📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 সম্মান প্রদর্শন

📄 সম্মান প্রদর্শন


يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
মুমিনগণ, তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচুস্বরে কথা বল, তার সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ইসলামের মূলনীতিগুলোর অন্তর্গত। যে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে, তাকে পুরস্কৃত করা হবে। আর যে বীতশ্রদ্ধ হবে, তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা এবং তাকে সম্মানের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত রেখে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ইসলামের একটি মৌলিক বিষয়। তাই আমাদের সবার উচিত হলো পরিমীতিবোধ বজায় রেখে তাকে ভালোবাসা। এক্ষেত্রে কোনো প্রকার শিথিলতা বা সীমালঙ্ঘন না করা। যেমন, খ্রিস্টানরা তাদের রাসূলকে খোদা বলে দাবি করে। এই অত্যুচ্চ মর্যাদার দাবি করা যেমন সীমালংঘন, তেমনই তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাও চরম শিথিলতা।
আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে-কাজ করেছেন অথবা যে-কথা সে-কাজ বা কথার বিরোধিতা করা কোনো মুসলিমের পক্ষে শোভা পায় না; বরং তার প্রতিটি আদেশ ও নিষেধ আমাদের খুশিমনে মেন চলা একান্ত অপরিহার্য। উপরন্তু মনে রাখতে হবে যে, সাধারণ মানুষের চিন্তা ও বক্তব্যে শুদ্ধাশুদ্ধির আশঙ্কা থাকলেও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে আদৌ এমন কোনো আশঙ্কা নেই। এমন আশঙ্কা মনে স্থান দেওয়াও ঈমানের দুর্বলতার পরিচায়ক।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বলা প্রতিটি কথা সত্য। কারণ, আল্লাহর অশেষ দয়ায় তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি কোনোভাবেই বীতশ্রদ্ধ হওয়া যাবে না এবং তার স্পষ্ট সত্য-ভাষণ নিয়ে কোনোরূপ সন্দেহ করা যাবে না। তার করা কোনো বিচারের রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। আর কোনোভাবেই কোনো রাজা, নেতা, রাষ্ট্রপতি অথবা শাসকের বলা কথার সাথে তার কথার তুলনা করা চলবে না। কারণ, আল্লাহপাক তাকে এসব-শ্রেনীর অনেক ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।
কার্যত আল্লাহর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হেয় করা হয় এমন কোনো শব্দ উচ্চারণ করা অথবা কাজে লিপ্ত হওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য। কোনো মুসলিম যদি তাকে রাসূল হিসেবে পেয়ে অত্যন্ত পরিতৃপ্ত থাকে, তার প্রতি গভীর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নিজেকে তার অনুসারী বলে দাবি করে তাহলে তার উচিত হবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে অন্য যে-কোনো মানুষের চেয়ে ওপরে স্থান দেওয়া ও সম্মান করা। তার প্রতি মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান এবং অন্য সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসা থাকতে হবে। এমনকি নিজের চেয়েও তাকে বেশি ভালোবাসতে হবে। তার বলা প্রতিটি কথাকে বিশ্বাস করে তার আদেশ মেনে চলতে হবে এবং নিষেধসমূহ থেকে দূরে থাকতে হবে। তার সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে। তার আনীত বিধি-বিধানে সন্তুষ্ট থাকতে হবে এবং সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে তার আদর্শ আঁকড়ে ধরতে হবে।
তাই তার নাম বা তার হাদীস নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা যাবে না, বিরূপ আচরণ বা মন্তব্য করা যাবে না। তার সমস্ত অলৌকিক ঘটনার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে তার ও তার পরিবার এবং সাহাবীদের সম্মান রক্ষার চেষ্টা করে যেতে হবে। কারণ, বর্ণিত হয়েছে—
فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ أُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
সুতরাং, যে-সব লোক তার ওপর ঈমান এনেছে, তার সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাকে সাহায্য করেছে এবং সে-নূরের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধু তারাই নিজেদের উদ্দেশ্যে সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।।১। [১]
মহান আল্লাহর এই ঘোষণার কারণে সাহাবীগণ যেভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আগলে রেখেছেন, তার প্রতি যে-মনোভাব পোষণ করেছেন, আমাদেরও ঠিক তা-ই করতে হবে। তারা অত্যন্ত নিচুস্বরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে কথা বলতেন। আর যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে কথা বলতেন তখন তারা এতটাই মনোযোগী হয়ে উঠতেন, দেখলে মনে হতো-তাদের মাথায় কোনো পাখি বসে আছে। নড়াচড়া করলে যদি পাখি উড়ে যায়, এই আশঙ্কায় যেন তারা ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন।
কখনো যদি এমন হতো যে, কোনো ব্যক্তি মসজিদে যাচ্ছে এবং ভেতরে প্রবেশ করার আগেই ভেতর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কণ্ঠে শোনা যায়, 'হে লোকসকল, তোমরা বসে পড়ো' তাহলে তার এই ঘোষণা শোনামাত্রই শ্রবণকারী সেখানেই বসে পড়ত। সাহাবীগণ তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এতটাই সম্মান করতেন। তাদের আপন সন্তানও যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা মানতে অস্বীকৃতি জানাত তাহলে তারা তৎক্ষণাৎ সন্তানের সাথে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানাতেন। এগুলো সাহাবীদের নবীপ্রেমের অসংখ্য ঘটনার মাঝে সামান্য কিছু ঘটনামাত্র।

টিকাঃ
১. সূরা হুজরাত, আয়াত : ২
১. সূরা আরাফ, আয়াত: ৫৭

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
মুমিনগণ, তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচুস্বরে কথা বল, তার সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ইসলামের মূলনীতিগুলোর অন্তর্গত। যে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে, তাকে পুরস্কৃত করা হবে। আর যে বীতশ্রদ্ধ হবে, তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা এবং তাকে সম্মানের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত রেখে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ইসলামের একটি মৌলিক বিষয়। তাই আমাদের সবার উচিত হলো পরিমীতিবোধ বজায় রেখে তাকে ভালোবাসা। এক্ষেত্রে কোনো প্রকার শিথিলতা বা সীমালঙ্ঘন না করা। যেমন, খ্রিস্টানরা তাদের রাসূলকে খোদা বলে দাবি করে। এই অত্যুচ্চ মর্যাদার দাবি করা যেমন সীমালংঘন, তেমনই তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাও চরম শিথিলতা।
আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে-কাজ করেছেন অথবা যে-কথা সে-কাজ বা কথার বিরোধিতা করা কোনো মুসলিমের পক্ষে শোভা পায় না; বরং তার প্রতিটি আদেশ ও নিষেধ আমাদের খুশিমনে মেন চলা একান্ত অপরিহার্য। উপরন্তু মনে রাখতে হবে যে, সাধারণ মানুষের চিন্তা ও বক্তব্যে শুদ্ধাশুদ্ধির আশঙ্কা থাকলেও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে আদৌ এমন কোনো আশঙ্কা নেই। এমন আশঙ্কা মনে স্থান দেওয়াও ঈমানের দুর্বলতার পরিচায়ক।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বলা প্রতিটি কথা সত্য। কারণ, আল্লাহর অশেষ দয়ায় তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি কোনোভাবেই বীতশ্রদ্ধ হওয়া যাবে না এবং তার স্পষ্ট সত্য-ভাষণ নিয়ে কোনোরূপ সন্দেহ করা যাবে না। তার করা কোনো বিচারের রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। আর কোনোভাবেই কোনো রাজা, নেতা, রাষ্ট্রপতি অথবা শাসকের বলা কথার সাথে তার কথার তুলনা করা চলবে না। কারণ, আল্লাহপাক তাকে এসব-শ্রেনীর অনেক ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।
কার্যত আল্লাহর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হেয় করা হয় এমন কোনো শব্দ উচ্চারণ করা অথবা কাজে লিপ্ত হওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য। কোনো মুসলিম যদি তাকে রাসূল হিসেবে পেয়ে অত্যন্ত পরিতৃপ্ত থাকে, তার প্রতি গভীর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নিজেকে তার অনুসারী বলে দাবি করে তাহলে তার উচিত হবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে অন্য যে-কোনো মানুষের চেয়ে ওপরে স্থান দেওয়া ও সম্মান করা। তার প্রতি মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান এবং অন্য সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসা থাকতে হবে। এমনকি নিজের চেয়েও তাকে বেশি ভালোবাসতে হবে। তার বলা প্রতিটি কথাকে বিশ্বাস করে তার আদেশ মেনে চলতে হবে এবং নিষেধসমূহ থেকে দূরে থাকতে হবে। তার সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে। তার আনীত বিধি-বিধানে সন্তুষ্ট থাকতে হবে এবং সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে তার আদর্শ আঁকড়ে ধরতে হবে।
তাই তার নাম বা তার হাদীস নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা যাবে না, বিরূপ আচরণ বা মন্তব্য করা যাবে না। তার সমস্ত অলৌকিক ঘটনার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে তার ও তার পরিবার এবং সাহাবীদের সম্মান রক্ষার চেষ্টা করে যেতে হবে। কারণ, বর্ণিত হয়েছে—
فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ أُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
সুতরাং, যে-সব লোক তার ওপর ঈমান এনেছে, তার সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাকে সাহায্য করেছে এবং সে-নূরের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধু তারাই নিজেদের উদ্দেশ্যে সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।।১। [১]
মহান আল্লাহর এই ঘোষণার কারণে সাহাবীগণ যেভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আগলে রেখেছেন, তার প্রতি যে-মনোভাব পোষণ করেছেন, আমাদেরও ঠিক তা-ই করতে হবে। তারা অত্যন্ত নিচুস্বরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে কথা বলতেন। আর যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে কথা বলতেন তখন তারা এতটাই মনোযোগী হয়ে উঠতেন, দেখলে মনে হতো-তাদের মাথায় কোনো পাখি বসে আছে। নড়াচড়া করলে যদি পাখি উড়ে যায়, এই আশঙ্কায় যেন তারা ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন।
কখনো যদি এমন হতো যে, কোনো ব্যক্তি মসজিদে যাচ্ছে এবং ভেতরে প্রবেশ করার আগেই ভেতর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কণ্ঠে শোনা যায়, 'হে লোকসকল, তোমরা বসে পড়ো' তাহলে তার এই ঘোষণা শোনামাত্রই শ্রবণকারী সেখানেই বসে পড়ত। সাহাবীগণ তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এতটাই সম্মান করতেন। তাদের আপন সন্তানও যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা মানতে অস্বীকৃতি জানাত তাহলে তারা তৎক্ষণাৎ সন্তানের সাথে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানাতেন। এগুলো সাহাবীদের নবীপ্রেমের অসংখ্য ঘটনার মাঝে সামান্য কিছু ঘটনামাত্র।

টিকাঃ
১. সূরা হুজরাত, আয়াত : ২
১. সূরা আরাফ, আয়াত: ৫৭

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 মহান সুসংবাদদাতা

📄 মহান সুসংবাদদাতা


GG
وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ بِأَنَّ لَهُم مِّنَ اللَّهِ فَضْلًا كَبِيرًا
আপনি মুমিনদের সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
GG
يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
মানুষকে সুসংবাদ দাও। বীতস্পৃহ করো না। বিষয়বস্তু সহজ করো। কঠিন করো না। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্রের প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য ছিল- মানুষকে সুসংবাদ প্রদান করা। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا
হে নবী, আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জন্য অসংখ্য সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন। মানবজাতির জন্য বয়ে এনেছেন অজস্র আনন্দবার্তা। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সুসংবাদ ছিল মহান আল্লাহর প্রতি ঈমানের আহ্বান। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারার চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের আগে মানুষ অন্ধকার ও কুফরের যুগে বাস করত। তাদের সকল চিন্তা কেবল এই দুনিয়া ও পার্থিব-জীবন কেন্দ্রিক ছিল। উদ্দেশ্যহীনভাবে তারা মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছিল-এই বিশ্বাসে যে, মৃত্যুই শেষ। মৃত্যুর পর শুধুই শূন্যতা। জান্নাত বা জাহান্নাম বলতে কিছু নেই।
তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পরকালের সুসংবাদ নিয়ে হাজির হন তখন তারা তাদের রবের কৃপায় জান্নাতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তাদের এই স্বপ্ন ছিল আসমান ও যমীনের চেয়েও অধিক প্রশস্ত। তাদের রবের ব্যাপারে সুসংবাদ তো তিনিই এনে দিয়েছেন। আল্লাহর ক্ষমাশীলতা, দয়াপরবশতা এবং উদারতা সম্পর্কে তিনিই তো জানিয়েছেন। মানুষ যত গুনাহই করুক না কেন, আল্লাহর কাছে তওবা করা মাত্রই আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিতে পারেন-এই সংবাদও তো তিনিই আমাদের দিয়েছেন!
প্রকৃতপক্ষে ইসলামের বিশাল একটি অংশজুড়ে রয়েছে মানবসম্প্রদায়ের সুসংবাদের অজস্র বর্ণনা। যে ওযু করে, তার জন্য রয়েছে প্রত্যেকবার ওযুর সাথে গুনাহ মাফের সুসংবাদ। এক ওয়াক্তের সালাত থেকে আরেক ওয়াক্ত, এক রামাদান থেকে আরেক রামাদান, একটি হজ থেকে আরেকটি হজ এবং এক উমরাহ থেকে আরেক উমরাহ পর্যন্ত একজন মুসলিমের জন্য রয়েছে তার সকল গুনাহ মাফের সুসংবাদ। অবশ্য সেসব কবীরা গুনাহ এর আওতামুক্ত, যেগুলো তওবা ছাড়া মাফ হয় না। আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সকল সুসংবাদ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই আমাদের দিয়েছেন।
অন্ধের জন্য তিনি এই সুসংবাদ বয়ে এনেছেন যে, তার এ অবস্থায় ধৈর্যধারণের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাকে জান্নাত দেবেন। সন্তানহারা মা-বাবাকে ধৈর্যধারণের শর্তে জান্নাতে সুবিশাল প্রাসাদের মালিক হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে রোগে-শোকে জর্জরিত, তাদের গুনাহ মাফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যারা দুঃখ-দুর্দশায় আক্রান্ত, তাদের মহাকল্যাণের খোশখবর দিয়েছেন। কারণ, আল্লাহ যে-বান্দার ভালো চান, তাকেই দুঃখ-কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা করেন।
উপরন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যারা এক ওয়াক্তের সালাত শেষ করে পরবর্তী ওয়াক্তের সালাতের জন্য অপেক্ষা করে তাদের জন্য রয়েছে ফেরেশতাদের দুআ-যতক্ষণ তারা নিজেদের পবিত্রতা ধরে রাখে। ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছের সুসংবাদ রয়েছে, যে সারা জীবনে মাত্র একবার 'সুবহানাল্লাহ্' বলেছে। তিনি আরও বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি দিনে একশতবার 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' পড়ে, তবে তার গুনাহ যদি সাগরের ফেনার সমপরিমাণও হয় তাহলেও আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবেন। যে-ব্যক্তি গুনাহ করার পর ওযু করে দুই রাকআত সালাত আদায় করে তার জন্যও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর ক্ষমার সুসংবাদ এনেছেন। যদি কেউ অসুখ-বিসুখ, দুঃখ-দুর্দশা, দুশ্চিন্তা, এমনকি একটি কাঁটার আঘাতও পায়, তাহলে এর বিনিময়েও তার গুনাহ মাফ হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সর্বোপরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি মহাগ্রন্থ নিয়ে আগমন করেছেন, যাতে সৎকর্মশীল মুমিনদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কারের সুসংবাদ; আর অসৎকর্মপরায়ণ মুমিনদের প্রতি হতাশ হওয়ার নিষেধাজ্ঞা। ইরশাদ হচ্ছে-
إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবিশ্বাসী লোকেরাই কেবল আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়। [১]
অন্যত্র ঘোষণা করা হয়েছে
قَالَ وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ
তিনি বললেন, পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্টরা ছাড়া আর কে নিরাশ হয়?[১]
মহান আল্লাহ মানুষকে দুঃখীত হতে নিষেধ করে বলেছেন-
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখও কোরো না। তোমরাই বিজয়ী হবে। যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।[২]
সর্বোপরি গুনাহগারদের জন্য এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বলুন, নিজেদের ওপর যুলুমকারী হে আমার বান্দাগণ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[৩]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে ইসলামের পথে আনার জন্য দূর-দূরান্তে দূত প্রেরণ করতেন। তিনি তাদের বলে দিতেন-
بَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا ، وَيَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا
তোমরা মানুষকে সুসংবাদ দাও। বীতস্পৃহ করো না। তাদের জন্য বিষয়বস্তু সহজ করো। কঠিন করো না।[৪]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের প্রতি রুক্ষ আচরণ করতে বারণ করেছেন। কারণ, রুক্ষতা মানুষের মনে ধর্মের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে। তাই তিনি বলেন-
GG يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ مِنْكُمْ مُنَفِرِينَ فَمَنْ صَلَّى بِالنَّاسِ فَلْيُوجِزُ ، فَإِنَّ فِيهِمُ الضَّعِيفَ وَالْكَبِيرَ وَذَا الْحَاجَةِ
হে লোকসকল, নিঃসন্দেহে তোমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা অন্যদের ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যখন তোমাদের মধ্য হতে কেউ ইমামতি করবে তখন সে যেন সালাত সংক্ষিপ্ত করে। কারণ, মুসল্লিদের মধ্যে দুর্বল, বয়স্ক, ও প্রয়োজন-তাড়িত ব্যক্তিও থাকে।। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই অন্যদের ভালো সংবাদ দিতেন। তিনি আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে আল্লাহর তরফ থেকে পবিত্রতার ঘোষণা শোনান; কাব ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমার সুসংবাদ জানান; জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জানান যে, আল্লাহ তার পিতার সাথে কথা বলেছেন। একবার সাহাবীদের তিনি জায়দ রাযিয়াল্লাহু আনহু, জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও ইবনে রাওয়াহাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে জান্নাতবাসী হবার খবর দেন। বদরের যোদ্ধাদের জন্যও তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে-
اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ
তোমরা যা ইচ্ছে করতে পারো। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। [২]
এছাড়াও যারা হুদায়বিয়া প্রান্তরে বিখ্যাত বাবলা গাছের নিচে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিলেন, তাদের আল্লাহর সন্তুষ্টির খোশখবর দেন। ইসলামী দণ্ডবিধি অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত জনৈক ব্যক্তি যখন তার সাথে সালাত আদায় করেছিল তখন আল্লাহর রাসূল তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্তির সুসংবাদ প্রদান করেন। যে-ব্যক্তি সদা-সর্বক্ষণ সূরা ইখলাস পাঠ করত, তিনি তাকে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের
সুসংবাদ দেন। মোটকথা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবাইকে কেবল সুসংবাদ আর সুসংবাদই দিয়ে গিয়েছেন। এ কারণে আনন্দ প্রকাশের জন্য তাদের বিশেষ কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন পড়ত না।

টিকাঃ
১. সূরা আহযাব, আয়াত: ৪৭
২. সহীহ বুখারী: ৬৯, ৬১২৫; সহীহ মুসলিম: ১৭৩৪, হাদীসটি আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা আহযাব, আয়াত : ৪৫
১. সূরা ইউসুফ, আয়াত : ৮৭
১. সূরা হিজর, আয়াত: ৫৬
২. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৩৯
৩. সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩
৪. প্রাগুক্ত
১. সহীহ বুখারী: ৯০, ৭০২; সহীহ মুসলিম: ৪৬৬, হাদীসটি আবু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ বুখারী: ৩০০৭, ৩৯৮৩; সহীহ মুসলিম: ২৪৯৪, হাদীসটি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

GG
وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ بِأَنَّ لَهُم مِّنَ اللَّهِ فَضْلًا كَبِيرًا
আপনি মুমিনদের সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
GG
يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
মানুষকে সুসংবাদ দাও। বীতস্পৃহ করো না। বিষয়বস্তু সহজ করো। কঠিন করো না। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্রের প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য ছিল- মানুষকে সুসংবাদ প্রদান করা। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا
হে নবী, আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জন্য অসংখ্য সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন। মানবজাতির জন্য বয়ে এনেছেন অজস্র আনন্দবার্তা। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সুসংবাদ ছিল মহান আল্লাহর প্রতি ঈমানের আহ্বান। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারার চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের আগে মানুষ অন্ধকার ও কুফরের যুগে বাস করত। তাদের সকল চিন্তা কেবল এই দুনিয়া ও পার্থিব-জীবন কেন্দ্রিক ছিল। উদ্দেশ্যহীনভাবে তারা মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছিল-এই বিশ্বাসে যে, মৃত্যুই শেষ। মৃত্যুর পর শুধুই শূন্যতা। জান্নাত বা জাহান্নাম বলতে কিছু নেই।
তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পরকালের সুসংবাদ নিয়ে হাজির হন তখন তারা তাদের রবের কৃপায় জান্নাতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তাদের এই স্বপ্ন ছিল আসমান ও যমীনের চেয়েও অধিক প্রশস্ত। তাদের রবের ব্যাপারে সুসংবাদ তো তিনিই এনে দিয়েছেন। আল্লাহর ক্ষমাশীলতা, দয়াপরবশতা এবং উদারতা সম্পর্কে তিনিই তো জানিয়েছেন। মানুষ যত গুনাহই করুক না কেন, আল্লাহর কাছে তওবা করা মাত্রই আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিতে পারেন-এই সংবাদও তো তিনিই আমাদের দিয়েছেন!
প্রকৃতপক্ষে ইসলামের বিশাল একটি অংশজুড়ে রয়েছে মানবসম্প্রদায়ের সুসংবাদের অজস্র বর্ণনা। যে ওযু করে, তার জন্য রয়েছে প্রত্যেকবার ওযুর সাথে গুনাহ মাফের সুসংবাদ। এক ওয়াক্তের সালাত থেকে আরেক ওয়াক্ত, এক রামাদান থেকে আরেক রামাদান, একটি হজ থেকে আরেকটি হজ এবং এক উমরাহ থেকে আরেক উমরাহ পর্যন্ত একজন মুসলিমের জন্য রয়েছে তার সকল গুনাহ মাফের সুসংবাদ। অবশ্য সেসব কবীরা গুনাহ এর আওতামুক্ত, যেগুলো তওবা ছাড়া মাফ হয় না। আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সকল সুসংবাদ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই আমাদের দিয়েছেন।
অন্ধের জন্য তিনি এই সুসংবাদ বয়ে এনেছেন যে, তার এ অবস্থায় ধৈর্যধারণের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাকে জান্নাত দেবেন। সন্তানহারা মা-বাবাকে ধৈর্যধারণের শর্তে জান্নাতে সুবিশাল প্রাসাদের মালিক হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে রোগে-শোকে জর্জরিত, তাদের গুনাহ মাফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যারা দুঃখ-দুর্দশায় আক্রান্ত, তাদের মহাকল্যাণের খোশখবর দিয়েছেন। কারণ, আল্লাহ যে-বান্দার ভালো চান, তাকেই দুঃখ-কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা করেন।
উপরন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যারা এক ওয়াক্তের সালাত শেষ করে পরবর্তী ওয়াক্তের সালাতের জন্য অপেক্ষা করে তাদের জন্য রয়েছে ফেরেশতাদের দুআ-যতক্ষণ তারা নিজেদের পবিত্রতা ধরে রাখে। ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছের সুসংবাদ রয়েছে, যে সারা জীবনে মাত্র একবার 'সুবহানাল্লাহ্' বলেছে। তিনি আরও বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি দিনে একশতবার 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' পড়ে, তবে তার গুনাহ যদি সাগরের ফেনার সমপরিমাণও হয় তাহলেও আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবেন। যে-ব্যক্তি গুনাহ করার পর ওযু করে দুই রাকআত সালাত আদায় করে তার জন্যও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর ক্ষমার সুসংবাদ এনেছেন। যদি কেউ অসুখ-বিসুখ, দুঃখ-দুর্দশা, দুশ্চিন্তা, এমনকি একটি কাঁটার আঘাতও পায়, তাহলে এর বিনিময়েও তার গুনাহ মাফ হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সর্বোপরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি মহাগ্রন্থ নিয়ে আগমন করেছেন, যাতে সৎকর্মশীল মুমিনদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কারের সুসংবাদ; আর অসৎকর্মপরায়ণ মুমিনদের প্রতি হতাশ হওয়ার নিষেধাজ্ঞা। ইরশাদ হচ্ছে-
إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবিশ্বাসী লোকেরাই কেবল আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়। [১]
অন্যত্র ঘোষণা করা হয়েছে
قَالَ وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ
তিনি বললেন, পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্টরা ছাড়া আর কে নিরাশ হয়?[১]
মহান আল্লাহ মানুষকে দুঃখীত হতে নিষেধ করে বলেছেন-
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখও কোরো না। তোমরাই বিজয়ী হবে। যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।[২]
সর্বোপরি গুনাহগারদের জন্য এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বলুন, নিজেদের ওপর যুলুমকারী হে আমার বান্দাগণ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[৩]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে ইসলামের পথে আনার জন্য দূর-দূরান্তে দূত প্রেরণ করতেন। তিনি তাদের বলে দিতেন-
بَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا ، وَيَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا
তোমরা মানুষকে সুসংবাদ দাও। বীতস্পৃহ করো না। তাদের জন্য বিষয়বস্তু সহজ করো। কঠিন করো না।[৪]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের প্রতি রুক্ষ আচরণ করতে বারণ করেছেন। কারণ, রুক্ষতা মানুষের মনে ধর্মের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে। তাই তিনি বলেন-
GG يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ مِنْكُمْ مُنَفِرِينَ فَمَنْ صَلَّى بِالنَّاسِ فَلْيُوجِزُ ، فَإِنَّ فِيهِمُ الضَّعِيفَ وَالْكَبِيرَ وَذَا الْحَاجَةِ
হে লোকসকল, নিঃসন্দেহে তোমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা অন্যদের ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যখন তোমাদের মধ্য হতে কেউ ইমামতি করবে তখন সে যেন সালাত সংক্ষিপ্ত করে। কারণ, মুসল্লিদের মধ্যে দুর্বল, বয়স্ক, ও প্রয়োজন-তাড়িত ব্যক্তিও থাকে।। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই অন্যদের ভালো সংবাদ দিতেন। তিনি আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে আল্লাহর তরফ থেকে পবিত্রতার ঘোষণা শোনান; কাব ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমার সুসংবাদ জানান; জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জানান যে, আল্লাহ তার পিতার সাথে কথা বলেছেন। একবার সাহাবীদের তিনি জায়দ রাযিয়াল্লাহু আনহু, জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও ইবনে রাওয়াহাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে জান্নাতবাসী হবার খবর দেন। বদরের যোদ্ধাদের জন্যও তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে-
اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ
তোমরা যা ইচ্ছে করতে পারো। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। [২]
এছাড়াও যারা হুদায়বিয়া প্রান্তরে বিখ্যাত বাবলা গাছের নিচে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিলেন, তাদের আল্লাহর সন্তুষ্টির খোশখবর দেন। ইসলামী দণ্ডবিধি অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত জনৈক ব্যক্তি যখন তার সাথে সালাত আদায় করেছিল তখন আল্লাহর রাসূল তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্তির সুসংবাদ প্রদান করেন। যে-ব্যক্তি সদা-সর্বক্ষণ সূরা ইখলাস পাঠ করত, তিনি তাকে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের
সুসংবাদ দেন। মোটকথা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবাইকে কেবল সুসংবাদ আর সুসংবাদই দিয়ে গিয়েছেন। এ কারণে আনন্দ প্রকাশের জন্য তাদের বিশেষ কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন পড়ত না।

টিকাঃ
১. সূরা আহযাব, আয়াত: ৪৭
২. সহীহ বুখারী: ৬৯, ৬১২৫; সহীহ মুসলিম: ১৭৩৪, হাদীসটি আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা আহযাব, আয়াত : ৪৫
১. সূরা ইউসুফ, আয়াত : ৮৭
১. সূরা হিজর, আয়াত: ৫৬
২. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৩৯
৩. সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩
৪. প্রাগুক্ত
১. সহীহ বুখারী: ৯০, ৭০২; সহীহ মুসলিম: ৪৬৬, হাদীসটি আবু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ বুখারী: ৩০০৭, ৩৯৮৩; সহীহ মুসলিম: ২৪৯৪, হাদীসটি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 আদর্শ শিক্ষক

📄 আদর্শ শিক্ষক


মহান আল্লাহ বলেন-
وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُن تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
আল্লাহ আপনার প্রতি ঐশীগ্রন্থ ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর করুণা অসীম। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
❝ مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ ❞
যে-ব্যক্তি দ্বীনি ইলম অর্জনের জন্য যাত্রা করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেবেন। [২]
দ্বীনি ইলমের ক্ষেত্রে মুসলিমদের শিক্ষক হিসেবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই যথেষ্ট। তিনি ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে শুরু করে ইবাদাতের মৌলিক
পদ্ধতি, পানাহারের আদব; এমনকি পেশাপ-পায়খানার নিয়ম-নীতি পর্যন্ত শিক্ষা দিয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাধারণ বিষয়ে বয়ান করতেন তখন ভয়ে ও আবেগে শ্রোতাদের হৃদয় বিগলিত হতো। আর যখন অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে বয়ান করতেন তখন সুর ক্রমশ উঁচু হতে থাকত, চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করত, চেহারায় প্রচণ্ড ক্রোধের লক্ষণ ফুটে উঠত। মনে হতো, যেন আসন্ন কোনো শত্রুদলের ব্যাপারে তিনি সবাইকে সাবধান করছেন। তার কণ্ঠের গভীরতা এবং পরকালের ভয়াবহতার কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই কেঁদে ফেলতেন কিংবা অন্তত তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে অনুতপ্ত হতেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ নিঃসৃত কথাগুলো ছিল প্রজ্ঞাপূর্ণ—যা সব সময় সঠিক পথের নির্দেশনা দিত এবং সাহাবীদের ঈমান-বৃদ্ধিতে কাজে আসত। কেউ তার কাছে কোনো ব্যাপারে ফতোয়া জানতে চাইলে তিনি সাথে সাথে সেই ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ করে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করতেন। কেউ তার কাছে কোনো উপদেশ চাইলে তিনি এমন উত্তর দিতেন—যাতে করে প্রশ্নকর্তার মন সততা, বিশ্বাস এবং ভক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। যখন তিনি কোনো উপদেশমূলক গল্প বলতেন, তখন তিনি এমন উদাহরণই পেশ করতেন—যা সাহাবীদের জন্য স্পষ্ট ও বোধগম্য। যখন তিনি পূর্ববর্তী জাতিদের নিয়ে কথা বলতেন, সাহাবীগণ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তা শুনতেন এবং শিক্ষা গ্রহণ করতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়ান যেন তাদের হৃদয় বন্দী করে ফেলত। ফলে তারা সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতেন। তবে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল উদ্দিষ্ট কাজটি নিজে করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। তার করা সব কিছু ছিল পবিত্র ও মহৎ। আর যা করেননি এবং অন্যকেও করার অনুমতি দেননি, তা ছিল অপবিত্র ও ক্ষতিকর। ইসলামের প্রতিটি অংশই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুসরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাজেই যুগ যুগ ধরে নিষ্ঠাবান মুসলিমগণ তার সুন্নাহ অনুসরণ করে আসছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর নাযিল হওয়া মহাসত্যের প্রথম শব্দই ছিল 'পড়ো'। শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এরচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী উদাহরণ আর হতে পারে না। আল্লাহ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এই দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন—
رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا
উচ্চারণ- ‘রব্বি যিদনী ইলমা।’ অর্থাৎ ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দেন’।[১]
আল্লাহপাক চাইলেই অন্য অনেক কিছুই চাওয়ার আদেশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে; বরং জ্ঞান বৃদ্ধির দুআ করার আদেশ করেছেন। কারণ, একমাত্র জ্ঞানই মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে। জ্ঞান হলো একটি দরজা- যার অন্যপাশে রয়েছে সুখ, সমৃদ্ধি এবং সাফল্যের ঐশ্বর্য। ভালো কথা এবং সৎ কাজ করতে বলারও আগে আল্লাহ জ্ঞান অর্জন করতে বলেছেন। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

إِنَّ مَثَلَ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ مِنَ الْهُدَى وَالْعِلْمِ كَمَثَلَ غَيْثٍ
মহান আল্লাহ আমাকে যে-জ্ঞান ও পথ-নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত হলো বর্ষণমুখর মেঘ। [৩]
বস্তুত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেওয়া আল্লাহর বিশেষ একটি রহমত হলো জ্ঞান। আর সেই জ্ঞান প্রচার করা ছিল তার ওপর বর্তানো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ
তিনি তাদের কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন।১ [১]
উল্লেখ্য যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পালন করেছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সেইসব ফকীহ, তাফসীরকারক, ধর্ম প্রচারক, হাদীসবেত্তা ও বিজ্ঞ আলিমের মাধ্যমে, যারা তার জীবদ্দশায় তাঁরই অধীনে থেকে জ্ঞানলাভ করেছেন। এই আলোর মশালবাহীরাই পরবর্তী সময়ে পৃথিবীকে করেছেন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত, ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বার্তা এবং তুলে নিয়েছেন তার রেখে যাওয়া দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রচারিত বার্তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব সাহাবীদের দিয়ে গেছেন। ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিদায় হজের বিখ্যাত ভাষণে তিনি বলেছেন-
GG فَلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الغَابِبَ، فَإِنَّه رُبَّ مُبَلِّغ يُبَلِّغُهُ لِمَن هو أَوْعَى له
উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে আমার এই পয়গাম পৌঁছে দেয়। কারণ, হতে পারে পরবর্তী কোনো শ্রোতা উপস্থিত ব্যক্তির চেয়েও বেশি যোগ্য। [২]
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
GG نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأَ سَمِعَ مِنَّا حَدِيثًا فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ غَيْرَهُ، فَرُبَّ حَامِلٍ فِقْهِ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ
আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে প্রাণবন্ত রাখুন, যে আমার কথা শুনে মুখস্থ করে অতঃপর অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়। কারণ, অনেক শ্রোতা বার্তাবাহক অপেক্ষাও অধিক জ্ঞানী হয়ে থাকে। [৩]
আরেক হাদীসে আছে-
GG بَلِّغُوا عَني ولو آيةٌ
আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও অন্যের কাছে পৌঁছে দাও। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পুরোটা জীবন কেটেছে উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার পেছনে। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে সালাত আদায় করতে হয়, রোযা রাখতে হয়, যাকাত দিতে হয়, হজ করতে হয়। আল্লাহকে স্মরণ করা, তার দরবারে প্রার্থনা করা এবং পানাহার করাসহ যাবতীয় আদব-কায়দা তো তার হাত ধরেই শেখা। আর এই সব কিছু একদিনে হয়ে যায়নি। বছরের পর বছর ধরে অল্প অল্প করে অথচ পর্যায়ক্রমে তিনি সব কিছু শিখিয়ে গেছেন। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
وَقُرْءَانًا فَرَقْنَهُ لِتَقْرَأَهُ وَ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثٍ
আমি কুরআনকে অবতীর্ণ করেছি পৃথকভাবে পাঠের উপযোগী করে, যাতে আপনি তা লোকদের কাছে ধীরে ধীরে পাঠ করেতে পারেন। আর আমি তা অবতীর্ণ করেছি পর্যায়ক্রমে। [২]
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةٌ وَاحِدَةً كَذَلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا
সত্য প্রত্যাখানকারীরা বলে, তার প্রতি সমগ্র কুরআন একদফায় কেন অবতীর্ণ করা হলো না? আমি এমনিভাবে একে অবতীর্ণ করেছি এবং ক্রমে ক্রমে আবৃত্তি করেছি আপনার অন্তকরণকে মজবুত করার জন্য। [৩]
সাহাবীদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি নীতি ও অভ্যাস এই ছিল যে, তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে শিক্ষা দিতেন। প্রয়োজনভেদে একটি কথা একবার, দুইবার বা তিনবারও বলতেন। তিনি বারবার পুনরাবৃত্তি করতেন-যাতে সাহাবীগণ মূল বিষয়টি খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।
ইবাদাতের নতুন কোনো পন্থা শেখানোর আগে তিনি নিজে তা করে দেখাতেন। এভাবেই সাহাবীগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখে দেখে নির্ভুলভাবে শেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
** صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي
তোমরা সেভাবেই সালাত আদায় করো, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখছ। [১]
আরও বলেছেন-
** خُذُوا عَنِّي مَنَاسِكَكُمْ
তোমরা আমার কাছ থেকে হজের বিধি-বিধান শিখে নাও। [২]
অন্যভাবে বললে, 'আমি যা বলি তা শোনো, যা করি তা খেয়াল করো এবং ঠিক তা-ই নিজেরা পালন করো।'
ইয়া আল্লাহ, আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর, তার পরিবারবর্গের ওপর, সম্মানিত সাহাবীগণের ওপর এবং যারা তাদের রাসূলকে ভালোবেসে তার দেখানো পথ অনুসরণ করে তাদের সবার ওপর শেষ দিন পর্যন্ত রহমতের বারিধারা বর্ষণ করতে থাকুন।

টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত: ১১৩
২. সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা ত-হা, আয়াত: ১১৪
২. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯
৩. সহীহ বুখারী: ৭৯; সহীহ মুসলিম: ২২৮২, হাদীসটি আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৯
২. সহীহ বুখারী: ১৭৪১, ৭০৭৮; সহীহ মুসলিম: ১৬৭৯, হাদীসটি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
৩. জামি তিরমিযী: ২৬৫৮; ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; কাশফ আল খফা
: ২/৪২৩
১. সহীহ বুখারী: ৩৪৬১; হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ১০৬
৩. সূরা ফুরকান, আয়াত: ৩২
১. সহীহ বুখারী: ৬৩১; হাদীসটি মালিক ইবনুল হুওয়ায়রিস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ মুসলিম: ১২৯৭; হাদীসটি জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

মহান আল্লাহ বলেন-
وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُن تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
আল্লাহ আপনার প্রতি ঐশীগ্রন্থ ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর করুণা অসীম। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
❝ مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ ❞
যে-ব্যক্তি দ্বীনি ইলম অর্জনের জন্য যাত্রা করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেবেন। [২]
দ্বীনি ইলমের ক্ষেত্রে মুসলিমদের শিক্ষক হিসেবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই যথেষ্ট। তিনি ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে শুরু করে ইবাদাতের মৌলিক
পদ্ধতি, পানাহারের আদব; এমনকি পেশাপ-পায়খানার নিয়ম-নীতি পর্যন্ত শিক্ষা দিয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাধারণ বিষয়ে বয়ান করতেন তখন ভয়ে ও আবেগে শ্রোতাদের হৃদয় বিগলিত হতো। আর যখন অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে বয়ান করতেন তখন সুর ক্রমশ উঁচু হতে থাকত, চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করত, চেহারায় প্রচণ্ড ক্রোধের লক্ষণ ফুটে উঠত। মনে হতো, যেন আসন্ন কোনো শত্রুদলের ব্যাপারে তিনি সবাইকে সাবধান করছেন। তার কণ্ঠের গভীরতা এবং পরকালের ভয়াবহতার কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই কেঁদে ফেলতেন কিংবা অন্তত তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে অনুতপ্ত হতেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ নিঃসৃত কথাগুলো ছিল প্রজ্ঞাপূর্ণ—যা সব সময় সঠিক পথের নির্দেশনা দিত এবং সাহাবীদের ঈমান-বৃদ্ধিতে কাজে আসত। কেউ তার কাছে কোনো ব্যাপারে ফতোয়া জানতে চাইলে তিনি সাথে সাথে সেই ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ করে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করতেন। কেউ তার কাছে কোনো উপদেশ চাইলে তিনি এমন উত্তর দিতেন—যাতে করে প্রশ্নকর্তার মন সততা, বিশ্বাস এবং ভক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। যখন তিনি কোনো উপদেশমূলক গল্প বলতেন, তখন তিনি এমন উদাহরণই পেশ করতেন—যা সাহাবীদের জন্য স্পষ্ট ও বোধগম্য। যখন তিনি পূর্ববর্তী জাতিদের নিয়ে কথা বলতেন, সাহাবীগণ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তা শুনতেন এবং শিক্ষা গ্রহণ করতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়ান যেন তাদের হৃদয় বন্দী করে ফেলত। ফলে তারা সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতেন। তবে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল উদ্দিষ্ট কাজটি নিজে করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। তার করা সব কিছু ছিল পবিত্র ও মহৎ। আর যা করেননি এবং অন্যকেও করার অনুমতি দেননি, তা ছিল অপবিত্র ও ক্ষতিকর। ইসলামের প্রতিটি অংশই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুসরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাজেই যুগ যুগ ধরে নিষ্ঠাবান মুসলিমগণ তার সুন্নাহ অনুসরণ করে আসছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর নাযিল হওয়া মহাসত্যের প্রথম শব্দই ছিল 'পড়ো'। শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এরচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী উদাহরণ আর হতে পারে না। আল্লাহ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এই দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন—
رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا
উচ্চারণ- ‘রব্বি যিদনী ইলমা।’ অর্থাৎ ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দেন’।[১]
আল্লাহপাক চাইলেই অন্য অনেক কিছুই চাওয়ার আদেশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে; বরং জ্ঞান বৃদ্ধির দুআ করার আদেশ করেছেন। কারণ, একমাত্র জ্ঞানই মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে। জ্ঞান হলো একটি দরজা- যার অন্যপাশে রয়েছে সুখ, সমৃদ্ধি এবং সাফল্যের ঐশ্বর্য। ভালো কথা এবং সৎ কাজ করতে বলারও আগে আল্লাহ জ্ঞান অর্জন করতে বলেছেন। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

إِنَّ مَثَلَ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ مِنَ الْهُدَى وَالْعِلْمِ كَمَثَلَ غَيْثٍ
মহান আল্লাহ আমাকে যে-জ্ঞান ও পথ-নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত হলো বর্ষণমুখর মেঘ। [৩]
বস্তুত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেওয়া আল্লাহর বিশেষ একটি রহমত হলো জ্ঞান। আর সেই জ্ঞান প্রচার করা ছিল তার ওপর বর্তানো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ
তিনি তাদের কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন।১ [১]
উল্লেখ্য যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পালন করেছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সেইসব ফকীহ, তাফসীরকারক, ধর্ম প্রচারক, হাদীসবেত্তা ও বিজ্ঞ আলিমের মাধ্যমে, যারা তার জীবদ্দশায় তাঁরই অধীনে থেকে জ্ঞানলাভ করেছেন। এই আলোর মশালবাহীরাই পরবর্তী সময়ে পৃথিবীকে করেছেন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত, ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বার্তা এবং তুলে নিয়েছেন তার রেখে যাওয়া দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রচারিত বার্তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব সাহাবীদের দিয়ে গেছেন। ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিদায় হজের বিখ্যাত ভাষণে তিনি বলেছেন-
GG فَلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الغَابِبَ، فَإِنَّه رُبَّ مُبَلِّغ يُبَلِّغُهُ لِمَن هو أَوْعَى له
উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে আমার এই পয়গাম পৌঁছে দেয়। কারণ, হতে পারে পরবর্তী কোনো শ্রোতা উপস্থিত ব্যক্তির চেয়েও বেশি যোগ্য। [২]
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
GG نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأَ سَمِعَ مِنَّا حَدِيثًا فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ غَيْرَهُ، فَرُبَّ حَامِلٍ فِقْهِ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ
আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে প্রাণবন্ত রাখুন, যে আমার কথা শুনে মুখস্থ করে অতঃপর অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়। কারণ, অনেক শ্রোতা বার্তাবাহক অপেক্ষাও অধিক জ্ঞানী হয়ে থাকে। [৩]
আরেক হাদীসে আছে-
GG بَلِّغُوا عَني ولو آيةٌ
আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও অন্যের কাছে পৌঁছে দাও। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পুরোটা জীবন কেটেছে উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার পেছনে। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে সালাত আদায় করতে হয়, রোযা রাখতে হয়, যাকাত দিতে হয়, হজ করতে হয়। আল্লাহকে স্মরণ করা, তার দরবারে প্রার্থনা করা এবং পানাহার করাসহ যাবতীয় আদব-কায়দা তো তার হাত ধরেই শেখা। আর এই সব কিছু একদিনে হয়ে যায়নি। বছরের পর বছর ধরে অল্প অল্প করে অথচ পর্যায়ক্রমে তিনি সব কিছু শিখিয়ে গেছেন। কুরআনে কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে-
وَقُرْءَانًا فَرَقْنَهُ لِتَقْرَأَهُ وَ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثٍ
আমি কুরআনকে অবতীর্ণ করেছি পৃথকভাবে পাঠের উপযোগী করে, যাতে আপনি তা লোকদের কাছে ধীরে ধীরে পাঠ করেতে পারেন। আর আমি তা অবতীর্ণ করেছি পর্যায়ক্রমে। [২]
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةٌ وَاحِدَةً كَذَلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا
সত্য প্রত্যাখানকারীরা বলে, তার প্রতি সমগ্র কুরআন একদফায় কেন অবতীর্ণ করা হলো না? আমি এমনিভাবে একে অবতীর্ণ করেছি এবং ক্রমে ক্রমে আবৃত্তি করেছি আপনার অন্তকরণকে মজবুত করার জন্য। [৩]
সাহাবীদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি নীতি ও অভ্যাস এই ছিল যে, তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে শিক্ষা দিতেন। প্রয়োজনভেদে একটি কথা একবার, দুইবার বা তিনবারও বলতেন। তিনি বারবার পুনরাবৃত্তি করতেন-যাতে সাহাবীগণ মূল বিষয়টি খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।
ইবাদাতের নতুন কোনো পন্থা শেখানোর আগে তিনি নিজে তা করে দেখাতেন। এভাবেই সাহাবীগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখে দেখে নির্ভুলভাবে শেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
** صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي
তোমরা সেভাবেই সালাত আদায় করো, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখছ। [১]
আরও বলেছেন-
** خُذُوا عَنِّي مَنَاسِكَكُمْ
তোমরা আমার কাছ থেকে হজের বিধি-বিধান শিখে নাও। [২]
অন্যভাবে বললে, 'আমি যা বলি তা শোনো, যা করি তা খেয়াল করো এবং ঠিক তা-ই নিজেরা পালন করো।'
ইয়া আল্লাহ, আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর, তার পরিবারবর্গের ওপর, সম্মানিত সাহাবীগণের ওপর এবং যারা তাদের রাসূলকে ভালোবেসে তার দেখানো পথ অনুসরণ করে তাদের সবার ওপর শেষ দিন পর্যন্ত রহমতের বারিধারা বর্ষণ করতে থাকুন।

টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত: ১১৩
২. সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা ত-হা, আয়াত: ১১৪
২. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯
৩. সহীহ বুখারী: ৭৯; সহীহ মুসলিম: ২২৮২, হাদীসটি আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৯
২. সহীহ বুখারী: ১৭৪১, ৭০৭৮; সহীহ মুসলিম: ১৬৭৯, হাদীসটি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
৩. জামি তিরমিযী: ২৬৫৮; ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; কাশফ আল খফা
: ২/৪২৩
১. সহীহ বুখারী: ৩৪৬১; হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ১০৬
৩. সূরা ফুরকান, আয়াত: ৩২
১. সহীহ বুখারী: ৬৩১; হাদীসটি মালিক ইবনুল হুওয়ায়রিস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ মুসলিম: ১২৯৭; হাদীসটি জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 লেখক-পরিচিতি

📄 লেখক-পরিচিতি


আয়িয ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি আল-কারনী। আরববিশ্বের প্রখ্যাত আলিম, বিশ্ববরেণ্য ও পাঠকনন্দিত একজন তারকা লেখক। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে যিনি ড. আয়িয আল-কারনী-নামেই সমধিক পরিচিত। ১৩৭৯ হিজরীতে সৌদি আরবের দক্ষিণ অঞ্চলের মাজদূ আল-কারনী গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
লেখাপড়া করেছেন রিয়াদের 'ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়'-এ। হিজরী ১৪০৩-১৪০৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি এখান থেকেই 'উসুল আদ-দ্বীন'-এর ওপর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৪০৮ হিজরীতে তিনি 'উচ্চতর হাদীসশাস্ত্র'-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এসময়ে তাঁর রচিত গবেষণামূলক প্রবন্ধের নাম ছিল 'ধর্মে নতুন উদ্ভাবন; হাদীসের বর্ণনা ও শিক্ষায় এর প্রভাব'। এরপর ১৪২২ হিজরীতে তিনি লাভ করেন পিএইচডি ডিগ্রি। তার অভিসন্দর্ভটি ছিল ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ-এর আল মুফহিম আলা সাহীহিল মুসলিম গ্রন্থের ওপর একটি বিশ্লেষণাত্মক পাঠের ওপর ভিত্তি করে।
লেখায় ও বলায় ড. আয়িয আল-কারনী ছিলেন সমান পারদর্শী; যে-কারণে বিভিন্ন অডিও সিডি-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে তার ৮০০-এরও বেশি অডিও টেপ প্রকাশিত হয়েছে। যেগুলোতে সংরক্ষিত আছে তার অসংখ্য বক্তৃতা, খুতবা, বয়ান, কবিতা আবৃত্তি প্রভৃতি; কিন্তু এরপরও রচনায় তিনি যে বৈভিক বৈচিত্র্যের অবতারণা করেছেন-তা আমাদেরকে বারবার আপ্লুত করে। মুগ্ধ করে। 'বিশেষ কিছু' পাওয়ার স্বাদ ও তৃপ্তিতে আশ্বস্ত করে।
ড. আয়িয আল-কারনী বিস্ময়কর ধী-শক্তির অধিকারী একজন আলিম। কুরআন হিফযের পাশাপাশি তিনি বুলুগুল মারাম গ্রন্থটিও মুখস্ত করেছেন। এছাড়াও তিনি মুখস্থ বলতে পারেন প্রায় ৫০০০ হাদীস। আর কবিতার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১০০০০ ছাড়িয়ে যাবে। মহামহিম আল্লাহ তাআলা তার হায়াতে বরকত দান করুন।

আয়িয ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি আল-কারনী। আরববিশ্বের প্রখ্যাত আলিম, বিশ্ববরেণ্য ও পাঠকনন্দিত একজন তারকা লেখক। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে যিনি ড. আয়িয আল-কারনী-নামেই সমধিক পরিচিত। ১৩৭৯ হিজরীতে সৌদি আরবের দক্ষিণ অঞ্চলের মাজদূ আল-কারনী গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
লেখাপড়া করেছেন রিয়াদের 'ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়'-এ। হিজরী ১৪০৩-১৪০৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি এখান থেকেই 'উসুল আদ-দ্বীন'-এর ওপর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৪০৮ হিজরীতে তিনি 'উচ্চতর হাদীসশাস্ত্র'-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এসময়ে তাঁর রচিত গবেষণামূলক প্রবন্ধের নাম ছিল 'ধর্মে নতুন উদ্ভাবন; হাদীসের বর্ণনা ও শিক্ষায় এর প্রভাব'। এরপর ১৪২২ হিজরীতে তিনি লাভ করেন পিএইচডি ডিগ্রি। তার অভিসন্দর্ভটি ছিল ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ-এর আল মুফহিম আলা সাহীহিল মুসলিম গ্রন্থের ওপর একটি বিশ্লেষণাত্মক পাঠের ওপর ভিত্তি করে।
লেখায় ও বলায় ড. আয়িয আল-কারনী ছিলেন সমান পারদর্শী; যে-কারণে বিভিন্ন অডিও সিডি-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে তার ৮০০-এরও বেশি অডিও টেপ প্রকাশিত হয়েছে। যেগুলোতে সংরক্ষিত আছে তার অসংখ্য বক্তৃতা, খুতবা, বয়ান, কবিতা আবৃত্তি প্রভৃতি; কিন্তু এরপরও রচনায় তিনি যে বৈভিক বৈচিত্র্যের অবতারণা করেছেন-তা আমাদেরকে বারবার আপ্লুত করে। মুগ্ধ করে। 'বিশেষ কিছু' পাওয়ার স্বাদ ও তৃপ্তিতে আশ্বস্ত করে।
ড. আয়িয আল-কারনী বিস্ময়কর ধী-শক্তির অধিকারী একজন আলিম। কুরআন হিফযের পাশাপাশি তিনি বুলুগুল মারাম গ্রন্থটিও মুখস্ত করেছেন। এছাড়াও তিনি মুখস্থ বলতে পারেন প্রায় ৫০০০ হাদীস। আর কবিতার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১০০০০ ছাড়িয়ে যাবে। মহামহিম আল্লাহ তাআলা তার হায়াতে বরকত দান করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00