📄 ক। মানুষের প্রকারভেদ
মানুষের প্রকারভেদ (أقسام البشر): কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তিন ধরণের মানুষের পরিচয় উল্লেখ করেছেনঃ
(১) মুমিন (المؤمنون)
(২) কাফের (الكفار)
(৩) মুনাফিক (المنافقون)
১। মুমিনরা ঈমান ও সৎ আমল বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ (2) الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ ( 3) أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ (4)} . [الأنفال: 2 - 4]
'মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে। (২) যারা ছালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে। (৩) তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট উচ্চ মর্যাদাসমূহ এবং ক্ষমা ও সম্মানজনক রিযিক' (সূরা আল-আনফাল: ২-৪)।
মুমিনরা উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, যারা দুনিয়াতে হবে সৌভাগ্যবান আর আখেরাতে জান্নাত লাভ করবে।
২। কাফেররা কুফর, আল্লাহর অবাধ্যতা ও কু-প্রবৃত্তির উপভোগ বৃদ্ধির জন্য কাজ করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَالَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُونَ وَيَأْكُلُونَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَهُمْ ( 12)} [محمد: 12]
'কিন্তু যারা কুফরী করে, তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং তারা আহার করে যেমন চতুষ্পদ জন্তুরা আহার করে। আর জাহান্নামই তাদের বাসস্থান' (সূরা মুহাম্মাদ: ১২)।
কাফেররা হবে নিকৃষ্টতম স্তরের বাসিন্দা, তারা সবাই দুনিয়াতে হবে হতভাগা আর আখেরাতে জাহান্নামী।
৩। মুনাফিকরা কাফেরদের চেয়েও বেশি বিপদজনক। তারা মুখে মুসলিমদের সাথে অবস্থান করলেও তাদের অন্তর কাফেরদের সাথেই থাকে। তারা ভেতর থেকে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। যেমন- আল্লাহ বলেন:
{وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِنْ يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ كَأَنَّهُمْ خُشُبٌ مُسَنَّدَةٌ يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرْهُمْ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ} [المنافقون: 4]
'আর যখন তুমি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখবে, তখন তাদের শরীর তোমাকে মুগ্ধ করবে। আর যদি তারা কথা বলে, তুমি তাদের কথা (আগ্রহ নিয়ে) শুনবে। তারা দেয়ালে ঠেস দেয়া কাঠের মতই। তারা মনে করে, প্রতি আওয়াজই তাদের বিরুদ্ধে। এরাই শত্রু, অতএব এদের সম্পর্কে সতর্ক হও। আল্লাহ এদেরকে ধ্বংস করুন। তারা কিভাবে সত্য থেকে ফিরে যাচ্ছে' (সূরা আল-মুনাফিকুন: ৪)।
তারা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। দুনিয়াতে হতভাগা ও শংকায় থাকবে। আর সব ধরনের আওয়াজই তারা তাদের বিরুদ্ধে মনে করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا} [النساء: 145]
'নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনো তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না' (সূরা আন-নিসা: ১৪৫)।
মুমিনদের উচিত, আল্লাহর দিকে কাফের ও মুনাফিকদের দা'ওয়াত দেয়ার চেষ্টা করা।
📄 খ। আল্লাহর দিকে দা‘ওয়াতের বিরোধিতাকারীরা
আল্লাহর দিকে দা'ওয়াতের বিরোধিতাকারীরা (المعارضون للدعوة إلى الله): তিন শ্রেণীর মানুষের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে দা'ওয়াতদাতা (দাঈ) গণকে আল্লাহ পরীক্ষা করেন। প্রত্যেক শ্রেণীর মানুষেরই তাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু অনুসারী, বাণী, লেনদেন ও দা'ওয়াত রয়েছে।
প্রথম: যারা সত্য উপলব্ধি করা সত্ত্বেও হিংসা ও সীমালঙ্ঘন বশতঃ তার বিরোধিতা করে। যেমন- ইয়াহূদী। অথবা যারা সত্য জেনেও পথভ্রষ্ট হয়। যেমন- খ্রিস্টান। আল্লাহ বলেন:
{وَدَّ كَثِيرٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُمْ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} [البقرة: 109]
'আহলে কিতাবের অনেকেই চায়, যদি তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পর কাফের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারত! সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে হিংসাবশতঃ (তারা এরূপ করে থাকে)। সুতরাং তোমরা ক্ষমা কর এবং এড়িয়ে চল, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর নির্দেশ দেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান' (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১০৯)।
দ্বিতীয়: নেতৃস্থানীয় ও সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ, যারা দুনিয়াদার ও প্রবৃত্তির অনুসারী। যখন তারা বুঝতে পারে যে, দ্বীন তাদেরকে পরিচালিত করবে এবং তাদের পছন্দনীয় বিষয়ে বাধাগ্রস্ত করবে, তখন তারা দ্বীনের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়। যেমন- আল্লাহ বলেন:
{فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (50)} [القصص: 50]
'অতঃপর তারা যদি তোমার আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে জেনে রাখ, তারা তো নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে। আর আল্লাহর দিকনির্দেশনা ছাড়া যে নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ যালিম কওমকে হেদায়াত করেন না' (সূরা আল-ক্বাছাছ: ৫০)।
তৃতীয়: যারা বাতিলের উপর বেড়ে উঠে। এ শ্রেণীর মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের যে অবস্থায় পায়, তাকেই হক্ব মনে করে; অথচ তারা বাতিলের উপর। বেশিরভাগ মানুষই এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন:
{إِنَّهُمْ أَلْفَوْا آبَاءَهُمْ ضَالِّينَ (69) فَهُمْ عَلَى آثَارِهِمْ يُهْرَعُونَ (70)} .. [الصافات: 69 - 70]
'নিশ্চয় এরা নিজেদের পিতৃপুরুষদেরকে পথভ্রষ্ট পেয়েছিল; (৬৯) ফলে তারাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণে দ্রুত ছুটেছে' (সূরা আছ-ছফাত: ৬৯-৭০)।
আর তারা অন্ধ অনুসারীও:
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ (170)} .. [البقرة: 170]
'আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা অনুসরণ কর, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন, তার; তারা বলে, বরং আমরা অনুসরণ করব আমাদের পিতৃ-পুরুষদেরকে যার উপর পেয়েছি। যদি তাদের পিতৃ-পুরুষরা কিছু না বুঝে এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত না হয়, তাহলেও কি?' (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৭০)।
📄 গ। আল্লাহর দিকে আহ্বানের ক্ষেত্র
আল্লাহর দিকে আহ্বানের ক্ষেত্র (ميادين الدعوة إلى الله): সকল স্তরের মানুষই আল্লাহর দিকে দা'ওয়াতের মুখাপেক্ষী।
১। কাফের ও মুশরিকদেরকে ইসলামে প্রবেশের এবং কুফর থেকে প্রত্যাবর্তনের জন্য দা'ওয়াত দিতে হবে। আর ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের মত আরো যাদের চিন্তা-চেতনা নষ্ট হয়ে গেছে, তাদের প্রত্যেককেই কাফের-মুশরিকদের সাথে দা'ওয়াতে সম্পৃক্ত করা হবে।
২। ছহীহ দ্বীনের ছহীহ বিধান বর্ণনার মাধ্যমে বিদ'আতীদেরকে আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দিতে হবে, যাতে তারা জাগ্রত জ্ঞান সহকারে এবং দ্বীনের উত্তম অনুসারী হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে।
৩। পাপী ও চরিত্রহীন ব্যক্তিদেরকে আল্লাহর বড়ত্বের উপদেশ দানের মাধ্যমে দা'ওয়াত দিতে হবে, যাতে তারা আল্লাহর মর্যাদা উপলব্ধি করে। তাঁর নেয়ামত স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে দা'ওয়াত দিতে হবে, যাতে তারা তাঁর শুকরিয়া আদায় করে। তাঁর সীমাহীন রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে তাদেরকে দা'ওয়াত দিতে হবে, যাতে তারা আল্লাহর নিকট (তাওবা) ফিরে আসে। দা'ওয়াত দিতে হবে জান্নাতের প্রতি উৎসাহিত করে, যাতে তারা তাঁর আনুগত্য করে এবং জাহান্নামের ভয় দেখিয়ে, যাতে তারা তাঁর অবাধ্য না হয়।
৪। ইবাদতকারীগণও দা'ওয়াতের মুখাপেক্ষী, যাতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়, আমল সুন্দর হয়, অন্যকে দা'ওয়াত দানে তারা যেন উৎসাহিত হয়। এতে তারা নিজে সংশোধিত হওয়া এবং অন্যকে সংশোধিত করার উভয় বৈশিষ্ট্যেরই সমন্বয় করতে পারবে।
৫। আলেমগণও দা'ওয়াতের মুখাপেক্ষী, যাতে তারা তাদের জ্ঞান অনুযায়ী আমল করতে পারেন এবং মানুষের মাঝে তাদের জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে পারেন।
৬। মুসলিম জনসাধারণকেও আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে হবে, যাতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়, আমল সুন্দর হয় এবং তাদের পাপের জন্য তাওবা করে। আল্লাহ তা'আলার দিকে দা'ওয়াত দান, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজ থেকে নিষেধ, উপদেশ দান, কল্যাণ কামনা এবং সঠিক পথ প্রর্দশন এ কাজগুলো থেকে মুমিন, কাফের, আনুগত্যকারী, অবাধ্য, আলেম, জাহিল (অজ্ঞ) কেউই অমুখাপেক্ষী নয়। প্রত্যেকেই তাদের অবস্থা অনুপাতে আল্লাহর দিকে আহ্বান করবে এবং অবস্থানুযায়ী সকলকেই দা'ওয়াত দিতে হবে।
১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ} [فاطر: 15]
'হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর নিকট মুখাপেক্ষী আর আল্লাহ অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত' (সূরা ফাতির: ১৫)।
২। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: {قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ} [يوسف: 108]
'বলুন, ইহাই আমার পথ, আমি ও আমার অনুসারীগণ ডাকি আল্লাহর দিকে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে। আল্লাহ পবিত্র এবং আমি শিরককারীদের অন্তর্ভুক্ত নই' (সূরা ইউসুফ: ১০৮)।
📄 ঘ। আহূতদের প্রকার এবং তাদের দা‘ওয়াতের ধরণ
আহূতদের প্রকার এবং তাদের দা'ওয়াতের ধরণ (أصناف المدعوين وكيفية دعوتهم): মানুষ চিন্তা-চেতনা ও আমলের দিক থেকে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। তাই তাদের ভিন্নতা অনুযায়ী তাদের দা'ওয়াত, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধের বিধানও ভিন্ন ভিন্ন হবে, আর তা নিম্নরূপ:
১। অপূর্ণ ঈমানের অধিকারী এবং বিধি-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ: এসব ব্যক্তির ক্ষেত্রে আমরা ধৈর্য ধারণসহ তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করবো, নরম কথা ও সহানুভূতির সাথে শিক্ষা দেবো। কোমলতার সাথে উত্তম কাজের দিক-নির্দেশনা দিব। যেমন- একজন আগন্তুক বেদুঈন এসে মসজিদে পেশাব করলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে ধৈর্যের সাথে ভাল আচরণ করেছিলেন। আনাস ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সঙ্গে মসজিদে নববীতে ছিলাম। এ সময় হঠাৎ এক বেদুঈন এসে মসজিদের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে লাগলেন, তা দেখে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছাহাবীগণ 'থামো থামো' বলে তাঁকে প্রস্রাব করতে বাধা দিলেন। আনাস (রা.) বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তোমরা তাঁকে বাধা দিও না, বরং তাঁকে ছেড়ে দাও। লোকেরা তাঁকে ছেড়ে দিলেন, তিনি প্রস্রাব সেরে নিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে কাছে ডেকে বললেন: এটা হলো মসজিদ। এখানে প্রস্রাব করা কিংবা ময়লা-আবর্জনা ফেলা যায় না। বরং এ হলো আল্লাহর যিক্র করা, ছালাত আদায় করা এবং কুরআন পাঠ করার স্থান। অথবা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কথাটা যেভাবে বলেছেন তাই। আনাস (রা.) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সবার মধ্য থেকে এক ব্যক্তিতে এক বালতি পানি আনতে আদেশ করলেন। সে এক বালতি পানি আনলে তিনি তা প্রস্রাবের উপর ঢেলে দিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/২১৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৫)।
২। অপূর্ণ ঈমানের অধিকারী কিন্তু বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত: উত্তম উপদেশ ও হিকমাত (কৌশল জ্ঞান)-এর সাথে এ ব্যক্তিকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে হবে। তাঁর সামনে বোধগম্য উদাহরণ ও যৌক্তিক দলীল পেশ করতে হবে। তাঁর ঈমান বৃদ্ধির জন্য দু'আ করতে হবে, যাতে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের উপর অটল থাকে। আবূ উমামাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একজন যুবক রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন। লোকজন তাঁকে ধমক দিলেন এবং বললেন, চুপ করো। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাঁকে কাছে আসতে দাও। অতঃপর যুবকটি কাছে আসলেন। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি কি তোমার মায়ের জন্য যিনা পছন্দ করো? যুবকটি বললেন, আল্লাহর কসম! পছন্দ করি না। কেউই তার মায়ের জন্য যিনা পছন্দ করে না। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য যিনা পছন্দ করো? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! পছন্দ করি না, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন। কেউই তার মেয়ের জন্য যিনা পছন্দ করে না। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি কি তোমার বোনের জন্য যিনা পছন্দ করো? তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহর কসম! পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন। কেউই তার বোনের জন্য যিনা পছন্দ করে না। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি কি তোমার ফুফুর জন্য যিনা পছন্দ করো? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন। কেউই তার ফুফুর জন্য যিনা পছন্দ করে না। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি কি তোমার খালার জন্য যিনা পছন্দ করো? তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহর কসম! পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন। কেউই তার খালার জন্য যিনা পছন্দ করে না। তারপর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর হাত যুবকটির গায়ে রেখে বললেন: “হে আল্লাহ! তার গুনাহ মাফ করো, তার অন্তর পবিত্র রাখো, তার লজ্জা স্থানের হিফাযত করো।” অতঃপর ঐ যুবক আর কখনো এ কাজে লিপ্ত হননি (মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৫৬৪, ছহীহ)।
৩। দৃঢ় ঈমানের অধিকারী কিন্তু বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ: এ ধরণের ব্যক্তিকে সরাসরি শরী'আতের বিধান ও অবাধ্যতার কুফল বর্ণনার মাধ্যমে এবং তাঁর ঘটিত অসৎকাজ দূরীকরণে সঠিক দিশা প্রদানের মাধ্যমে দা'ওয়াত দিতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জনৈক লোকের হাতে একটি সোনার আংটি লক্ষ্য করে সেটি খুলে ফেলে দিলেন এবং বললেন, তোমাদের মাঝে কেউ কেউ আগুনের টুকরা জোগাড় করে তার হাতে রাখে। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সে স্থান ত্যাগ করলে ব্যক্তিটিকে বলা হলো, আপনার আংটি উঠিয়ে নিন। এটি দিয়ে উপকার হাছিল করুন। তিনি বললেন, না। আল্লাহর কসম! আমি কক্ষনো ওটা নিব না। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তো ওটা ফেলে দিয়েছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২০৯০)।
৪। দৃঢ় ঈমানের অধিকারী ও বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত: এ ধরনের ব্যক্তির ব্যাপারে কোন আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। আগের ব্যক্তিদের তুলনায় এ ধরনের ব্যক্তির পাপ থেকে তাঁকে শক্তভাবে নিষেধ করতে হবে এবং কঠিন আচরণ করতে হবে, যাতে সে পাপকাজে অন্যের আদর্শ না হয়। যেমন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার অপরাধে তিন ব্যক্তি থেকে ৫০ দিন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন এবং মানুষদেরকে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ তাদের পূর্ণ ঈমান ও জ্ঞান ছিল, কোন অজুহাত ছিল না। অবশ্য পরবর্তীতে আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেন। তারা হচ্ছেন, হিলাল ইবনু উমাইয়াহ, কা'ব ইবনু মালেক ও মুরারা ইবনুর-রবী'। ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে ঘটনাটি বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ (118)} [التوبة: 118] 'এবং সে তিন জনের (তাওবা কবুল করলেন), যাদের বিষয়টি স্থগিত রাখা হয়েছিল। এমনকি পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের নিকট তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। আর তারা নিশ্চিত বুঝেছিল যে, আল্লাহর আযাব থেকে কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের তওবার তাওফীক্ব দিলেন, যাতে তারা তাওবা করে। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, দয়ালু' (সূরা আত-তাওবা: ১১৮)।
৫। যে ব্যক্তি ঈমান ও বিধি-বিধান উভয় সম্পর্কে অজ্ঞ: পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর অধিকাংশ কাফেরই এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে প্রথমত আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের দা'ওয়াত দিতে হবে। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর নামসমূহ, গুণাবলী, তাঁর সীমাহীন দয়া এবং মহা নেয়ামত সম্পর্কে জানাতে হবে। আল্লাহর শান্তির অঙ্গীকার ও শাস্তির ভয় স্মরণ করাতে হবে, জান্নাত লাভে উৎসাহ প্রদান এবং জাহান্নাম সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করতে হবে। তারা ঈমানে অটল হলে পর্যায়ক্রমে আল্লাহর বিধানাবলী জানাতে হবে। যেমনঃ ছালাত এবং ছালাতের আবশ্যকীয় বিষয় পবিত্রতা ও অযূ ইত্যাদি; তারপর যাকাত...এভাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ} [محمد: 19] 'অতএব, জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই। তুমি ক্ষমা প্রার্থনা কর তোমার এবং মুমিন নারী-পুরুষদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং নিবাস সম্পর্কে অবগত রয়েছেন' (সূরা মুহাম্মাদ: ১৯)।
টিকাঃ
১. মুত্তাফাকুন আলাইহি। ছহীহ বুখারী, হা/৪৪১৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৯।