📘 নবী রসূলগনের দাওয়াতী মূলনীতি 📄 ক। মানুষের প্রকারভেদ

📄 ক। মানুষের প্রকারভেদ


মানুষের প্রকারভেদ (أقسام الناس): কর্মভেদে মানুষ দু'শ্রেণীতে বিভক্ত। তাদের মধ্যে প্রথম প্রকার হচ্ছে, কাফের- যারা দুনিয়ার চেষ্টায় মৃত্যু পর্যন্ত ব্যস্ত থাকে। দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে, মুমিন- যারা মৃত্যু পর্যন্ত আখেরাতের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে। আখেরাতের চেষ্টায় নিয়োজিত মুমিনরা আবার দু'প্রকার:

প্রথম প্রকারঃ এ প্রকার মুমিন শুধুমাত্র ইবাদত নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ফলে, মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আর তাদের আমলনামাও বন্ধ হয়ে যায়।

দ্বিতীয় প্রকারঃ এ প্রকার মুমিন শুধু ইবাদত নিয়ে ব্যস্ত থাকে না; বরং তারা আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করে, দ্বীন শিক্ষা করে ও অন্যকে দ্বীন শিক্ষা দেয়, সৃষ্টির প্রতি সদয় হয়। এ শ্রেণীর মুমিন সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং মৃত্যুর পরও তাদের আমল চালু থাকে। আর প্রত্যহ তাদের আমলনামা নেকী দ্বারা পূর্ণ হতে থাকে।

১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَوُونَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (19) الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ (20) يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِنْهُ وَرِضْوَانٍ وَجَنَّاتٍ لَهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُقِيمٌ ( 21) خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ (22)} ... [التوبة: 19 – 22]
'তোমরা কি হাজীদের পানি পান করানো ও মসজিদুল হারাম আবাদ করাকে ঐ ব্যক্তির মত বিবেচনা কর, যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তারা আল্লাহর নিকট বরাবর নয়। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না। (১৯) যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করেছে, আল্লাহর কাছে তারা বড়ই মর্যাদাবান আর তারাই সফলকাম। (২০) তাদের প্রতিপালক তাদেরকে নিজের পক্ষ হতে সুসংবাদ দিচ্ছেন রহমত ও সন্তুষ্টির এবং এমন জান্নাতসমূহের, যাতে রয়েছে তাদের জন্য স্থায়ী নেয়ামত। (২১) তথায় তারা থাকবে চিরকাল। নিশ্চয় আল্লাহর নিকট রয়েছে মহা পুরস্কার' (সূরা আত-তাওবা: ১৯-২২)।

২। আবু মাস'ঊদ আনছারী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক লোক নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, আমার বাহন নষ্ট হয়ে গেছে, আপনি আমাকে একটি বাহন দিন। তিনি বললেন: আমার কাছে তো তা নেই। সে সময় এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এমন এক ব্যক্তির সন্ধান তাকে দিচ্ছি, যে তাকে বাহন দিতে পারবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: যে ব্যক্তি কোন ভাল আমলের পথ প্রদর্শন করে, তার জন্য আমলকারীর সমান ছওয়াব রয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩৯)।

৩। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি হেদায়াতের দিকে ডাকে, তার জন্য সে পথের অনুসারীদের প্রতিদানের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য ঘাটতি হবে না। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি পথভ্রষ্টতার দিকে ডাকে, তার উপর সে রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য হালকাও হবে না (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৪)।

📘 নবী রসূলগনের দাওয়াতী মূলনীতি 📄 খ। মুসলিম জাতির দায়িত্ব কর্তব্য

📄 খ। মুসলিম জাতির দায়িত্ব কর্তব্য


মুসলিম জাতির দায়িত্ব কর্তব্য (وظيفة الأمة): সমগ্র মুসলিম জাতির উপর কর্তব্য হলো, আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দেওয়া। অমুসলিমদেরকে আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দেওয়া সমস্ত মুসলিমের উপর ওয়াজিব। কেন না, আল্লাহর দিকে দা'ওয়াতের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় গিরা খুলে যায়। আর মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় গিরা হচ্ছে কুফর এবং শিরকের গিরা। আর যখনই এ গিরাটি খুলে যায়, তখনই অন্যান্য সব গিরা খুলে যায়।

বিভিন্ন মাসআলা-মাসায়েলে ফাতাওয়া দেওয়ার বিষয়টি আলেমগণের সাথে নির্দিষ্ট। যার ফাতওয়া জানা থাকবে, তিনি ফাতওয়া দিবেন। আর জানা না থাকলে প্রশ্নকারীকে এমন সব আলেমের সন্ধান দিবেন, যাদেরকে আল্লাহ অধিক জ্ঞান, তীক্ষ্ণ বুঝ-শক্তি ও মুখস্থ-শক্তি দ্বারা বিশেষিত করেছেন। এক্ষেত্রে আলেমগণ ভাল কাজের দিক-নির্দেশনাকারী হিসাবে তা পালনকারীর মতই প্রতিদান পাবেন।

ছাহাবীগণের মধ্যে সবাই ফাতওয়া দিতেন না, বরং একজন আরেকজনের কাছে ফাতওয়া ঠেলে দিতেন। তাদের মাঝে খুব কম সং্যখ্যক মুফতীই ছিলেন। মুফতীগণের মধ্যে আলী, মু'আয, যায়েদ ইবনে ছাবেত, ইবনে আব্বাস এবং ইবনে উমার অন্যতম। অতএব, সবার জন্য ফাতওয়া দেয়া বৈধ নয়, যাতে মানুষ আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে (ভুল ফাতওয়ার কারণে) অসত্য কথা বলতে না পারে। সেজন্য আলেম এবং ফক্বীহগণই ফাতওয়া দিবেন। যেমন- আল্লাহ তা'আলা বলেন: {فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (43)} ... [النحل: 43] 'যদি তোমরা না জান, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর' (সূরা আন-নাহল: ৪৩)।

তবে, দা'ওয়াতী ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই তার জ্ঞান অনুযায়ী এবং কুরআন জানা অনুপাতে দা'ওয়াত দিবে। আর কুরআন জানার সর্বনিম্ন পরিমাণ হচ্ছে, এক আয়াত। অতএব, এ উম্মতের প্রত্যেকের উপর দা'ওয়াতী কাজ, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করা ওয়াজিব। ছালাত, যাকাত ইত্যাদির বিধি-বিধান নাযিল হওয়ার পূর্ব থেকেই ছাহাবীগণ আল্লাহর দিকে দা'ওয়াতী কাজ করতেন। মহান আল্লাহ এ মুসলিম জাতিকে দা'ওয়াতের জন্য বাছাই করেছেন, যেমনভাবে তিনি তাঁর দিকে আহ্বানকারী হিসাবে নবীগণকে মনোনীত করেছিলেন। তিনি তাদেরকে মর্যাদা দিয়েছেন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দানের দায়িত্ব দিয়েছেন।

১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: { وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (104)} ... [آل عمران: 104] 'আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম' (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)।

২। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: { وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ } [التوبة: 71] 'আর মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা ছালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়' (সূরা আত-তাওবা: ৭১)।

৩। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: { كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ } [آل عمران: 110] 'তোমরা হলো সর্বোত্তম উম্মত, যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর যদি আহলে কিতাব ঈমান আনত, তবে অবশ্যই তা তাদের জন্য কল্যাণকর হত। তাদের কতক ঈমানদার। আর তাদের অধিকাংশই ফাসিক' (সূরা আলে ইমরান: ১১০)।

📘 নবী রসূলগনের দাওয়াতী মূলনীতি 📄 গ। মুসলিম নর-নারীর উপর যা আবশ্যক

📄 গ। মুসলিম নর-নারীর উপর যা আবশ্যক


মুসলিম নর-নারীর উপর যা আবশ্যক (ওয়াজিব আল মুসলিম ওয়াল মুসলিমাহ): মুসলিম নর-নারীর উপর আবশ্যক কর্তব্য দু'টিঃ

প্রথম কর্তব্য: দ্বীনের আমল করা, একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করা, যার কোন শরীক নেই, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা, আল্লাহ তা'আলা যা নির্দেশ করেছেন, তা পালন করা আর তিনি যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা।

১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا} [النساء: 36] 'তোমরা ইবাদত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না' (সূরা আন-নিসা: ৩৬)।

২। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُونَ (20)} [الأنفال: 20] 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, অথচ তোমরা শুনছ' (সূরা আল-আনফাল: ২০)।

৩। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: {وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ (7)} [الحشر: 7] 'রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর' (সূরা আল-হাশর: ৭)।

দ্বিতীয় কর্তব্য: আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দান, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা।

১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (104)} [آل عمران: 104] 'আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম' (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)।

২। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছিয়ে দাও (ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১)।

৩। আবু সা'ঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: তোমাদের কেউ গর্হিত কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগে) পরিবর্তন করে দেয়, যদি তার সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (বাক্য) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা করবে, তবে এটা ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯)।

📘 নবী রসূলগনের দাওয়াতী মূলনীতি 📄 ঘ। আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী (দাঈ)-এর অবস্থাসমূহ

📄 ঘ। আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী (দাঈ)-এর অবস্থাসমূহ


আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী (দাঈ)-এর অবস্থাসমূহ (أحوال الداعي إلى الله): আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী দা'ওয়াতী কাজ করলে তিনি দু'টি অবস্থার মুখোমুখি হনঃ

(ক) মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া। যেমনটি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বেলায় হয়েছিল, যখন মদীনাবাসীরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর আগমনে আনন্দিত হয়েছিলেন।

(খ) জনগণের সরে যাওয়া। যেমনটি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বেলায় হয়েছিল, যখন তায়েফের নেতারা প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে নির্বোধ ও শিশুদেরকে উস্কে দিয়েছিল, এমনকি তারা তাঁকে পাথর দিয়ে প্রহার করেছিল। মহান আল্লাহ তাঁর অলী-আউলিয়াকে তাঁর শত্রুদের নিকট সমর্পণ করেন না। তবে, সর্বজ্ঞাত, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা'আলা কখনো কখনো দাঈকে শিক্ষা দেন এবং কখনও কখনও তাঁর মাধ্যমে অন্যকে শিক্ষা দেন।

মানুষের ব্যাপক সাড়া দাঈর জন্য বেশি কঠিন এবং মারাত্মক। এক্ষেত্রে তার অহংকার আসতে পারে, তাকে পদমর্যাদায় ভূষিত করার প্রস্তাব দেয়া হতে পারে। ফলে, তিনি দুনিয়ার ফিতনার সম্মুখীন হতে পারেন। আর দাঈকে দ্বীনের দা'ওয়াত দেয়া থেকে বিরত রাখতে এবং দুনিয়া, ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা ও বিভিন্ন বিষয়ের মাধ্যমে দ্বীন থেকে অন্যমনস্ক রাখতে শয়তানের অপচেষ্টা মাত্র।

তবে, জনগণ দূরে সরে গেলে এবং দা'ওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তা দাঈর জন্য বেশি উত্তম এবং তার শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশি শক্তিশালী। কেন না, এর মাধ্যমে দাঈ বেশি বেশি আল্লাহমুখী হয়। এর ফলে নেমে আসে আল্লাহর সাহায্য, যেমনটি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিল; যখন তায়েফবাসী তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তখন তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে জিবরীল (আ.) ও পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেছিলেন। অতঃপর সসম্মানে তাঁর মক্কায় প্রবেশের বিষয়টি তাঁর জন্য সহজ করেছিলেন। অতঃপর ইসরা ও মি'রাজের মাধ্যমে তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন। তারপর মদীনায় হিজরতের বিষয়টিও তাঁর জন্য সহজ করেছিলেন। অবশেষে, ইসলামের বিজয় এবং যমীনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটিও সহজ করে দিয়েছিলেন।

১। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفتَنُونَ (2) وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ (3)} [العنكبوت: 2 - 3] 'মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? (২) আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে, আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যে, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী' (সূরা আল-আনকাবূত: ২-৩)।

২। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জীবনে কি উহুদ দিবসের চেয়েও অধিকতর কঠিন কোন দিন এসেছে? তিনি বললেন, তোমার সম্প্রদায়ের হাতে 'আক্বাবার' দিন যে নির্যাতনের শিকার হয়েছি, তা এর চেয়েও অধিকতর কঠিন ছিল, যখন আমি (আল্লাহর পানে দা'ওয়াত দিতে গিয়ে) ইবনু 'আব্‌দে ইয়ালীল ইবনু আব্‌দে কিলালের কাছে নিজেকে পেশ করছিলাম। কিন্তু সে আমার কাঙ্ক্ষিত ডাকে সাড়া দেয়নি। তখন আমি অত্যন্ত বিষণ্ণ অবস্থায় সম্মুখের দিকে চলতে লাগলাম এবং কারনুছ-ছা'আলিব নামক স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত আমি সংজ্ঞা ফিরে পাইনি। তারপর যখন আমি মাথা উঠালাম, তখন দেখলাম, একখণ্ড মেঘ আমাকে ছায়া দিয়ে রেখেছে এবং এর মধ্যে জিবরীল (আ.) কে দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেন, মহা মহিমান্বিত আল্লাহ আপনার ব্যাপারে আপনার সম্প্রদায়ের উক্তি এবং আপনার বিরুদ্ধে তাদের উত্তরও শুনেছেন এবং তিনি আপনার নিকট পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন, যেন আপনি আপনার সম্প্রদায়ের লোকজনের ব্যাপারে যেরূপ ইচ্ছা সেরূপ আদেশ করেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতাও আমাকে ডাক দিলেন এবং আমাকে সালাম দিলেন। তারপর বললেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রতি আপনার সম্প্রদায়ের লোকজনের উক্তি আল্লাহ তা'আলা শুনেছেন। আমি পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা, আপনার রব আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন, যেন আপনি আপনার ইচ্ছামত আমাকে নির্দেশ দেন। আপনি কি করতে চান? (আপনি বললে) আমি এ পাহাড় দু'টিকে তাদের উপর চাপা দিয়ে দিব। তখন রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: আমি বরং আশা করছি যে, আল্লাহ তা'আলা হয়তো এদের ঔরস থেকেই এমন ব্যক্তি বের করে আনবেন, যারা তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক না করে এক আল্লাহর ইবাদত করবে (ছহীহ বুখারী, হা/৩২৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৯৫)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px