📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 আদর্শ শিক্ষক

📄 আদর্শ শিক্ষক


মহান আল্লাহ বলেন-
وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُن تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
আল্লাহ আপনার প্রতি ঐশীগ্রন্থ ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর করুণা অসীম। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
❝ مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ ❞
যে-ব্যক্তি দ্বীনি ইলম অর্জনের জন্য যাত্রা করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেবেন। [২]
দ্বীনি ইলমের ক্ষেত্রে মুসলিমদের শিক্ষক হিসেবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই যথেষ্ট। তিনি ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে শুরু করে ইবাদাতের মৌলিক
পদ্ধতি, পানাহারের আদব; এমনকি পেশাপ-পায়খানার নিয়ম-নীতি পর্যন্ত শিক্ষা দিয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাধারণ বিষয়ে বয়ান করতেন তখন ভয়ে ও আবেগে শ্রোতাদের হৃদয় বিগলিত হতো। আর যখন অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে বয়ান করতেন তখন সুর ক্রমশ উঁচু হতে থাকত, চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করত, চেহারায় প্রচণ্ড ক্রোধের লক্ষণ ফুটে উঠত। মনে হতো, যেন আসন্ন কোনো শত্রুদলের ব্যাপারে তিনি সবাইকে সাবধান করছেন। তার কণ্ঠের গভীরতা এবং পরকালের ভয়াবহতার কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই কেঁদে ফেলতেন কিংবা অন্তত তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে অনুতপ্ত হতেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ নিঃসৃত কথাগুলো ছিল প্রজ্ঞাপূর্ণ—যা সব সময় সঠিক পথের নির্দেশনা দিত এবং সাহাবীদের ঈমান-বৃদ্ধিতে কাজে আসত। কেউ তার কাছে কোনো ব্যাপারে ফতোয়া জানতে চাইলে তিনি সাথে সাথে সেই ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ করে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করতেন। কেউ তার কাছে কোনো উপদেশ চাইলে তিনি এমন উত্তর দিতেন—যাতে করে প্রশ্নকর্তার মন সততা, বিশ্বাস এবং ভক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। যখন তিনি কোনো উপদেশমূলক গল্প বলতেন, তখন তিনি এমন উদাহরণই পেশ করতেন—যা সাহাবীদের জন্য স্পষ্ট ও বোধগম্য। যখন তিনি পূর্ববর্তী জাতিদের নিয়ে কথা বলতেন, সাহাবীগণ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তা শুনতেন এবং শিক্ষা গ্রহণ করতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়ান যেন তাদের হৃদয় বন্দী করে ফেলত। ফলে তারা সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতেন। তবে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল উদ্দিষ্ট কাজটি নিজে করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। তার করা সব কিছু ছিল পবিত্র ও মহৎ। আর যা করেননি এবং অন্যকেও করার অনুমতি দেননি, তা ছিল অপবিত্র ও ক্ষতিকর। ইসলামের প্রতিটি অংশই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুসরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাজেই যুগ যুগ ধরে নিষ্ঠাবান মুসলিমগণ তার সুন্নাহ অনুসরণ করে আসছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর নাযিল হওয়া মহাসত্যের প্রথম শব্দই ছিল 'পড়ো'। শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এরচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী উদাহরণ আর হতে পারে না। আল্লাহ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এই দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন—
رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا
উচ্চারণ- ‘রব্বি যিদনী ইলমা।’ অর্থাৎ ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দেন’।[১]
আল্লাহপাক চাইলেই অন্য অনেক কিছুই চাওয়ার আদেশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে; বরং জ্ঞান বৃদ্ধির দুআ করার আদেশ করেছেন। কারণ, একমাত্র জ্ঞানই মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে। জ্ঞান হলো একটি দরজা- যার অন্যপাশে রয়েছে সুখ, সমৃদ্ধি এবং সাফল্যের ঐশ্বর্য। ভালো কথা এবং সৎ কাজ করতে বলারও আগে আল্লাহ জ্ঞান অর্জন করতে বলেছেন। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

إِنَّ مَثَلَ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ مِنَ الْهُدَى وَالْعِلْمِ كَمَثَلَ غَيْثٍ
মহান আল্লাহ আমাকে যে-জ্ঞান ও পথ-নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত হলো বর্ষণমুখর মেঘ। [৩]
বস্তুত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেওয়া আল্লাহর বিশেষ একটি রহমত হলো জ্ঞান। আর সেই জ্ঞান প্রচার করা ছিল তার ওপর বর্তানো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ
তিনি তাদের কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন।১ [১]
উল্লেখ্য যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পালন করেছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সেইসব ফকীহ, তাফসীরকারক, ধর্ম প্রচারক, হাদীসবেত্তা ও বিজ্ঞ আলিমের মাধ্যমে, যারা তার জীবদ্দশায় তাঁরই অধীনে থেকে জ্ঞানলাভ করেছেন। এই আলোর মশালবাহীরাই পরবর্তী সময়ে পৃথিবীকে করেছেন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত, ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বার্তা এবং তুলে নিয়েছেন তার রেখে যাওয়া দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রচারিত বার্তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব সাহাবীদের দিয়ে গেছেন। ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিদায় হজের বিখ্যাত ভাষণে তিনি বলেছেন-
GG فَلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الغَابِبَ، فَإِنَّه رُبَّ مُبَلِّغ يُبَلِّغُهُ لِمَن هو أَوْعَى له
উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে আমার এই পয়গাম পৌঁছে দেয়। কারণ, হতে পারে পরবর্তী কোনো শ্রোতা উপস্থিত ব্যক্তির চেয়েও বেশি যোগ্য। [২]
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
GG نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأَ سَمِعَ مِنَّا حَدِيثًا فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ غَيْرَهُ، فَرُبَّ حَامِلٍ فِقْهِ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ
আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে প্রাণবন্ত রাখুন, যে আমার কথা শুনে মুখস্থ করে অতঃপর অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়। কারণ, অনেক শ্রোতা বার্তাবাহক অপেক্ষাও অধিক জ্ঞানী হয়ে থাকে। [৩]
আরেক হাদীসে আছে-
GG بَلِّغُوا عَني ولو آيةٌ
আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও অন্যের কাছে পৌঁছে দাও। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পুরোটা জীবন কেটেছে উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার পেছনে। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে সালাত আদায় করতে হয়, রোযা রাখতে হয়, যাকাত দিতে হয়, হজ করতে হয়। আল্লাহকে স্মরণ করা, তার দরবারে প্রার্থনা করা এবং পানাহার করাসহ যাবতীয় আদব-কায়দা তো তার হাত ধরেই শেখা। আর এই সব কিছু একদিনে হয়ে যায়নি। বছরের পর বছর ধরে অল্প অল্প করে অথচ পর্যায়ক্রমে তিনি সব কিছু শিখিয়ে গেছেন। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
وَقُرْءَانًا فَرَقْنَهُ لِتَقْرَأَهُ وَ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثٍ
আমি কুরআনকে অবতীর্ণ করেছি পৃথকভাবে পাঠের উপযোগী করে, যাতে আপনি তা লোকদের কাছে ধীরে ধীরে পাঠ করেতে পারেন। আর আমি তা অবতীর্ণ করেছি পর্যায়ক্রমে। [২]
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةٌ وَاحِدَةً كَذَلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا
সত্য প্রত্যাখানকারীরা বলে, তার প্রতি সমগ্র কুরআন একদফায় কেন অবতীর্ণ করা হলো না? আমি এমনিভাবে একে অবতীর্ণ করেছি এবং ক্রমে ক্রমে আবৃত্তি করেছি আপনার অন্তকরণকে মজবুত করার জন্য। [৩]
সাহাবীদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি নীতি ও অভ্যাস এই ছিল যে, তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে শিক্ষা দিতেন। প্রয়োজনভেদে একটি কথা একবার, দুইবার বা তিনবারও বলতেন। তিনি বারবার পুনরাবৃত্তি করতেন-যাতে সাহাবীগণ মূল বিষয়টি খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।
ইবাদাতের নতুন কোনো পন্থা শেখানোর আগে তিনি নিজে তা করে দেখাতেন। এভাবেই সাহাবীগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখে দেখে নির্ভুলভাবে শেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
** صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي
তোমরা সেভাবেই সালাত আদায় করো, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখছ। [১]
আরও বলেছেন-
** خُذُوا عَنِّي مَنَاسِكَكُمْ
তোমরা আমার কাছ থেকে হজের বিধি-বিধান শিখে নাও। [২]
অন্যভাবে বললে, 'আমি যা বলি তা শোনো, যা করি তা খেয়াল করো এবং ঠিক তা-ই নিজেরা পালন করো।'
ইয়া আল্লাহ, আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর, তার পরিবারবর্গের ওপর, সম্মানিত সাহাবীগণের ওপর এবং যারা তাদের রাসূলকে ভালোবেসে তার দেখানো পথ অনুসরণ করে তাদের সবার ওপর শেষ দিন পর্যন্ত রহমতের বারিধারা বর্ষণ করতে থাকুন।

টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত: ১১৩
২. সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা ত-হা, আয়াত: ১১৪
২. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯
৩. সহীহ বুখারী: ৭৯; সহীহ মুসলিম: ২২৮২, হাদীসটি আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৯
২. সহীহ বুখারী: ১৭৪১, ৭০৭৮; সহীহ মুসলিম: ১৬৭৯, হাদীসটি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
৩. জামি তিরমিযী: ২৬৫৮; ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; কাশফ আল খফা
: ২/৪২৩
১. সহীহ বুখারী: ৩৪৬১; হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ১০৬
৩. সূরা ফুরকান, আয়াত: ৩২
১. সহীহ বুখারী: ৬৩১; হাদীসটি মালিক ইবনুল হুওয়ায়রিস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ মুসলিম: ১২৯৭; হাদীসটি জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

মহান আল্লাহ বলেন-
وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُن تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
আল্লাহ আপনার প্রতি ঐশীগ্রন্থ ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর করুণা অসীম। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
❝ مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ ❞
যে-ব্যক্তি দ্বীনি ইলম অর্জনের জন্য যাত্রা করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেবেন। [২]
দ্বীনি ইলমের ক্ষেত্রে মুসলিমদের শিক্ষক হিসেবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই যথেষ্ট। তিনি ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে শুরু করে ইবাদাতের মৌলিক
পদ্ধতি, পানাহারের আদব; এমনকি পেশাপ-পায়খানার নিয়ম-নীতি পর্যন্ত শিক্ষা দিয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাধারণ বিষয়ে বয়ান করতেন তখন ভয়ে ও আবেগে শ্রোতাদের হৃদয় বিগলিত হতো। আর যখন অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে বয়ান করতেন তখন সুর ক্রমশ উঁচু হতে থাকত, চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করত, চেহারায় প্রচণ্ড ক্রোধের লক্ষণ ফুটে উঠত। মনে হতো, যেন আসন্ন কোনো শত্রুদলের ব্যাপারে তিনি সবাইকে সাবধান করছেন। তার কণ্ঠের গভীরতা এবং পরকালের ভয়াবহতার কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই কেঁদে ফেলতেন কিংবা অন্তত তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে অনুতপ্ত হতেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ নিঃসৃত কথাগুলো ছিল প্রজ্ঞাপূর্ণ—যা সব সময় সঠিক পথের নির্দেশনা দিত এবং সাহাবীদের ঈমান-বৃদ্ধিতে কাজে আসত। কেউ তার কাছে কোনো ব্যাপারে ফতোয়া জানতে চাইলে তিনি সাথে সাথে সেই ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ করে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করতেন। কেউ তার কাছে কোনো উপদেশ চাইলে তিনি এমন উত্তর দিতেন—যাতে করে প্রশ্নকর্তার মন সততা, বিশ্বাস এবং ভক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। যখন তিনি কোনো উপদেশমূলক গল্প বলতেন, তখন তিনি এমন উদাহরণই পেশ করতেন—যা সাহাবীদের জন্য স্পষ্ট ও বোধগম্য। যখন তিনি পূর্ববর্তী জাতিদের নিয়ে কথা বলতেন, সাহাবীগণ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তা শুনতেন এবং শিক্ষা গ্রহণ করতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়ান যেন তাদের হৃদয় বন্দী করে ফেলত। ফলে তারা সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতেন। তবে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল উদ্দিষ্ট কাজটি নিজে করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। তার করা সব কিছু ছিল পবিত্র ও মহৎ। আর যা করেননি এবং অন্যকেও করার অনুমতি দেননি, তা ছিল অপবিত্র ও ক্ষতিকর। ইসলামের প্রতিটি অংশই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুসরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাজেই যুগ যুগ ধরে নিষ্ঠাবান মুসলিমগণ তার সুন্নাহ অনুসরণ করে আসছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর নাযিল হওয়া মহাসত্যের প্রথম শব্দই ছিল 'পড়ো'। শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এরচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী উদাহরণ আর হতে পারে না। আল্লাহ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এই দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন—
رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا
উচ্চারণ- ‘রব্বি যিদনী ইলমা।’ অর্থাৎ ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দেন’।[১]
আল্লাহপাক চাইলেই অন্য অনেক কিছুই চাওয়ার আদেশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে; বরং জ্ঞান বৃদ্ধির দুআ করার আদেশ করেছেন। কারণ, একমাত্র জ্ঞানই মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে। জ্ঞান হলো একটি দরজা- যার অন্যপাশে রয়েছে সুখ, সমৃদ্ধি এবং সাফল্যের ঐশ্বর্য। ভালো কথা এবং সৎ কাজ করতে বলারও আগে আল্লাহ জ্ঞান অর্জন করতে বলেছেন। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

إِنَّ مَثَلَ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ مِنَ الْهُدَى وَالْعِلْمِ كَمَثَلَ غَيْثٍ
মহান আল্লাহ আমাকে যে-জ্ঞান ও পথ-নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত হলো বর্ষণমুখর মেঘ। [৩]
বস্তুত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেওয়া আল্লাহর বিশেষ একটি রহমত হলো জ্ঞান। আর সেই জ্ঞান প্রচার করা ছিল তার ওপর বর্তানো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ
তিনি তাদের কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন।১ [১]
উল্লেখ্য যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পালন করেছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সেইসব ফকীহ, তাফসীরকারক, ধর্ম প্রচারক, হাদীসবেত্তা ও বিজ্ঞ আলিমের মাধ্যমে, যারা তার জীবদ্দশায় তাঁরই অধীনে থেকে জ্ঞানলাভ করেছেন। এই আলোর মশালবাহীরাই পরবর্তী সময়ে পৃথিবীকে করেছেন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত, ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বার্তা এবং তুলে নিয়েছেন তার রেখে যাওয়া দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রচারিত বার্তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব সাহাবীদের দিয়ে গেছেন। ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিদায় হজের বিখ্যাত ভাষণে তিনি বলেছেন-
GG فَلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الغَابِبَ، فَإِنَّه رُبَّ مُبَلِّغ يُبَلِّغُهُ لِمَن هو أَوْعَى له
উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে আমার এই পয়গাম পৌঁছে দেয়। কারণ, হতে পারে পরবর্তী কোনো শ্রোতা উপস্থিত ব্যক্তির চেয়েও বেশি যোগ্য। [২]
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
GG نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأَ سَمِعَ مِنَّا حَدِيثًا فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ غَيْرَهُ، فَرُبَّ حَامِلٍ فِقْهِ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ
আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে প্রাণবন্ত রাখুন, যে আমার কথা শুনে মুখস্থ করে অতঃপর অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়। কারণ, অনেক শ্রোতা বার্তাবাহক অপেক্ষাও অধিক জ্ঞানী হয়ে থাকে। [৩]
আরেক হাদীসে আছে-
GG بَلِّغُوا عَني ولو آيةٌ
আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও অন্যের কাছে পৌঁছে দাও। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পুরোটা জীবন কেটেছে উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার পেছনে। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে সালাত আদায় করতে হয়, রোযা রাখতে হয়, যাকাত দিতে হয়, হজ করতে হয়। আল্লাহকে স্মরণ করা, তার দরবারে প্রার্থনা করা এবং পানাহার করাসহ যাবতীয় আদব-কায়দা তো তার হাত ধরেই শেখা। আর এই সব কিছু একদিনে হয়ে যায়নি। বছরের পর বছর ধরে অল্প অল্প করে অথচ পর্যায়ক্রমে তিনি সব কিছু শিখিয়ে গেছেন। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
وَقُرْءَانًا فَرَقْنَهُ لِتَقْرَأَهُ وَ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثٍ
আমি কুরআনকে অবতীর্ণ করেছি পৃথকভাবে পাঠের উপযোগী করে, যাতে আপনি তা লোকদের কাছে ধীরে ধীরে পাঠ করেতে পারেন। আর আমি তা অবতীর্ণ করেছি পর্যায়ক্রমে। [২]
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةٌ وَاحِدَةً كَذَلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا
সত্য প্রত্যাখানকারীরা বলে, তার প্রতি সমগ্র কুরআন একদফায় কেন অবতীর্ণ করা হলো না? আমি এমনিভাবে একে অবতীর্ণ করেছি এবং ক্রমে ক্রমে আবৃত্তি করেছি আপনার অন্তকরণকে মজবুত করার জন্য। [৩]
সাহাবীদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি নীতি ও অভ্যাস এই ছিল যে, তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে শিক্ষা দিতেন। প্রয়োজনভেদে একটি কথা একবার, দুইবার বা তিনবারও বলতেন। তিনি বারবার পুনরাবৃত্তি করতেন-যাতে সাহাবীগণ মূল বিষয়টি খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।
ইবাদাতের নতুন কোনো পন্থা শেখানোর আগে তিনি নিজে তা করে দেখাতেন। এভাবেই সাহাবীগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখে দেখে নির্ভুলভাবে শেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
** صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي
তোমরা সেভাবেই সালাত আদায় করো, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখছ। [১]
আরও বলেছেন-
** خُذُوا عَنِّي مَنَاسِكَكُمْ
তোমরা আমার কাছ থেকে হজের বিধি-বিধান শিখে নাও। [২]
অন্যভাবে বললে, 'আমি যা বলি তা শোনো, যা করি তা খেয়াল করো এবং ঠিক তা-ই নিজেরা পালন করো।'
ইয়া আল্লাহ, আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর, তার পরিবারবর্গের ওপর, সম্মানিত সাহাবীগণের ওপর এবং যারা তাদের রাসূলকে ভালোবেসে তার দেখানো পথ অনুসরণ করে তাদের সবার ওপর শেষ দিন পর্যন্ত রহমতের বারিধারা বর্ষণ করতে থাকুন।

টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত: ১১৩
২. সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা ত-হা, আয়াত: ১১৪
২. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯
৩. সহীহ বুখারী: ৭৯; সহীহ মুসলিম: ২২৮২, হাদীসটি আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৯
২. সহীহ বুখারী: ১৭৪১, ৭০৭৮; সহীহ মুসলিম: ১৬৭৯, হাদীসটি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
৩. জামি তিরমিযী: ২৬৫৮; ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; কাশফ আল খফা
: ২/৪২৩
১. সহীহ বুখারী: ৩৪৬১; হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ১০৬
৩. সূরা ফুরকান, আয়াত: ৩২
১. সহীহ বুখারী: ৬৩১; হাদীসটি মালিক ইবনুল হুওয়ায়রিস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ মুসলিম: ১২৯৭; হাদীসটি জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 লেখক-পরিচিতি

📄 লেখক-পরিচিতি


আয়িয ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি আল-কারনী। আরববিশ্বের প্রখ্যাত আলিম, বিশ্ববরেণ্য ও পাঠকনন্দিত একজন তারকা লেখক। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে যিনি ড. আয়িয আল-কারনী-নামেই সমধিক পরিচিত। ১৩৭৯ হিজরীতে সৌদি আরবের দক্ষিণ অঞ্চলের মাজদূ আল-কারনী গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
লেখাপড়া করেছেন রিয়াদের 'ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়'-এ। হিজরী ১৪০৩-১৪০৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি এখান থেকেই 'উসুল আদ-দ্বীন'-এর ওপর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৪০৮ হিজরীতে তিনি 'উচ্চতর হাদীসশাস্ত্র'-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এসময়ে তাঁর রচিত গবেষণামূলক প্রবন্ধের নাম ছিল 'ধর্মে নতুন উদ্ভাবন; হাদীসের বর্ণনা ও শিক্ষায় এর প্রভাব'। এরপর ১৪২২ হিজরীতে তিনি লাভ করেন পিএইচডি ডিগ্রি। তার অভিসন্দর্ভটি ছিল ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ-এর আল মুফহিম আলা সাহীহিল মুসলিম গ্রন্থের ওপর একটি বিশ্লেষণাত্মক পাঠের ওপর ভিত্তি করে।
লেখায় ও বলায় ড. আয়িয আল-কারনী ছিলেন সমান পারদর্শী; যে-কারণে বিভিন্ন অডিও সিডি-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে তার ৮০০-এরও বেশি অডিও টেপ প্রকাশিত হয়েছে। যেগুলোতে সংরক্ষিত আছে তার অসংখ্য বক্তৃতা, খুতবা, বয়ান, কবিতা আবৃত্তি প্রভৃতি; কিন্তু এরপরও রচনায় তিনি যে বৈভিক বৈচিত্র্যের অবতারণা করেছেন-তা আমাদেরকে বারবার আপ্লুত করে। মুগ্ধ করে। 'বিশেষ কিছু' পাওয়ার স্বাদ ও তৃপ্তিতে আশ্বস্ত করে।
ড. আয়িয আল-কারনী বিস্ময়কর ধী-শক্তির অধিকারী একজন আলিম। কুরআন হিফযের পাশাপাশি তিনি বুলুগুল মারাম গ্রন্থটিও মুখস্ত করেছেন। এছাড়াও তিনি মুখস্থ বলতে পারেন প্রায় ৫০০০ হাদীস। আর কবিতার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১০০০০ ছাড়িয়ে যাবে। মহামহিম আল্লাহ তাআলা তার হায়াতে বরকত দান করুন।

আয়িয ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি আল-কারনী। আরববিশ্বের প্রখ্যাত আলিম, বিশ্ববরেণ্য ও পাঠকনন্দিত একজন তারকা লেখক। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে যিনি ড. আয়িয আল-কারনী-নামেই সমধিক পরিচিত। ১৩৭৯ হিজরীতে সৌদি আরবের দক্ষিণ অঞ্চলের মাজদূ আল-কারনী গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
লেখাপড়া করেছেন রিয়াদের 'ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়'-এ। হিজরী ১৪০৩-১৪০৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি এখান থেকেই 'উসুল আদ-দ্বীন'-এর ওপর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৪০৮ হিজরীতে তিনি 'উচ্চতর হাদীসশাস্ত্র'-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এসময়ে তাঁর রচিত গবেষণামূলক প্রবন্ধের নাম ছিল 'ধর্মে নতুন উদ্ভাবন; হাদীসের বর্ণনা ও শিক্ষায় এর প্রভাব'। এরপর ১৪২২ হিজরীতে তিনি লাভ করেন পিএইচডি ডিগ্রি। তার অভিসন্দর্ভটি ছিল ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ-এর আল মুফহিম আলা সাহীহিল মুসলিম গ্রন্থের ওপর একটি বিশ্লেষণাত্মক পাঠের ওপর ভিত্তি করে।
লেখায় ও বলায় ড. আয়িয আল-কারনী ছিলেন সমান পারদর্শী; যে-কারণে বিভিন্ন অডিও সিডি-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে তার ৮০০-এরও বেশি অডিও টেপ প্রকাশিত হয়েছে। যেগুলোতে সংরক্ষিত আছে তার অসংখ্য বক্তৃতা, খুতবা, বয়ান, কবিতা আবৃত্তি প্রভৃতি; কিন্তু এরপরও রচনায় তিনি যে বৈভিক বৈচিত্র্যের অবতারণা করেছেন-তা আমাদেরকে বারবার আপ্লুত করে। মুগ্ধ করে। 'বিশেষ কিছু' পাওয়ার স্বাদ ও তৃপ্তিতে আশ্বস্ত করে।
ড. আয়িয আল-কারনী বিস্ময়কর ধী-শক্তির অধিকারী একজন আলিম। কুরআন হিফযের পাশাপাশি তিনি বুলুগুল মারাম গ্রন্থটিও মুখস্ত করেছেন। এছাড়াও তিনি মুখস্থ বলতে পারেন প্রায় ৫০০০ হাদীস। আর কবিতার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১০০০০ ছাড়িয়ে যাবে। মহামহিম আল্লাহ তাআলা তার হায়াতে বরকত দান করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00