📄 নীল বিষের ছোবল
১২ বছর বয়সি মোটামুটি রক্ষণশীল পরিবারের কোনো কিশোরকে যদি কেউ পর্নোগ্রাফি দেখায়, তবে তার প্রতিক্রিয়া হবে—‘তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! এসব কী বিচ্ছিরি! ওয়াক থু!’ প্রথমবার ওসব দেখার সময় আমার প্রতিক্রিয়া ঠিক এমনই ছিল। পাড়ার এক বড়ো ভাই আমাকে এই নোংরা ভিডিও দেখিয়েছিল। পেশায় তিনি ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রী। যখনকার কথা বলছি, তখন ছিল দ্বিতীয় মোবাইলের জামানা।
২০১৩ সালের কথা। ১৩ বছর বয়সি আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। সে সময় সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না। আমার বয়সি কিছু ছেলে দ্বিতীয় মোবাইল ব্যবহার করত। তবে ওরা পাড়ায় ও স্কুলে পরিচিত ছিল বেয়াদব নামে। ওই ছেলেদের একদিন দেখি স্কুলের টয়লেটের দরজায় লেখা একটা ইংরেজি শব্দ নিয়ে খুব হাসাহাসি করছে। এর মর্মার্থ আমি সেদিন বুঝতে পারিনি।
সেখানে আরও একটা শব্দ পাশাপাশি লেখা ছিল। ছোটো পকেট ডিকশনারিতে অনেক খুঁজেও এটি পেলাম না। স্যারকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। স্যার একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন আমার প্রশ্ন শুনে। তিনি বললেন, 'এটা কোথায় পেয়েছ?' আমি বললাম- 'টয়লেটের দরজায়।' স্যার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেলেন। এরপর হঠাৎ একদিন দেখি দরজায় নতুন রং করা হয়েছে। টয়লেটের দরজায় সেই লেখাটাও আর চোখে পড়েনি।
২০১৪ সালে আবারও টয়লেটে কিছু লেখা চোখে পড়ল। আগের শব্দগুলো তো ছিলই, সাথে নতুন কিছু শব্দ যোগ হয়েছিল। ততদিনে আমি ইন্টারনেটের সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। আব্বু বিদেশ থেকে একটি টাচস্ক্রিন ফোন পাঠিয়েছিলেন ঘরে ব্যবহারের জন্য। আম্মু মোবাইল খুব একটা ব্যবহার করতেন না। এ কারণে আমার কাছেই ফোনটা থাকত।
স্কুলের টয়লেটে দেখা শব্দগুলো এবার আর কাউকে জিজ্ঞেস না করে ডাইরেক্ট গুগল করি। রেজাল্টে যা এলো, আমার চোখ এক্কেবারে কপালে। দেখামাত্রই অপরাধবোধ ও উত্তেজনা একই সরলরেখায় চলা শুরু করেছিল। এখনও ওই ভয়াবহ অনুভূতিটা স্মরণ করতে পারি। ছি!
আমি কিছুটা হলেও ধার্মিক ছিলাম। মানে দৈনিক তিন-চার ওয়াক্ত নামাজ পড়া হতো। কিন্তু সেদিন আমার উত্তেজনা অপরাধবোধকে ছাপিয়ে গেল। আর এগোয়নি। এরপর থেকেই ওসব দেখার শুরু। গোপনে, একটু সংযতভাবে বিচরণ করতে থাকলাম এই জগতে। মাস্টারবেশনও শুরু করলাম। এটা চলত রুটিনমাফিক। নিয়মিত রুটিন ছিল সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন। বিকৃত এই ভিডিওগুলো দেখা ও মাস্টারবেশন; যুগপভাবে।
প্রায় ছয় মাস চলেছিল এ রকম। কিছু টাকা জমিয়ে মেমোরি কার্ড কিনলাম। এরপর দোকানে গিয়ে কার্ডভর্তি ভিডিও লোড করে আনলাম। যখন দেখতে ইচ্ছে হতো, মেমোরি ঢুকিয়ে নিতাম ফোনে। ইন্টারনেটে সরাসরি দেখে সুবিধা হচ্ছিল না বিভিন্ন কারণে।
একদিন বাথরুমে ফোন নিয়ে গেলাম এই উদ্দেশ্যে। হঠাৎ রিংটোন বেজে উঠলে তা আম্মুর কর্ণগোচর হলো। বাথরুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তিনি জেরা করা শুরু করলেন। বাথরুমে ফোনের কী কাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি আমতা আমতা করে বললাম, 'পকেটে ছিল, খেয়াল করিনি।' সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও আম্মুর মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল।
আরেক দিন বাথরুমে থাকাকালীন সময় ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। সেদিন খালা বেড়াতে এসেছিলেন। মা হয়তো খেয়াল করেছিল, কিন্তু আমাকে কিছু বলেননি। এরপর গোসল সেরে বের হওয়ার পর খালা আমাকে ডেকে এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি ঠিক এ রকমই বলেছিলেন—'আব্বু, এই বয়সটায় খুবই খারাপ সময় পার করতে হয়। মোবাইল একটু কম ঘাঁটাঘাঁটি করিস। খারাপ ছেলেদের সাথে মেলামেশা করিস না, আজেবাজে ভিডিও দেখিস না। তুই ভালো ছেলে, ভালো ছেলের মতো চলবি।' আমি কোনোভাবে পাশ কাটিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। মূলত আমি ফোন থেকে মেমোরি কার্ড সরাতে ভুলে গিয়েছিলাম। ফলে পুরো ব্যাপারটাই খালা আর আম্মু ধরে ফেলেছিলেন!
এদিকে জেসএসি পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছিল। তাই ওসব দেখার ভূত মাথা থেকে কিছুদিনের জন্য চলে গেল। ভেবেছিলাম এবার বোধহয় এই নেশা থেকে নিস্তার পাব, কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক যেতে না যেতেই আবারও ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করার তাড়না অনুভব করতে লাগলাম।
কিন্তু আম্মু মোবাইল সব সময় তার কাছে রাখতেন। তাই ওগুলো দেখার সুযোগও আর থাকল না। যদিও ব্যাপারটা আমার জন্য ভালো হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হলো উলটোটা। আমি ইতোমধ্যে যা দেখেছি, সেগুলো কল্পনায় নিয়ে আসতাম। সেই দৃশ্যগুলো কল্পনা করার মাধ্যমে মাস্টারবেশন করতাম। ফলে মাস্টারবেশন করার জন্য সরাসরি বিকৃত ভিডিওগুলো আর দেখতে হতো না। এভাবে চলতে থাকল দিন। ফ্যান্টাসি, মাস্টারবেশন কিছুই থেমে থাকল না।
দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট হলো। ভালো ছাত্র ছিলাম, বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন বা স্কুলের শিক্ষকরা আশা করেছিলেন আমি জিপিএ ৫ পাব; কিন্তু সবাইকে হতাশ করে রেজাল্ট এলো ৪.৫০। অবস্থা বেশ বেগতিক হয়ে পড়ল। এত ভালো একটা ছাত্রের এ রকম খারাপ রেজাল্ট কেউ মেনে নিতে পারবে না-এটাই স্বাভাবিক। এবার আম্মু মুখ খুললেন। আজও কানে ভাসছে সেদিনের কথাগুলো—‘পড়ালেখা না করে সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে ছিলি না! ন্যাংটা মেয়েগুলোর ছবি দেখতি না বাথরুমে গিয়ে! যাহ, এই নে মোবাইল। আরও দেখ গিয়ে! আমার সাথে আর কথা বলবি না। জাহান্নামে যা বেয়াদব।’
মায়ের এই রাগ স্বাভাবিক ছিল। যেহেতু রোল এক ছিল, আব্বু ভাবতেন আমি খুব পড়ুয়া ছেলে। রেজাল্ট নিঃসন্দেহে ভালো হবে; কিন্তু রেজাল্ট তো আর ভালো হয়নি। আম্মু আব্বুকে কীভাবে এই বাজে রেজাল্টের খবর দেবেন, তা নিয়ে রীতিমতো খুব টেনশনে ছিলেন। আমিও ভীষণ হতাশ ও দুঃখিত ছিলাম। মনে মনে স্থির করলাম, ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করা ছেড়ে দেবো। ভালো হয়ে যাব। যেভাবেই হোক পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতেই হবে।
এরপর প্রায় দুই মাস এগুলো থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলাম। শুধু জিদের বসে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত এত ফলপ্রসূ হয়েছিল। মূলত এই নোংরা কাজ থেকে মুক্তি পেতে একটা জেদ অনেক সাহায্য করে। নামাজ পড়তে শুরু করেছিলাম নিয়মিত। আমার সাথে আম্মুর আচরণও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
কিন্তু একদিন...
টিভিতে একটা মুভি দেখছিলাম। একপর্যায়ে খারাপ একটা দৃশ্য চলে আসে। আমি সামান্য এই দৃশ্যও সহ্য করতে পারলাম না। এতটুকুতেই উত্তেজিত হয়ে সোজা বাথরুমে গিয়ে মাস্টারবেশন করে ফেললাম। আর এরপর আবারও সেই অনুশোচনা। এ কী করলাম আমি! মনে মনে আবারও প্রতিজ্ঞা করি, 'আর নাহ! এটাই শেষবার।'
কিন্তু শেষবার হওয়াটা এতই সহজ? তার পরদিন আবারও মাস্টারবেশন। টাইটানিক সিনেমার সেই অশ্লীল দৃশ্য মাথায় ঘুরঘুর করছিল। এভাবে করে পর্নোগ্রাফির অশরীরী প্রেতাত্মা আবারও আমার ঘাড়ে চেপে বসল।
আবারও মাস্টারবেশনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। নিয়মিত অপরাধবোধে ভুগতাম। আর নিয়মিতই প্রতিজ্ঞা করতাম-এই শেষ; আর করব না। আমার এই পচে যাওয়া কারও চোখে পড়েনি। ততদিনে মাও বিশ্বাস করা শুরু করেছিলেন। ফলে আরও অবারিত সুযোগ। আমি ইউটিউবে পড়া দেখব বলে মোবাইল নিয়ে ডুব দিতাম নোংরা জগতে। বিকৃত ভিডিওগুলোতে যা দেখতাম, সেগুলো ক্যাশ করে মোবাইল মায়ের হাতে দিয়ে কিছুক্ষণ পরে বাথরুমে যেতাম, যাতে বুঝতে না পারে।
অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন আমাকে উত্তেজিত করার জন্য একটা চুম্বন দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি আরও বিকৃতমনা হয় গেলাম। হরেক রকম স্টাইল কিংবা এক্সট্রিম কিছু ছাড়া আমার জমত না। এভাবেই পার হতে থাকল দিন। আর আমি পরিণত হচ্ছিলাম আস্ত এক পশুতে।
এভাবেই পার হয়ে গেল আরও দুই বছর। এসএসসি পরীক্ষার বাকি আর তিন মাস। তখন জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলের কথা স্মরণ হওয়ায় অনেক বেশি ধার্মিক হয়ে উঠি। হেব্বি পড়াশোনা শুরু করে দিই। জঘন্য কাজগুলোও বন্ধ করি। এই রেশ ছিল রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত। রেজাল্ট বেরোল। এবার জিপিএ ৫.০০ পেলাম। সবাই খুশিতে আত্মহারা। আব্বু ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা তোমার কী লাগবে? তা যদি চাঁদও হয়, আমি এনে দেবো।' আমার ল্যাপটপ কেনার ইচ্ছে ছিল। আমতা আমতা করে সেটা বলে ফেললাম। এর ঠিক এক মাস পর চাঁদ তথা ল্যাপটপ এসে হাজির। এরপর শহরে চলে যাই পড়াশোনার জন্য।
শহরে গিয়ে মেসে উঠি। ওয়াই-ফাইয়ের সাথে বই মারফত পূর্ব পরিচিতি থাকলেও এবার প্র্যাকটিক্যালি পরিচিত হই। একাই একটা রুম নিয়ে নিই। ফেসবুকে একটি মুভিসংশ্লিষ্ট গ্রুপের সাথে যুক্ত হই। এবার আমার মুভি দেখার নতুন আসক্তি শুরু হয়। যেকোনো মুভিতেই এখন ছোটোখাটো যৌন দৃশ্য থাকে। আর এগুলাই আমার জন্য কাল হলো। প্রায় পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর আবারও পুনঃঅবনতি ঘটে আমার।
পর্নোগ্রাফি দেখলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন আর আমি ভালো রেজাল্ট করতে পারব না, এই ভয়ে বেশ কিছুদিন এই জঘন্য কাজ হতে নিজেকে বিরত রেখেছিলাম। কিন্তু আমি আবারও অকৃতজ্ঞ হলাম। আনলিমিটেড ইন্টারনেট পাওয়ায় আবারও বিষাক্ত নীল দুনিয়ায় ডুব দিলাম। এবার আর আগের মতো অনুশোচনা হলো না। প্রায় প্রতিদিনই গোসলের আগে নোংরা ভিডিওগুলো দেখতাম ও মাস্টারবেশন করতাম। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটা চলে।
ইতোমধ্যে লক্ষ করি, আমার নাইট ইমিশন হচ্ছে না। হঠাৎ নিজেকে নিয়ে চিন্তা শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার শারীরিক অবনতি টের পাই। কিন্তু ততদিনে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা খুইয়ে বসেছি। না চাইলেও খানিক সময়ের জন্য হলেও জানোয়ারে পরিণত হতাম। দেখা গেল, কয়েক সেকেন্ডেই আমার বীর্যপাত হয়ে যায়।
(নাইট ইমিশন; আমরা একে স্বপ্নদোষ বলে জানি। আদতে এটা দোষের কিছু নয়। ছেলেদের আল্লাহ প্রদত্ত অন্যতম একটি নিয়ামত এই নাইট ইমিশন। অবিবাহিত কারও নিয়মিত নাইট ইমিশন সুস্থ যৌন স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয়।)
এসব সমস্যার কথা কাউকে যে বলব, এমন কেউই ছিল না। বাস্তবিকভাবে আমার স্কুলের সব বন্ধুই খুব ভালো ছিল। কথায়, চালচলনে তাদের খুঁত ধরা ছিল অসম্ভব। বাহ্যিকভাবে যতটুকু দেখেছি, তারা ছিল পারফেক্ট। সুতরাং তাদের সাথে একসাথে বসে এই নোংরা ভিডিওগুলো দেখা সম্ভব ছিল না। কেউ এসব দেখে বলে জানতামও না। অফলাইন দুনিয়ায় আমি বড়োই ভদ্রসদ্র এক ছেলে; ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানি না। পাড়ায়, আত্মীয়স্বজন, সর্বমহলে ভদ্র ছেলে হিসেবে আমার ব্যাপক সুখ্যাতি আছে। কিন্তু স্ক্রিনের সামনে এলেই আমি খুব বেহায়া, বেশরম হয়ে পড়তাম।
নিজের শারীরিক, মানসিক অবনতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমি আর আমি নেই; নিকৃষ্ট এক পশুতে পরিণত হয়েছি।
করে চেয়েছিলাম, এই ভয়াল চক্র থেকে যেন মুক্তি পাই। স্ক্রিনের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে কাটাতে পারলেও বাস্তবে কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে পারতাম না। কারণ, স্ক্রিনের বাইরের দুনিয়ায় আমি ছিলাম খুবই লাজুক একটা ছেলে। সব সময় মাথায় কাজ করত-পাছে লোকে কিছু ভাবে কিনা! আদতে আমি ছিলাম ভদ্র মুখোশ পরা এক আস্ত পশু! নিজের এই বিপরীতমুখী আচরণে নিজেকে ভণ্ড, জাল মনে হতো। মানসিক যাতনা বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশি। খুব করে এই জাল থেকে মুক্তি চাইছিলাম; তা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।
ঠিক এ সময় মেসে একটা নতুন ছেলে আসে। বেশ নম্র, ভদ্র ও ধার্মিক। ভেতরে-বাইরে সাদা ও ভালো মনের এই ছেলেটি বেশ মিশুক ছিল। ফলে অল্পদিনেই আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একদিন আমাকে কী বুঝে সে একটি বই দেয়। সূচিপত্র দেখে বুঝে যাই, এতে হয়তো আমার মেডিসিন থাকতে পারে।
খুব দ্রুত পুরো বইটি শেষ করি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার প্রেসক্রিপশন পেয়ে যাই। পর্নোগ্রাফি কেন ছাড়ব? এই একটি প্রশ্ন বিগত কিছুদিন ধরে নিজেকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি। 'কিন্তু যে কোটি কোটি স্পার্ম আমার হারাম কামনার কবলে পড়ে শেষ হয়ে গেল, সেগুলো থেকে তো অগণিত ভ্রূণ সৃষ্টি হতে পারত, তার হিসাব কি দেওয়া সম্ভব?' এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিজেকে করা হয়নি।
অন্তরে আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার প্রচণ্ড ভয় ঢুকে গেল। আমার সেই বন্ধুর সঙ্গে বেশি বেশি সময় কাটাতে শুরু করলাম। তাকে অনুরোধ করলাম আমার রুমে চলে আসার। এতে জঘন্য কাজ থেকে দূরে থাকা সহজ হবে।
সেও চলে আসে। সে আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাত। আমিও অনলাইনে টুকটাক ইসলাম নিয়ে পড়াশোনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। পর্নোগ্রাফি নামক টক্সিকের বিরুদ্ধে টনিক হিসেবে কাজ করেছিল কিছু কুরআনের আয়াত ও নবিজির হাদিস। যেমন- 'তোমরা অশ্লীলতার ধারে কাছেও যেয়ো না।' তারপর অশ্লীলতা থেকে ইউসুফ (আ.)-এর পালিয়ে বাঁচাতে দৌড়ে যাওয়া, এক সাহাবির ঘটনা, যিনি গোসলরত এক মহিলাকে দেখার পর যে উপায়ে অনুশোচনা করে সেই ঘটনা... আরও অনেক। আরও একটি হাদিসের কথা মনে পড়ছে। যেখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-'তোমার যদি লজ্জা না থাকে, তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।'
নামাজ শেষে মোনাজাতে পুরোটা সময়জুড়ে এতদিনের কৃত পাপের ক্ষমা চাইতাম। কিছু টেকনিকও অনুসরণ করতাম। যেমন: খুব ভোরে অর্থাৎ ফজর নামাজ আদায় শেষেই গোসল সেরে নিতাম। সব সময় অজু অবস্থায় থাকতাম, যেন ভেতরে পবিত্র অনুভব করতে পারি। কামভাব জাগলে প্রস্রাব করে ফেলতাম, এখনও করি। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কিনা জানি না, কিন্তু এটা খুবই কার্যকর ছিল।
নতুন করে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করলাম। বাইরে ঘোরাঘুরিতে আমার প্রচুর এলার্জي ছিল। যে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা, বাইরের আলোকিত জীবন তার কী আর ভালো লাগার কথা? তাই অনেকটা নিজের সাথে জোর খাটিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার অভ্যাস করি।
মুভিতে ব্যাপকহারে আসক্ত ছিলাম। এটা কোনোক্রমেই ছাড়তে পারছিলাম না। তাই প্রথমে মুভি রিলেটেড গ্রুপ থেকে বের হই। গুগল করে পিজি ১৩ মুভির লিস্ট বের করি। এমন নয় যে, এগুলোতে মডেলরা হিজাব পরিধান করত। তবে আমি অতিমাত্রায় আসক্ত ছিলাম। আগেই বলেছি, আমার চাহিদা ছিল অধিক জঘন্য কিছু (কারণ, আমি এক্সট্রিম পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম)। তাই একটা চুম্বন দৃশ্য আমাকে উত্তেজিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
তবুও একা একা মুভি দেখতাম না। এমনভাবে দেখতাম, যেন সবাই দেখে যে আমি কী দেখছি। নিজের কাছে টাচস্ক্রিন ফোন রাখি না। মায়ের ফোনটা অবশ্য প্রায়ই নিই, তবে সেটা ফেসবুকিং করার জন্য।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি বেশ। আজ প্রায় তিন বছর পূর্ণ হতে চলল পর্নোগ্রাফি ও মাস্টারবেশনমুক্ত সুস্থ জীবনের। আমার স্বাভাবিক নাইট ইমিশন হচ্ছে এখন। অন্তিম নিশ্বাস পর্যন্ত এভাবেই চলুক, এটাই কামনা।
১২ বছর বয়সি মোটামুটি রক্ষণশীল পরিবারের কোনো কিশোরকে যদি কেউ পর্নোগ্রাফি দেখায়, তবে তার প্রতিক্রিয়া হবে—‘তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! এসব কী বিচ্ছিরি! ওয়াক থু!’ প্রথমবার ওসব দেখার সময় আমার প্রতিক্রিয়া ঠিক এমনই ছিল। পাড়ার এক বড়ো ভাই আমাকে এই নোংরা ভিডিও দেখিয়েছিল। পেশায় তিনি ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রী। যখনকার কথা বলছি, তখন ছিল দ্বিতীয় মোবাইলের জামানা।
২০১৩ সালের কথা। ১৩ বছর বয়সি আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। সে সময় সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না। আমার বয়সি কিছু ছেলে দ্বিতীয় মোবাইল ব্যবহার করত। তবে ওরা পাড়ায় ও স্কুলে পরিচিত ছিল বেয়াদব নামে। ওই ছেলেদের একদিন দেখি স্কুলের টয়লেটের দরজায় লেখা একটা ইংরেজি শব্দ নিয়ে খুব হাসাহাসি করছে। এর মর্মার্থ আমি সেদিন বুঝতে পারিনি।
সেখানে আরও একটা শব্দ পাশাপাশি লেখা ছিল। ছোটো পকেট ডিকশনারিতে অনেক খুঁজেও এটি পেলাম না। স্যারকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। স্যার একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন আমার প্রশ্ন শুনে। তিনি বললেন, 'এটা কোথায় পেয়েছ?' আমি বললাম- 'টয়লেটের দরজায়।' স্যার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেলেন। এরপর হঠাৎ একদিন দেখি দরজায় নতুন রং করা হয়েছে। টয়লেটের দরজায় সেই লেখাটাও আর চোখে পড়েনি।
২০১৪ সালে আবারও টয়লেটে কিছু লেখা চোখে পড়ল। আগের শব্দগুলো তো ছিলই, সাথে নতুন কিছু শব্দ যোগ হয়েছিল। ততদিনে আমি ইন্টারনেটের সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। আব্বু বিদেশ থেকে একটি টাচস্ক্রিন ফোন পাঠিয়েছিলেন ঘরে ব্যবহারের জন্য। আম্মু মোবাইল খুব একটা ব্যবহার করতেন না। এ কারণে আমার কাছেই ফোনটা থাকত।
স্কুলের টয়লেটে দেখা শব্দগুলো এবার আর কাউকে জিজ্ঞেস না করে ডাইরেক্ট গুগল করি। রেজাল্টে যা এলো, আমার চোখ এক্কেবারে কপালে। দেখামাত্রই অপরাধবোধ ও উত্তেজনা একই সরলরেখায় চলা শুরু করেছিল। এখনও ওই ভয়াবহ অনুভূতিটা স্মরণ করতে পারি। ছি!
আমি কিছুটা হলেও ধার্মিক ছিলাম। মানে দৈনিক তিন-চার ওয়াক্ত নামাজ পড়া হতো। কিন্তু সেদিন আমার উত্তেজনা অপরাধবোধকে ছাপিয়ে গেল। আর এগোয়নি। এরপর থেকেই ওসব দেখার শুরু। গোপনে, একটু সংযতভাবে বিচরণ করতে থাকলাম এই জগতে। মাস্টারবেশনও শুরু করলাম। এটা চলত রুটিনমাফিক। নিয়মিত রুটিন ছিল সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন। বিকৃত এই ভিডিওগুলো দেখা ও মাস্টারবেশন; যুগপভাবে।
প্রায় ছয় মাস চলেছিল এ রকম। কিছু টাকা জমিয়ে মেমোরি কার্ড কিনলাম। এরপর দোকানে গিয়ে কার্ডভর্তি ভিডিও লোড করে আনলাম। যখন দেখতে ইচ্ছে হতো, মেমোরি ঢুকিয়ে নিতাম ফোনে। ইন্টারনেটে সরাসরি দেখে সুবিধা হচ্ছিল না বিভিন্ন কারণে।
একদিন বাথরুমে ফোন নিয়ে গেলাম এই উদ্দেশ্যে। হঠাৎ রিংটোন বেজে উঠলে তা আম্মুর কর্ণগোচর হলো। বাথরুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তিনি জেরা করা শুরু করলেন। বাথরুমে ফোনের কী কাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি আমতা আমতা করে বললাম, 'পকেটে ছিল, খেয়াল করিনি।' সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও আম্মুর মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল।
আরেক দিন বাথরুমে থাকাকালীন সময় ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। সেদিন খালা বেড়াতে এসেছিলেন। মা হয়তো খেয়াল করেছিল, কিন্তু আমাকে কিছু বলেননি। এরপর গোসল সেরে বের হওয়ার পর খালা আমাকে ডেকে এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি ঠিক এ রকমই বলেছিলেন—'আব্বু, এই বয়সটায় খুবই খারাপ সময় পার করতে হয়। মোবাইল একটু কম ঘাঁটাঘাঁটি করিস। খারাপ ছেলেদের সাথে মেলামেশা করিস না, আজেবাজে ভিডিও দেখিস না। তুই ভালো ছেলে, ভালো ছেলের মতো চলবি।' আমি কোনোভাবে পাশ কাটিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। মূলত আমি ফোন থেকে মেমোরি কার্ড সরাতে ভুলে গিয়েছিলাম। ফলে পুরো ব্যাপারটাই খালা আর আম্মু ধরে ফেলেছিলেন!
এদিকে জেসএসি পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছিল। তাই ওসব দেখার ভূত মাথা থেকে কিছুদিনের জন্য চলে গেল। ভেবেছিলাম এবার বোধহয় এই নেশা থেকে নিস্তার পাব, কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক যেতে না যেতেই আবারও ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করার তাড়না অনুভব করতে লাগলাম।
কিন্তু আম্মু মোবাইল সব সময় তার কাছে রাখতেন। তাই ওগুলো দেখার সুযোগও আর থাকল না। যদিও ব্যাপারটা আমার জন্য ভালো হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হলো উলটোটা। আমি ইতোমধ্যে যা দেখেছি, সেগুলো কল্পনায় নিয়ে আসতাম। সেই দৃশ্যগুলো কল্পনা করার মাধ্যমে মাস্টারবেশন করতাম। ফলে মাস্টারবেশন করার জন্য সরাসরি বিকৃত ভিডিওগুলো আর দেখতে হতো না। এভাবে চলতে থাকল দিন। ফ্যান্টাসি, মাস্টারবেশন কিছুই থেমে থাকল না।
দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট হলো। ভালো ছাত্র ছিলাম, বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন বা স্কুলের শিক্ষকরা আশা করেছিলেন আমি জিপিএ ৫ পাব; কিন্তু সবাইকে হতাশ করে রেজাল্ট এলো ৪.৫০। অবস্থা বেশ বেগতিক হয়ে পড়ল। এত ভালো একটা ছাত্রের এ রকম খারাপ রেজাল্ট কেউ মেনে নিতে পারবে না-এটাই স্বাভাবিক। এবার আম্মু মুখ খুললেন। আজও কানে ভাসছে সেদিনের কথাগুলো—‘পড়ালেখা না করে সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে ছিলি না! ন্যাংটা মেয়েগুলোর ছবি দেখতি না বাথরুমে গিয়ে! যাহ, এই নে মোবাইল। আরও দেখ গিয়ে! আমার সাথে আর কথা বলবি না। জাহান্নামে যা বেয়াদব।’
মায়ের এই রাগ স্বাভাবিক ছিল। যেহেতু রোল এক ছিল, আব্বু ভাবতেন আমি খুব পড়ুয়া ছেলে। রেজাল্ট নিঃসন্দেহে ভালো হবে; কিন্তু রেজাল্ট তো আর ভালো হয়নি। আম্মু আব্বুকে কীভাবে এই বাজে রেজাল্টের খবর দেবেন, তা নিয়ে রীতিমতো খুব টেনশনে ছিলেন। আমিও ভীষণ হতাশ ও দুঃখিত ছিলাম। মনে মনে স্থির করলাম, ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করা ছেড়ে দেবো। ভালো হয়ে যাব। যেভাবেই হোক পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতেই হবে।
এরপর প্রায় দুই মাস এগুলো থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলাম। শুধু জিদের বসে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত এত ফলপ্রসূ হয়েছিল। মূলত এই নোংরা কাজ থেকে মুক্তি পেতে একটা জেদ অনেক সাহায্য করে। নামাজ পড়তে শুরু করেছিলাম নিয়মিত। আমার সাথে আম্মুর আচরণও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
কিন্তু একদিন...
টিভিতে একটা মুভি দেখছিলাম। একপর্যায়ে খারাপ একটা দৃশ্য চলে আসে। আমি সামান্য এই দৃশ্যও সহ্য করতে পারলাম না। এতটুকুতেই উত্তেজিত হয়ে সোজা বাথরুমে গিয়ে মাস্টারবেশন করে ফেললাম। আর এরপর আবারও সেই অনুশোচনা। এ কী করলাম আমি! মনে মনে আবারও প্রতিজ্ঞা করি, 'আর নাহ! এটাই শেষবার।'
কিন্তু শেষবার হওয়াটা এতই সহজ? তার পরদিন আবারও মাস্টারবেশন। টাইটানিক সিনেমার সেই অশ্লীল দৃশ্য মাথায় ঘুরঘুর করছিল। এভাবে করে পর্নোগ্রাফির অশরীরী প্রেতাত্মা আবারও আমার ঘাড়ে চেপে বসল।
আবারও মাস্টারবেশনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। নিয়মিত অপরাধবোধে ভুগতাম। আর নিয়মিতই প্রতিজ্ঞা করতাম-এই শেষ; আর করব না। আমার এই পচে যাওয়া কারও চোখে পড়েনি। ততদিনে মাও বিশ্বাস করা শুরু করেছিলেন। ফলে আরও অবারিত সুযোগ। আমি ইউটিউবে পড়া দেখব বলে মোবাইল নিয়ে ডুব দিতাম নোংরা জগতে। বিকৃত ভিডিওগুলোতে যা দেখতাম, সেগুলো ক্যাশ করে মোবাইল মায়ের হাতে দিয়ে কিছুক্ষণ পরে বাথরুমে যেতাম, যাতে বুঝতে না পারে।
অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন আমাকে উত্তেজিত করার জন্য একটা চুম্বন দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি আরও বিকৃতমনা হয় গেলাম। হরেক রকম স্টাইল কিংবা এক্সট্রিম কিছু ছাড়া আমার জমত না। এভাবেই পার হতে থাকল দিন। আর আমি পরিণত হচ্ছিলাম আস্ত এক পশুতে।
এভাবেই পার হয়ে গেল আরও দুই বছর। এসএসসি পরীক্ষার বাকি আর তিন মাস। তখন জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলের কথা স্মরণ হওয়ায় অনেক বেশি ধার্মিক হয়ে উঠি। হেব্বি পড়াশোনা শুরু করে দিই। জঘন্য কাজগুলোও বন্ধ করি। এই রেশ ছিল রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত। রেজাল্ট বেরোল। এবার জিপিএ ৫.০০ পেলাম। সবাই খুশিতে আত্মহারা। আব্বু ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা তোমার কী লাগবে? তা যদি চাঁদও হয়, আমি এনে দেবো।' আমার ল্যাপটপ কেনার ইচ্ছে ছিল। আমতা আমতা করে সেটা বলে ফেললাম। এর ঠিক এক মাস পর চাঁদ তথা ল্যাপটপ এসে হাজির। এরপর শহরে চলে যাই পড়াশোনার জন্য।
শহরে গিয়ে মেসে উঠি। ওয়াই-ফাইয়ের সাথে বই মারফত পূর্ব পরিচিতি থাকলেও এবার প্র্যাকটিক্যালি পরিচিত হই। একাই একটা রুম নিয়ে নিই। ফেসবুকে একটি মুভিসংশ্লিষ্ট গ্রুপের সাথে যুক্ত হই। এবার আমার মুভি দেখার নতুন আসক্তি শুরু হয়। যেকোনো মুভিতেই এখন ছোটোখাটো যৌন দৃশ্য থাকে। আর এগুলাই আমার জন্য কাল হলো। প্রায় পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর আবারও পুনঃঅবনতি ঘটে আমার।
পর্নোগ্রাফি দেখলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন আর আমি ভালো রেজাল্ট করতে পারব না, এই ভয়ে বেশ কিছুদিন এই জঘন্য কাজ হতে নিজেকে বিরত রেখেছিলাম। কিন্তু আমি আবারও অকৃতজ্ঞ হলাম। আনলিমিটেড ইন্টারনেট পাওয়ায় আবারও বিষাক্ত নীল দুনিয়ায় ডুব দিলাম। এবার আর আগের মতো অনুশোচনা হলো না। প্রায় প্রতিদিনই গোসলের আগে নোংরা ভিডিওগুলো দেখতাম ও মাস্টারবেশন করতাম। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটা চলে।
ইতোমধ্যে লক্ষ করি, আমার নাইট ইমিশন হচ্ছে না। হঠাৎ নিজেকে নিয়ে চিন্তা শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার শারীরিক অবনতি টের পাই। কিন্তু ততদিনে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা খুইয়ে বসেছি। না চাইলেও খানিক সময়ের জন্য হলেও জানোয়ারে পরিণত হতাম। দেখা গেল, কয়েক সেকেন্ডেই আমার বীর্যপাত হয়ে যায়।
(নাইট ইমিশন; আমরা একে স্বপ্নদোষ বলে জানি। আদতে এটা দোষের কিছু নয়। ছেলেদের আল্লাহ প্রদত্ত অন্যতম একটি নিয়ামত এই নাইট ইমিশন। অবিবাহিত কারও নিয়মিত নাইট ইমিশন সুস্থ যৌন স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয়।)
এসব সমস্যার কথা কাউকে যে বলব, এমন কেউই ছিল না। বাস্তবিকভাবে আমার স্কুলের সব বন্ধুই খুব ভালো ছিল। কথায়, চালচলনে তাদের খুঁত ধরা ছিল অসম্ভব। বাহ্যিকভাবে যতটুকু দেখেছি, তারা ছিল পারফেক্ট। সুতরাং তাদের সাথে একসাথে বসে এই নোংরা ভিডিওগুলো দেখা সম্ভব ছিল না। কেউ এসব দেখে বলে জানতামও না। অফলাইন দুনিয়ায় আমি বড়োই ভদ্রসদ্র এক ছেলে; ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানি না। পাড়ায়, আত্মীয়স্বজন, সর্বমহলে ভদ্র ছেলে হিসেবে আমার ব্যাপক সুখ্যাতি আছে। কিন্তু স্ক্রিনের সামনে এলেই আমি খুব বেহায়া, বেশরম হয়ে পড়তাম।
নিজের শারীরিক, মানসিক অবনতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমি আর আমি নেই; নিকৃষ্ট এক পশুতে পরিণত হয়েছি।
করে চেয়েছিলাম, এই ভয়াল চক্র থেকে যেন মুক্তি পাই। স্ক্রিনের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে কাটাতে পারলেও বাস্তবে কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে পারতাম না। কারণ, স্ক্রিনের বাইরের দুনিয়ায় আমি ছিলাম খুবই লাজুক একটা ছেলে। সব সময় মাথায় কাজ করত-পাছে লোকে কিছু ভাবে কিনা! আদতে আমি ছিলাম ভদ্র মুখোশ পরা এক আস্ত পশু! নিজের এই বিপরীতমুখী আচরণে নিজেকে ভণ্ড, জাল মনে হতো। মানসিক যাতনা বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশি। খুব করে এই জাল থেকে মুক্তি চাইছিলাম; তা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।
ঠিক এ সময় মেসে একটা নতুন ছেলে আসে। বেশ নম্র, ভদ্র ও ধার্মিক। ভেতরে-বাইরে সাদা ও ভালো মনের এই ছেলেটি বেশ মিশুক ছিল। ফলে অল্পদিনেই আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একদিন আমাকে কী বুঝে সে একটি বই দেয়। সূচিপত্র দেখে বুঝে যাই, এতে হয়তো আমার মেডিসিন থাকতে পারে।
খুব দ্রুত পুরো বইটি শেষ করি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার প্রেসক্রিপশন পেয়ে যাই। পর্নোগ্রাফি কেন ছাড়ব? এই একটি প্রশ্ন বিগত কিছুদিন ধরে নিজেকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি। 'কিন্তু যে কোটি কোটি স্পার্ম আমার হারাম কামনার কবলে পড়ে শেষ হয়ে গেল, সেগুলো থেকে তো অগণিত ভ্রূণ সৃষ্টি হতে পারত, তার হিসাব কি দেওয়া সম্ভব?' এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিজেকে করা হয়নি।
অন্তরে আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার প্রচণ্ড ভয় ঢুকে গেল। আমার সেই বন্ধুর সঙ্গে বেশি বেশি সময় কাটাতে শুরু করলাম। তাকে অনুরোধ করলাম আমার রুমে চলে আসার। এতে জঘন্য কাজ থেকে দূরে থাকা সহজ হবে।
সেও চলে আসে। সে আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাত। আমিও অনলাইনে টুকটাক ইসলাম নিয়ে পড়াশোনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। পর্নোগ্রাফি নামক টক্সিকের বিরুদ্ধে টনিক হিসেবে কাজ করেছিল কিছু কুরআনের আয়াত ও নবিজির হাদিস। যেমন- 'তোমরা অশ্লীলতার ধারে কাছেও যেয়ো না।' তারপর অশ্লীলতা থেকে ইউসুফ (আ.)-এর পালিয়ে বাঁচাতে দৌড়ে যাওয়া, এক সাহাবির ঘটনা, যিনি গোসলরত এক মহিলাকে দেখার পর যে উপায়ে অনুশোচনা করে সেই ঘটনা... আরও অনেক। আরও একটি হাদিসের কথা মনে পড়ছে। যেখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-'তোমার যদি লজ্জা না থাকে, তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।'
নামাজ শেষে মোনাজাতে পুরোটা সময়জুড়ে এতদিনের কৃত পাপের ক্ষমা চাইতাম। কিছু টেকনিকও অনুসরণ করতাম। যেমন: খুব ভোরে অর্থাৎ ফজর নামাজ আদায় শেষেই গোসল সেরে নিতাম। সব সময় অজু অবস্থায় থাকতাম, যেন ভেতরে পবিত্র অনুভব করতে পারি। কামভাব জাগলে প্রস্রাব করে ফেলতাম, এখনও করি। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কিনা জানি না, কিন্তু এটা খুবই কার্যকর ছিল।
নতুন করে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করলাম। বাইরে ঘোরাঘুরিতে আমার প্রচুর এলার্জي ছিল। যে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা, বাইরের আলোকিত জীবন তার কী আর ভালো লাগার কথা? তাই অনেকটা নিজের সাথে জোর খাটিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার অভ্যাস করি।
মুভিতে ব্যাপকহারে আসক্ত ছিলাম। এটা কোনোক্রমেই ছাড়তে পারছিলাম না। তাই প্রথমে মুভি রিলেটেড গ্রুপ থেকে বের হই। গুগল করে পিজি ১৩ মুভির লিস্ট বের করি। এমন নয় যে, এগুলোতে মডেলরা হিজাব পরিধান করত। তবে আমি অতিমাত্রায় আসক্ত ছিলাম। আগেই বলেছি, আমার চাহিদা ছিল অধিক জঘন্য কিছু (কারণ, আমি এক্সট্রিম পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম)। তাই একটা চুম্বন দৃশ্য আমাকে উত্তেজিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
তবুও একা একা মুভি দেখতাম না। এমনভাবে দেখতাম, যেন সবাই দেখে যে আমি কী দেখছি। নিজের কাছে টাচস্ক্রিন ফোন রাখি না। মায়ের ফোনটা অবশ্য প্রায়ই নিই, তবে সেটা ফেসবুকিং করার জন্য।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি বেশ। আজ প্রায় তিন বছর পূর্ণ হতে চলল পর্নোগ্রাফি ও মাস্টারবেশনমুক্ত সুস্থ জীবনের। আমার স্বাভাবিক নাইট ইমিশন হচ্ছে এখন। অন্তিম নিশ্বাস পর্যন্ত এভাবেই চলুক, এটাই কামনা।
১২ বছর বয়সি মোটামুটি রক্ষণশীল পরিবারের কোনো কিশোরকে যদি কেউ পর্নোগ্রাফি দেখায়, তবে তার প্রতিক্রিয়া হবে—‘তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! এসব কী বিচ্ছিরি! ওয়াক থু!’ প্রথমবার ওসব দেখার সময় আমার প্রতিক্রিয়া ঠিক এমনই ছিল। পাড়ার এক বড়ো ভাই আমাকে এই নোংরা ভিডিও দেখিয়েছিল। পেশায় তিনি ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রী। যখনকার কথা বলছি, তখন ছিল দ্বিতীয় মোবাইলের জামানা।
২০১৩ সালের কথা। ১৩ বছর বয়সি আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। সে সময় সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না। আমার বয়সি কিছু ছেলে দ্বিতীয় মোবাইল ব্যবহার করত। তবে ওরা পাড়ায় ও স্কুলে পরিচিত ছিল বেয়াদব নামে। ওই ছেলেদের একদিন দেখি স্কুলের টয়লেটের দরজায় লেখা একটা ইংরেজি শব্দ নিয়ে খুব হাসাহাসি করছে। এর মর্মার্থ আমি সেদিন বুঝতে পারিনি।
সেখানে আরও একটা শব্দ পাশাপাশি লেখা ছিল। ছোটো পকেট ডিকশনারিতে অনেক খুঁজেও এটি পেলাম না। স্যারকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। স্যার একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন আমার প্রশ্ন শুনে। তিনি বললেন, 'এটা কোথায় পেয়েছ?' আমি বললাম- 'টয়লেটের দরজায়।' স্যার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেলেন। এরপর হঠাৎ একদিন দেখি দরজায় নতুন রং করা হয়েছে। টয়লেটের দরজায় সেই লেখাটাও আর চোখে পড়েনি।
২০১৪ সালে আবারও টয়লেটে কিছু লেখা চোখে পড়ল। আগের শব্দগুলো তো ছিলই, সাথে নতুন কিছু শব্দ যোগ হয়েছিল। ততদিনে আমি ইন্টারনেটের সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। আব্বু বিদেশ থেকে একটি টাচস্ক্রিন ফোন পাঠিয়েছিলেন ঘরে ব্যবহারের জন্য। আম্মু মোবাইল খুব একটা ব্যবহার করতেন না। এ কারণে আমার কাছেই ফোনটা থাকত।
স্কুলের টয়লেটে দেখা শব্দগুলো এবার আর কাউকে জিজ্ঞেস না করে ডাইরেক্ট গুগল করি। রেজাল্টে যা এলো, আমার চোখ এক্কেবারে কপালে। দেখামাত্রই অপরাধবোধ ও উত্তেজনা একই সরলরেখায় চলা শুরু করেছিল। এখনও ওই ভয়াবহ অনুভূতিটা স্মরণ করতে পারি। ছি!
আমি কিছুটা হলেও ধার্মিক ছিলাম। মানে দৈনিক তিন-চার ওয়াক্ত নামাজ পড়া হতো। কিন্তু সেদিন আমার উত্তেজনা অপরাধবোধকে ছাপিয়ে গেল। আর এগোয়নি। এরপর থেকেই ওসব দেখার শুরু। গোপনে, একটু সংযতভাবে বিচরণ করতে থাকলাম এই জগতে। মাস্টারবেশনও শুরু করলাম। এটা চলত রুটিনমাফিক। নিয়মিত রুটিন ছিল সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন। বিকৃত এই ভিডিওগুলো দেখা ও মাস্টারবেশন; যুগপভাবে।
প্রায় ছয় মাস চলেছিল এ রকম। কিছু টাকা জমিয়ে মেমোরি কার্ড কিনলাম। এরপর দোকানে গিয়ে কার্ডভর্তি ভিডিও লোড করে আনলাম। যখন দেখতে ইচ্ছে হতো, মেমোরি ঢুকিয়ে নিতাম ফোনে। ইন্টারনেটে সরাসরি দেখে সুবিধা হচ্ছিল না বিভিন্ন কারণে।
একদিন বাথরুমে ফোন নিয়ে গেলাম এই উদ্দেশ্যে। হঠাৎ রিংটোন বেজে উঠলে তা আম্মুর কর্ণগোচর হলো। বাথরুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তিনি জেরা করা শুরু করলেন। বাথরুমে ফোনের কী কাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি আমতা আমতা করে বললাম, 'পকেটে ছিল, খেয়াল করিনি।' সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও আম্মুর মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল।
আরেক দিন বাথরুমে থাকাকালীন সময় ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। সেদিন খালা বেড়াতে এসেছিলেন। মা হয়তো খেয়াল করেছিল, কিন্তু আমাকে কিছু বলেননি। এরপর গোসল সেরে বের হওয়ার পর খালা আমাকে ডেকে এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি ঠিক এ রকমই বলেছিলেন—'আব্বু, এই বয়সটায় খুবই খারাপ সময় পার করতে হয়। মোবাইল একটু কম ঘাঁটাঘাঁটি করিস। খারাপ ছেলেদের সাথে মেলামেশা করিস না, আজেবাজে ভিডিও দেখিস না। তুই ভালো ছেলে, ভালো ছেলের মতো চলবি।' আমি কোনোভাবে পাশ কাটিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। মূলত আমি ফোন থেকে মেমোরি কার্ড সরাতে ভুলে গিয়েছিলাম। ফলে পুরো ব্যাপারটাই খালা আর আম্মু ধরে ফেলেছিলেন!
এদিকে জেসএসি পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছিল। তাই ওসব দেখার ভূত মাথা থেকে কিছুদিনের জন্য চলে গেল। ভেবেছিলাম এবার বোধহয় এই নেশা থেকে নিস্তার পাব, কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক যেতে না যেতেই আবারও ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করার তাড়না অনুভব করতে লাগলাম।
কিন্তু আম্মু মোবাইল সব সময় তার কাছে রাখতেন। তাই ওগুলো দেখার সুযোগও আর থাকল না। যদিও ব্যাপারটা আমার জন্য ভালো হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হলো উলটোটা। আমি ইতোমধ্যে যা দেখেছি, সেগুলো কল্পনায় নিয়ে আসতাম। সেই দৃশ্যগুলো কল্পনা করার মাধ্যমে মাস্টারবেশন করতাম। ফলে মাস্টারবেশন করার জন্য সরাসরি বিকৃত ভিডিওগুলো আর দেখতে হতো না। এভাবে চলতে থাকল দিন। ফ্যান্টাসি, মাস্টারবেশন কিছুই থেমে থাকল না।
দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট হলো। ভালো ছাত্র ছিলাম, বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন বা স্কুলের শিক্ষকরা আশা করেছিলেন আমি জিপিএ ৫ পাব; কিন্তু সবাইকে হতাশ করে রেজাল্ট এলো ৪.৫০। অবস্থা বেশ বেগতিক হয়ে পড়ল। এত ভালো একটা ছাত্রের এ রকম খারাপ রেজাল্ট কেউ মেনে নিতে পারবে না-এটাই স্বাভাবিক। এবার আম্মু মুখ খুললেন। আজও কানে ভাসছে সেদিনের কথাগুলো—‘পড়ালেখা না করে সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে ছিলি না! ন্যাংটা মেয়েগুলোর ছবি দেখতি না বাথরুমে গিয়ে! যাহ, এই নে মোবাইল। আরও দেখ গিয়ে! আমার সাথে আর কথা বলবি না। জাহান্নামে যা বেয়াদব।’
মায়ের এই রাগ স্বাভাবিক ছিল। যেহেতু রোল এক ছিল, আব্বু ভাবতেন আমি খুব পড়ুয়া ছেলে। রেজাল্ট নিঃসন্দেহে ভালো হবে; কিন্তু রেজাল্ট তো আর ভালো হয়নি। আম্মু আব্বুকে কীভাবে এই বাজে রেজাল্টের খবর দেবেন, তা নিয়ে রীতিমতো খুব টেনশনে ছিলেন। আমিও ভীষণ হতাশ ও দুঃখিত ছিলাম। মনে মনে স্থির করলাম, ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করা ছেড়ে দেবো। ভালো হয়ে যাব। যেভাবেই হোক পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতেই হবে।
এরপর প্রায় দুই মাস এগুলো থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলাম। শুধু জিদের বসে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত এত ফলপ্রসূ হয়েছিল। মূলত এই নোংরা কাজ থেকে মুক্তি পেতে একটা জেদ অনেক সাহায্য করে। নামাজ পড়তে শুরু করেছিলাম নিয়মিত। আমার সাথে আম্মুর আচরণও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
কিন্তু একদিন...
টিভিতে একটা মুভি দেখছিলাম। একপর্যায়ে খারাপ একটা দৃশ্য চলে আসে। আমি সামান্য এই দৃশ্যও সহ্য করতে পারলাম না। এতটুকুতেই উত্তেজিত হয়ে সোজা বাথরুমে গিয়ে মাস্টারবেশন করে ফেললাম। আর এরপর আবারও সেই অনুশোচনা। এ কী করলাম আমি! মনে মনে আবারও প্রতিজ্ঞা করি, 'আর নাহ! এটাই শেষবার।'
কিন্তু শেষবার হওয়াটা এতই সহজ? তার পরদিন আবারও মাস্টারবেশন। টাইটানিক সিনেমার সেই অশ্লীল দৃশ্য মাথায় ঘুরঘুর করছিল। এভাবে করে পর্নোগ্রাফির অশরীরী প্রেতাত্মা আবারও আমার ঘাড়ে চেপে বসল।
আবারও মাস্টারবেশনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। নিয়মিত অপরাধবোধে ভুগতাম। আর নিয়মিতই প্রতিজ্ঞা করতাম-এই শেষ; আর করব না। আমার এই পচে যাওয়া কারও চোখে পড়েনি। ততদিনে মাও বিশ্বাস করা শুরু করেছিলেন। ফলে আরও অবারিত সুযোগ। আমি ইউটিউবে পড়া দেখব বলে মোবাইল নিয়ে ডুব দিতাম নোংরা জগতে। বিকৃত ভিডিওগুলোতে যা দেখতাম, সেগুলো ক্যাশ করে মোবাইল মায়ের হাতে দিয়ে কিছুক্ষণ পরে বাথরুমে যেতাম, যাতে বুঝতে না পারে।
অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন আমাকে উত্তেজিত করার জন্য একটা চুম্বন দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি আরও বিকৃতমনা হয় গেলাম। হরেক রকম স্টাইল কিংবা এক্সট্রিম কিছু ছাড়া আমার জমত না। এভাবেই পার হতে থাকল দিন। আর আমি পরিণত হচ্ছিলাম আস্ত এক পশুতে।
এভাবেই পার হয়ে গেল আরও দুই বছর। এসএসসি পরীক্ষার বাকি আর তিন মাস। তখন জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলের কথা স্মরণ হওয়ায় অনেক বেশি ধার্মিক হয়ে উঠি। হেব্বি পড়াশোনা শুরু করে দিই। জঘন্য কাজগুলোও বন্ধ করি। এই রেশ ছিল রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত। রেজাল্ট বেরোল। এবার জিপিএ ৫.০০ পেলাম। সবাই খুশিতে আত্মহারা। আব্বু ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা তোমার কী লাগবে? তা যদি চাঁদও হয়, আমি এনে দেবো।' আমার ল্যাপটপ কেনার ইচ্ছে ছিল। আমতা আমতা করে সেটা বলে ফেললাম। এর ঠিক এক মাস পর চাঁদ তথা ল্যাপটপ এসে হাজির। এরপর শহরে চলে যাই পড়াশোনার জন্য।
শহরে গিয়ে মেসে উঠি। ওয়াই-ফাইয়ের সাথে বই মারফত পূর্ব পরিচিতি থাকলেও এবার প্র্যাকটিক্যালি পরিচিত হই। একাই একটা রুম নিয়ে নিই। ফেসবুকে একটি মুভিসংশ্লিষ্ট গ্রুপের সাথে যুক্ত হই। এবার আমার মুভি দেখার নতুন আসক্তি শুরু হয়। যেকোনো মুভিতেই এখন ছোটোখাটো যৌন দৃশ্য থাকে। আর এগুলাই আমার জন্য কাল হলো। প্রায় পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর আবারও পুনঃঅবনতি ঘটে আমার।
পর্নোগ্রাফি দেখলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন আর আমি ভালো রেজাল্ট করতে পারব না, এই ভয়ে বেশ কিছুদিন এই জঘন্য কাজ হতে নিজেকে বিরত রেখেছিলাম। কিন্তু আমি আবারও অকৃতজ্ঞ হলাম। আনলিমিটেড ইন্টারনেট পাওয়ায় আবারও বিষাক্ত নীল দুনিয়ায় ডুব দিলাম। এবার আর আগের মতো অনুশোচনা হলো না। প্রায় প্রতিদিনই গোসলের আগে নোংরা ভিডিওগুলো দেখতাম ও মাস্টারবেশন করতাম। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটা চলে।
ইতোমধ্যে লক্ষ করি, আমার নাইট ইমিশন হচ্ছে না। হঠাৎ নিজেকে নিয়ে চিন্তা শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার শারীরিক অবনতি টের পাই। কিন্তু ততদিনে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা খুইয়ে বসেছি। না চাইলেও খানিক সময়ের জন্য হলেও জানোয়ারে পরিণত হতাম। দেখা গেল, কয়েক সেকেন্ডেই আমার বীর্যপাত হয়ে যায়।
(নাইট ইমিশন; আমরা একে স্বপ্নদোষ বলে জানি। আদতে এটা দোষের কিছু নয়। ছেলেদের আল্লাহ প্রদত্ত অন্যতম একটি নিয়ামত এই নাইট ইমিশন। অবিবাহিত কারও নিয়মিত নাইট ইমিশন সুস্থ যৌন স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয়।)
এসব সমস্যার কথা কাউকে যে বলব, এমন কেউই ছিল না। বাস্তবিকভাবে আমার স্কুলের সব বন্ধুই খুব ভালো ছিল। কথায়, চালচলনে তাদের খুঁত ধরা ছিল অসম্ভব। বাহ্যিকভাবে যতটুকু দেখেছি, তারা ছিল পারফেক্ট। সুতরাং তাদের সাথে একসাথে বসে এই নোংরা ভিডিওগুলো দেখা সম্ভব ছিল না। কেউ এসব দেখে বলে জানতামও না। অফলাইন দুনিয়ায় আমি বড়োই ভদ্রসদ্র এক ছেলে; ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানি না। পাড়ায়, আত্মীয়স্বজন, সর্বমহলে ভদ্র ছেলে হিসেবে আমার ব্যাপক সুখ্যাতি আছে। কিন্তু স্ক্রিনের সামনে এলেই আমি খুব বেহায়া, বেশরম হয়ে পড়তাম।
নিজের শারীরিক, মানসিক অবনতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমি আর আমি নেই; নিকৃষ্ট এক পশুতে পরিণত হয়েছি।
করে চেয়েছিলাম, এই ভয়াল চক্র থেকে যেন মুক্তি পাই। স্ক্রিনের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে কাটাতে পারলেও বাস্তবে কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে পারতাম না। কারণ, স্ক্রিনের বাইরের দুনিয়ায় আমি ছিলাম খুবই লাজুক একটা ছেলে। সব সময় মাথায় কাজ করত-পাছে লোকে কিছু ভাবে কিনা! আদতে আমি ছিলাম ভদ্র মুখোশ পরা এক আস্ত পশু! নিজের এই বিপরীতমুখী আচরণে নিজেকে ভণ্ড, জাল মনে হতো। মানসিক যাতনা বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশি। খুব করে এই জাল থেকে মুক্তি চাইছিলাম; তা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।
ঠিক এ সময় মেসে একটা নতুন ছেলে আসে। বেশ নম্র, ভদ্র ও ধার্মিক। ভেতরে-বাইরে সাদা ও ভালো মনের এই ছেলেটি বেশ মিশুক ছিল। ফলে অল্পদিনেই আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একদিন আমাকে কী বুঝে সে একটি বই দেয়। সূচিপত্র দেখে বুঝে যাই, এতে হয়তো আমার মেডিসিন থাকতে পারে।
খুব দ্রুত পুরো বইটি শেষ করি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার প্রেসক্রিপশন পেয়ে যাই। পর্নোগ্রাফি কেন ছাড়ব? এই একটি প্রশ্ন বিগত কিছুদিন ধরে নিজেকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি। 'কিন্তু যে কোটি কোটি স্পার্ম আমার হারাম কামনার কবলে পড়ে শেষ হয়ে গেল, সেগুলো থেকে তো অগণিত ভ্রূণ সৃষ্টি হতে পারত, তার হিসাব কি দেওয়া সম্ভব?' এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিজেকে করা হয়নি।
অন্তরে আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার প্রচণ্ড ভয় ঢুকে গেল। আমার সেই বন্ধুর সঙ্গে বেশি বেশি সময় কাটাতে শুরু করলাম। তাকে অনুরোধ করলাম আমার রুমে চলে আসার। এতে জঘন্য কাজ থেকে দূরে থাকা সহজ হবে।
সেও চলে আসে। সে আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাত। আমিও অনলাইনে টুকটাক ইসলাম নিয়ে পড়াশোনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। পর্নোগ্রাফি নামক টক্সিকের বিরুদ্ধে টনিক হিসেবে কাজ করেছিল কিছু কুরআনের আয়াত ও নবিজির হাদিস। যেমন- 'তোমরা অশ্লীলতার ধারে কাছেও যেয়ো না।' তারপর অশ্লীলতা থেকে ইউসুফ (আ.)-এর পালিয়ে বাঁচাতে দৌড়ে যাওয়া, এক সাহাবির ঘটনা, যিনি গোসলরত এক মহিলাকে দেখার পর যে উপায়ে অনুশোচনা করে সেই ঘটনা... আরও অনেক। আরও একটি হাদিসের কথা মনে পড়ছে। যেখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-'তোমার যদি লজ্জা না থাকে, তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।'
নামাজ শেষে মোনাজাতে পুরোটা সময়জুড়ে এতদিনের কৃত পাপের ক্ষমা চাইতাম। কিছু টেকনিকও অনুসরণ করতাম। যেমন: খুব ভোরে অর্থাৎ ফজর নামাজ আদায় শেষেই গোসল সেরে নিতাম। সব সময় অজু অবস্থায় থাকতাম, যেন ভেতরে পবিত্র অনুভব করতে পারি। কামভাব জাগলে প্রস্রাব করে ফেলতাম, এখনও করি। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কিনা জানি না, কিন্তু এটা খুবই কার্যকর ছিল।
নতুন করে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করলাম। বাইরে ঘোরাঘুরিতে আমার প্রচুর এলার্জي ছিল। যে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা, বাইরের আলোকিত জীবন তার কী আর ভালো লাগার কথা? তাই অনেকটা নিজের সাথে জোর খাটিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার অভ্যাস করি।
মুভিতে ব্যাপকহারে আসক্ত ছিলাম। এটা কোনোক্রমেই ছাড়তে পারছিলাম না। তাই প্রথমে মুভি রিলেটেড গ্রুপ থেকে বের হই। গুগল করে পিজি ১৩ মুভির লিস্ট বের করি। এমন নয় যে, এগুলোতে মডেলরা হিজাব পরিধান করত। তবে আমি অতিমাত্রায় আসক্ত ছিলাম। আগেই বলেছি, আমার চাহিদা ছিল অধিক জঘন্য কিছু (কারণ, আমি এক্সট্রিম পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম)। তাই একটা চুম্বন দৃশ্য আমাকে উত্তেজিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
তবুও একা একা মুভি দেখতাম না। এমনভাবে দেখতাম, যেন সবাই দেখে যে আমি কী দেখছি। নিজের কাছে টাচস্ক্রিন ফোন রাখি না। মায়ের ফোনটা অবশ্য প্রায়ই নিই, তবে সেটা ফেসবুকিং করার জন্য।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি বেশ। আজ প্রায় তিন বছর পূর্ণ হতে চলল পর্নোগ্রাফি ও মাস্টারবেশনমুক্ত সুস্থ জীবনের। আমার স্বাভাবিক নাইট ইমিশন হচ্ছে এখন। অন্তিম নিশ্বাস পর্যন্ত এভাবেই চলুক, এটাই কামনা।