📄 ভুল- উপলব্ধি- অনুশোচনা
আল্লাহ তা'আলা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের পিতামাতাকে তাদের ভুল উপলব্ধি করতে সহায়তা করেন। আমাদের এই দুনিয়ার মতো নয়, যেখানে আমরা ভুল করলে বুঝতেও পারি না যে, আমরা কি করেছি। অন্য কারো কর্তৃক আমাদের বিবেককে ধাক্কা দেওয়া কিংবা পুরোপুরি মুখ থুবড়ে না পড়া পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারি না যে, আমরা ভুল করেছি। কিন্তু আল্লাহ আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে সাথে সাথে ভুল ধরিয়ে দিলেন এজন্য যে, এখান থেকে পরবর্তী আদম সন্তানগণ শিক্ষা লাভ করবে।
শয়তানের পরিকল্পনা মোতাবেক যখন তারা নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে, তখন 'তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়ে পড়লো আর তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে তা ঢাকতে লাগলো।'- সূরা আরাফ, ৭:২২
আমাদের গোপনাঙ্গসমূহ ঢেকে দেওয়ার এ সর্বজনীন অভ্যাসের উৎপত্তি এখান থেকেই হয়েছিল এবং এটা নির্দেশ করে যে, শালীনতা ও লজ্জাবোধ মানুষের সহজাত একটি প্রবৃত্তি, যা আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন।
যখন আমরা কোনো ভুল করি, তখন সাথে সাথে ঘণ্টাধ্বনি বাজতে শুরু করে না কিংবা আল্লাহ আমাদেরকে সোজা করে দেন না। আমরা বুঝতে পারি না আমরা কোনো ভুল করছি কিনা, পরবর্তীতে যখন বুঝতে পারি যে, আমরা ভুল করে ফেলেছি, তখন হয়তো অনেক দেরী হয়ে যায় কিংবা আমরা (ওই পাপ বা ভুলের পথে) অনেক দূর এগিয়ে যাই।
আল্লাহ আমাদের পিতামাতার সাথে কথা বলতে শুরু করেন, 'তাদের রব তাদেরকে বললেন, 'আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনি এবং আমি কি তোমাদের বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?।' - সূরা আরাফ, ৭:২২। আল্লাহ তাদের জন্য কেবল একটি বৃক্ষকে হারাম করেছিলেন এবং বাদ-বাকি জান্নাতকে তাদের উপভোগের জন্য রাখেন।
অন্যভাবে বললে, শয়তান আমাদেরকে বহু হালাল জিনিসের মধ্য দিয়ে এমন এক হারাম জিনিসের দিকে নিয়ে যাবে, যেটা আমাদেরকে আল্লাহর অবাধ্য বানাবে এবং আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে বিচ্যুত করবে। আল্লাহ আমাদের জন্য অনেক হালাল রাস্তা খুলে দিয়েছেন, কিন্তু শয়তান চায় যে, আমরা হালাল রাস্তা বাদ দিয়ে হারাম রাস্তায় বিচরণ করি। শয়তান হালাল সম্ভাবনাগুলোকে উপেক্ষা করতে আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করবে, যেন আমরা হারামে লিপ্ত হই।
📄 শয়তান ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য
ইবলিশ (শয়তান):
১. আল্লাহ আদমকে সিজদা করতে আদেশ করেন।
২. শয়তানের ভুল: সে আদমকে সিজদা করেনি।
৩. অহংকার: সে নিজের ভুল স্বীকার করেনি উল্টো অজুহাত দেখাতে শুরু করে।
আদম (মানুষ):
১. আল্লাহ নিষিদ্ধ বৃক্ষ থেকে দূরে থাকার আদেশ দেন।
২. আদমের ভুল: তিনি নিষিদ্ধ বৃক্ষ থেকে ফল খান।
৩. তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং ক্ষমা চান।
শিক্ষা:
নিজেদেরকে শয়তানের কৌশল থেকে নিরাপদ রাখার জন্য কুর'আনের এই আয়াতগুলো জানা আমাদের জন্য আবশ্যক, যেন আমরা জানতে পারি যে, আমরা কোথায় যাচ্ছি। ভুল করা যদিও আল্লাহর অবাধ্যতা নয়, তথাপি এটা আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার মতো। আপনি আল্লাহকে অমান্য করার পদক্ষেপ নিচ্ছেন কিনা তা আপনি ছাড়া আর কে ভালো জানবে। যখন আপনি পাপের পথের কাছাকাছি আসতে থাকেন, তখন তা আপনাকে আরও বেশি শক্তি দিয়ে কাছে টানতে শুরু করে, যা মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জটি কঠিন হলেও তা জয় করা অসম্ভব নয়, এমনকি কুর'আন ও আল্লাহর রজ্জু শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে আমরা পুরো বিষয়টি অর্থাৎ পাপের যে শক্ত আকর্ষণ ক্ষমতা রয়েছে, সেটাকে পাল্টে দিয়ে সেখানে আমরা পুণ্য ও নেকা কাজ করার প্রতি তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারি।
📄 আদম (আ.) ও হাওয়ার (আ.) দু’আ
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّমْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخাসিরিন
'তারা বললো, 'হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি আপনি ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব।' - সূরা আরাফ, ৭: ২৩
ইবলিস ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর অবাধ্য হয়েছিল এবং এর পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল। অন্যদিকে আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) সাধারণ ভুলে যাওয়া ও গাফেলতির কবলে পড়ে এই ভুল করেন এবং পরবর্তীতে এর জন্য চরমভাবে দুঃখিত হন, বিনীতভাবে অনুশোচনা করেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। জান্নাতে থাকাকালে তারা এই দু'আ করেন এবং ওখানে থাকতেই আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেন।
আমাদের প্রথম পিতামাতার এ ভুল তাদের জন্য এবং আমাদের সবার জন্য গুরুতর ফলাফল বয়ে আনলেও তার জন্য কোনো মন্তব্যের প্রয়োজন নেই। এটা তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ভুল ছিল, এর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী এবং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে আলাদাভাবে ক্ষমাও করে দিয়েছিলেন। ইসলামী শিক্ষার মৌলিক একটি বিষয় হচ্ছে: প্রত্যেকেই নিজ কাজের জন্য দায়ী হবে এবং একজন আরেকজনের বোঝা বহন করবে না। এ বিষয়টি কুর'আনে বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে:
وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
'যে যা করবে তাই পাবে। কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।' - সূরা আন'আম, ৬:১৬৪
আদম (আ.) ও হাওয়ার (আ.) প্রকৃত নিবাস ছিল জান্নাত। যদিও এটা ছেড়ে আসা এবং পৃথিবীতে বাস করা তাদের ভাগ্যে ছিল, তথাপি পৃথিবী তাদের জন্য ছিল এক অস্থায়ীভাবে আবাস, যেখান থেকে তারা পুনরায় তাদের মূল উৎসে ফিরে যাবেন। জান্নাতের স্বাদ আস্বাদন করানোর মাধ্যমে সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তাদের হৃদয় ও রূহানি জগতের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য সংযোগ সৃষ্টি করেন, যে জগত থেকে তারা দুনিয়াতে এসেছে এবং যা তাদের চিরস্থায়ী আবাস।
শিক্ষা:
আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) তৎক্ষণাৎ তাদের কৃতকর্মের দায় নিজেদের কাঁধে তুলে নেন এবং তারা একে অন্যকে দোষারোপ করেননি, কোনো অজুহাতও দেখাননি। তারা তাদের ভুল স্বীকার করে নেন, কারণ তারা জানতেন, আল্লাহর অবাধ্যতার জন্য তারা দুজনই দায়ী ছিল। একে অন্যের দিকে আঙুল না তুলে তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে নেন। তারা আল্লাহর কাছে দু'আ করেন এবং সমবেত কণ্ঠে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যা আমাদের পিতামাতা তরফ থেকে আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পরিবার হিসেবে আমাদের উচিত একসাথে দু'আ করা, একে অপরের জন্য ক্ষমা চাওয়া, ভুল করেছেন কি করেননি, সেটা বড় কথা নয়, একসাথে দাঁড়িয়ে আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জন করাটাই আসলে প্রকৃত ভালবাসা। এখান থেকে আমরা এটাও শিখেছি, যখন আমরা কোনো ভুল করি, তখন ভুল স্বীকার ও দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়ার পরিবর্তে একে অপরের দিকে আঙ্গুল না তোলার খেলায় মেতে উঠি। এসব ক্ষেত্রে আমাদের জন্য আবশ্যক যে, আমরা আমাদের পিতামাতার স্থাপন করা আদর্শ অনুসরণ করা, নিজেদের ভুল স্বীকার করা এবং অজুহাত না দেখিয়ে সোজা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করা। আমরা হয়তো সব ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করতে পারবো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যখন আমরা সীমালঙ্ঘন করবো এবং আল্লাহর আইন অমান্য করবো, তখন অনুতাপ ছাড়া সব যুক্তিই অকেজো হওয়া উচিত।
📄 পৃথিবীর দিকে যাত্রা
জীবনের যে চক্রটি দুনিয়াতে ঘটতে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) সম্যক অবগত আছেন এবং তারা পৃথিবীর জীবনের জন্য প্রস্তুত। এই পৃথিবীতে বাস করতে গেলে কি কি ঘটতে পারে, এটা ছিল তার একটি প্রিভিউ বা পূর্ব উপস্থাপনা। শয়তান তাদেরকে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করে তাদেরকে পাপলিপ্ত করাতে চাইবে, কিন্তু যখনই তারা ভুল করবে বা বিপথগামী হবে, তখনই তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে এবং সত্য পথে ফিরে আসবে:
قَالَ اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ
'তিনি বললেন, 'তোমরা পরস্পর শত্রুরূপে নেমে যাও। তোমাদের জন্যে পৃথিবীতে কিছু সময়ের জন্য বাসস্থান ও জীবিকা আছে।' - সূরা আরাফ, ৭: ২৪