📘 নবীদের দুআ 📄 আদম (আ.) ও হাওয়ার (আ.) ঘটনা

📄 আদম (আ.) ও হাওয়ার (আ.) ঘটনা


আমাদের আদি পিতামাতা আদম (আ.) এবং হাওয়া (আ.) জান্নাতে সুখেই বাস করছিলেন। ওই জান্নাত কোথায় ছিল, তার সঠিক অবস্থান কুর'আন বর্ণনা করেনি। তবে কুর'আনের ভাষ্যকাররা এ ব্যাপারে একমত, তা পৃথিবীর কোথাও ছিল না। মূল বিষয় হচ্ছে জান্নাতটির সঠিক অবস্থান জানার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই, বরং সেখানে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা থেকে শিক্ষা নেয়ার মাঝেই সত্যিকারের কল্যাণ রয়েছে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আদম (আ.)-কে বেহেশতে কেন তাদের উপর বিপদ নেমে আসতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন:
وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلًّا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ
'হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাকো এবং ওখানে যা ইচ্ছে তা আহার কর।' [আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে থাকতে মাত্র একটি শর্ত জুড়ে দেন] কিন্তু এ গাছের কাছে যেও না। অন্যথায় তোমরা জালিম গণ্য হবে।' - সূরা বাকারাহ, ২:৩৫

আমাদের পিতা আদম (আ.) ও মাতা হাওয়ার (আ.) করা দু'আকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হলে, আমাদেরকে প্রথমে এটা উপলব্ধি করতে হবে, কিভাবে তাদের পদঙ্খলন ঘটলো এবং নিষিদ্ধ গাছ থেকে ফল খাওয়ার মাধ্যমে তারা আল্লাহর দেওয়া একটি মাত্র আদেশ অমান্য করে ভুলে জড়ালো।

সতর্ক না হওয়া
ইচ্ছাকৃত নয়
পদস্খলন
স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নয়
পিছলে যাওয়া

পদস্খলন তখনই ঘটে, যখন আগামীদিনে কি ঘটতে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে মানুষ সতর্ক থাকে না। অথচ এ অসতর্কতা মোটেও ইচ্ছাকৃত বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নয়। ভুলের ব্যাপারে মানুষ এমনটাই ভাবে। তাই মানুষকে অবশ্যই সব সময় সতর্ক থাকতে হবে এবং কিভাবে শয়তানের ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছে, তা খেয়ালে রাখতে হবে। মানুষকে অবশ্যই এটা মেনে নিতে হবে, তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য বানাতে শয়তান সব ধরনের কলা-কৌশল প্রয়োগ করবে।

আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা কুর'আনে উল্লেখ করেন:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِن قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيرًا وَضَلُّوا عَن سَوَاءِ السَّبِيلِ
'বলুন, হে কিতাবের অনুসারীরা তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অযথা বাড়াবাড়ি করো না। যারা ইতিপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে বিভ্রান্ত করেছে এবং সরল পথ যারা হারিয়েছে, তাদের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।'- সূরা মায়িদাহ, ৫:৭৭

📘 নবীদের দুআ 📄 শয়তানের কৌশল

📄 শয়তানের কৌশল


إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ قَدْ ضَلُّوا ضَلَالًا بَعِيدًا 'যারা কাফের এবং আল্লাহর পথে বাধা দেয়, তারা মারাত্মক পথভ্রষ্ট।' - সূরা নিসা, ৪:১৬৭

এই ঘটনা থেকে আল্লাহ আমাদের শেখাতে চাচ্ছেন, আমাদের আদি পিতামাতা মানুষের অস্তিত্বের বহু আগেই শয়তানের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। শয়তানের কৌশল হচ্ছে, সে তৎক্ষণাৎ আক্রমণ করে না, বরং ধীরে ধীরে আল্লাহর আনুগত্য করার যে সহজাত প্রবৃদ্ধি আমাদের রয়েছে, সেটাকে নিস্তেজ করতে থাকে, যতক্ষণ না আপনি ওই ভুল বা পাপ কাজে এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েন যে, সেটাকে আপনি আর পাপ বা ভুল মনে না করে স্বাভাবিক বিষয় ভাবেন।

প্রথম ধাপ: আপনি ওই পথে চলতে অভ্যস্ত হতে শুরু করেন
দ্বিতীয় ধাপ: নিষিদ্ধ এলাকার সীমানার কাছাকাছি হাঁটাচলা করা
তৃতীয় ধাপ: অবশেষে নিষিদ্ধ অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং পাপ বা ভুল করতে শুরু করেন

📘 নবীদের দুআ 📄 নিষিদ্ধ বৃক্ষ

📄 নিষিদ্ধ বৃক্ষ


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা নতুন দম্পতিকে উদ্দেশ্য করে দ্বিতীয় সতর্কবার্তা জারি করেন, যেন তারা ইবলিসের উপস্থিতি ও তার শত্রুতা সম্পর্কে জানতে পারে। এই সতর্কবার্তাটি বেশ স্পষ্ট ও সরাসরি:

فَقُلْنَا يَا آدَمُ إِنَّ هَذَا عَدُوٌّ لَّكَ وَلِزَوْجِكَ فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى ﴾ إِنَّ لَكَ أَلَّا تَجُوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى ) وَأَنَّكَ لَا تَظْمَأُ فِيهَا وَلَا تَضْحَى )
'অতপর আমি বললাম, হে আদম, এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু, সুতরাং তোমাদেরকে জান্নাত থেকে সে যেন বের করে না দেয়। তাহলে তোমরা দুর্ভাগা হবে। সেখানে সব আছে, না থাকবে ক্ষুধার্ত, না থাকবে উলঙ্গ এবং তোমরা তৃষ্ণার্তও হবে না এবং রৌদ্রেও কষ্ট পাবে না।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০: ১১৭-১১৯

বিতাড়িত ইবলিশ পরিকল্পনা তৈরি করে, যা ছিল সাধারণ এক কৌশল। ইবলিশ লক্ষ্য করলো, আদমের (আ.) মনের ভেতরটা ফাঁকা, তাই সে এই দুর্বলতার ফায়দা লুটার অপেক্ষায় থাকে। সে ইতিমধ্যে বুঝে ফেলেছে, আদম (আ.)-কে খুব সহজেই আয়ত্তে এনে ধ্বংস করা যাবে। ইবলিশ যে মেধাকে আগে ইবাদাতের কাজে ব্যবহার করতো, সেটাকে সে এখন নতুন শত্রুকে ধ্বংস করার কাজে ব্যবহার করছে।

পাপাচারী ইবলিশ নির্দোষ দম্পতির নিকট কৌশল ও প্রতারণার বাহানা নিয়ে হাজির হয়:
فَوَসْوَসَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ قَالَ يَا آدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى শজরাতিল খলদি وَمُلْكٍ لَّا يَبْلَى
'অতপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল, হে আদম, আমি কি তোমাকে চিরস্থায়ী বৃক্ষের কথা এবং অবিনশ্বর রাজ্যের কথা বলে দিবো?' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০:১২০

فَوَসْوَসَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِن سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا নহাকুমা রব্বুকুমা عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا মলাকাইনি أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ () وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ
সে বলল: তোমাদের পালনকর্তা তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করেননি, কেবল এ কারণ ছাড়া যে, তোমরা না আবার ফেরেশতা হয়ে যাও কিংবা হয়ে যাও চিরকাল বসবাসকারী। সে তাদের কাছে (আল্লাহর) কসম খেয়ে বললো, 'আমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী।' - সূরা আরাফ, ৭: ২০-২১

শয়তানের মন্দ পরামর্শ ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) কান দিলেন এবং নিষিদ্ধ বৃক্ষ ও তাদের শত্রু ইবলিস সম্পর্কে আল্লাহর স্পষ্ট সতর্কতা ভুলে যান। পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ হৃদয় ও মন্দ অভিপ্রায়হীন চেতনার অধিকারী আদম ও হাওয়া ইবলিশের অন্তরের ভয়াবহ ধরনের হিংসা ও শত্রুতার ব্যাপারে সন্দেহ করা পর্যন্ত ভুলে যায়।

ইবলিস সুকৌশলে তার আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে, যতক্ষণ না তারা তার ফাঁদে পা দিচ্ছে। ভুলে যাওয়া ও গাফেল থাকার কারণে তারা প্রতারণার শিকার হয় এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করার মতো পদস্খলনে জড়িয়ে পড়ে: وَلَقَدْ عَهِدْنَا إِلَى آدَمَ مِن قَبْلُ فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا 'আমরা ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতপর সে ভুলে যায় এবং আমি তাঁর মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০: ১১৫

আর এর মাধ্যমেই চূড়ান্ত বিপর্যয় ঘটে:
وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَى 'আদম তাঁর পালনকর্তার অবাধ্য হলো এবং এতে সে পথচ্যুত হয়ে গেলো।' - সূরা ত্বোয়াহা, ২০: ১২১

أَزَلَّهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ অনন্তর শয়তান তাদের উভয়কে ওখান থেকে পদস্খলিত করেছিল। পরে তারা যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল তা থেকে তাদেরকে বের করে দিল।' - সূরা বাকারাহ, ২: ৩৬

📘 নবীদের দুআ 📄 ভুল- উপলব্ধি- অনুশোচনা

📄 ভুল- উপলব্ধি- অনুশোচনা


আল্লাহ তা'আলা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের পিতামাতাকে তাদের ভুল উপলব্ধি করতে সহায়তা করেন। আমাদের এই দুনিয়ার মতো নয়, যেখানে আমরা ভুল করলে বুঝতেও পারি না যে, আমরা কি করেছি। অন্য কারো কর্তৃক আমাদের বিবেককে ধাক্কা দেওয়া কিংবা পুরোপুরি মুখ থুবড়ে না পড়া পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারি না যে, আমরা ভুল করেছি। কিন্তু আল্লাহ আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে সাথে সাথে ভুল ধরিয়ে দিলেন এজন্য যে, এখান থেকে পরবর্তী আদম সন্তানগণ শিক্ষা লাভ করবে।

শয়তানের পরিকল্পনা মোতাবেক যখন তারা নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে, তখন 'তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়ে পড়লো আর তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে তা ঢাকতে লাগলো।'- সূরা আরাফ, ৭:২২

আমাদের গোপনাঙ্গসমূহ ঢেকে দেওয়ার এ সর্বজনীন অভ্যাসের উৎপত্তি এখান থেকেই হয়েছিল এবং এটা নির্দেশ করে যে, শালীনতা ও লজ্জাবোধ মানুষের সহজাত একটি প্রবৃত্তি, যা আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন।

যখন আমরা কোনো ভুল করি, তখন সাথে সাথে ঘণ্টাধ্বনি বাজতে শুরু করে না কিংবা আল্লাহ আমাদেরকে সোজা করে দেন না। আমরা বুঝতে পারি না আমরা কোনো ভুল করছি কিনা, পরবর্তীতে যখন বুঝতে পারি যে, আমরা ভুল করে ফেলেছি, তখন হয়তো অনেক দেরী হয়ে যায় কিংবা আমরা (ওই পাপ বা ভুলের পথে) অনেক দূর এগিয়ে যাই।

আল্লাহ আমাদের পিতামাতার সাথে কথা বলতে শুরু করেন, 'তাদের রব তাদেরকে বললেন, 'আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনি এবং আমি কি তোমাদের বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?।' - সূরা আরাফ, ৭:২২। আল্লাহ তাদের জন্য কেবল একটি বৃক্ষকে হারাম করেছিলেন এবং বাদ-বাকি জান্নাতকে তাদের উপভোগের জন্য রাখেন।

অন্যভাবে বললে, শয়তান আমাদেরকে বহু হালাল জিনিসের মধ্য দিয়ে এমন এক হারাম জিনিসের দিকে নিয়ে যাবে, যেটা আমাদেরকে আল্লাহর অবাধ্য বানাবে এবং আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে বিচ্যুত করবে। আল্লাহ আমাদের জন্য অনেক হালাল রাস্তা খুলে দিয়েছেন, কিন্তু শয়তান চায় যে, আমরা হালাল রাস্তা বাদ দিয়ে হারাম রাস্তায় বিচরণ করি। শয়তান হালাল সম্ভাবনাগুলোকে উপেক্ষা করতে আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করবে, যেন আমরা হারামে লিপ্ত হই।

ফন্ট সাইজ
15px
17px