📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 নবীজির দয়া

📄 নবীজির দয়া


মহামহিম আল্লাহ তার প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দয়া-গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন—
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি। [১]
একটি হাদীসে এসেছে—
إِنَّمَا أَنَا رَحْمَةٌ مُهْدَاةٌ
আমি মহান আল্লাহর দয়া বিশেষ এবং তার দিকে পথপ্রদর্শক। [২]
একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার এক দৌহিত্রকে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখে কেঁদে ফেলেন। উপস্থিত সাহাবীদের কাছে তার এই ক্রন্দন অস্বাভাবিক মনে হয়। জনৈক সাহাবী ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি দুচোখে গড়ানো অশ্রু
দেখিয়ে বলেন-
إِنَّمَا هَذِهِ رَحْمَةٌ جَعَلَهَا اللَّهُ فِي قُلُوبِ عِبَادِهِ ، وَإِنَّمَا يَرْحَمُ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الرُّحَمَاءَ
এটা মানুষকে দেওয়া মহান আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ বিশেষ। তিনি তার বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছে করেন, কেবল তার হৃদয়ে এই দয়ার উদ্রেক করেন। অধিকন্তু মহান আল্লাহ কেবল দয়াশীলদের প্রতিই দয়া করেন। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন এমনকি অপরিচিতদের সাথেও দয়াপূর্ণ আচরণ করতেন। তার দয়া নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি এসেছিলেন গোটা মানবজাতির জন্য অনুগ্রহ হয়ে।
সব ক্ষেত্রে তিনি মানুষের সুবিধার স্বার্থে কাজ করে গেছেন। জামাআতে সালাত আদায়ের সময় যদি কোনো শিশুর কান্নার আওয়াজ পেলে শিশুটির মায়ের কষ্টের কথা ভেবে সালাত সংক্ষিপ্ত করতেন। অথচ স্বাভাবিক অবস্থায় তিনি সালাত দীর্ঘ করতে ভালোবাসতেন। একবার তার দৌহিত্রী শিশু-উমামাহ বিনতে যাইনাব রাযিয়াল্লাহু আনহা সালাতের সময় কেঁদে ওঠে। সাথে সাথে তিনি উমামাকে কোলে তুলে নেন এবং যথারীতি সালাতের ইমামতি চালিয়ে যান। [২] সিজদার সময় হলে তাকে একপাশে রেখে সিজদায় যান। আবার সালাতে দাঁড়ানোর সময় তাকে কোলে তুলে নেন।'[৩]
আরেক দিনের ঘটনা। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদায় চলে গিয়েছেন। এমন সময়ে তার প্রাণের টুকরা হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিঠে চড়ে বসেন। নাতির মনোরঞ্জনের জন্য তিনি সিজদা দীর্ঘ করেন এবং সালাত শেষে সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন-
ابْنِي ارْتَحَلَنِي فَكَرِهْتُ أَنْ أُعَجِلَهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَاجَتَهُ
এই শিশুটি আমার পিঠে চড়ে বসেছিল। স্বেচ্ছায় সে নিচে নামা পর্যন্ত সিজদা থেকে উঠতে মন সায় দেয়নি। [১]
উল্লেখ্য যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল নিজে দয়া-গুণের চর্চা করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তার সাহাবীদেরও এই গুণ অর্জন ও চর্চার নির্দেশ দিয়েছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
❝ مَنْ صَلَّى بِالنَّاسِ فَلْيُخَفِّفُ، فَإِنَّ فِيهِمُ المَرِيضَ، وَالضَّعِيفَ، وَذَا الحَاجَةِ
যখন তোমাদের মধ্যে কেউ ইমামতি করে তখন সে যেন তার সালাত সংক্ষিপ্ত করে; কারণ, সেখানে অনেক অসুস্থ, দুর্বল ও প্রয়োজন-তাড়িত ব্যক্তিও থাকে। [২]
একবার মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু লম্বা সময় নিয়ে সালাত পড়ান। তার এক ব্যস্ত মুসল্লী আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট গিয়ে অভিযোগ করেন। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআযকে উদ্দেশ্য করে বললেন-
❝ يَا مُعَاذُ أَفَتَّانُ أَنْتَ ؟
হে মুআয, তুমি কি ‘ফাত্তান’?[৩]
ফাত্তান বলা হয় ওই ব্যক্তিকে-যে অন্যদের কষ্টে ফেলে, পরীক্ষায় নিপতিত করে অথবা কর্তব্যকর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সালাত দীর্ঘ করায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ফাত্তান বলে তিরস্কার করেছেন এ কারণে যে, দীর্ঘ সালাতের ফলে অনেকে জামাআতে সালাত আদায় থেকে বিমুখ হয়ে যেতে পারে। এই দিকে লক্ষ্য করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক ক্ষেত্রেই
মানুষকে ছাড় দিতেন। নিজের প্রচন্ড আগ্রহ সত্ত্বেও সালাত সংক্ষিপ্ত করতেন। কারণ, তিনি কোনো কিছুই মানুষের জন্য কঠিন করে ফেলতে চাননি। তিনি বলেন-
” لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي أَوْ عَلَى النَّاسِ لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ مَعَ كُلِّ صَلَاةٍ
যদি মানুষের জন্য কঠিন না হয়ে যেত, তবে প্রতি ওয়াক্তের সালাতের আগে মিসওয়াক করার আদেশ দিতাম। [১]
ইবাদাতের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি মূলনীতিও বাতলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
" وَالقَصْدَ القَصْدَ تَبْلُغُوا
ধৈর্য ধরো, মধ্যপন্থা অবলম্বন করো তবেই তোমরা মুক্তির লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। [২]
তিনি আরও বলেন-
" إِنِّي بُعِثْتُ بِالْحَنِيفِيَّةِ السَّمْحَةِ
আমাকে সত্য, উদার ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন-বিধান দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। [৩]
অর্থাৎ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এমন একটি দ্বীন ও জীবন-বিধান দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে, যে-দ্বীন মিথ্যেকে অস্বীকার করে, মহান আল্লাহর এককত্ব ঘোষণা করে এবং সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ আমল ও বিধান প্রণয়ন করে।
অপর এক হাদীসে এসেছে-
GG ، إِنَّ خَيْرَ دِينِكُمْ أَيْسَرُهُ দ্বীনের মধ্যে যা পালনে সহজ তা-ই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম।। [১]
আরও বলা হয়েছে-
GG عَلَيْكُمْ هَدْيًا قَاصِدًا তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো।। [২]
অন্য একটি হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
GG عَلَيْكُمْ مِنْ الْعَمَلِ مَا تُطِيقُونَ فَوَاللَّهِ لَا يَمَلُّ اللَّهُ حَتَّى تَمَلُّوا তোমরা ওই কাজটিই করো, যা ক্লান্তিহীনভাবে করতে পারবে। কারণ, আল্লাহ প্রতিদান দিতে গিয়ে ক্লান্ত হবেন না; বরং তোমরাই ইবাদাত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে।। [৩]
অবশ্যই 'ক্লান্তি' আল্লাহকে ছুঁতে পারে না। তাই এটাকে এভাবে বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ এমন সত্তা নন, যিনি আমাদের দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন; বরং আমরা যতক্ষণ ভালো কাজ করতে থাকব, তিনিও আমাদের ক্লান্তিহীনভাবে পুরস্কার দিতে থাকবেন। কাজেই এমন ইবাদাত করা উচিত-যাতে অল্পেই ক্লান্তি চলে না আসে বরং সব সময়ই পালন করা যায়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দয়া-গুণের মহৎ একটি দিক এই যে, তাকে সহজ ও কঠিন দুটি বিষয়ের কোনো একটি নির্বাচনের ইচ্ছাধিকার দেওয়া হলে তিনি সাধারণ মানুষের সুবিধার দিকে লক্ষ্য করে অপেক্ষাকৃত সহজটি গ্রহণ করতেন।
একবার তিন ব্যক্তি এই ভেবে নিজেদের ওপর কঠোর ইবাদাত চাপিয়ে নিয়েছিল যে, মহান আল্লাহ তার রাসূলের পূর্বাপরের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। কাজেই তিনি কখনো ইবাদাত করেন; আবার কখনো বিশ্রাম নেন; কিন্তু তিনি ব্যতীত অন্যকারও সমস্ত গুনাহ মাফ করা হয়নি। ভবিষ্যতে মাফ হবে কি না-তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই তারা নিজেদের ওপর সাধ্যাতীত ইবাদাত চাপিয়ে নেয়। তাদের একজন তো শপথ-ই করে ফেলে যে, বাকি জীবনের প্রতিটি রাত সে না-ঘুমিয়ে ইবাদাতে কাটিয়ে দেবে। আরেকজন প্রতিদিন সিয়াম রাখার ব্রত নেয়। আর তৃতীয়জন কখনো বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
তাদের এই অযৌক্তিক সংকল্প ও অভিপ্রায়ের কথা জানতে পেরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
GG أما واللهِ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُم لَهُ لكنى أَصُومُ وَأُفْطِرُ ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُد ، وَأَتَزَوْجُ النِّسَاءَ ، فمن رغب عَنْ سُنَّتِي فَلَيسَ مِنِّي
আল্লার শপথ, আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং আমি তোমাদের চেয়ে বড় মুত্তাকি। তারপরও আমি রাতের কিছু অংশ ঘুমাই আর কিছু অংশ সালাত আদায় করি। কোনো দিন রোযা রাখি আবার কোনো দিন রাখি না। কেউ যদি আমার এই আদর্শ ত্যাগ করে, তবে সে আমার অনুসারী বলে বিবেচিত হবে না। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো করেই জানতেন যে, সফর সব সময়ই কষ্টদায়ক। কারণ, সফরের প্রয়োজনে মুসাফিরকে দীর্ঘদিন ঘর ছেড়ে দূরে থাকতে হয়। নতুন পরিবেশে ঘুমের অসুবিধা হয়। রৌদ্রের তাপ ও পথের কষ্ট সহ্য করে যাত্রা অব্যাহত রাখতে হয়। তাই সফরের কষ্ট লাঘব করার জন্য তিনি বেশ কিছু নিয়ম প্রবর্তন করেন। রামাদান মাসে সফরের সময় মাঝে মাঝে সিয়াম পালন থেকে বিরত থাকেন। সফরে চার রাকাত সালাতকে সংক্ষিপ্ত করে দুই রাকাত পড়েন। (হজের সময়ে) যোহর ও আসর এবং মাগরীব ও ইশা একত্রে পড়েন। অতিবৃষ্টির সময়ে মুআযযিনকে এই বলে ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ করেন যে, 'তোমরা যার যার ঘরে সালাত পড়ে নাও'।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোমলতা ও মধ্যপন্থার এই অনন্য সাধারণ গুণগুলো শুধু নিজে ধারণ করাই যথেষ্ট মনে করেননি; বরং তার সাহাবী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এই সকল গুণ ধারণ ও চর্চার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। সেই সঙ্গে কঠোরতা আরোপকারীদের সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন-
GG هَلَكَ الْمُتَنَطِعُونَ কঠোরতাকারীরা ধ্বংস হোক। [১]
GG إِنَّ الرِّفقَ لَا يَكُونُ في شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ যখন কোনো কিছুর সাথে কোমলতা যুক্ত হয়, তখন তা অলঙ্কৃত হয়। আর যখন কোমলতা সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন তা কলঙ্কিত ও দূষিত হয়ে যায়। [২]
একদা আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনি আস রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের ওপর ইবাদাতের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে নিলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ভর্ৎসনা করে বলেন-
GG إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فِي الدِّينِ সাবধান! মাত্রা ছাড়িয়ে যেয়ো না।। [৩]
GG أُمَّتِي هَذِهِ أُمَّةٍ مَرْحُومَةً আমরা মহান আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত বিশেষ জাতি। [৪]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
وَمَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
আমি তোমাদের কোনো আদেশ করলে, তোমরা যথাসম্ভব তা পালন করবে।। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই সহজায়ন প্রচেষ্টা মূলত মহান আল্লাহর নির্দেশেরই বাস্তবায়ন। কেননা, মহান আল্লাহ তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন-
وَنُيَسِّرُكَ لِلْيُسْرَى
আর আমি আপনার জন্য সুগম করে দেবো সহজ পথ। অর্থাৎ, আমি আপনার জন্য শরীয়ত সহজতর করে দেবো। [২]
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُsْعَهَا
আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না। [৩]
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
অতএব, তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো। [৪]
يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না। [৫]
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি। [১]

টিকাঃ
১. সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭
২. সুনানুদ দারিমি : ১৫; সনদ : মুরসাল; মুসতাদরাক আল-হাকীম, একই হাদীস অন্য বর্ণনায় সহীহ সনদে এসেছে আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে।
১. সহীহ বুখারী: ১২৮৪, ৬৬৫৫, সহীহ মুসলিম: ৯২৩
২. এটি ওই সময়ের হাদীস, যখন সালাতে পার্থিব ক্রিয়াকলাপ জায়িয ছিল এবং জামাআতের সালাতে নারীদের অংশ গ্রহণের সাধারণ অনুমতি ছিল।
৩. সহীহ বুখারী: ৫১৬; সহীহ মুসলিম: ৫৪৩, হাদীসটি আবু কাতাদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. মুসনাদে আহমাদ: ২৭১০০, সুনানুন নাসায়ী: ১১৪১
২. সহীহ বুখারী: ৭০৩; সহীহ মুসলিম: ৪৬৮; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
৩. সহীহ বুখারী: ৭০৫, ৬১০৬; সহীহ মুসলিম: ৪৬৫; হাদীসটি জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সহীহ বুখারী: ৮৮৭; সহীহ মুসলিম: ২৫২, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
২. সহীহ বুখারী: ৬৪৬৩; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ২১৭৮৮; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. মুসনাদে আহমাদ: ১৫৫০৬; মাজমাউয যাওয়াইদ: ৩/৩০৮
২. মুসনাদে আহমাদ: ২২৪৫৪, ২২৫৪৪; আস-সুনানুল কুবরা: ৪৫১৯; আল-বায়ান ওয়াত তারিফ : ২/১০৯
৩. সহীহ বুখারী: ৫৮৬২; সহীহ মুসলিম : ৭৮২, হাদীসটি আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সহীহ বুখারী: ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম: ১৪০১, হাদীসটি আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সহীহ মুসলিম: ২৬৭০
২. সহীহ মুসলিম: ২৫৯৪, হাদীসটি আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ১৮৫৪, ৩২৩৮; সুনানু নাসায়ী: ৩০৫৭; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩০২৯; আস-সুন্নাহ: ১/৪৬, ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আবি আসিম এর সনদ সহীহ বলেছেন।
৪. মুসনাদে আহমাদ: ১৯১৭৯, ১৯২৫৩; সুনানু আবি দাউদ: ৪২৭৮, মুসতাদরাক আল-হাকিম :
৮৩৭২, হাদীসটি আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। সনদ: সহীহ।
১. সহীহ বুখারী: ৭২৮৮; সহীহ মুসলিম: ১৩৩৭; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
২. সূরা আলা, আয়াত : ৮
৩. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬
৪. সূরা তাগাবুন, আয়াত: ১৬
৫. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫
১. সূরা হজ, আয়াত: ৭৮

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 আল্লাহর স্মরণ

📄 আল্লাহর স্মরণ


নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সারাটা জীবনই আল্লাহর স্মরণে কেটেছে। ইসলামের দাওয়াত, উপদেশ প্রদান, জিহাদ, ইবাদাত এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজে তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেছেন। ঘরে-বাইরে, সকাল-সন্ধ্যা-সব সময় তাকে ডেকেছেন; প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে তার যিকির করেছেন। এমনকি নিদ্রা ও বিশ্রামও তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। চোখের পাতা বন্ধ হলেও রবের প্রতি ভালোবাসায় তার হৃদয় জাগ্রত থাকত। এই অন্তহীন প্রভুপ্রেমের অপার্থিব একটি জ্যোতি তার চোখে-মুখে ও সর্বসত্তায় খেলা করত। তাই তাকে দেখামাত্রই আল্লাহর কথা স্মরণ হতো।
অধিকন্তু তিনি কথায় ও আচরণে সাধারণ মানুষকেও আল্লাহর যিকির ও স্মরণে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি বলতেন- ‘যারা মুফাররাদুন তারা অগ্রবর্তী।’ সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ‘মুফাররাদুন’ কারা? তিনি বললেন, ‘মুফাররাদুন হলো সেইসব নারী-পুরুষ-যারা অষ্টপ্রহর আল্লাহকে স্মরণ করে।’ [১]
অপর এক বর্ণনায় আছে-
مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لاَ يَذْكُرُ رَبَّهُ ، مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ
যে-ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে, আর যে-ব্যক্তি করে না, তাদের উদাহরণ হলো জীবিত ও মৃতের ন্যায়। [১]
একবার এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বলেন-
GG لَا يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ তোমার জিহ্বাকে সর্বদা আল্লাহর স্মরণে সিক্ত রাখবে। [২]
যে যত বেশি আল্লাহকে স্মরণ করবে মুসলিম হিসেবে সে তত বেশি সম্মানের অধিকারী হবে। হাদীসে কুদসীতে আছে-
أَنَا مَعَ عَبْدِي إِذَا هُوَ ذَكَرَنِي وَتَحَرَّكَتْ بِي شَفَتَاهُ
আমি ততক্ষণ আমার বান্দার সাথে থাকি, যতক্ষণ সে আমাকে স্মরণ করে এবং (আমার স্মরণে) তার ঠোঁট নড়তে থাকে। [৩]
হাদীসে কুদসীতে আরও এসেছে-
فَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ، ذَكَرْتُهُ فى نفسى ، وإنْ ذَكَرَنى في ملا ، ذكرتُهُ في ملإ خَيْرٍ مِنْهُمْ
কেউ যদি আমাকে নিভৃতে স্মরণ করে, তবে আমিও তাকে নিভৃতে স্মরণ করি। আর কেউ যদি আমাকে লোকদের মজলিসে স্মরণ করে, তবে আমি তাকে তাদের চেয়েও উত্তম মজলিসে স্মরণ করি। [৪]
এছাড়াও আরও অসংখ্য বর্ণনা আছে, যেখানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন দুআ ও যিকিরের মাধ্যমে মুসলিমদের আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকার আহ্বান করেছেন। এ স্মরণ হতে পারে তাওহীদের বাণী 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' ঘোষণার মাধ্যমে, কিংবা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করে 'সুবহানাল্লাহ', তার প্রশংসায় মগ্ন থেকে 'আলহামদু লিল্লাহ' এবং তার বড়ত্বের কথা চিন্তা করে 'আল্লাহু আকবার' উচ্চারণের মাধ্যমে।
এছাড়াও তার ক্ষমতার ব্যাপ্তি বর্ণনা করে 'লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' পড়া, নিজের গুনাহের জন্য মাফ চেয়ে 'আসতাগফিরুল্লাহ' পড়া এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করাও আল্লাহর স্মরণের অন্তর্ভুক্ত।
সত্যি বলতে এ বিষয়ে চাইলেই একটি কিতাব লিখে ফেলা সম্ভব। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আল্লাহকে স্মরণ করতে বলে গেছেন। কীভাবে তাকে স্মরণ করতে হবে, বিশেষ বিশেষ সময়ে কী বলতে হবে, সকাল-সন্ধ্যা কীভাবে আল্লাহকে ডাকতে হবে, তাকে স্মরণ করার সুফল ও পুরস্কার কী হবে?-সব কিছুই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে গেছেন।
অন্যকে আল্লাহর স্মরণের গুরুত্ব বোঝানোর আগে তিনি নিজেই সর্বাবস্থায় তাকে স্মরণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। আল্লাহর স্মরণে তার হৃদয় ছিল সদা জাগ্রত। শ্রদ্ধাবনত। তিনি নিবিষ্ট-চিত্তে তার রবকে ডাকতেন। তার কোমল হৃদয় ছিল আশা ও ভালোবাসায় সিক্ত। আর সে-হৃদয় কেবল তার রবের সন্তুষ্টির মোহেই আচ্ছন্ন হয়ে থাকত।

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম: ২৬৭৬, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সহীহ বুখারী: ৬৪০৭; সহীহ মুসলিম: ৭৭৯, হাদীসটি আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
২. মুসনাদে আহমাদ: ১৭২২৭, ১৭২৪৫; জামি তিরমিযী: ৩৩৭৫; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৭৯৩; মিশকাত আল মাসাবীহ : ২২৭৯
৩. সহীহ বুখারী-তে একে 'মুআল্লাক' বলা হয়েছে; মুসনাদে আহমাদ: ১০৫৮৫, ১০৫৯২; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৭৯২; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
৪. সহীহ বুখারী: ৭৪০৫; সহীহ মুসলিম: ২৬৭৫, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 নবীজির প্রার্থনা

📄 নবীজির প্রার্থনা


দুআ সম্পর্কে কিছু বলার আগে পাঠকের দুআ, সালাত এবং ইবাদাতের মধ্যকার মিল ও অমিলগুলোর ব্যাপারে ধারণা থাকা প্রয়োজন। যেমন, সালাত হলো ইবাদাতের একটি সুনির্দিষ্ট বিধান-যেখানে তাকবীরে তাহরীমা বলতে হয়, রুকুতে যেতে হয়, সিজদা করতে হয়। সালাতের মধ্যেই রয়েছে কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর বিশালতার স্মরণ, তাঁর প্রশংসা এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর দরূদ পাঠ। এটা ইবাদাতের বিশেষ একটি মাধ্যম।
পক্ষান্তরে দুআ হচ্ছে আল্লাহর নিকট সরাসরি চাওয়ার একটি সাধারণ মাধ্যম। দুআর ভেতর আল্লাহর কাছে সাহায্য, সমৃদ্ধি, পুরস্কার, জান্নাত, হিদায়াত-সব কিছু চাওয়া হয় এবং যে-কোনো সময় এটা করা যায়।
আর ইবাদাত বলতে যে-কোনো ধরনের 'উপাসনা' বোঝানো হয়। নিয়ত সঠিক থাকলে প্রতিটি কাজই ইবাদাত হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। কাজেই সালাত একটি ইবাদাত হলেও কেবল সালাতের ভেতরেই ইবাদাতের ব্যাপ্তি সীমাবদ্ধ নয়। সালাত যেমন ইবাদাত তেমনই দুআও। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
❝ الدعاء هو العبادة দুআ হলো ইবাদাত। [১]
প্রার্থনা-বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন-
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। [১]
অন্যত্র বলেন করেন-
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে, বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটে। আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করি-যখন সে আমার কাছে প্রার্থনা করে। [২]
মহান আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যে বড় একটি পার্থক্য হলো, মানুষের কাছে চাইলে মানুষ অখুশি হয়। অনেক সময় চক্ষুলজ্জা বা অন্যকোনো কারণে সাহায্যও করে; কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে তারা বিরক্ত হয়। অন্যরা তাদের উদারতার সুযোগ নিচ্ছে ভেবে ক্রুদ্ধ হয়; কিন্তু মহান আল্লাহ এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি না চাইলে অখুশি হন। তার কাছে যত বেশি চাওয়া হয় তিনি তত বেশি খুশি হন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
" إِنَّهُ مَنْ لَمْ يَسْأَلِ اللَّهَ يَغْضَبْ عَلَيْهِ
যদি কেউ আল্লাহর কাছে না চায়, তবে আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হন। [৩]
৩২৪৭; হাদীসটি নুমান ইবনু বশীর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; সনদ: সহীহ।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ ছাড়া কারও ওপর ভরসা করতেন না। আল্লাহই ছিল তার একমাত্র ভরসা। যে-কোনো সময়, যে-কোনো প্রয়োজনে তিনি কেবল তার রবকেই ডাকতেন। নিবেদিতপ্রাণ হয়ে তার কাছে প্রার্থনা করতেন। প্রয়োজন দেখা দিলে প্রার্থনা করতে কালবিলম্ব করতেন না। তবে তিনি সাধারণ প্রার্থনায় ব্যাপক অর্থবোধক সংক্ষিপ্ত দুআ করতেন। তার এই সকল দুআ হতো সারগর্ভ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন তিনি প্রায়শই তার দুআয় বলতেন—
" رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
হে আমাদের প্রভু, এই দুনিয়াতে যা-কিছু মঙ্গল তা আমাদের দিন এবং আখিরাতের জন্য যা কল্যাণকর তা-ও আমাদের দিন। আর জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদের রক্ষা করুন। [১]
এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ দুআ আর কী হতে পারে?
অবশ্য কোনো কোনো দুআয় তিনি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের জন্যও প্রার্থনা করতেন। ক্ষমা ও নিরাপত্তা চেয়ে একটি দুআয় তিনি প্রায়শই বলতেন—
" اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ
হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা চাই। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিটি বিষয়ের জন্য সাধারণত তিনবার করে দুআ করতেন। প্রয়োজন হলে ওযু করে পাক-পবিত্র হয়ে নিতেন। কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করতেন। এরপর দুআ শুরু করতেন। তিনি দুআর এই সকল আদব সাহাবীদেরও শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন-সম্ভব হলে দুআর পূর্বে ওযু করা, দুআ শুরু করার পূর্বে আল্লাহর প্রশংসা করা। রাসূলের ওপর দরূদ পাঠ করা। দুআর মধ্যে আল্লাহকে তার গুণবাচক নামে ডাকা। প্রয়োজনের বিষয়টি নিবেদিত-চিত্তে
প্রার্থনা করা। প্রার্থনা কবুলের ব্যাপারে আস্থাশীল থাকা। মনের চৌহদ্দিতে অধৈর্য ও হতাশাকে স্থান না দেওয়া। অনবরত দুআ করতে থাকা এবং হামদ ও সালাতের মাধ্যমে দুআ শেষ করা।
দুআর আদব শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি দুআ কবুলের বিশেষ কিছু সময়ের কথাও উল্লেখ করেছেন। যেমন—সালাতের পরে, আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে, জুমআর দিনের শেষভাগে, আরাফাতের দিনে, সিয়াম পালনরত অবস্থায়, সিজদারত অবস্থায় এবং মুসাফির থাকাকালীন সময়ে দুআ করা হলে আল্লাহ সে দুআ কবুল করে থাকেন। এছাড়াও পিতা-পুত্রের পারস্পরিক দুআ কবুল হওয়ার ব্যাপারেও সমূহ সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময়ই আল্লাহকে ডাকতেন। তাঁর কাছে প্রার্থনা করতেন। তবে বিপদের মুহূর্তে তাঁর দুআয় আন্তরিকতা ও আত্মনিবেদন বহুগুণে বেড়ে যেত। যখনই তিনি সংকটে পড়তেন, তখনই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন—সন্ত্রস্ত, বিনীত ও অনুগত হয়ে। আল্লাহর প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস। বদর, খন্দক ও আরাফাতের দিনে আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করেছেন। অনাবৃষ্টির কারণে একবার মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে হাত তোলেন, অমনি মুষলধারে বৃষ্টি নামতে শুরু করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বচক্ষে দুআ কবুলের অভাবনীয় দৃশ্য দেখেছেন। তিনি দেখেছেন প্রার্থনা করামাত্রই সুদূর আকাশের চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার অভূতপূর্ব দৃশ্য।
প্রার্থনার মাধ্যমে তিনি মহান আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ করেছিলেন। ফলস্বরূপ আল্লাহও তাকে প্রভূত কল্যাণ দান করেছিলেন। জিহাদের ময়দানে তাঁর জন্য সরাসরি সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। মুসলিমদের জয়ী করে কাফিরদের অপদস্থ করেছিলেন। এভাবেই মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআ কবুল করেছেন এবং দ্বীন ও একাত্মবাদের প্রতিষ্ঠায় তাঁকে সাহায্য করেছেন।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ : ১৭৮৮৮, ১৭৯১৯; সুনানু আবি দাউদ : ১৪৭৯; জামি তিরমিযী : ২৯৬৯, ও
১. সূরা মুমিনূন, আয়াত : ৬০
২. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬
৩. আল আদাবুল মুফরাদ: ৬৫৮; জামি তিরমিযী: ৩৩৭৩, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সহীহ বুখারী: ৪৫২২, ৬৩৮৯; সহীহ মুসলিম: ২৬৮৮, হাদীসটি আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。
২. মুসনাদে আহমাদ: ৪৭৭০; সুনানু আবি দাউদ: ৫০৭৪; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৮৭১; মুসতাদরাক আল-হাকিম: ১৯০২; হাদীসটি উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে。

📘 নবীজি (ﷺ) যেমন ছিলেন তিনি > 📄 নবীজির লক্ষ্য

📄 নবীজির লক্ষ্য


উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে হলে নিঃসন্দেহে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে হয়। তবে 'উচ্চাকাঙ্ক্ষা' শব্দটিকে সাধারণত ইতিবাচক হিসেবে নেওয়া হয় না। উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিমাত্রই অসংযত উপায়ে নিজেকে সবার থেকে আলাদা প্রমাণ করতে চায়; অসদুপায় অবলম্বন করে হলেও লাভবান হতে চায়-এমনটাই সাধারণত ভাবা হয়ে থাকে। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উচ্চাভিলাষকে উন্নত লক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করাই শ্রেয়। কারণ, সাধারণ মানুষের উচ্চাভিলাষ এবং তার উচ্চাভিলাষের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
মানুষ সাধারণত পার্থিব ক্ষমতা ও সম্পদের চিন্তায় বিভোর থাকে। উন্নত জীবনোপকরণের উচ্চাশা পোষণ করে। অপরদিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আখিরাত। তিনি অহর্নিশি মৃত্যু-পরবর্তী চিন্তায় বিভোর থাকতেন। এজন্যই তার লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে উন্নত ও অনন্য।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মায়ের গর্ভে তখনই যেন আপন লক্ষ্য বাস্তবায়নে পৃথিবীতে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন! শৈশব থেকেই তিনি শুদ্ধ বিশ্বাস, ভালো ব্যবহার ও ন্যায়পরায়ণতায় সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে চাইতেন। চারপাশের মানুষ তার এই বিকাশমান উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে খালি চোখেই অনুধাবন করতে পারত। তার দাদা আব্দুল মুত্তালিব কুরাইশদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী ছিলেন। এ কারণে কাবাঘরের সামনে তার জন্য একটি স্থান সংরক্ষিত ছিল। সেখানে তিনি ছাড়া আর কেউ বসার দুঃসাহস করত না। এমনকি
তার সন্তানেরাও না। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিনা বাধায় সেখানে চলে যেতেন। তার দাদার পাশে অনায়াসে জায়গা করে নিতেন। এই ব্যতিক্রম আব্দুল মুত্তালিব তার নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রেও করেননি।
নেতৃত্ব-গুণ ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। চারিত্রিক সৌন্দর্যের কারণে সমাজে সবাই তাকে একনামে চিনত। এমনকি তার ওপর ওহী নাযিল হবার আগে থেকেই মক্কার লোকেরা তাকে ‘আল-আমীন’ ও ‘সত্যবাদী’ বিশেষণে ভূষিত করেছিল। মূল্যবান বিষয়সম্পত্তির ক্ষেত্রেও তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ছাড়া আর কাউকে ভরসা করত না। তার প্রতি সাধারণ মানুষ ও কাফিরদের এতটাই গভীর বিশ্বাস ছিল।
শুধু তাই নয়; জ্ঞান ও বিচক্ষণতার ক্ষেত্রেও নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর তারা এমনই আস্থাশীল ছিল যে, যে-কোনো বিবাদে তাকে মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করত না।
যুবক বয়সেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন। সুতরাং, নবুওয়াতলাভের পর তার এই উৎকর্ষ কোন মাত্রায় পৌঁছেছিল—তা কল্পনারও অতীত! একজন নবী হিসেবে জীবন শুরু করে তিনি কোনো দিনও অর্থ, ক্ষমতা ও সামাজিক প্রতিপত্তির পেছনে ছুটে বেড়াননি। তিনি কেবল ‘ওয়াসিলাহ’ বা জান্নাতের সবচেয়ে সম্মানিত স্থানে অধিষ্ঠিত হতে চেয়েছেন। এমনকি অনুসারীদেরও তার জন্য এটাই প্রার্থনা করতে বলে গেছেন।
উত্তম এবং সুন্দর লক্ষ্যান্বেষী হবার কারণে মানব-ইতিহাসে তিনি অনন্তকাল পর্যন্ত আদর্শ হয়ে থাকবেন। তার এই উন্নত লক্ষ্যই তাকে দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়ানো থেকে বিরত রেখেছে। তিনি জীবনে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করেই বসে থাকেননি; বরং কর্মের মাধ্যমে তা অর্জনও করে গেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00