📘 নবী সাঃ যেভাবে হজ্জ করেছেন > 📄 মক্কায় প্রবেশ ও বায়তুল্লাহর তাওয়াফ

📄 মক্কায় প্রবেশ ও বায়তুল্লাহর তাওয়াফ


১৯- এমনিভাবে আমরা তাঁর সাথে বায়তুল্লাহ্ এসে পৌঁছলাম। সময়টা ছিল যিলহজের চার তারিখ ভোরবেলা।২৮
২০- নবী ﷺ মসজিদের দরজার সামনে এলেন। অতপর তিনি তাঁর উট বসালেন। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলেন।
২১- তিনি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন।
২২- এরপর তিনি তাঁর ডান দিকে চললেন।২৯
২৩- অতপর তিনি তিন চক্করে রমল৩০ করতে করতে হাজরে আসওয়াদের কাছে আসলেন। আর চতুর্থ চক্করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটলেন।
২৪- এরপর মাকামে ইবরাহীম আ.-এ পৌঁছে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন : وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلَّ (ওয়াত্তাখিযু মিম মাকামি ইবরাহীমা মুসাল্লা)। তিনি উচ্চস্বরে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন যাতে লোকেরা শুনতে পায়।৩১
২৫- এরপর মাকামে إবরাহীমকে তাঁর ও বায়তুল্লাহ্র মাঝখানে রেখে দুই রাক'আত সালাত আদায় করলেন।৩২
২৬- 'তিনি এ দু'রাক'আত সালাতে সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাস পড়েছিলেন।’৩৩
২৭- এরপর তিনি যমযমের কাছে গিয়ে যমযমের পানি পান করলেন এবং তাঁর নিজের মাথায় ঢাললেন।৩৪
২৮- এরপর তিনি হাজরে আসওয়াদের নিকট গিয়ে তা স্পর্শ করলেন।

টিকাঃ
২৭. মুসলিম।
২৮. মুসলিম।
২৯. মুসলিম।
৩০. রমল হচ্ছে, ঘন পদক্ষেপে বীরের মত দ্রুত হাঁটা।

📘 নবী সাঃ যেভাবে হজ্জ করেছেন > 📄 সাফা ও মারওয়ায় অবস্থান

📄 সাফা ও মারওয়ায় অবস্থান


২৯- তারপর সাফা দরজা দিয়ে বের হয়ে সাফা পাহাড়ে গেলেন। সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি এসে পাঠ করলেন :
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ
'নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমিও তা দিয়ে শুরু করছি'। অতপর তিনি সাফা দিয়ে শুরু করলেন এবং কাবাঘর দেখা যায় এমন উঁচুতে উঠলেন।
৩০- অতপর তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর একত্ববাদ, বড়ত্ব ও প্রশংসার ঘোষণা দিয়ে বললেন,
لاَ إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدِ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَه.
(লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু লাহুল মুল্ক ওয়ালাহুল হাম্দু ইউহয়ী ওয়া ইয়ুমীতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু আনজাযা ওয়াদাহু, ওয়া নাছারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহ্)।
'আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক। তাঁর কোন শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই। প্রশংসাও তাঁর। তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন। আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন; তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রু-দলগুলোকে পরাজিত করেছেন।’৩৫ অতপর এর মাঝে তিনি দু'আ করলেন এবং এরূপ তিনবার পাঠ করলেন।
৩১- এরপর মারওয়া পাহাড়ের দিকে হেঁটে অগ্রসর হলেন। যখন তিনি বাতনুল-ওয়াদীতে পদার্পন করলেন, তখন তিনি দৌড়াতে লাগলেন। যখন তিনি 'উপত্যকার অপর প্রান্তে’৩৬ এসে গেলেন, তখন তিনি স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগলেন। মারওয়ায় এসে তিনি তাতে আরোহন করলেন এবং বায়তুল্লাহ্ দিকে তাকালেন।৩৭
৩২- অতপর সাফা পাহাড়ে যা করেছিলেন মারওয়া পাহাড়েও তাই করলেন।

টিকাঃ
৩১. নাসাঈ।
৩২. বায়হাকী, মুসনাদে আহমদ।
৩৩. নাসাঈ, তিরমিযী।
৩৪. আহমদ।
৩৫. নাসাঈ, মুসলিম। (খন্দকের যুদ্ধে)
৩৬. মুসনাদে আহমদ।
৩৭. নাসাঈ।

📘 নবী সাঃ যেভাবে হজ্জ করেছেন > 📄 হজকে উমরায় পরিণত করার আদেশ

📄 হজকে উমরায় পরিণত করার আদেশ


৩৩- মারওয়া পাহাড়ে শেষ চক্করকালে তিনি বললেন, হে লোকসকল!
لَوْ أَنّى اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِى مَا اسْتَدْبَرْتُ لَمْ أَسُقِ الْهَدْيَ وَجَعَلْتُهَا عُمْرَةً فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ لَيْسَ مَعَهُ هَدَى فَلْيَحِلَّ وَلْيَجْعَلْهَا عُمْرَةً.
'আমি পরে যা বুঝেছি তা যদি আগে বুঝতে পারতাম, তাহলে হাদী বা কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসতাম না এবং হজকে উমরায় পরিণত করতাম। তোমাদের মধ্যে যার সাথে হাদী বা পশু নেই সে যেন হালাল হয়ে যায় এবং এটাকে উমরায় পরিণত করে।৩৮ অন্য বর্ণনায় এসেছে,
أَحِلُّوا مِنْ إِحْرَامِكُمْ فَطُوفُوا بِالْبَيْتِ وَبَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ وَقَصَّرُوا ثُمَّ أَقِيمُوا حَلَالاً حَتَّى إِذَا كَانَ يَوْمُ التَّرْوِيَةِ فَأَهِلُوا بِالْحَجِّ وَاجْعَلُوا الَّتِي قَدِمْتُمْ بِهَا مُتْعَةً.
'বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার মাঝে সা'ঈ করে তোমরা তোমাদের ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাও এবং চুল ছোট করে ফেল। অতপর হালাল হয়ে অবস্থান কর। এমনিভাবে যখন তারবিয়া দিবস৩৯ (যিলহজের আট তারিখ) হবে, তখন তোমরা হজের ইহরাম বেঁধে তালবিয়া পাঠ কর। আর তোমরা যে হজের ইহরাম করে এসেছ, সেটাকে তামাত্তুতে পরিণত কর।'৪০
৩৪- তখন সুরাকা ইন্ন মালিক ইন্ন জু'শুম রা. মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে ছিলেন, তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের এই উমরায় রূপান্তর করে তামাতু করা কি শুধু এ বছরের জন্য নাকি সব সময়ের জন্য? তখন নবী ﷺ দু'হাতের আঙ্গুলগুলো পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে বললেন,
دَخَلَتِ الْعُمْرَةُ فِي الْحَجِّ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ، لَا بَلْ لأَبَدٍ أَبَدٍ، لَا بَلْ لأَبَدٍ أَبَدٍ،
'হজের ভেতরে উমরা কিয়ামত দিন পর্যন্ত প্রবিষ্ট হয়েছে। না, বরং তা সবসময়ের জন্য, না, বরং তা সবসময়ের জন্য' এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। '৪১
৩৫- সুরাকা ইবন মালিক রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদেরকে দীনের ব্যাখ্যা দিন, আমাদেরকে যেন এখনই সৃষ্টি করা হয়েছে (অর্থাৎ আমাদেরকে সদ্যভূমিষ্ট সন্তানের ন্যায় দীনের তালীম দিন)। আজকের আমল কিসের ওপর ভিত্তি করে? কলম যা লিখে শুকিয়ে গিয়েছে এবং তাকদীর যে বিষয়ে অবধারিত হয়ে গিয়েছে, তার ভিত্তিতে? না কি ভবিষ্যতে রচিতব্য নতুন কোন বিষয়ের ভিত্তিতে?৪২ তিনি বললেন,
لَا ، بَل فِي مَا جَفَّتْ بِهِ الْأَقْلَامُ وَجَرَتْ بِهِ الْمَقَادِيرُ.
'না, বরং যা লিখে কলম শুকিয়ে গিয়েছে এবং যে ব্যাপারে তাকদীর নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে, তা-ই তোমরা আমল করবে।
তিনি বললেন, 'তাহলে৪৩ আর আমলের দরকার কী? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
اعْمَلُوا فَكُلُّ مُيَسَّرُ لِمَا خُلِقَ لَهُ ٤٤ [
'তোমরা আমল করে যাও, তোমাদের কেউ যে জন্য সৃষ্ট হয়েছ তার জন্য সে কাজ করা সহজ করে দেয়া হয়েছে।'৪৫
৩৬- জাবের রা. বলেন, 'তিনি আমাদেরকে আদেশ দিলেন, আমরা হালাল হয়ে গেলে যেন হাদীর ব্যবস্থা করি।'৪৬ 'আমাদের মধ্য থেকে এক উটে সাতজন অংশ নিতে পারে। '৪৭ 'যার সাথে হাদী নেই সে যেন হজের সময়ে তিনদিন রোযা রাখে আর যখন নিজ পরিবারের নিকট অর্থাৎ দেশে ফিরে যাবে তখন যেন সাতদিন রোযা রাখে। '৪৮
৩৭- 'অতপর আমরা বললাম, কী হালাল হবে? তিনি বললেন,

টিকাঃ
৩৮. সাহাবীদের মধ্যে যারা হাদী সঙ্গে নিয়ে আসেননি রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদেরকে উমরা করে হালাল হতে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তাদের হজ মুশরিকদের বিপরীত হয়। কেননা মুশরিকরা মনে করতো, হজের মাসসমূহে উমরা পালন জঘন্যতম অপরাধ (বুখারী : ৭২৩০)।
৩৯. ৮ যিলহজকে ইয়াওমুত তারবিয়া বলা হয়। ইয়াওমুত-তারবিয়া অর্থ পানি পান করানোর দিন। মিনায় পানি ছিল না বলে এদিন হাজীরা পানি পান করে নিতেন, সাথেও নিয়ে নিতেন এবং তাদের বাহন জন্তুগুলোকেও পানি পান করাতেন। তাই এই দিনকে পান করানোর দিন বলা হয়। ইন্ন কুদামা, আল-মুগনী : ৩১৪।
৪০. বুখারী ও মুসলিম।
৪১. ইন্ন জারূদ, আল-মুনতাকা।
৪২. অর্থাৎ, আমাদের কর্মকান্ড কি আগেই নির্ধারিত নাকি আমরা সামনে যা করব সেটাই চূড়ান্ত?
৪৩. মুসনাদে আহমদ।
৪৪. অর্থাৎ তাকদীরে যদি ভালো লিখা হয়ে থাকে, তাহলে ভাল কাজ করা তার জন্য সহজ হবে। আর যদি তাকদীরে খারাপ লিখা থাকে, তবে খারাপ কাজ করা তার জন্য সহজ করে দেয়া হবে।
৪৫. মুসনাদে আহমদ।
৪৬. মুসলিম, মুসনাদে আহমদ।
৪৭. মুসনাদে আহমদ।
৪৮. মুয়াত্তা, বায়হাকী।

📘 নবী সাঃ যেভাবে হজ্জ করেছেন > 📄 বাতহা নামক জায়গায় অবস্থান

📄 বাতহা নামক জায়গায় অবস্থান


'৫০
৩৯- 'জাবের রা. বলেন, আমরা বের হয়ে বাতহা৫১ নামক স্থানে গেলাম। তিনি বলেন, এমতাবস্থায় এক লোক বলতে লাগল,
عَهْدِي بِأَهْلِي الْيَوْمَ
'আজকে আমার পরিবারের সাথে আমার সাক্ষাতের পালা।' ৫২
৪০- 'জাবের রা. বলেন, আমরা পরস্পর আলোচনা করতে লাগলাম। অতপর আমরা বললাম, আমরা হাজী হিসেবে বের হয়েছিলাম। হজ ছাড়া আমরা অন্য কিছুর নিয়ত করিনি। এমতাবস্থায় আমাদের কাছে আরাফা দিবস আসতে যখন আর মাত্র চার দিন বাকী।’৫৩ 'এক বর্ণনায় এসেছে, পাঁচ রাত্রি, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন, যেন আমরা আমাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত হই। অতপর আমরা আরাফার উদ্দেশ্যে (মিনা) গমন করি, অথচ আমাদের পুরুষাঙ্গগুলি সবে মাত্র বীর্যস্খলন করেছে। জাবের রা. এটি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখাচ্ছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি যেন জাবের রা. এর কথার সাথে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখানোর ব্যাপারটি দেখতে পাচ্ছি। মোট কথা, তাঁরা বললেন, আমরা কিভাবে তামাতু করব অথচ আমরা শুধু হজের নাম উল্লেখ করেছি।'৫৪
৪১- জাবের রা. বলেন, 'বিষয়টি নবী ﷺ এর কাছে পৌঁছল। আমরা জানি না এটা কি আসমান থেকে তাঁর নিকট পৌঁছল নাকি মানুষের নিকট থেকে পৌঁছল।’৫৫

টিকাঃ
৪৯. মুসনাদে আহমদ, তাহাবী।
১৭'সব কিছু হালাল হয়ে যাবে।' الْحِلُّ كُلُّهُ.
৫০. মুসনাদে আহমদ, নাসাঈ।
৫১. বায়তুল্লাহর পূর্বদিকে অবস্থিত।
৫২. মুসনাদে আহমদ।
৫৩. মুসনাদে আহমদ।
৫৪. বুখারী, মুসলিম।
৫৫. মুসলিম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00