📄 গ। মুসলিম নর-নারীর উপর যা আবশ্যক
মুসলিম নর-নারীর উপর যা আবশ্যক (ওয়াজিব আল মুসলিম ওয়াল মুসলিমাহ): মুসলিম নর-নারীর উপর আবশ্যক কর্তব্য দু'টিঃ
প্রথম কর্তব্য: দ্বীনের আমল করা, একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করা, যার কোন শরীক নেই, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা, আল্লাহ তা'আলা যা নির্দেশ করেছেন, তা পালন করা আর তিনি যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা।
১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا} [النساء: 36] 'তোমরা ইবাদত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না' (সূরা আন-নিসা: ৩৬)।
২। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُونَ (20)} [الأنفال: 20] 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, অথচ তোমরা শুনছ' (সূরা আল-আনফাল: ২০)।
৩। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: {وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ (7)} [الحشر: 7] 'রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর' (সূরা আল-হাশর: ৭)।
দ্বিতীয় কর্তব্য: আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দান, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা।
১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (104)} [آل عمران: 104] 'আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম' (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)।
২। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছিয়ে দাও (ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১)।
৩। আবু সা'ঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: তোমাদের কেউ গর্হিত কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগে) পরিবর্তন করে দেয়, যদি তার সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (বাক্য) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা করবে, তবে এটা ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯)।
📄 ঘ। আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী (দাঈ)-এর অবস্থাসমূহ
আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী (দাঈ)-এর অবস্থাসমূহ (أحوال الداعي إلى الله): আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী দা'ওয়াতী কাজ করলে তিনি দু'টি অবস্থার মুখোমুখি হনঃ
(ক) মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া। যেমনটি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বেলায় হয়েছিল, যখন মদীনাবাসীরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর আগমনে আনন্দিত হয়েছিলেন।
(খ) জনগণের সরে যাওয়া। যেমনটি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বেলায় হয়েছিল, যখন তায়েফের নেতারা প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে নির্বোধ ও শিশুদেরকে উস্কে দিয়েছিল, এমনকি তারা তাঁকে পাথর দিয়ে প্রহার করেছিল। মহান আল্লাহ তাঁর অলী-আউলিয়াকে তাঁর শত্রুদের নিকট সমর্পণ করেন না। তবে, সর্বজ্ঞাত, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা'আলা কখনো কখনো দাঈকে শিক্ষা দেন এবং কখনও কখনও তাঁর মাধ্যমে অন্যকে শিক্ষা দেন।
মানুষের ব্যাপক সাড়া দাঈর জন্য বেশি কঠিন এবং মারাত্মক। এক্ষেত্রে তার অহংকার আসতে পারে, তাকে পদমর্যাদায় ভূষিত করার প্রস্তাব দেয়া হতে পারে। ফলে, তিনি দুনিয়ার ফিতনার সম্মুখীন হতে পারেন। আর দাঈকে দ্বীনের দা'ওয়াত দেয়া থেকে বিরত রাখতে এবং দুনিয়া, ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা ও বিভিন্ন বিষয়ের মাধ্যমে দ্বীন থেকে অন্যমনস্ক রাখতে শয়তানের অপচেষ্টা মাত্র।
তবে, জনগণ দূরে সরে গেলে এবং দা'ওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তা দাঈর জন্য বেশি উত্তম এবং তার শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশি শক্তিশালী। কেন না, এর মাধ্যমে দাঈ বেশি বেশি আল্লাহমুখী হয়। এর ফলে নেমে আসে আল্লাহর সাহায্য, যেমনটি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিল; যখন তায়েফবাসী তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তখন তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে জিবরীল (আ.) ও পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেছিলেন। অতঃপর সসম্মানে তাঁর মক্কায় প্রবেশের বিষয়টি তাঁর জন্য সহজ করেছিলেন। অতঃপর ইসরা ও মি'রাজের মাধ্যমে তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন। তারপর মদীনায় হিজরতের বিষয়টিও তাঁর জন্য সহজ করেছিলেন। অবশেষে, ইসলামের বিজয় এবং যমীনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটিও সহজ করে দিয়েছিলেন।
১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفتَنُونَ (2) وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ (3)} [العنكبوت: 2 - 3] 'মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? (২) আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে, আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যে, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী' (সূরা আল-আনকাবূত: ২-৩)।
২। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জীবনে কি উহুদ দিবসের চেয়েও অধিকতর কঠিন কোন দিন এসেছে? তিনি বললেন, তোমার সম্প্রদায়ের হাতে 'আক্বাবার' দিন যে নির্যাতনের শিকার হয়েছি, তা এর চেয়েও অধিকতর কঠিন ছিল, যখন আমি (আল্লাহর পানে দা'ওয়াত দিতে গিয়ে) ইবনু 'আব্দে ইয়ালীল ইবনু আব্দে কিলালের কাছে নিজেকে পেশ করছিলাম। কিন্তু সে আমার কাঙ্ক্ষিত ডাকে সাড়া দেয়নি। তখন আমি অত্যন্ত বিষণ্ণ অবস্থায় সম্মুখের দিকে চলতে লাগলাম এবং কারনুছ-ছা'আলিব নামক স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত আমি সংজ্ঞা ফিরে পাইনি। তারপর যখন আমি মাথা উঠালাম, তখন দেখলাম, একখণ্ড মেঘ আমাকে ছায়া দিয়ে রেখেছে এবং এর মধ্যে জিবরীল (আ.) কে দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেন, মহা মহিমান্বিত আল্লাহ আপনার ব্যাপারে আপনার সম্প্রদায়ের উক্তি এবং আপনার বিরুদ্ধে তাদের উত্তরও শুনেছেন এবং তিনি আপনার নিকট পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন, যেন আপনি আপনার সম্প্রদায়ের লোকজনের ব্যাপারে যেরূপ ইচ্ছা সেরূপ আদেশ করেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতাও আমাকে ডাক দিলেন এবং আমাকে সালাম দিলেন। তারপর বললেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রতি আপনার সম্প্রদায়ের লোকজনের উক্তি আল্লাহ তা'আলা শুনেছেন। আমি পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা, আপনার রব আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন, যেন আপনি আপনার ইচ্ছামত আমাকে নির্দেশ দেন। আপনি কি করতে চান? (আপনি বললে) আমি এ পাহাড় দু'টিকে তাদের উপর চাপা দিয়ে দিব। তখন রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: আমি বরং আশা করছি যে, আল্লাহ তা'আলা হয়তো এদের ঔরস থেকেই এমন ব্যক্তি বের করে আনবেন, যারা তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক না করে এক আল্লাহর ইবাদত করবে (ছহীহ বুখারী, হা/৩২৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৯৫)।
📄 ঙ। দাঈর প্রস্তুতি
দাঈর প্রস্তুতি (عدة الداعي إلى الله): দ্বীনের মূল ভিত্তি দু'টি। হক্বের (আল্লাহর) উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও সৃষ্টির প্রতি পূর্ণ দয়া। হক্বের উপর দৃঢ় বিশ্বাসই (ঈমান) দাঈকে সৃষ্টির মন্দ বিষয় থেকে বিরত রাখবে। আর সৃষ্টির প্রতি পূর্ণ দয়াই দাঈকে সৃষ্টির ক্ষতি করা থেকে প্রতিহত করবে। ফলে, ঈমান শক্তিশালী করার মাধ্যমে মানুষের সকল ধরণের ক্ষতি করা থেকে আমরা বিরত থাকবো। অনুরূপভাবে, মন্দ লোকদের প্রতি অতি দয়ার কারণে তারাও দাঈর পক্ষ থেকে নিরাপদে থাকবে। এভাবে হেদায়াত ও কল্যাণ অর্জিত হবে, আর দ্বীনের প্রতি মানুষের হৃদয় ঝুঁকে পড়বে।
১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا (3)} [الطلاق: 3] 'আর যে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়-সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন' (সূরা আত-ত্বলাক: ৩)।
২। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ (67)} [المائدة: 67] 'হে রাসূল! তোমার রবের পক্ষ হতে তোমার নিকট যা নাযিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও এবং যদি তুমি না কর, তবে তুমি তাঁর রিছালাত পৌঁছালে না। আর আল্লাহ তোমাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না' (সূরা আল-মায়েদা: ৬৭)।
৩। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: {وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ} ... [الأنبياء: 107] 'আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসাবেই প্রেরণ করেছি' (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)।
৪। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি নাজদ এলাকায় রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যাবর্তন করলে তিনিও তাঁর সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। পথিমধ্যে কাটা গাছ ভরা এক উপত্যকায় মধ্যাহ্নের সময় তাদের ভীষণ গরম অনুভূত হলো। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এখানেই অবতরণ করলেন। লোকজন ছায়াদার বৃক্ষের খোঁজে কাঁটাবনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি বাবলা গাছের নিচে অবস্থান করে তরবারিখানা গাছে ঝুলিয়ে রাখলেন। জাবের (রা.) বলেন, সবেমাত্র আমরা নিদ্রা গিয়েছি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে ডাকতে লাগলেন। আমরা তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। তখন তাঁর কাছে এক বেদুঈন বসেছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি নিদ্রিত অবস্থায় ছিলাম, এমতাবস্থায় সে আমার তরবারিখানা হস্তগত করে কোষমুক্ত অবস্থায় তা আমার উপর উঁচিয়ে ধরলে আমি জেগে যাই। তখন সে আমাকে বলল, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে? আমি বললাম, আল্লাহ। দেখ না, এ-ই তো সে বসে আছে। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে কোন প্রকার শাস্তি দিলেন না (ছহীহ বুখারী, হা/৪১৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৪৩)।
রবের প্রতি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পূর্ণ বিশ্বাসই আগন্তুককে রাসূলের ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দয়াই আগন্তুককে হত্যা করা থেকে বিরত রাখে। আর এ দয়ার কারণেই আগন্তুক ও তার দলবল হেদায়াত লাভ করেন।
📄 চ। দাঈর নিয়্যত-সংকল্প
দাঈর নিয়্যত-সংকল্প (نية الداعي إلى الله): দ্বীন ইসলাম বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ। আর নিয়্যতানুযায়ী প্রত্যেক দাঈকে প্রতিদান দেয়া হবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দিয়েছেন ও ইবাদত করেছেন। তিনি নিজেকে দিয়েই দা'ওয়াতী কাজ শুরু করেন, তারপর পর্যায়ক্রমে তার পরিবার, নিকটাত্মীয়, তার জাতি, মক্কাবাসী ও এর চতুষ্পার্শ্বে বসবাসকারী লোকজন, আরববাসী এবং সকল শ্রেণীর মানুষকে আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দিয়েছেন এই বলে যে, তিনি সমগ্র মানবমণ্ডলীর কাছে আল্লাহর রাসূল হিসাবে এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন। এর ফলে, মানুষ দলে দলে দ্বীনে প্রবেশ করেছে।
দাঈর নিয়্যতের ৮টি স্তর রয়েছেঃ
১। নিজেকে দিয়ে দা'ওয়াত শুরু করা (أن يبدأ بنفسه): আল্লাহ বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ (6)} ... [التحريم: 6] 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সে অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যেখানে রয়েছে নির্মম ও কঠোর ফেরেশতাকূল, যারা আল্লাহ তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, সে ব্যাপারে অবাধ্য হয় না। আর তারা তা-ই করে, যা তাদেরকে আদেশ করা হয়' (সূরা আত-তাহরীম: ৬)।
২। তারপর নিজের পরিবারকে দা'ওয়াত দেয়া: আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى} [طه: 132] 'আর তোমার পরিবার-পরিজনকে ছালাত আদায়ে আদেশ দাও এবং নিজেও তার উপর অবিচল থাক। আমি তোমার কাছে কোন রিযক চাই না। আমিই তোমাকে রিযক দেই আর শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য' (সূরা ত্বহা: ১৩২)।
৩। তারপর নিকটাত্মীয়কে দা'ওয়াত দেয়া: আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ (214)} ... [الشعراء: 214] 'আর তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক কর' (সূরা আশ-শু'আরা: ২১৪)।
৪। তারপর নিজ কওমের মানুষকে আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দেয়া: আল্লাহ তা'আলা বলেন: {لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَا أَتَاهُمْ مِنْ نَذِيرٍ مِنْ قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ (3)} [السجدة: 3]. 'যাতে আপনি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন, যাদের কাছে তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি। হয়তো তারা হেদায়াত লাভ করবে' (সূরা আস-সাজদা: ৩)।
৫। তারপর নিজ অঞ্চল ও তার চার পার্শ্বের লোকজনকে দা'ওয়াত দেয়া: আল্লাহ তা'আলা বলেন: {لِتُنْذِرَ أُمَّ الْقُرَى وَمَنْ حَوْلَهَا وَتُنْذِرَ يَوْمَ الْجَمْعِ لَا رَيْبَ فِيهِ فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ (7)} ... [الشورى: 7]. 'যাতে আপনি মূল জনপদ ও তার আশপাশের বাসিন্দাদেরকে সতর্ক করতে পারেন, আর যাতে 'একত্রিত হওয়ার দিন'-এর ব্যাপারে সতর্ক করতে পারেন, যাতে কোন সন্দেহ নেই, সেদিন একদল থাকবে জান্নাতে আরেক দল যাবে জ্বলন্ত আগুনে' (সূরা আশ-শুরা: ৭)।
৬। তারপর আরবের বা নিজ দেশের সবাইকে দা'ওয়াত দেয়া: আল্লাহ তা'আলা বলেন: {هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (2)} ... [الجمعة: 2] 'তিনিই নিরক্ষরদের মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যিনি তাদের কাছে তেলাওয়াত করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমাত। যদিও ইতঃপূর্বে তারা স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিল' (সূরা আল-জুমু'আ: ২)।
৭। তারপর ব্যাপকভাবে সব মানুষকে দা'ওয়াত দেয়া: আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (28)} [سبأ: 28] 'আর আমি তো কেবল তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী হিসাবে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না' (সূরা সাবা: ২৮)।
৮। তারপর পৃথিবীর সব মানুষকে দা'ওয়াত দেয়া। এমনকি জিন জাতি দাঈর কাছে আসলে তাদেরকেও দা'ওয়াত দেয়া: আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ (107)} ... [الأنبياء: 107]. 'আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসাবেই প্রেরণ করেছি' (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: {قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا (1) يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ وَلَنْ نُشْرِكَ بِرَبِّنَا أَحَدًا (2)} [الجن: 1 - 2] . 'বল, 'আমার প্রতি অহী করা হয়েছে যে, নিশ্চয় জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে শুনেছে। অতঃপর বলেছে- 'আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, (১) যা সত্যের দিকে হেদায়াত করে; ফলে আমরা তাতে ঈমান এনেছি। আর আমরা কক্ষনো আমাদের রবের সাথে কাউকে শরীক করব না' (সূরা আল-জিন: ১-২)।