📄 নবুওয়াত
অপেক্ষার সুদীর্ঘ প্রহর শেষে পৃথিবীবাসীর মুক্তির বার্তা নিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমন হয়। কতই-না অসাধারণ ছিল সে-আগমন! যে আগমনে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশে শান্তির সূর্য উদিত হয়; ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে যায়। আরবের সাধারণ নাগরিক ও যাযাবর-শ্রেণি তো বটেই; ভিনদেশি শাসকগণও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আলোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। তার প্রচার করা বাণী সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ইতিহাস যেন থমকে দাঁড়ায়। কুরআনের ভাষায়-
عَمَّ يَتَسَاءَلُونَ عَنِ النَّبَإِ الْعَظِيمِ الَّذِي هُم فِيهِ مُخْتَلِفُونَ ﴾
তারা পরস্পরে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? মহা সংবাদ সম্পর্কে, যে-সম্পর্কে তারা মতানৈক্য করে। [১]
এটা সেই সময়ের কথা, যখন পৃথিবীতে কোনো নবী না আসার প্রায় ছয়শ বছর পার হয়ে গেছে। ঈসা আলাইহিস সালাম-এর মুষ্টিমেয় অনুসারী ব্যতীত সকলেই তার শিক্ষা ও আদর্শ ভুলে গেছে। পৃথিবী ও পৃথিবীবাসী হয়ে পড়েছে প্রাণহীন। খাবারের অভাবে যেমন মানুষের মৃত্যু হয়, তেমনই একজন নবী ও নববী শিক্ষার অভাবে পৃথিবীবাসী আত্মিক দিক থেকে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। এসময় নবীজি সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমন ছিল শুষ্ক ও অনুর্বর ভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো। তিনি এসেছিলেন আলো হয়ে। আর আলোকে কি কখনো রুখে দেওয়া যায়? মহান আল্লাহর বর্ণনায়-
يُرِيدُونَ أَن يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَن يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়। যে-কোনো মূল্যে আল্লাহ তার আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন-যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।[১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভাষায়- "
مَثَلُ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ مِنْ الْهُدَى وَالْعِلْمِ كَمَثَلِ الْغَيْثِ
মহান আল্লাহ আমাকে যে-জ্ঞান ও পথ-নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার দৃষ্টান্ত হলো মুষলধারে বৃষ্টিপাত (—যা অনুর্বর ভূমিকে উর্বর করে এবং সমস্ত আবিলতা দূর করে)।[২]
অর্থাৎ, মহান একটি লক্ষ্য সামনে রেখেই আল্লাহ তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দুনিয়ায় প্রেরণ করেন। আর সেই উদ্দেশ্যটি হলো তাওহীদ বা একাত্মবাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা—যাতে পৃথিবীবাসী মহান আল্লাহকেই একমাত্র স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করে। একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করে। এদুটি বিষয়ে অন্যকাউকে তাঁর শরীক বা সমকক্ষ মনে না করে। সর্বোপরি সবাই যেন গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে বলে ওঠে-'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'।
এই মহাসত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই তার আগমন। তাকে দিয়ে সত্যের প্রতিষ্ঠা আর মিথ্যে উৎপাটনই ছিল মহান আল্লাহর মূল লক্ষ্য। এজন্য তাকে সুস্পষ্ট প্রমাণপঞ্জি ও পরিপূর্ণ জীবন-বিধান প্রদান করা হয়েছে। তাকে শান্তি, নিরাপত্তা এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের
মূর্ত প্রতীক বানানো হয়েছে। তার মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতির ওপর সালাত, সাদাকা, সিয়াম, হজ, যাকাত এবং অন্যান্য ইবাদাতের নীতি ও বিধান আরোপ করা হয়েছে।
উপরন্তু এই মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাকে উত্তম চরিত্র, উন্নত নীতি-নৈতিকতা, অসম ধৈর্য ও সাহসিকতা এবং অনন্য সাধারণ মানবিক গুণাবলি দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। সর্বোপরি তাওহীদ ও একাত্মবাদ প্রতিষ্ঠায় এই মানবিক আচরণ ও উন্নত গুণাবলি ব্যর্থ হলে তাকে সশস্ত্র জিহাদের আদেশ করা হয়েছে। মহান আল্লাহর এই প্রত্যক্ষ সাহায্য এবং দিক-নির্দেশ অবলম্বন করেই তিনি সমাজ থেকে শিরক ও পৌত্তলিকতার মূলোৎপাটন করেছেন। দেবতা ও প্রতীমাপূজার অবসান ঘটিয়েছেন। অন্যায়-অবিচার দূরীভূত করেছেন। অসত্য ও অসুন্দরের স্থলে সত্য ও সুন্দর প্রতিস্থাপন করেছেন। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পাপ-পুণ্যের পথও তিনি মানুষকে বাতলে দিয়েছেন। পুণ্যকর্মের প্রাপ্তি এবং পাপকর্মের শাস্তি ঘোষণা করে মানুষকে যুগপৎ উৎসাহিত ও নিবৃত্ত করেছেন।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আচার-আচরণ ও নীতি-নৈতিকতা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। আর এটাই হবার ছিল। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। তার আচার-আচরণকে পরিশীলিত করেছেন; চিন্তা ও চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করেছেন। তাই আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সকল মানবীয় গুণে পরিপূর্ণ। তিনি যখন কথা বলতেন, সত্য বলতেন। যখন উপদেশ দিতেন, সদুপদেশ দিতেন। যখন চুপ থাকতেন, আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকতেন। নিজেকে সব সময় ভালো ও কল্যাণের পথে নিরত রাখতেন। সবার সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতেন। সাধারণ মানুষের প্রতি সদয় আচরণ করতেন।
এই সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য তাকে এতটাই মহিমান্বিত করেছিল যে, অন্যকারও পক্ষে এগুলোর মাহাত্ম্য ও সৌন্দর্য ধারণ করা সম্ভবপর ছিল না। তার চেহারায় ছিল সত্যের আলো। চোখে ছিল বিশ্বাসের দীপ্তি। মুখে ছিল ভালোবাসার হাসি। হৃদয়ে ছিল অনিঃশেষ প্রভুপ্রেম ও উম্মাহর প্রতি অসামান্য দরদ-ব্যথা। এজন্য নিরিবিলি সময়ে তিনি চিন্তিত ও বিষণ্ণ থাকতেন। মানুষের সঙ্গে মিশলে স্বাভাবিক আচরণ করতেন। ঠোঁটের কোণায় হাসির মৃদু একটি রেখা ফুটিয়ে তুলতেন। যতক্ষণ কথা বলতেন, তার হাসির রেখা আভা ছড়াত। উপস্থিত লোকদের মধ্যে ভালোবাসা ও প্রশান্তির উদ্রেক করত। এভাবে তিনি হাসির আড়ালে চিন্তার অথৈ সাগর লুকিয়ে রাখতেন।
তিনি ইতিবাচক মানসিকতার চর্চা করতেন। শুভলক্ষণ গ্রহণ করে সম্মুখে এগিয়ে যেতে ভালোবাসতেন। নেতিবাচকতা ও অশুভলক্ষণ গ্রহণকে ঘৃণা করতেন। এধরনের মানসিকতা নিয়ে কোনো কাজের সিদ্ধান্ত ত্যাগ বা স্থগিত করাকে কাপুরুষতা বলে বিবেচনা করতেন। কারণ, ইতিবাচক মানসিকতা ও শুভলক্ষণ মানুষকে প্রেরণা জোগায়। নেতিবাচক মানসিকতা ও অশুভলক্ষণ তাকে হতাশ ও হতোদ্যম করে।
ক্ষমা ও দয়াগুণ তাঁর চারিত্রিক ভূষণ ছিল। তিনি মানুষকে অসম্ভব রকম ভালোবাসতেন। তাদের অশোভন আচরণ সহ্য করতেন। অপরাধ ক্ষমা করতেন। অধিকন্তু তাদের অকাতরে দান করতেন। তাঁর এই বদান্যতাকে মুক্ত বাতাস অথবা উদ্দাম মরুবৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করলেও অত্যুক্তি হবে না।
তিনি অসীম মহানুভবতা, শৈল্পিক আচরণ ও ভাষার জাদুতে খুব সহজেই মানুষকে প্রভাবিত করতে পারতেন। কখনো এমন হতো না যে, কেউ তাঁর সংস্পর্শে এসেছে, অথচ প্রভাবিত হয়নি। তাঁকে দেখেছে, অথচ ভালোবাসেনি। তাঁর সাথে পরিচিত হয়েছে, অথচ শ্রদ্ধায় নত হয়নি। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে, অথচ সমীহ করেনি।
তাঁর মুখের ভাষায় মানুষের হৃদয় বন্দী হতো। তাঁর অমায়িক আচরণে কৃতজ্ঞ হৃদয় নিঃশর্ত আনুগত্য ঘোষণা করত। তিনি এই প্রভাব ও আনুগত্যকে কাজে লাগিয়ে তাদের সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখাতেন। কল্যাণ-ধর্মের প্রতি আহ্বান করতেন। ইহকালীন ও পরকালীন সৌভাগ্য নিশ্চিত করতেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই ঈর্ষণীয় সাফল্য তাঁর মুখের ভাষা ও বাহ্যিক আচরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁর আত্মিক ও অভ্যন্তরীণ বিকাশেও পরিব্যাপ্ত ছিল। মহান আল্লাহ তাঁকে স্থিরচিত্ত করে তৈরি করেছিলেন। ফলে সংশয় বা ভ্রষ্টতা কোনো দিন তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। চরম সংকট ও দুঃসময়েও তিনি সুস্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হননি।
এক কথায়, মহান আল্লাহ প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বাহ্যিক ও আত্মিক দিক দিয়ে এতটাই সমৃদ্ধ ও বিকশিত করেছেন যে, নিজেই তাঁর প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেছেন—
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।। [১]
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ আল্লাহর অনুগ্রহেই আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছেন। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
GG إِنَّ أَتْقَاكُمْ وَأَعْلَمَكُمْ بِاللَّهِ أَنَا তোমাদের মধ্যে যে-ব্যক্তি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে এবং তার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জানে, সে-ব্যক্তি হলাম আমি। [৩]
অন্য হাদীসে এসেছে-
GG خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে একমাত্র আমিই আমার পরিবারের নিকট সবচেয়ে উত্তম। [৪]
অন্যত্র আরও বর্ণিত হয়েছে—
GG إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দিতেই কেবল আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে।। [১]
সুতরাং, সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর—যিনি আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সর্বদিক থেকে পূর্ণতা দান করেছেন। তাকে আদর্শমানব ও শ্রেষ্ঠ রাসূল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তার চিন্তা ও চরিত্র এবং নীতি ও নৈতিকতা পরিশুদ্ধ করেছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দেখভাল করেছেন। সর্বদিক থেকে সুরক্ষা দিয়েছেন এবং আমাদের তার অনুসারী হিসেবে মনোনীত করেছেন।
টিকাঃ
১. সূরা নাবা, আয়াত: ১-৩
১. সূরা সফ, আয়াত : ৮
২. সহীহ বুখারী: ৭৯, সহীহ মুসলিম: ২২৮২; হাদীসটি আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সূরা কালাম, আয়াত: ৪
২. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৯
৩. সহীহ বুখারী: ২০; হাদীসটি উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
৪. জামি তিরমিযী: ৩৮৯৫; সুনানু বায়হাকী: ১৫৪৭৭; হাদীসটি উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সুনানু বায়হাকী: ২০৫৭১, মাওযুআত আল-কুদায়ী: ১১৬৫; কাশ আল-খফা: ৬৩৮ দ্রষ্টব্য
অপেক্ষার সুদীর্ঘ প্রহর শেষে পৃথিবীবাসীর মুক্তির বার্তা নিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমন হয়। কতই-না অসাধারণ ছিল সে-আগমন! যে আগমনে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশে শান্তির সূর্য উদিত হয়; ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে যায়। আরবের সাধারণ নাগরিক ও যাযাবর-শ্রেণি তো বটেই; ভিনদেশি শাসকগণও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আলোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। তার প্রচার করা বাণী সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ইতিহাস যেন থমকে দাঁড়ায়। কুরআনের ভাষায়-
عَمَّ يَتَسَاءَلُونَ عَنِ النَّبَإِ الْعَظِيمِ الَّذِي هُم فِيهِ مُخْتَلِفُونَ ﴾
তারা পরস্পরে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? মহা সংবাদ সম্পর্কে, যে-সম্পর্কে তারা মতানৈক্য করে। [১]
এটা সেই সময়ের কথা, যখন পৃথিবীতে কোনো নবী না আসার প্রায় ছয়শ বছর পার হয়ে গেছে। ঈসা আলাইহিস সালাম-এর মুষ্টিমেয় অনুসারী ব্যতীত সকলেই তার শিক্ষা ও আদর্শ ভুলে গেছে। পৃথিবী ও পৃথিবীবাসী হয়ে পড়েছে প্রাণহীন। খাবারের অভাবে যেমন মানুষের মৃত্যু হয়, তেমনই একজন নবী ও নববী শিক্ষার অভাবে পৃথিবীবাসী আত্মিক দিক থেকে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। এসময় নবীজি সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমন ছিল শুষ্ক ও অনুর্বর ভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো। তিনি এসেছিলেন আলো হয়ে। আর আলোকে কি কখনো রুখে দেওয়া যায়? মহান আল্লাহর বর্ণনায়-
يُرِيدُونَ أَن يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَن يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়। যে-কোনো মূল্যে আল্লাহ তার আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন-যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।[১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভাষায়- "
مَثَلُ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ مِنْ الْهُدَى وَالْعِلْمِ كَمَثَلِ الْغَيْثِ
মহান আল্লাহ আমাকে যে-জ্ঞান ও পথ-নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার দৃষ্টান্ত হলো মুষলধারে বৃষ্টিপাত (—যা অনুর্বর ভূমিকে উর্বর করে এবং সমস্ত আবিলতা দূর করে)।[২]
অর্থাৎ, মহান একটি লক্ষ্য সামনে রেখেই আল্লাহ তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দুনিয়ায় প্রেরণ করেন। আর সেই উদ্দেশ্যটি হলো তাওহীদ বা একাত্মবাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা—যাতে পৃথিবীবাসী মহান আল্লাহকেই একমাত্র স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করে। একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করে। এদুটি বিষয়ে অন্যকাউকে তাঁর শরীক বা সমকক্ষ মনে না করে। সর্বোপরি সবাই যেন গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে বলে ওঠে-'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'।
এই মহাসত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই তার আগমন। তাকে দিয়ে সত্যের প্রতিষ্ঠা আর মিথ্যে উৎপাটনই ছিল মহান আল্লাহর মূল লক্ষ্য। এজন্য তাকে সুস্পষ্ট প্রমাণপঞ্জি ও পরিপূর্ণ জীবন-বিধান প্রদান করা হয়েছে। তাকে শান্তি, নিরাপত্তা এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের
মূর্ত প্রতীক বানানো হয়েছে। তার মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতির ওপর সালাত, সাদাকা, সিয়াম, হজ, যাকাত এবং অন্যান্য ইবাদাতের নীতি ও বিধান আরোপ করা হয়েছে।
উপরন্তু এই মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাকে উত্তম চরিত্র, উন্নত নীতি-নৈতিকতা, অসম ধৈর্য ও সাহসিকতা এবং অনন্য সাধারণ মানবিক গুণাবলি দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। সর্বোপরি তাওহীদ ও একাত্মবাদ প্রতিষ্ঠায় এই মানবিক আচরণ ও উন্নত গুণাবলি ব্যর্থ হলে তাকে সশস্ত্র জিহাদের আদেশ করা হয়েছে। মহান আল্লাহর এই প্রত্যক্ষ সাহায্য এবং দিক-নির্দেশ অবলম্বন করেই তিনি সমাজ থেকে শিরক ও পৌত্তলিকতার মূলোৎপাটন করেছেন। দেবতা ও প্রতীমাপূজার অবসান ঘটিয়েছেন। অন্যায়-অবিচার দূরীভূত করেছেন। অসত্য ও অসুন্দরের স্থলে সত্য ও সুন্দর প্রতিস্থাপন করেছেন। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পাপ-পুণ্যের পথও তিনি মানুষকে বাতলে দিয়েছেন। পুণ্যকর্মের প্রাপ্তি এবং পাপকর্মের শাস্তি ঘোষণা করে মানুষকে যুগপৎ উৎসাহিত ও নিবৃত্ত করেছেন।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আচার-আচরণ ও নীতি-নৈতিকতা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। আর এটাই হবার ছিল। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। তার আচার-আচরণকে পরিশীলিত করেছেন; চিন্তা ও চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করেছেন। তাই আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সকল মানবীয় গুণে পরিপূর্ণ। তিনি যখন কথা বলতেন, সত্য বলতেন। যখন উপদেশ দিতেন, সদুপদেশ দিতেন। যখন চুপ থাকতেন, আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকতেন। নিজেকে সব সময় ভালো ও কল্যাণের পথে নিরত রাখতেন। সবার সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতেন। সাধারণ মানুষের প্রতি সদয় আচরণ করতেন।
এই সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য তাকে এতটাই মহিমান্বিত করেছিল যে, অন্যকারও পক্ষে এগুলোর মাহাত্ম্য ও সৌন্দর্য ধারণ করা সম্ভবপর ছিল না। তার চেহারায় ছিল সত্যের আলো। চোখে ছিল বিশ্বাসের দীপ্তি। মুখে ছিল ভালোবাসার হাসি। হৃদয়ে ছিল অনিঃশেষ প্রভুপ্রেম ও উম্মাহর প্রতি অসামান্য দরদ-ব্যথা। এজন্য নিরিবিলি সময়ে তিনি চিন্তিত ও বিষণ্ণ থাকতেন। মানুষের সঙ্গে মিশলে স্বাভাবিক আচরণ করতেন। ঠোঁটের কোণায় হাসির মৃদু একটি রেখা ফুটিয়ে তুলতেন। যতক্ষণ কথা বলতেন, তার হাসির রেখা আভা ছড়াত। উপস্থিত লোকদের মধ্যে ভালোবাসা ও প্রশান্তির উদ্রেক করত। এভাবে তিনি হাসির আড়ালে চিন্তার অথৈ সাগর লুকিয়ে রাখতেন।
তিনি ইতিবাচক মানসিকতার চর্চা করতেন। শুভলক্ষণ গ্রহণ করে সম্মুখে এগিয়ে যেতে ভালোবাসতেন। নেতিবাচকতা ও অশুভলক্ষণ গ্রহণকে ঘৃণা করতেন। এধরনের মানসিকতা নিয়ে কোনো কাজের সিদ্ধান্ত ত্যাগ বা স্থগিত করাকে কাপুরুষতা বলে বিবেচনা করতেন। কারণ, ইতিবাচক মানসিকতা ও শুভলক্ষণ মানুষকে প্রেরণা জোগায়। নেতিবাচক মানসিকতা ও অশুভলক্ষণ তাকে হতাশ ও হতোদ্যম করে।
ক্ষমা ও দয়াগুণ তাঁর চারিত্রিক ভূষণ ছিল। তিনি মানুষকে অসম্ভব রকম ভালোবাসতেন। তাদের অশোভন আচরণ সহ্য করতেন। অপরাধ ক্ষমা করতেন। অধিকন্তু তাদের অকাতরে দান করতেন। তাঁর এই বদান্যতাকে মুক্ত বাতাস অথবা উদ্দাম মরুবৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করলেও অত্যুক্তি হবে না।
তিনি অসীম মহানুভবতা, শৈল্পিক আচরণ ও ভাষার জাদুতে খুব সহজেই মানুষকে প্রভাবিত করতে পারতেন। কখনো এমন হতো না যে, কেউ তাঁর সংস্পর্শে এসেছে, অথচ প্রভাবিত হয়নি। তাঁকে দেখেছে, অথচ ভালোবাসেনি। তাঁর সাথে পরিচিত হয়েছে, অথচ শ্রদ্ধায় নত হয়নি। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে, অথচ সমীহ করেনি।
তাঁর মুখের ভাষায় মানুষের হৃদয় বন্দী হতো। তাঁর অমায়িক আচরণে কৃতজ্ঞ হৃদয় নিঃশর্ত আনুগত্য ঘোষণা করত। তিনি এই প্রভাব ও আনুগত্যকে কাজে লাগিয়ে তাদের সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখাতেন। কল্যাণ-ধর্মের প্রতি আহ্বান করতেন। ইহকালীন ও পরকালীন সৌভাগ্য নিশ্চিত করতেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই ঈর্ষণীয় সাফল্য তাঁর মুখের ভাষা ও বাহ্যিক আচরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁর আত্মিক ও অভ্যন্তরীণ বিকাশেও পরিব্যাপ্ত ছিল। মহান আল্লাহ তাঁকে স্থিরচিত্ত করে তৈরি করেছিলেন। ফলে সংশয় বা ভ্রষ্টতা কোনো দিন তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। চরম সংকট ও দুঃসময়েও তিনি সুস্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হননি।
এক কথায়, মহান আল্লাহ প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বাহ্যিক ও আত্মিক দিক দিয়ে এতটাই সমৃদ্ধ ও বিকশিত করেছেন যে, নিজেই তাঁর প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেছেন—
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।। [১]
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ আল্লাহর অনুগ্রহেই আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছেন। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
GG إِنَّ أَتْقَاكُمْ وَأَعْلَمَكُمْ بِاللَّهِ أَنَا তোমাদের মধ্যে যে-ব্যক্তি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে এবং তার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জানে, সে-ব্যক্তি হলাম আমি। [৩]
অন্য হাদীসে এসেছে-
GG خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে একমাত্র আমিই আমার পরিবারের নিকট সবচেয়ে উত্তম। [৪]
অন্যত্র আরও বর্ণিত হয়েছে—
GG إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দিতেই কেবল আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে।। [১]
সুতরাং, সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর—যিনি আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সর্বদিক থেকে পূর্ণতা দান করেছেন। তাকে আদর্শমানব ও শ্রেষ্ঠ রাসূল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তার চিন্তা ও চরিত্র এবং নীতি ও নৈতিকতা পরিশুদ্ধ করেছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দেখভাল করেছেন। সর্বদিক থেকে সুরক্ষা দিয়েছেন এবং আমাদের তার অনুসারী হিসেবে মনোনীত করেছেন।
টিকাঃ
১. সূরা নাবা, আয়াত: ১-৩
১. সূরা সফ, আয়াত : ৮
২. সহীহ বুখারী: ৭৯, সহীহ মুসলিম: ২২৮২; হাদীসটি আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সূরা কালাম, আয়াত: ৪
২. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৯
৩. সহীহ বুখারী: ২০; হাদীসটি উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
৪. জামি তিরমিযী: ৩৮৯৫; সুনানু বায়হাকী: ১৫৪৭৭; হাদীসটি উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১. সুনানু বায়হাকী: ২০৫৭১, মাওযুআত আল-কুদায়ী: ১১৬৫; কাশ আল-খফা: ৬৩৮ দ্রষ্টব্য
📄 ধর্ম
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম-যা একটি নিরাপদ ও সফল জীবনের নিশ্চয়তা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
কেউ যদি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম সন্ধান করে তবে তা কস্মিনকালেও গ্রহণ করা হবে না। অধিকন্তু সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। [১]
ইসলাম নিছক একটি ধর্ম নয়; বরং পরিপূর্ণ ও সর্বাঙ্গীণ সুন্দর জীবনব্যবস্থা। মহান আল্লাহ বলেন-
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। [২]
এই ধর্ম মানুষকে সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে স্রষ্টার দাসত্বে আবদ্ধ করে। শিরকের অন্ধকার থেকে বের করে একাত্মবাদের আলোয় প্রবেশ করায়। কুফরের অভিশাপ থেকে উদ্ধার করে ঈমানের আশীর্বাদে ভরিয়ে দেয়। দুনিয়ার মরীচিকাময় জীবনের পরিবর্তে আখিরাতের শান্তিময় জীবনের স্বপ্ন দেখায়।
এই ধর্ম সর্বজনীন ও সর্বকালীন-সকল যুগের সকল শ্রেণির সকল মানুষের জন্য সমান উপযোগী। যুগের আবর্তনে এর আবেদন কখনো হ্রাস পাবে না। সমাজের পরিবর্তনে এর চাহিদায় কখনো ভাটা পড়বে না। এর অনুসারীরা কখনোই ভ্রষ্ট ও বিপথগামী হবে না। এমনকি পাপের পঙ্কিলতায় ডুবে গিয়েও হতাশ হয়ে জীবনের আশা ছেড়ে দেবে না। কারণ, এই ধর্মের বিধায়ক শিরক ব্যতীত সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। এই বিশাল ছাড়ের কারণে তাকে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। অধিকন্তু তিনি মানুষের ভেতরের ও বাইরের সমুদয় অবস্থা জানেন। তাদের মানবিক চাহিদা এবং দুর্বলতার ব্যাপারে পূর্ণ অবগতি রাখেন। এজন্যই তিনি ইসলাম ধর্মে বৈষয়িক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সুষম ব্যবস্থা রেখেছেন।
মুসলিম ও ইহুদী-খ্রিস্টানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য এখানেই। কেননা, ইহুদীরাও আল্লাহর পক্ষ হতে বিশেষ জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছিল; কিন্তু তারা সেই জ্ঞানের সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। ইলম অনুযায়ী আমল করতে পারেনি। ফলে অল্প দিনেই তারা বিপথগামী হয়ে পড়েছে এবং মহান আল্লাহর প্রচণ্ড ক্রোধে নিপতিত হয়েছে। খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে। তারা আল্লাহ-প্রদত্ত জ্ঞানের বাইরে গিয়ে সাধনা করার চেষ্টা করেছে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে তারা ভালো করলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।
পক্ষান্তরে ইসলাম হলো মানুষের স্বভাবজাত প্রাকৃতিক ধর্ম। এ ধর্মে ইলম-আমল এবং জ্ঞান ও কর্মের সুষম বণ্টন রয়েছে। ফলে এই ধর্মের অনুসারীরা দিকভ্রষ্ট হয় না। মহান আল্লাহর ক্রোধেও নিপতিত হয় না।
ইসলাম শাশ্বত ও সর্বোপযোগী হওয়ার কারণ হলো-এই ধর্মে মানুষের ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাম্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান রাখা হয়েছে। মিথ্যাচার, স্বেচ্ছাচার, ব্যভিচার, নিন্দা, পরনিন্দা, অসত্য স্বাক্ষ্য, অন্যায় পক্ষপাত, রক্তপাত,
আত্মসাৎ, মাপে কারচুপি এবং এজাতীয় আরও যে-সকল অপতৎপরতার কারণে মানুষের অধিকার খর্ব হতে পারে কিংবা তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে— সেগুলোকে হারাম করা হয়েছে।
সুতরাং, কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে আমরা বলতেই পারি— رَضِيتُ بِاللهِ رَبًا ، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا ، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا
আমরা মহান আল্লাহকে প্রভু হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট। ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পেয়ে কৃতজ্ঞ এবং মুহাম্মাদকে নবী হিসেবে পেয়ে ধন্য।
টিকাঃ
১. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৮৫
২. সূরা মায়িদা, আয়াত: ৩
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম-যা একটি নিরাপদ ও সফল জীবনের নিশ্চয়তা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
কেউ যদি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম সন্ধান করে তবে তা কস্মিনকালেও গ্রহণ করা হবে না। অধিকন্তু সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। [১]
ইসলাম নিছক একটি ধর্ম নয়; বরং পরিপূর্ণ ও সর্বাঙ্গীণ সুন্দর জীবনব্যবস্থা। মহান আল্লাহ বলেন-
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। [২]
এই ধর্ম মানুষকে সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে স্রষ্টার দাসত্বে আবদ্ধ করে। শিরকের অন্ধকার থেকে বের করে একাত্মবাদের আলোয় প্রবেশ করায়। কুফরের অভিশাপ থেকে উদ্ধার করে ঈমানের আশীর্বাদে ভরিয়ে দেয়। দুনিয়ার মরীচিকাময় জীবনের পরিবর্তে আখিরাতের শান্তিময় জীবনের স্বপ্ন দেখায়।
এই ধর্ম সর্বজনীন ও সর্বকালীন-সকল যুগের সকল শ্রেণির সকল মানুষের জন্য সমান উপযোগী। যুগের আবর্তনে এর আবেদন কখনো হ্রাস পাবে না। সমাজের পরিবর্তনে এর চাহিদায় কখনো ভাটা পড়বে না। এর অনুসারীরা কখনোই ভ্রষ্ট ও বিপথগামী হবে না। এমনকি পাপের পঙ্কিলতায় ডুবে গিয়েও হতাশ হয়ে জীবনের আশা ছেড়ে দেবে না। কারণ, এই ধর্মের বিধায়ক শিরক ব্যতীত সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। এই বিশাল ছাড়ের কারণে তাকে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। অধিকন্তু তিনি মানুষের ভেতরের ও বাইরের সমুদয় অবস্থা জানেন। তাদের মানবিক চাহিদা এবং দুর্বলতার ব্যাপারে পূর্ণ অবগতি রাখেন। এজন্যই তিনি ইসলাম ধর্মে বৈষয়িক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সুষম ব্যবস্থা রেখেছেন।
মুসলিম ও ইহুদী-খ্রিস্টানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য এখানেই। কেননা, ইহুদীরাও আল্লাহর পক্ষ হতে বিশেষ জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছিল; কিন্তু তারা সেই জ্ঞানের সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। ইলম অনুযায়ী আমল করতে পারেনি। ফলে অল্প দিনেই তারা বিপথগামী হয়ে পড়েছে এবং মহান আল্লাহর প্রচণ্ড ক্রোধে নিপতিত হয়েছে। খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে। তারা আল্লাহ-প্রদত্ত জ্ঞানের বাইরে গিয়ে সাধনা করার চেষ্টা করেছে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে তারা ভালো করলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।
পক্ষান্তরে ইসলাম হলো মানুষের স্বভাবজাত প্রাকৃতিক ধর্ম। এ ধর্মে ইলম-আমল এবং জ্ঞান ও কর্মের সুষম বণ্টন রয়েছে। ফলে এই ধর্মের অনুসারীরা দিকভ্রষ্ট হয় না। মহান আল্লাহর ক্রোধেও নিপতিত হয় না।
ইসলাম শাশ্বত ও সর্বোপযোগী হওয়ার কারণ হলো-এই ধর্মে মানুষের ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাম্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান রাখা হয়েছে। মিথ্যাচার, স্বেচ্ছাচার, ব্যভিচার, নিন্দা, পরনিন্দা, অসত্য স্বাক্ষ্য, অন্যায় পক্ষপাত, রক্তপাত,
আত্মসাৎ, মাপে কারচুপি এবং এজাতীয় আরও যে-সকল অপতৎপরতার কারণে মানুষের অধিকার খর্ব হতে পারে কিংবা তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে— সেগুলোকে হারাম করা হয়েছে।
সুতরাং, কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে আমরা বলতেই পারি— رَضِيتُ بِاللهِ رَبًا ، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا ، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا
আমরা মহান আল্লাহকে প্রভু হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট। ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পেয়ে কৃতজ্ঞ এবং মুহাম্মাদকে নবী হিসেবে পেয়ে ধন্য।
টিকাঃ
১. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৮৫
২. সূরা মায়িদা, আয়াত: ৩
📄 নবীজির আত্মত্যাগ
‘যাহিদ’ একটি আরবী শব্দ। অর্থ এমন ব্যক্তি—যে ‘যুহদ’ চর্চা করে। অর্থাৎ, যে দুনিয়ার আনন্দ ও মায়া-মোহ একমাত্র আল্লাহর জন্য ত্যাগ করে। ‘যাহিদ’ ব্যক্তি সব সময় দুনিয়াবি আশা-আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে আখিরাতের সাফল্য-লাভের জন্য উদগ্রীব থাকে। এজন্য অনেকেই একে সুফিবাদের সাথে মিলিয়ে ফেলে—যা অনুচিত।
মূলত ‘যুহদ’ ঈমানের অনেক উঁচু একটি পর্যায়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সকল যাহিদের ইমাম। ‘দুনিয়া হচ্ছে একটি ভাসমান ঘর’—এই কথার ওপর ভিত্তি করেই তিনি ‘যুহদ’ করে গেছেন। দুনিয়ার সব আনন্দই ক্ষণস্থায়ী। জীবন কতটা দ্রুত বয়ে যায়, সেটা যারা বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হয়েছে, তাদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। অথচ এই সেদিনও তারা শিশু ছিল। তাই এই জীবনকে কখনোই আখিরাতের বিশাল জীবনের সাথে তুলনা করা চলে না। আর এজন্যই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আখিরাতের প্রতি তার লক্ষ্য স্থির রেখেছিলেন। আল্লাহর পুরস্কারের ব্যাপারে তিনি বেশ ভালোমতোই জানতেন। আল্লাহ অবশ্যই তার মুমিন বান্দাদের জন্য আনন্দ, স্বস্তি ও মহাপুরস্কারের ব্যবস্থা রেখেছেন। তাই দুনিয়ায় যা না হলেই নয়—এমন জিনিস ছাড়া আর কিছুর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকৃষ্ট ছিলেন না।
‘একজন ব্যক্তি যত বেশি দুনিয়াবি জিনিসের অধিকারী হবে, ততবেশি এই দুনিয়ার মায়াজালে আটকা পড়ে যাবে’—এ মহাসত্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দিষ্ট
কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে 'যুহদ' বা আত্মত্যাগ করেননি; বরং তিনি নিজের ইচ্ছায় একজন 'যাহিদ' তথা আত্মত্যাগী ছিলেন। তিনি ছিলেন সমগ্র জাতির নেতা। তার চেয়েও বড় কথা, তিনি ছিলেন আল্লাহর সম্মানিত রাসূল। তিনি যদি ধন-দৌলত চাইতেন, তবে তার জন্য আল্লাহর কাছে একবার ফরিয়াদ করাই যথেষ্ট ছিল। চাইলেই তিনি পর্বতসম সোনা-রূপার মালিক হতে পারতেন। চাইলেই বিলাস বহুল জীবনের নিশ্চয়তা পেতেন; কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি 'যুহদ' করাকে শ্রেয় মনে করেছেন। তার যা পাওয়ার, তিনি তা আখিরাতে গ্রহণ করতে চেয়েছেন।
এমন সিদ্ধান্তের কারণে কত রাত যে তাকে অনাহারে কাটাতে হয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। এমনও হয়েছে, দুই দিন, তিন দিন এমনকি এক মাসও চলে গেছে, কিন্তু তার চুলায় একবারও আগুন জ্বলেনি। সে-সময় হয় তিনি অনাহারে থেকেছেন; নয়তো কেবল খেজুর আর পানি পান করে দিনাতিপাত করেছেন।
একবার তার একজন স্ত্রী বলেছিলেন, এমন কখনো হয়নি যে, টানা তিন দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেট ভরে রুটি খেতে পেরেছেন। তিনি কখনো নরম গদিতে ঘুমাতেন না। হাতে বানানো খড়-কুটোর বিছানায় ঘুমাতেন। তার কোমল দেহে সেগুলোর দাগ পড়ে যেত। তবুও আরামদায়ক বিছানা গ্রহণ করতেন না।
এমনও সময় গেছে যখন ক্ষুধা নিবারণ করতে তাকে পেটে পাথর বেঁধে রাখতে হয়েছে। সাহাবীদের মধ্যে যারা অভাবে দিন যাপন করতেন, তারাও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই কষ্ট দেখে মুষড়ে পড়তেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘর ছিল মাটির তৈরি। এতে ইট, সিমেন্ট অথবা অন্যকোনো দীর্ঘস্থায়ী উপাদান ছিল না। ঘরটি ছিল নিতান্তই সাধারণ। ছোট, নিচু ও সংকীর্ণ। সাহাবীদের ওপর নির্ভর না করে একবার তিনি তার বর্মটি এক ইহুদীর কাছে ত্রিশ 'সা'' যবের বিনিময়ে বন্ধক রেখেছিলেন। [১]
তার পোশাক ছিল অতি সাধারণ। আহারের জন্য কোনো দিনও আলাদা কোনো টেবিল ব্যবহার করেননি। সব সময় মেঝেতে বসে খেয়েছেন। সাহাবীগণ তার অভাবের কথা উপলব্ধি করে অনেক সময় তার নিকট খাবার পাঠাতেন।
উল্লেখ্য যে, তার এই অসামান্য ত্যাগ ও স্বেচ্ছায় কৃচ্ছতা বরণের উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়ার আবিলতা থেকে মুক্ত থাকা, স্রষ্টার প্রতি আস্থা ও নির্ভরতা বজায় রাখা, স্বীয় বিশ্বাসে অটল থাকা এবং প্রতিশ্রুত পুরস্কারের জন্য নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করা। কেননা, মহান আল্লাহ তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন-
وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى
আপনার পালনকর্তা সত্বরই আপনাকে দান করবেন, অতঃপর আপনি সন্তুষ্ট হবেন। [১]
তার এই অনটনপূর্ণ জীবন দেখে এমনটি ভাবার সুযোগ নেই যে, তিনি কখনোই সচ্ছলতার মুখ দেখেননি অথবা তিনি চাইলেও সুখী-সচ্ছল জীবন-যাপন করতে পারতেন না। কারণ, তার কাছে বিভিন্ন সময়ে গনীমত, সাদাকা ও হাদিয়াস্বরূপ প্রচুর সম্পদ আসত। তিনি সেগুলো অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। দারিদ্র্যের ভয়ে অথবা বিলাসিতার আশায় একটি দিরহামও নিজের জন্য রাখতেন না।
অধিকন্তু কখনো যদি বুঝতে পারতেন, কারও হৃদয়ে ইসলামের প্রতি আগ্রহ আছে কিন্তু সে অর্থনৈতিক সংকটের ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে পারছে না, তবে তিনি নিজের উট, গরু, মেষ-সবই ওই মানুষটিকে দিয়ে দিতেন। ইসলামের প্রতি তার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিতেন। তিনি বলতেন, 'যদি আমার কাছে তিহামার বৃক্ষরাজি সমপরিমাণ সম্পদ থাকত, তাহলে আমি তা অকাতরে বিলিয়ে দিতাম। তোমরা আমাকে কৃপণ, মিথ্যেবাদী বা ভীরু ভাবার সুযোগ পেতে না।'খ [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আখিরাতমুখিতা, দুনিয়াবিমুখতা এবং পার্থিব বিলাস-ব্যসনে অনাসক্তি যাহিদদের জন্য উত্তম আদর্শ হয়ে থাকবে। কারণ, বিলাসিতার সকল দরজা তার সামনে উন্মুক্ত ও অবারিত ছিল। জাতীয় কোষাগার তার অধীনে ছিল। তিনি চাইলে বৈধ উপায়ে সেখান থেকে সুবিধা গ্রহণ করতে পারতেন; এমনকি সাহাবীদের জীবনে তার অনস্বীকার্য অবদানের কথা উল্লেখ করে তাদের সমস্ত সম্পদও দাবি করতে পারতেন; কিন্তু তিনি এসবের কিছুই করেননি। নিজের জন্য কোনো প্রাসাদ বা অট্টালিকা নির্মাণ করেননি।
বরং ইন্তেকালের সময় দেখা গেছে, তিনি পার্থিব কোনো সম্পদ রেখে যাননি। আর যেটুকু রেখে গেছেন, সেটুকুও দানের খাতায় চলে গেছে। কেননা, ইন্তেকালের পূর্বে তিনি বলে গেছেন—
GG لَا نُورَثُ مَا تَرَكْنَا فَهُوَ صَدَقَةٌ আমাদের [১] কোনো উত্তরাধিকার নেই; আমরা যা রেখে যাই তা সাদাকা। [২]
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল একবার মুখ ফুটে চাইলেই সর্বকালের সেরা ধনী হয়ে যেতে পারতেন। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তাকে রাজকীয় ও আড়ম্বর জীবন-যাপনের অফার দিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি রাজকীয় জীবনের দিকে হাত না বাড়িয়ে অনাড়ম্বর বন্দেগীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। অথচ তিনি জানতেন, এই জীবনে একদিন খেতে পেলে আরেকদিন পাবেন না। মৃত্যু পর্যন্ত তার এই অনটন ও দারিদ্র্য চলতেই থাকবে। তবুও তিনি স্বেচ্ছায় দারিদ্র্য ও অনটনপূর্ণ জীবন বেছে নিয়েছেন। সারাটা জীবন সংগ্রাম করে কাটিয়ে দিয়েছেন।
পার্থিব-জীবনের প্রতি অথবা ভোগ-বিলাসের প্রতি তার কোনো মায়া বা মোহ ছিল না। কাউকে দান করার আগে দ্বিতীয়বার ভাববার প্রয়োজনবোধ করতেন না। এজন্য দানের ব্যাপারে কেউ তার মুখ থেকে কখনো ‘না’ শোনেনি। কোনো দিন তার কাছে কিছু চেয়ে কাউকে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়নি। কারণ, তার দৃষ্টিতে পার্থিব-জীবন এবং ভোগপোকরণ এতটাই তুচ্ছ ও মূল্যহীন ছিল যে, তিনি এগুলোকে সংরক্ষণেরও অনোপযোগী মনে করতেন। তাই দুনিয়ার ক্ষুদ্রতা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন—
GG لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ الله جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةً مَاءٍ যদি আল্লাহর কাছে এই দুনিয়ার মূল্য মশার একটি পাখার সমানও হতো তবে তিনি কোনো কফিরকে এক ঢোক পানি পান করতে পর্যন্ত দিতেন না। [৩]
كُنْ فِي الدُّنْيَا ... أَوْ عَابِرُ سبيل তুমি দুনিয়ায় মুসাফির হয়ে থাকো (কারণ সফরের সামান বেশি হলে যেমন সফর কষ্টদায়ক হয়, তেমনই দুনিয়ার ভোগোপকরণ বেশি হলেও আখিরাতের সফর কণ্টকাকীর্ণ হয়)। [১]
ازهد في الدُّنيا يُحِبَّكَ الله ، وَازْهَدْ فِيمَا عِنْدَ النَّاسِ يُحِبَّكَ النَّاسُ তুমি দুনিয়ার ব্যাপারে নির্মোহ থাকো, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। মানুষের কাছে চাওয়া থেকে বিরত থাক, মানুষ তোমাকে ভালোবাসবে। [২]
مَا لِي وَالدُّنْيَا ؟ مَا أَنَا فِي الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبِ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ، ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَ আমার সাথে দুনিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই! বস্তুত আমার এবং দুনিয়ার উপমা হচ্ছে ওই ব্যক্তির মতো যে দুপুরবেলা একটি গাছের ছায়ায় সামান্য বিশ্রাম নেয় অতঃপর ঘুম ভাঙলে সেখান থেকে চলে যায়। (আর কখনো সেখানে ফেরার ইচ্ছে করে না।) [৩]
الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ، مَلْعُونُ مَا فِيهَا، إِلَّا ذِكْرَ اللهِ، وَمَا وَالَاهُ، أَوْ عَالِمًا، أَوْ مُتَعَلَّمًا আল্লাহর যিকির, প্রিয় নেক আমল, ইলমের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী ব্যতীত দুনিয়া এবং দুনিয়ার সমস্ত কিছু অভিশপ্ত।। [৪]
GG
وَهَل لَكَ يَا ابْنَ آدَمَ مِنْ مَالِكَ إِلَّا مَا أَكَلْتَ فَأَفْنَيْتَ ، أَو لَبِسْتَ فَأَبْلَيْتَ ، أَوْ تَصَدَّقْتَ فَأَمْضَيْتَ
তোমার সম্পদের কেবল ততটুকুই তোমার, যতটুকু তুমি খেয়ে নিঃশেষ করেছ অথবা পরিধান করে নষ্ট করে ফেলেছ কিংবা জীবদ্দশায় দান করে মৃত্যু-পরবর্তী সময়ের জন্য সংরক্ষণ করেছ। [১]
টিকাঃ
১. আরবের পরিমাপ-বিশেষ। প্রায় সাড়ে তিন সের।
১. সূরা দোহা, আয়াত: ৫
২. মুআত্তা: ৯৭৭; আল-আসওয়াত: ১৮৬৪; আল কামিল: ৩৯৭
১. নবীদের
২. সহীহ বুখারী: ৩০৯৩, ৩৭১২; সহীহ মুসলিম: ১৭৫৮
৩. জামি তিরমিযী: ২৩২০।
১. সহীহ মুসলিম: ২৯৫৮
১. সহীহ বুখারী: ৬৪১৬; জামি তিরমিযী: ২৩৩৩; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১১৪; মুসনাদে আহমাদ: ৪৭৫০, ৪৯৮২, ৬১২১।
২. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১০২; আল কাবীর ১০৫২২; মুসতাদরাক আল-হাকিম: ৭৮৩৩, হাদীসটি সাহল ইবনু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; সিলসিলাতু আহাদীস আস-সাহীহা: ৯৪৪।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৩৭০১, ৪১৯৬; জামি তিরমিযী: ২৩৭৭; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১০৯; হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরিমিযী বলেছেন, 'হাদীসটি হাসান সহীহ।'
৪. জামি তিরমিযী: ২৩২২; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১১২; হাদীসটি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
📄 নবীজির বিনয়
প্রকৃতিগতভাবে যে নিরহঙ্কারী ও সাদাসিধে সে-ই মূলত বিনয়ী। নিজেকে সব সময় অবনমিত রাখা বিনয়ের পরিচয়-বৈশিষ্ট্য। আর এর ঠিক বিপরীত হলো ঔদ্ধত্য, গর্ব, অহঙ্কার।
মানুষ নানা কারণে বিনয়ের আশ্রয় নিয়ে থাকে। কেউ হীনম্মন্যতার কারণে; কেউ নিজেকে বিনয়ের মোড়কে উপস্থাপন করে বিশেষ সুবিধা গ্রহণের অভিপ্রায়ে; আবার কেউ বাস্তবিক অর্থেই ভালো ও সজ্জন ব্যক্তি হওয়ার সদিচ্ছায়। তবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিনয় ছিল সব ধরনের লৌকিকতামুক্ত। তার বিনয় ছিল সর্বশক্তিমান প্রভুর বিশালতার সামনে ভক্তিপ্রণোদিত হয়ে নতজানু থাকার বহিঃপ্রকাশ। তিনি মহান আল্লাহর শায়ানে শানা [১] প্রশংসা করতেন। তার বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করতেন। জীবনের সকল কৃতিত্ব ও অর্জনকে মহান আল্লাহর হাতে সঁপে দিতেন। নিজেকে নিছক একজন প্রচারক ও বার্তাবাহক মনে করতেন।
সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য অনুধাবন করেছিলেন বলেই তিনি জানতেন, মানুষ হয়ে অহমিকা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করতে যাওয়া কেবলই নির্বুদ্ধিতা। মানুষ যতই তাদের পদমর্যাদার গরিমা দেখাক না কেন, যতই টাকার পাহাড় বানাক না কেন, দুনিয়ার রাজা হয়ে যতই ক্ষমতার দাপট দেখাক না কেন—বাস্তবে এগুলো একেবারেই সামান্য। সূর্যের অপস্রিয়মাণ ছায়ামাত্র। আল্লাহর বিশাল সৃষ্টির তুলনায় এগুলো অতি ক্ষুদ্র। একেবারেই নগণ্য। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষে আখিরাতের স্থায়িত্বের তুলনায় দুনিয়ার অস্থায়িত্বকে বেছে নেওয়া আদৌ সম্ভবপর ছিল না। যে-সকল জিনিসের প্রতি সাধারণ মানুষ সব সময় লালায়িত থাকে সে-সবের প্রতি তার মোটেও আগ্রহ ছিল না। আল্লাহর প্রতি সুদৃঢ় বিশ্বাস তাকে এই নীচতা থেকে পবিত্র রেখেছিল। তিনি বিনম্র আচরণকে আরাধ্য মনে করতেন। এটাকেই সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তি বলে বিশ্বাস করতেন। আল্লাহর অনুগত দাস হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। মানুষ ও পশুপাখি তো বটেই; সৃষ্টির প্রতিটি সদস্যের প্রতি তিনি বিনম্র আচরণ করতেন। অসুস্থদের দেখতে যেতেন। বৃদ্ধদের সাহায্য করতেন। গরীবদের দুঃখে ব্যথিত হতেন। অবহেলিত ও দুর্দশাগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতেন। দুস্থের প্রতি গভীর সহানুভূতি পোষণ করতেন। ছোটদের সাথে খেলা করতেন। পরিবারের সাথে বিনোদন করতেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। সবার সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করতেন। মাটিতে বসতে দ্বিধা করতেন না। বালুর বিছানা ও খড়ের বালিশে ঘুমাতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। আল্লাহর দয়া ও দানে পরিতুষ্ট থাকতেন। সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সুনাম সুখ্যাতির আশা করতেন না। অন্যের জন্যও এগুলোকে কল্যাণকর মনে করতেন না। বলা হয় যে, একজন মানুষ তার অধীনদের সাথে কীরূপ ব্যবহার করে-তার ওপর ভিত্তি করেই তার চরিত্র যাচাই করা যায়। এই বিচারেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সুমহান চরিত্রের অধিকারী। কারণ, তিনি সব সময় সাহাবীদের সাথে হাসিখুশি থাকতেন। কখনো কখনো হাস্যরসও করতেন। অসহায়-দুর্বলদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন। নারীদের সম্মান করতেন। অন্যদেরও নারীদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করার আদেশ দিতেন। অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করতেন। অপরিচিতদের সঙ্গেও সৌহার্দপূর্ণ ভাষায় কথা বলতেন এবং তার এই নিরহঙ্কার জীবন যাপনের রহস্য ব্যাখ্যা করে বলতেন, 'আমি আল্লাহর নগণ্য গোলামমাত্র। একজন গোলাম যেভাবে আহার করে আমিও ঠিক সেভাবেই আহার করি। একজন গোলাম যেভাবে উপবেসন করে আমিও ঠিক সেভাবেই উপবেসন করি।' [১]
একবার জনৈক ব্যক্তি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখে শ্রদ্ধার আতিশয্যে কাঁপছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার এই ভয়ার্ত চেহারা দেখে বলে ওঠেন-
GG هَوِّنْ عَلَيْكَ، فَإِنِّي لَسْتُ بِمَلِكٍ، إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ শান্ত হও! আমি কোনো রাজা বাদশাহ নই। আমি তো সাধারণ এক মায়ের সন্তান। যে-মা অন্যান্য মায়ের মতো 'ক্বাদীদ' [১]- খেয়ে বড় হয়েছেন। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে কেউ তার প্রশংসা করলে তিনি তা পছন্দ করতেন না। তিনি বলেন-
GG لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ ، فَقُولُوا : عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ তোমরা আমার অতিশয় প্রশংসা করবে না, যেভাবে খ্রিস্টানরা ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম-এর প্রশংসা করত। আমি তো কেবল আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল। তাই আমাকে শুধু আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলেই ডাকবে। [৩]
একদা আমির ইবনু সা'সা'আ-এর প্রতিনিধিদল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে তাকে ভক্তি গদগদ হয়ে বলে-
GG وَأَفْضَلُنَا فَضْلًا وَأَعْظَمُنَا طَوْلًا আপনি আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। আপনি আমাদের মান্যবর। মান্যবরের একমাত্র সন্তান।
একথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
"
قُولُوا بِقَوْلِكُمْ ، أَوْ بَعْضِ قَوْلِكُمْ ، وَلَا يَسْتَجْرِيَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ
হে লোক সকল, তোমরা যা বলতে এসেছ, শুধু তাই বলো (আমার অনর্থক প্রশংসা কোরো না।) আর খেয়াল রেখো, শয়তান যেন কোনো দিন তোমাদের তার সাহায্যকারী ও অনুসারী না বানাতে পারে। [১]
আরেক দিনের ঘটনা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন মনে কাজ করছিলেন। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি এসে তার প্রশংসা করে বলেন-
"
مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ
যা আল্লাহ চান এবং যা আপনি চান, তাই হোক।
একথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভীষণ ক্রুদ্ধ হন এবং তাকে ধমক দিয়ে বলেন-
"
أَجَعَلْتَنِي لِلَّهِ عَدْلًا ؟ بَلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَحْدُهُ
ধিক তোমাকে! তুমি তো আমাকে আল্লাহর সমতুল্য বানিয়ে ফেললে? বরং বলো, 'যা একমাত্র আল্লাহ চান তা-ই হবে।' [২]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্মানে উঠে দাঁড়ানোও ভীষণ অপছন্দ করতেন। কোনো মজলিসে বিশেষ জায়গায় বসার জন্য তিনি কাউকে উঠে যেতে বলতেন না; বরং যেখানে জায়গা পেতেন সেখানেই বসে পড়তেন। এমনকি যে-ব্যক্তি তার একটু আগে এসেছে, তিনি তারও পেছনে বসতেন। উঁচুদরের কোনো সভা-সমাবেশে না গিয়ে মুসলিম জনসাধারণের সঙ্গে থাকতে বেশি পছন্দ করতেন। অতি সাধারণ কেউ তাকে দাওয়াত দিলেও তিনি তার দাওয়াত কবুল করতেন এবং বলতেন-
لَوْ دُعِيتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ ، وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعٌ لَقَبِلْتُ আমাকে যদি (ভেড়ার) পায়ের নলা দিয়েও আপ্যায়ন করা হয় তবুও আমি তা গ্রহণ করব। আমাকে যদি (ভেড়ার) একটি হস্তও হাদিয়া দেওয়া হয়, তবুও আমি তা কবুল করব। [১]
গরীবদের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। তিনি বলতেন-
اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مِسْكِينًا ، وَأَمِتْنِي مِسْكِينًا ، وَاحْشُرْنِي فِي زُمْرَةِ الْمَسَاكِينِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ হে আল্লাহ, আমাকে গরীব করে বাঁচিয়ে রাখো। গরীব হিসেবে মৃত্যু দিয়ো এবং পুনরুত্থান-দিবসে গরীবদের সাথেই উত্থিত কোরো। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিনয়কে যেমন ভালোবাসতেন, অন্যদের বিনয়াবলম্বনের আদেশ করতেন আর তেমনই অহংকার ও ঔদ্ধত্যকে ঘৃণা করতেন; মানুষকে এগুলোতে জড়িয়ে যেতে নিষেধ করতেন এবং অহংকারের মন্দ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলতেন-
يُحشر المتكبرون يوم القيامة أمثال الذَّرِّ في صُوَرِ الرّجال يغشاهمُ الذُّلُّ من كلِّ مَكَانٍ ، يُساقون إلى سجن في جَهَنَّمَ يسمى بولس تعلوهم نارُ الأَنْيارِ يَسقون من عُصارةِ أَهْلِ النَّارِ طينة الخبال কিয়ামতের দিন ঔদ্ধত্য প্রদর্শনকারীরা পিঁপড়ার আকারে পুনরুত্থিত হবে। অপমান তাদের চারপাশ থেকে চেপে ধরবে। [৩]
ঔদ্ধত্য বলতে সাধারণত আল্লাহর সম্মান, মাহাত্ম্য ও মহিমার সাথে প্রতিযোগিতা করাকে বোঝায়। এই সকল গুণাবলি কেবল আল্লাহরই। হাদীসে কুদসীতে এসেছে-
GG الْكِبْرِيَاءُ رِدَانِي ، وَالْعَظَمَةُ إِزَارِي ، فَمَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا ، قَذَفْتُهُ فِي النَّارِ
অহংকার আমার চাদর এবং শ্রেষ্ঠত্ব আমার পোশাক। অনন্তর এর যে-কোনো একটি নিয়ে আমার সাথে কাড়াকাড়ি করবে তাকে আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন বিনয় ও বিনম্রতার মূর্তপ্রতীক। সাধারণ মানুষ তো বটেই; দাস-দাসীদের ডাকেও তিনি সাড়া দিতেন। পথিমধ্যে কেউ তার হাত টেনে ধরলে, তিনি তার সাথে গমন করতেন। দাস-দাসীদের নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। একারণে তার প্রতি ছিল সকল শ্রেণির মানুষের হৃদয়ছোঁয়া ভালোবাসা।
পৃথিবীর আর কোনো নেতা কি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মতো বিনয় দেখিয়েছেন? তিনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরিবারের সুবিধার কথা ভেবে সাধারণ গৃহস্থালি কাজ করতেও দ্বিধা করতেন না। নিজের জামা থেকে শুরু করে জুতা পর্যন্ত—নিজেই সেলাই করতেন। নিজেই ঘর মুছতেন, দুধ দোহাতেন, পরিবারকে মাংস কাটায় সহায়তা করতেন। কেউ এলে নিজেই আতিথেয়তা করতেন। কথা বলতেন এবং তাদের সাথে অত্যন্ত উদার ও মানবিক আচরণ করতেন।
সফরে বের হলে বাহন ও সহযাত্রীর প্রতি সযত্ন দৃষ্টি রাখতেন। একবার তিনি সাওয়ার হতেন, আরেকবার তার সাথীকে সাওয়ার হতে দিতেন। দুজন একসাথে সাওয়ার হলে সঙ্গীর সুবিধার কথা ভেবে তিনি পেছনে বসতেন। কখনো আবার পশুর আরামের জন্য দুজনই পায়দল চলতেন। কাফেলায় একাধিক সহযাত্রী থাকলে তিনি সবার পেছনে থাকতেন। দুর্বল যাত্রীদের সাহায্য করতেন। তাদের নিরাপত্তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে চলার গতি ও পথ নির্ধারণ করতেন।
সুতরাং, এই দয়ার আধার ও বিনয়ের মূর্ত প্রতীক মহান রাসূলের জন্য আমরা এই প্রার্থনা করতেই পারি—
হে আল্লাহ, যতদিন আমাদের মুখে তার নাম উচ্চারিত হবে, যতদিন তাকে নিয়ে মজলিস হবে আর যতদিন জিন-ইনসান তাকে স্মরণ করবে, ততদিন তুমি তার ওপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করো।
টিকাঃ
১. যথোপযুক্ত
১. আয-যুহদ: ১/৬; তাবাকাত: ১/৩৭১; কাশফ আল-খফা: ১/১৭
১. লবণ মাখানো শুকনো গোশত-এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, তিনি সাধারণ মানুষ ছিলেন।
২. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৩১২; মুসতাদরাক আল-হাকিম: ৪৩৬৬, আবু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু- এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; আল কামিল: ৬/২৮৬
৩. সহীহ বুখারী: ৩৪৪৫
১. মুসনাদে আহমাদ: ১৫৮৭৬; সুনানু আবি দাউদ: ৪৮০৬
২. মুসনাদে আহমাদ: ১৮৪২, ২৫৫৫. আস-সনানল কুবরা : ১০৮২৫ ও
১. সহীহ বুখারী: ২৫৬৮, ৫১৭৮
২. জামি তিরমিযী: ২৩৫২; হাদীসটি আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১২৬; মুসতাদরাক আল-হাকিম: ৭৯১১; হাদীসটি আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
৩. জামি তিরমিযী: ২৩৫২
১. সহীহ মুসলিম: ২৬২০; সুনানু আবি দাউদ: ৪০৯০