📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 নবীজির প্রার্থনা

📄 নবীজির প্রার্থনা


দুআ সম্পর্কে কিছু বলার আগে পাঠকের দুআ, সালাত এবং ইবাদাতের মধ্যকার মিল ও অমিলগুলোর ব্যাপারে ধারণা থাকা প্রয়োজন। যেমন, সালাত হলো ইবাদাতের একটি সুনির্দিষ্ট বিধান-যেখানে তাকবীরে তাহরীমা বলতে হয়, রুকুতে যেতে হয়, সিজদা করতে হয়। সালাতের মধ্যেই রয়েছে কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর বিশালতার স্মরণ, তাঁর প্রশংসা এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর দরূদ পাঠ। এটা ইবাদাতের বিশেষ একটি মাধ্যম।
পক্ষান্তরে দুআ হচ্ছে আল্লাহর নিকট সরাসরি চাওয়ার একটি সাধারণ মাধ্যম। দুআর ভেতর আল্লাহর কাছে সাহায্য, সমৃদ্ধি, পুরস্কার, জান্নাত, হিদায়াত-সব কিছু চাওয়া হয় এবং যে-কোনো সময় এটা করা যায়।
আর ইবাদাত বলতে যে-কোনো ধরনের 'উপাসনা' বোঝানো হয়। নিয়ত সঠিক থাকলে প্রতিটি কাজই ইবাদাত হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। কাজেই সালাত একটি ইবাদাত হলেও কেবল সালাতের ভেতরেই ইবাদাতের ব্যাপ্তি সীমাবদ্ধ নয়। সালাত যেমন ইবাদাত তেমনই দুআও। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
❝ الدعاء هو العبادة দুআ হলো ইবাদাত। [১]
প্রার্থনা-বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন-
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। [১]
অন্যত্র বলেন করেন-
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে, বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটে। আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করি-যখন সে আমার কাছে প্রার্থনা করে। [২]
মহান আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যে বড় একটি পার্থক্য হলো, মানুষের কাছে চাইলে মানুষ অখুশি হয়। অনেক সময় চক্ষুলজ্জা বা অন্যকোনো কারণে সাহায্যও করে; কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে তারা বিরক্ত হয়। অন্যরা তাদের উদারতার সুযোগ নিচ্ছে ভেবে ক্রুদ্ধ হয়; কিন্তু মহান আল্লাহ এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি না চাইলে অখুশি হন। তার কাছে যত বেশি চাওয়া হয় তিনি তত বেশি খুশি হন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
" إِنَّهُ مَنْ لَمْ يَسْأَلِ اللَّهَ يَغْضَبْ عَلَيْهِ
যদি কেউ আল্লাহর কাছে না চায়, তবে আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হন। [৩]
৩২৪৭; হাদীসটি নুমান ইবনু বশীর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; সনদ: সহীহ।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ ছাড়া কারও ওপর ভরসা করতেন না। আল্লাহই ছিল তার একমাত্র ভরসা। যে-কোনো সময়, যে-কোনো প্রয়োজনে তিনি কেবল তার রবকেই ডাকতেন। নিবেদিতপ্রাণ হয়ে তার কাছে প্রার্থনা করতেন। প্রয়োজন দেখা দিলে প্রার্থনা করতে কালবিলম্ব করতেন না। তবে তিনি সাধারণ প্রার্থনায় ব্যাপক অর্থবোধক সংক্ষিপ্ত দুআ করতেন। তার এই সকল দুআ হতো সারগর্ভ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন তিনি প্রায়শই তার দুআয় বলতেন—
" رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
হে আমাদের প্রভু, এই দুনিয়াতে যা-কিছু মঙ্গল তা আমাদের দিন এবং আখিরাতের জন্য যা কল্যাণকর তা-ও আমাদের দিন। আর জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদের রক্ষা করুন। [১]
এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ দুআ আর কী হতে পারে?
অবশ্য কোনো কোনো দুআয় তিনি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের জন্যও প্রার্থনা করতেন। ক্ষমা ও নিরাপত্তা চেয়ে একটি দুআয় তিনি প্রায়শই বলতেন—
" اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ
হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা চাই। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিটি বিষয়ের জন্য সাধারণত তিনবার করে দুআ করতেন। প্রয়োজন হলে ওযু করে পাক-পবিত্র হয়ে নিতেন। কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করতেন। এরপর দুআ শুরু করতেন। তিনি দুআর এই সকল আদব সাহাবীদেরও শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন-সম্ভব হলে দুআর পূর্বে ওযু করা, দুআ শুরু করার পূর্বে আল্লাহর প্রশংসা করা। রাসূলের ওপর দরূদ পাঠ করা। দুআর মধ্যে আল্লাহকে তার গুণবাচক নামে ডাকা। প্রয়োজনের বিষয়টি নিবেদিত-চিত্তে
প্রার্থনা করা। প্রার্থনা কবুলের ব্যাপারে আস্থাশীল থাকা। মনের চৌহদ্দিতে অধৈর্য ও হতাশাকে স্থান না দেওয়া। অনবরত দুআ করতে থাকা এবং হামদ ও সালাতের মাধ্যমে দুআ শেষ করা।
দুআর আদব শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি দুআ কবুলের বিশেষ কিছু সময়ের কথাও উল্লেখ করেছেন। যেমন—সালাতের পরে, আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে, জুমআর দিনের শেষভাগে, আরাফাতের দিনে, সিয়াম পালনরত অবস্থায়, সিজদারত অবস্থায় এবং মুসাফির থাকাকালীন সময়ে দুআ করা হলে আল্লাহ সে দুআ কবুল করে থাকেন। এছাড়াও পিতা-পুত্রের পারস্পরিক দুআ কবুল হওয়ার ব্যাপারেও সমূহ সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময়ই আল্লাহকে ডাকতেন। তাঁর কাছে প্রার্থনা করতেন। তবে বিপদের মুহূর্তে তাঁর দুআয় আন্তরিকতা ও আত্মনিবেদন বহুগুণে বেড়ে যেত। যখনই তিনি সংকটে পড়তেন, তখনই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন—সন্ত্রস্ত, বিনীত ও অনুগত হয়ে। আল্লাহর প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস। বদর, খন্দক ও আরাফাতের দিনে আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করেছেন। অনাবৃষ্টির কারণে একবার মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে হাত তোলেন, অমনি মুষলধারে বৃষ্টি নামতে শুরু করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বচক্ষে দুআ কবুলের অভাবনীয় দৃশ্য দেখেছেন। তিনি দেখেছেন প্রার্থনা করামাত্রই সুদূর আকাশের চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার অভূতপূর্ব দৃশ্য।
প্রার্থনার মাধ্যমে তিনি মহান আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ করেছিলেন। ফলস্বরূপ আল্লাহও তাকে প্রভূত কল্যাণ দান করেছিলেন। জিহাদের ময়দানে তাঁর জন্য সরাসরি সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। মুসলিমদের জয়ী করে কাফিরদের অপদস্থ করেছিলেন। এভাবেই মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআ কবুল করেছেন এবং দ্বীন ও একাত্মবাদের প্রতিষ্ঠায় তাঁকে সাহায্য করেছেন।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ : ১৭৮৮৮, ১৭৯১৯; সুনানু আবি দাউদ : ১৪৭৯; জামি তিরমিযী : ২৯৬৯, ও
১. সূরা মুমিনূন, আয়াত : ৬০
২. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬
৩. আল আদাবুল মুফরাদ: ৬৫৮; জামি তিরমিযী: ৩৩৭৩, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সহীহ বুখারী: ৪৫২২, ৬৩৮৯; সহীহ মুসলিম: ২৬৮৮, হাদীসটি আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. মুসনাদে আহমাদ: ৪৭৭০; সুনানু আবি দাউদ: ৫০৭৪; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৮৭১; মুসতাদরাক আল-হাকিম: ১৯০২; হাদীসটি উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 নবীজির লক্ষ্য

📄 নবীজির লক্ষ্য


উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে হলে নিঃসন্দেহে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে হয়। তবে 'উচ্চাকাঙ্ক্ষা' শব্দটিকে সাধারণত ইতিবাচক হিসেবে নেওয়া হয় না। উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিমাত্রই অসংযত উপায়ে নিজেকে সবার থেকে আলাদা প্রমাণ করতে চায়; অসদুপায় অবলম্বন করে হলেও লাভবান হতে চায়-এমনটাই সাধারণত ভাবা হয়ে থাকে। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উচ্চাভিলাষকে উন্নত লক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করাই শ্রেয়। কারণ, সাধারণ মানুষের উচ্চাভিলাষ এবং তার উচ্চাভিলাষের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
মানুষ সাধারণত পার্থিব ক্ষমতা ও সম্পদের চিন্তায় বিভোর থাকে। উন্নত জীবনোপকরণের উচ্চাশা পোষণ করে। অপরদিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আখিরাত। তিনি অহর্নিশি মৃত্যু-পরবর্তী চিন্তায় বিভোর থাকতেন। এজন্যই তার লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে উন্নত ও অনন্য।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মায়ের গর্ভে তখনই যেন আপন লক্ষ্য বাস্তবায়নে পৃথিবীতে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন! শৈশব থেকেই তিনি শুদ্ধ বিশ্বাস, ভালো ব্যবহার ও ন্যায়পরায়ণতায় সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে চাইতেন। চারপাশের মানুষ তার এই বিকাশমান উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে খালি চোখেই অনুধাবন করতে পারত। তার দাদা আব্দুল মুত্তালিব কুরাইশদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী ছিলেন। এ কারণে কাবাঘরের সামনে তার জন্য একটি স্থান সংরক্ষিত ছিল। সেখানে তিনি ছাড়া আর কেউ বসার দুঃসাহস করত না। এমনকি
তার সন্তানেরাও না। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিনা বাধায় সেখানে চলে যেতেন। তার দাদার পাশে অনায়াসে জায়গা করে নিতেন। এই ব্যতিক্রম আব্দুল মুত্তালিব তার নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রেও করেননি।
নেতৃত্ব-গুণ ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। চারিত্রিক সৌন্দর্যের কারণে সমাজে সবাই তাকে একনামে চিনত। এমনকি তার ওপর ওহী নাযিল হবার আগে থেকেই মক্কার লোকেরা তাকে ‘আল-আমীন’ ও ‘সত্যবাদী’ বিশেষণে ভূষিত করেছিল। মূল্যবান বিষয়সম্পত্তির ক্ষেত্রেও তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ছাড়া আর কাউকে ভরসা করত না। তার প্রতি সাধারণ মানুষ ও কাফিরদের এতটাই গভীর বিশ্বাস ছিল।
শুধু তাই নয়; জ্ঞান ও বিচক্ষণতার ক্ষেত্রেও নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর তারা এমনই আস্থাশীল ছিল যে, যে-কোনো বিবাদে তাকে মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করত না।
যুবক বয়সেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন। সুতরাং, নবুওয়াতলাভের পর তার এই উৎকর্ষ কোন মাত্রায় পৌঁছেছিল—তা কল্পনারও অতীত! একজন নবী হিসেবে জীবন শুরু করে তিনি কোনো দিনও অর্থ, ক্ষমতা ও সামাজিক প্রতিপত্তির পেছনে ছুটে বেড়াননি। তিনি কেবল ‘ওয়াসিলাহ’ বা জান্নাতের সবচেয়ে সম্মানিত স্থানে অধিষ্ঠিত হতে চেয়েছেন। এমনকি অনুসারীদেরও তার জন্য এটাই প্রার্থনা করতে বলে গেছেন।
উত্তম এবং সুন্দর লক্ষ্যান্বেষী হবার কারণে মানব-ইতিহাসে তিনি অনন্তকাল পর্যন্ত আদর্শ হয়ে থাকবেন। তার এই উন্নত লক্ষ্যই তাকে দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়ানো থেকে বিরত রেখেছে। তিনি জীবনে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করেই বসে থাকেননি; বরং কর্মের মাধ্যমে তা অর্জনও করে গেছেন।

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 কুরআনের ভাষায় নবীজি

📄 কুরআনের ভাষায় নবীজি


[এক]
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللَّهُ
হে নবী, আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। [১]
উল্লেখ্য যে, কেউ কারও জন্য যথেষ্ট হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে তিনি ব্যতীত তার অন্যকারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই। অতএব, উল্লিখিত আয়াতের ভাষ্যমতে-
'আল্লাহ আপনার জীবনের সকল পর্যায়ের জন্য যথেষ্ট। তিনি ছাড়া আপনার আর কারও সাহায্যের দরকার নেই। বিপদে তিনিই আপনাকে সঙ্গ দিয়েছেন। দুঃসময়ে পাশে থেকেছেন। শত্রুর আক্রোশ থেকে রক্ষা করেছেন। ভবিষ্যতেও করবেন। জীবনের পদে পদে আপনাকে এভাবেই সুরক্ষা দেবেন। কাজেই, ভয় পাবেন না, দুঃখ করবেন না, সন্ত্রস্ত থাকবেন না, উদ্বিগ্নও হবেন না। আল্লাহ আছেন। তিনি আপনাকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আপনার সকল চাহিদা পূরণ করবেন। আপনি
ক্ষমা চাইলে, তিনি আপনাকে ক্ষমা করবেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে, বর্ধিত পুরস্কার দেবেন। আপনি তাকে স্মরণ করলে তিনিও আপনাকে স্মরণ করবেন। শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় চাইলে, তিনি বিজয় দান করবেন।
সুতরাং, আপনি তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন। তার সিদ্ধান্তকে কল্যাণকর মনে করুন এবং তার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। কারণ, তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট।
সুতরাং, বিদ্বেষীরা যদি সর্বত্র বিদ্বেষের আগুন জ্বালে, শত্রুরা যদি ষড়যন্ত্রের জাল বোনে, প্রতারকরা যদি প্রতারণার সূক্ষ্ম ফাঁদ রচনা করে—সর্বোপরি কাফির-মুশরিক ও মুনাফিক-শ্রেণি যদি আপনার বিরুদ্ধে সম্মিলিত-বাহিনী গঠন করে অথবা আপনার দুঃখ-দুর্দশায় যদি তারা উল্লাস করে, তবে আপনি ভয় পাবেন না; বিচলিত হবেন না। কারণ, আল্লাহ আপনার সঙ্গে আছেন। তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট।
সুতরাং, চরম দুঃসময়ে যখন পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন দূরে সরে যায়, বন্ধুরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং সহযোদ্ধারাও হাল ছেড়ে দেয়—তখনো আপনি ধৈর্য ধরুন। দৃঢ়তার সঙ্গে সব কিছু মুকাবেলা করুন। কারণ, আল্লাহই আপনার জন্য যথেষ্ট। তার সাহায্য আপনার অতি নিকটে।
সুতরাং, যখন রোগ-শোক ও দুঃখ-দুর্দশা আপনাকে ঘিরে ধরে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ে, অভাব-অনটনে জীবনের গতি মন্থর ও স্থবির হয়ে পড়ে, সংসারের মৌলিক চাহিদাগুলো অপূর্ণই রয়ে যায়—তখনো অবিচল থাকুন। একমাত্র আল্লাহর কাছেই উত্তরণ ও সাহায্য কামনা করুন। কারণ, তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট। রোগ-শোক ও অভাব-অনটন দিয়ে আপনার উপযোগিতা পরীক্ষা করছেন মাত্র।
সুতরাং, যখন অনন্যোপায় হয়ে শত্রুর আগ্রাসনের মুখে হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হয়, বিজয়কে সুদূরপরাহত মনে হয় কিংবা অনিশ্চিত সাহায্যের আশায় কেবল তাকিয়েই থাকতে হয়—তখনো হতাশ হবেন না। কারণ, আপনি সুনিশ্চিত সাহায্য পেতে যাচ্ছেন। আল্লাহই আপনার সাহায্যের জন্য যথেষ্ট। তবে তিনি আপনার আস্থা ও ধৈর্যের মাত্রা পরখ করছেন।
হে মুহাম্মাদ, আপনি তো আমার খলীল, আমার প্রিয় বান্দা ও শ্রেষ্ঠ রাসূল! সুতরাং, আমিই আপনার জন্য যথেষ্ট। আপনি আমার জিম্মায় সুরক্ষিত।'
[দুই]
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
চিন্তিত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। [১]
এই প্রত্যয়দীপ্ত ও চিত্ত প্রশান্তকারী কথাটি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ঠিক তখন বলেছিলেন quando তারা শত্রুর খড়গহস্ত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পর্বত-গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, যখন শত্রু তাদের চারপাশ থেকে ঘেরাও করে ফেলেছিল এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু গুহার ভেতর থেকে স্পষ্টতই কাফিরদের পা দেখতে পাচ্ছিলেন এবং এই ভয়ে প্রকম্পিত ছিলেন যে, তারা গুহার ভেতরে একটু উঁকি দিলেই আল্লাহর রাসূলকে দেখে ফেলবে। সেই চরম দুঃসময়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন 'তুমি চিন্তিত হয়ো না'।
কথাটি বলার সময় তার ঠোঁট একবারও কাঁপেনি, তার জিহবা একটুও আড়ষ্ট হয়নি; বরং দৃঢ় চিত্তে তিনি কথাটি বলেছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন 'আল্লাহ আমাদের সাথেই রয়েছেন'।
এই কথার মর্মার্থ হলো-
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেন সাহাবী আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলছেন, 'আল্লাহ যদি আমাদের সাথেই থাকেন তাহলে কীসের ভয়? কীসের হতাশা? কীসের এত চিন্তা? শান্ত হও, সংকল্পে অটল থাক। অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সাথে রয়েছেন। তিনিই আমাদের শত্রুর চোখ ও অস্ত্রের কবল থেকে রক্ষা করবেন।'
যতক্ষণ আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন, ততক্ষণ আমরা লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবো না। তিনি কখনোই আমাদের শত্রুর হাতে তুলে দেবেন না। আমাদের সঙ্গ ও সাহায্য ত্যাগ করবেন না। কাজেই আশাহত হলে চলবে না। আল্লাহর পথের অভিযাত্রীরা কখনো আশাহত হয় না। কারণ, তাদের পরাজয়ের ভয় নেই। চূড়ান্ত বিজয় তাদেরই। আল্লাহর চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে? কে আছে সাহায্যকারী?
তিনি ছাড়া আর কে দেখান পথের দিশা?
আল্লাহর সামনে সকল শত্রু দুর্বল। সকল প্রতিপক্ষ ভীরু। সকলের পা কম্পমান। আমরা কোনো লোকের সাহায্য চাইব না, কোনো সৃষ্টের নিকট হাত পাতব না। কারণ, সৃষ্টির কোনো উপাদানই আল্লাহর চেয়ে বেশি শক্তিশালী নয়; আল্লাহর চেয়ে অধিক সাহায্যপরায়ণ নয়।
আল্লাহর পথের অভিযাত্রীরা কোনো দিন ভয় পায় না। তারা সদা নির্ভিক। সদা তৎপর। স্রষ্টার বিশ্বাস ও আনুগত্যবোধ তাদের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। তারা সরল পথের পথিক। সত্য ও সুন্দরের অভিযাত্রী। তারাই শত্রুর ওপর বলীয়ান। মর্যাদায় মহীয়ান। এটাই চিরন্তন বাস্তবতা। কারণ, আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন। সুতরাং, হে আবু বকর, চিন্তিত ও বিষণ্ণ হয়ো না। ঝেড়ে ফেলো সকল দুশ্চিন্তা। আল্লাহ তো আমাদের সাথেই আছেন।
হে আবু বকর, এখন তো সময় শির উঁচু করে থাকার। নিজে শান্ত হও। হৃদয়কেও শান্ত করো। অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সাথে রয়েছেন।
হে আবু বকর, আল্লাহর সাহায্যপ্রার্থী হও। মন খুলে তার প্রত্যক্ষ অনুগ্রহ কামনা করো এবং সুখ ও সাফল্যের সুসংবাদ গ্রহণ করো। অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সাথেই রয়েছেন।
[তিন]
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী। [১]
হে মুহাম্মাদ, [২] আল্লাহর শপথ, সর্বোত্তম চরিত্র তো আপনারই। শিষ্টাচার ও মহত্ত্বের আদর্শ তো আপনিই। মানুষ বাইরে থেকে দেখেই যদি আপনার আচরণকে সৌন্দর্যের আধার বলে থাকে, তাহলে লোকচক্ষুর আড়ালের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো তুলনাহীন! একজন মানুষের পক্ষে যে-সকল উত্তম গুণ ধারণ করা সম্ভব-তার সব কিছুই আপনার মাঝে ছিল। শত্রুরা আপনার প্রতি অবিচার করেছে,
আপনি তাদের প্রতি সুবিচার করেছেন। তারা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, আপনি তাদের ক্ষমার চাদরে জড়িয়ে নিয়েছেন। তারা আপনাকে অভিসম্পাত করেছে, আপনি তাদের আশীর্বাদ দিয়েছেন। তারা আপনার সাথে কঠোর আচরণ করেছে, আপনি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করেছেন। সুতরাং, হে মুহাম্মাদ, নিশ্চয় আল্লাহ যা বলেন তা-ই সত্য, 'নিশ্চয় আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।'
কে আপনাকে ভালোবাসত না? রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, চেনা-অচেনা-সবাই আপনাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসত। কারণ, আপনার মহানুভবতা দিয়ে তাদের হৃদয়রাজ্য আপনি জয় করে নিয়েছিলেন। আপনার অমায়িক ব্যবহার আর চারিত্রিক মাধুর্য দিয়ে তাদের মনকে করেছিলেন মন্ত্রমুগ্ধ।
নবুওয়াতের ঐশী ছোঁয়া আপনার চরিত্রকে ঢেলে সাজিয়েছে। আপনাকে পবিত্রতার আদর্শ করে তুলেছে। আপনার রব আপনাকে পথ দেখিয়েছেন। ফেরেশতা জিবরীল আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে আপনাকে শিক্ষাদান করেছেন। নিরাপত্তার চাদরে জড়িয়ে আপনার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি খেয়াল রেখেছেন। আপনার প্রতিটি চিন্তায়, প্রতিটি পদে, প্রতিটি কাজে তিনি পাশে থেকেছেন। একমাত্র তার রহমত ও বরকতেই আপনি হয়ে উঠেছেন সুমহান চরিত্রের অধিকারী।
আপনার মুখে সব সময় ভূবনমোহিনী হাসির ছোঁয়া লেগেই থাকত। হৃদয়ের মমতা ও ভালোবাসা সবার মাঝে স্নিগ্ধতা ছড়াত। দান ও বদান্যতা মানুষের মাঝে আশা জাগাত। এক কথায়, আপনি ছিলেন কল্যাণ ও বরকতের রাজপুত্র।
তলোয়ারের তীক্ষ্ণ চোখ রাঙানিও কোনো দিন আপনার সত্যবাদিতাকে হত্যা করতে পারেনি। নারী, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রলোভন আপনার সংকল্প টলাতে পারেনি। অস্ত্র ও মৃত্যুর ভয় আপনাকে দায়িত্বপালন থেকে বিরত রাখতে পারেনি। কারণ, আপনি আল্লাহ প্রেরিত নবী। মানবসভ্যতার অনন্য আদর্শ। এ ধরনের অজস্র দৃষ্টান্ত স্থাপনের উদ্দেশ্যেই আপনাকে প্রেরণ করা হয়েছে।
আপনার চরিত্রের মাহাত্ম্য এখানেই যে, ভয়ঙ্কর সব শত্রু যখন আপনাকে মৃত্যুভয় দেখিয়েছে তখনো আপনি সংকল্পে অটল ছিলেন; যারা আপনার সর্বস্ব কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তাদের প্রতিও আপনি সদয় আচরণ করেছিলেন। আপনার মতো পুণ্যবান, জ্ঞানী, বিশ্বাসী, বিনম্র, উদার, ভরসার আধার এই পৃথিবীতে পূর্বে কখনো আগমন করেনি। ভবিষ্যতেও করবে না। হে মুহাম্মাদ, নিঃসন্দেহে আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।
[চার]
مَا أَنتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُونٍ আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহে আপনি উন্মাদ নন।১। [১]
শত্রুরা আপনাকে উন্মাদ বলে কটাক্ষ করেছে; কিন্তু আপনি তো আদৌ উন্মাদ নন। অধিকন্তু আপনার হাতেই ছিল সকল উন্মাদনার প্রতিষেধক। মহান আল্লাহ সকল উন্মাদনা বিদূরিত করার লক্ষ্যেই আপনাকে নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন। এই ঐশী দায়িত্বের কারণেই আপনার চিন্তা ছিল স্বচ্ছ। মেধা ছিল ক্ষুরধার। কর্মক্ষমতা ছিল অসাধারণ।
তাছাড়া প্রকৃত উন্মাদ তো সে, মহান আল্লাহর প্রিয় নবীকে যে উন্মাদ বলে। অথচ এরা শুধু আপনাকে উন্মাদ বলেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং আপনার বিরোধিতা করেছে। আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সুতরাং, তারা মহা উন্মাদ। তাদের চেয়ে বড় উন্মাদ আর কে হতে পারে? 'আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহে আপনি কিছুতেই উন্মাদ নন।'
সবচেয়ে বিজ্ঞ, মহান ও বিবেকবান মানুষটি কীভাবে উন্মাদ হতে পারে? আপনি তো ওহীর প্রজ্বলিত শিখা ধারণ করে সকল মিথ্যেকে নিশ্চিহ্ন করেছেন। সত্য ও মিথ্যের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। অজ্ঞতা ও মূর্খতাকে ভস্মিভূত করে জ্ঞানের আলোক-রেখা ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রতিটি কাজে মহান আল্লাহর অসামান্য সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছেন। সার্বিক নিরাপত্তা পেয়েছেন। সুতরাং, আপনি কিছুতেই উন্মাদ হতে পারেন না।
আপনি তো কখনো সত্য বৈ মিথ্যে বলেননি। কল্যাণ বৈ অকল্যাণের পথে আহ্বান করেননি। আলো বৈ অন্ধকারের দিকে ডাকেননি। আপনি বোদ্ধাদেরও শিক্ষক। জ্ঞানীদেরও প্রশিক্ষক। নেতাদেরও পথপ্রদর্শক। সুতরাং, যে আপনাকে উন্মাদ বলে, সে সুস্পষ্ট মিথ্যেবাদী।
এটা তো সর্বজন স্বীকৃত যে, আপনি বিশ্বকে সত্য ও ন্যায়ের সন্ধান দিয়েছেন। জ্ঞান ও সভ্যতার আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন। সুতরাং, আপনি কিছুতেই উন্মাদ হতে পারেন না। যে-মানুষটা গোটা মানবজাতিকে জ্ঞানের পাথেয় উপহার দিয়েছে, সত্য ও ন্যায়ের সন্ধান দিয়েছে সে কীভাবে উন্মাদ হতে পারে?
কবি ঠিকই বলেছেন-
ঈসার [১] ডাকে প্রাণ ফিরে পেত মড়দেহ
আপনার ডাকে প্রাণ ফিরে পায় যুগান্তরের প্রজন্ম।
[পাঁচ]
وَإِنَّكَ لَتَهْدِى إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন। [২]
হে মুহাম্মাদ, দ্বীনের হিদায়াত ও সত্যের পথ প্রদর্শন আপনার মিশন। পথহারা মানুষের সংশোধন এবং তাদের চিন্তা ও মননের পরিশীলন আপনার দায়িত্ব। তাদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে পাপাচারের নরক থেকে টেনে তোলা আপনার প্রধান লক্ষ্য। আপনি এবং শুধু আপনিই পারেন তাদের সংশোধন করে সরল পথের দিশা দিতে। তাই কেউ যদি প্রকৃত সুখ খুঁজে পেতে চায় তবে সে যেন আপনার পথ অনুসরণ করে। কেউ যদি ইহকালীন নিরাপত্তা ও পরকালীন মুক্তি কামনা করে তবে সে যেন আপনার নীতি ও মতাদর্শ মেনে চলে। কারণ, আপনার সালাত সবচেয়ে সুন্দর। আপনার সিয়াম সর্বাধিক পরিপূর্ণ। আপনার হজ সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আপনার দান সবচেয়ে মহান। আপনার যিকির সবচেয়ে অর্থবহ।
'নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।' সুতরাং, যে আপনার নেতৃত্বে হিদায়াতের তরীতে আরোহণ করবে, সে নির্বিঘ্নে মুক্তির বন্দরে পৌঁছে যাবে। যে আপনার প্রচারিত দ্বীনে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং যে আপনার রিসালাতের রজ্জু আঁকড়ে ধরবে, সে বিচ্যুতি থেকে বেঁচে যাবে।
সুতরাং, যে আপনাকে অনুসরণ করবে সে কখনো লাঞ্ছিত হবে না। যে আপনার দেখানো পথে চলবে, সে কখনো পদস্খলনের শিকার হবে না। যে আপনার আদর্শ ধারণ করবে, সে কখনো পরাস্ত হবে না। আপনার হিদায়াতের তরীতে যে আরোহণ করবে, সে কখনো দিকভ্রষ্ট হবে না। কারণ, আপনার দেখানো পথে বিচ্যুতি থাকতে পারে না। আপনার
অনুসৃত আদর্শে ভ্রান্তি থাকতে পারে না। আপনার পরিচালনায় ত্রুটির ভয় থাকতে পারে না।
‘নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।’ শয়তানের ধোঁকা ও মিথ্যের মরিচীকায় খেই হারানো হৃদয়গুলোকে পথ দেখান। সংশয়ের চোরাবালিতে ডুবে যাওয়া মানুষগুলোকে টেনে তোলেন। নির্জীব প্রাণগুলোকে সজীব করেন। সৃষ্টিকে সৃষ্টির দাসত্ব থেকে উদ্ধার করে মহান আল্লাহর একাত্মবাদের পাঠ দেন।
‘নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।’ - কখনো কাজে, কখনো কথায়, কখনো মৌনে; আবার কখনো আচরণে। কারণ, আপনি আপাদমস্তক হিদায়াতের চাদরে মোড়ানো। সত্য ও সরলতায় জড়ানো। মানব-প্রকৃতির সম্পূর্ণ অনুকূল।
[ছয়]
يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ হে রাসূল, আপনার ওপর আপনার রবের পক্ষ থেকে যা-অবতীর্ণ হয়েছে, আপনি তা পৌঁছে দিন।১ [১]
হে মুহাম্মাদ!, [২] ইসলামের যে-মহান বার্তা আপনার কাছে পূর্ণাঙ্গরূপে প্রেরিত হয়েছে, আপনি যথাযথভাবে তা প্রচার করুন। মানুষের কাছে পৌঁছে দিন। একটি বাক্য, শব্দ এমনকি একটি হরফও যেন ছুটে না যায়। কারণ, এটি ভরসার বাণী। আপনার প্রভুর সুমহান পয়গাম। তাছাড়া আপনাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদও করা হবে। সুতরাং, আপনার ওপর অবতীর্ণ মহাসত্য প্রকাশ করুন। প্রতিটি বার্তা অক্ষরে অক্ষরে প্রচার করুন এবং তা দিয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করুন।
وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ ...আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তার পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না...।২ [৩]
মনে রাখবেন, আপনি কেবলই একজন বার্তাবাহক। কাজেই এতে যা নেই তা সংযোজন কিংবা যা আছে তা থেকে বিয়োজন করার অধিকার আপনার নেই। আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী আপনি প্রেরিত হয়েছেন এক সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য। কাজেই যেভাবে তা আপনার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে, ঠিক সেভাবেই প্রচার করুন। আপনার এই প্রচারিত বাণী কেউ মানবে, কেউ মানবে না। কেউ আপনার অনুসরণ করবে, কেউ করবে না; কিন্তু এ নিয়ে আপনার বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনি আপনার মতো করে সত্য প্রচার করে যান। দুনিয়াবী কোনো কিছু যেন আপনার দায়িত্ব পালনের অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়-সে দিকে লক্ষ্য রাখুন। সব কিছু উপেক্ষা করে অর্পিত দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করুন। মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব পরিপূর্ণ করুন।
আপনি সবার কাছে সযত্নে এই বাণী পৌঁছে দিন। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবা, প্রভু-ভৃত্য, ধনী-গরীব, জিন-ইনসান এবং ক্ষমতাহীন-ক্ষমতাবান-সবাই যেন এই বাণী থেকে উপদেশ লাভ করতে পারে। উপকৃত হতে পারে। সুতরাং, যা আপনার কাছে এসে পৌঁছেছে, তা প্রকাশ করুন। কোনো শত্রুকে পরোয়া করবেন না। উদ্ধত তলোয়ার আর সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনীকে উপেক্ষা করে শুধু নেক নিয়তে প্রচার করতে থাকুন। খেয়াল রাখবেন, সম্পদ যেন আপনাকে মোহগ্রস্ত করতে না পারে। ক্ষমতা যেন আপনাকে অন্ধ করে না ফেলে। সম্মান ও মর্যাদার হাতছানি যেন আপনাকে প্রলুব্ধ না করে-অন্যথায় আপনি দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হবেন।
وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ
...আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তার পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না...। [১]
যদি আপনি এই সত্যের বাণী পূর্ণাঙ্গরূপে প্রচার না করেন, বরং এর একটি শব্দ, বাক্য অথবা বাক্যাংশও গোপন করেন, তবে আপনি ব্যর্থ: আপনার ওপর অর্পিত দায়িত্বপালনে অক্ষম। আল্লাহ যেভাবে আপনার নিকট জিবরীল আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সত্যবার্তা প্রেরণ করেছেন, অবিকল সেভাবেই তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিন।
وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ
... আল্লাহ আপনাকে মানুষের (অনিষ্ট) থেকে রক্ষা করবেন...।। [১]
আল্লাহর প্রেরিত বার্তার ভার বহনে কাউকে ভয় করবেন না। আর কেন-ই বা আপনি ভয় করবেন?-স্বয়ং আমি আল্লাহ আপনার সঙ্গে আছি, আপনার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখছি এবং আপনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি! কেউ আপনার ক্ষতি করতে পারবে না। কেউ আপনার অগ্রগতি রুখতে পারবে না। কেউ আপনার প্রাণ সংহার করতে পারবে না এবং আপনার বহন করা সত্যের মশাল কেউ নেভাতে পারবে না। কারণ, আমি নিজেই আপনার রক্ষাকর্তা। মহাসত্যের প্রতিষ্ঠাতা ও রক্ষাকর্তা। সুতরাং, আপনি নির্ভয়ে সত্যের বাণী প্রচার করুন। সত্যকে প্রকাশ করুন। কোনো সৃষ্টিকে ভয় পাবার কারণ নেই। অবশ্যই আমি আপনাকে রক্ষা করব।
দুনিয়ায় এমন কোনো শক্তি নেই, যা আপনাকে পরাজিত করতে পারে; এমন কোনো সেনাবাহিনী নেই, যারা আপনার প্রাণসংহার করতে পারে। এমন কোনো ক্ষমতাধর বাদশা নেই, যে আপনাকে গোলাম বানাতে পারে। কাজেই, নিশ্চিন্তে সামনে অগ্রসর হোন এবং ইসলামের বাণী প্রচার করতে থাকুন। এ কথা নিশ্চিত যে, আপনি অবশ্যই আপনার রবের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
[সাত]
أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ
আমি কি আপনার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিইনি?[২]
আমি কি আপনার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিইনি? ক্ষমা, দয়া ও মহানুভবতায় আপনাকে সমৃদ্ধ করিনি? ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্ণতা থেকে আপনার মন-মস্তিষ্ককে পবিত্র করিনি? জ্ঞানের আলো ও বিশ্বাসের জ্যোতিতে আপনার হৃদয়কে পরিপূর্ণ করিনি? আত্মিক সুখ ও মানসিক শান্তিতে আপনার মনোজগৎ ভরে দিইনি?
আমি কি আপনার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিইনি? আপনাকে বিশাল হৃদয়ের অধিকারী বানাইনি? আপনি কি অন্যের দুর্বলতা গোপন করেন না? আপনি কি মানুষের বিরূপ আচরণ উপেক্ষা করেন না? নির্বোধদের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করেন না? মুর্খদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখেন না? দুস্থ, দুর্বল ও অভাবীদের সাহায্য করেন না? অবশ্যই আপনি এগুলো করেন। কারণ, আমি আপনার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি।
আমি আপনার বক্ষকে উন্মুক্ত করে দিয়েছি—যাতে আপনি বয়ে যাওয়া সেই বাতাসের মতো হন, যা সবার জন্য উন্মুক্ত ও কল্যাণকর। এজন্য মানুষ আপনার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে, আপনি তাদের ফিরিয়ে দেন না; বরং শত্রু ও বিপদের ভয় উপেক্ষা করে সাহায্য করেন। অভাবের ভয় না করে মুক্তহস্তে দান করেন।
আমি আপনার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি—যাতে এটা আপনার জন্য শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনে; যাতে বিদ্বেষীদের উগ্র বাক্যবাণে জর্জরিত হলেও আপনার হৃদয়ে কেবলই দয়া, ক্ষমা ও সহনশীলতার উদ্রেক ঘটে।
আমি আপনার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি—যাতে আপনি বেদুঈনদের বেপরোয়া আচরণে ধৈর্যধারণ করতে পারেন। প্রতিপক্ষের ঔদ্ধত্য, বিদ্বেষ ও শত্রুভাবাপন্ন আচরণ সহ্য করতে পারেন। তাদের সকল ষড়যন্ত্রের মুখে অটল ও অবিচল থাকতে পারেন।
আমি আপনার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি—যাতে কঠিন বিপদেও আপনার মুখে হাসি লেগে থাকে। সঙ্কটে নিপতিত হয়েও হৃদয়ে অটুট আস্থা ও কৃতার্থতা বিরাজ করে। এক কথায়, বৈষয়িক দুঃখ-কষ্ট ও রোগ-শোকে আপনি অবিচল ও দৃঢ়পদ থাকেন।
আমি আপনার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি—যাতে সেখানে অজ্ঞতা, রূঢ়তা ও কঠোরতা বাসা বাঁধতে না পারে; বরং সেখানে যেন কেবলই দয়া, অনুকম্পা ও কোমলতা অবস্থান করে।
وَوَضَعْنَا عَنْكَ وِزْرَكَ
আমি লাঘব করেছি আপনার বোঝা। [১]
আমি আপনাকে পাপের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করেছি। আপনার সকল ভ্রান্তির বীজকে বিনষ্ট করেছি। আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে
দিয়েছি। সুতারং, এখন আপনি ক্ষমালাভের সুসংবাদ গ্রহণ করুন। মহাসাফল্য অর্জনের অভিনন্দন গ্রহণ করুন।
الَّذِي أَنْقَضَ ظَهْرَكَ
যা ছিল আপনার জন্য অতিশয় দুঃসহ।। [১]
নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব আপনাকে ভারাক্রান্ত করে ফেলেছিল। এর ভার বহন আপনার জন্য কষ্টকর ও দুর্বহ হয়ে পড়েছিল এবং আপনাকে ক্রমশ দুর্বল করে ফেলছিল; কিন্তু এখন আপনাকে এর ভার থেকে মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। তাই ভারমুক্তির সুসংবাদ গ্রহণ করে আনন্দিত হোন।
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
আমি আপনার আলোচনাকে সমুচ্চ করেছি। [২]
যেখানে আমার আলোচনা হয় সেখানে আপনারও আলোচনা করা হয়। আমাদের দুজনের নাম সব সময় পাশাপাশি থাকে। আযানের সময়, সালাতের সময়, গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময়-যখন যেখানে আমাকে ডাকা হয়, সেখানে আপনার প্রিয় নামটিও উচ্চারিত হয়। এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে? সালাত পালনকারী, হজ আদায়কারী, খুতবা প্রদানকারী-সবাই সবখানে আমার সাথে আপনাকেও স্মরণ করে। আপনি কি এর চেয়েও বড় মর্যাদা চান?
তাছাড়া তাওরাত ও ইঞ্জিলেও আপনার কথা বলা আছে। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে আপনাকে সম্মানিত করা হয়েছে।
আমি আপনার আলোচনাকে সমুচ্চ করেছি-যাতে আপনার নাম সূর্যের আলোর মতো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে; আলোর গতিতে সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দেয়; প্রত্যেক নগরবাসী আপনাকে চেনে, প্রত্যেক জনপদ আপনার নাম জানে, সবাই শুধু
আপনার কথা জিজ্ঞেস করে। ছোট থেকে বড়—সব মজলিসে আপনাকে স্মরণ করে।
আমি আপনার আলোচনাকে সমুচ্চ করেছি। এজন্যই এত এত বছর কেটে যাবার পরও কেউ আপনাকে ভুলে যায়নি। আপনার নাম ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যায়নি। কত মানুষেরই তো গৌরবময় ইতিহাস আছে! কিন্তু তাদের কয়জনকে মানুষ মনে রেখেছে? তাদের কয়জনকে মানুষ চর্চা ও অনুসরণ করছে?
মুসলিমজাতির কেউ যদি স্মরণীয় হয়ে থাকে তবে সেটা এজন্য যে, সে আপনাকে চর্চা করেছে। আপনার দেখানো পথ অনুসরণ করেছে। এজন্যই মানুষ হাদীস মুখস্থকারী ও বর্ণনাকারীদের মনে রেখেছে। কারণ, তারা আপনার বাণী ধারণ ও প্রচারের দুর্লভ সম্মান লাভ করেছে।
সময়ের ভাঙনে কত সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে! অথচ আপনার নামে একটু আঁচড়ও লাগেনি। আপনার সুন্নাহ, আপনার ওপর নাযিলকৃত কুরআন—সবই এখনো আগের মতোই আছে। কোথাও পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। রাজাদের রাজত্ব শেষ হয়ে গেছে, অথচ আপনার সম্মান-সম্ভ্রম আগের মতোই রয়ে গেছে; বরং আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, হৃদয়ের ব্যাপ্তিতে, চিন্তার গভীরতায় এবং আদর্শের উচ্চতায় আজও কেউ আপনার সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেনি।
আমি আপনার নামকে সমুন্নত করেছি। যখন কোনো সালাত আদায়কারী তাশাহুদ পড়ে, তখন সে আমার সাথে আপনাকেও স্মরণ করে। যখন কোনো হজ পালনকারী বাইতুল্লাহর গিলাফ ধরে আমাকে ডাকে তখন সে রওজার পাশে দাঁড়িয়ে আপনাকেও স্মরণ করে। তাই সকল প্রশংসা আপনার রবের—যিনি আপনাকে এত উঁচু মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন।'
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
নিশ্চয় কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি। [১]
বিপদে পড়ে যখন মনে হবে, মুক্তির পথ হয়তো রুদ্ধ হয়ে গেছে; সংকটে পড়ে যখন মনে হবে, উত্তরণের পথ অবরুদ্ধ হয়ে গেছে; তখনই বুঝবেন, রাত পোহাবার অতিঅল্প সময় বাকি আছে; অবারিত মুক্তি ও শান্তি আপনাকে অদূরেই হাতছানি
দিচ্ছে। সুতরাং, হতাশ হবেন না। অভাবের পরেই প্রাচুর্য আসে। অসুস্থতার পরেই সুস্থতা আসে। দুঃখের পরেই সুখেরা দল বেঁধে ছুটে আসে। ভয়ের পরেই নিরাপত্তা ফিরে আসে। তবে এজন্য মাঝের সময়টুকু ধৈর্যসহকারে অপেক্ষা করতে হয়। এই অপেক্ষার জন্যই সুখ, সচ্ছলতা ও নিরাপত্তার এত মূল্য!
হে মুহাম্মাদ, আপনি এবং আপনার অনুসারীরা অবশ্যই সুদিন দেখবেন। আল্লাহর অনিঃশেষ নিয়ামত প্রত্যক্ষ করে কৃতার্থ হবেন। আজ অথবা কাল-বিজয় আপনাদেরই হবে। কারণ, এটা পরিষ্কার যে, জীবনে কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। রাতের পরেই দিন আসে। কষ্টের বিশাল পাহাড় অতিক্রম করলেই বিস্তীর্ণ সমতল ভূমির দেখা মেলে। শুষ্ক মরুর শেষেই সবুজের সমারোহ হৃদয় কাড়ে।
তাছাড়া কথায় আছে-বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো। অর্থাৎ, নিয়মের কড়াকড়ি যত বাড়বে ফাঁকি দেওয়া ফাঁকফোকরও তত বৃদ্ধি পাবে। এই কথাটি কষ্টের ক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য। কেননা, কষ্ট ও দুঃখ-দুর্দশা যখন চরমে গিয়ে পৌঁছে, ঠিক তখনই তার সমাপ্তি ঘটে। শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসে। পথিক তখন খুব সহজেই ঠিকানা খুঁজে পায়। অভাবী ব্যক্তি সচ্ছলতা ফিরে পায়। রোগী আরোগ্য লাভ করে। কয়েদী মুক্তি পায়। আশ্রয়প্রার্থী নিরাপদ আশ্রয় পায়। তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা মিটে যায়। এক কথায়, অবস্থা যা-ই হোক না কেন, সবর ও শোকরের পরিচয় দিলে আল্লাহ অবশ্যই কষ্টের পরে স্বস্তি ফিরিয়ে দেন।
সূরা ইনশিরাহ'র এই অংশটি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল জীবনের কঠিনতম সময়ে-যখন দুঃখ-দুর্দশা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল। আত্মীয়-পরিজন দূরে সরে গিয়েছিল। স্বগোত্রের লোকেরা ঠাট্টা-বিদ্রূপে মেতে উঠেছিল। কাফির-মুশরিকদের নির্যাতন ও ষড়যন্ত্র মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধৈর্যের চূড়ান্ত সীমায় উপনীত হয়েছিলেন-তখন আল্লাহ তাকে বিপদমুক্তির আশ্বাস ও নিরাপত্তার সুসংবাদ দিতে সূরা ইনশিরাহ নাযিল করেন। এতে উল্লেখিত সকল ওয়াদাই আল্লাহ পূরণ করেন। তাই কিয়ামতের আগ পর্যন্ত তা মানুষের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। সূরার পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে—
فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ
অতএব, আপনি যখনই অবসর পান তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হোন।১৯ [১]
পার্থিব কাজ-কর্ম ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততা সেরে একান্তে আমার ইবাদাত করুন। আমাকে স্মরণ করুন। আমার কাছে প্রার্থনা করুন। মানুষের অভিযোগ-আবেদন সমাধা করামাত্রই আমার দ্বারস্থ হোন। সামাজিক দায়িত্ব থেকে অবসর হয়েই আমাকে ডাকুন। আমার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করুন। আমার সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ুন। মনে রাখবেন, যদি আপনি শুধু আমারই জন্য কপালকে ধূলিধূসরিত করেন, তবে আমি আপনাকে এনে দেবো নিরাপত্তা, সাফল্য এবং চিরমুক্তি।
স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজন এবং আত্মীয়-স্বজনকে সময় দেওয়া শেষ হলে আমার যিকির-ইবাদাতে সময় দিন। আপনার সমস্যা আমি জানি। তবুও আমাকে কায়মনোবাক্যে সমস্যা সম্পর্কে অবগত করুন। আপনার প্রয়োজনে কেবল আমার কাছেই প্রার্থনা করুন। বিপদে আমার সাহায্য গ্রহণ করুন। অপরাধ হয়ে গেলে আমারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
মানুষকে দ্বীনের শিক্ষা ও কল্যাণের পথ দেখানো শেষেও আমার কাছেই ফিরে আসুন। আমার কাছে এলেই আমি আপনাকে করুণার চাদরে জড়িয়ে নেবো। আমার কাছে চাইলেই আমি নিয়ামত বাড়িয়ে দেবো। নিজের ওপর আপনার যতটা না অধিকার আছে, তারচেয়ে বেশি অধিকার আছে আমার। কারণ, আমি আপনাকে সৃষ্টি করেছি। আপনার সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। সুতরাং, আপনি ও আপনার অবসর তো আমারই অধিকার।
وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ এবং আপনার পালনকর্তার প্রতি মনোনিবেশ করুন। [১]
আমি ছাড়া আর কারও শরণাপন্ন হবেন না। আর কারও সাহায্য চাইবেন না। কেবল আমারই শরণাপন্ন হবেন। আমারই সাহায্য প্রার্থনা করবেন; আমারই ওপর ভরসা করবেন এবং একমাত্র আমাকেই ভয় করবেন। কারণ, পুণ্যবানদের সাহায্য প্রদানে এবং পাপিষ্ঠদের শাস্তিবিধানে আমিই যথেষ্ট। তাই শুধু আমাকেই ভয় করুন। আমার ওপরই আশা রাখুন। আমারই ইবাদাত করুন। আমার প্রতিই মনোনিবেশ করুন। আমি আপনাকে সাহায্য করব, নিরাপত্তা দেবো এবং প্রাচুর্যময় করব।
[আট]
إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا
নিশ্চয় আমি আপনাকে দান করেছি সুস্পষ্ট বিজয়। [১]
হে মুহাম্মাদ, আমি আপনাকে মহান বিজয় দান করেছি। আপনার জন্য মানুষের হৃদয়কে কোমল ও উর্বর করে দিয়েছি; ফলে আপনি সেখানে ঈমানের বৃক্ষ রোপণ করতে সক্ষম হয়েছেন। আমি আপনার জন্য তাদের বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি; ফলে আপনি সেখানে বিশ্বাসের বীজ বপন করতে পেরেছেন। আমি আপনাকে রাজনৈতিক বিজয় দান করেছি; ফলে আপনি বিশ্বব্যাপী সত্য ও হিদায়াতের বাণী প্রচার করতে সমর্থ হয়েছেন। আমি আপনার জন্য জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছি; ফলে আপনি জ্ঞানের আলোয় জগৎ উদ্ভাসিত করতে পেরেছেন। জিন-ইনসান সকলের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে সমর্থ হয়েছেন।
অথচ এই কিছুদিন আগেও আপনি অবরুদ্ধ ছিলেন; জ্ঞানের স্পর্শ-বঞ্চিত নিরক্ষর ছিলেন; কিন্তু আজ জগদ্বিখ্যাত জ্ঞানী-গুণীরা আপনার দ্বারে ভিড় জমায়—আপনার জ্ঞান-সাগর থেকে উপকৃত হওয়ার আশায় সকাল-সন্ধ্যা ধরনা দেয়।
আমি আপনাকে সম্পদ দিয়েছি—যাতে করে আপনি পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে হাত খুলে দান করতে পারেন। আমার দেওয়া সম্পদ থেকেই আপনি অন্নহীনকে অন্ন দিয়েছেন। বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দিয়েছেন। অসহায়কে সাহায্য করেছেন এবং নিঃস্বকে দান করেছেন।
আমি আপনাকে মহান বিজয় দান করেছি। শহর-নগর, গ্রাম-জনপদ—সব আপনার অধীন করে দিয়েছি। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমি আপনাকে সঙ্গ দিয়েছি। সাহায্য করেছি। পথ দেখিয়েছি। ফলে আপনার প্রচারিত দ্বীন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আপনার মতাদর্শ অনুসৃত হয়েছে। ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তৃতি লাভ করেছে। সুতরাং, কেবল আমার প্রতিই বিনীত থাকুন। আমারই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।
[নয়]
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। [১]
হে মুহাম্মাদ, এখন যেহেতু আপনি জেনেই গেছেন যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাই তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবেন না। তিনি ছাড়া আর কারও কাছে প্রার্থনা করবেন না; বরং শুধুই তাঁর ইবাদাত করবেন। কোনো কিছু চাইতে হলে তাঁরই কাছে চাইবেন। কারণ, एकमात्र তিনিই আপনাকে মন্দ ও অনিষ্টের হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন; আপনার অভাব দূর করার মতো প্রাচুর্য ধারণ করেন। তিনি ছাড়া আর কেউ কোনো অভাবীর অভাব দূর করতে পারে না।
জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। সুতরাং, কেবল তাকেই মান্য করবেন। তাকেই ভালোবাসবেন। তাকেই ভয় করবেন। তাঁর আনুগত্যের বাইরে গিয়ে কাউকে মান্য করবেন না। তাঁর ভালোবাসাকে উপেক্ষা করে কাউকে ভালোবাসবেন না। তাকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবেন না। মনে রাখবেন, যে তাকে যত বেশি ভালোবাসে, সে তাঁর তত বেশি নৈকট্য লাভ করে। যে তাকে যত বেশি মান্য করে, সে তাঁর তত বেশি সন্তুষ্টি লাভ করে। যে তাকে যত বেশি ভয় করে, সে তাঁর শাস্তি থেকে তত বেশি নিরাপদ থাকে। যে তাঁর যত বেশি প্রশংসা করে সে তত বেশি পুরস্কার লাভ করে। একইভাবে যে তাঁর অবাধ্য হয়, তাকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয়। যে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে, সে অনিবার্য ধ্বংসের শিকার হয়।
জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। সুতরাং, যে তাকে ছাড়া অন্য কারও উপাসনা করবে, সে জাহান্নামের প্রজ্জ্বলিত আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। যে তাকে অবিশ্বাস করবে, সে চরম লাঞ্ছনাকর শাস্তির মুখোমুখি হবে। আসমান-যমীনে কেবল তাঁরই রাজত্ব ও উপাসনা চলবে এবং বিচার দিবসে হিসেবের জন্য তাঁরই সামনে সবাইকে দাঁড় করানো হবে।
জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। সুতরাং, একমাত্র তাঁরই ইবাদাতে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন। আপনার সকল নির্ভরতা হোক কেবল তাঁরই প্রতি। তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দুঃসময়ের ত্রাণকর্তা ও নিরাপত্তা দানকারী। কাজেই আপনার সার্বিক কল্যাণ ও প্রয়োজনের জন্য তিনিই যথেষ্ট। মন খুলে তাঁর কাছে প্রার্থনা করুন। তাঁর শাস্তিকে ভয় করুন। শাস্তিদাতা হিসেবে তিনি অত্যন্ত কঠোর। তাঁর শাস্তি মানুষের কল্পনারও অতীত। কখনো তাঁর বেঁধে দেওয়া সীমা অতিক্রম করবেন না। এমনকি তাঁর অনুগত বান্দাদেরও বিরোধিতা করবেন না। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ তাদের হয়ে প্রতিশোধ নিয়ে থাকেন।
তাঁর কাছে ক্ষমা ও আশ্রয় প্রার্থনা করুন। পুরস্কারেরও আশা রাখুন। কারণ, একমাত্র তিনিই বান্দার অপরাধ ক্ষমা করার অধিকার রাখেন। বান্দাকে আশ্রয় ও পুরস্কার দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সামর্থ্য রাখেন। সুতরাং, তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসা ও কল্যাণ পেতে হলে তাঁর স্মরণকে অভ্যাসে পরিণত করুন—না, বরং নেশায় পরিণত করুন। সেই সঙ্গে তাঁর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন। ধর্মীয় বিধি-নিষেধকে সম্মান করুন। ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন। এভাবে আপনি সরাসরি আল্লাহর জিম্মায় চলে যাবেন এবং বিজয় ও মহাপুরস্কারে ভূষিত হবেন।
[দশ]
اقْرأْ
পড়ো [১]
নবুওয়াতের গল্পটা শুরু হয়েছিল ‘পড়ো’ দিয়ে। হেরা গুহায় অবস্থানরত মানুষটিকে যেদিন এই আহ্বান জানানো হয়েছে, সেদিনই মুসলিমজাতি হিসেবে আমাদের জন্ম হয়েছে; জ্ঞান ও সভ্যতার পথে মানবতার যাত্রা শুরু হয়েছে; পৃথিবীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য নতুন পথে মোড় নিয়েছে। কাজেই ‘পড়ো’ আমাদের শেকড়। গর্ব ও অহংকার। ইতিহাস-ঐতিহ্যের সূতিকাগার।
এই ‘পড়ো’র মাধ্যমেই মহান আল্লাহ সত্য ও মিথ্যের পার্থক্য রচনা করেছেন। আলো ও আঁধারকে আলাদা করেছেন। অজ্ঞতাকে বিদূরিত করে জ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত
করেছেন। আরবী শব্দকোষের বিশাল ভাণ্ডার থেকে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে উচ্চারণ করতে বললেন, 'পড়ো'। তিনি বলতে পারতেন 'লেখো', 'প্রার্থনা করো', 'বলো', 'ভালো কাজ করো' ইত্যাদি; কিন্তু তিনি তা করেননি; বরঞ্চ সত্যের উন্মোচন ঘটিয়েছেন সাধারণ অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ 'পড়ো' শব্দ দিয়ে। 'পড়ো' শব্দ দিয়ে আলোর পথের এই যাত্রা শুরু করার রহস্য এটাই ছিল যে-'হে মুহাম্মাদ, আপনি অন্যকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার পূর্বে নিজে পড়ুন; ভালো কাজ শুরু করার পূর্বে জ্ঞান অন্বেষণ করুন এবং 'জেনে রাখুন, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আর ক্ষমাপ্রার্থনা করুন-নিজের ত্রুটির জন্য...।' [১]
উল্লেখ যে, পড়া কোনো শখের বিষয় না; অবসর কাটানোর বিষয় তো কিছুতেই না; বরং পড়া হলো জীবনের চালিকাশক্তি। কাজেই জীবনকে গতিশীল করতে হলে মূর্খতাকে পরিত্যাগ করে জ্ঞান অন্বেষণ করার কোনোই বিকল্প নেই-বরং এটাই মানুষের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আমার পিতা-মাতা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য কুরবান হোক! তিনি কীভাবে পড়বেন? কী দিয়ে শুরু করবেন? তিনি তো কারও কাছ থেকে লেখাপড়া শেখেননি। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও শেখার চেষ্টা করেননি। তবে কীভাবে পড়বেন? কী দিয়ে শুরু করবেন? তার এই অজস্র প্রশ্ন ও অজ্ঞতার অবসান ঘটিয়ে তৎক্ষণাৎ অবতীর্ণ হয়-'পড়ুন আপনার প্রভুর নামে। যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন।'
সেই সঙ্গে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, এখন থেকে আপনি আপনার রবের বাণী পড়বেন এবং তাঁরই নামে শুরু করবেন। এখন থেকে প্রতিনিয়ত আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনাকে জ্ঞানমূলক প্রত্যাদেশ করা হবে। আপনি তা নিজে পড়বেন এবং অন্যদেরও পড়ে শোনাবেন।
'পড়ো'-এর মাধ্যমে একটি জাতির গোড়াপত্তন ও একটি ধর্মের শুভসূচনা বিশ্বমানবতার সামনে জ্ঞানার্জনের তীব্র গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা তুলে ধরে। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা সুখ ও সাফল্য অর্জন করেছে, তারা জ্ঞানকেই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। কারণ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অবতারিত প্রথম ওহী- 'পড়ো'-এর মধ্যে প্রভৃত কল্যাণ নিহিত আছে। কেননা, এই বার্তা প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং পুণ্যকর্মের মধ্যে সুসামঞ্জস্য বিধান করে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
إِنَّ مَثَلَ مَا بَعَثَنِي اللهُ بِهِ مِنَ الْهُدَى وَالْعِلْمِ كَمَثَلِ غَيْثٍ
মহান আল্লাহ আমাকে যে-জ্ঞান ও দিক-নির্দেশনা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার উদাহরণ হলো বর্ষণমুখর মেঘমালার ন্যায়। (যা আসমান থেকে বর্ষিত হয়ে ফসল ফলায়)। [১]

টিকাঃ
১. সূরা আনফাল, আয়াত: ৬৪
১. সূরা তাওবা, আয়াত: ৪০
১. সূরা কালাম, আয়াত : ৪
২. সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
১. সূরা কালাম, আয়াত: ২
১. আলাইহিস সালাম
২. সূরা শূরা, আয়াত: ৫২
১. সূরা মায়িদা, আয়াত: ৬৭
২. সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
৩. সূরা মায়িদা, আয়াত: ৬৭
১. সূরা মায়িদা, আয়াত: ৬৭
১. সূরা মায়িদা, আয়াত: ৬৭
২. সূরা ইনশিরাহ, আয়াত: ১
১. সূরা ইনশিরাহ, আয়াত: ২
১. সূরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৩
২. সূরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৪
১. সূরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫
১. সূরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৭
১. সূরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৮
১. সূরা ফাতহ, আয়াত : ১
১. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ১৯
১. সূরা আলাক, আয়াত : ১
১. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ১৯
১. সহীহ বুখারী: ৭৯; সহীহ মুসলিম: ২২৮২; হাদীসটি আবু মুসা আশ'আরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 নবীজির কান্না

📄 নবীজির কান্না


কান্না ভালো, না মন্দ? পুরুষের চোখে অশ্রু শোভা পায়, না পায় না? কান্না কি মেয়েলি স্বভাবের বহিঃপ্রকাশ? -সে ব্যাপারে অনেকে সন্দিহান হলেও এতটুকু সুনিশ্চিত সত্য যে, সব সময় চোখের জল ফেলা কাম্য নয়; প্রশংসনীয় তো কিছুতেই নয়; বরং ক্ষেত্রবিশেষ অবশ্যই তা পৌরুষের বিপরীত, কিংবা নিতান্তই বোকামি।
তারপরও জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন অশ্রু সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। সে-সব মুহূর্তে বরং কান্নাই স্বাভাবিক, সহজাত ও প্রশংসনীয়।
আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনরত চোখের চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে? বস্তুত নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাওয়া এবং আল্লাহর স্মরণে অশ্রু বিসর্জন দেওয়া একটি মহৎ গুণ। অনুশোচনা ও পবিত্রতার বহিঃপ্রকাশ। এ অবস্থায় চোখের জল প্রশংসার দাবি রাখে। এমন দামি অশ্রুজলের প্রশংসা করে মহান আল্লাহ বলেন—
إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا
তাদের কাছে যখন দয়াময় আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং ক্রন্দন করে। [১]
وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا
তারা ক্রন্দন করতে করতে অবনত মস্তকে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়ভাব আরও বৃদ্ধি পায়। [১]
وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ
আর তারা রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যখন শোনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রুপূর্ণ দেখতে পাবেন; এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনতে পেরেছে। [২]
অপরদিকে কঠোর হৃদয় ও কঠিন স্বভাবের লোকদের তিরস্কার করে বলেন-
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ ۞
তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? হাসছ? কাঁদছ না?[৩]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হৃদয় ছিল অত্যন্ত কোমল। তিনি আল্লাহকে সর্বাধিক ভালোবাসতেন। সর্বাপেক্ষা বেশি ভয় করতেন। তাঁর ভয় ও ভালোবাসায় অশ্রু বিসর্জন দিতেন। পরকালের চিন্তা, জাহান্নামের বর্ণনা, আল্লাহর শাস্তির ভয়—সব কিছুই তাঁর চোখকে অশ্রুসজল করে তুলত। কুরআন তিলাওয়াতের সময় প্রায়ই তাঁকে চোখের পানি ফেলতে দেখা যেত। তাঁর এ কান্না সাহাবীদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলত।
এক রাতের ঘটনা। হঠাৎ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুম থেকে উঠে সালাতে দাঁড়িয়ে যান এবং নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করে কাঁদতে কাঁদতে সারাটা রাত কাটিয়ে দেন—
إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمِ
যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার বান্দা। (সুতরাং, শাস্তি দিতেই পারেন।) আর যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞ।১। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার ইবনু মাসউদকে বলেন, 'আমাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাও।' ইবনু মাসউদ উত্তর দেন, 'আমি আপনাকে শোনাবো! কুরআন তো আপনার ওপরই অবতীর্ণ হয়! নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তুমি তিলাওয়াত করো। অন্যের তিলাওয়াত শুনতে আমার খুব ভালো লাগে।' এ কথা শুনে ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সূরা নিসা তিলাওয়াত করতে শুরু করেন। যখন এই আয়াতে এসে পৌঁছেন-
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا
অতঃপর, যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব তখন কী অবস্থা হবে? [২]
তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'থামো, আপাতত এটুকুই তোমার জন্য যথেষ্ট।' এর পরবর্তী অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তিলাওয়াত শেষ করে আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখি, তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।' [৩]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই এভাবে অন্যের তিলাওয়াত শুনতেন। তিলাওয়াত শুনে হতবিহ্বল হয়ে যেতেন। একরাতে তিনি অত্যন্ত চুপিসারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর তিলাওয়াত শোনেন। পরদিন
সকালে তাকে ডেকে বলেন, 'আমি গতরাতে তোমার তিলাওয়াত শুনে মুগ্ধ হয়েছি। তোমাকে তো দাউদ আলাইহিস সালাম-এর কণ্ঠসুর দেওয়া হয়েছে! আচ্ছা, তুমি যদি আমার উপস্থিতি আঁচ করতে পারতে তাহলে কী করতে? আবু মূসা আশআরী বলেন, 'যদি আমি জানতাম, আপনি আমার তিলাওয়াত শুনছেন, তাহলে আরও সুন্দর করে তিলাওয়াত করার চেষ্টা করতাম।'[১]
সহীহ সূত্রে বর্ণিত অপর একটি হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু শিখখীর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'একবার আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে যাই। গিয়ে দেখি, তিনি সালাত আদায় করছেন। কান্নাজনিত কারণে তার বুক থেকে ফুটন্ত ডেকের মতো শব্দ হচ্ছে—তিনি শিশুদের মতো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন।'
আরেক দিনের ঘটনা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় কন্যা যাইনাব রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর জানাযায় উপস্থিত হন। জানাযার পর তিনি যখন মাইয়িতকে কবরে রাখার জন্য ভেতরে প্রবেশ করেন তখন কবরের সংকীর্ণতা দেখে এবং ভয়াবহতা চিন্তা করে তার চোখদুটো অশ্রু-ছলছল হয়ে ওঠে। কারণ, তিনি মৃত্যু, মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থা এবং জান্নাত-জাহান্নামের অনন্ত জীবন সম্পর্কে জানতেন। তাই তার চোখজুড়ে অশ্রুর বাঁধভাঙা জোয়ার নেমে আসে। নবীজির এই কান্না দেখে সাহাবীগণ শিউরে ওঠেন। কারণ, তারা জানতেন, যার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়েছে, তিনিই যদি এভাবে কাঁদেন, তবে তাদের এর চেয়েও বেশি কাঁদতে হবে!
তাই আল্লাহর জন্য ক্রন্দন করার এই মহৎ গুণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়ে গেছেন এবং ক্রন্দনের অনন্য সাধারণ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করে আমাদের উৎসাহিত করেছেন। হাশরের ময়দানে আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। আর সেই আরশের নিচে সাত শ্রেণির লোক ছাড়া আর কেউ জায়গা পাবে না। সেই সাত শ্রেণির একটি শ্রেণির বর্ণনা দিতে গিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'এবং ওই ব্যক্তি সেই ছায়ায় আশ্রয় পাবে—যে নিভৃতে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়।' [২]
অপর এক হাদীসে এসেছে-
GG عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ : عَيْنُ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ الله، وَعَيْنُ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِي سَبِيلِ الله
দুই প্রকারের চোখকে জাহান্নামের আগুন কোনো দিন স্পর্শ করতে পারবে না। এক. যে-চোখ আল্লাহর ভয়ে কাঁদে। দুই. যে-চোখ দ্বীন রক্ষায় জিহাদের ময়দানে বিনিদ্র জেগে থাকে।
যে-চোখ আল্লাহর ভয়ে ভিজে ওঠে, সৃষ্টির নিদর্শন দেখে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আর্দ্র হয়ে ওঠে, বিচার দিবসে আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার ভয়ে ছলছল হয়ে ওঠে-সে-চোখ আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। সে-চোখের অশ্রু ইসলামে প্রশংসনীয়। কারণ, এই চোখ, এই অশ্রু এবং এই কান্নাই নিজেকে আল্লাহর হাতে সঁপে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম। কাজেই পাপের অনুশোচনা থেকে যে-কান্না আসে, সে-কান্না সবচেয়ে দামি। আল্লাহর শাস্তির ভয়ে এবং আখিরাতের চিন্তায় যে-চোখের পাতাদুটো ভিজে ওঠে সে-চোখ সবচেয়ে মহান। ঈমান ও আনুগত্যের স্বল্পতার কথা ভেবে মনের গভীরে যে-শূন্যতা তৈরি হয়, চোখের কোণে যে-মেঘ জমা হয় সেই শূন্যতা ও অশ্রুবৃষ্টি সবচেয়ে প্রশংসনীয়।
কিন্তু পার্থিব কোনো কিছুর জন্য কান্না মোটেও প্রশংসনীয় নয়। ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ায় কোনো কিছু না পাওয়া, কিংবা অবাঞ্ছিত কিছু পেয়ে দুঃখ করতে থাকা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। পৃথিবী এবং পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিতান্তই খেলার সামগ্রী। একেবারেই তুচ্ছ বস্তু। কাজেই এর জন্য কান্না ও অশ্রুপাত গ্রহণযোগ্য নয়; পৌরুষের পরিচয় তো কিছুতেই নয়।
উল্লেখ্য যে, কান্নার ক্ষেত্রেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুসরণীয়। কারণ, তিনি নিজেও আল্লাহকে ভালোবেসে ভয় করতেন; তাঁর শাস্তির কথা চিন্তা করে ক্রন্দন করতেন। তিনি জানতেন, পার্থিব-জীবনই শেষ নয়; বরং অনন্ত জীবনের শুরুমাত্র। এই জীবন পুণ্যময় হলে আখিরাতের জীবন সুখময় হবে। তাই তিনি সেই অনন্ত জীবনের কথা ভেবে কাঁদতেন।
দুনিয়াবাসীর নিকট যা চরম আকাঙ্ক্ষিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তা মূল্যহীন। সম্পত্তি অর্জনে ব্যর্থতা, প্রেমাষ্পদকে বিয়ে করতে না পারার
মনস্তাপ কিংবা ব্যবসায় ক্ষয়ক্ষতি-কোনো দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কান্নার কারণ হতে পারেনি। এমনকি তার চিন্তায়ও আসতে পারেনি। কখনো যদি তার মন দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত, চোখজোড়া আর্দ্র হয়ে উঠত তবে সেটা একান্তই মহান আল্লাহর জন্য হতো। আর যদি কান্নার পরিবর্তে মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠত তবে সেটাও কেবল তার রবের সৌজন্যেই হতো। একারণেই তার জীবনের প্রতিটি আচরণ, উচ্চারণ এমনকি মৌন আচরণও আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন-
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। [১]
কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যক্তির কান্নাকাটি দেখে কারও মনে দয়ার উদ্রেগ হয় না; বরং ভণিতা মনে হয়। মানুষের কাছে এ ধরনের কান্না মূল্যহীন; কিন্তু উন্নত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কান্না ছিল খাঁটি। হৃদয় নিংড়ানো। চোখ জুড়ানো। তার কান্নার প্রভাব ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তার কান্না সাহাবীদের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করত। তাই নবীজিকে কাঁদতে দেখলে তারাও কেঁদে ফেলতেন। তিনি যখন মিম্বরে দাঁড়িয়ে পুনরুত্থান দিবসের বর্ণনা দিতেন তখন কেঁদে ফেলতেন। তার কান্নাবিজড়িত সকরুণ বর্ণনায় সাহাবীগণও কাঁদতেন। তাদের কান্না গুমোট মেঘের মতো মসজিদময় গুঞ্জরিত হতো।
একই ভাবাবেগ সবাইকে আচ্ছন্ন করে ফেলত। কেউ-ই এই কান্নার প্রভাব এড়াতে পারত না; আবেগ সামলাতে পারত না।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কান্না মানুষকে ছুঁয়ে যেত। কারণ, তার হৃদয়ে ছিল আল্লাহর প্রতি সর্বোচ্চ ভয় ও সীমাহীন ভালোবাসা। কাজেই তার অশ্রুর প্রতিটি ফোঁটা যেন কথা বলে উঠত। প্রেম ও ভয়ের পাঠ দিত। অশ্রুর এই নীরব পাঠ বাগ্মী বক্তাদের সাহিত্যপূর্ণ ভাষণের চেয়েও বেশি আবেদনময় হতো। বেশি হৃদয়গ্রাহী হতো।
হে আল্লাহ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার পরিবার-পরিজন ও সাহাবাদের আমাদের সালাম পৌঁছে দিন।

টিকাঃ
১. সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৮
১. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ১০৯
২. সূরা মায়িদা, আয়াত: ৮৩
৩. সূরা নাজম, আয়াত: ৫৯-৬০
১. সূরা মায়িদা, আয়াত: ১১৮
২. সূরা নিসা, আয়াত: ৪১
৩. সহীহ বুখারী: ৪৫৮২, ৫০৫৫; সহীহ মুসলিম: ৮০০, হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সুনানু কুবরা: ৪৪৮৪, ২০৮৪১; শুআব: ২৬০৪
২. সহীহ বুখারী: ৬৬০, ১৪২৩, ৬৮০৬; সহীহ মুসলিম: ১০৩১, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
১. সূরা আহযাব, আয়াত: ২১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00