📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 নবীজির কান্না

📄 নবীজির কান্না


কান্না ভালো, না মন্দ? পুরুষের চোখে অশ্রু শোভা পায়, না পায় না? কান্না কি মেয়েলি স্বভাবের বহিঃপ্রকাশ? -সে ব্যাপারে অনেকে সন্দিহান হলেও এতটুকু সুনিশ্চিত সত্য যে, সব সময় চোখের জল ফেলা কাম্য নয়; প্রশংসনীয় তো কিছুতেই নয়; বরং ক্ষেত্রবিশেষ অবশ্যই তা পৌরুষের বিপরীত, কিংবা নিতান্তই বোকামি।
তারপরও জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন অশ্রু সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। সে-সব মুহূর্তে বরং কান্নাই স্বাভাবিক, সহজাত ও প্রশংসনীয়।
আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনরত চোখের চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে? বস্তুত নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাওয়া এবং আল্লাহর স্মরণে অশ্রু বিসর্জন দেওয়া একটি মহৎ গুণ। অনুশোচনা ও পবিত্রতার বহিঃপ্রকাশ। এ অবস্থায় চোখের জল প্রশংসার দাবি রাখে। এমন দামি অশ্রুজলের প্রশংসা করে মহান আল্লাহ বলেন—
إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا
তাদের কাছে যখন দয়াময় আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং ক্রন্দন করে। [১]
وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا
তারা ক্রন্দন করতে করতে অবনত মস্তকে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়ভাব আরও বৃদ্ধি পায়। [১]
وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ
আর তারা রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যখন শোনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রুপূর্ণ দেখতে পাবেন; এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনতে পেরেছে। [২]
অপরদিকে কঠোর হৃদয় ও কঠিন স্বভাবের লোকদের তিরস্কার করে বলেন-
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ ۞
তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? হাসছ? কাঁদছ না?[৩]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হৃদয় ছিল অত্যন্ত কোমল। তিনি আল্লাহকে সর্বাধিক ভালোবাসতেন। সর্বাপেক্ষা বেশি ভয় করতেন। তাঁর ভয় ও ভালোবাসায় অশ্রু বিসর্জন দিতেন। পরকালের চিন্তা, জাহান্নামের বর্ণনা, আল্লাহর শাস্তির ভয়—সব কিছুই তাঁর চোখকে অশ্রুসজল করে তুলত। কুরআন তিলাওয়াতের সময় প্রায়ই তাঁকে চোখের পানি ফেলতে দেখা যেত। তাঁর এ কান্না সাহাবীদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলত।
এক রাতের ঘটনা। হঠাৎ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুম থেকে উঠে সালাতে দাঁড়িয়ে যান এবং নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করে কাঁদতে কাঁদতে সারাটা রাত কাটিয়ে দেন—
إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمِ
যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার বান্দা। (সুতরাং, শাস্তি দিতেই পারেন।) আর যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞ।১। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার ইবনু মাসউদকে বলেন, 'আমাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাও।' ইবনু মাসউদ উত্তর দেন, 'আমি আপনাকে শোনাবো! কুরআন তো আপনার ওপরই অবতীর্ণ হয়! নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তুমি তিলাওয়াত করো। অন্যের তিলাওয়াত শুনতে আমার খুব ভালো লাগে।' এ কথা শুনে ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সূরা নিসা তিলাওয়াত করতে শুরু করেন। যখন এই আয়াতে এসে পৌঁছেন-
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا
অতঃপর, যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব তখন কী অবস্থা হবে? [২]
তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'থামো, আপাতত এটুকুই তোমার জন্য যথেষ্ট।' এর পরবর্তী অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তিলাওয়াত শেষ করে আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখি, তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।' [৩]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই এভাবে অন্যের তিলাওয়াত শুনতেন। তিলাওয়াত শুনে হতবিহ্বল হয়ে যেতেন। একরাতে তিনি অত্যন্ত চুপিসারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর তিলাওয়াত শোনেন। পরদিন
সকালে তাকে ডেকে বলেন, 'আমি গতরাতে তোমার তিলাওয়াত শুনে মুগ্ধ হয়েছি। তোমাকে তো দাউদ আলাইহিস সালাম-এর কণ্ঠসুর দেওয়া হয়েছে! আচ্ছা, তুমি যদি আমার উপস্থিতি আঁচ করতে পারতে তাহলে কী করতে? আবু মূসা আশআরী বলেন, 'যদি আমি জানতাম, আপনি আমার তিলাওয়াত শুনছেন, তাহলে আরও সুন্দর করে তিলাওয়াত করার চেষ্টা করতাম।'[১]
সহীহ সূত্রে বর্ণিত অপর একটি হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু শিখখীর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'একবার আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে যাই। গিয়ে দেখি, তিনি সালাত আদায় করছেন। কান্নাজনিত কারণে তার বুক থেকে ফুটন্ত ডেকের মতো শব্দ হচ্ছে—তিনি শিশুদের মতো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন।'
আরেক দিনের ঘটনা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় কন্যা যাইনাব রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর জানাযায় উপস্থিত হন। জানাযার পর তিনি যখন মাইয়িতকে কবরে রাখার জন্য ভেতরে প্রবেশ করেন তখন কবরের সংকীর্ণতা দেখে এবং ভয়াবহতা চিন্তা করে তার চোখদুটো অশ্রু-ছলছল হয়ে ওঠে। কারণ, তিনি মৃত্যু, মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থা এবং জান্নাত-জাহান্নামের অনন্ত জীবন সম্পর্কে জানতেন। তাই তার চোখজুড়ে অশ্রুর বাঁধভাঙা জোয়ার নেমে আসে। নবীজির এই কান্না দেখে সাহাবীগণ শিউরে ওঠেন। কারণ, তারা জানতেন, যার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়েছে, তিনিই যদি এভাবে কাঁদেন, তবে তাদের এর চেয়েও বেশি কাঁদতে হবে!
তাই আল্লাহর জন্য ক্রন্দন করার এই মহৎ গুণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়ে গেছেন এবং ক্রন্দনের অনন্য সাধারণ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করে আমাদের উৎসাহিত করেছেন। হাশরের ময়দানে আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। আর সেই আরশের নিচে সাত শ্রেণির লোক ছাড়া আর কেউ জায়গা পাবে না। সেই সাত শ্রেণির একটি শ্রেণির বর্ণনা দিতে গিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'এবং ওই ব্যক্তি সেই ছায়ায় আশ্রয় পাবে—যে নিভৃতে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়।' [২]
অপর এক হাদীসে এসেছে-
GG عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ : عَيْنُ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ الله، وَعَيْنُ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِي سَبِيلِ الله
দুই প্রকারের চোখকে জাহান্নামের আগুন কোনো দিন স্পর্শ করতে পারবে না। এক. যে-চোখ আল্লাহর ভয়ে কাঁদে। দুই. যে-চোখ দ্বীন রক্ষায় জিহাদের ময়দানে বিনিদ্র জেগে থাকে।
যে-চোখ আল্লাহর ভয়ে ভিজে ওঠে, সৃষ্টির নিদর্শন দেখে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আর্দ্র হয়ে ওঠে, বিচার দিবসে আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার ভয়ে ছলছল হয়ে ওঠে-সে-চোখ আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। সে-চোখের অশ্রু ইসলামে প্রশংসনীয়। কারণ, এই চোখ, এই অশ্রু এবং এই কান্নাই নিজেকে আল্লাহর হাতে সঁপে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম। কাজেই পাপের অনুশোচনা থেকে যে-কান্না আসে, সে-কান্না সবচেয়ে দামি। আল্লাহর শাস্তির ভয়ে এবং আখিরাতের চিন্তায় যে-চোখের পাতাদুটো ভিজে ওঠে সে-চোখ সবচেয়ে মহান। ঈমান ও আনুগত্যের স্বল্পতার কথা ভেবে মনের গভীরে যে-শূন্যতা তৈরি হয়, চোখের কোণে যে-মেঘ জমা হয় সেই শূন্যতা ও অশ্রুবৃষ্টি সবচেয়ে প্রশংসনীয়।
কিন্তু পার্থিব কোনো কিছুর জন্য কান্না মোটেও প্রশংসনীয় নয়। ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ায় কোনো কিছু না পাওয়া, কিংবা অবাঞ্ছিত কিছু পেয়ে দুঃখ করতে থাকা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। পৃথিবী এবং পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিতান্তই খেলার সামগ্রী। একেবারেই তুচ্ছ বস্তু। কাজেই এর জন্য কান্না ও অশ্রুপাত গ্রহণযোগ্য নয়; পৌরুষের পরিচয় তো কিছুতেই নয়।
উল্লেখ্য যে, কান্নার ক্ষেত্রেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুসরণীয়। কারণ, তিনি নিজেও আল্লাহকে ভালোবেসে ভয় করতেন; তাঁর শাস্তির কথা চিন্তা করে ক্রন্দন করতেন। তিনি জানতেন, পার্থিব-জীবনই শেষ নয়; বরং অনন্ত জীবনের শুরুমাত্র। এই জীবন পুণ্যময় হলে আখিরাতের জীবন সুখময় হবে। তাই তিনি সেই অনন্ত জীবনের কথা ভেবে কাঁদতেন।
দুনিয়াবাসীর নিকট যা চরম আকাঙ্ক্ষিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তা মূল্যহীন। সম্পত্তি অর্জনে ব্যর্থতা, প্রেমাষ্পদকে বিয়ে করতে না পারার
মনস্তাপ কিংবা ব্যবসায় ক্ষয়ক্ষতি-কোনো দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কান্নার কারণ হতে পারেনি। এমনকি তার চিন্তায়ও আসতে পারেনি। কখনো যদি তার মন দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত, চোখজোড়া আর্দ্র হয়ে উঠত তবে সেটা একান্তই মহান আল্লাহর জন্য হতো। আর যদি কান্নার পরিবর্তে মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠত তবে সেটাও কেবল তার রবের সৌজন্যেই হতো। একারণেই তার জীবনের প্রতিটি আচরণ, উচ্চারণ এমনকি মৌন আচরণও আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন-
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। [১]
কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যক্তির কান্নাকাটি দেখে কারও মনে দয়ার উদ্রেগ হয় না; বরং ভণিতা মনে হয়। মানুষের কাছে এ ধরনের কান্না মূল্যহীন; কিন্তু উন্নত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কান্না ছিল খাঁটি। হৃদয় নিংড়ানো। চোখ জুড়ানো। তার কান্নার প্রভাব ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তার কান্না সাহাবীদের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করত। তাই নবীজিকে কাঁদতে দেখলে তারাও কেঁদে ফেলতেন। তিনি যখন মিম্বরে দাঁড়িয়ে পুনরুত্থান দিবসের বর্ণনা দিতেন তখন কেঁদে ফেলতেন। তার কান্নাবিজড়িত সকরুণ বর্ণনায় সাহাবীগণও কাঁদতেন। তাদের কান্না গুমোট মেঘের মতো মসজিদময় গুঞ্জরিত হতো।
একই ভাবাবেগ সবাইকে আচ্ছন্ন করে ফেলত। কেউ-ই এই কান্নার প্রভাব এড়াতে পারত না; আবেগ সামলাতে পারত না।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কান্না মানুষকে ছুঁয়ে যেত। কারণ, তার হৃদয়ে ছিল আল্লাহর প্রতি সর্বোচ্চ ভয় ও সীমাহীন ভালোবাসা। কাজেই তার অশ্রুর প্রতিটি ফোঁটা যেন কথা বলে উঠত। প্রেম ও ভয়ের পাঠ দিত। অশ্রুর এই নীরব পাঠ বাগ্মী বক্তাদের সাহিত্যপূর্ণ ভাষণের চেয়েও বেশি আবেদনময় হতো। বেশি হৃদয়গ্রাহী হতো।
হে আল্লাহ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার পরিবার-পরিজন ও সাহাবাদের আমাদের সালাম পৌঁছে দিন।

টিকাঃ
১. সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৮
১. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ১০৯
২. সূরা মায়িদা, আয়াত: ৮৩
৩. সূরা নাজম, আয়াত: ৫৯-৬০
১. সূরা মায়িদা, আয়াত: ১১৮
২. সূরা নিসা, আয়াত: ৪১
৩. সহীহ বুখারী: ৪৫৮২, ৫০৫৫; সহীহ মুসলিম: ৮০০, হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সুনানু কুবরা: ৪৪৮৪, ২০৮৪১; শুআব: ২৬০৪
২. সহীহ বুখারী: ৬৬০, ১৪২৩, ৬৮০৬; সহীহ মুসলিম: ১০৩১, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা আহযাব, আয়াত: ২১

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 প্রাণজুড়ানো হাসি

📄 প্রাণজুড়ানো হাসি


সুন্দর হাসি হৃদয়ে শান্তির প্রলেপ দিয়ে দেয়। কঠোর পরিশ্রমের পর মনে স্বস্তি এনে দেয়। হাসিতেই স্বভাবের অভিপ্রকাশ ঘটে। খাঁটি ও পবিত্র হৃদয়ের পরিচয় মেলে। কাজেই মনে স্থিরতা আনতে এবং চারপাশে আনন্দ বিলাতে হাসির কোনো বিকল্প নেই।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে প্রবেশ করে পরিবারের সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। কখনো হাস্যরসপূর্ণ গল্প বলে শোনাতেন। নিজেও শুনতেন। তার উপস্থিতি ছিল সবার জন্য আশীর্বাদ। কথা ছিল মধুময়। ব্যবহার ছিল অমায়িক। আর কেনই-বা এমন হবে না? তিনি তো প্রেরিত-ই হয়েছেন মানবজাতির শান্তি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে। কাজেই তার হাসিতে কল্যাণের বারিধারা বর্ষিত হতো।
আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোনো ব্যক্তির কল্যাণময় হাসি ও সদাচারের সবচেয়ে বড় হকদার হলো তার পরিবার ও কাছের মানুষ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। কাজেই যারা সব সময় তার হাসিমুখ দেখে চোখ জুড়িয়েছে; হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসায় বিমোহিত হয়েছে এবং মনোমুগ্ধকর আচরণে প্রীত ও কৃতজ্ঞ হয়েছে—তাদের চেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান আর কে হতে পারে?
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রিয়জনের মনোরঞ্জনের জন্য কখনো কখনো কৌতুক করতেন। কৌতুকের সময় খেয়াল করতেন, বিষয়বস্তু মজার হলেও যেন তাতে মিথ্যের অনুপ্রবেশ না ঘটে। কাজেই তিনি যা-ই বলতেন, সত্য বলতেন। কাউকে হাসানোর জন্যও তিনি কোনো দিন মিথ্যের আশ্রয় নেননি। মমতাময়ী মা
যেমন পরম যত্নে সন্তানদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, সাহাবীগণ ঠিক সেই মমতা খুঁজে পেতেন তার পবিত্র ও স্নেহসিক্ত হাসিতে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এমন আচরণে তারা খুজে পেতেন নব উদ্যম। নতুন তেজে, নতুন শক্তিতে তাদের দেহ-মন ভরে উঠত।
আল্লাহর শপথ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মজলিসে কেউ কোনো পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার জন্য উপস্থিত হতো না। আল্লাহ ও তার রাসূলে সন্তুষ্টি ছাড়া কারও মনে কোনো সুপ্ত বাসনা থাকত না। তার কাছে গেলে স্বর্ণ-রৌপ্য, হীরা-জহরতের মালিক হওয়া যাবে-এই আশায় কেউ তার কাছে যেত না; বরং স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থিতিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পরম পাওয়া।
জারীর ইবনু আব্দিল্লাহ বাজালী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'এমনটা কোনো দিন হয়নি যে, আমার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দেখা হয়েছে, অথচ তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসেননি।'
উল্লেখ্য যে, জারীর রাযিয়াল্লাহু আনহু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন নির্মল হাসি। হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও অফুরন্ত উচ্ছ্বাস। তার কাছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখের একটুখানি হাসিই ছিল সমগ্র পৃথিবীর সমস্ত কিছুর চেয়ে বেশি মূল্যবান। এর চেয়ে মূল্যবান স্মৃতি আর কিছুই হতে পারে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখের এই এক চিলতে হাসি জারীর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অন্তরকে পূর্ণ করে দিত। হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ তুলত। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই হাসির মূল্য সমকালীন সকলেই অনুভব করত।
প্রিয় পাঠক, চাইলে আপনিও এর মূল্য উপলব্ধি করতে পারবেন। একটু কল্পনা করুন তো, আপনার পরমপ্রিয় কোনো ব্যক্তি অথবা জগদ্বিখ্যাত কোনো ব্যক্তিত্ব আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। তিনি এই মুহূর্তে আপনার সঙ্গে কথা বলছেন। আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছেন-আপনি এখন কতটা খুশি হবেন! নিশ্চয় এই আশ্চর্যজনক ঘটনা আপনার স্মৃতির পাতায় চিরকালের জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পার্থিব-জীবনে সফল সাধারণ একজন মানুষের সাক্ষাতেই যদি আপনার এই অবস্থা হয়-তবে একবার ভাবুন তো, বিশ্ব জাহানের পালনকর্তার প্রেরিত রাসূল যদি আপনার সাক্ষাতে আসে এবং আপনার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে
থাকে তখন আপনার অবস্থা কেমন হবে? প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাক্ষাতে জারীর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অবস্থাও ঠিক এমনই হয়েছিল। কাজেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাসি-কেন্দ্রিক তার অভিব্যক্তি মোটেও অত্যুক্তি নয়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসি-ঠাট্টা, ক্রীড়া-কৌতুক-সব কিছুতেই ছিলেন মধ্যপন্থী। তার স্বভাব ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। তার অবস্থা ওই বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির মতো ছিল না; যার মুখে সারাক্ষণ মেকি হাসি লেগে থাকে, যে-জীবনকে গুরুত্বের সাথে না নিয়ে সারাক্ষণ খেল-তামাশায় মত্ত থাকে। হাসির সময়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসতেন। কান্নার সময়ে কাঁদতেন। রেগে যাবার মতো অবস্থা হলে রাগান্বিত হতেন। তবে কখনোই অট্টহাস্যে লিপ্ত হতেন না। তার হাসিতে ঠোঁট ঈষৎ প্রকম্পিত হতো; কিন্তু শরীর কাঁপত না। অধিকন্তু তিনি বলেন-
GG لَا تُكْثِرُوا الضَّحِكَ ، فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ
হাসির ব্যাপারে সাবধান। অবশ্যই অতিরিক্ত হাসির কারণে অন্তর মরে যায়। [১]
তিনি সাহাবীদের সাথে রহস্য করতেন। একবার এক ব্যক্তি এসে তার কাছে নিবেদন করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার কাছে আরোহণের উপযোগী একটি উট চাই।' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'এই মুহূর্তে আমি তোমাকে কেবল উটের একটি বাচ্চাই দিতে পারব।' নবীজির এই কথায় হতাশ ও মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে লোকটি চলে যেতে উদ্যত হয়। এমন সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে পেছন থেকে ডেকে বলেন, 'সব উট-ই তো কোনো-না-কোনো উটের বাচ্চা।'
আরেক দিনের ঘটনা। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবা- পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন। এমন সময় এক বৃদ্ধা এসে নিবেদন করেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমার জন্য জান্নাতের দুআ করুন। তখন আল্লাহর রাসূল বলেন-'কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' এ কথা শুনে বৃদ্ধা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং একবুক হতাশা নিয়ে ফিরে যেতে থাকেন। এমন সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডেকে বলেন, আপনি কি মহামহিম আল্লাহর এই ঘোষণাটি শোনেননি- [১]
إِنَّا أَنشَأْنَاهُنَّ إِنشَاءً فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا عُرُبًا أَتْرَابًا *
আমি জান্নাতী রমণীগণকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের করেছি চিরকুমারী। কামিনী, সমবয়স্কা। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাসি ছিল রবের প্রতি তার আনুগত্যেরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি কখনো কোনো দিন আমাদের অনেকের মতো অযথা, অকারণে হাসেননি। একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফরের উদ্দেশ্যে তার বাহনের পিঠে সওয়ার হন। অতঃপর এই দুআ পড়েন-
G اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي ، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ হে আল্লাহ, আমার পাপরাশি ক্ষমা করুন। আপনি ছাড়া আর কোনো ক্ষমাকারী নেই।'
দুআটি পড়েই তিনি হাসতে শুরু করেন। তার এই অসংলগ্ন হাসি দেখে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি হাসছেন যে?।' উত্তরে তিনি বলেন-'যখন কোনো বান্দা বলে- 'হে আল্লাহ, আমার পাপরাশি ক্ষমা করুন। আপনি ছাড়া আর কোনো ক্ষমাকারী নেই।' তখন আল্লাহ হেসে দিয়ে বলেন-'আমার বান্দা জানে, আমি ছাড়া আর কোনো ক্ষমাকারী নেই। [৩]
একদা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের জাহান্নাম থেকে নাজাত পাওয়া শেষ ব্যক্তির গল্প শোনাচ্ছিলেন। সেই ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে আল্লাহর কৃপা ও অনুকম্পা চাইতে থাকবে। এমন করতে করতে একসময় লোকটি জানতে পারবে যে, আল্লাহ তাকে চাহিদার চেয়েও
দশগুণ বেশি নিয়ামত দান করতে যাচ্ছেন। এই কল্পনাতীত সুসংবাদে সে হতবিহ্বল হয়ে পড়বে এবং মহান আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলবে, 'এই বিশাল আশা দেখিয়ে আপনি কি আমার সাথে মশকরা করছেন? অথচ আপনি বিশ্বচরাচরের একমাত্র প্রভু।' এই ঘটনা বলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসতে শুরু করেন।
মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সর্বদা সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। এর ফলে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময় অবস্থার প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। খুশির সময়ে কিংবা অবসরে হাস্যরস করতে পছন্দ করতেন। দ্বীনের কথা বয়ান করার সময় গাম্ভীর্য বজায় রাখতেন। আল্লাহর ভয়ে ও ভালোবাসায় চোখ দুটো সজল হয়ে উঠত। সত্যিকার অর্থেই তিনি ছিলেন সম্মানিত ও আশীর্বাদপুষ্ট। এ কারণে তার হাসি-কান্না, আনন্দ-বিনোদন এবং উপদেশ-দান ও সতর্কীকরণ-সব কিছুই উম্মাহর অনুসরণীয় সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় হাদীসে বর্ণিত ও সংরক্ষিত হয়েছে। তার পবিত্র হাসিও সংরক্ষণ-নীতির আওতার বাইরে পড়েনি। হাদীস সংকলকগণ শুধু তার হাসির ধরন ও কারণ জানার জন্য প্রয়োজনে শত শত মাইল পাড়ি দিতেন। সংকলকগণের এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও ভালোবাসার কারণে তার হাসি পর্যন্ত দলীলে লিপিবদ্ধ হয়েছে-যা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কাছে সমাদৃত ও অনুসৃত।
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদা এতটাই সমুন্নত করেছেন যে, তার ক্রীড়া-কৌতুক ও হাসি-আনন্দের গল্পগুলোও সংকলক ও বর্ণনাকারী পরম্পরায় এমনভাবে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে, যেন আমরা বুঝতে পারি-হাস্যোজ্জ্বল থাকাটা আমাদের ওপর রীতিমতো আবশ্যক! হে মহান রাব্বুল আলামীন, যতদিন পর্যন্ত ভোরে সূর্য উদিত হবে, সন্ধ্যায় অস্ত যাবে; ততদিন পর্যন্ত প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার পরিবার-পরিজন এবং তার সাহাবী ও অনুসারীদের ওপর অনবরত শান্তি বর্ষণ করুন।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৮০৩৪; জামি তিরিমিযী: ২৩০৫; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২১৭, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, জান্নাতে প্রবেশের আগে বৃদ্ধাদেরও কুমারী বানানো হবে। এরপর জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে。
২. সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৩৫-৩৭
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৯৩২, সুনানু আবি দাউদ: ২৬০২. সনান্ তিরমিযী: ৩৪৪৬ ও

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 নবীজির বীরত্ব

📄 নবীজির বীরত্ব


দৈহিক গঠনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন একজন সামর্থ্যবান সুপুরুষ। বীরত্ব ও অসম সাহসিকতা তার পৌরুষ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করতেন না। তার সময়কালে যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও দুঃসাহিসক ব্যাপার। যুদ্ধ ও যুদ্ধের পরিণতি সব সময় ভয়ঙ্কর হলেও তৎকালের যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর। কেননা, তখন যোদ্ধারা একে অপরের দিকে দূর থেকে গুলি ছুঁড়ে মারত না; বরং উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে সম্মুখযুদ্ধে পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। যুদ্ধে গর্দান কাটা পড়ত। তলোয়ারের আঘাতে হাত-পা ঝুলে থাকত। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। তাদের শরীরে, কাপড়ে, বর্মে রক্তের দাগ লেগে থাকত-রক্তের বন্যায় ময়দান ভেসে যেত।
এরকম অবস্থায় স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, সে বীর না হয়ে পারে না। আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শৈশবেই এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। পরিণত বয়সে বহু যুদ্ধে সম্মুখে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শত্রুর ভয়ে কখনোই লুকিয়ে থাকেননি। সহযোদ্ধাদের ঢাল বানিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি; বরং অধিকাংশ যুদ্ধেই সম্মুখসারিতে অবস্থান নিয়েছেন। সহযোদ্ধাদের পেছনে ফেলে শত্রুবাহিনীর কেন্দ্রীয় শক্তিতে আঘাত হেনেছেন।
তার সাহসিকতা প্রমাণের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তিনি কোনো দিন রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেননি। এমনকি পশ্চাদপদও হননি। যখন অন্যরা শত্রুর তীব্র আক্রমণে কয়েক কদম পিছু হটে রক্ষণশীল হয়ে উঠত, তখনও নবীজি সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। শত্রুপক্ষকে এক ইঞ্চি মাটিও ছেড়ে দিতেন না।
কখনো কখনো তিনি বাহিনীর মধ্যভাগে থেকে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করতেন। যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সৈন্যদের দিক-নির্দেশনা দিতেন; কিন্তু যুদ্ধ যখন ভয়াবহ রূপ নিত, চারিদিকে রক্তের স্রোত বইতে শুরু করত; একের পর এক লাশ পড়তে থাকত, যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ কোনো দিকে মোড় নেওয়ার উপক্রম হতো, তখন বীরবিক্রমে বাহিনীর একদম সম্মুখে গিয়ে যুদ্ধ করতেন। তাঁর স্নায়ু থাকত নির্ভার। আল্লাহর ওপর ভরসা থাকত অবিচল।
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সঙ্গে করে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকালে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গুহায় আশ্রয় নেন। তাঁরা তখন নিরস্ত্র। ওদিকে বাইরে অপেক্ষমাণ মুশরিকদের হন্তারক-বাহিনী। তাদের হাতে ছিল কোষমুক্ত তরবারি। চোখেমুখে ছিল রক্তের লাল নেশা। এ অবস্থায় আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চেহারায় ভয়ের ছাপ দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে ওঠেন, 'হে আবু বকর, এমন দুই ব্যক্তির ব্যাপারে তোমার কী ধারণা-যাদের তৃতীয়জন হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ?' [১] চরম বিপদের মুহূর্তে এমন অভয়বাণী উচ্চারণ করা নিঃসন্দেহে চূড়ান্ত সাহসিকতার অভিপ্রকাশ।
হুনাইন-যুদ্ধে প্রথম দিকে মুসলিম-বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। মাত্র ছয়জন সাহাবী তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে অবস্থান করে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একটি খচ্চরের পিঠে চড়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত্রুবাহিনীর দিকে ধাবিত হতে থাকেন। অথচ শত্রুবাহিনী ছিল সংখ্যায় প্রচুর-অস্ত্রশস্ত্র ও লৌহবর্মে সুসজ্জিত। এতদসত্ত্বেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের দিকে ছুটে যান এবং একমুষ্টি বালু নিয়ে শত্রুদের দিকে নিক্ষেপ করে বলেন—'তোমাদের চেহারাগুলো কুৎসিত হয়ে যাক।' [২]
আল্লাহর ইচ্ছায় তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ নতুন দিকে মোড় নেয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছুঁড়ে মারা বালুর প্রতিটি কণা শত্রুবাহিনীর প্রত্যেকের চোখে ঢুকে যায়। তারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। যে যে-দিকে পারে ছুটতে থাকে। মুহূর্তেই মুসলিম যোদ্ধারা ময়দানে ফিরে আসে এবং আল্লাহ তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় দান করেন।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: ৩৬৫৩, ৪৬৬৩; সহীহ মুসলিম: ২৩৮১; হাদীসটি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সহীহ মুসলিম: ১৭৭৭; হাদীসটি সালামাহ ইবন আমর ইবনি আকওয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 তার প্রশংসায়

📄 তার প্রশংসায়


আমরা এখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের সেইসব মুহূর্তের কথা জানব, যখন তাকে নিয়ে প্রশংসা করা হয়েছে। মানুষ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, সে-পরিচয় তার নামেই পাওয়া যায়। আরবীতে, 'মুহাম্মাদ' শব্দটি দ্বারা 'মাহমুদ' বোঝানো হয়; যার অর্থ- 'প্রশংসনীয়।' আর তার সমস্ত বৈশিষ্ট্যই এমন ছিল-যার প্রশংসা না করে থাকা অসম্ভব। পবিত্রতা, মহানুভবতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সত্যনিষ্ঠা যেন তার নামের সাথেই জড়িয়ে আছে এবং এটাই হবার ছিল। কারণ, স্বয়ং মহান আল্লাহ তার গুণকীর্তন করতে গিয়ে বলেন-
তিনি নিজে প্রশংসিত এবং প্রশংসিত স্থানের অধিকারী। কুরআনের ভাষায়-
عَسَى أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا
খুব সম্ভব আপনার পালনকর্তা আপনাকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন। [১]
মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি নাম-যা নূরের হরফে ঈমানের কালিতে মুমিনদের বুকের ভেতর খোদাই করে লিখে দেওয়া হয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসা তাওরাত এবং
ইঞ্জিলেও স্থান পেয়েছে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্ববর্তী নবীগণও নিজ অনুসারীদের শেষ-নবী হিসেবে তার নাম জানিয়ে গেছেন। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহেও তার আগমনের আগাম বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা থেকে অবমুক্ত। কুরআনের ভাষায়-
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى
তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি।১ [১]
কুপ্রবৃত্তির তাড়না থেকে পবিত্র। কুরআনের ভাষায়-
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى
আর তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না।খ [২]
ধর্মীয় প্রাণপুরুষ ও শরীয়তপ্রণেতা। কুরআনের ভাষায়-
إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
কুরআন ওহী বিশেষ-যা তাকে প্রত্যাদেশ করা হয়। [৩]
আল্লাহমুখী ও সত্যের অভিসারী। কুরআনের ভাষায়-
فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّكَ عَلَى الْحَقِّ الْمُبِينِ
অতএব, আপনি আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। নিশ্চয় আপনি সত্য ও স্পষ্ট পথে আছেন।। [৪]
সুমহান চরিত্রের অধিকারী। কুরআনের ভাষায়-
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী। [১]
কোমল হৃদয় ও ক্ষমাপরায়ণ। কুরআনের ভাষায়-
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نَفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল-হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি কঠিন ও রুক্ষ-হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করুন। তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন। [২]
মহান বিজয়ী। কুরআনের ভাষায়-
إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا
নিশ্চয় আমি আপনাকে দান করেছি সুস্পষ্ট বিজয়। [৩]
ক্ষমাপ্রাপ্ত। কুরআনের ভাষায়-
لِّيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ
যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত-ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন। [৪]
সরল পথের পথিক ও পথপ্রদর্শক। কুরআনের ভাষায়-
وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন। [১]
কষ্ট লাঘবকারী। কুরআনের ভাষায়-
وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ
তিনি তাদের থেকে লাঘব করেন গুরুভার। অপসারণ করেন শৃঙ্খল। [২]
শান্তির দূত। কুরআনের ভাষায়-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ। [৩]
বস্তুত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অনুগ্রহ ও অনুকম্পার মূর্তপ্রতীক। নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, শাসক-শাসিত-সবার প্রতিই তিনি অসামান্য অনুগ্রহ করেছেন। সবার জন্য যথোপযুক্ত মর্যাদা নিশ্চিত করেছেন। প্রত্যেককে তার যোগ্যতা ও সুবিধা-অসুবিধা অনুপাতে বিধান দিয়েছেন। অবস্থাভেদে ইবাদাতের স্বতন্ত্র পথ বাতলে দিয়েছেন। আর কেনই-বা তা হবে না? তাকে যিনি শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি তো অনুগ্রহের আধার-মহান রাব্বুল আলামীন।
বৃদ্ধদের জন্য তিনি ছিলেন আল্লাহর বিশেষ রহমত-কষ্ট লাঘবকারী। কারণ, তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বলদের ইবাদাতের সহজ উপায় বলে দিতেন-যাতে শেষ বয়সে এসে ইবাদাত তাদের কাছে দুর্বহ মনে না হয়; ইবাদাতকে বোঝা মনে করে তারা দূরে সরে
না যায়। অধিকন্তু বৃদ্ধদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল—তারা যেন জীবনের শেষ সময়গুলো এমনভাবে কাজে লাগায় যেন এগুলোই হয় তাদের শেষ, অথচ শ্রেষ্ঠ ইবাদাত।
যুবকদের জন্যও তিনি ছিলেন আল্লাহর বিশেষ রহমত—উত্তম আদর্শ। কারণ, তিনি তাদের উন্নত চারিত্রিক গুণাবলি ও নীতি-নৈতিকতা দিয়ে সাজাতে চাইতেন। তাদের অমূল্য যৌবনকে কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহ দিতেন। পথ ও পন্থা বাতলে দিতেন। তাদের জন্য উজ্জ্বল ও নিরাপদ ভবিষ্যতের ছক আঁকতেন।
শিশুদের জন্যও তিনি ছিলেন আল্লাহর বিশেষ রহমত—স্নেহ-মমতার অফুরন্ত উৎস। কারণ, তিনি স্নেহ ও ভালোবাসার বন্ধনে তাদের আগলে রাখতেন। যে-সকল শিশু তাঁর ইন্তেকালের পরে জন্ম গ্রহণ করেছে, তাদের জন্যও তিনি চিন্তা করেছেন। নবজাতকের কানে আযান দেওয়া, তাদের সুন্দর নাম রাখা এবং যথাযথভাবে প্রতিপালন করার আদেশের মাধ্যমে তিনি তাদের জন্যও ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন রেখে গেছেন।
নারীদের প্রতিও ছিলেন তিনি মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত—তাদের সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠাকারী। কারণ, তিনিই নারীদের সমাজের অত্যাচার ও বৈষম্য থেকে উদ্ধার করেছেন। দাসত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে স্বাধীনতার আস্বাদ দিয়েছেন। সামাজিক, মানবিক ও বৈষয়িক বৈষম্য দূর করে যথার্থ অধিকার নিশ্চিত করেছেন। তাদের সম্মান ও সম্ভ্রম নিরাপদ করেছেন।
শাসক-শ্রেণির জন্যও তিনি ছিলেন আল্লাহর সুস্পষ্ট অনুগ্রহ—অনুপম দিক-নির্দেশক। কারণ, তাদের জন্য তিনি ইনসাফ-ভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন। সমাজ থেকে অবিচার, দুঃশাসন ও দূর্নীতি দূর করার কার্যকর পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। জাতীয় জীবনে দয়া ও সহানুভূতির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাদের জন্য এ জাতীয় কাজকে সহজ করে দিয়েছেন। অধিকন্তু তাদেরকেও এসব অপরাধকর্ম থেকে বিরত থাকার আদেশ করেছেন।
জনসাধারণের জন্যও তিনি ছিলেন মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ—করুণার অনিঃশেষ উৎস। কারণ, তিনি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। সামাজিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। সেই সঙ্গে তাদের সীমালঙ্ঘন ও বিদ্রোহের মতো অমার্জনীয় অপরাধের ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন। শাসক যতদিন আল্লাহর অনুগত্য করবে, ততদিন অবাধ্য হতে নিষেধ করেছেন। নিঃসন্দেহে তাঁর এই আদেশ-নিষেধ
ও নির্দেশনা একটি শক্তিশালী জাতি গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এজন্যই তিনি বিশ্বমানবতার জন্য আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। কুরআনের ভাষায়-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ। [১]
এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, কপট লোকদের কথা মানুষ কানে তোলে না; কিন্তু সৎ লোকদের কথা তারা হৃদয়ের কান দিয়ে শ্রবণ করে। তাহলে কল্পনা করুন, স্বয়ং আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথাগুলো তার অনুসারীদের ওপর কেমন প্রভাব ফেলতে পারে! নিঃসন্দেহে তার মুখ নিঃসৃত বাণী মানুষের অন্তরের অন্তঃস্তলে পৌঁছে যেত। সাহাবীগণ তার কথা হৃদয়ের কোমল ভূমিতে খোদাই করে রাখতেন। তিনি যখন কথা বলতেন, তারা অবনত মস্তকে মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করতেন। তার সম্মানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন, দেখে মনে হতো তাদের মাথায় বুঝি কোনো পাখি এসে বসেছে। তাই তারা নড়াচড়া করছেন না-পাছে পাখিটি যদি উড়ে যায়!
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্বাভাবিক কথাই এতটা হৃদয়গ্রাহী ছিল। আর যখন তিনি বয়ান করতেন, তখন যেন মিম্বর কেঁপে উঠত। শ্রবণকারীদের হৃদয় জাগ্রত হতো। সমস্ত মনোযোগ তার প্রতি নিবদ্ধ হতো। উপস্থিত সবাই পার্থিব-জীবনের মায়া-মোহ অতিক্রম করে আধ্যাত্মিকতার অপার্থিব জগতে হারিয়ে যেত। হৃদয়ের গভীরে আখিরাতের বাস্তবতা বাঙময় হয়ে উঠত। তাদের চোখের পাতা ভিজে উঠত। মনে হতো, এই বুঝি মৃত্যুর দূত এসে তাদের জান নিয়ে যাবে।
শুধু মানুষ কেন-নিষ্প্রাণ পাথরও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়ান শুনে ভয়ে কেঁপে উঠত। মাটির দেওয়ালও ডুকরে কেঁদে উঠত এবং এটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ, মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ
তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? হাসছ? কিন্তু ক্রন্দন করছ না? [১]
দৃঢ়চেতা যোদ্ধা। কুরআনের ভাষায়-
فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا تُكَلِّفُ إِلَّا نَفْسَكَ
আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করতে থাকুন, আপনি নিজের সত্তা ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ের যিম্মাদার নন...[২]
উল্লেখ্য যে, যুদ্ধের পরিস্থিতি যত বেশি ভয়ংকর হতো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহসিকতাও সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেত। কারণ, তিনি নিশ্চিত বিশ্বাস করতেন, মৃত্যু তার জন্য অবধারিত। তবে আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতি ব্যতীত মৃত্যু তার কিচ্ছুটি করতে পারবে না। অধিকন্তু মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে মৃত্যুর বাস্তবতা এভাবে তুলে ধরেছিলেন-
وَمَا مُحَمَّدُ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ
আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ কিছু নন! তার পূর্বেও বহু রাসূল গত হয়েছেন। তাহলে তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসারণ করবে? বস্তুত কেউ যদি পশ্চাদপসারণ করে, তবে সে আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সাওয়াব দান করেন।[৩]
সীমাহীন বদান্য। হাদীসের ভাষায়-
<Q> والذي نفسي بيده ، لو أن لى بعدد عضاة تهامة مالا لأنفقته ثم لا تجدونى بخيلا ولا جبانا ولا كذبا </Q>
যদি আমার কাছে তিহামার বৃক্ষরাজি পরিমাণ সম্পদ থাকত তবে আমি সেগুলো অকাতরে দান করে দিতাম। তোমরা আমাকে কিছুতেই কৃপণ, মিথ্যেবাদী অথবা ভীরু ভাবতে পারতে না। [১]
বস্তুত বদান্যতায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ছাড়িয়ে যাওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। কারণ, বাস্তবজীবনে সবাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের কাছে কিছু-না-কিছু অর্থ রেখেই দেয়! কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো দিনই এমনটি করেননি; অভাবের ভয়ে সম্পদ জমা করেননি।
আল্লাহর প্রতি তার আস্থা এতটাই দৃঢ় ছিল যে, তিনি জানতেন, আল্লাহই তাকে খাওয়াবেন, পরাবেন এবং দেখভাল করবেন। তাই তিনি সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মাত্রায় বদান্যতা দেখাতে পেরেছেন। তার বদান্যতার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হলো সময়। কারণ, তিনি জীবনের পুরোটা সময়ই ইসলামের জন্য বিসর্জন দিয়েছেন। সময়ের সাথে সাথে সম্পদের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন অতুলনীয় দানশীল। ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি নিজের জন্য কিছুই সংরক্ষণ করতেন না; বরং নিজের নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসও অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। জীবনের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন নির্মোহ দাতা। এজন্য সব সময় সামনের সারিতে থেকে যুদ্ধ করতেন। মৃতুভয় উপেক্ষা করে আল্লাহর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত থাকতেন।
হাতিম তাঈ-ও দানশীল ছিলেন। তবে তিনি এর বিনিময়ে খ্যাতি ও ভালোবাসা চাইতেন; কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দান ছিল শুধুই এবং শুধুই আল্লাহকে খুশি করার জন্য। এজন্য তার এই দান ও বদান্যতা অন্যদেরও প্রবলভাবে আলোড়িত করত।
পরম ক্ষমাশীল। কুরআনের ভাষায়-
فَاصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ
অতএব, আপনি পরম সৌজন্যের সাথে তাদের ক্ষমা করুন।। [১]
কোনোরকম বিনিময়ের আশা ছাড়াই তিনি তার অধিকার ক্ষুণ্ণকারীকে ক্ষমা করে দিতেন। এতে সামান্য অনুযোগও করতেন না। সবচেয়ে পাষাণ হৃদয়ের শত্রুকেও তিনি তার ক্ষমা ও সদ্ব্যবহারে পরম বন্ধু ও সেবাদাসে পরিণত করতে পারতেন।
স্বজাতি ও সুগোত্রের অনেকেই তাকে নবী হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তার প্রচার করা বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। অধিকন্তু তাকে ‘মিথ্যেবাদী’ ও ‘জাদুকর’ বলে বয়কট করেছে। একাধারে তের বছর তার ওপর অকথ্য নির্যাতন করেছে। একপর্যায়ে তাকে প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। সর্বোপরি দীর্ঘ সময় ধরে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। অথচ এত কিছুর পরেও দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। মক্কা বিজয়কালে তাদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘যাও, তোমাদের মুক্ত করে দেওয়া হলো।’
তার এই উদারতা ও মহানুভবতা ঠিক কোন পর্যায়ের ছিল সেটা তার এই কথার মাধ্যমেই অনুধাবন করা যায়। একদা সদাচার ও সম্পর্ক রক্ষার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই যারা আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আল্লাহ আমাকে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে আদেশ করেছেন। যারা আমার সাথে অন্যায় করে তাদের ক্ষমা করে দিতে বলেছেন এবং যারা আমাকে বঞ্চিত করে, তাদের দান করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ [২]
কুরআনে যে-সকল সুন্দর গুণের কথা বলা হয়েছে, তার সবই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাস্তব জীবনে ধারণ করেছিলেন। এজন্যই আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা তার সম্পর্কে বলেছেন-
كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ
কুরআন হচ্ছে তার চরিত্র। [১]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারও সাথে কোনো ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলে যে-কোনো উপায়ে তা পালন করতেন। তার শত্রুরা পর্যন্ত বলতে পারবে না যে, তিনি কোনো দিন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন অথবা কোনো চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন। তার চরিত্রের খুঁত ধরার জন্য এবং আচরণের ভুল বের করার জন্য শত্রুরা সারাক্ষণ তার পিছে লেগে থাকত। অথচ শত চেষ্টার করেও তারা তার কোনো ত্রুটি বা ভুল খুঁজে বের করতে পারেনি।
শান্তি কিংবা যুদ্ধে, খুশি কিংবা ক্রোধে, উদ্বেগ কিংবা নির্ভার সময়ে-সর্বাবস্থায়ই তিনি সত্যবাদিতা এবং বিশ্বস্ততার ওপর অবিচল ছিলেন। একবার তার সাথে এক লোকের নির্দিষ্ট একটি স্থানে সাক্ষাৎ করার কথা ছিল। তিনি সময়মতো সেখানে উপস্থিত হন; কিন্তু লোকটি আর আসে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ভেবে সেখানে তার জন্য তিন দিন অপেক্ষা করেন যে, লোকটা হয়তো এসে তাকে খুঁজবে এবং না পেয়ে ভীষণ কষ্ট পাবে। এমনই ছিলেন আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এমনই ছিল তার বিশ্বস্ততা!
বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতিতে তিনি ইহুদী ও মুশরিকদের সাথেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। যদিও এই দুই দল সারা জীবন তার বিপক্ষে লড়ে গেছে, তবুও তিনি কোনো দিন সন্ধির একটি কথাও এদিক-সেদিক করেননি। প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি ছিলেন আপসহীন। তার পক্ষে এই পর্যায়ের বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠা প্রদর্শন খুবই স্বাভাবিক ছিল। কারণ, তিনি যে-সত্যনীতি মেনে চলতেন, যে-শরীয়ত অনুযায়ী জীবন-যাপন করতেন, তা বিবেচনায় আনলে মানুষের চরিত্র এমন সুউচ্চ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তিনি মিথ্যের আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। চুক্তি ও অঙ্গীকার ভঙ্গের ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তিনি বলেছেন—
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلاثُ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি-কথা বললে মিথ্যে বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে খিয়ানাত করে।। [১]
অধিকন্তু মহান আল্লাহর পক্ষ হতে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে দেওয়া নির্দেশনায় তাকে বলা হয়েছে-
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا
এবং অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। [২]
الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ الْمِيثَاقَ
এরা এমন লোক, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে। অঙ্গীকার ভঙ্গ করেনা। [৩]
অতএব, যে-মহান সত্তা দয়া, ক্ষমা, কল্যাণকামিতা ও অন্য সকল মানবিক গুণে অনন্য-কেনই বা তার প্রশংসা করা হবে না?

টিকাঃ
১. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯
১. সূরা নাজম, আয়াত: ২
২. সূরা নাজম, আয়াত: ৩
৩. সূরা নাজম, আয়াত: ৪
৪. সূরা নামল, আয়াত: ৭৯
১. সূরা কালাম, আয়াত : ৪
২. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৯
৩. সূরা ফাতহ, আয়াত: ১
৪. সূরা ফাতহ, আয়াত: ২
১. সূরা শূরা, আয়াত: ৫২
২. সূরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭
৩. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭
১. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭
১. সূরা নাজম, আয়াত: ৫৯,৬০
২. সূরা নিসা, আয়াত : ৪
৩. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১৪৪
১. মুআত্তা মালিক: ৯৭৭, আল-কামিল লিবনি আদি: ৩/৯৭
১. সূরা হিজর, আয়াত: ৮৫
২. মিশকাতুল মাসাবীহ : ৫৩৫৮; তাফসীরে কুরতবী: ৭/৩৪৬
১. প্রাগুক্ত
১. সহীহ বুখারী: ৩৩/২৬৮২; সহীহ মুসলিম: ৫৯, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৪
৩. সূরা রাদ, আয়াত: ২০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00