📄 যুদ্ধের মাঠে নবীজীর সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করা মিকদাদ ﷺ এর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা
আমরা আরো এক নবী প্রেমিককে প্রত্যক্ষ করছি যে যুদ্ধের মাঠে নবীজীর পাশে থেকে যুদ্ধ করে শহীদ জন্য প্রস্তুত, ইমাম বুখারী এ ঘটনাটি নিজ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন:
অর্থ, তিনি বলেন, আমি তাঁর কর্ম-কাণ্ড দেখেছি, যা দুনিয়ার সকল বস্তুর চেয়ে (-) আমার নিকট প্রিয়। তিনি নবীজীর নিকট ঐ সময় উপস্থিত ছিলেন যে সময় তিনি মুশরেকদের জন্য বদ দুয়া করছিলেন, (সে সময়) তিনি বলে ছিলেন আমরা আপনাকে ঐ কথা বলব না যে কথা মুসা ✉️ এর কওম তাঁকে বলে ছিল (তুমি ও তোমার রব যুদ্ধ কর আমরা এখানে বসে থাকি) আমরা আপনার ডানে-বামে, অগ্রে-পশ্চাতে সকল দিক থেকে যুদ্ধ করব। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি দেখেছি ঐ কথায় নবীজীর চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে যায়। (বুখারী) (-)
এই বর্ণনায় মিকদাদ ؓ এর জীবন কুরবানী করার ইচ্ছা প্রকাশের সাথে সাথে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদেরও নবীজীর জন্য জীবন কুরবান করার ইচ্ছা প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর এ ইচ্ছা এই বাক্যে প্রকাশিত হচ্ছেঃ “আমি মিকদাদ ؓ এর ভূমিকা দেখেছি, যদি আমি তাঁর কর্তা হতাম।
তাহলে তা আমার নিকট দুনিয়ার সমস্ত বস্তুর চেয়ে প্রিয় হত।”
হাফেয ইবনে হাজর এই উক্তির ব্যাখ্যায় বলেন, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে মিকদাদের মত কৃতিত্ব ও দুনিয়ার সকল জিনিস গ্রহণ করার এখতিয়ার দেয়া হলে, এ দুটির মধ্যে মিকদাদের কৃতিত্বকে অগ্রাধিকার দিতেন। (১)
টিকাঃ
৬৬ ফাতহুলবারী ২৬৭/৭।
৬৭ সাইরু কুরআন কিতাবুল মাগাযী, পাদ, (إذ تستعينون ربكم ..... شديد العقاب) এর তাফসীর। হাদীস সংখ্যা ২৬৭/৭, ৩৩৯২।
68 ফাতহুল বারী ২৮-৭/৯১
📄 নবীর জন্য এগারো জন আনসারী ও তালহা ﷺ এর জান কুরবান
উহুদের যুদ্ধে কোন এক ঘাঁটিতে রাসূল এর পক্ষ থেকে তের জন তীর নিক্ষেপে পারদর্শী সাহাবাকে নির্ধারণ করা হয়, তারা ঐ ঘাঁটি ছেড়ে দিয়ে ভুল করে, যার সুবাদে মক্কার মুশরেকদের কিছু যোদ্ধা খালেদ বিন ওয়ালীদের পরিচালনায় পিছন দিক থেকে মুসলিমদের উপর হামলা চালায়। ঐ অতর্কিত হামলায় মুসলিমদের এমন দুরবস্থার
সৃষ্টি হয় যে, রাসুল ﷺ এর সঙ্গে কেবল এক জায়গায় ১২ বারজন সাহাবা রয়ে যান এবং মুশরিকরা রাসূল ﷺ এর নিকট পৌঁছে যায়, এমতাবস্থায় প্রকৃত নবী প্রেমী ১২ জন জীবন কুরবানকারী সাহাবা কি ভাবে প্রতিরোধ করেন তা দেখার বিষয়?
ইমাম নাসায়ীর জাবের এর পরম্পরায় বর্ণিত হাদীসে এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে: যাতে তিনি বলেন, উহুদের যুদ্ধে মুসলিমগণ যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে যান এবং রাসূল ﷺ এর সঙ্গে কেবল ১২জন সাহাবা তাদের মধ্যে তালহা বিন উবাইদুল্লাহ থাকেন তখন মুশরিকরা রাসূল ﷺ এর নিকটে এসে যায়। অত:পর চোখ উঠিয়ে বলেন, মুশরিকদের মুকাবিলা করবে কে? তালহা বল্লেন, আমি, তিনি বলেন, তুমি নিজ স্থানে থাক, এরপর আনসারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বলল, আমি, তিনি বলেন, তুমি? (ঠিক আছে মুশরিকদের মুকাবিলা কর) সে ব্যক্তি মুশরিকদের সাথে লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে যান। রাসূল ﷺ দেখেন যে, মুশরিকরা নিজদের স্থানে দৃঢ় রয়েছে, সেই জন্য পুনরায় বল্লেন, মুশরিকদের সাথে কে মুকাবিলা করবে? তালহা বলেন, আমি, তিনি বলেন, তুমি নিজ স্থানে থাক। অত:পর আনসারদের জনৈক ব্যক্তি বলেন, আমি তিনি বলেন, তুমি? (ঠিক আছে মুকাবেলা কর) সে ব্যক্তি লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে যান। এভাবে রাসূল বলতে থাকেন আর আনসারগোষ্ঠীর মধ্য থেকে এক এক করে আসেন আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়েন ও শহীদ হতে থাকেন, শেষ পর্যন্ত রাসূল এবং তালহা অবশিষ্ট থাকেন। রাসূল পুনরায় বললেন, মুশরিকদের সাথে কে মুকাবিলা করবে? তালহা বলেন, আমি। তিনিও এগারোজন আনসারের মত যুদ্ধ করলেন। যুদ্ধের সময় তাঁর হাতে আঘাত লাগে ও আঙুল কেটে যায়, তখন তিনি বলেন, (হিস)। রাসূল বলেন, তুমি যদি (হিসের পরিবর্তে) বিসমিল্লাহ বলতে তাহলে ফেরেস্তারা লোকের মাঝখান থেকে তোমাকে উঠিয়ে নিতেন। অবশেষে আল্লাহ মুশরিকদের ফিরিয়ে দেন। (সহীহ, নাসায়ী) ()
আল্লাহু আকবার! রাসূলের প্রকৃত প্রেমে এগারোটি জীবন কুরবানী হয়, তারপর বারো নম্বর জীবনও এগিয়ে আসে ও কুরবান হয়ে যায়, এটি সহজ ব্যাপার ছিল না বরং তাঁর (তালহা) একাকী লড়াই এবং শাহাদাত বরণ, এগারো জন আনসারের সমতুল্য ছিল। তাঁর হাত রাসূলের প্রতিরক্ষার জন্য শত্রুর অস্ত্রের আঘাতে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। (°) ইমাম বুখারী কায়েস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি তালহা এর ঐ হাত দেখেছি যা রাসূল এর প্রতিরক্ষার জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। (বুখারী)। রাসূলের প্রতিরক্ষার জন্য কেবল তাঁর হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছিল তাই নয় বরং তাঁর সমস্ত শরীর ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল, তাঁর শরীরে কম-বেশী সত্তুর জায়গায় আঘাত লেগেছিল। ইমাম আবু দাউদ তায়ালিসী আবু বকর এর পরম্পরায় বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা তাঁর কাছে যাই, গিয়ে দেখি তাঁর লাশটি একটিখালে পড়ে আছে।(-) শরীরে ছিল কম-বেশী তীর- তলোয়ারের সত্তরটি আঘাতের(৯) দাগ। (মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসী)। আবু বকর যখনই উহুদের যুদ্ধের কথা বলতেন তখনি কেঁদে ফেলতেন ও বলতেন, ঐ যুদ্ধের দিনটি তালহা এর ছিল,(-) সে দিন তিনি রাসূল ﷺ এর জন্য লড়ে অনেক নেকীর অধিকারী হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তালহা, আবু বকর, নবী ﷺ এবং তাঁর সকল প্রকৃত প্রেমীদের উপর সন্তুষ্ট হোন।
টিকাঃ
৬৯ সহীহ সুনানে নাসায়ী, কিতাবুল জিহাদ, পাঠ, শত্রু আঘাত করলে কি বলবে, হাদীস সংখ্যা ৬৬১/২,২৯৫১। শায়েখ আল-বানী বলেন,( قطعت أصابعه ) এইশব্দ পর্যন্ত হাসান, এর পূর্বে অংশ হাসানের মতাবানা আছে, হাদীসটি মুসলিমের শর্ত মুতাবেক। হাফেজ আয্যাহাবী এ হাদীস সম্পর্কে বলেন, এর কর্মকালীন নির্দোষণা (সিয়ারে আ'লামিন নুবালা ২/৭)।
71 সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকীব, বাবু (১) আয়াত হাদীস সংখ্যা ৩৫/৭/৪৮০৮০
72 (নেহায়া ফী-গারীবিল হাদীস অল-আসার, ধাতু "জাফারা” ২৭৮/১)
73 মিনহাতুল মা, বুদ ফী তারতীবি মুসনাদিততায়ালিসী আবী দাউদ, কিতাবুসসিরাতি নববীয়াহ, পাঠ, উহুদের যুদ্ধের ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে, হাদীস সংখ্যা ৯৯/২, ২৩৪৬। এবং দেখুন ফাতহুালবারী ৮৩-৮২/৭।
74 দেখুন মিনহাতুল মা, বুদ ৯৯/২।
📄 আবু তালহার বুক রাসূলের বুকের জন্য ঢাল
উহুদের যুদ্ধে রাসূল এর প্রকৃত প্রেমিককে দেখেছি যিনি নিজ বক্ষকে রাসূলের বক্ষের সামনে ঢালের ন্যায় রেখেছেন, যাতে শত্রু পক্ষের তীর তাকে লাগে এবং রাসূল শরীরে যেন কোন রূপ আঘাত না লাগে। ইমাম বুখারী ও মুসলিম আনাস বিন মালেক থেকে বর্ণনা করেন, উহুদের যুদ্ধে যখন কতিপয় মানুষ নবীজীকে ছেড়ে পিছনে চলে যায় তখন হাতে ঢাল নিয়ে নিজেই তাঁর সামনে ঢাল স্বরূপ দাঁড়িয়ে যান)। আনাস আরো বলেন, আবু তালহা বিখ্যাত তীরন্দাজ (তির নিক্ষেপকারী) ছিলেন। সে দিন তিনি দুটি অথবা তিনটি কামান ধবংস করেন। আনাস আরো বলেন, কেউ (রাসূলের সামনে) তীর নিয়ে পেরিয়ে গেলে তিনি তাকে বলছিলেন, তুমি তোমার তীর আবু তালহাকে দিয়ে দাও। তিনি আরো বলেন যে, নবী যখন মুশরিকদের দেখার জন্য নিজ মাথা তুলছিলেন তখন আবু তালহা বলছিলেন, হে আল্লার রাসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবাণ হোক, আপনি মাথা উঠাবেন না, এমন না হয় যে মুশরিকদের তীর আপনাকে আঘাত করে। আমার বুক আপনার বুকের জন্য ঢাল। (বুখারী) () আল্লাহু আকবার! রাসূলের প্রকৃত প্রেমিকগণ কি করতে পারেন এবং তারা কিসের ভরসা করেন। আল্লামা আইনী, আবু তালহা এর উক্তি (نحري دون نحرك) “আমার বুক আপনার বুকের আড়ালে” এর ব্যাখ্যায় বলেন, আমি আপনার সামনে দাঁড়াব তীর যখন আসবে তখন আপনার বুকে না লেগে আমার বুকে লাগবে। (-) শায়েখ মুহাম্মাদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী, উক্ত বাক্যের ভাব প্রকাশে বলেন, এটি প্রার্থনাগত বাক্য, অর্থাৎ আল্লাহ আমার বুককে তীরের কাছা-কাছি করেন যাতে তা আমার বুকে লাগে এবং আপনার বুকে না লাগে। (-)
টিকাঃ
75 (مجوف عليه بججفة( তিনি (আবু তালাহাহ রাসূলের সামনে ঢাল স্বরূপ দাঁড়িয়ে যান। (শারহে নওয়াবী ১৮৯/১২) আল-হাজফাহ: অর্থাৎ চামড়ার ঢাল। (উমদাতুলকারী ২৭৩/১৬)
76 ফাতহুলবারী ৩৬২/৭।
77 ঐ।
78 ঐ।
" বুখারী-মুসলিম, সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, পাঠ, (إذهمت طائفتان منكم أن تفشل) হাদীস সংখ্যা ৩৬১/৭,৪৬৪। সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ অয়াসায়ের, পাঠ মহিলাদের পুরুষের সঙ্গে থেকে জিহাদ, হাদীস সংখ্যা ১৪৪৩/৩, ১৮১১, শব্দ মুসলিমের।
৪০ (ওমদাতুলকারী ১৬/২৭৪)
(হামেশ সহীহ মুসলিম ১৪৪৩/৩)
📄 আবুদাজানা রাসূলের জন্য ঢাল
ইমাম ইবনে ইসহাক রাসূলের অন্য এক প্রকৃত প্রেমিকের কথা তার ভাষায় এ ভাবে বর্ণনা করেন, "আবু দুজানা রাসূলের জন্য নিজকে ঢাল বানান, তিনি ঝুকে থাকেন এবং তীর তার পৃষ্ঠে বিঁধতে থাকে, এমন কি তাঁর পিঠে অসংখ্য তীর বিদ্ধ হয়। (-) অন্য বর্ণনায় রয়েছে, এ অবস্থায় তিনি নড়চড়ও করেননি। (-) আল্লাহু আকবার! কোন্ বস্তু আবু দুজানাকে রাসূলের জন্য ঢাল হওয়া, ঝুকা এবং পিঠে তীর বিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও নিরবে ধৈর্য ধারণ করতে উৎসাহিত করল? নিশ্চয় সেটি রাসূলের জন্য নির্মল ভালবাসা। (আসিরাতুন নাববীয়হ, ইবনে হিশাম৩/৩০, তারিখুল ইসলাম, যাহাবী ১৭৪-১৭৫)
টিকাঃ
*2 আসসিরাতুন নাববীয়াহ, ইবনে হিশাম, ৩০/৩, এবং দেখুন আসসিরাতুন নাববীয়াহ, ইবনে হিব্বান আল-বাসতী পৃ: ২২৪, তারীখে ইসলাম (আমাগযী), আযযাহাবী, পৃঃ ১৭৫-১৭৪।
83 জাওয়ামিউস্ সিরাহ, ইবনে হাযম পৃ: ১৬২, এবং দেখুন যাদুল মাআদ, ১৯৭/৩।