📄 নবী প্রীতির দ্বিতীয় নিদর্শন নবীর জন্য জীবন ও সম্পদ কুরবানীর জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি
প্রকৃত প্রেমিকের অন্তর তার প্রিয় ব্যক্তির জন্য নিজ জান-মাল কুরবান করার জন্য অস্থির হয়ে যায়। প্রকৃত নবী প্রেমীদের অবস্থা এ থেকে আলাদা নয়। সাহাবাগণ তাঁর জন্য সব কিছু উৎসর্গ করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। নবীজীর গত হওয়ার পর তাঁর সত্য অনুরাগীরা নিজেদের অন্তরে এই বলে পরিতাপ করে যে, তারা তাঁর জন্য নিজেদের জান-মাল উৎসর্গ করার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে।
নবীজীর প্রকৃত ভালবাসার দাবীদার সাহাবাগণের কিছু ঘটনা নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে:
📄 রাসূল ﷺ এর নিরাপত্তাহীনতা ও বিপদের আশংকায় আবু বাকর ﷺ এর কান্না
হিজরতের সময় সুরাকা বিন মালেক রাসূল ﷺ ও আবু বকর রাঃ এর পিছনে ধাওয়া করতে করতে একেবারে নিকটে এসে যায়, রাসূল ﷺ এর নিরাপত্তা বিপর্যস্ত দেখে আবু বকর রাঃ অস্থির এবং বিচলিত হয়ে যান, তাঁর চোখে পানি বের হয়। ইমাম আহমাদ এই ঘটনা বারা, ইবনে আযেবের পরম্পরায় বর্ণনা করেন:
عن البراء بن عازب رضى الله عنه قال قال أبو بكر رضى الله عنه "فارتحلنا والقوم يطلبونا، فلم يدركنا إلا سراقة بن مالك بن جعشم على فرس له فقلت : يارسول الله هذا الطلب قد لحقنا، فقال: لا تحزن إن الله معنا، حتى إذا دنا منا فكان بيننا وبينه قدر رمح أو رمحين أو ثلاثة، قال قلت: يا رسول الله! هذا الطلب قد لحقنا وبكيت قال لم تبكي قلت أما والله ما على نفسي أبكي، ولكن أبكى عليك قال: فدعا عليه رسول الله صلى الله عليه وسلم، فقال: اللهم اكفناه بما
شنت ، فسَاخَتُ(" (قائم فرسه إلى بطنها إلى أرض صلد ،،،)
(حديث (أحــــــ
অর্থ,বারা,ইবনে আযেব কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন,আবু বকর বলেন,আমরা যাত্রা শুরু করি, মানুষ আমাদের ব্যাপারে তল্লাসি আরম্ভ করে, তার মধ্যে সুরাকা বিন মালিক নিজ ঘোড়ার পিঠে চড়ে আমাদের কাছে এসে যায়,আমি তখন বলি হে আল্লাহর রাসুল এই (সুরাকা) আমাদের অতি নিকটে এসে গিয়েছে, রাসুল বললেন, চিন্তা কর না নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। সে আমাদের এত কাছে এসে ছিল যে, কেবল এক ফলা অথবা দু ফলা অথবা তিন ফলার লাঠির পরিমাণ দূরত্ব বাকী ছিল। আবু বকর বলেন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল এ তো আমাদের কাছে পৌঁছে গিয়েছে বলে আমি, কান্না করতে আরম্ভ করি, রাসুল বললেন, তুমি কান্না করছ কেন? আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি আমার জীবনের ভয়ে কান্না করিনি বরং আপনার জীবন নাশের আশঙ্কায় রোদন করছি। আবু বকর বলেন, তিনি তার জন্য বদদোয়া করে বলেন, হে আল্লাহ! আপনি যেভাবে চান তাকে প্রতিহত করতে যথেষ্ট। অতঃপর তার ঘোড়ার পা শুকনো মাটিতে পেট পর্যন্ত ধসে যায়। (আহমদ) (~)
টিকাঃ
“সাল-লাত” মাটিতে পা ধ্বসে গেল।( আউনুলহাইয়াহ কী শারীখিল হাদীস অল আসার, ধাতু “মু” ৪১৮/২
আল-মুসনাদ হাদীস সংখ্যা ১৫৫/১০ শায়েখ আহমাদ মুহাম্মাদ শাকের ও হামিদার সানাদে সহীহ বলেছেন। (দেখুন ফাতহুল মুসনাল ১৪/১)
📄 যুদ্ধের মাঠে নবীজীর সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করা মিকদাদ ﷺ এর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা
আমরা আরো এক নবী প্রেমিককে প্রত্যক্ষ করছি যে যুদ্ধের মাঠে নবীজীর পাশে থেকে যুদ্ধ করে শহীদ জন্য প্রস্তুত, ইমাম বুখারী এ ঘটনাটি নিজ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন:
অর্থ, তিনি বলেন, আমি তাঁর কর্ম-কাণ্ড দেখেছি, যা দুনিয়ার সকল বস্তুর চেয়ে (-) আমার নিকট প্রিয়। তিনি নবীজীর নিকট ঐ সময় উপস্থিত ছিলেন যে সময় তিনি মুশরেকদের জন্য বদ দুয়া করছিলেন, (সে সময়) তিনি বলে ছিলেন আমরা আপনাকে ঐ কথা বলব না যে কথা মুসা ✉️ এর কওম তাঁকে বলে ছিল (তুমি ও তোমার রব যুদ্ধ কর আমরা এখানে বসে থাকি) আমরা আপনার ডানে-বামে, অগ্রে-পশ্চাতে সকল দিক থেকে যুদ্ধ করব। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি দেখেছি ঐ কথায় নবীজীর চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে যায়। (বুখারী) (-)
এই বর্ণনায় মিকদাদ ؓ এর জীবন কুরবানী করার ইচ্ছা প্রকাশের সাথে সাথে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদেরও নবীজীর জন্য জীবন কুরবান করার ইচ্ছা প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর এ ইচ্ছা এই বাক্যে প্রকাশিত হচ্ছেঃ “আমি মিকদাদ ؓ এর ভূমিকা দেখেছি, যদি আমি তাঁর কর্তা হতাম।
তাহলে তা আমার নিকট দুনিয়ার সমস্ত বস্তুর চেয়ে প্রিয় হত।”
হাফেয ইবনে হাজর এই উক্তির ব্যাখ্যায় বলেন, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে মিকদাদের মত কৃতিত্ব ও দুনিয়ার সকল জিনিস গ্রহণ করার এখতিয়ার দেয়া হলে, এ দুটির মধ্যে মিকদাদের কৃতিত্বকে অগ্রাধিকার দিতেন। (১)
টিকাঃ
৬৬ ফাতহুলবারী ২৬৭/৭।
৬৭ সাইরু কুরআন কিতাবুল মাগাযী, পাদ, (إذ تستعينون ربكم ..... شديد العقاب) এর তাফসীর। হাদীস সংখ্যা ২৬৭/৭, ৩৩৯২।
68 ফাতহুল বারী ২৮-৭/৯১
📄 নবীর জন্য এগারো জন আনসারী ও তালহা ﷺ এর জান কুরবান
উহুদের যুদ্ধে কোন এক ঘাঁটিতে রাসূল এর পক্ষ থেকে তের জন তীর নিক্ষেপে পারদর্শী সাহাবাকে নির্ধারণ করা হয়, তারা ঐ ঘাঁটি ছেড়ে দিয়ে ভুল করে, যার সুবাদে মক্কার মুশরেকদের কিছু যোদ্ধা খালেদ বিন ওয়ালীদের পরিচালনায় পিছন দিক থেকে মুসলিমদের উপর হামলা চালায়। ঐ অতর্কিত হামলায় মুসলিমদের এমন দুরবস্থার
সৃষ্টি হয় যে, রাসুল ﷺ এর সঙ্গে কেবল এক জায়গায় ১২ বারজন সাহাবা রয়ে যান এবং মুশরিকরা রাসূল ﷺ এর নিকট পৌঁছে যায়, এমতাবস্থায় প্রকৃত নবী প্রেমী ১২ জন জীবন কুরবানকারী সাহাবা কি ভাবে প্রতিরোধ করেন তা দেখার বিষয়?
ইমাম নাসায়ীর জাবের এর পরম্পরায় বর্ণিত হাদীসে এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে: যাতে তিনি বলেন, উহুদের যুদ্ধে মুসলিমগণ যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে যান এবং রাসূল ﷺ এর সঙ্গে কেবল ১২জন সাহাবা তাদের মধ্যে তালহা বিন উবাইদুল্লাহ থাকেন তখন মুশরিকরা রাসূল ﷺ এর নিকটে এসে যায়। অত:পর চোখ উঠিয়ে বলেন, মুশরিকদের মুকাবিলা করবে কে? তালহা বল্লেন, আমি, তিনি বলেন, তুমি নিজ স্থানে থাক, এরপর আনসারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বলল, আমি, তিনি বলেন, তুমি? (ঠিক আছে মুশরিকদের মুকাবিলা কর) সে ব্যক্তি মুশরিকদের সাথে লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে যান। রাসূল ﷺ দেখেন যে, মুশরিকরা নিজদের স্থানে দৃঢ় রয়েছে, সেই জন্য পুনরায় বল্লেন, মুশরিকদের সাথে কে মুকাবিলা করবে? তালহা বলেন, আমি, তিনি বলেন, তুমি নিজ স্থানে থাক। অত:পর আনসারদের জনৈক ব্যক্তি বলেন, আমি তিনি বলেন, তুমি? (ঠিক আছে মুকাবেলা কর) সে ব্যক্তি লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে যান। এভাবে রাসূল বলতে থাকেন আর আনসারগোষ্ঠীর মধ্য থেকে এক এক করে আসেন আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়েন ও শহীদ হতে থাকেন, শেষ পর্যন্ত রাসূল এবং তালহা অবশিষ্ট থাকেন। রাসূল পুনরায় বললেন, মুশরিকদের সাথে কে মুকাবিলা করবে? তালহা বলেন, আমি। তিনিও এগারোজন আনসারের মত যুদ্ধ করলেন। যুদ্ধের সময় তাঁর হাতে আঘাত লাগে ও আঙুল কেটে যায়, তখন তিনি বলেন, (হিস)। রাসূল বলেন, তুমি যদি (হিসের পরিবর্তে) বিসমিল্লাহ বলতে তাহলে ফেরেস্তারা লোকের মাঝখান থেকে তোমাকে উঠিয়ে নিতেন। অবশেষে আল্লাহ মুশরিকদের ফিরিয়ে দেন। (সহীহ, নাসায়ী) ()
আল্লাহু আকবার! রাসূলের প্রকৃত প্রেমে এগারোটি জীবন কুরবানী হয়, তারপর বারো নম্বর জীবনও এগিয়ে আসে ও কুরবান হয়ে যায়, এটি সহজ ব্যাপার ছিল না বরং তাঁর (তালহা) একাকী লড়াই এবং শাহাদাত বরণ, এগারো জন আনসারের সমতুল্য ছিল। তাঁর হাত রাসূলের প্রতিরক্ষার জন্য শত্রুর অস্ত্রের আঘাতে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। (°) ইমাম বুখারী কায়েস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি তালহা এর ঐ হাত দেখেছি যা রাসূল এর প্রতিরক্ষার জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। (বুখারী)। রাসূলের প্রতিরক্ষার জন্য কেবল তাঁর হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছিল তাই নয় বরং তাঁর সমস্ত শরীর ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল, তাঁর শরীরে কম-বেশী সত্তুর জায়গায় আঘাত লেগেছিল। ইমাম আবু দাউদ তায়ালিসী আবু বকর এর পরম্পরায় বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা তাঁর কাছে যাই, গিয়ে দেখি তাঁর লাশটি একটিখালে পড়ে আছে।(-) শরীরে ছিল কম-বেশী তীর- তলোয়ারের সত্তরটি আঘাতের(৯) দাগ। (মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসী)। আবু বকর যখনই উহুদের যুদ্ধের কথা বলতেন তখনি কেঁদে ফেলতেন ও বলতেন, ঐ যুদ্ধের দিনটি তালহা এর ছিল,(-) সে দিন তিনি রাসূল ﷺ এর জন্য লড়ে অনেক নেকীর অধিকারী হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তালহা, আবু বকর, নবী ﷺ এবং তাঁর সকল প্রকৃত প্রেমীদের উপর সন্তুষ্ট হোন।
টিকাঃ
৬৯ সহীহ সুনানে নাসায়ী, কিতাবুল জিহাদ, পাঠ, শত্রু আঘাত করলে কি বলবে, হাদীস সংখ্যা ৬৬১/২,২৯৫১। শায়েখ আল-বানী বলেন,( قطعت أصابعه ) এইশব্দ পর্যন্ত হাসান, এর পূর্বে অংশ হাসানের মতাবানা আছে, হাদীসটি মুসলিমের শর্ত মুতাবেক। হাফেজ আয্যাহাবী এ হাদীস সম্পর্কে বলেন, এর কর্মকালীন নির্দোষণা (সিয়ারে আ'লামিন নুবালা ২/৭)।
71 সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকীব, বাবু (১) আয়াত হাদীস সংখ্যা ৩৫/৭/৪৮০৮০
72 (নেহায়া ফী-গারীবিল হাদীস অল-আসার, ধাতু "জাফারা” ২৭৮/১)
73 মিনহাতুল মা, বুদ ফী তারতীবি মুসনাদিততায়ালিসী আবী দাউদ, কিতাবুসসিরাতি নববীয়াহ, পাঠ, উহুদের যুদ্ধের ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে, হাদীস সংখ্যা ৯৯/২, ২৩৪৬। এবং দেখুন ফাতহুালবারী ৮৩-৮২/৭।
74 দেখুন মিনহাতুল মা, বুদ ৯৯/২।