📄 সমাধান প্রদান
আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বলেন-
يَسْتَفْتُونَكَ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ
তারা আপনার কাছে জানতে চায়। আপনি বলুন, আল্লাহ তোমাদের জানান দিচ্ছেন। [১]
যে-কোনো জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি চাইলেই ফতোয়া জারি করতে পারে না। মুফতী বা বিচারক হতে গেলে কিছু বিশেষ দক্ষতা ও গুণাবলির প্রয়োজন হয়। জ্ঞান সেগুলোর একটি গুণ মাত্র, একমাত্র গুণ নয়। মুফতী ও বিচারককে অবশ্যই বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও তীক্ষ্ণ ধীসমৃদ্ধ হতে হবে। প্রত্যেক অবস্থার প্রেক্ষিতে আলাদা আলাদা ব্যবস্থাগ্রহণের প্রস্তুতি থাকতে হবে। প্রশ্নকর্তার বক্তব্য অনুধাবন করতে হবে। এ ব্যাপারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আল্লাহ তাআলা তাঁর স্বীয় রহমত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্য এবং অন্যান্য সুন্দর ও প্রয়োজনীয় গুণাবলি দ্বারা তাঁকে করেছিলেন সুসজ্জিত। যখন বিভিন্ন মানুষ তাঁর কাছে একই রকম অনুরোধ বা প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতো, তিনি সবার জন্য একই কথার পুনরাবৃত্তি করতেন না; বরং এমনভাবে উত্তর দিতেন-যা প্রশ্নকর্তার ইহকাল ও পরকাল-উভয় ক্ষেত্রেই উপকারে আসে।
যখনই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কেউ কোনো প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতো তিনি তার প্রেক্ষিতে এমন সব উত্তর দিতেন, যেন প্রশ্নকারীর চিন্তাধারা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আদ্যপান্ত সব তিনি মুখস্থ করে এসেছেন। এটা সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক তার ওপর বর্ষিত রহমত ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রশ্নকারীর জবাব তিনি এমনভাবে দিতেন যে, দুরূহ সমস্যারও সমধান হয়ে যেত। প্রশ্নকারী অমুসলিম হলে মুসলিম হওয়ার প্রেরণা লাভ করত। মোটকথা, তিনি এমন উপদেশই দিতেন, যাতে প্রশ্নকর্তা সকল সমস্যার সমাধান খুঁজে পেত।
একবার এক দুর্বল বৃদ্ধলোক নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হয়ে কিছু উপদেশ চাইলেন। তার বয়স ও দুর্বলতার কারণে তিনি বেশিক্ষণ সালাত পড়তে পারেন না। সিয়াম রাখতে পারেন না। অন্যান্য ইবাদাত-ও তেমন করতে পারেন না। হজ তো ছিল তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। তাই তিনি এমন ইবাদাতের সন্ধান করছিলেন, যাতে সামান্য পরিশ্রমে অসামান্য পুরস্কার পাওয়া যায়।
প্রশ্ন করার সময় এতকিছু তিনি উল্লেখ না করলেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঠিকই তার অবস্থা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি অতি সংক্ষেপে বললেন, 'আল্লাহর যিকিরে আপনার জিহ্বা যেন সব সময় আর্দ্র থাকে।'[১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে লোকটিকে এমন কিছু করতে দেননি, যাতে তার হাত-পায়ের ব্যবহার করতে হয় বা ভারী কিছু উঠাতে হয় কিংবা অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়; বরং যা তিনি করতে বললেন, তার জন্য সর্বোচ্চ জিহ্বা সঞ্চালন করতে হবে। কাজটি যেমন সহজ, তেমনই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বলার ভাব ও ভাষাও সহজ। তাই অতি সহজেই এটা মনে রাখা সম্ভব। এই একই প্রশ্ন যদি অন্য কাউকে করা হতো, তাহলে হয়তো সে এই বৃদ্ধ লোকটিকে এমন এমন কাজ করতে বলত-যা তার এই রুগ্ন শরীরে পালন করা একদমই সম্ভব হতো না।
এটা ছিল বৃদ্ধ লোকের প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপদেশ। এখন তাহলে শক্ত-সমর্থ্য যুবকদের প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপদেশ সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক। একদা গাইলান আস-সাকাফী রাযিয়াল্লাহু
আনহু নামের এক সুপুরুষ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আল্লাহর নিকটবর্তী হবার উপায় জানতে চান। নবীজি বৃদ্ধকে দেওয়া উপদেশের মতো এবারও সংক্ষিপ্ত, অথচ অর্থপূর্ণ ও সহজেই মনে রাখার মতো দেন; কিন্তু এই উপদেশটি আগেরবারের মতো অতটা সহজ ছিল না। পেশীবহুল গাইলান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি বলেন, 'আল্লাহর পথে জিহাদ করো।' তাই শক্তি ও সামর্থ্যের কথা চিন্তা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিম সৈন্যশিবিরে তার নাম লেখান। আর ইসলামের শত্রুদের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
আরেকবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু উপদেশ চেয়েছিলেন। তাকেও কি তিনি আল্লাহর পথে জিহাদ করতে কিংবা আল্লাহর যিকিরে জিহ্বা সর্বদা আর্দ্র রাখতে বলেছিলেন? নাহ, দুটোই আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় কাজ, তবে প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন শুনেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পেরেছিলেন যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে তিনি জানতে চাচ্ছেন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন- 'রাগান্বিত হয়ো না।' [১] এই ভিন্নধর্মী উপদেশের কারণ এই ছিল যে, আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রকৃতিগতভাবেই রাগী স্বভাবের ছিলেন। কাজেই ঠিক এরকম একটি উপদেশই আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রয়োজন ছিল। কারণ, এ উপদেশ ঠিকমতো পালন করতে পারলে তার এবং আশেপাশের সবার জীবনেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তাছাড়া সরল অথচ গভীর এই উপদেশটি যে শুধু আবু যরেরই উপকার করে থেমে গেছে-তা কিন্তু নয়; বরং আরও অনেকেরই তা কাজে এসেছে এবং এটা ইসলামের মৌলিক একটি নীতিতে পরিণত হয়েছে।
একবার আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পর্বতে আরোহণ করতে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'বলো-উচ্চারণ-লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ-আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো মৌলিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নেই'। কারণ, এই কথাটি জান্নাতের অমূল্য সম্পদ।'।খ [২]
এখন কথা হলো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে কেন এই উপদেশ দিলেন? কারণ, তিনি এমন একটি কাজ করছিলেন-যাতে প্রচন্ড শক্তি ও প্রচেষ্টার প্রয়োজন-যা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়। তাছাড়া নিজের কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে যে বিনম্রভাবে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে, আল্লাহর সাহায্য তাকে সঙ্গ দেয়। অধিকন্তু আল্লাহই সর্বশক্তিমান। একমাত্র সাহায্যকারী।
আল্লাহর বিশেষ রহমতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের দক্ষতা ও সামর্থ্য বুঝতে পারার এক আশ্চর্য ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। যে-মানুষটা যে-কাজের যোগ্য, তিনি তাকে সেই কাজটিই দিতেন। উদাহরণস্বরূপ, হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু-র কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি একজন ভালো মানের কবি ছিলেন। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইসলামের স্তুতি গেয়ে কবিতা লিখতে উৎসাহিত করেন। তিনি যাতে সিদ্ধ নন, তার ভার তাকে দেওয়া হয়নি। তাকে বলা হয়নি যে, লোকেদের বিবাদ মিটিয়ে দাও। বিচার করা তার বিশেষত্ব নয়-দেখে তাকে সেই দায়িত্বও দেওয়া হয়নি।
যে-সাহাবী অন্যদের থেকে বিচক্ষণ, তাকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিচারকার্যে নিয়োগ দিতেন। যিনি শারীরিকভাবে সবল তাকে তিনি সেনাশিবিরে যোগদান করতে বলতেন। যার ভেতর নেতৃত্ব প্রদানের গুণ ছিল তাকে তিনি প্রাদেশিক শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করতেন। আবার যে-সাহাবীর আচার-ব্যবহার ভালো, তাকে তিনি ইসলামী শিক্ষাদানে উৎসাহিত করতেন। যেমন, মুসআব ইবনু উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে মদিনাবাসীর ইসলামী জ্ঞান শেখানোর আদেশ করেছিলেন।
এভাবে যোগ্যতা বুঝে তিনি সবাইকে কাজে লাগাতেন। অধিকন্তু তাদের স্বভাববিরুদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকার জন্য সাবধানও করে দিতেন। যেমন আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেক বিষয়েই পারদর্শী হলেও নেতৃত্ব প্রদানের জন্য সঠিক ব্যক্তি ছিলেন না। হয়তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, তার ভেতর সহিমুতা ও অন্যান্য নেতাসুলভ আচরণের ঘাটতি রয়েছে। তাই আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে তিনি নেতৃত্বগ্রহণে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। তিনি আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে অনেক খেয়াল রাখতেন। তাই এমন কোনো দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করতে চাননি, যা তিনি বহন করতে অপারগ। কেননা, পুনরুত্থান দিবসে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার হিসেবও দিতে হতে পারে।
ইসলামে নেতৃত্ব বিশেষ কোনো সুবিধা বা অধিকার নয়; বরং বিরাট দায়িত্বকে নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার শামিল—যার হিসেব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। এ থেকেই বোঝা যায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতটা সুবিবেচনার সাথে সাহাবীদের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করেছিলেন এবং এটাই হওয়ার ছিল। কারণ, তার সম্পর্কে কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে—
إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
কুরআন ওহী—যা তাকে প্রত্যাদেশ করা হয়। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ইয়েমেনে প্রেরণ করার সময় জানিয়ে দেন—
❝
إِنَّكَ تَأْتِي قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
তুমি এমন জাতির কাছে যাচ্ছ—যারা আহলে কিতাব—তথা ইহুদী ও নাসারা। [২]
তাকে এ কথা বলার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, যাতে তিনি বুঝতে পারেন তাকে কাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে এবং কোন উপায়ে তাদের উপদেশ দিলে তারা তা গ্রহণ করতে পারে এবং হেদায়েত পেতে পারে।
একবার গাধার পিঠে সওয়ার অবস্থায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বান্দার প্রতি আল্লাহর হক এবং আল্লাহর প্রতি বান্দার হকের ব্যাপারে বোঝাচ্ছিলেন। সব কিছু তিনি সবিস্তারে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। কারণ, মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু শুধু একজন জ্ঞানী ব্যক্তিই নন; বরং তাকে দাওয়াতের কাজে অন্যদের নিকট প্রেরণ করা হচ্ছিল। তিনি একই সাথে একজন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং একজন বিচারক ছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি গাধার পিঠে অন্য কারও সাথে থাকতেন, যেমন ধরা যাক কোনো বেদুঈনের সাথে যাত্রা করতেন, তবে তাকে এত বিস্তারিত উপদেশ দেওয়া কোনো ফল বয়ে আনত না। অবশ্যই তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই ব্যক্তির উপযোগী কোনো উপদেশই প্রদান করতেন।
একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে হুসাইন ইবনে উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গমন করেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কয়জন দেবতার পূজা করো?।' হুসাইন জবাব দেন, 'আমি সাতজনের পূজা করি। একজন আকাশে থাকে। আর ছয়জন যমীনে থাকে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরপর জিজ্ঞাসা করেন, 'এদের মধ্য থেকে কার ব্যাপারে তুমি আশা ও ভয় পোষণ করো?।' উত্তরে তিনি বলেন, 'যে আসমানে থাকে, তার ব্যাপারে।' একথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তাহলে যমীনের দেবতাদের পরিহার করে শুধু আসমানে যিনি আছেন তারই ইবাদাত করো।' এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'বলো-
66
اللَّهُمَّ أَلْهِمْنِي رُشْدِي، وَأَعِذْنِي مِنْ شَرِّ نَفْسِي
হে আল্লাহ, আমাকে সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং আমাকে আমার প্রবৃত্তির অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন। [১]
উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসার আগে হুসাইন ইবনু উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সত্য থেকে অনেক দূরে ছিলেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। তাই তার অবস্থার প্রেক্ষিতে এই দুআ ছিল খুবই প্রাসঙ্গিক ও অত্যন্ত কার্যকর।
আরেকবার আলি ইবনু আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'বলো'-
66
اللَّهُمَّ اهْدِنِي وَسَدِّدْنِي
হে আল্লাহ, আমাকে হিদায়াত দান করুন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করুন।।খ [২]
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অবস্থার প্রেক্ষিতে এই দুআ ছিল যথোপযুক্ত। কারণ, তিনি অন্যান্য সাহাবীদের চেয়ে যথেষ্ট দীর্ঘায়ু পেয়েছিলেন। তিনি এমন যুগ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন যখন ফিতনার পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল এবং সত্যকে মানুষের কাছ থেকে গোপন করা হচ্ছিল। তাই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দিক নির্দেশনা চেয়ে কঠিন মেঘাচ্ছন্ন সময়ে আলোর পথ দেখতে পাওয়াটা তার জন্য জরুরি ছিল।
সুতরাং, সকল প্রশংসা আল্লাহর-যিনি তার রাসূলকে সত্য, সুন্দর ও চিরকল্যাণের পথ দেখিয়েছেন। তিনি স্বীয় দয়াগুণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মানুষের যোগ্যতা বিচার করার জ্ঞান দান করেছেন, তার মাধ্যমে তাদের যথার্থ ও সর্বোত্তম উপদেশ প্রদান করেছেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবিদের পছন্দ করতেন না। কারণ, সাধারণত কবিরা যা জানে না তাই নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে। উদ্দেশ্যহীনভাবে পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায়। শব্দের কল্পরাজ্যে বিচরণ করে। তাদের মনগড়া কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে তারা যা বলে, তা শুনলে বাস্তবতা বিবর্জিত অনেক কিছুই মনের আয়নায় ভেসে ওঠে। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব অসার কথা ও কল্পনাবিলাস অপছন্দ করতেন। নিজেকে এ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখতেন। অন্যদেরকেও নিরুৎসাহিত করতেন। নিজে সত্যভাষণ দিতেন। অন্যদেরও সত্যভাষণে উদ্বুদ্ধ করতেন। একারণেই তার প্রতিটি কথা ওহীর মর্যাদা লাভ করেছে।
যে-সকল রাজনীতিবিদ তোষামোদ ও মিথ্যে প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে মানুষের মন রক্ষার চেষ্টা করে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মতো ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন সবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, তিনি আল্লাহর প্রেরিত দূত। একজন বিশিষ্ট নবী ও রাসূল-যাকে মহান আল্লাহ আপন ব্যবস্থাপনায় অসৎ কাজ ও অশুভ চিন্তা থেকে পবিত্র ও নিরাপদ রেখেছেন। তিনি এসেছিলেন প্রজ্ঞানির্ভর ও নীতিসমৃদ্ধ সত্য দ্বীনের সংবাদ নিয়ে। তিনি এমন কোনো লেখক, গবেষক বা দার্শনিক ছিলেন না, যাদের জ্ঞান কেবল নিজেদের অভিজ্ঞতা, অন্য লেখকদের মতামত কিংবা দার্শনিকদের চিন্তার ওপর নির্ভর করে; বরং তিনি যা বলতেন, সরাসরি আল্লাহর সূত্রে বলতেন-যিনি জ্ঞান ও সৃষ্টির একমাত্র উৎস।
টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত: ১২৭
১. মুসনাদে আহমাদ: ১৭২২৭, ১৭২৪৫; জামি তিরিমিযী: ৩৩৭৫; সুনান ইবনি মাজাহ: ৩৭৯৩; মিশকাতুল মাসাবীহ : ২২৭৯
১. সহীহ বুখারী: ৬১১৬; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ বুখারী: ৪২০৫, ৬৬১০; সহীহ মুসলিম: ২৭০৪; হাদীসটি আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা নাজম, আয়াত: ৪
২. সহীহ বুখারী: ১৪৫৮, ১৪৯৬; সহীহ মুসলিম: ১৯, ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. জামি তিরিমিযী: ৩৪৮৩; লালকাঈ ১১৮৪; হাদীসটি ইমরান ইবন হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; মিশকাতুল মাসাবীহ: ২৪৭৬
২. সহীহ মুসলিম: ২৭২৫
📄 চারিত্রিক শুচিতা
মহান আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا
হে নবী, আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি-সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তার দিকে আহ্বানকারী ও উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। [১]
আল্লাহ শুধু তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে যাবতীয় সৎ গুণ দিয়েই থেমে থাকেননি; বরং সে-সকল গুণে সর্বোচ্চ উৎকর্ষ দান করেছেন। যেমন, ধরা যাক—তার দানশীলতার কথা। তিনি শুধু দানশীলই ছিলেন না; বরং দানশীলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাই জীবন সংক্রান্ত সকল বিষয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অতুলনীয়-অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। সহনশীলতা, নম্রতা, ধার্মিকতা, ন্যায়-নীতি এবং আরও যত সুন্দর গুণাবলি আছে-মানব-ইতিহাসে-নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়ে অধিক মাত্রায় আর কেউ তা ধারণ করতে পারেনি। অন্যরা শুধু নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে বিশিষ্টতা অর্জন করেছিল। যেমন কেউ হয়তো ধৈর্যশীল; কিন্তু দানশীল নয়। সাহসী; কিন্তু ধার্মিক নয়। অথচ একজনের চরিত্রে যতগুলো সুন্দর ও সৎ গুণাবলি ধারণ করা সম্ভব-তার সবই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে ছিল।
আর কেনই বা এমন হবে না—যেখানে স্বয়ং আল্লাহ্ তাকে মানুষের জন্য আদর্শ হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং তাদের আদর্শ গুণাবলির দিকে পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ্ কর্তৃক প্রেরিত দূত হিসেবে চরিত্র ও নৈতিকতার যতটুকু উৎকর্ষ সাধন করার কথা ছিল, তিনি তার সবটুকু করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অন্যকে শেখানোর আগে নিজের মধ্যে যে-সকল শিক্ষা ও গুণ ধারণ করা প্রয়োজন সেক্ষেত্রেও তিনি অনন্যতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এক কথায়, সর্ববিচারেই তিনি ছিলেন সৎ, পবিত্র, মহানুভব ও আল্লাহ্র রহমতপ্রাপ্ত। আল্লাহ্র ইশারায় তাঁর দেহ থেকে হৃৎপিণ্ড বের করে পরিশুদ্ধ করা হয়েছে। সব ধরনের মন্দ থেকে তা পবিত্র রাখা হয়েছে। তাই তাঁর অন্তর ছিল হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতারণা ও পাপ-প্রবণতা থেকে অবমুক্ত। একারণে অবিসংবাদিতভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবচেয়ে ভদ্র, সজ্জন, মহানুভব ও ধার্মিক সুপুরুষ এবং এটাই হবার ছিল। কেননা, তাঁর সম্পর্কে কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে—
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
আমি আপনাকে কেবল বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি। [১]
যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যদের ক্রোধ সংবরণের আদেশ করেছেন তখন সবার আগে নিজেই সেটা আয়ত্ত করেছেন। আল্লাহ্র হক ও অধিকারের প্রশ্ন ছাড়া কখনোই তিনি ক্রুদ্ধ হননি। তাই, একজন রগচটা স্বভাবের মানুষ হিসেবে কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কল্পনাও করতে পারে না; বরং তাঁকে স্মরণ করা হয় তাঁর সদাচার, সদ্ব্যবহার, সহনশীলতা ও বদান্যতার জন্য। সাহাবীদেরকেও তিনি এই গুণ আয়ত্ত করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। বলেছেন—
GG
وَلَا تَحَاسَدُوا
তোমরা একে অন্যকে দেখে বিদ্বেষপরায়ণ হবে না। [২]
নিজেও সর্বাগ্রে ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের মধ্যে এই গুণ ধারণ করেছেন। মহান আল্লাহ তাকে হিংসা ও ঘৃণা থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের দিকে ধাবিত করেছেন। তাকে আপন অভিপ্রায়ের কথা জানিয়ে সাধারণ মানুষকে উপকৃত করেছেন। যে-সমস্ত মানুষ তাকে অভিসম্পাত করত, তিনি তাদেরও উপকার করার চেষ্টা করতেন-যাতে তাদের মনে ইসলামগ্রহণের ইচ্ছা জাগ্রত হয় এবং আল্লাহর দয়ায় জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে যায়।
সদাচার ও সুসম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তোমরা একে অন্যের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করো না।' [১]
উল্লেখ্য যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যকে যে-আদেশ বা উপদেশ দিতেন সেটা আগে নিজে পালন করতেন। কেউ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে তিনি দয়া ও উদারতা দিয়ে তার মন জয় করার চেষ্টা করতেন। কেউ তার প্রতি অবিচার করলে তিনি মাফ করে দিতেন। কেউ তাকে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত করলে, তিনি তাকে মন উজাড় করে দান করতেন। অন্যের ব্যাপারে সব সময় সুধারণা পোষণ করতেন। আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার সাথে সদাচার করতেন। একারণে বলা যায়, নিম্নোক্ত আয়াতটি অন্য যে-কোনো ব্যক্তির চেয়ে নবীজির ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য-
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ
...যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে-(তারাই প্রকৃতসদাচারী)।খ [২]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
"" إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَى أَنْ تَوَاضَعُوا নিশ্চয় আল্লাহ আমাকে এই মর্মে প্রত্যাদেশ করেছেন যে, তোমরা বিনয়ী ও নিরহংকার হও।। [৩]
এজন্যই তিনি বিনয় ও বিনম্রতার আদর্শ ছিলেন এবং এজন্যই তাকে মহান আল্লাহ মর্যাদার উচ্চাসনে আসীন করেছিলেন। অনুসারীদের ভালোবাসায় সিক্ত করেছিলেন। অনুসারীরা তাকে মানব ও মানবতার জনক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এসব গুণাবলি ও মর্যাদা সত্ত্বেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন। মাটিতে বসতেন। ভেড়ার দুধ দোহন করতেন। গরীবদের সাহচর্যে থাকতেন। ঘোড়ায় আরোহণ না করে গাধার পিঠে চড়তেন। দুর্বল ও বয়স্কদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। ছোট ও অধিকার বঞ্চিতদের প্রতিও অনুগ্রহ দেখাতেন। আপন-পর সবার প্রতিই সমান সদাচার করতেন। একারণেই তিনি বলতে পেরেছেন-
“খাইরুকুম খাইরুকুম লিআহলিহি ওয়া আনা খাইরুকুম লিআহলি”
তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রী ও পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার স্ত্রী-পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। [১]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীগণ উল্লেখিত হাদীসটির স্বপক্ষে বিভিন্ন বয়ানে সাক্ষ্য দিয়েছেন। স্বামী হিসেবে উৎকর্ষের শীর্ষ চূড়ায় উন্নীত হলে একজন মানুষ যতখানি মহান হতে পারে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঠিক ততখানি মহান ছিলেন। তিনি যখন তার স্ত্রীদের কাছে যেতেন, তাদের সুন্দর হাসি উপহার দিতেন। তাদের সাথে হাসি-কৌতুক করতেন। ঘরের কাজে সাহায্য করতেন। স্ত্রীদের সাথে তার কথোপকথন ছিল অত্যন্ত অর্থপূর্ণ। কখনো খারাপ বা কর্কশ আচরণ না করে ধীর-স্থির এবং খোশ মেজাজে কথা বলতেন। তার এই অসামান্য ঔদার্যের স্বীকৃতি দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন-
“ওয়াইন্নাকা লাআ’লা খুলুকিন আ’জিম”
নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।খ [২]
বস্তুত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিচার এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাই তার অন্তরের পবিত্রতার পরিচায়ক। বিচারকার্যে কে বাদী, আর কে বিবাদী-তা নিয়ে তিনি মাথা ঘামাননি। রায় যদি তার আত্মীয়-সুজন, বন্ধু-বান্ধব এমনকি নিজের বিপক্ষেও যেত, তবুও তিনি তা কার্যকর করা থেকে পিছপা হতেন না। রায় প্রদানে তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিলেন। তবুও অনেক মূর্খ ও স্বার্থান্বেষী লোক তাতে সন্তুষ্ট হতো না।
একবার এক লোক তাকে বলেছিল, 'আপনি ইনসাফ করুন।' নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূলকে এধরনের উপদেশ দেওয়া ছিল চরম হঠকারিতার শামিল। তবুও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চরম সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে তাকে আক্রমণ করেননি; বরং বিনয়ের সাথে কেবল এতটুকু বলেছেন যে, 'আমি যদি ইনসাফ না করি তবে আমি অবশ্যই ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবো। তাছাড়া আমিই যদি ইনসাফ না করি, তাহলে আর কে করবে?'[১]
আসলেই তো! স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি সঠিক বিচার না করেন, তাহলে এ ব্যাপারে ভরসা করার মতো তারচেয়ে উত্তম আর কে আছে? মানুষের মধ্যে একমাত্র নবীজিই সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই হচ্ছেন সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ। কাজেই তিনি যদি ন্যায়বিচার না করতেন, তাহলে পৃথিবী থেকে ন্যায়-নীতি এবং সকল আশা-ভরসা উঠে যেত। যখন তাকে ওই ব্যক্তি রুক্ষভাবে ন্যায়বিচার করতে বলেছিল, তখনও তিনি ওই ব্যক্তির প্রতি ন্যায়বিচারই করেছিলেন। ন্যায়পরায়ণতা যদি রক্ত-মাংসে গড়া কোনো সত্তা হতো এবং তাকে ভাষাজ্ঞান দেওয়া হতো তবে তার নাম হতো 'মুহাম্মাদ'-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
কারও অন্তরে যদি ব্যাধি থাকে তাহলে সে অপরিচিত দুই ব্যক্তির মধ্যে যথাযথ বিচার করতে পারলেও যখন তাকে পরিচিত মানুষদের বিচারের ভার দেওয়া হবে তখন সে তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নির্ঘাত বেইনসাফী করে বসবে। এদিক থেকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হৃদয় ছিল স্বচ্ছ ও নির্মল-সকল মন্দের ঊর্ধ্বে। কাজেই নিজের এবং স্বজনদের স্বার্থ বলি দিয়ে হলেও তার মুখ থেকে সত্য রায় ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ পায়নি। তিনি একবার বলেছিলেন যদি চুরি করতে গিয়ে তার নিজের কন্যা ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা-ও ধরা পড়ে, তবুও শাস্তি হিসেব তার হাত কাটা যাবে।
মানুষের প্রতি অন্যায় আচরণ আল্লাহর রাসূলের পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিল না।
তবুও যদি তার মনে হতো যে, অজ্ঞাতসারে কারও প্রতি অন্যায় হয়ে গেছে তাহলে তিনি নিজে গিয়ে এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করতেন। ক্ষমা চাইতেন এবং যথাযথ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করতেন। অথচ এখন মানুষ কত জঘন্য অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়! এর কারণ, তাদের সাথে এমন ব্যক্তিবর্গের যোগাযোগ আছে-যারা দেশের নেতা, যুবরাজ, সাংসদ, কিংবা শিল্পপতি। একই অপরাধে একজন সাধারণ নাগরিক যেখানে বছরের পর বছর কারাভোগ করে, সেখানে একজন যুবরাজের আত্মীয় নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়ায়। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবদ্দশায় এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যেত।
কুরাইশ বংশের বনু মাখযুম গোত্রের এক মহিলা চুরির অপরাধে ধরা পড়ে। তাই স্বাভাবিকভাবেই তার হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন কুরাইশেরা এই শাস্তি ঠেকাতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন উসামা ইবনু যায়দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শরণাপন্ন হয়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি ওই মহিলার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে কথা বলতে রাজী হন। যখন তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তার অভিপ্রায়ের কথা বলেন, তখন রাগে তার চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করে। তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও আহত স্বরে বলেন, 'তুমি কি আল্লাহর আইনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছ?'
সাথে সাথে ভুল বুঝতে পেরে উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে ওঠেন, 'হে আল্লাহর নবী, আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।' [১৯] [১]
আরেকবার যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু ও একজন আনসারী একটি ব্যাপারে মীমাংসার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়। বিচারের রায় যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষে যাওয়ায় আনসারী ব্যক্তি বলে ওঠে-'যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু আপনার ফুফাতো ভাই দেখে আপনি তার পক্ষে রায় দিয়েছেন!' তখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব, তোমার পালনকর্তার শপথ, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন বলে বিবেচিত হবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা খুঁজে না পায় এবং হৃষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করে। [১]
বলাবাহুল্য যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ন্যায়পরায়ণতা প্রমাণের জন্য মহান আল্লাহর এই একটি সাক্ষ্যই যথেষ্ট।
অধিকন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শত্রু-মিত্র সকলেই এই ব্যাপারে একমত হতে বাধ্য যে, পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়কে প্রতিহত করতেই তার আগমন ঘটেছিল। মক্কার যে-মানুষগুলো তাকে নবী হিসেবে অস্বীকার করেছিল তারাই তাকে নিজেদের জান-মালের ব্যাপারে পরম নির্ভরতার একমাত্র উৎস মনে করত। যে-ইহুদীরা তার প্রচার করা বার্তাকে বর্জন করেছিল, সেই ইহুদীরাই আবার প্রয়োজনের সময় বিবাদ-মীমাংসার জন্য তাকেই বেছে নিত।
বস্তুত মানুষের আত্মিক শুচিতা ও অশুচিতার প্রকাশ ঘঠে তার বাহ্যিক আচার-ব্যবহারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মূল্যায়ন করি, তবে দেখতে পাবো যে, তার আচার-ব্যবহার হৃদয়ের কথা বলত। কথায় ও কাজে এবং চিন্তায় ও আচরণে সব সময় মিল পাওয়া যেত। তিনি যা-সত্য, তাই বলতেন। যা বলতেন, তাই সত্য হতো। তার কোনো কথা অসত্য প্রমাণিত হয়নি। তার কোনো ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যে প্রতিপন্ন হয়নি। তার কৃত আচরণ ও প্রদত্ত উপদেশের মধ্যে কখনো বিরোধ বা ব্যতিক্রম দেখা যায়নি।
আর যদি বাহ্যিক রূপের প্রসঙ্গে আসি তবে বলতে হয়-তার চেহারা ছিল নূরের শিখা। ত্বক ছিল প্রভাত-সমীরের মতো কোমল। নিঃশ্বাস ছিল মেশকের মতো সুগন্ধ। তার গায়ের সুঘ্রাণ ছিল মগনাভীর চেয়েও তীব্র। এমনকি তার শরীরের ঘামও ছিল উজ্জ্বল মুক্তোর মতো জ্বলজ্বলে ও ফুলের রেণুর মতো সুরভিত। আনাস রাযিয়াল্লাহু
আনহু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুরভিত অঙ্গশৌষ্ঠবের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন-
GG مَا شَمَمْتُ عَنْبَرًا قَطُّ، وَلَا مِسْكًا، وَلَا شَيْئًا أَطْيَبَ مِنْ رِيحِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَا مَسِسْتُ شَيْئًا قَطُّ دِيبَاجًا، وَلَا حَرِيرًا أَلْيَنَ مَسَّا مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
আমি কোনো দিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতের মতো নরম ও কোমল রেশম স্পর্শ করিনি এবং তার দেহের বায়বীয় সুঘ্রাণ সর্বোৎকৃষ্ট কস্তুরি বা আম্বরেও পাইনি। [১]
অধিকন্তু তার সাথে হাত মেলানোর কয়েকদিন পর্যন্ত তার গায়ের সুগন্ধ পাওয়া যেত।
বক্র ও অপবিত্র হৃদয়ের মানুষের মুখে হাসির বদলে বিরক্তি থাকে। সঙ্গী হিসেবে এরা মোটেও কাম্য নয়। এরকম মানুষের মেজাজ সারাক্ষণ তিরিক্ষি হয়ে থাকে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তর পরিষ্কার থাকায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত উত্তম একজন সাথী। হাসির কথায় হাসতেন। দুঃখজনক ঘটনায় কাঁদতেন। সান্ত্বনা দিতেন। আবার কারও সাথে দেখা হলে মুচকি হেসে অভ্যর্থনা জানাতেন। মজলিসে কথার যাদুতে সবার মনে শান্তি ও স্বস্তি জোগাতেন। তার কথায় কেউ কোনো দিন বিরক্ত হয়নি। তার সান্নিধ্যে এসে কেউ কখনো ক্লান্তি অনুভব করেনি; বরং যে তার সঙ্গে একবার পরিচিত হয়েছে, সে বারবার তার সান্নিধ্য পাবার জন্য ব্যাকুল হয়েছে।
ঈদের সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিপাটি হয়ে বাইরে বের হতেন। তার দীপ্তিময় মুখে সুন্দর একটুকরো হাসি শোভা ছড়াত। ঈদ নিঃসন্দেহে সবার জন্য পরম আনন্দের মুহূর্ত। তবে তার অনুসারীদের কাছে এই আনন্দের চেয়েও বড় আনন্দ ছিল তার সাথে সময় কাটানো এবং তার পাশে বসে তার উপদেশ শোনা। কারণ, তিনি এমন মানুষ ছিলেন-যার দিকে দৃষ্টি গেলেই মহান আল্লাহর কথা মনে পড়ত। যার কথা শোনা মাত্রই হৃদয়ে শান্তির একপশলা বৃষ্টি নেমে যেত।
তার হৃদয়ের পবিত্রতার নিদর্শন দেখা যেত যুদ্ধের ময়দানেও। কারণ, যার মনে সংশয় বা দুরভিসন্ধি থাকে সে সব সময় মৃত্যুকে ভয় করে। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি যুদ্ধের ময়দানে শহীদী মৃত্যু কামনা করতেন। সব সময় আপন রবের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকতেন। দুনিয়ার এই জীবনের চেয়ে আখিরাত তার কাছে বেশি মূল্যবান ছিল। তাই তিনি শৌর্য-বীর্যে লড়াই করে যেতেন। একদম সম্মুখভাগে থেকে শত্রুর মোকাবেলা করতেন। কোনো দিন ভয়ে এক পা-ও পিছু হটেননি। এমনকি সবচেয়ে বীর সাহাবীগণও যুদ্ধের ভয়ানক মুহূর্তে শত্রুর মোকাবিলায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পেছনে থেকে লড়াই করতেন। তারা কেবল এটুকু জানত যে, যতক্ষণ তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে অবস্থান করবে ততক্ষণ তারা নিরাপদ এবং তাদের বিজয় সুনিশ্চিত।
টিকাঃ
১. সূরা আহযাব, আয়াত: ৪৫-৪৬
১. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭
২. সহীহ বুখারী: ৬০৬৫, ৬০৭৬; সহীহ মুসলিম: ২৫৫৯, হাদীসটি আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. প্রাগুক্ত
২. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৩৪
৩. সহীহ মুসলিম: ২৮৬৫; হাদীসটি ইয়ায ইবনু হুমার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সুনানু তিরমিযী: ৩৮৯৫; বায়হাকী, আস-সুনান ১৫৪৭৭, হাদীসটি আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।।
২. সূরা কালাম, আয়াত : ৪
১. সহীহ বুখারী: ৩৬১০; সহীহ মুসলিম: ১০৬৩; হাদীসটি আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সহীহ বুখারী: ৩৪৭৫, ৬৭৮৮; হাদীসটি উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সুরা নিসা, আয়াত: ৬৫
১. সহীহ বুখারী: ৩৫৬১; সহীহ মুসলিম: ২৩৩০; হাদীসটি আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
📄 নবীপ্রেম
মহান আল্লাহ বলেন-
فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ
...সুতরাং, যারা তার প্রতি ঈমান এনেছে, তাকে সম্মান করেছে; সাহায্য করেছে এবং সে-নূরের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে (তারাই সফলকাম)।[১]
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
GG
لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান-সন্ততি ও সকলের চেয়ে অধিক প্রিয় হবো।[২]
সাহাবীদের জীবনীকার ও জীবনী-পাঠকমাত্রই জানেন যে, সাহাবীদের কাছে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতটা প্রিয় ছিলেন। একজন মানুষ
আরেকজন মানুষকে সর্বোচ্চ যতটা ভালোবাসতে পারে, তারা আল্লাহর রাসূলকে ঠিক ততটা ভালোবাসতেন। তাদের এই ভালোবাসা সকল আবেগকে ছাড়িয়ে যেত। এই ভালোবাসার সঙ্গে মাতৃত্ব, পিতৃত্ব ও ভ্রাতৃত্বের তুলনা করলে তারা মা-বাবা ও স্ত্রী সন্তানের কথা ভুলে যেতেন।
কিন্তু এই হৃদয় উজাড় করা ও সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া ভালোবাসার কারণ কী ছিল? এই প্রশ্নটা এজন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, ইতিহাসে আর কোনো নেতা, শাসক বা সেনাপ্রধান তার অনুসারীদের ততটা ভক্তি ও ভালোবাসা পায়নি; ততটা সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেনি—যতটা ভক্তি ও ভালোবাসা আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেয়েছেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু বলেছেন বা করেছেন, অথচ তার সাহাবীগণ জান-প্রাণ দিয়ে তা অনুসরণ করার চেষ্টা করেননি—এমনটা কখনো হয়নি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল আদেশ তারা একবাক্যে পালন করতেন। তাকে রক্ষা করার জন্য নিজেদের দেহকে ঢাল বানিয়ে দিতেন। এই ঢাল নিছক জীবনরক্ষার ঢাল ছিল না; বরং সম্মান-রক্ষারও ঢাল ছিল। তাকে তারা এতটাই শ্রদ্ধা করতেন যে, অনেকে তার দিকে তাকিয়ে কথা বলতেও দ্বিধা বোধ করতেন; কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তার একটি মাত্র আদেশে পরদেশে যাত্রা করতে তারা দ্বিধা করতেন না। অধিকন্তু তার আদেশ পালন করতে পেরেই বরং তারা ছিলেন সবচেয়ে খুশি। এতটাই খুশি, যেন তারা শত্রুর মুখোমুখি নয়; বরং নববিবাহিতা স্ত্রীর সঙ্গ পেতে যাত্রা করছেন। আর এভাবেই তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মর্যাদা দিয়েছেন। তার প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রচার করা প্রতিটি কথায় তারা নিঃশর্ত ঈমান এনেছেন। সম্ভাব্য সকল উপায়ে নবীজিকে সব কিছুর ওপরে তুলে ধরেছেন। নিজেদের খুশির আগে তার খুশির কথা চিন্তা করেছেন। নিজেরা কষ্ট করে হলেও তার স্বস্তির ব্যবস্থা করেছেন। তারা চাইতেন, নিজেরা না খেয়ে থাকলেও যেন নবীজি অনাহারে না থাকেন।
তারা কখনোই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে উচু আওয়াজে কথা বলতেন না। তার চেয়ে উঁচু আওয়াজে তো কিছুতেই নয়। কথা বলার সময় তারা ভক্তি ও ভালোবাসার যৌথ চাহিদার প্রতি খেয়াল রাখতেন। ভালোবাসাকে সমীহের গাম্ভীর্যে মুড়িয়ে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতেন।
আল্লাহর রাসূলের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। নিজেদের সিদ্ধান্ত তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া তো দূরে কথা; কখনো তার অনুমতি ছাড়া সিদ্ধান্তই নিতেন না। সর্বোতভাবে তাকে ভালোবাসতেন। শালীন ও মার্জিত পন্থায় সেই ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। তার প্রতিটি সুন্নাহ পালনের জন্য পরস্পরে প্রতিযোগিতা করতেন।
নবীজির প্রতি তাদের এই অভূতপূর্ব ভালোবাসার কারণ গুণে শেষ করা সম্ভব হবে না। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। জিন-ইনসানের হিদায়েতের গুরুদায়িত্ব তার স্কন্ধেই ন্যস্ত ছিল। কারণ, তাকে এ উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করা হয়েছিল যে, তিনি মানবজাতিকে কুফরের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে ঈমানের আলোতে বের করে আনবেন; পথহারা মানুষকে হাতে ধরে জান্নাতের পথে পরিচালিত করবেন।
সুতরাং, বলা যায়, নবুওয়াতের গুরুদায়িত্বই ছিল তার প্রতি সবার অনন্য ভালোবাসার প্রধান কারণ; তবে এটাই একমাত্র কারণ ছিল না। কারণ, তার সুকুমার গুণাবলি ও অমায়িক ব্যবহারে যে-কেউ তাকে ভালোবাসতে বাধ্য ছিল। তিনি তাদের হৃদয়-ভূমি জয় করেছিলেন—তার হৃদ্যতা ও মহত্ত্ব দিয়ে। তার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তাদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করেছে, চেতনাকে শানিত করেছে এবং চিত্তকে প্রাণবন্ত করেছে।
কুফর ও জাহিলিয়াতের আঁধার চিরে যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ আগমন ঘটে তখন সাহাবীগণ তাকে আঁকড়ে ধরে প্রশান্তি লাভ করেন। আল্লাহর অনুগ্রহে তিনিই তো তাদের অন্তর থেকে শিরকের কলুষতা বিদূরিত করেছেন, তাদের হৃদয়কে কুফরের পাপাচার এবং নির্জীব মূর্তির উপাসনার লজ্জা থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন; সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের দিশা দিয়েছেন। বিভ্রান্তি আর অশান্তির পরিবর্তে শুদ্ধি ও নিরাপত্তা উপহার দিয়েছেন। যে-হৃদয়-ভূমি সংশয়ের রুক্ষতায় বিরান মরুতে পরিণত হয়েছিল সেই হৃদয়ে তিনি ঈমানের দুর্গ গড়ে তুলেছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মাঝে সত্যের বার্তা নিয়ে আগমনের পূর্বে তারা ছিল বন্যপশুর মতো—অজ্ঞ ও উদ্দেশ্যহীন। সততা ও সত্যবাদিতা, আস্থা ও বিশ্বাস, দয়া-দাক্ষিণ্য ও আচার-ব্যবহার এবং নীতি ও নৈতিকতার কোনো বালাই ছিল না তাদের মাঝে—সব কিছু ছিল আলোকশূন্য। অন্ধকার ও হতাশার জীবনে তারা আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল। অনৈতিক কার্যকলাপ, মূর্তিপূজা এবং মদ ও মদিরার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা ছিল তাদের জীবনের অহঙ্কার, ক্ষমতা, মর্যাদা ও আভিজাত্যের সর্বোচ্চ প্রতীক।
অন্যায় রক্তপাত ও অন্যের ভূমিদখল ছিল নিতান্তই সাধারণ ব্যাপার-বীরত্বের পরিচায়ক। সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠার জন্য তাদের জীবনে বিশেষ কোনো লক্ষ্য ছিল না। আল্লাহকে তারা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। আর আল্লাহকে উপেক্ষা করে যে-জীবন পরিচালিত হয়, সে-জীবনের কী-ই বা অর্থ থাকতে পারে? আখিরাত সম্পর্কে তারা ছিল ঘোর অন্ধকারে। জীবন অতিবাহিত হচ্ছিল ভ্রান্ত পথে। মূল্যবান সময় অহেতুক কাজে খরচ করে তারা ধাবিত হচ্ছিল নির্মম মৃত্যুর দিকে।
তাদের হৃদয় হয়ে গিয়েছিল পাথরের চেয়েও কঠিন। আত্মা ছিল রাতের নিকষ অন্ধকারের চাইতেও কালো। জীবনের পবিত্রতা-অপবিত্রতা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। আশেপাশের কিছুই তাদের স্পর্শ করত না। হালাল বা হারাম-কোনো উপার্জনই তাদের কাছে বিশেষ কোনো অর্থ বহন করত না। তারা পরিণত হয়েছিল সম্পূর্ণ ন্যায়-নীতি বিবর্জিত এক জাতিতে।
অবশেষে আল্লাহ তাদের রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের জীবনে আবারও সুখ-সমৃদ্ধি ও সাফল্য ফিরিয়ে দিতে মনোস্থির করেন। তাই তিনি রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে। তার আগমনে পাল্টে যায় সব কিছু-চিন্তা, মনন, ধর্ম, বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য সব কিছু। তাদের দেখে তখন মনে হয়, তারা যেন নবজন্ম ও নতুন জীবন লাভ করেছে।
মহামহিম আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর ওহী নাযিল করেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে ঐশী জ্ঞান ও বিধান প্রেরণ করেন। এই জ্ঞান ও বিধানই তাদের জীবন-বিধান ও সুখ-সমৃদ্ধির প্রধান অবলম্বন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাই, অনেক অনেক বছর ধরে না-করা সৎকর্ম আবার পৃথিবীর বুকে ফিরে আসে। মন্দিরের সেবকগণ মসজিদ নির্মাণ করেন। অনর্থক পূজা-পার্বণ বাদ দিয়ে সালাত-সিয়ামে মনোনিবেশ করেন। দাস-শ্রেণিকে মুক্ত করেন।
এক কথায়, তাদের হৃদয়ে জ্ঞানের আলো ও মনে মানবিকতার বীভা জেগে ওঠে। কুরআন হয়ে ওঠে তাদের চর্চা ও অধ্যয়নের মূলবস্তু। তারা এই জ্ঞান শুধু নিজেরা অধ্যয়ন ও চর্চা করেই ক্ষান্ত হননি; বরং এর সংরক্ষণ ও প্রচারেও সর্বাত্মক চেষ্টা ব্যয় করেছেন। এভাবেই তারা সৃষ্টির দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং নিজেদের পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি হিসেবে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
পবিত্র কুরআনে মানুষ ও মানব সমাজের এই ক্রমপরিবর্তনের ধারা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঘোষণা করেন-
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদের পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতোপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত। [১]
সাহাবীগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে খুবই ভালোবাসতেন। কারণ, তার হাত ধরেই তারা আল্লাহকে চিনতে পেরেছেন। তিনিই তাদের আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির ব্যাপারে সংবাদ দিয়েছেন। জাহান্নামের রাস্তা থেকে জান্নাতের পথে তুলে এনেছেন। পার্থিব-জীবনের মায়াজাল থেকে বের করে অনন্ত শান্তির ঠিকানার সন্ধান দিয়েছেন এবং উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন-
GG يَا أَيُّهَا النَّاسُ ، قُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، تُفْلِحُوا
হে লোকসকল, বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তবেই তোমরা সফলকাম হবে। [২]
সালাতের ব্যাপারে বলেছেন-
صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي
আমাকে যেভাবে সালাত পড়তে দেখেছ, সেভাবে সালাত আদায় করো। [৩]
হজের ব্যাপারে বলেছেন—
لِتَأْخُذُوا مَنَاسِكَكُمْ আমার কাছ থেকে তোমরা হজের বিধি-বিধান শিখে নাও।। [১]
শুদ্ধি ও তাকওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করে বলেছেন—
إِنَّ أَتْقَاكُمْ وَأَعْلَمَكُمْ بِاللَّهِ أَنَا তোমাদের মধ্যে আমিই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি এবং তার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জানি। [২]
সর্বোপরি সুন্নাহর ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন—
فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي ، فَلَيْسَ مِنِّي যে আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে আমার আদর্শের অনুসারী বলে বিবেচিত হবে না। [৩]
বস্তুত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদেরকে অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতা থেকে উদ্ধার করেছেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেছেন। এতকিছুর পরও কি সাহাবীগণ তাকে ভালো না বেসে থাকতে পারে? শুধু তারা কেন; মুসলিম জাতিই বা কীভাবে তাকে ভালো না বেসে থাকতে পারে—যেখানে সকল সৎকর্ম ও সুকুমারবৃত্তির একমাত্র আদর্শ তিনিই!
সুতরাং, একজন মুসলিম যখন ওযু-গোসল, সালাত-সিয়াম, হজ-যাকাত অথবা অন্যকোনো ইবাদাত করতে চায় তখন তাকে অবশ্যই খেয়াল করতে হবে, তার
নবী এই সকল ইবাদাত কীভাবে পালন করেছেন। তাকেও ঠিক সেভাবেই ইবাদাত পালন করতে হবে। কারণ, একমাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণেই তার ইবাদাত পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে!
একজন মুসলিম কীভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ভালো না বেসে থাকতে পারে-অথচ তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, পথ প্রদর্শক এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরম অনুসরণীয়!
একজন মুসলিম কীভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ভালো না বেসে থাকতে পারে-অথচ তিনি গোটা মানবজাতিকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে দাওয়াত দিয়েছেন-যে-পথ সততা, সত্যবাদিতা, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচারের পথ!
কীভাবে একজন মুসলিম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ভালো না বেসে থাকতে পারে-অথচ তিনি ছিলেন সুস্পষ্ট সতর্ককারী এবং সব ধরনের মন্দ হতে রক্ষাকারী! অন্যায়, অবিচার, শোষণের বিপক্ষে লড়াই করে কেটেছে তার সারাটা জীবন। সুতরাং, যেদিন থেকে কোনো মুসলিম ইসলামের শিক্ষায় জীবন পরিচালনা শুরু করে এবং প্রতিটি কাজে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে, সেইদিনই সে প্রকৃত জন্ম লাভ করে।
পৃথিবীতে একজন মানুষের সুখ-সাফল্য নির্ভর করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনাদর্শ মেনে চলার ওপর। কারণ, কথা ও কাজে একমাত্র তিনিই ছিলেন সত্যপথযাত্রী। অন্যভাবে বললে, তার দেখানো পথে না চললে আমাদের পদস্খলন ঘটবেই। কেননা, সত্য ব্যতীত সমস্ত পথ কেবলই ভ্রান্তির। তাই আমাদের কথায় ও কাজে ঠিক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মতোই হতে হবে। তাঁকেই একমাত্র আদর্শ হিসেবে মেনে চলতে হবে এবং তাঁর সুন্নাহকেই সকল কাজের মানদণ্ড স্থির করতে হবে।
মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভূমিকা ব্যাখ্যা করে বলেন-
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِن جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَن نَّشَاء إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
এভাবে আমি আপনার কাছে এক ফেরেশতা প্রেরণ করেছি আমার আদেশক্রমে। আপনি জানতেন না, কিতাব কী এবং ঈমান কী? কিন্তু আমি একে করেছি নূর, যার দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করি। নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।। [১]
টিকাঃ
১. সূরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭
২. সহীহ বুখারী: ১৫; সহীহ মুসলিম: ৪৪; হাদীসটি আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা জুমুআ, আয়াত: ২
২. মুসনাদে আহমাদ: ১৮৫২৫; মুসতাদরাকে হাকিম: ৩৯; হাদীসটি রাবীয়া ইবনু আব্বাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
৩. সহীহ বুখারী: ৬৩১; হাদীসটি মালিক ইবনুল হুয়ায়রিত রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সহীহ মুসলিম: ১২৯৭; হাদীসটি জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ বুখারী: ২০; উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
৩. সহীহ বুখারী: ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম: ১৪০১; আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা শূরা, আয়াত: ৫২
📄 কল্যাণের আধার
وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন আল্লাহর বরকতে পরিপূর্ণ। তিনি যেখানে যেতেন, সেখানেই বরকত ও কল্যাণের বারিধারা বর্ষিত হতো। শৈশব থেকেই তার এই কল্যাণময়তা মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। তিনি যখন দুধের শিশু তখন হালিমা সাদিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা তাকে 'দুধ-শিশু' হিসেবে গ্রহণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে তার সার্বিক অবস্থা পাল্টে যায়। সর্বত্র বরকতের ছোঁয়া দেখা যায়। তার জীর্ণ বুকে দুধ ফিরে আসে। বাহনের গায়ে শক্তি ফিরে আসে। অনুর্বরতার কারণে যখন অন্যদের মেষ ও গবাদি পশু খালি পেটে ফেরে তখনও তার মেষগুলোর পেট ভরা থাকে। ওলান দুধে পূর্ণ থাকে।
তার মুখের কথায়ও অসামান্য বরকত ছিল। তিনি অত্যন্ত জটিল বিষয়ও খুব সহজে ও স্বল্প ভাষায় বোঝাতে পারতেন। তার শব্দের কারিগরি এতটাই অসাধারণ ছিল যে, সর্বস্তরের মানুষ অনায়াসে তার কথা বুঝতে পারত। যে-সকল তাৎপর্যপূর্ণ
বিষয় বোঝাতে সাধারণ মানুষের কয়েক ঘণ্টা লেগে যেত সেগুলো তিনি মুহুর্তেই বোঝাতে পারতেন। এক কথায়, অসাধারণ ছিল তার বাগ্মীতা।
তার আয়ুষ্কালেও ছিল আশ্চর্য বরকত। মাত্র তেইশ বছরের নবুওয়াতী জীবনে তিনি কী না করেছেন! ইসলামকে বৃহৎ পরিসরে গোটা বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। একটি জাতি কয়েক যুগের অব্যাহত সাধনায় যা করতে না পারে, তিনি তা মাত্র তেইশ বছরে করে দেখিয়েছেন। আরবের সীমানা থেকে অবিশ্বাসের আঁধারকে দূরীভূত করেছেন। আঁধারের বুকে আলো প্রতিস্থাপন করেছেন। ন্যায় ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। সত্যকে অবলম্বন করে এমন একটি জাতি গড়ে তুলেছেন-যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অদ্বিতীয়। সর্বোপরি ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি এমন সব নজির রেখে গেছেন যা পরবর্তীদের নিকট সুন্নাহ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং আজও বিনম্র শ্রদ্ধায় পালিত হয়ে আসছে।
তার জীবন থেকে নেওয়া একটি বরকতময় দিনের কথাই ধরা যাক। সেদিন ছিল নহরের দিবস; হজের দশম দিন। সেদিন তিনি ফজর পড়েন মুযদালিফায়, তারপর মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যান। এই পুরোটা সময়জুড়ে তিনি তাসবীহ, [১] তাহলীলাখ [২] ও দুআ-মানুজাতে ব্যাপৃত থাকেন। হজের করণীয় বিষয়ে সবাইকে নির্দেশনা দেন। হাজীদের প্রশ্নের উত্তর ও সমস্যার সমাধান দেন। এরপর জামারাতুল আকাবায় পাথর নিক্ষেপ করেন। মাথা মুণ্ডন ও পশু কুরবানী সম্পন্ন করেন। সেখান থেকে ফিরে এসে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেন। এরপর যোহরের সালাত আদায় করেন। এসব করতে তার একদিনও লাগেনি; বরং ফজর থেকে যোহরের মধ্যেই সব কিছু সম্পন্ন হয়ে গেছে। এটা অবশ্যই অসামান্য বরকতের বহিঃপ্রকাশ।
কেননা, সেই সময়ে না ছিল কোনো গাড়ি, না কোনো দ্রুতযান। উটের পিঠে চড়ে দূরবর্তী ও জনবহুল সব স্থানে তিনি হাজার হাজার মানুষকে সাথে নিয়ে যাত্রা করেছেন। প্রচণ্ড রোদ, মানুষের অবিরাম প্রশ্ন ও সেগুলোর উত্তর তার যাত্রার গতিকে মন্থর করা সত্ত্বেও কত সুন্দরভাবে সকল কাজ সম্পাদন করেছেন। তাই সকল প্রশংসা আল্লাহর-যিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এত ক্ষুদ্র সময়ে এত বরকতপূর্ণ একটি জীবন দিয়েছেন-যা একের পর এক সাফল্য দিয়ে সুসজ্জিত।
আল্লাহর অনুগ্রহে তিনি মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের অসামান্য ক্ষমতা রাখতেন।
অনেক জটিল, সূক্ষ্ম ও অস্বাভাবিক বিষয়ও অনায়াসে বুঝে ফেলতেন এবং সহজ সমাধান দিতেন। একবার তিনি কোনো এক কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কবরে দুইজন ব্যক্তিকে আযাব দেওয়া হচ্ছিল। একজনের আযাবের কারণ ছিল মূত্রত্যাগ করে পানি ব্যবহার না করা আর অপরজন ছিল চোগলখোর। তাদের আযাবের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাছের সবুজ ডাল ভেঙে দুই টুকরো করে তাদের কবরের ওপর রেখে বলেন-
GG لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسًا এই দুইটি (ডাল) শুকিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি আশা করি তাদের শাস্তি কম হতে থাকবে। [১]
উল্লেখ্য যে, এ ধরনের ব্যাপার একমাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথেই যায়। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তার সকল কাজ-কর্ম ও আচার-আচরণে প্রত্যক্ষ বরকত দান করেছেন।
খায়বারের যুদ্ধে আলী ইবনু আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু চক্ষুপীড়ায় আক্রান্ত হন। একসময় তিনি দেখার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। অবস্থা জানতে পেরে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মুখের লালা আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে লাগিয়ে দেন। আল্লাহর রহমতে মুহূর্তের মধ্যেই তিনি দৃষ্টি ফিরে পান।
খন্দকের যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে এক হাজার সৈন্য ছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও দীর্ঘতার ফলে আটকে পড়া মদীনাবাসীর সকল রসদ ও প্রয়োজনীয় খাদ্য-শস্য শেষ হয়ে আসে। ফলে সৈন্যরা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণেও ব্যর্থ হয়ে পড়ে। সেই দুঃসময়ে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ঘরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আরও তিনজন ব্যক্তিকে দাওয়াত দেন। জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী যেটুকু খাবার প্রস্তুত করেছিলেন তা চার-পাঁচজনের জন্যও যথেষ্ট ছিল না; কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৈন্যশিবিরের সবাইকে নিয়ে এই দাওয়াতে অংশগ্রহণ করেন।
আল্লাহর রাসূলের এই অসাভাবিক আচরণে জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রচণ্ড বিস্মিত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ, এতটুকু খাবার কোনোভাবেই এই বিশাল সেনাবাহিনীর জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাবারে ফুঁ দিয়ে সৈন্যদের দশজন করে ভেতরে আসতে বলেন। আল্লাহ খাবারে ভরপুর বরকত ঢেলে দেন। ফলে খাবারের পরিমাণ এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, সবাই চাহিদামতো আহার্য গ্রহণ করার পরেও পর্যাপ্ত খাবার অবশিষ্ট রয়ে যায়। শুধু তাই নয়; এই খাবার মদীনার ঘরে ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সুবহানাল্লাহ! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! কী অলৌকিক ব্যাপার! এসব তো নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর আল্লাহর বরকত ছাড়া আর কিছু নয়। এসব তো তার নবুওয়াতের প্রমাণ ছাড়া আর কিছুই নয়!
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চৌদ্দশ সেনা নিয়ে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বিদেশযাত্রা করেন। পথিমধ্যে জনমানবহীন একস্থানে এসে তাদের পানি সঙ্কট দেখা দেয়। মরু-মরিচীকায় যখন মৃত্যুর বিভীষিকা জ্বলজ্বল করে ওঠে তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি পানির পাত্র তলব করেন। পাত্রটিতে তখন সামান্য পানি অবশিষ্ট ছিল। তিনি সেই পানি তার পবিত্র হাতে ঢালেন অমনি সবাইকে অবাক করে দিয়ে তার হাত থেকে পানির ফোয়ারা ছুটতে শুরু করে। সেই বরকতের পানি দিয়ে সবাই তাদের তৃষ্ণা নিবারণ করে। পশুদেরও পান করায়। অজু-গোসলের কাজে ব্যবহার করে। এরপরও পানি অবশিষ্ট থেকে যায়।
أَفَسِحْرُ هَذَا أَمْ أَنتُمْ لَا تُبْصِرُونَ
এটা কি জাদু, না তোমরা চোখে দেখছ না? [১]
আরেক দিনের ঘটনা। সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। জ্বরে তার দেহ পুড়ে যাচ্ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখতে আসেন। এসেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোগীর বুকের ওপর তার হাত মোবারক রাখেন। মুহূর্তেই শরীরের তাপমাত্রা কমে আসে। আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। অনেক বছর পর তিনি সেই দিনের স্মৃতিচারতণ করতে গিয়ে বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আজও আমি আমার বুকের
'ওপর তার হাতের শীতলতা অনুভব করি।'
আরেকবার যখন জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওযু করে সেই পানি রোগীর ওপর ছিটিয়ে দেন। আল্লাহর রহমতে তিনিও সাথে সাথে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সর্বসত্তা যেমন বরকতময় ছিল তেমনই তার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও বরকতপূর্ণ ছিল। এজন্যই তিনি বিভিন্ন সময়ে তার মুণ্ডিত চুল ও ঝরে পড়া দাড়ি দিয়ে বিভিন্ন জনকে পুরস্কৃত করতেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের চুল দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবু তালহা আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু। আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কণ্ঠস্বর অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় তিনি যুদ্ধের ময়দানে সেনাদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ঘোষণা দিতেন। তাদের নানাভাবে যুদ্ধের জন্য উজ্জীবিত করতেন। এজন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নহরের দিন মাথা মুণ্ডন করে ডান পাশের চুল দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করেন। কারণ, তার মাথার চুলও ছিল আল্লাহর বরকতপুষ্ট। তাই তিনি চেয়েছিলেন আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু-ও যেন এই বরকতের ভাগীদার হতে পারেন। আর বাম পাশের চুলগুলো তিনি অন্যান্য হাজীদের মাঝে বণ্টন করে দেন। যখন তার কেশরাজি বণ্টন করা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত হাজিদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। কেউ এক গোছা; আবার কেউ একটিমাত্র চুল পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতে শুরু করে। কেউ কেউ বরকতের আশায় সেই চুল ভেজানো পানি পান করে। এতটাই বরকতপূর্ণ ছিল নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সব কিছু!
আবু মাহযুরা রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন ছোট্ট শিশু তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মাথায় হাত রেখে আদর করে দিয়েছিলেন। এ কারণে আবু মাহযুরা শপথ করেছিলেন যে, তার যে-চুল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র স্পর্শ পেয়ে ধন্য হয়েছে, সে-চুলে তিনি কখনোই ক্ষুর বা কাঁচি ব্যবহার করবেন না।
উল্লেখ্য যে, আবু মাহযুরা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার শপথ পূর্ণ করেছিলেন। আমৃত্যু তিনি মাথায় ক্ষুর বা কাঁচি ব্যবহার করেননি। মৃত্যুর সময় তার চুল অস্বাভাবিক বড় হয়ে যায় এবং সেই চুলসহই তাকে দাফন করা হয়।
ছোট শিশুরা দুধ ও পানিভর্তি পাত্র নিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে যেত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বরকতময় হাত পাত্রে প্রবেশ করাতেন। দুধ ও পানি তখন বরকতে ভরে যেত। শিশুরা এই দুধ ও পানি পান করে আরোগ্য লাভ করত।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এধরনের অলৌকিক বরকতের ঘটনা অসংখ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। সেসকল হাদীস পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি যেখানে অবস্থান করতেন অথবা যেখানে গমন করতেন সেখানেই কল্যাণ ও বরকতের বারিধারা বর্ষিত হতো।
হে আল্লাহ, আপনি আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার পরিবার এবং সাহাবীদের ওপর শান্তি বর্ষণ করুন।
টিকাঃ
১. সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৩১
১. সুবহানাল্লাহ বলা।
২. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলা।
১. সহীহ বুখারী: ২১৬, ২১৮; ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা তৃর, আয়াত: ১৫