📘 নবী সাঃ যেভাবে হজ্জ করেছেন > 📄 ৮ যিলহজ ইহরাম বেঁধে মিনা যাত্রা

📄 ৮ যিলহজ ইহরাম বেঁধে মিনা যাত্রা


৪৯- অতপর যখন তারবিয়া দিবস (যিলহজের আট তারিখ) হল, তখন তাঁরা 'তাদের আবাসস্থল বাতহা থেকে’৭৫ হজের ইহরাম বেঁধে মিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন।
৫০- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আয়েশার কাছে গেলেন। তিনি তাঁকে ক্রন্দনরত অবস্থায় পেলেন। তখন তিনি বললেন,
مَا شَانُكِ ؟ قَالَتْ : شَانِي أَنِّى قَدْ حِضْتُ وَقَدْ حَلَّ النَّاسُ وَلَمْ أَحْلِلْ وَلَمْ أَطُفْ بِالْبَيْتِ وَالنَّاسُ يَذْهَبُونَ إِلَى الْحَجِّ الآنَ. فَقَالَ إِنَّ هَذَا أَمْرُ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ فَاغْتَسِلِي ثُمَّ أَهِلَّى بِالْحَجَّ ثُمَّ حُجِّى وَاصْنَعِي مَا يَصْنَعُ الْحَاجُ غَيْرَ أَنْ لَا تَطُوفِي بِالْبَيْتِ وَلَا تُصَلَّى
'তোমার কী হয়েছে? আয়েশা রা. বললেন, আমার হায়েয এসে গেছে। লোকজন হালাল হয়ে গিয়েছে; কিন্তু আমি হালাল হতে পারিনি। বায়তুল্লাহর তাওয়াফও করিনি। অথচ সব মানুষ এখন হজে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, এটা এমন একটি বিষয়, যা আল্লাহ আদমের কন্যা সন্তানদের ওপর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং তুমি গোসল করে নাও। অতপর হজের তালবিয়া পাঠ কর। 'তারপর তুমি হজ কর এবং হজকারী যা করে তুমিও তা কর; কিন্তু বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করো না এবং সালাত আদায় করো না'।৭৬ 'অতপর তিনি তাই করলেন, কিন্তু বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করলেন না। '৭৭
৫১- আর রাসূলুল্লাহ ﷺ উটের পিঠে আরোহন করলেন। ৭৮ তিনি 'আমাদেরকে নিয়ে মিনায়'৭৯ যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজরের সালাত আদায় করলেন।
৫২- অতপর তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। এভাবেই সূর্য উদিত হলো।৮০
৫৩- তিনি নামিরা নামক স্থানে 'তাঁর জন্য'৮১ একটি পশমের তাবু স্থাপন করার নির্দেশ দিলেন।

টিকাঃ
৭৫. বুখারী, মুসলিম।
৭৬. মুসনাদে আহমদ, আবূ দাউদ।
৭৭. মুসনাদে আহমদ।
৭৮. এ থেকে বুঝা যায় এসব স্থানে হাঁটার চেয়ে আরোহনই উত্তম; যেমন পুরো রাস্তায় হেঁটে আসার চেয়ে বাহনে আসা উত্তম। দেখুন : আত-তা'লীক : ১৬।
৭৯. আবূ দাউদ।
৮০. এ থেকে জানা গেল, মিনায় রাত্রিযাপন করা এবং সকালের আগে এস্থান ত্যাগ না করা সুন্নত।
৮১. আবূ দাউদ, ইবন মাজা।

📘 নবী সাঃ যেভাবে হজ্জ করেছেন > 📄 আরাফায় যাত্রা ও নামিরাতে অবস্থান

📄 আরাফায় যাত্রা ও নামিরাতে অবস্থান


৫৪- এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ রওয়ানা হলেন। কুরাইশদের এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না যে, তিনি মাশ'আরে হারাম (অর্থাৎ) 'মুযদালিফাতেই’৮২ অবস্থান করবেন এবং সেখানেই তাঁর অবস্থানস্থল হবে। কেননা কুরাইশরা জাহেলী যুগে এরকম করত।৮৩ কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ মাশ'আরে হারাম অতিক্রম করে আরাফায় উপনীত হলেন এবং নামিরা নামক স্থানে তাঁর জন্য তাঁবু তৈরি করা অবস্থায় পেলেন। তিনি সেখানে অবতরণ করলেন।
৫৫- অতপর যখন সূর্য হেলে পড়ল, তখন তিনি কসওয়া নামক উটনীটি আনতে বললেন এবং তাতে সওয়ার হয়ে উপত্যকার মধ্যে এসে থামলেন৮৪।

টিকাঃ
৮২. আবূ দাউদ, ইবন মাজা।
৮৩. হজ পালনকারী সাহাবীগণকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ আরাফার ময়দানে অবস্থান করলেন এবং এ-ক্ষেত্রেও মুশরিকদের বিপরীত করলেন, কেননা মুশরিকরা মুযদালিফায় অবস্থান করতো এবং বলতো আমরা হারাম এলাকা ছাড়া অন্য জায়গায় যাব না এবং সেখান থেকে প্রস্থান করব না। উল্লেখ্য, আরাফা হারাম এলাকার বাইরে অবস্থিত।
৮৪. এ উপত্যকার নাম হচ্ছে 'উরনা'। এটা আরাফা এলাকার বাইরে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই উরনা উপত্যকা থেকে আরাফার ভাষণ দিয়েছেন।

📘 নবী সাঃ যেভাবে হজ্জ করেছেন > 📄 আরাফার ভাষণ

📄 আরাফার ভাষণ


৫৬- অতপর তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন এবং বললেন,
إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا.
'নিশ্চয় তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য সম্মানিত। যেমন তোমাদের এই শহরে, তোমাদের এই মাসে, তোমাদের এই দিন সম্মানিত'।
أَلَا إِنَّ كُلَّ شَيْءٍ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ تَحْتَ قَدَمَ هَاتَيْنِ مَوْضُوعٌ.
'জেনে রাখো! নিশ্চয় জাহিলিয়াতের প্রত্যেকটি বিষয় আমার এই দুই পায়ের তলে রাখা হল'।
وَدِمَاءُ الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعَةٌ وَإِنَّ أَوَّلَ دَمٍ أَضَعُهُ مِنْ دِمَائِنَا دَمُ ابْنِ رَبِيعَةَ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ. كَانَ مُسْتَرْضَعًا فِي بَنِي سَعْدٍ فَقَتَلَتْهُ هُذَيْلٌ.
'জাহিলী যুগের যাবতীয় রক্তের দাবী রহিত করা হল। আমাদের রক্তের দাবীসমূহের মধ্যে প্রথম রক্তের দাবী যা রহিত করা হল, তা ইবন রবী'আ ইবনুল-হারিসের রক্তের দাবী। সে সা'দ গোত্রে দুধ পানরত অবস্থায় ছিল। হুযাইল গোত্র তাকে হত্যা করেছিল'।
وَرِبَا الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ وَأَوَّلُ رِبًا أَضَعُ رِبَانَا رِبَا عَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَإِنَّهُ مَوْضُوعٌ كُلُّهُ
'জাহেলী যুগের সুদ রহিত করা হল। সর্বপ্রথম যে সুদের দাবী রহিত করছি তা হল আববাস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। তার পুরোটাই রহিত করা হল'।
اتَّقُوا اللهَ فِي النِّسَاءِ فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللَّهِ وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوْجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللَّهِ
'আর তোমরা স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহ্ আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের লজ্জাস্থানসমূহকে আল্লাহর বাণী৮৫ দ্বারা হালাল করে নিয়েছ'।
وَإِنَّ لَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لاَ يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ فَإِنْ فَعَلْنَ فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ
'নিশ্চয় তোমাদের ব্যাপারে তাদের ওপর দায়িত্ব হচ্ছে, তারা যেন তোমাদের বিছানাসমূহকে এমন কোন ব্যক্তি দ্বারা পদদলিত না করে যাকে তোমরা অপছন্দ কর (অর্থাৎ তারা যেন পরপুরুষদেরকে তাদের কাছে আসার অনুমতি না দেয়)। যদি তারা তা করে, তবে তোমরা তাদেরকে মৃদুভাবে প্রহার কর।'
وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
'আর তাদের ব্যাপারে তোমাদের উপর দায়িত্ব হচ্ছে, উত্তম পন্থায় তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা'।
وَإِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابَ اللَّهِ
'আমি তোমাদের মধ্যে এমন এক বিষয় রেখে যাচ্ছি, যা তোমরা অাকড়ে ধরলে আর কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো, আললাহ্ কিতাব'।
وَأَنْتُمْ مَسْئُولُونَ عَنِّى فَمَا أَنْتُمْ قَائِلُونَ. قَالُوا نَشْهَدُ أَنَّكَ قَدْ بَلَّغْتَ رِسَالَاتِ رَبِّكَ وَأَدَّيْتَ وَنَصَحْتَ لِأُمَّتِكَ.
'আমার ব্যাপারে তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে, তখন তোমরা কী বলবে ? তারা বলল, আমরা সাক্ষী দিচ্ছি, নিশ্চয় আপনি আপনার রবের বাণীসমূহ পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, অর্পিত দায়িত্ব আদায় করেছেন, উম্মতকে উপদেশ দিয়েছেন'।
ثُمَّ قَالَ بِأُصْبُعِهِ السَّبَّابَةِ يَرْفَعُهَا إِلَى السَّمَاءِ وَيَنْكِبُهَا إِلَى النَّاسِ اللَّهُمَّ اشْهَدُ اللَّهُمَّ اشْهَدُ اللَّهُمَّ اشْهَدْ.
'অতপর তিনি তাঁর শাহাদাত অঙ্গুলী আকাশের দিকে তুলে মানুষের দিকে ইশারা করে বললেন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন'।

টিকাঃ
৮৫. আল্লাহর বাণীটি হচ্ছে, (فَانكِحُواْ مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ) 'তাহলে তোমরা বিয়ে কর মহিলাদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে' (নিসা : ৩)।

📘 নবী সাঃ যেভাবে হজ্জ করেছেন > 📄 দুই ওয়াক্ত সালাত একসাথে আদায় ও আরাফায় অবস্থান

📄 দুই ওয়াক্ত সালাত একসাথে আদায় ও আরাফায় অবস্থান


৫৬- 'এরপর বিলাল রা. একবার আযান দিলেন। '৮৬
৫৭- অতপর ইকামত দিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ (সবাইকে নিয়ে) যোহরের সালাত আদায় করলেন। বিলাল রা. পুনরায় ইকামত দিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আসরের সালাতও আদায় করলেন।
৫৮- তিনি উভয় সালাতের মাঝখানে অন্য কোন সালাত আদায় করেননি।
৫৯- অতপর রাসূলুল্লাহ ﷺ 'কাসওয়া নামক উটনীর'৮৭ পিঠে আরোহন করলেন। এভাবে তিনি উকূফের স্থানে এলেন। তাঁর উটনী কসওয়ার পেট পাথরের৮৮ দিকে ফিরিয়ে রাখলেন। যারা পায়ে হেঁটে তাঁর সাথে এসেছিলেন, তিনি তাঁদের সকলকে তাঁর সামনে রাখলেন এবং কিবলামুখী হলেন।৮৯
৬০- সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই উকূফ করলেন। এমনিভাবে (পশ্চিম আকাশের) হলুদ আভা ফিকে হয়ে গেল এমনকি লালিমাও দূর হয়ে গেল৯০।
৬১- আর তিনি বললেন,
قَدْ وَقَفْتُ هَهُنَا وَعَرَفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ
'আমি এখানে উকূফ করলাম; কিন্তু আরাফার পুরো এলাকা উকূফের স্থান।'৯১
৬২- এরপর তিনি উসামা ইন্ন যায়েদ রা. কে তাঁর উটনীর পেছনে বসালেন।

টিকাঃ
৮৬. দারেমী।
৮৭. ইবন মাজা।
৮৮. এ পাথরটি জাবালে রহমতের নিচে বিছানো। জাবালে রহমত অবস্থিত আরাফার মাঝামাঝি স্থানে। ইমাম নাববী রহ. বলেন, এটিই উকূফের মুস্তাহাব স্থান। অনেকে মনে করেন জাবালে রহমতে না ওঠলে উকূফ পূর্ণ হবে না- এটি সঠিক নয়।
৮৯. অন্য হাদীসে এসেছে, তিনি উকূফ করেছেন, উভয় হাত তুলে দু'আ করেছেন। হাজ্জাতুন-নবী : ৭৩ পৃষ্ঠা।
৯০. সূর্যাস্তের পর আরাফা থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রস্থান মুশরিকদের আচারের সাথে ভিন্নতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই ছিল। কেননা মুশরিকরা সূর্যাস্তের আগেই আরাফা ত্যাগ করতো। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমাদের আদর্শ তাদের থেকে ভিন্ন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00