📄 হজকে উমরায় পরিণত করার জোর তাগিদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ভাষণ এবং সাহাবীগণের তাঁর আনুগত্য
৪২- 'অতপর রাসূলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে'৫৬ 'মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাবলি বর্ণনা করে বললেন,৫৭
أَبَاللَّهِ تُعَلِّمُونِي أَيُّهَا النَّاسُ، قَدْ عَلِمْتُمْ أَنِّي أَتْقَاكُمْ لِلَّهِ وَأَصْدَقُكُمْ وَأَبَرُّكُمْ
'হে মানুষ, তোমরা কি আমাকে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছ?৫৮ তোমরা জানো, নিশ্চয় আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, তোমাদের চেয়ে অধিক সত্যবাদী, তোমাদের চেয়ে অধিক সৎকর্মশীল।
افْعَلُوا مَا آمُرُكُمْ بِهِ فَإِنِّى لَوْلاَ هَدْيِي لَخَلَلْتُ كَمَا تَحِلُّونَ وَلَكِنْ لَا يَحِلُّ مِنِّي حَرَامٌ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ. وَلَوِ اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِي مَا اسْتَدْبَرْتُ لَمْ أَسُقِ الْهَدْيَ فَحِلُّوا
'আমি তোমাদেরকে যা নির্দেশ করছি তা পালন কর।’৫৯ আমার সাথে যদি হাদী (যবেহের পশু) না থাকত, তাহলে আমি অবশ্যই হালাল হয়ে যেতাম যেরূপ তোমরা হালাল হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু যতক্ষণ না হাদী তার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছবে, [অর্থাৎ দশ তারিখ হাদী যবেহ না হবে] ততক্ষণ আমার পক্ষে হারামকৃত বিষয়াদি হালাল হবে না।'৬০ 'যদি আমি পরে যা জেনেছি পূর্বেই তা জানতাম, তাহলে হাদী সাথে নিয়ে আসতাম না। অতএব, তোমরা হালাল হয়ে যাও।’৬১
৪৩- 'জাবের রা. বলেন, আমরা আমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করলাম এবং সুগন্ধি ব্যবহার করলাম। আমরা আমাদের স্বাভাবিক পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করলাম।'৬২ 'আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কথা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।'৬৩ 'অতপর নবী ﷺ নিজে এবং যাদের সাথে হাদী ছিল৬৪ তারা ছাড়া সবাই হালাল হয়ে গেল এবং চুল ছোট করল।’৬৫
টিকাঃ
৫৬. মুসলিম, তাহাবী, ইবন মাজা।
৫৭. মুসনাদে আহমদ, তাহাবী,
৫৮. বুখারী।
৫৯. বুখারী, মুসলিম।
৬০. বুখারী।
৬১. মুসলিম, ইন্ন মাজা, তাহাবী।
৬২. মুসলিম, নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ।
৬৩. মুসলিম, তাহাবী।
৬৪. যাদের সাথে হাদী ছিল তাঁরা হলেন, রাসূল ﷺ, তালহা রা., আবু বকর রা., উমর রা., যুল-ইয়াসারা রা. ও যুবাইর রা.। সুতরাং তাঁরা কিরান হজ করেছেন। এরা ছাড়া সবাই তামাত্তু হজ করেছেন (বুখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমদ)।
৬৫. ইবন মাজা, তাহাবী।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মত ইহরাম বেঁধে ইয়ামান থেকে আলী রা.-এর আগমন
৪৪- ‘এদিকে আলী রা. তাঁর কর্মস্থল ইয়ামান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের উটগুলো নিয়ে আগমন করলেন। '৬৬
৪৫- তিনি ফাতিমা রা. কে তাদের মধ্যে পেলেন যারা হালাল হয়েছেন। তিনি মাথা আঁচড়িয়েছেন,'৬৭ রঙ্গীন পোশাক পরেছেন এবং সুরমা ব্যবহার করেছেন। তিনি ফাতিমা রা. কে এই অবস্থায় দেখে তা অপছন্দ করলেন। 'তিনি বললেন, তোমাকে এ রকম করার জন্য কে নির্দেশ দিয়েছে?'৬৮ ফাতেমা রা. বললেন, আমার পিতা আমাকে এ রকম করার নির্দেশ দিয়েছেন।
৪৬- জাবের রা. বলেন, আলী রা. ইরাকে থাকা অবস্থায় বলতেন, 'ফাতেমার কৃতকর্মের ওপর উত্তেজিত অবস্থায় আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে গেলাম, ফাতেমা যা রাসূলের বরাত দিয়ে বলেছেন সে সম্পর্কে তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করলাম। আমি রাসূলকে জানালাম যে, আমি ফাতেমার এ কাজ অপছন্দ করেছি; কিন্তু সে আমাকে বলেছে, আমার পিতা আমাকে এরকম করতে নির্দেশ দিয়েছেন। '৬৯ তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
صَدَقَتْ صَدَقَتْ صَدَقَتْ أَنَا أَمَرْتُهَا بِهِ
'সে সত্য বলেছে, সে সত্য বলেছে, সে সত্য বলেছে’৭০। 'আমিই তাকে এরকম করতে নির্দেশ দিয়েছি।'৭১
৪৬- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আলী রা. কে বললেন, হজের নিয়ত করার সময় তুমি কী বলেছিলে? তিনি বললেন, আমি বলেছি,
اللَّهُمَّ إِنِّي أُهِلَّ بِمَا أَهَلَّ بِهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ،
'হে আল্লাহ, নিশ্চয় আমি এভাবে ইহরাম বাঁধছি যেভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইহরাম বেঁধেছেন'।
৪৭- রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
فَإِنَّ مَعِيَ الْهَدْيَ فَلا تَحِلُّ، وَامْكُتْ حَرَامًا كَمَا أَنْتَ
'আমার সাথে হাদী রয়েছে। সুতরাং তুমি হালাল হয়ো না। তুমি হারাম অবস্থায়ই থাকো যেমন আছ।'৭২
৪৭- জাবের রা. বলেন, ইয়ামান থেকে আলী রা. কর্তৃক আনিত হাদী এবং 'মদীনা থেকে'৭৩ রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক আনিত হাদীর 'মোট সংখ্যা ছিল একশত উট।’৭৪
৪৮- জাবের রা. বলেন, নবী ﷺ ও যাদের সাথে হাদী ছিল, তাঁরা ছাড়া সব মানুষ হালাল হয়ে গেল এবং চুল ছোট করল।
টিকাঃ
৬৬. মুসলিম, নাসাঈ।
৬৭. ইবনুল-জারূদ।
৬৮. আবূ দাউদ, বায়হাকী।
৬৯. আবূ দাউদ, বায়হাকী।
৭০. নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ।
৭১. নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ।
৭২. নাসাঈ।
৭৩. নাসাঈ, ইবন মাজা।
৭৪. দারমী।
📄 ৮ যিলহজ ইহরাম বেঁধে মিনা যাত্রা
৪৯- অতপর যখন তারবিয়া দিবস (যিলহজের আট তারিখ) হল, তখন তাঁরা 'তাদের আবাসস্থল বাতহা থেকে’৭৫ হজের ইহরাম বেঁধে মিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন।
৫০- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আয়েশার কাছে গেলেন। তিনি তাঁকে ক্রন্দনরত অবস্থায় পেলেন। তখন তিনি বললেন,
مَا شَانُكِ ؟ قَالَتْ : شَانِي أَنِّى قَدْ حِضْتُ وَقَدْ حَلَّ النَّاسُ وَلَمْ أَحْلِلْ وَلَمْ أَطُفْ بِالْبَيْتِ وَالنَّاسُ يَذْهَبُونَ إِلَى الْحَجِّ الآنَ. فَقَالَ إِنَّ هَذَا أَمْرُ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ فَاغْتَسِلِي ثُمَّ أَهِلَّى بِالْحَجَّ ثُمَّ حُجِّى وَاصْنَعِي مَا يَصْنَعُ الْحَاجُ غَيْرَ أَنْ لَا تَطُوفِي بِالْبَيْتِ وَلَا تُصَلَّى
'তোমার কী হয়েছে? আয়েশা রা. বললেন, আমার হায়েয এসে গেছে। লোকজন হালাল হয়ে গিয়েছে; কিন্তু আমি হালাল হতে পারিনি। বায়তুল্লাহর তাওয়াফও করিনি। অথচ সব মানুষ এখন হজে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, এটা এমন একটি বিষয়, যা আল্লাহ আদমের কন্যা সন্তানদের ওপর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং তুমি গোসল করে নাও। অতপর হজের তালবিয়া পাঠ কর। 'তারপর তুমি হজ কর এবং হজকারী যা করে তুমিও তা কর; কিন্তু বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করো না এবং সালাত আদায় করো না'।৭৬ 'অতপর তিনি তাই করলেন, কিন্তু বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করলেন না। '৭৭
৫১- আর রাসূলুল্লাহ ﷺ উটের পিঠে আরোহন করলেন। ৭৮ তিনি 'আমাদেরকে নিয়ে মিনায়'৭৯ যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজরের সালাত আদায় করলেন।
৫২- অতপর তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। এভাবেই সূর্য উদিত হলো।৮০
৫৩- তিনি নামিরা নামক স্থানে 'তাঁর জন্য'৮১ একটি পশমের তাবু স্থাপন করার নির্দেশ দিলেন।
টিকাঃ
৭৫. বুখারী, মুসলিম।
৭৬. মুসনাদে আহমদ, আবূ দাউদ।
৭৭. মুসনাদে আহমদ।
৭৮. এ থেকে বুঝা যায় এসব স্থানে হাঁটার চেয়ে আরোহনই উত্তম; যেমন পুরো রাস্তায় হেঁটে আসার চেয়ে বাহনে আসা উত্তম। দেখুন : আত-তা'লীক : ১৬।
৭৯. আবূ দাউদ।
৮০. এ থেকে জানা গেল, মিনায় রাত্রিযাপন করা এবং সকালের আগে এস্থান ত্যাগ না করা সুন্নত।
৮১. আবূ দাউদ, ইবন মাজা।
📄 আরাফায় যাত্রা ও নামিরাতে অবস্থান
৫৪- এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ রওয়ানা হলেন। কুরাইশদের এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না যে, তিনি মাশ'আরে হারাম (অর্থাৎ) 'মুযদালিফাতেই’৮২ অবস্থান করবেন এবং সেখানেই তাঁর অবস্থানস্থল হবে। কেননা কুরাইশরা জাহেলী যুগে এরকম করত।৮৩ কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ মাশ'আরে হারাম অতিক্রম করে আরাফায় উপনীত হলেন এবং নামিরা নামক স্থানে তাঁর জন্য তাঁবু তৈরি করা অবস্থায় পেলেন। তিনি সেখানে অবতরণ করলেন।
৫৫- অতপর যখন সূর্য হেলে পড়ল, তখন তিনি কসওয়া নামক উটনীটি আনতে বললেন এবং তাতে সওয়ার হয়ে উপত্যকার মধ্যে এসে থামলেন৮৪।
টিকাঃ
৮২. আবূ দাউদ, ইবন মাজা।
৮৩. হজ পালনকারী সাহাবীগণকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ আরাফার ময়দানে অবস্থান করলেন এবং এ-ক্ষেত্রেও মুশরিকদের বিপরীত করলেন, কেননা মুশরিকরা মুযদালিফায় অবস্থান করতো এবং বলতো আমরা হারাম এলাকা ছাড়া অন্য জায়গায় যাব না এবং সেখান থেকে প্রস্থান করব না। উল্লেখ্য, আরাফা হারাম এলাকার বাইরে অবস্থিত।
৮৪. এ উপত্যকার নাম হচ্ছে 'উরনা'। এটা আরাফা এলাকার বাইরে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই উরনা উপত্যকা থেকে আরাফার ভাষণ দিয়েছেন।