য করে চলছে, তখন এমন আচরণই ওই ব্যক্তি বা জিনিসকে দেবতা বানানোর জন্য যথেষ্ট। এমন আচরণকে শিরকের অপরাধ থেকে মুক্তি দেওয়া যায় না, শুধুমাত্র এই কারণে যে, সে তাঁর উপাসনার ব্যক্তি বা বস্তুটিকে নিজের দেবতা বলে অভিহিত করেনি অর্থাৎ জিহ্বা দিয়ে আহ্বান করেনি, কিংবা সেটাকে সিজদাও করেনি।
কুর'আনের শীর্ষস্থানীয় তাফসিরবিদগণ এই আয়াতের এরূপ ব্যাখ্যাই দিয়েছেন। ইবনে জারির তাবারি বলেন, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা হারাম। আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেননি, তা হালাল। যে ব্যক্তি নিজের কামনা-বাসনাকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে, সে আল্লাহ কর্তৃক হালাল করা জিনিসকে হালাল মনে করে না এবং আল্লাহ কর্তৃক হারাম করা জিনিসকে হারাম মনে করে না।
আবু বকর আল-জাসসাস এর ব্যাখ্যায় বলেন, যে ব্যক্তি নিজের কামনা- বাসনাকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে, সে তাঁর কামনা-বাসনাকে ঠিক সেভাবে মান্য করে, যেভাবে তাঁর উচিত ছিল আল্লাহকে মান্য করা।
জামাখশারী এর ব্যাখ্যায় বলেন, এ ধরনের ব্যক্তি নিজের ইচ্ছের প্রতি বাধ্য থাকে। তাঁর কামনা-বাসনা তাকে যেদিকে যেতে বলে, সে দিকেই যায়।
উপসংহার:
আমাদের সকলের উচিত নিজেদের ভিতরে থাকা প্রতিমাগুলোর উপর তদারকি জোরদার করা, যেন আমাদের কামনা-বাসনা আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু না করে। নিজেদেরকে আল্লাহ তা'আলার সাথে সংযুক্ত করা এবং কিভাবে হৃদয়ের সত্যিকার প্রশান্তি আসে, তাঁর অনুসন্ধানে নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখা।