📘 নবী সাঃ প্রীতি ও তার নিদর্শন সমূহ > 📄 নবী প্রেমী আখেরাতে নবীর সঙ্গী

📄 নবী প্রেমী আখেরাতে নবীর সঙ্গী


যে ব্যক্তি দুনিয়ায় ঈমানের অবস্থায় রাসূলের সাথে ভালবাসা রাখবে সে আখেরাতে তাঁর সঙ্গী হবে। নিম্ন লিখিত হাদীস এর স্পষ্ট দলীল।

عن أنس رضي الله عنه قال: جاء رجل إلى النبي صلى الله عليه وسلم فقال: يا رسول الله متى الساعة؟ قال: وما أعددت للساعة؟ قال: حب الله ورسوله قال: فإنك مع من أحببت، قال: انس رضى الله عنه فما فرحنا بعد الإسلام فرحا أشد من قول النبي صلى الله عليه وسلم ،" فإنك مع من أحببت" قال: أنس رضى الله عنه فأنا أحب الله ورسوله وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا ، فَارْجُو اَنْ اَكُوْنَ مَعَهُمْ ۠ وَلَنْ لَمْ اَعْمَلُ بِاَعْمَلِهِمْ (مَسْلِم)
অর্থ, আনাস বিন মালেক রাঃ কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাঃ এর নিকটে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন কিয়ামতের জন্য কি প্রস্তুত করেছ? সে বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালবাসা। তিনি বললেন, নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাস তার সঙ্গী হবে। আনাস রাঃ বললেন, রাসূলের উক্তি “فَإِنَّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ” (নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাস তার সঙ্গী হবে) শ্রবণে আমরা এমন আনন্দিত হয়েছি যে ইসলাম গ্রহণের পর এত আনন্দিত আর কখনো হয়নি। তিনি (আনাস রাঃ) আরো বলেন, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল, আবু বকর এবং উমর (রাঃ)-কে ভালবাসি। আমার আশা (কিয়ামতের দিন) তাদের সঙ্গী হব যদিও আমার আমল তাদের সমতুল্য নয়।(~) (মুসলিম)। একই অর্থে আর একটি হাদীস:

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ ، كَيْفَ تَقُولُ فِي رَجُلٍ أَحَبَّ قَوْمًا وَلَمْ يَلْحَقُ بِهِمْ، فَقَالَ: رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اَلْمَرْءُ مَعَ مَنْ اَحَبَّ অর্থ: আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে কি বলেন, যে ব্যক্তি কোন কাওমের সাথে ভালবাসা রাখে কিন্তু সে তাদের সঙ্গে মিলিত হতে পারেনি, (অর্থাৎ তাদের সমতুল্য আমল করতে পারেনি) প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, মানুষ যে যাকে ভালবাসে (কিয়ামতের দিন) সে তার সঙ্গী হবে। (~) (বুখারী-মুসলিম)। নবীজীর উক্তিঃ “মানুষ যে যাকে ভালবাসে সে তার সঙ্গী হবে” এর অর্থ হল, যে ব্যক্তির যার সঙ্গে ভালবাসা আছে সে তার সঙ্গে জান্নাতে অবস্থান করবে।(০) আল্লাহু আকবার! নবীর প্রতি ভালবাসার ফল কত বৃহৎ এবং মর্যাদা সম্পন্ন। হে আল্লাহ তুমি নিজ দয়ায় নবী প্রীতির ফলদানে ভাগ্যবান কর। কবুল কর হে চিরঞ্জীব চির প্রতিষ্ঠিত।

টিকাঃ
দেখুন শারহে নওয়াবী, ২/১৩ এবং ফাতহুল বারী/১১৬।

13. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বিররে ওয়াসসিলাতি ওয়াল আদাবি, হাদীস সংখ্যা: ২০০০/৪, ২৬০২, অনুরূপ ইমাম বুখারীও বর্ণনা করেছেন, দেখুন সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদাব, পায়ে আলে “আল্লাকা” হাদীস সংখ্যা ৫৫০/১০, ৬১৬৭।

14. বুখারী মুসলিম, সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদাব, পায়ে আল্লাহার ওয়ালেদ তালগাসার নিরন, হাদীস সংখ্যা: ৫৪৭/১০, ৬১৫১, সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বিররে ওয়াসসিলাতি ওয়াল আদাবি, পায়ে, মানুষ যে যাকে ভালবাসে সে তার সঙ্গী হবে, হাদীস সংখ্যা ২০০৪/৪, ২৬৪০, শব্দ বুখারীর।

15. দেখুন উমদাতুলকারী ১৯৭/২২

📘 নবী সাঃ প্রীতি ও তার নিদর্শন সমূহ > 📄 নবী প্রীতির নিদর্শন

📄 নবী প্রীতির নিদর্শন


তৃতীয় অধ্যায়
নবী প্রীতির নিদর্শন
আলেমগণ কুরআন-হাদীসের আলোকে নবী প্রেমের কতিপয় নিদর্শন বর্ণনা করেছেন। যেমন কাযী ইয়ায বলেন, নবীর সুন্নতের সাহায্য, সহযোগিতা, তাঁর উপর নাযেলকৃত শরীয়তের সংরক্ষণ, তিনি বেঁচে থাকলে তাঁর জন্য জান-মাল কুরবাণী দেয়ার আশা পোষণ করা তাঁর প্রীতির নিদর্শন।(শারহে নওয়াবী ২/১৬)
এ বিষয়ে হাফেয ইবনে হাজর বলেন, নবী প্রেমের নিদর্শন এটি একটি যে, যদি নবীজীর যিয়ারত সম্ভব হয় এবং কোন ব্যক্তিকে এই এখতিয়ার দেয়া হয় যে দুনিয়ার সম্পদ বা ভোগসামগ্রী হারাতে চাও না নবীজীর যিয়ারত হারাতে চাও? এ দুটির মধ্যে একটিকে অগ্রাধিকার দাও? দুনিয়াবী সম্পদ হারানোর চেয়ে যদি রাসূলের যিয়ারত হারানো তার জন্য ভারী বা কষ্টদায়ক হয় তাহলে জানতে হবে এটি রাসূলের প্রতি ভালবাসার নিদর্শন। কেউ যদি এ সুযোগ হারায় বা বঞ্চিত হয় তাহলে সে রাসূলের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হবে। নবী প্রীতি কেবল তাঁর যিয়ারতের উপর সীমিত নয়, বরং তাঁর সুন্নতের সহযোগিতা, সমর্থন, তাঁর উপর নাযেলকৃত শরীয়তের প্রতিরক্ষা, তাঁর শত্রুদের মূলোৎপাটন করা এবং সৎ কর্মের আদেশ, অসৎ কর্মের নিষেধও তাঁর প্রীতির নিদর্শন। (-) (ফাতহুল বারী ১/৫৯)

আল্লামা আইনী এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেন, এ কথা ভাল করে জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, রাসূলের আনুগত্য করা এবং অবাধ্য না হওয়া তাঁর ভালোবাসার মূল চাহিদা। এটি ইসলামের অপরিহার্য কর্তব্য। (*)

উল্লেখিত আলোচনার ভিত্তিতে নিম্ন লিখিত নবী প্রীতির নিদর্শন গ্রহণ করতে পারি:
*- নবীজীর সাক্ষাৎএবং তাঁর সাহচর্য গ্রহণের প্রবল আশা।
*- তাঁর জন্যে নিজ জান-মাল কুরবাণী দেয়ার উদ্দেশ্যে সর্বদা পূর্ণ প্রস্তুতি।
*- তাঁর আদেশ এবং নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন।
*- তাঁর সুন্নতের সহযোগিতা, সমর্থন এবং তাঁর উপর নাযেলকৃত শরীয়তের প্রতিরক্ষা।
এ সমস্ত নিদর্শন যার মধ্যে পাওয়া যাবে সে যেন আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করে যে, সে নিজ অন্তরে রাসুলের ভালবাসাকে স্থান দিয়েছে, তার সাথে যেন এ দুয়াও করে যেন এই অবদান স্থায়ী হয়। আর যার মধ্যে এ সমস্ত নিদর্শন পাওয়া যাবে না সে যেন কিয়ামতের পূর্বেই নিজের হিসাব নিজেই করে যে তার অন্তরে যা লুক্কায়িত আছে তা প্রকাশিত হয়ে যাবে। সে যেন আল্লাহ এবং মুমিনদের অযথা ধোকা দেয়ার চেষ্টা না করে। আল্লাহকে ধোকা দেয়ার প্রচেষ্টাকারী তো নিজেকেই ধোকা দেয় আল্লাহ বলেন,
"يخادعون الله والذين آمنو وما يخدعون إلا أنفسهم وما يشعرون" (البقرة: ٩) অর্থ, যারা আল্লাহ ও মুমিনদের ধোকা দেয় অথচ তারা নিজেরাই ধোকা খায়, যদিও সে তার অনুভূতি রাখেনা। (বাকারাহ: ৯) এরপর সাহাবাগণের জীবনীর ভিত্তিতে নবী প্রীতির নিদর্শনের আলোচনা করব, তার সঙ্গে প্রয়োজনানুযায়ী বর্তমানে মুসলিমদের অবস্থা নিয়ে আলোকপাত করব

টিকাঃ
16 ফাতহুল বারী, ১/৫৯
17 উমদাতুল কারী, ১/১৪৪

📘 নবী সাঃ প্রীতি ও তার নিদর্শন সমূহ > 📄 নবী প্রীতির প্রথম নিদর্শন

📄 নবী প্রীতির প্রথম নিদর্শন


যাতে দয়াবান আল্লাহ আমাদের হৃদয়ে নবীজীর প্রকৃত ভালবাসা সৃষ্টি করেন এবং দুনিয়া-আখেরাতে আমাদের মত পাপী-তাপী মানুষকে ফলদানে লাভবান করেন। তিনি প্রার্থনা শ্রবণ ও গ্রহণকারী। প্রতিটি নিদর্শন আলাদা আলাদা ভাবে আলোচনা করব।

নবী প্রীতির প্রথম নিদর্শন

নবীজীর দর্শন ও তাঁর সাহচর্যের প্রবল আশা

সকলে এ কথা জানে যে, প্রেমিকের সবচেয়ে বড় আশা-আকাঙ্খা তার প্রিয়ের দর্শন। অনুরূপ নবী প্রেমিক তাঁর উজ্জ্বল চেহারা দর্শন এবং সাহচর্য লাভ করার জন্য অস্থির থাকে, সঙ্গী হওয়ার প্রবল আশা করে, দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ নিয়ামত এবং নবীজীর দর্শন ও সাহচর্যের মধ্যে কোন একটি গ্রহণ করার সুযোগ দিলে অবিলম্বে নবীজীর দর্শনকে অগ্রাধিকার দেয়। তাঁর উজ্জ্বল চেহারা দর্শনে এবং পবিত্র সাহচর্যের কল্যাণে তার নয়ন শীতল হয় ও অন্তর আনন্দে ভরে উঠে। তাঁর বিরহ বেদনা তাকে ব্যথিত ও অস্থির করে তুলে, চক্ষু দিয়ে অশ্রু নির্গত হয়। নিম্নে প্রকৃত নবী প্রেমীদের দু,একটি ঘটনা উল্লেখ করা হচ্ছে যাতে উপলব্ধি করা যাবে যে নবী প্রেমের যে নিদর্শন তার ভিত্তিতে সে কি পরিমাণ তাঁকে ভালবাসত।

হিজরতের সময় নবীজীর সাহচর্য লাভ করার সুযোগে অতি আনন্দের সাথে আবু বাকর এর যাত্রা:
রাসূল আবু বাকর কে হিজরতের সময় নিজ সঙ্গী হওয়ার সুসংবাদ শুনান, এ সংবাদ শ্রবণে তিনি এমন আনন্দিত হন যে তাঁর চক্ষু দিয়ে আনন্দাশ্রু নির্গত হয়। নিম্ন লিখিত হাদীসে এই ঘটনা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।

عن عائشة رضى الله عنها زوج النبي صلى الله عليه وسلم قالت : فبينما نحن يوما جلوس في بيت أبي بكر رضى الله عنه في نحر الظهيرة قال قائل لأبي بكر ، هذا رسول الله صلى الله عليه وسلم متقنعا في ساعة لم يكن يأتينا فيها فقال أبو بكر فداء له أبي وأمي والله ما جاء به في هذه الساعة إلا أمر ، قالت عائشة: فجاء رسول الله صلى الله عليه وسلم فاستأذن فأذن له، فدخل فقال النبي صلى الله عليه وسلم لأبي بكر أخرج من عندك، فقال أبوبكر إنما هم أهلك بأبي أنت يا رسول الله ، قال : فإني قد أذن لي في الخروج فقال أبو بكر الصحابة بأبي أنت يا رسول الله قال: نعم، ) البخاري)
অর্থ, নবীজীর স্ত্রী আয়েশা (رض الله عنها) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা দুপুরে আবু বাকর এর গৃহে বসে(-) আছি এমন সময় কেউ যেন বল্ল, রাসূল (রোদের তাপে মাথা ঢেকে (এ)দিকে আসছেন) এ সময়ে আসতে তিনি অভ্যস্ত নন। আবু বাকর বলেন, আমার পিতা-মাতা তাঁর জন্য কুরবাণ হোক, আল্লাহর কসম, এ সময়ে নবীজীর আগমন নিশ্চয় কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য। আয়েশা বলেন, রাসূল পৌঁছে ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলেন, অনুমতির ভিত্তিতে ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং আবু বাকরকে বল্লেন, তোমার নিকট যারা আছে তাদেরকে বাইরে যেতে বল। আবু বাকর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবাণ হোক এরা তো আপনার পরিবার। অত:পর রাসূল বল্লেন, আমাকে মক্কা ত্যাগ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আবু বাকর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল আপনার জন্য আমার পিতা- মাতা কুরবাণ হোক আমি এই সফরে আপনার সঙ্গী হব? তিনি বলেন, হাঁ।(-) (বুখারী)
আবু বাকর হিজরতের সফরে সম্ভাব্য কঠোর বিপদের কথা জানতেন। কিন্তু এই বিপদের আশংকা তার প্রিয় রাসূলের সাথী হওয়ার আগ্রহকে কোন রূপ হাস করতে পারেনি। রাসূল যখন তাকে সঙ্গে থাকার অনুমতি প্রদান করলেন তখন অতি আনন্দে তার চক্ষু দিয়ে আনন্দাশ্রু নির্গত হয়।

হাফেয ইবনে হাজর বলেন, ইমাম ইসহাকের বর্ণনায় এ অংশ টুকু বেশী রয়েছে: "قالت عائشة (رضي الله عنها) فرأيت أبا بكر يبكي وما كنت أحسب أن أحدا يبكى من الفرح" (فتح الباري ٢٣٥/٧ السيرة النبوية ، لابن هشام (۹۳/২ অর্থাৎ, আয়েশা বলেন, আমি আবু বাকরকে এমন কেঁদে ফেলতে দেখি, আমি জানতাম না যে আনন্দের জন্য কেউ কেঁদে ফেলে। (-)

টিকাঃ
18 আমরা বসে ছিলাম (উমদাকুল কারী, ৪৫/১৯।
19 অত্যন্ত গরমের সময়। দিনের সব চেয়ে গরমের সময় হচ্ছে সূর্য ঢলার সময়। ঐ।
20 "সাহাবাহ" "ব" আকারের সাথে পড়া, অর্থাৎ সঙ্গ তলব। (ফাতহুল বারী, ২৩৫,/৭)
21 সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকেবিল্ আল্সার, হাদীস সংখ্যা ২৩১/৭,৩৯০৫
22 ফাতহুলবারী, ২৩৫/৭,এবং দেখুন, আসসিরা আন্নাওয়াবীয়াহ, ইবনে হিশামের, ১২/২

📘 নবী সাঃ প্রীতি ও তার নিদর্শন সমূহ > 📄 রাসূল ﷺ এর আগমনে আনসার গোষ্টীর আনন্দ

📄 রাসূল ﷺ এর আগমনে আনসার গোষ্টীর আনন্দ


আনসার গোষ্ঠী-তাদের প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক-যখন রাসূল ﷺ এর মক্কা ত্যাগ ও মদীনা আগমনের সংবাদ শ্রবণ করেন তখন তাঁরা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তাঁর আগমনের অপেক্ষা করতে আরম্ভ করেন। হাদীস ও জীবন চরিত গ্রন্থ সমূহে রাসূল ﷺ কে সাদরে গ্রহণ ও বরণ এবং আগমনের ও উল্লাসের কথা বিস্তারিত আলোচনা বিদ্যমান। এ সর্ম্পকে কতিপয় বর্ণনা উল্লেখ করা হচ্ছে:
ইমাম বুখারী উরওয়া বিন যুবায়ের এর বরাতে বর্ণনা করেন যাতে তিনি রাসূল ﷺ কে স্বাগতম জানানোর জন্য আনসার গোষ্ঠীর আনন্দ উল্লাসকে এভাবে বর্ণনা করেন:
وسمع المسلمون بالمدينة مخرج رسول الله صلى الله عليه وسلم من مكة فكانوا يغدون (۳) كل غداة إلى الحرة فينتظرونه حتى يردهم حر الظهيرة، فانقلبوا يوما بعد ما أطالوه انتظارهم، فلما أووا إلى بيوتهم أوفى (۴) رجل من يهود على أطم (۲) من أطامهم لأمر ينظر إليه فبصر برسول الله صلى الله عليه وسلم وأصحابه مبيضين (1) يزول بهم السراب (۳) فلم يملك اليهودي أن قال بأعلى صوته يا معاشر العرب ! هذا جدكم (1) الذي تنتظرون فثار المسلمون إلى السلاح، فتلقوا رسول الله صلى الله عليه وسلم بظهر الحرة فعدل بهم ذات اليمين حتى نزل بهم في بني عمرو بن عوف. (البخاري)
অর্থ, মদীনার মুসলিমগণ যখন নবীজীর মক্কা ত্যাগ করে মদীনা আগমনের সংবাদ শ্রবণ করেন তখন নিয়মিত প্রতিদিন সকালে “হাররাহ” নামক স্থানে তাকে বরণ করার জন্য আসতেন ও অপেক্ষা করতেন এবং দুপুরে রোদের তাপের কারণে বাড়ি ফিরতেন, একদিন তারা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে ঘরে ফিরে যান, যখন তাঁরা নিজ নিবাসে পৌঁছেন তখন জনৈক ইয়াহুদী তার কোন কাজের জন্য পাহাড়ের চূড়ায় উঠে এবং দূর থেকে সাদা কাপড়ে রাসূল কে ও তাঁর সঙ্গী-সাথীকে দেখে মরিচিকা দুর হচ্ছিল। অত:পর সে ধৈর্যহারা হয়ে চিৎকার করে বলে উঠে: হে আরব গোষ্ঠী! এই তো তোমাদের সেই নেতা যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছিলে। এরপর মুসলিমগণ নিজ নিজ অস্ত্র গ্রহণ করেন এবং তাঁদেরকে “হাররাহ” নামক স্থানে স্বাগতম জানান। রাসূল ﷺ তাদেরকে সঙ্গে করে ডান দিকে যেতে আরম্ভ করেন এবং বনী আম্র বিন আওফের নিকটে অবতরণ করেন। (-) (বুখারী)

রাসূল ﷺ কে অভ্যর্থনা জানিয়ে গ্রহণ করার জন্য আনসার গোষ্ঠীর এমন আগ্রহ ছিল যে তাঁকে বরণ করার জন্য প্রতিদিন প্রভাতে “হাররাহ” নামক স্থানে যেতেন এবং রৌদ্রের তাপ বৃদ্ধি পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। ইমাম ইবনে সা‘দের একটি বর্ণনায় রয়েছে: "فإذا أحرقتهم الشمس رجعوا إلى منازلهم" অর্থাৎ, সূর্যের তাপ যখন তাদেরকে ঝলসিয়ে দিত তখন তারা নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করতেন। ইমাম হাকেমের বর্ণনায় রয়েছে: (*) " فينتظرونه حتى يؤذيهم حر الظهيرة" অর্থাৎ, দুপুরের রৌদ্র তাদেরকে কষ্ট দেয়া পর্যন্ত তাঁরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করতেন।" আনসারগণ রাসূলকে কি ভাবে অভ্যর্থনা জানিয়ে ছিলেন ইমাম বুখারী তা নিম্ন লিখিত হাদীসে বর্ণনা করেছেন;

عن أنس رضي الله عنه قال: نزل رسول الله صلى الله عليه وسلم جانب الحرة ثم بعث إلى الأنصار فجاءوا إلى النبي صلى الله عليه وسلم وإلى أبي بكر ، فسلموا عليهما وقالوا: " اركبا آمنين مطاعين، فركب نبي الله صلى الله عليه وسلم وأبوبكر وحفوا دونهما بالسلاح ، فقيل في المدينة، جاء نبي الله، جاء نبي الله فاشرفوا ينظرون ويقولون : جاء نبي الله صلى الله عليه وسلم فأقبل يسير حتى نزل جانب دار أبي أيوب رضي الله عنه (البخاري)
অর্থ, রাসূল ﷺ “হারাহ” নামক স্থানে অবতরণ করেন, অত:পর আনসার গোষ্ঠীর নিকট খবর পাঠান। তারা রাসূল ﷺ ও আবুবাক্র রাঃ এর নিকটে আসেন ও সালাম দেন এবং বলেন, আপনারা দুজনে নিরাপত্তার সাথে বাহনে আরোহণ করুন, আপনাদের অনুসরণ করা হবে, তাঁরা সওয়ার হলেন, আন্সারগণ নিরাপত্তার জন্য তাঁদেরকে অস্ত্রসহ বেষ্ঠন করেন। এদিকে মদীনায় সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে আল্লাহর নবী পৌঁছে গিয়েছেন-আল্লাহর নবী পৌঁছে গিয়েছেন, মানুষ উঁচু জায়গায় উঠে তাঁর আগমন দর্শন করতে আরম্ভ করে এবং বলে আল্লাহর নবী পৌঁছে গিয়েছেন। নবী যেতে থাকেন এবং আইয়ুব আনসারীর ঘরের একাংশে অবতরণ করেন। (১) ইমাম আহমাদ, আনাস এর সানাদে বর্ণনা করেন যে আন্সার গোষ্ঠীর মধ্যে যারা রাসূল কে ও আবু বাক্রকে বরণ করতে এসেছিলেন আনুমানিক (তাদের সংখ্যা) পাঁচশো। এরা তাঁকে স্বাগতম জানিয়ে বলেছিলেন (-) "انطلقا آمنين مطاعين" অর্থাৎ, আপনারা উভয়ে বাহনের পৃষ্ঠে আরোহণ করুন আপনারা আমাদের অনুসরণীয় ব্যক্তি। (-)

মদীনাবাসীদের ঐ অভ্যর্থনা ইমাম আহমাদ আবুবাকর এর পরম্পরায় এ ভাবে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “রাসূল যাত্রা করেন, আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম, আমরা মদীনায় পৌছে যাই, মানুষ তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। তারা রাস্তায় বের হয়, (আজাজীর) ছাদে উঠে যায়, বাচ্চারা আনন্দে রাস্তায় উচ্চ স্বরে বলে, আল্লাহু আকবার, আল্লাহর রাসূল পৌঁছে গিয়েছেন, মুহাম্মাদ পৌঁছে গিয়েছেন।আবু বাক্স বলেন, তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় যে কে রাসূল এর আপ্পায়ন করার সম্মান অর্জন করবে? (শায়েখ আহমাদ শাকের এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন।) আনাস বিন মালেক ঐ দিনের অনুভূতির কথা এ ভাবে প্রকাশ করেছেন,

فما رأيت يوما قط أنور ولا أحسن من يوم دخل رسول الله صلى الله عليه وسلم وأبو بكر رضى الله عنه المدينة (أحمد) অর্থাৎ, যে দিন রাসূল ﷺ ও আবু বাক্স মদীনায় প্রবেশ করেন সে দিনের চেয়ে আর কোন দিনকে আলোকিত এবং সুন্দরতম দেখিনি। ০" রাসুল ﷺ এর মদীনা আগমনের দিন মদীনা বাসীরা যে ভাবে তার অভ্যর্থনা জানিয়েছিল বারাআ ইবনে আ-যেব তার চিত্র এ ভাবে বর্ণনা করেন:

فما رأيت أهل المدينة فرحوا بشئ فرحهم برسول الله صلى الله عليه وسلم . অর্থাৎ, রাসূল ﷺ এর আগমনে মদীনা বাসীরা যে আনন্দিত হয়েছিল, আর কোন বিষয়ে তাদেরকে এত আনন্দিত হতে দেখিনি।

টিকাঃ
২৩ অর্থাৎ সকালে বের হত, (ফাতহুলবারী, ২৪৩/৭)
২৪ “আওফা” অর্থাৎ উঁচু জায়গায় উঠল, ঐ।
২৫ “উতুম” অর্থাৎ দুর্গ,ঐ।
২৬ অর্থাৎ তাদেরকে সাদা কাপড় পরিহিত অবস্থায় দেখা যাচ্ছিল, ইবনে তীন বলেন, যে তারা দ্রুত গতিতে আসছিলেন, এ অর্থও হতে পারে। ঐ।
27 "ইয়াযুলো বিহিম আস সারাবো" অর্থাৎ, তাঁদেরকে কলাসের মধ্যে দেখা যাচ্ছিল। অথবা তাঁদের আগমণ চোখের মাঝে ভেসে উঠছিল। ঐ।
28 এই সেই তোমারদের আকাংখিত ব্যক্তি, তোমাদের রাষ্ট্র নায়ক, তোমরা যাঁর অপেক্ষা করছিলে। ঐ।
২৯ সহীহ বুখারী, কিতাবু মানাকেবিল আনসার, পাঠ, নবীজীর ও তাঁর সাহাবীর মদীনায় হিজরত, হাদীস সংখ্যা ২৩৯/৭৩৯০৬।
৩০ আত্মাবাকাতুল আল-কুবরা ২৩৩/১
৩১ আল-মুসতাদরাক আলাস্সাহীহাইনে, কিতাবুল হিজরাতে রাসূল ও তাঁর সাহাগণের মদীনা আগমণের সময় তাঁদেরকে আনসারগণের বরণ। ১১/৩
৩২ সহীহ বুখারী, কিতাবু মানাকিবিল আনসার, পাঠ, নবী ও তাঁর সাহবাগণের মদীনায় হিজরত, হাদীস সংখ্যা ২৫০/৭৩৯১১।
৩৩ দেখুন আল-ফাজর রাব্বানী, লে-ভারতীবে মুসনাদে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল, কিতাবু সিরাতিন নাবাবিয়াহ পাঠ, নবীজীর মদীনায় আগমণ, হাদীস সংখ্যা ২৯১/২০, ১৫৫, ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন তারিখে সাদীরে। (দেখুন ফাভহুলবারী২৫০/৭) শায়েখ আহমাদ আল-বান্না ইমাম আছমাদের বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন। (দেখুন বলুগুল আমনী ২১২/২০)
৩৪ সহীহ বুখারী, কিতাবু মানাকেবিল আনসার, পাঠ, নবীজীর ও তাঁর সাহাবাগণের মদীনা আগমণ হাদীস সংখ্যা ২৫০/৭,৩৯১১।
৩৫ “আজাজীর” ইজ্জার, এর বহু বচন অর্থ, ছাদ। (দেখুন আননেহায়াহ ফী গারীবিল হাদীস অল-আসার মান্দাহ "আজারা” ২৬/১,)
৩৬ আল-মুসনাদ, হাদীস সংখ্যা ১৫৫/১,৩ এ হাদীসকে শায়েখ আহমাদ শাকের সহীহ বলেছেন (দেখুন হামেশ আল-মুসনাদ ১৫৪/১)
37 ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। দেখুন আল-ফাতহুর রাব্বানী লে-তারতীবিল মুসনাদ, কিতবুসসেয়ার আনবোবীয়াহ, পাঠ, নবীজীর মদীনায় আগমণ। হাদীস সংখ্যা ২৯০/২০১৫২।
38 'দেখুন সহীহ বুখারী, কিতাবু মানাকেবিল আনসার, পাঠ, নবীজী ও তাঁর সাহাবার মদীনায় আগমণ, হাদীস সংখ্যা ২৬০/৭,৩৯২৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00