📄 নবীজির বীরত্ব
দৈহিক গঠনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন একজন সামর্থ্যবান সুপুরুষ। বীরত্ব ও অসম সাহসিকতা তার পৌরুষ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করতেন না। তার সময়কালে যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও দুঃসাহিসক ব্যাপার। যুদ্ধ ও যুদ্ধের পরিণতি সব সময় ভয়ঙ্কর হলেও তৎকালের যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর। কেননা, তখন যোদ্ধারা একে অপরের দিকে দূর থেকে গুলি ছুঁড়ে মারত না; বরং উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে সম্মুখযুদ্ধে পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। যুদ্ধে গর্দান কাটা পড়ত। তলোয়ারের আঘাতে হাত-পা ঝুলে থাকত। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। তাদের শরীরে, কাপড়ে, বর্মে রক্তের দাগ লেগে থাকত-রক্তের বন্যায় ময়দান ভেসে যেত।
এরকম অবস্থায় স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, সে বীর না হয়ে পারে না। আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শৈশবেই এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। পরিণত বয়সে বহু যুদ্ধে সম্মুখে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শত্রুর ভয়ে কখনোই লুকিয়ে থাকেননি। সহযোদ্ধাদের ঢাল বানিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি; বরং অধিকাংশ যুদ্ধেই সম্মুখসারিতে অবস্থান নিয়েছেন। সহযোদ্ধাদের পেছনে ফেলে শত্রুবাহিনীর কেন্দ্রীয় শক্তিতে আঘাত হেনেছেন।
তার সাহসিকতা প্রমাণের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তিনি কোনো দিন রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেননি। এমনকি পশ্চাদপদও হননি। যখন অন্যরা শত্রুর তীব্র আক্রমণে কয়েক কদম পিছু হটে রক্ষণশীল হয়ে উঠত, তখনও নবীজি সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। শত্রুপক্ষকে এক ইঞ্চি মাটিও ছেড়ে দিতেন না।
কখনো কখনো তিনি বাহিনীর মধ্যভাগে থেকে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করতেন। যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সৈন্যদের দিক-নির্দেশনা দিতেন; কিন্তু যুদ্ধ যখন ভয়াবহ রূপ নিত, চারিদিকে রক্তের স্রোত বইতে শুরু করত; একের পর এক লাশ পড়তে থাকত, যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ কোনো দিকে মোড় নেওয়ার উপক্রম হতো, তখন বীরবিক্রমে বাহিনীর একদম সম্মুখে গিয়ে যুদ্ধ করতেন। তাঁর স্নায়ু থাকত নির্ভার। আল্লাহর ওপর ভরসা থাকত অবিচল।
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সঙ্গে করে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকালে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গুহায় আশ্রয় নেন। তাঁরা তখন নিরস্ত্র। ওদিকে বাইরে অপেক্ষমাণ মুশরিকদের হন্তারক-বাহিনী। তাদের হাতে ছিল কোষমুক্ত তরবারি। চোখেমুখে ছিল রক্তের লাল নেশা। এ অবস্থায় আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চেহারায় ভয়ের ছাপ দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে ওঠেন, 'হে আবু বকর, এমন দুই ব্যক্তির ব্যাপারে তোমার কী ধারণা-যাদের তৃতীয়জন হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ?' [১] চরম বিপদের মুহূর্তে এমন অভয়বাণী উচ্চারণ করা নিঃসন্দেহে চূড়ান্ত সাহসিকতার অভিপ্রকাশ।
হুনাইন-যুদ্ধে প্রথম দিকে মুসলিম-বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। মাত্র ছয়জন সাহাবী তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে অবস্থান করে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একটি খচ্চরের পিঠে চড়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত্রুবাহিনীর দিকে ধাবিত হতে থাকেন। অথচ শত্রুবাহিনী ছিল সংখ্যায় প্রচুর-অস্ত্রশস্ত্র ও লৌহবর্মে সুসজ্জিত। এতদসত্ত্বেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের দিকে ছুটে যান এবং একমুষ্টি বালু নিয়ে শত্রুদের দিকে নিক্ষেপ করে বলেন—'তোমাদের চেহারাগুলো কুৎসিত হয়ে যাক।' [২]
আল্লাহর ইচ্ছায় তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ নতুন দিকে মোড় নেয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছুঁড়ে মারা বালুর প্রতিটি কণা শত্রুবাহিনীর প্রত্যেকের চোখে ঢুকে যায়। তারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। যে যে-দিকে পারে ছুটতে থাকে। মুহূর্তেই মুসলিম যোদ্ধারা ময়দানে ফিরে আসে এবং আল্লাহ তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় দান করেন।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: ৩৬৫৩, ৪৬৬৩; সহীহ মুসলিম: ২৩৮১; হাদীসটি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ মুসলিম: ১৭৭৭; হাদীসটি সালামাহ ইবন আমর ইবনি আকওয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
📄 তার প্রশংসায়
আমরা এখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের সেইসব মুহূর্তের কথা জানব, যখন তাকে নিয়ে প্রশংসা করা হয়েছে। মানুষ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, সে-পরিচয় তার নামেই পাওয়া যায়। আরবীতে, 'মুহাম্মাদ' শব্দটি দ্বারা 'মাহমুদ' বোঝানো হয়; যার অর্থ- 'প্রশংসনীয়।' আর তার সমস্ত বৈশিষ্ট্যই এমন ছিল-যার প্রশংসা না করে থাকা অসম্ভব। পবিত্রতা, মহানুভবতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সত্যনিষ্ঠা যেন তার নামের সাথেই জড়িয়ে আছে এবং এটাই হবার ছিল। কারণ, স্বয়ং মহান আল্লাহ তার গুণকীর্তন করতে গিয়ে বলেন-
তিনি নিজে প্রশংসিত এবং প্রশংসিত স্থানের অধিকারী। কুরআনের ভাষায়-
عَسَى أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا
খুব সম্ভব আপনার পালনকর্তা আপনাকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন। [১]
মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি নাম-যা নূরের হরফে ঈমানের কালিতে মুমিনদের বুকের ভেতর খোদাই করে লিখে দেওয়া হয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসা তাওরাত এবং
ইঞ্জিলেও স্থান পেয়েছে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্ববর্তী নবীগণও নিজ অনুসারীদের শেষ-নবী হিসেবে তার নাম জানিয়ে গেছেন। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহেও তার আগমনের আগাম বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা থেকে অবমুক্ত। কুরআনের ভাষায়-
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى
তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি।১ [১]
কুপ্রবৃত্তির তাড়না থেকে পবিত্র। কুরআনের ভাষায়-
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى
আর তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না।খ [২]
ধর্মীয় প্রাণপুরুষ ও শরীয়তপ্রণেতা। কুরআনের ভাষায়-
إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
কুরআন ওহী বিশেষ-যা তাকে প্রত্যাদেশ করা হয়। [৩]
আল্লাহমুখী ও সত্যের অভিসারী। কুরআনের ভাষায়-
فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّكَ عَلَى الْحَقِّ الْمُبِينِ
অতএব, আপনি আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। নিশ্চয় আপনি সত্য ও স্পষ্ট পথে আছেন।। [৪]
সুমহান চরিত্রের অধিকারী। কুরআনের ভাষায়-
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী। [১]
কোমল হৃদয় ও ক্ষমাপরায়ণ। কুরআনের ভাষায়-
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نَفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল-হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি কঠিন ও রুক্ষ-হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করুন। তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন। [২]
মহান বিজয়ী। কুরআনের ভাষায়-
إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا
নিশ্চয় আমি আপনাকে দান করেছি সুস্পষ্ট বিজয়। [৩]
ক্ষমাপ্রাপ্ত। কুরআনের ভাষায়-
لِّيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ
যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত-ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন। [৪]
সরল পথের পথিক ও পথপ্রদর্শক। কুরআনের ভাষায়-
وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন। [১]
কষ্ট লাঘবকারী। কুরআনের ভাষায়-
وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ
তিনি তাদের থেকে লাঘব করেন গুরুভার। অপসারণ করেন শৃঙ্খল। [২]
শান্তির দূত। কুরআনের ভাষায়-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ। [৩]
বস্তুত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অনুগ্রহ ও অনুকম্পার মূর্তপ্রতীক। নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, শাসক-শাসিত-সবার প্রতিই তিনি অসামান্য অনুগ্রহ করেছেন। সবার জন্য যথোপযুক্ত মর্যাদা নিশ্চিত করেছেন। প্রত্যেককে তার যোগ্যতা ও সুবিধা-অসুবিধা অনুপাতে বিধান দিয়েছেন। অবস্থাভেদে ইবাদাতের স্বতন্ত্র পথ বাতলে দিয়েছেন। আর কেনই-বা তা হবে না? তাকে যিনি শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি তো অনুগ্রহের আধার-মহান রাব্বুল আলামীন।
বৃদ্ধদের জন্য তিনি ছিলেন আল্লাহর বিশেষ রহমত-কষ্ট লাঘবকারী। কারণ, তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বলদের ইবাদাতের সহজ উপায় বলে দিতেন-যাতে শেষ বয়সে এসে ইবাদাত তাদের কাছে দুর্বহ মনে না হয়; ইবাদাতকে বোঝা মনে করে তারা দূরে সরে
না যায়। অধিকন্তু বৃদ্ধদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল—তারা যেন জীবনের শেষ সময়গুলো এমনভাবে কাজে লাগায় যেন এগুলোই হয় তাদের শেষ, অথচ শ্রেষ্ঠ ইবাদাত।
যুবকদের জন্যও তিনি ছিলেন আল্লাহর বিশেষ রহমত—উত্তম আদর্শ। কারণ, তিনি তাদের উন্নত চারিত্রিক গুণাবলি ও নীতি-নৈতিকতা দিয়ে সাজাতে চাইতেন। তাদের অমূল্য যৌবনকে কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহ দিতেন। পথ ও পন্থা বাতলে দিতেন। তাদের জন্য উজ্জ্বল ও নিরাপদ ভবিষ্যতের ছক আঁকতেন।
শিশুদের জন্যও তিনি ছিলেন আল্লাহর বিশেষ রহমত—স্নেহ-মমতার অফুরন্ত উৎস। কারণ, তিনি স্নেহ ও ভালোবাসার বন্ধনে তাদের আগলে রাখতেন। যে-সকল শিশু তাঁর ইন্তেকালের পরে জন্ম গ্রহণ করেছে, তাদের জন্যও তিনি চিন্তা করেছেন। নবজাতকের কানে আযান দেওয়া, তাদের সুন্দর নাম রাখা এবং যথাযথভাবে প্রতিপালন করার আদেশের মাধ্যমে তিনি তাদের জন্যও ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন রেখে গেছেন।
নারীদের প্রতিও ছিলেন তিনি মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত—তাদের সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠাকারী। কারণ, তিনিই নারীদের সমাজের অত্যাচার ও বৈষম্য থেকে উদ্ধার করেছেন। দাসত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে স্বাধীনতার আস্বাদ দিয়েছেন। সামাজিক, মানবিক ও বৈষয়িক বৈষম্য দূর করে যথার্থ অধিকার নিশ্চিত করেছেন। তাদের সম্মান ও সম্ভ্রম নিরাপদ করেছেন।
শাসক-শ্রেণির জন্যও তিনি ছিলেন আল্লাহর সুস্পষ্ট অনুগ্রহ—অনুপম দিক-নির্দেশক। কারণ, তাদের জন্য তিনি ইনসাফ-ভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন। সমাজ থেকে অবিচার, দুঃশাসন ও দূর্নীতি দূর করার কার্যকর পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। জাতীয় জীবনে দয়া ও সহানুভূতির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাদের জন্য এ জাতীয় কাজকে সহজ করে দিয়েছেন। অধিকন্তু তাদেরকেও এসব অপরাধকর্ম থেকে বিরত থাকার আদেশ করেছেন।
জনসাধারণের জন্যও তিনি ছিলেন মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ—করুণার অনিঃশেষ উৎস। কারণ, তিনি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। সামাজিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। সেই সঙ্গে তাদের সীমালঙ্ঘন ও বিদ্রোহের মতো অমার্জনীয় অপরাধের ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন। শাসক যতদিন আল্লাহর অনুগত্য করবে, ততদিন অবাধ্য হতে নিষেধ করেছেন। নিঃসন্দেহে তাঁর এই আদেশ-নিষেধ
ও নির্দেশনা একটি শক্তিশালী জাতি গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এজন্যই তিনি বিশ্বমানবতার জন্য আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। কুরআনের ভাষায়-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ। [১]
এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, কপট লোকদের কথা মানুষ কানে তোলে না; কিন্তু সৎ লোকদের কথা তারা হৃদয়ের কান দিয়ে শ্রবণ করে। তাহলে কল্পনা করুন, স্বয়ং আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথাগুলো তার অনুসারীদের ওপর কেমন প্রভাব ফেলতে পারে! নিঃসন্দেহে তার মুখ নিঃসৃত বাণী মানুষের অন্তরের অন্তঃস্তলে পৌঁছে যেত। সাহাবীগণ তার কথা হৃদয়ের কোমল ভূমিতে খোদাই করে রাখতেন। তিনি যখন কথা বলতেন, তারা অবনত মস্তকে মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করতেন। তার সম্মানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন, দেখে মনে হতো তাদের মাথায় বুঝি কোনো পাখি এসে বসেছে। তাই তারা নড়াচড়া করছেন না-পাছে পাখিটি যদি উড়ে যায়!
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্বাভাবিক কথাই এতটা হৃদয়গ্রাহী ছিল। আর যখন তিনি বয়ান করতেন, তখন যেন মিম্বর কেঁপে উঠত। শ্রবণকারীদের হৃদয় জাগ্রত হতো। সমস্ত মনোযোগ তার প্রতি নিবদ্ধ হতো। উপস্থিত সবাই পার্থিব-জীবনের মায়া-মোহ অতিক্রম করে আধ্যাত্মিকতার অপার্থিব জগতে হারিয়ে যেত। হৃদয়ের গভীরে আখিরাতের বাস্তবতা বাঙময় হয়ে উঠত। তাদের চোখের পাতা ভিজে উঠত। মনে হতো, এই বুঝি মৃত্যুর দূত এসে তাদের জান নিয়ে যাবে।
শুধু মানুষ কেন-নিষ্প্রাণ পাথরও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়ান শুনে ভয়ে কেঁপে উঠত। মাটির দেওয়ালও ডুকরে কেঁদে উঠত এবং এটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ, মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ
তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? হাসছ? কিন্তু ক্রন্দন করছ না? [১]
দৃঢ়চেতা যোদ্ধা। কুরআনের ভাষায়-
فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا تُكَلِّفُ إِلَّا نَفْسَكَ
আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করতে থাকুন, আপনি নিজের সত্তা ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ের যিম্মাদার নন...[২]
উল্লেখ্য যে, যুদ্ধের পরিস্থিতি যত বেশি ভয়ংকর হতো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহসিকতাও সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেত। কারণ, তিনি নিশ্চিত বিশ্বাস করতেন, মৃত্যু তার জন্য অবধারিত। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতি ব্যতীত মৃত্যু তার কিচ্ছুটি করতে পারবে না। অধিকন্তু মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে মৃত্যুর বাস্তবতা এভাবে তুলে ধরেছিলেন-
وَمَا مُحَمَّدُ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ
আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ কিছু নন! তার পূর্বেও বহু রাসূল গত হয়েছেন। তাহলে তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসারণ করবে? বস্তুত কেউ যদি পশ্চাদপসারণ করে, তবে সে আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সাওয়াব দান করেন।[৩]
সীমাহীন বদান্য। হাদীসের ভাষায়-
<Q> والذي نفسي بيده ، لو أن لى بعدد عضاة تهامة مالا لأنفقته ثم لا تجدونى بخيلا ولا جبانا ولا كذبا </Q>
যদি আমার কাছে তিহামার বৃক্ষরাজি পরিমাণ সম্পদ থাকত তবে আমি সেগুলো অকাতরে দান করে দিতাম। তোমরা আমাকে কিছুতেই কৃপণ, মিথ্যেবাদী অথবা ভীরু ভাবতে পারতে না। [১]
বস্তুত বদান্যতায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ছাড়িয়ে যাওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। কারণ, বাস্তবজীবনে সবাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের কাছে কিছু-না-কিছু অর্থ রেখেই দেয়! কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো দিনই এমনটি করেননি; অভাবের ভয়ে সম্পদ জমা করেননি।
আল্লাহর প্রতি তার আস্থা এতটাই দৃঢ় ছিল যে, তিনি জানতেন, আল্লাহই তাকে খাওয়াবেন, পরাবেন এবং দেখভাল করবেন। তাই তিনি সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মাত্রায় বদান্যতা দেখাতে পেরেছেন। তার বদান্যতার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হলো সময়। কারণ, তিনি জীবনের পুরোটা সময়ই ইসলামের জন্য বিসর্জন দিয়েছেন। সময়ের সাথে সাথে সম্পদের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন অতুলনীয় দানশীল। ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি নিজের জন্য কিছুই সংরক্ষণ করতেন না; বরং নিজের নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসও অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। জীবনের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন নির্মোহ দাতা। এজন্য সব সময় সামনের সারিতে থেকে যুদ্ধ করতেন। মৃতুভয় উপেক্ষা করে আল্লাহর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত থাকতেন।
হাতিম তাঈ-ও দানশীল ছিলেন। তবে তিনি এর বিনিময়ে খ্যাতি ও ভালোবাসা চাইতেন; কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দান ছিল শুধুই এবং শুধুই আল্লাহকে খুশি করার জন্য। এজন্য তার এই দান ও বদান্যতা অন্যদেরও প্রবলভাবে আলোড়িত করত।
পরম ক্ষমাশীল। কুরআনের ভাষায়-
فَاصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ
অতএব, আপনি পরম সৌজন্যের সাথে তাদের ক্ষমা করুন।। [১]
কোনোরকম বিনিময়ের আশা ছাড়াই তিনি তার অধিকার ক্ষুণ্ণকারীকে ক্ষমা করে দিতেন। এতে সামান্য অনুযোগও করতেন না। সবচেয়ে পাষাণ হৃদয়ের শত্রুকেও তিনি তার ক্ষমা ও সদ্ব্যবহারে পরম বন্ধু ও সেবাদাসে পরিণত করতে পারতেন।
স্বজাতি ও সুগোত্রের অনেকেই তাকে নবী হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তার প্রচার করা বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। অধিকন্তু তাকে ‘মিথ্যেবাদী’ ও ‘জাদুকর’ বলে বয়কট করেছে। একাধারে তের বছর তার ওপর অকথ্য নির্যাতন করেছে। একপর্যায়ে তাকে প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। সর্বোপরি দীর্ঘ সময় ধরে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। অথচ এত কিছুর পরেও দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। মক্কা বিজয়কালে তাদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘যাও, তোমাদের মুক্ত করে দেওয়া হলো।’
তার এই উদারতা ও মহানুভবতা ঠিক কোন পর্যায়ের ছিল সেটা তার এই কথার মাধ্যমেই অনুধাবন করা যায়। একদা সদাচার ও সম্পর্ক রক্ষার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই যারা আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আল্লাহ আমাকে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে আদেশ করেছেন। যারা আমার সাথে অন্যায় করে তাদের ক্ষমা করে দিতে বলেছেন এবং যারা আমাকে বঞ্চিত করে, তাদের দান করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ [২]
কুরআনে যে-সকল সুন্দর গুণের কথা বলা হয়েছে, তার সবই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাস্তব জীবনে ধারণ করেছিলেন। এজন্যই আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা তার সম্পর্কে বলেছেন-
كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ
কুরআন হচ্ছে তার চরিত্র। [১]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারও সাথে কোনো ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলে যে-কোনো উপায়ে তা পালন করতেন। তার শত্রুরা পর্যন্ত বলতে পারবে না যে, তিনি কোনো দিন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন অথবা কোনো চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন। তার চরিত্রের খুঁত ধরার জন্য এবং আচরণের ভুল বের করার জন্য শত্রুরা সারাক্ষণ তার পিছে লেগে থাকত। অথচ শত চেষ্টার করেও তারা তার কোনো ত্রুটি বা ভুল খুঁজে বের করতে পারেনি।
শান্তি কিংবা যুদ্ধে, খুশি কিংবা ক্রোধে, উদ্বেগ কিংবা নির্ভার সময়ে-সর্বাবস্থায়ই তিনি সত্যবাদিতা এবং বিশ্বস্ততার ওপর অবিচল ছিলেন। একবার তার সাথে এক লোকের নির্দিষ্ট একটি স্থানে সাক্ষাৎ করার কথা ছিল। তিনি সময়মতো সেখানে উপস্থিত হন; কিন্তু লোকটি আর আসে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ভেবে সেখানে তার জন্য তিন দিন অপেক্ষা করেন যে, লোকটা হয়তো এসে তাকে খুঁজবে এবং না পেয়ে ভীষণ কষ্ট পাবে। এমনই ছিলেন আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এমনই ছিল তার বিশ্বস্ততা!
বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতিতে তিনি ইহুদী ও মুশরিকদের সাথেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। যদিও এই দুই দল সারা জীবন তার বিপক্ষে লড়ে গেছে, তবুও তিনি কোনো দিন সন্ধির একটি কথাও এদিক-সেদিক করেননি। প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি ছিলেন আপসহীন। তার পক্ষে এই পর্যায়ের বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠা প্রদর্শন খুবই স্বাভাবিক ছিল। কারণ, তিনি যে-সত্যনীতি মেনে চলতেন, যে-শরীয়ত অনুযায়ী জীবন-যাপন করতেন, তা বিবেচনায় আনলে মানুষের চরিত্র এমন সুউচ্চ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তিনি মিথ্যের আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। চুক্তি ও অঙ্গীকার ভঙ্গের ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তিনি বলেছেন—
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلاثُ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি-কথা বললে মিথ্যে বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে খিয়ানাত করে।। [১]
অধিকন্তু মহান আল্লাহর পক্ষ হতে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে দেওয়া নির্দেশনায় তাকে বলা হয়েছে-
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا
এবং অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। [২]
الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ الْمِيثَاقَ
এরা এমন লোক, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে। অঙ্গীকার ভঙ্গ করেনা। [৩]
অতএব, যে-মহান সত্তা দয়া, ক্ষমা, কল্যাণকামিতা ও অন্য সকল মানবিক গুণে অনন্য-কেনই বা তার প্রশংসা করা হবে না?
টিকাঃ
১. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯
১. সূরা নাজম, আয়াত: ২
২. সূরা নাজম, আয়াত: ৩
৩. সূরা নাজম, আয়াত: ৪
৪. সূরা নামল, আয়াত: ৭৯
১. সূরা কালাম, আয়াত : ৪
২. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৯
৩. সূরা ফাতহ, আয়াত: ১
৪. সূরা ফাতহ, আয়াত: ২
১. সূরা শূরা, আয়াত: ৫২
২. সূরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭
৩. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭
১. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭
১. সূরা নাজম, আয়াত: ৫৯,৬০
২. সূরা নিসা, আয়াত : ৪
৩. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১৪৪
১. মুআত্তা মালিক: ৯৭৭, আল-কামিল লিবনি আদি: ৩/৯৭
১. সূরা হিজর, আয়াত: ৮৫
২. মিশকাতুল মাসাবীহ : ৫৩৫৮; তাফসীরে কুরতবী: ৭/৩৪৬
১. প্রাগুক্ত
১. সহীহ বুখারী: ৩৩/২৬৮২; সহীহ মুসলিম: ৫৯, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৪
৩. সূরা রাদ, আয়াত: ২০
📄 নবীজির বাগ্মীতা
وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغًا
তাদের সদুপদেশ দিন এবং এমন কথা বলুন যা তাদের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। [১]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়ান যে শুনেছে, সে জানে কতটা বিস্ময়কর আলংকারিক ছিল তার বয়ান। আল্লাহর শপথ, এখনো তার উদ্ধৃতি এক নিমিষেই মানুষের হৃদয়কে বন্দী করে ফেলে। তার শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস, উপস্থাপনা শৈলী এবং পরিমিতি বোধ মানুষকে বিমুগ্ধ করে। তার বক্তব্য সুসংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ। সংক্ষিপ্ত বাক্যে ও পরিমিত শব্দে তিনি গভীর বার্তা দিতে পারতেন। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন—
أُوتِيتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ আমাকে সারগর্ভ বাণী শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। [২]
অপর এক হাদীসে বলেন-
GG وَاخْتَصَرَ لِي الْكَلَامَ اخْتِصَارًا আমাকে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ভাষাজ্ঞান দিয়ে ধন্য করা হয়েছে। [১]
বস্তুত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা ছিল একদম মেদহীন ও বাহুল্যমুক্ত। তবুও হাদীসে উল্লিখিত তার উদ্ধৃতিগুলো জীবনের সব বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ইহকাল-পরকাল, অতীত-বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সব কিছুর বর্ণনাই আমরা সেখানে পাই। কেউ যদি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সত্যিকার বাগ্মীতা ও ভাষার সৌন্দর্যকে অনুধাবন করতে যায়, তাহলে অন্য যে-কারও সাথে তার কথা তুলনা করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে-বড় বড় কবি-সাহিত্যিকের ভাষাও তার সামনে দাঁড়াতে পারবে না। কেউ যদি কোনো গবেষকের উদ্ধৃতিসমৃদ্ধ বই পড়তে যায়, তাহলে পরিষ্কার দেখতে পাবে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী ও বক্তব্য সেখানে আলো ছড়িয়েছে এবং নিঃসন্দেহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্ধৃত বাণী সেই বইয়ের মান ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে। আর যদি তার কথাগুলোকে কোনো সুবক্তার সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, তাদের কথায় সামান্য হলেও কৃত্রিমতা ও বাহুল্য আছে, আর খুব বেশি হলে গড়পড়তা মানের।
অশিক্ষিত লোক, যে-কোনো দিন কোনো বই বা সাহিত্য পাঠ করেনি-এমন ব্যক্তি থেকে শুরু করে কবি, সাহিত্যিক, বিদ্বান, বিজ্ঞ শিক্ষক-সবাইকে যদি একত্র করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কিছু বাণী শোনানো হয়, তাহলে এদের সবাই একসাথে মুগ্ধ হবে। সমানভাবে তাদের হৃদয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভালোবাসার জালে আটকা পড়বে।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে কিছু উপদেশ দেবেন বলে মনোস্থির করেন। তিনি তাকে এমনভাবে বলতে চেয়েছিলেন, যেন তা একই সাথে সংক্ষিপ্ত ও জ্ঞানগর্ভ হয়। তাই তিনি বললেন-
اِتَّقِ اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ, وَاَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا, وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ
যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো। মন্দ কাজ করলে সাথে সাথে একটি ভালো কাজ করো। পরের কাজটি আগেরটাকে মুছে দেবে। আর মানুষের সাথে মিশলে উত্তম ও সদয় আচরণ করো। [১]
যে যত বড় বাকপটু হোক না কেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মতো করে সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থপূর্ণ কথা বলতে তার যথেষ্ট বেগ পেতে হবে—সারগর্ভ ভাব ধরে রাখতে গেলে, সংক্ষিপ্ততা হারিয়ে যাবে। তাকে এত সময় ধরে কথা বলতে হবে যে, শ্রোতা ধৈর্য ও আগ্রহ দুই-ই হারিয়ে ফেলবে। আবার সময় সংক্ষিপ্ত করতে গেলে অর্থের ভাব-গাম্ভীর্য নষ্ট হয়ে যাবে। তখন বাক্য অপচয় কম হলেও অর্থের প্রতি সুবিচার করা সম্ভব হবে না।
একদা উকবা ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, মুক্তি কীসে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বলেন—
أَمْسِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ
জিহ্বায় লাগাম দাও, তোমার ঘরকে তোমার জন্য যথেষ্ট মনে করো এবং কৃতপাপের জন্য ক্রন্দন করো। [২]
প্রিয় পাঠক, লক্ষ্য করুন, জটিল একটি প্রশ্নের উত্তরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাৎক্ষণিক উত্তর তিনটি কতটা সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ! কতটা সুবিন্নস্ত ও অর্থবহ! এই একই প্রশ্ন যদি অন্য কাউকে করা হতো, তাহলে হয়তো সে উত্তরের জন্য দীর্ঘ সময় প্রার্থনা করত, প্রস্তুতি নেই বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত কিংবা এমন একটি উত্তর দিত—যা সংক্ষিপ্ত একটি বাণী না হয়ে, দীর্ঘ একটি বক্তব্য অথবা রচনায় পরিণত হতো। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো প্রকার পূর্ব প্রস্তুতি ও লিখিত বক্তব্য ছাড়াই তাৎক্ষণিক, অথচ কত সুন্দর, অর্থবহ
ও তাৎপর্যপূর্ণ উত্তর দিলেন। একটা প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য সাধারণ মানুষের যে-প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, তিনি সে-সুযোগই পাননি। কারণ, প্রশ্নকর্তা এখনো তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। উত্তরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
কার্যত এটাই ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা বলার সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য। তিনি যা-ই বলতেন, তাতে কোনোরকম পূর্ব প্রস্তুতি থাকত না। অথচ কথাগুলো হতো নিখুঁت, নির্ভুল ও কালজয়ী। সবচেয়ে পারদর্শী বক্তাদের হাতে যদি সংলাপপত্র নাও থাকে তবুও তাদের কিছু-না-কিছু পূর্বপরিকল্পনা বা প্রস্তুতি থাকেই। কেউই হঠাৎ করে মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে একদম নির্ভুল, সংক্ষিপ্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলতে পারে না। অথচ দিনের পর দিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কাজটি নিখুঁতভাবে করে গেছেন। অবশ্য এটা মোটেও আশ্চর্যের কোনো বিষয় নয়। কারণ, তিনি যা বলতেন সব আসমানী জ্ঞানের আলোকে বলতেন।
একবার তিনি এবং ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু একসাথে কোথাও যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন-
"ইয়া গুলামু, ইন্নি উআল্লিমুকা কালিমাতিন; ইহফাযিল্লাহা ইয়াহফাযকা, ইহফাযিল্লাহা তাজ্বিদহু তুজাহাকা, ইযা সাআলতা ফাসআলিল্লাহ, ওয়া ইযাস্তাআনতা ফাস্তাঈম বিল্লাহ, ওয়ালাম আন্নাল উম্মাতা লাউজতামাত আলা আন ইয়াংফাউকা বিশাইয়িন লাম ইয়াংফাউকা ইল্লা বিশাইয়িন ক্বাদ কাতাবাহুল্লাহু লাকা, ওয়া ইন ইজতামাউ আলা আন ইয়াদুররুকা বিশাইয়িন লাম ইয়াদুররুকা ইল্লা বিশাইয়িন ক্বাদ কাতাবাহুল্লাহু আলাইকা, রুফিয়াতিল আকলামু ওয়া জাফফাতিস সহুফ। ওয়ালাম আন্নান নাসরা মাসসাবরি, ওয়া আন্নাল ফারাজা মাল কারবি, ওয়া আন্না মাল উসরি ইউসরা।"
আমি তোমাকে কিছু কথা শিখিয়ে দিচ্ছি—আল্লাহর হক ও অধিকার রক্ষা করবে, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। তার অধিকার রক্ষা করে চললে, দুঃসময়ে তুমি তাকে পাশে পাবে। কিছু চাইলে কেবল আল্লাহর কাছেই চাইবে। সাহায্য প্রার্থনা করলেও কেবল তারই কাছে প্রার্থনা করবে। আর মনে রেখো, যদি গোটা মানবজাতি তোমাকে সাহায্য করতে জড়ো হয়, তবুও আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে গিয়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারবে না। অনুরূপভাবে গোটা জাতি যদি তোমাকে ক্ষতি করতে উদ্যত হয় তবুও আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে গিয়ে তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে, লেখার কালি শুকিয়ে গেছে। আর জেনে নিয়ো, ধৈর্যের সাথেই রয়েছে বিজয়। দুঃখের সাথেই রয়েছে মুক্তি এবং কষ্টের সাথেই রয়েছে সুস্তি।১
কলেবরে কত ছোট্ট একটি কথা। অথচ এর অর্থ কত গভীর ও ব্যাপক! হাদীসের এই কথাগুলো মনে রাখার জন্য যথেষ্ট সংক্ষিপ্ত। অথচ এর মর্ম ধারণ করলে জীবনের সকল সমস্যা সহজেই সমাধান হয়ে যাবে; গুনাহ পরিহার করা সম্ভবপর হবে এবং জীবনকে সুখ ও নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে নেওয়া যাবে—শুধু মনে রাখতে হবে—'আল্লাহর হক ও অধিকার রক্ষা করবে, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন।'
এত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনঘনিষ্ঠ একটি উপদেশ—এর চেয়ে অল্প কথায় ব্যক্ত করা অন্যকারও পক্ষে সম্ভব নয়। উপদেশটির অবশিষ্ট অংশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই সারগর্ভ বাণীর সৌন্দর্য বুঝতে হলে অবশ্যই আরবী ভাষাজ্ঞান থাকতে হবে এবং মূল আরবী বক্তব্য সামনে রাখতে হবে।
এই হাদীসের মতো অন্যান্য হাদীসেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথার কারুকাজ খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিটি শব্দ যথাস্থানে এমনভাবে বসানো হয়েছে যে অন্য কিছু দ্বারা এর প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। একটি বাক্যেও কোনো প্রকার কৃত্রিমতা বা একঘেয়েমির ছোঁয়া নেই; বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাক্যের প্রতিটি শব্দ ও কাঠামো জুড়ে রয়েছে অনন্য সাবীলতা। এজন্য তার কথাগুলো সংক্ষিপ্ত; তবে সারগর্ভ। সরল; কিন্তু সুশোভিত। অতীতের অনেক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি হাদীস বর্ণনাকারীদের ত্রুটি দেখে নয়; বরং কোনো কথিত হাদীসের বর্ণনা ও শব্দচয়ন দেখেই হাদীসের দুর্বলতা নির্ণয় করতে পারতেন।
তারা এত এত হাদীস অধ্যয়ন করেছেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিখুঁত বচনভঙ্গির সাথে তারা একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। তারা বুঝে গিয়েছিলেন যে, দুর্বল কোনো বাক্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ থেকে বের হতে পারে না।
একটি হাদীসে আছে—
“ প্রতিটি কাজের ভালোমন্দ নিয়তের ওপর নির্ভর করে। মানুষ কাজের পূর্বে যে-নিয়ত করে তা-ই সে প্রাপ্ত হয়। ” [১]
সরল ও সংক্ষিপ্ত এই কথাটি শুধুই একটি বাণী নয়। এর সাথে ইসলামে মৌলিক বিশ্বাস-রীতি-নীতি ও বিধি-বিধান সংযুক্ত রয়েছে। বাক্যের সংক্ষিপ্ততা অর্থের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি; বরং জ্ঞানীদের জন্য তা হয়ে উঠেছে উপদেশ। সময়ের সাথে এটা হয়ে উঠেছে গবেষকদের মূলনীতি এবং কবি-সাহিত্যিকদের জন্য প্রায়শ ব্যবহার করা উদ্ধৃতি।
দুঃখের সময়ে মানুষের মনকে কথার দ্বারা সুস্তি প্রদানের এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর। তিনি এমন কিছু বলতেন-যাতে দুশ্চিন্তা দূরীভূত হয়, ভারাক্রান্ত মনও স্বস্তি ফিরে পায়। কখনো কখনো তিনি সংক্ষিপ্ত কথায় সুর-ছন্দও সৃষ্টি করতেন। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'সকল নবীর ভেতর আমাদের নবী হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ নীতির অধিকারী। আমার একজন ভাই ছিল। নাম ছিল আবু উমাইর। যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে এসেছিলেন খুব সম্ভবত তখন আবু উমাইর সদ্য মায়ের দুধ ত্যাগ করা শিশু ছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে উমাইর, 'কোথায় তোমার নুগাইর?।'
'নুগাইর' অর্থ ছোট পাখি। তাই পাখিটির নামের সাথে শিশুটির নামের ছন্দ মিলিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু উমাইরকে খুশি করতে চেয়েছিলেন। কারণ, তার পোষা পাখিটি মারা যাওয়ায় সে অনেক দুঃখ পেয়েছিল।' [১]
এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, কথার কারুকাজে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সেরাদের সেরা। আর সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব কুরআন তো তারই ওপর নাযিল হয়েছে-যার পূর্ণতা, মহিমা এবং ভাষার ব্যাপ্তি, গভীরতা ও মাধুর্য সমগ্র আরবকে করে ফেলেছিল বাকরুদ্ধ।
টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত: ৬৩
২. সহীহ বুখারী: ২৯৭৭; সহীহ মুসলিম: ৫২৩; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. বায়হাকী, শুআব: ১৪৩৬; উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; কাশফ আল খফা: ১/১৪-১৫
১. মুসনাদে আহমাদ: ২০৮৪৭, ২০৮৯৪; জামি তিরমিযী: ১৯৮৭; সুনানু দারিমী: ২৭৯১; মিশকাতুল মাসাবীহ: ৫০৮৩
২. মুসনাদে আহমাদ: ২১৭৩২, জামি তিরমিযী: ২৪০৬; ইবনু আবি আসিম, সহীহ আয-যুহদ: ১/১৫
১. মুসনাদে আহমাদ: ২৬৬৪, ২৭৫৮, ২৮০০; জামি তিরমিযী: ২৫১৬; মুসতাদরাকে হাকিম: ৬৩০৪, হাদীসটি ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; মিশকাতুল মাসাবীহ : ৫৩০২
১. সহীহ বুখারী: ১/৫৪; সহীহ মুসলিম: ১৯০৭; হাদীসটি উমার ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সহীহ বুখারী: ৬১২৯, ৬২০৩; সহীহ মুসলিম: ২১৫০, হাদীসটি আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
📄 সমাধান প্রদান
আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বলেন-
يَسْتَفْتُونَكَ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ
তারা আপনার কাছে জানতে চায়। আপনি বলুন, আল্লাহ তোমাদের জানান দিচ্ছেন। [১]
যে-কোনো জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি চাইলেই ফতোয়া জারি করতে পারে না। মুফতী বা বিচারক হতে গেলে কিছু বিশেষ দক্ষতা ও গুণাবলির প্রয়োজন হয়। জ্ঞান সেগুলোর একটি গুণ মাত্র, একমাত্র গুণ নয়। মুফতী ও বিচারককে অবশ্যই বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও তীক্ষ্ণ ধীসমৃদ্ধ হতে হবে। প্রত্যেক অবস্থার প্রেক্ষিতে আলাদা আলাদা ব্যবস্থাগ্রহণের প্রস্তুতি থাকতে হবে। প্রশ্নকর্তার বক্তব্য অনুধাবন করতে হবে। এ ব্যাপারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আল্লাহ তাআলা তাঁর স্বীয় রহমত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্য এবং অন্যান্য সুন্দর ও প্রয়োজনীয় গুণাবলি দ্বারা তাঁকে করেছিলেন সুসজ্জিত। যখন বিভিন্ন মানুষ তাঁর কাছে একই রকম অনুরোধ বা প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতো, তিনি সবার জন্য একই কথার পুনরাবৃত্তি করতেন না; বরং এমনভাবে উত্তর দিতেন-যা প্রশ্নকর্তার ইহকাল ও পরকাল-উভয় ক্ষেত্রেই উপকারে আসে।
যখনই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কেউ কোনো প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতো তিনি তার প্রেক্ষিতে এমন সব উত্তর দিতেন, যেন প্রশ্নকারীর চিন্তাধারা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আদ্যপান্ত সব তিনি মুখস্থ করে এসেছেন। এটা সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক তার ওপর বর্ষিত রহমত ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রশ্নকারীর জবাব তিনি এমনভাবে দিতেন যে, দুরূহ সমস্যারও সমধান হয়ে যেত। প্রশ্নকারী অমুসলিম হলে মুসলিম হওয়ার প্রেরণা লাভ করত। মোটকথা, তিনি এমন উপদেশই দিতেন, যাতে প্রশ্নকর্তা সকল সমস্যার সমাধান খুঁজে পেত।
একবার এক দুর্বল বৃদ্ধলোক নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হয়ে কিছু উপদেশ চাইলেন। তার বয়স ও দুর্বলতার কারণে তিনি বেশিক্ষণ সালাত পড়তে পারেন না। সিয়াম রাখতে পারেন না। অন্যান্য ইবাদাত-ও তেমন করতে পারেন না। হজ তো ছিল তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। তাই তিনি এমন ইবাদাতের সন্ধান করছিলেন, যাতে সামান্য পরিশ্রমে অসামান্য পুরস্কার পাওয়া যায়।
প্রশ্ন করার সময় এতকিছু তিনি উল্লেখ না করলেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঠিকই তার অবস্থা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি অতি সংক্ষেপে বললেন, 'আল্লাহর যিকিরে আপনার জিহ্বা যেন সব সময় আর্দ্র থাকে।'[১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে লোকটিকে এমন কিছু করতে দেননি, যাতে তার হাত-পায়ের ব্যবহার করতে হয় বা ভারী কিছু উঠাতে হয় কিংবা অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়; বরং যা তিনি করতে বললেন, তার জন্য সর্বোচ্চ জিহ্বা সঞ্চালন করতে হবে। কাজটি যেমন সহজ, তেমনই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বলার ভাব ও ভাষাও সহজ। তাই অতি সহজেই এটা মনে রাখা সম্ভব। এই একই প্রশ্ন যদি অন্য কাউকে করা হতো, তাহলে হয়তো সে এই বৃদ্ধ লোকটিকে এমন এমন কাজ করতে বলত-যা তার এই রুগ্ন শরীরে পালন করা একদমই সম্ভব হতো না।
এটা ছিল বৃদ্ধ লোকের প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপদেশ। এখন তাহলে শক্ত-সমর্থ্য যুবকদের প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপদেশ সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক। একদা গাইলান আস-সাকাফী রাযিয়াল্লাহু
আনহু নামের এক সুপুরুষ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আল্লাহর নিকটবর্তী হবার উপায় জানতে চান। নবীজি বৃদ্ধকে দেওয়া উপদেশের মতো এবারও সংক্ষিপ্ত, অথচ অর্থপূর্ণ ও সহজেই মনে রাখার মতো দেন; কিন্তু এই উপদেশটি আগেরবারের মতো অতটা সহজ ছিল না। পেশীবহুল গাইলান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি বলেন, 'আল্লাহর পথে জিহাদ করো।' তাই শক্তি ও সামর্থ্যের কথা চিন্তা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিম সৈন্যশিবিরে তার নাম লেখান। আর ইসলামের শত্রুদের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
আরেকবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু উপদেশ চেয়েছিলেন। তাকেও কি তিনি আল্লাহর পথে জিহাদ করতে কিংবা আল্লাহর যিকিরে জিহ্বা সর্বদা আর্দ্র রাখতে বলেছিলেন? নাহ, দুটোই আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় কাজ, তবে প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন শুনেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পেরেছিলেন যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে তিনি জানতে চাচ্ছেন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন- 'রাগান্বিত হয়ো না।' [১] এই ভিন্নধর্মী উপদেশের কারণ এই ছিল যে, আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রকৃতিগতভাবেই রাগী স্বভাবের ছিলেন। কাজেই ঠিক এরকম একটি উপদেশই আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রয়োজন ছিল। কারণ, এ উপদেশ ঠিকমতো পালন করতে পারলে তার এবং আশেপাশের সবার জীবনেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তাছাড়া সরল অথচ গভীর এই উপদেশটি যে শুধু আবু যরেরই উপকার করে থেমে গেছে-তা কিন্তু নয়; বরং আরও অনেকেরই তা কাজে এসেছে এবং এটা ইসলামের মৌলিক একটি নীতিতে পরিণত হয়েছে।
একবার আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পর্বতে আরোহণ করতে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'বলো-উচ্চারণ-লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ-আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো মৌলিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নেই'। কারণ, এই কথাটি জান্নাতের অমূল্য সম্পদ।'।খ [২]
এখন কথা হলো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে কেন এই উপদেশ দিলেন? কারণ, তিনি এমন একটি কাজ করছিলেন-যাতে প্রচন্ড শক্তি ও প্রচেষ্টার প্রয়োজন-যা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়। তাছাড়া নিজের কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে যে বিনম্রভাবে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে, আল্লাহর সাহায্য তাকে সঙ্গ দেয়। অধিকন্তু আল্লাহই সর্বশক্তিমান। একমাত্র সাহায্যকারী।
আল্লাহর বিশেষ রহমতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের দক্ষতা ও সামর্থ্য বুঝতে পারার এক আশ্চর্য ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। যে-মানুষটা যে-কাজের যোগ্য, তিনি তাকে সেই কাজটিই দিতেন। উদাহরণস্বরূপ, হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু-র কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি একজন ভালো মানের কবি ছিলেন। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইসলামের স্তুতি গেয়ে কবিতা লিখতে উৎসাহিত করেন। তিনি যাতে সিদ্ধ নন, তার ভার তাকে দেওয়া হয়নি। তাকে বলা হয়নি যে, লোকেদের বিবাদ মিটিয়ে দাও। বিচার করা তার বিশেষত্ব নয়-দেখে তাকে সেই দায়িত্বও দেওয়া হয়নি।
যে-সাহাবী অন্যদের থেকে বিচক্ষণ, তাকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিচারকার্যে নিয়োগ দিতেন। যিনি শারীরিকভাবে সবল তাকে তিনি সেনাশিবিরে যোগদান করতে বলতেন। যার ভেতর নেতৃত্ব প্রদানের গুণ ছিল তাকে তিনি প্রাদেশিক শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করতেন। আবার যে-সাহাবীর আচার-ব্যবহার ভালো, তাকে তিনি ইসলামী শিক্ষাদানে উৎসাহিত করতেন। যেমন, মুসআব ইবনু উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে মদিনাবাসীর ইসলামী জ্ঞান শেখানোর আদেশ করেছিলেন।
এভাবে যোগ্যতা বুঝে তিনি সবাইকে কাজে লাগাতেন। অধিকন্তু তাদের স্বভাববিরুদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকার জন্য সাবধানও করে দিতেন। যেমন আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেক বিষয়েই পারদর্শী হলেও নেতৃত্ব প্রদানের জন্য সঠিক ব্যক্তি ছিলেন না। হয়তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, তার ভেতর সহিমুতা ও অন্যান্য নেতাসুলভ আচরণের ঘাটতি রয়েছে। তাই আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে তিনি নেতৃত্বগ্রহণে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। তিনি আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে অনেক খেয়াল রাখতেন। তাই এমন কোনো দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করতে চাননি, যা তিনি বহন করতে অপারগ। কেননা, পুনরুত্থান দিবসে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার হিসেবও দিতে হতে পারে।
ইসলামে নেতৃত্ব বিশেষ কোনো সুবিধা বা অধিকার নয়; বরং বিরাট দায়িত্বকে নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার শামিল—যার হিসেব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। এ থেকেই বোঝা যায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতটা সুবিবেচনার সাথে সাহাবীদের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করেছিলেন এবং এটাই হওয়ার ছিল। কারণ, তার সম্পর্কে কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে—
إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
কুরআন ওহী—যা তাকে প্রত্যাদেশ করা হয়। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ইয়েমেনে প্রেরণ করার সময় জানিয়ে দেন—
❝
إِنَّكَ تَأْتِي قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
তুমি এমন জাতির কাছে যাচ্ছ—যারা আহলে কিতাব—তথা ইহুদী ও নাসারা। [২]
তাকে এ কথা বলার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, যাতে তিনি বুঝতে পারেন তাকে কাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে এবং কোন উপায়ে তাদের উপদেশ দিলে তারা তা গ্রহণ করতে পারে এবং হেদায়েত পেতে পারে।
একবার গাধার পিঠে সওয়ার অবস্থায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বান্দার প্রতি আল্লাহর হক এবং আল্লাহর প্রতি বান্দার হকের ব্যাপারে বোঝাচ্ছিলেন। সব কিছু তিনি সবিস্তারে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। কারণ, মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু শুধু একজন জ্ঞানী ব্যক্তিই নন; বরং তাকে দাওয়াতের কাজে অন্যদের নিকট প্রেরণ করা হচ্ছিল। তিনি একই সাথে একজন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং একজন বিচারক ছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি গাধার পিঠে অন্য কারও সাথে থাকতেন, যেমন ধরা যাক কোনো বেদুঈনের সাথে যাত্রা করতেন, তবে তাকে এত বিস্তারিত উপদেশ দেওয়া কোনো ফল বয়ে আনত না। অবশ্যই তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই ব্যক্তির উপযোগী কোনো উপদেশই প্রদান করতেন।
একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে হুসাইন ইবনে উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গমন করেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কয়জন দেবতার পূজা করো?।' হুসাইন জবাব দেন, 'আমি সাতজনের পূজা করি। একজন আকাশে থাকে। আর ছয়জন যমীনে থাকে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরপর জিজ্ঞাসা করেন, 'এদের মধ্য থেকে কার ব্যাপারে তুমি আশা ও ভয় পোষণ করো?।' উত্তরে তিনি বলেন, 'যে আসমানে থাকে, তার ব্যাপারে।' একথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তাহলে যমীনের দেবতাদের পরিহার করে শুধু আসমানে যিনি আছেন তারই ইবাদাত করো।' এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'বলো-
66
اللَّهُمَّ أَلْهِمْنِي رُشْدِي، وَأَعِذْنِي مِنْ شَرِّ نَفْسِي
হে আল্লাহ, আমাকে সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং আমাকে আমার প্রবৃত্তির অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন। [১]
উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসার আগে হুসাইন ইবনু উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সত্য থেকে অনেক দূরে ছিলেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। তাই তার অবস্থার প্রেক্ষিতে এই দুআ ছিল খুবই প্রাসঙ্গিক ও অত্যন্ত কার্যকর।
আরেকবার আলি ইবনু আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'বলো'-
66
اللَّهُمَّ اهْدِنِي وَسَدِّدْنِي
হে আল্লাহ, আমাকে হিদায়াত দান করুন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করুন।।খ [২]
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অবস্থার প্রেক্ষিতে এই দুআ ছিল যথোপযুক্ত। কারণ, তিনি অন্যান্য সাহাবীদের চেয়ে যথেষ্ট দীর্ঘায়ু পেয়েছিলেন। তিনি এমন যুগ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন যখন ফিতনার পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল এবং সত্যকে মানুষের কাছ থেকে গোপন করা হচ্ছিল। তাই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দিক নির্দেশনা চেয়ে কঠিন মেঘাচ্ছন্ন সময়ে আলোর পথ দেখতে পাওয়াটা তার জন্য জরুরি ছিল।
সুতরাং, সকল প্রশংসা আল্লাহর-যিনি তার রাসূলকে সত্য, সুন্দর ও চিরকল্যাণের পথ দেখিয়েছেন। তিনি স্বীয় দয়াগুণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মানুষের যোগ্যতা বিচার করার জ্ঞান দান করেছেন, তার মাধ্যমে তাদের যথার্থ ও সর্বোত্তম উপদেশ প্রদান করেছেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবিদের পছন্দ করতেন না। কারণ, সাধারণত কবিরা যা জানে না তাই নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে। উদ্দেশ্যহীনভাবে পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায়। শব্দের কল্পরাজ্যে বিচরণ করে। তাদের মনগড়া কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে তারা যা বলে, তা শুনলে বাস্তবতা বিবর্জিত অনেক কিছুই মনের আয়নায় ভেসে ওঠে। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব অসার কথা ও কল্পনাবিলাস অপছন্দ করতেন। নিজেকে এ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখতেন। অন্যদেরকেও নিরুৎসাহিত করতেন। নিজে সত্যভাষণ দিতেন। অন্যদেরও সত্যভাষণে উদ্বুদ্ধ করতেন। একারণেই তার প্রতিটি কথা ওহীর মর্যাদা লাভ করেছে।
যে-সকল রাজনীতিবিদ তোষামোদ ও মিথ্যে প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে মানুষের মন রক্ষার চেষ্টা করে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মতো ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন সবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, তিনি আল্লাহর প্রেরিত দূত। একজন বিশিষ্ট নবী ও রাসূল-যাকে মহান আল্লাহ আপন ব্যবস্থাপনায় অসৎ কাজ ও অশুভ চিন্তা থেকে পবিত্র ও নিরাপদ রেখেছেন। তিনি এসেছিলেন প্রজ্ঞানির্ভর ও নীতিসমৃদ্ধ সত্য দ্বীনের সংবাদ নিয়ে। তিনি এমন কোনো লেখক, গবেষক বা দার্শনিক ছিলেন না, যাদের জ্ঞান কেবল নিজেদের অভিজ্ঞতা, অন্য লেখকদের মতামত কিংবা দার্শনিকদের চিন্তার ওপর নির্ভর করে; বরং তিনি যা বলতেন, সরাসরি আল্লাহর সূত্রে বলতেন-যিনি জ্ঞান ও সৃষ্টির একমাত্র উৎস।
টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত: ১২৭
১. মুসনাদে আহমাদ: ১৭২২৭, ১৭২৪৫; জামি তিরিমিযী: ৩৩৭৫; সুনান ইবনি মাজাহ: ৩৭৯৩; মিশকাতুল মাসাবীহ : ২২৭৯
১. সহীহ বুখারী: ৬১১৬; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ বুখারী: ৪২০৫, ৬৬১০; সহীহ মুসলিম: ২৭০৪; হাদীসটি আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা নাজম, আয়াত: ৪
২. সহীহ বুখারী: ১৪৫৮, ১৪৯৬; সহীহ মুসলিম: ১৯, ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. জামি তিরিমিযী: ৩৪৮৩; লালকাঈ ১১৮৪; হাদীসটি ইমরান ইবন হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; মিশকাতুল মাসাবীহ: ২৪৭৬
২. সহীহ মুসলিম: ২৭২৫