📘 নীল বিষ > 📄 নীল বিষের কবলে

📄 নীল বিষের কবলে


সময়কাল ২০১৬।

বছরটা ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। মোটামুটি ধার্মিক টাইপ আমি তখন মাত্রই দ্বীনের স্বাদ অনুভব করতে শুরু করেছি।

এমনিতে আমি চাপা ধরনের ছেলে। বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না টাইপের। ভেতরে কী চলছে, আমার মুখ দেখে কেউ বুঝতেও পারত না। এদিক দিয়ে অভিনয়টা বেশ ভালোই পারি। ভেতরে খুন হয়ে গেলেও বাইরে খুব সুন্দর হাসতে পারি।

আমার জন্ম ১৯৯৮-এর মাঝামাঝিতে। এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার বয়স ছিল ১৪। খুব ছোটো বয়সে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। ফলে দেখা যেত, অন্যান্য বন্ধুদের চেয়ে আমার ম্যাচুরিটি ছিল বেশ কম কিংবা মেয়েলি ব্যাপারগুলোতেও আমি ছিলাম অজ্ঞ। অনেক কিছুই বুঝতাম না তাদের আলোচনার। এর ফলে একটু দেরিতে পর্নোগ্রাফিতে অ্যাডিক্টেড হয়েছিলাম।

পর্নের হাতেখড়ি বাকি সবার মতোই। চাচাতো ভাই এসব দেখাত। সেখান থেকেই শুরু। আর মাস্টারবেট করা শিখেছি দুই বন্ধুর কাছে। বলা যায়, আমাদের ক্লাসের বেশিরভাগ ছেলেদের মাস্টারবেশনের ওস্তাদ তারা দুজন।

এসএসসি পর্যন্ত আমি বেশ ভদ্রই ছিলাম বলা চলে। নিজেরও স্মার্টফোন ছিল না আবার বন্ধুদের সঙ্গেও কখনো পর্নোগ্রাফির বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করিনি। সবাই আমাকে ভদ্র ও ভালো ছেলে হিসেবে জানত কি না? নিজের সুনাম খোয়ানোর ইচ্ছেও হয়নি কখনো। এসএসএসি-তে বেশ ভালো রেজাল্ট করলাম। উপহার হিসেবে ইন্টারমিডিয়েটে উঠার পর আমাকে অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে দেওয়া হলো।

অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল চালানো শুরু করার পর আমাকে আর পায় কে? আমি বেপরোয়া হয়ে গেলাম। দোকান থেকে মেমোরি কার্ডে ওসব জঘন্য ভিডিও ভর্তি করে আনতাম। দুটো মেমোরি কার্ড ছিল আমার। একটায় শুধু ওসবই ছিল। প্রতিমাসেই একবার লোড করে নিয়ে আসতাম।

এদিকে পড়াশোনা শিকেয় উঠল। সারাদিন মোবাইলে বুঁদ হয়ে টেপাটিপি করা আর ওসব দেখাই ছিল আমার মূল কাজ। এমনও হয়েছে, কোনো কোনোদিন আম্মা আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছেন আর আমি দিব্যি পাশে শুয়ে ওসব দেখে মাস্টারবেট করছি। এখন ভাবতেও ঘৃণা লাগে!

ভালো কিংবা খারাপই হোক, কিছু ঘটনা মনে থেকেই যায়। পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত এমন অনেক ঘটনাই আমি ভুলতে পারি না। এত জঘন্য সেসব স্মৃতি।

একদিন আমি ঘরের দরজা লাগিয়ে মাস্টারবেট করছিলাম। এমন সময় দাদি এসেছেন। দাদুবাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ-ছয় বাড়ি পার হয়ে। আমি দরজা না খুলে দাদির সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছিলাম আবার একই সঙ্গে মাস্টারবেটও চালিয়ে গিয়েছি। এখনও মনে পড়লে ঘৃণায় আমার শরীর শিউরে উঠে!!

পড়ার টেবিলে বসেও কত যে মাস্টারবেট করেছি-তার ইয়ত্তা নেই। দেখা গেল আমি মাস্টারবেট করছিলাম, ভুলে দরজা লাগাইনি। ঘরে আব্বু ঢুকে পড়েছেন। আমি লুঙ্গি দিয়ে যতটুকু পারা যায় আড়াল করে চালিয়ে গেছি; অথচ আব্বু তখনও ঘরে!

ইন্টারনেট আর অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল আমাকে তিলে তিলে শেষ করে ফেলছিল। গভীর রাত তো দূরের কথা, আসক্তি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, আমি সবার সামনে বসে ওসব দেখতাম। লজ্জা বলতে যে একটা জিনিস থাকা দরকার-সেটার কোনো ছিটেফোঁটাও আমার ভেতরে ছিল না। দিন-রাত ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকতাম। এমনও হয়েছে, নামাজে দাঁড়িয়েও (সচরাচর নামাজ পড়তাম না। মাঝেমধ্যে অনিয়মিতভাবে জুমার নামাজে যাওয়া হতো।) ওইসব নোংরা দৃশ্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। সিজদাতে গিয়েছি, তখনও একই অবস্থা। এত পরিমাণে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, শয়নে-স্বপনে শুধু ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো-এসব নিয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ততা ছিল না। আর থাকবেই-বা কেন? মুসলিম আচরণের ছিটেফোঁটাও তো আমার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না! আমি তখন চাবি দেওয়া একটা পুতুল, মানুষের পরিচয় ফেলে এসেছি অনেক পেছনে!

এভাবে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ভর্তি কোচিং করতে গেলাম ঢাকায়। উঠলাম কয়েকজন সিনিয়রের সঙ্গে। তারা ছিলেন সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দিনের বেলা ক্লাস শেষ করে নানান ঝামেলা মিটিয়ে মেসে ফিরতে রাত হয়ে যেত ভাইদের। বাসায় আমি সারাদিন একা। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। মফস্বলের লিমিটেড ইন্টারনেটের জগৎ থেকে এসে পড়েছি ওয়াই-ফাইয়ের আনলিমিটেড জগতে। সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকি।

এই সময় কীভাবে যেন ফেসবুকের নীল জগতের খোঁজ পেলাম। ফেইক আইডি খুলে আঁটসাঁট বেঁধে প্রবেশ করলাম সেখানে। ফেসবুককে তো আমরা খুব ভালো চোখে দেখি। কিন্তু আমরা কি জানি-ফেসবুকে দ্বীনি সার্কেল যেমনটা অ্যাভেইলেবল, খারাপ সার্কেল এর চেয়েও বেশি হাতের নাগালে? এমন হাজারো প্রাইভেট গ্রুপ আছে, যেগুলো খোলার উদ্দেশ্যই শুধু পর্ন আদান-প্রদান করা। এমন অজস্র প্রোফাইল আছে, যাদের কাজই হচ্ছে নানান ভিডিও বানিয়ে আপলোড করা। গ্রুপগুলোয় ম্যাসেজ দিয়ে উলটাপালটা কথাবার্তার বিনিময় হতো। ভিডিও আদান-প্রদান হতো। যৌনসঙ্গী খোঁজার এক অদ্ভুত এবং সহজ উপায়ও ছিল এই গ্রুপগুলো।

টুইটারের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ফেসবুকে নগ্নতা ইত্যাদি কেউ পোস্ট করতে পারে না। কিন্তু টুইটারে এই রকম কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। টুইটার যেন নিজেই একটা পর্নসাইট।

পর্নসাইট, টুইটার, ফেসবুকের বিষাক্ত দুনিয়ায় ডুবে গেলাম পুরোপুরিভাবে। সারাদিনের একাকিত্ব কাটাতাম ওসব দেখে দেখে। সাথে মাস্টারবেশন তো মাস্ট। ফলে পড়াশোনা শিকেয় উঠল। ভর্তি পরীক্ষার সময়টা কাজে লাগাতে পারলাম না। ফলাফল? মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে পারলাম না। খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। হতাশা কাটানোর জন্য আরও বেশি বেশি পর্ন ভিডিও দেখা শুরু করলাম। স্বাভাবিকভাবেই মাস্টারবেশনের পরিমাণও বেড়ে গেল।

এত বেশি মাস্টারবেশনের পরিণাম হলো ভয়াবহ। শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। দুর্বল হয়ে গেলাম। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যেতাম। জার্নি সিকনেস তৈরি হলো। রাতের ঘুমের বারোটা বেজে গেল। গ্যাস্ট্রিকের আধার বানালাম নিজেকে। এভাবেই কাটতে থাকল দিন।

২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। র‍্যাগিং ও বন্ধুদের উলটাপালটা কথাবার্তা সেক্সুয়্যাল ফ্যান্টাসিকে চরমে নিয়ে গেল। একদিনে চারবার পর্যন্ত মাস্টারবেশন করেছি। শরীরের যা হাল করেছিলাম, এখনও ভাবলে লজ্জা লাগে, কষ্টও লাগে।

যাহোক, এর মাঝেই মরুভূমির জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো কয়েকজন ভালো সিনিয়র ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো। কিছু ভালো বন্ধুর সঙ্গেও মেশা শুরু করলাম। তাদের সংস্পর্শে এসে নিজের বিশ্বাসকে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করলাম। নিজেকে মুসলিম বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত হলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তখনও আমি যেন এক বন্য অমানুষ! গোপন পাপকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণই করতে পারছিলাম না। কত যে কান্নাকাটি করেছি, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। দুই দিন কষ্ট করে থাকি তো পরের দিন আবার দেখে ফেলি। মাস্টারবেশনও হয়ে যায়। এরপর আবারও হতাশা চলে আসত। হতাশার সাথে সাথে ফিরে আসত পর্নোগ্রাফির সেই জগৎটাও!!

বাথরুম আমার কাছে এক বীভৎসতার অন্য নাম। গোসল ছিল পাপে লিপ্ত হওয়ার মোক্ষম সময়। গোসলে গেলেই মাস্টারবেশন করে ফেলতাম! থামাতেই পারতাম না। সময়টা ছিল আমার জন্য অতলে ডুবে যাওয়ার সময়। যে অতল গহ্বরের কথা মনে পড়লে আজও শিউরে উঠি!

কিন্তু এই ২০১৬ সালটাই আমার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। অতল গহ্বরে এনে দিয়েছিল আলোর রেখা। এই বছরেই আমি অন্ধকার সেই নীল জগৎ থেকে বের হতে পেরেছিলাম।

একদিন এক ভাইয়ের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে চা খাচ্ছি। তিনি খট করে আমাকে খুবই অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসলেন। প্রশ্নটা হলো-আমি পর্নোগ্রাফি দেখি কিনা? প্রশ্নটা শুনেই ঝিম ধরে থাকলাম। কিছুই বললাম না। বলবই-বা কীভাবে? এতদিনে লড়তে লড়তে আমি পরিশ্রান্ত। প্রাণপণ সাঁতার কেটেও কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না। খড়কুটো হলেও কিছু একটার আশ্রয় চাচ্ছিলাম, যেন কোনোক্রমে বেঁচে যাই। জানেনই তো, ডুবন্ত ব্যক্তি খড়কুটো আঁকড়ে ধরে হলেও বাঁচতে চায়।

ঠিক অমন একটা সময়ে আমাকে তিনি এই প্রশ্নটা করেছিলেন। প্রশ্নটা শোনার পর মনে হলো—আমি তো এই দিনটার অপেক্ষাতেই ছিলাম। খুব করে চেয়েছিলাম, কেউ একজন আমার গল্পটা শুনুক। পথ বাতলে দিক। এতদিন ধরে বুকের ভেতরে জেঁকে বসা পাথরটা সরানোর জন্য কেউ আমার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিক।

আমার মৌনতাকেই তিনি সম্মতি হিসেবে ধরে নিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমিও একসময় দেখতাম।' পরিবেশ সহজ করার জন্য হেসে হেসে তার ওই অবস্থার কিছু বর্ণনাও দিলেন।

আমি তখন খুব বেশি বাজে অবস্থায় ছিলাম। সামান্য কোনো ঘটনা (যেমন : চুম্বন) আমার কামভাব জাগ্রত করতে পারত না। সারাদিন পর্ন দেখলে যা হয় আর কী!!

প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে নিয়মিত নামাজ পড়ছি। দ্বীনের বুঝ আসতে শুরু করেছে। কিন্তু ওসব ছাড়তে পারিনি। অনুতপ্ততা যে কম, তাও না। ইন্টারনেট ও মোবাইলের জন্য পারছিলাম না দূরে থাকতে। কোনো না কোনোভাবে সুযোগ পেলেই ওসব দেখি; হোক তা রাতের অন্ধকারে কিংবা দিনের আলোতে।

মূলত সে সময় আমার মনোবল অতটা চাঙ্গা ছিল না। বন্যার তোড়ে ভেঙে যাওয়া নদীর পাড়ের মতো ছিলাম আমি। অল্প স্রোত এসে মাটিকে টেনে নিয়ে নদীর গর্তে ফেলে দিত। কত চেষ্টা করছিলাম এসব নোংরামো থেকে দূরে থাকার, কিন্তু হচ্ছিল না।

ভাইয়ের আলাপ আমাকে যেন আবার জীবনীশক্তি দিলো। তৎক্ষণাৎ সব শেয়ার করলাম ভাইয়ের সঙ্গে। সেদিন যদি সব শেয়ার না করতাম, তবে আমি আজও হয়তো সেই নীল অক্টোপাসের জালে বন্দি থাকতাম। ভাই সব শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। নীরবতা ভেঙে বললেন, 'তোমার কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি।' ভাইয়ের কণ্ঠে আন্তরিকতা ও আবেগ যেন ঠিকরে পড়ছিল। সেই আবেগ স্পর্শ করল আমাকেও!!

ভাই তখনও বলে চলেছেন তার জীবনের অন্ধকার সময়ের গল্প— 'আমিও তোমার মতোই আসক্ত ছিলাম। হয়তো-বা এক্সট্রিম কিছু দেখতাম না। সে সময় এত সুযোগ ছিল না। একা চেষ্টা করে আমি এ থেকে বেরোতে পারিনি। কারণ, অতল সাগরে ডুব দেওয়ার পর কারও সাহায্য ছাড়া ওপরে উঠে আসা খুব কঠিন। আমি যদি তোমাকে সাহায্য করতে চাই এবং এ ব্যাপারে কোনো কিছুতে জোর করি, তুমি কি তা মানবে?'

ভাইয়ের কণ্ঠের জোর এতটাই বেশি ছিল যে, আমি সাথে সাথেই বলেছিলাম, 'পারব ভাই।'

ওই রেস্টুরেন্টেই ভাই আমার অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলটা নিয়ে নিয়েছিলেন। একটা সাধারণ মোবাইল আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, 'আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমার ইশারা বুঝতে পারছ। আমি আজ থেকে ঠিক ছয় মাস পর তোমাকে মোবাইলটা ফেরত দেবো। তোমার মেসের সবাইকে বলে দেবো, যেন তারা তোমাকে তাদের মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ একা ছেড়ে না দেয়। তোমার প্রতিও অনুরোধ, অনলাইনে কোনো কাজ থাকলে তাদের সামনে বসে করার। নিজের দায়িত্ব পালনের স্বার্থে ঘরে একা কখনোই বসে না থেকে মানুষের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করো। কারও সঙ্গে মিশতে ভালো না লাগলে একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াও। নানান রকম লোকজনের আচার-আচরণ পরখ করো। তাও যেন একা ঘরে বসে থাকতে না দেখি বা শুনি। কাজ নাই, কী করব? এটা বলতে যেন না শুনি।'

ভাইয়ের কথাগুলো আমার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত ছিল। হ্যাঁ, আমার প্রথম কয়েকদিন খুবই কষ্ট হয়েছিল। এমনও হয়েছে, রাতে ঘুমোতেই পারছিলাম না, আমার মোবাইল নেই এই দুঃখে। ভাইকে গালিগালাজ যে কম করেছি, তাও না।

যে আমি চব্বিশ ঘণ্টা মোবাইল হাতে নিয়ে থাকতাম, তার এখন একটা সাধারণ দায়সারাবার মতো মোবাইল। কথাবার্তা ও বার্তা আদান-প্রদান ব্যতীত কিছুই করা যেত না। তাহলে সময় কীভাবে কাটাব আমি?

ভাইয়ের কথা অনুযায়ী হয় মানুষের সঙ্গে মিশব, না হয় রাস্তায় ঘুরে বেড়াব।

আমি এই দুইটার সঙ্গে আরেকটা বিষয় যুক্ত করেছিলাম-বই পড়া। অর্থাৎ, আমি তিনটি কাজ করব : বই পড়ব, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব এবং মানুষের সঙ্গে মিশব।

ঘরকুনো আমি আর ঘরকুনো থাকলাম না। রাস্তার ফকির থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা সবার সঙ্গেই কথা বলতাম। আর নানান উদ্ভট পরীক্ষা করে বেড়াতাম। সবই সময় কাটানোর ধান্দায়।

যেমন-কয়েকদিন মাস্টারবেট না করেই নিজেকে সাধু মনে হতে লাগল। অর্থাৎ আমি ভালো ও নিষ্পাপ হয়ে গেছি টাইপ ফিলিংস কাজ করে মাথায়।

অনেককে মনে মনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা শুরু করলাম। অহংকার এলো নিজের মধ্যে। ব্যাপারটা একদিন ধরতে পারলাম। এখন অহংকার দূর করা যাবে কিভাবে? ভালো একটা উপায় মাথায় এলো। টয়লেট পরিষ্কারের কাজকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজের একটা ধরা হয়। সে হিসেবে নিকৃষ্ট কেউ এই কাজ করে। যেই ভাবা সেই কাজ। লেগে পড়লাম। বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়র যার মেসেই যেতাম, তাদের অজান্তেই টয়লেট পরিষ্কার করে দিয়ে আসতাম। আলহামদুলিল্লাহ, এই পদ্ধতি বেশ কাজের ছিল।

এরপর দেখলাম, আমি দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারছি না। অথচ আমার চেয়ে পিচ্চি পিচ্চি ছেলে-মেয়েরা ডাস্টবিনে খাবার খোঁজে কিংবা প্লাস্টিক আলাদা করে জমা করে। সব দুর্গন্ধময় জিনিস। পরে নিয়ম করে সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ট্রাকের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, নির্দিষ্ট রিদম মেনে।

এসবের পাশাপাশি হাঁটাহাঁটি ও বই পড়া চলছিল পুরোদমে। এক মাসের মধ্যেই অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ছাড়াই বেশ ভালোভাবে দিন কাটাতে পারছিলাম। কোনো দুঃখবোধই ছিল না। ভেতরের পশুটার মধ্যে যে ফ্যান্টাসিগুলো ছিল, সেগুলো এক-দেড় মাসের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। কারণ, পুরাতন জিনিস আর কতদিন চলবে। এদিকে নতুন আসার সুযোগই ছিল না। ইন্টারনেটের প্রয়োজন পড়লে যার ডিভাইস নিতাম, তার সামনে বসে ব্যবহার করতাম। ফলে খারাপ কিছু দেখার বা পড়ার সুযোগই ছিল না।

পরে সাত মাস, হ্যাঁ সাত মাস পর আমি মোবাইল হাতে পেয়েছিলাম। আমার অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল। ইংরেজি শাইখদের লেকচার শুনে ও পর্নোগ্রাফি থেকে দূরে থাকার নানান টিপস দেখে দেখে মোবাইল দিয়ে যেন পর্ন সাইটে প্রবেশ না করা যায়, তা সেট-আপ করে দিলাম।

আর যেহেতু একটা আলাদা জীবনচক্রে ইতোমধ্যে অভ্যস্ত ছিলাম, তাই মোবাইল আর খুব বেশি প্রভাব খাটাতে পারল না। আমি ততদিনে বইয়ের জগতের মজা পেয়ে গিয়েছিলাম। রাতে হাঁটাহাঁটি করতেও ভালো লাগত।

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সেই নীল অক্টোপাসের জাল থেকে আমাকে মুক্ত করেছেন। আল্লাহর দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া। পর্নোগ্রাফির আড়ালে থেমে যাওয়া মানবতাকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন। আমার সামান্য বিকৃত তৃপ্তির জন্য হাজারো চোখের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছেন। সেই ভাই ছিলেন আমার অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনার। তিনি ছাড়া আমার ফিরে আসা অনেক কঠিন হতো।

সময়কাল ২০১৬।

বছরটা ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। মোটামুটি ধার্মিক টাইপ আমি তখন মাত্রই দ্বীনের স্বাদ অনুভব করতে শুরু করেছি।

এমনিতে আমি চাপা ধরনের ছেলে। বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না টাইপের। ভেতরে কী চলছে, আমার মুখ দেখে কেউ বুঝতেও পারত না। এদিক দিয়ে অভিনয়টা বেশ ভালোই পারি। ভেতরে খুন হয়ে গেলেও বাইরে খুব সুন্দর হাসতে পারি।

আমার জন্ম ১৯৯৮-এর মাঝামাঝিতে। এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার বয়স ছিল ১৪। খুব ছোটো বয়সে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। ফলে দেখা যেত, অন্যান্য বন্ধুদের চেয়ে আমার ম্যাচুরিটি ছিল বেশ কম কিংবা মেয়েলি ব্যাপারগুলোতেও আমি ছিলাম অজ্ঞ। অনেক কিছুই বুঝতাম না তাদের আলোচনার। এর ফলে একটু দেরিতে পর্নোগ্রাফিতে অ্যাডিক্টেড হয়েছিলাম।

পর্নের হাতেখড়ি বাকি সবার মতোই। চাচাতো ভাই এসব দেখাত। সেখান থেকেই শুরু। আর মাস্টারবেট করা শিখেছি দুই বন্ধুর কাছে। বলা যায়, আমাদের ক্লাসের বেশিরভাগ ছেলেদের মাস্টারবেশনের ওস্তাদ তারা দুজন।

এসএসসি পর্যন্ত আমি বেশ ভদ্রই ছিলাম বলা চলে। নিজেরও স্মার্টফোন ছিল না আবার বন্ধুদের সঙ্গেও কখনো পর্নোগ্রাফির বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করিনি। সবাই আমাকে ভদ্র ও ভালো ছেলে হিসেবে জানত কি না? নিজের সুনাম খোয়ানোর ইচ্ছেও হয়নি কখনো। এসএসএসি-তে বেশ ভালো রেজাল্ট করলাম। উপহার হিসেবে ইন্টারমিডিয়েটে উঠার পর আমাকে অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে দেওয়া হলো।

অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল চালানো শুরু করার পর আমাকে আর পায় কে? আমি বেপরোয়া হয়ে গেলাম। দোকান থেকে মেমোরি কার্ডে ওসব জঘন্য ভিডিও ভর্তি করে আনতাম। দুটো মেমোরি কার্ড ছিল আমার। একটায় শুধু ওসবই ছিল। প্রতিমাসেই একবার লোড করে নিয়ে আসতাম।

এদিকে পড়াশোনা শিকেয় উঠল। সারাদিন মোবাইলে বুঁদ হয়ে টেপাটিপি করা আর ওসব দেখাই ছিল আমার মূল কাজ। এমনও হয়েছে, কোনো কোনোদিন আম্মা আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছেন আর আমি দিব্যি পাশে শুয়ে ওসব দেখে মাস্টারবেট করছি। এখন ভাবতেও ঘৃণা লাগে!

ভালো কিংবা খারাপই হোক, কিছু ঘটনা মনে থেকেই যায়। পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত এমন অনেক ঘটনাই আমি ভুলতে পারি না। এত জঘন্য সেসব স্মৃতি।

একদিন আমি ঘরের দরজা লাগিয়ে মাস্টারবেট করছিলাম। এমন সময় দাদি এসেছেন। দাদুবাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ-ছয় বাড়ি পার হয়ে। আমি দরজা না খুলে দাদির সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছিলাম আবার একই সঙ্গে মাস্টারবেটও চালিয়ে গিয়েছি। এখনও মনে পড়লে ঘৃণায় আমার শরীর শিউরে উঠে!!

পড়ার টেবিলে বসেও কত যে মাস্টারবেট করেছি-তার ইয়ত্তা নেই। দেখা গেল আমি মাস্টারবেট করছিলাম, ভুলে দরজা লাগাইনি। ঘরে আব্বু ঢুকে পড়েছেন। আমি লুঙ্গি দিয়ে যতটুকু পারা যায় আড়াল করে চালিয়ে গেছি; অথচ আব্বু তখনও ঘরে!

ইন্টারনেট আর অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল আমাকে তিলে তিলে শেষ করে ফেলছিল। গভীর রাত তো দূরের কথা, আসক্তি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, আমি সবার সামনে বসে ওসব দেখতাম। লজ্জা বলতে যে একটা জিনিস থাকা দরকার-সেটার কোনো ছিটেফোঁটাও আমার ভেতরে ছিল না। দিন-রাত ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকতাম। এমনও হয়েছে, নামাজে দাঁড়িয়েও (সচরাচর নামাজ পড়তাম না। মাঝেমধ্যে অনিয়মিতভাবে জুমার নামাজে যাওয়া হতো।) ওইসব নোংরা দৃশ্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। সিজদাতে গিয়েছি, তখনও একই অবস্থা। এত পরিমাণে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, শয়নে-স্বপনে শুধু ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো-এসব নিয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ততা ছিল না। আর থাকবেই-বা কেন? মুসলিম আচরণের ছিটেফোঁটাও তো আমার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না! আমি তখন চাবি দেওয়া একটা পুতুল, মানুষের পরিচয় ফেলে এসেছি অনেক পেছনে!

এভাবে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ভর্তি কোচিং করতে গেলাম ঢাকায়। উঠলাম কয়েকজন সিনিয়রের সঙ্গে। তারা ছিলেন সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দিনের বেলা ক্লাস শেষ করে নানান ঝামেলা মিটিয়ে মেসে ফিরতে রাত হয়ে যেত ভাইদের। বাসায় আমি সারাদিন একা। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। মফস্বলের লিমিটেড ইন্টারনেটের জগৎ থেকে এসে পড়েছি ওয়াই-ফাইয়ের আনলিমিটেড জগতে। সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকি।

এই সময় কীভাবে যেন ফেসবুকের নীল জগতের খোঁজ পেলাম। ফেইক আইডি খুলে আঁটসাঁট বেঁধে প্রবেশ করলাম সেখানে। ফেসবুককে তো আমরা খুব ভালো চোখে দেখি। কিন্তু আমরা কি জানি-ফেসবুকে দ্বীনি সার্কেল যেমনটা অ্যাভেইলেবল, খারাপ সার্কেল এর চেয়েও বেশি হাতের নাগালে? এমন হাজারো প্রাইভেট গ্রুপ আছে, যেগুলো খোলার উদ্দেশ্যই শুধু পর্ন আদান-প্রদান করা। এমন অজস্র প্রোফাইল আছে, যাদের কাজই হচ্ছে নানান ভিডিও বানিয়ে আপলোড করা। গ্রুপগুলোয় ম্যাসেজ দিয়ে উলটাপালটা কথাবার্তার বিনিময় হতো। ভিডিও আদান-প্রদান হতো। যৌনসঙ্গী খোঁজার এক অদ্ভুত এবং সহজ উপায়ও ছিল এই গ্রুপগুলো।

টুইটারের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ফেসবুকে নগ্নতা ইত্যাদি কেউ পোস্ট করতে পারে না। কিন্তু টুইটারে এই রকম কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। টুইটার যেন নিজেই একটা পর্নসাইট।

পর্নসাইট, টুইটার, ফেসবুকের বিষাক্ত দুনিয়ায় ডুবে গেলাম পুরোপুরিভাবে। সারাদিনের একাকিত্ব কাটাতাম ওসব দেখে দেখে। সাথে মাস্টারবেশন তো মাস্ট। ফলে পড়াশোনা শিকেয় উঠল। ভর্তি পরীক্ষার সময়টা কাজে লাগাতে পারলাম না। ফলাফল? মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে পারলাম না। খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। হতাশা কাটানোর জন্য আরও বেশি বেশি পর্ন ভিডিও দেখা শুরু করলাম। স্বাভাবিকভাবেই মাস্টারবেশনের পরিমাণও বেড়ে গেল।

এত বেশি মাস্টারবেশনের পরিণাম হলো ভয়াবহ। শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। দুর্বল হয়ে গেলাম। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যেতাম। জার্নি সিকনেস তৈরি হলো। রাতের ঘুমের বারোটা বেজে গেল। গ্যাস্ট্রিকের আধার বানালাম নিজেকে। এভাবেই কাটতে থাকল দিন।

২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। র‍্যাগিং ও বন্ধুদের উলটাপালটা কথাবার্তা সেক্সুয়্যাল ফ্যান্টাসিকে চরমে নিয়ে গেল। একদিনে চারবার পর্যন্ত মাস্টারবেশন করেছি। শরীরের যা হাল করেছিলাম, এখনও ভাবলে লজ্জা লাগে, কষ্টও লাগে।

যাহোক, এর মাঝেই মরুভূমির জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো কয়েকজন ভালো সিনিয়র ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো। কিছু ভালো বন্ধুর সঙ্গেও মেশা শুরু করলাম। তাদের সংস্পর্শে এসে নিজের বিশ্বাসকে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করলাম। নিজেকে মুসলিম বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত হলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তখনও আমি যেন এক বন্য অমানুষ! গোপন পাপকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণই করতে পারছিলাম না। কত যে কান্নাকাটি করেছি, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। দুই দিন কষ্ট করে থাকি তো পরের দিন আবার দেখে ফেলি। মাস্টারবেশনও হয়ে যায়। এরপর আবারও হতাশা চলে আসত। হতাশার সাথে সাথে ফিরে আসত পর্নোগ্রাফির সেই জগৎটাও!!

বাথরুম আমার কাছে এক বীভৎসতার অন্য নাম। গোসল ছিল পাপে লিপ্ত হওয়ার মোক্ষম সময়। গোসলে গেলেই মাস্টারবেশন করে ফেলতাম! থামাতেই পারতাম না। সময়টা ছিল আমার জন্য অতলে ডুবে যাওয়ার সময়। যে অতল গহ্বরের কথা মনে পড়লে আজও শিউরে উঠি!

কিন্তু এই ২০১৬ সালটাই আমার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। অতল গহ্বরে এনে দিয়েছিল আলোর রেখা। এই বছরেই আমি অন্ধকার সেই নীল জগৎ থেকে বের হতে পেরেছিলাম।

একদিন এক ভাইয়ের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে চা খাচ্ছি। তিনি খট করে আমাকে খুবই অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসলেন। প্রশ্নটা হলো-আমি পর্নোগ্রাফি দেখি কিনা? প্রশ্নটা শুনেই ঝিম ধরে থাকলাম। কিছুই বললাম না। বলবই-বা কীভাবে? এতদিনে লড়তে লড়তে আমি পরিশ্রান্ত। প্রাণপণ সাঁতার কেটেও কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না। খড়কুটো হলেও কিছু একটার আশ্রয় চাচ্ছিলাম, যেন কোনোক্রমে বেঁচে যাই। জানেনই তো, ডুবন্ত ব্যক্তি খড়কুটো আঁকড়ে ধরে হলেও বাঁচতে চায়।

ঠিক অমন একটা সময়ে আমাকে তিনি এই প্রশ্নটা করেছিলেন। প্রশ্নটা শোনার পর মনে হলো—আমি তো এই দিনটার অপেক্ষাতেই ছিলাম। খুব করে চেয়েছিলাম, কেউ একজন আমার গল্পটা শুনুক। পথ বাতলে দিক। এতদিন ধরে বুকের ভেতরে জেঁকে বসা পাথরটা সরানোর জন্য কেউ আমার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিক।

আমার মৌনতাকেই তিনি সম্মতি হিসেবে ধরে নিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমিও একসময় দেখতাম।' পরিবেশ সহজ করার জন্য হেসে হেসে তার ওই অবস্থার কিছু বর্ণনাও দিলেন।

আমি তখন খুব বেশি বাজে অবস্থায় ছিলাম। সামান্য কোনো ঘটনা (যেমন : চুম্বন) আমার কামভাব জাগ্রত করতে পারত না। সারাদিন পর্ন দেখলে যা হয় আর কী!!

প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে নিয়মিত নামাজ পড়ছি। দ্বীনের বুঝ আসতে শুরু করেছে। কিন্তু ওসব ছাড়তে পারিনি। অনুতপ্ততা যে কম, তাও না। ইন্টারনেট ও মোবাইলের জন্য পারছিলাম না দূরে থাকতে। কোনো না কোনোভাবে সুযোগ পেলেই ওসব দেখি; হোক তা রাতের অন্ধকারে কিংবা দিনের আলোতে।

মূলত সে সময় আমার মনোবল অতটা চাঙ্গা ছিল না। বন্যার তোড়ে ভেঙে যাওয়া নদীর পাড়ের মতো ছিলাম আমি। অল্প স্রোত এসে মাটিকে টেনে নিয়ে নদীর গর্তে ফেলে দিত। কত চেষ্টা করছিলাম এসব নোংরামো থেকে দূরে থাকার, কিন্তু হচ্ছিল না।

ভাইয়ের আলাপ আমাকে যেন আবার জীবনীশক্তি দিলো। তৎক্ষণাৎ সব শেয়ার করলাম ভাইয়ের সঙ্গে। সেদিন যদি সব শেয়ার না করতাম, তবে আমি আজও হয়তো সেই নীল অক্টোপাসের জালে বন্দি থাকতাম। ভাই সব শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। নীরবতা ভেঙে বললেন, 'তোমার কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি।' ভাইয়ের কণ্ঠে আন্তরিকতা ও আবেগ যেন ঠিকরে পড়ছিল। সেই আবেগ স্পর্শ করল আমাকেও!!

ভাই তখনও বলে চলেছেন তার জীবনের অন্ধকার সময়ের গল্প— 'আমিও তোমার মতোই আসক্ত ছিলাম। হয়তো-বা এক্সট্রিম কিছু দেখতাম না। সে সময় এত সুযোগ ছিল না। একা চেষ্টা করে আমি এ থেকে বেরোতে পারিনি। কারণ, অতল সাগরে ডুব দেওয়ার পর কারও সাহায্য ছাড়া ওপরে উঠে আসা খুব কঠিন। আমি যদি তোমাকে সাহায্য করতে চাই এবং এ ব্যাপারে কোনো কিছুতে জোর করি, তুমি কি তা মানবে?'

ভাইয়ের কণ্ঠের জোর এতটাই বেশি ছিল যে, আমি সাথে সাথেই বলেছিলাম, 'পারব ভাই।'

ওই রেস্টুরেন্টেই ভাই আমার অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলটা নিয়ে নিয়েছিলেন। একটা সাধারণ মোবাইল আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, 'আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমার ইশারা বুঝতে পারছ। আমি আজ থেকে ঠিক ছয় মাস পর তোমাকে মোবাইলটা ফেরত দেবো। তোমার মেসের সবাইকে বলে দেবো, যেন তারা তোমাকে তাদের মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ একা ছেড়ে না দেয়। তোমার প্রতিও অনুরোধ, অনলাইনে কোনো কাজ থাকলে তাদের সামনে বসে করার। নিজের দায়িত্ব পালনের স্বার্থে ঘরে একা কখনোই বসে না থেকে মানুষের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করো। কারও সঙ্গে মিশতে ভালো না লাগলে একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াও। নানান রকম লোকজনের আচার-আচরণ পরখ করো। তাও যেন একা ঘরে বসে থাকতে না দেখি বা শুনি। কাজ নাই, কী করব? এটা বলতে যেন না শুনি।'

ভাইয়ের কথাগুলো আমার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত ছিল। হ্যাঁ, আমার প্রথম কয়েকদিন খুবই কষ্ট হয়েছিল। এমনও হয়েছে, রাতে ঘুমোতেই পারছিলাম না, আমার মোবাইল নেই এই দুঃখে। ভাইকে গালিগালাজ যে কম করেছি, তাও না।

যে আমি চব্বিশ ঘণ্টা মোবাইল হাতে নিয়ে থাকতাম, তার এখন একটা সাধারণ দায়সারাবার মতো মোবাইল। কথাবার্তা ও বার্তা আদান-প্রদান ব্যতীত কিছুই করা যেত না। তাহলে সময় কীভাবে কাটাব আমি?

ভাইয়ের কথা অনুযায়ী হয় মানুষের সঙ্গে মিশব, না হয় রাস্তায় ঘুরে বেড়াব।

আমি এই দুইটার সঙ্গে আরেকটা বিষয় যুক্ত করেছিলাম-বই পড়া। অর্থাৎ, আমি তিনটি কাজ করব : বই পড়ব, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব এবং মানুষের সঙ্গে মিশব।

ঘরকুনো আমি আর ঘরকুনো থাকলাম না। রাস্তার ফকির থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা সবার সঙ্গেই কথা বলতাম। আর নানান উদ্ভট পরীক্ষা করে বেড়াতাম। সবই সময় কাটানোর ধান্দায়।

যেমন-কয়েকদিন মাস্টারবেট না করেই নিজেকে সাধু মনে হতে লাগল। অর্থাৎ আমি ভালো ও নিষ্পাপ হয়ে গেছি টাইপ ফিলিংস কাজ করে মাথায়।

অনেককে মনে মনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা শুরু করলাম। অহংকার এলো নিজের মধ্যে। ব্যাপারটা একদিন ধরতে পারলাম। এখন অহংকার দূর করা যাবে কিভাবে? ভালো একটা উপায় মাথায় এলো। টয়লেট পরিষ্কারের কাজকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজের একটা ধরা হয়। সে হিসেবে নিকৃষ্ট কেউ এই কাজ করে। যেই ভাবা সেই কাজ। লেগে পড়লাম। বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়র যার মেসেই যেতাম, তাদের অজান্তেই টয়লেট পরিষ্কার করে দিয়ে আসতাম। আলহামদুলিল্লাহ, এই পদ্ধতি বেশ কাজের ছিল।

এরপর দেখলাম, আমি দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারছি না। অথচ আমার চেয়ে পিচ্চি পিচ্চি ছেলে-মেয়েরা ডাস্টবিনে খাবার খোঁজে কিংবা প্লাস্টিক আলাদা করে জমা করে। সব দুর্গন্ধময় জিনিস। পরে নিয়ম করে সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ট্রাকের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, নির্দিষ্ট রিদম মেনে।

এসবের পাশাপাশি হাঁটাহাঁটি ও বই পড়া চলছিল পুরোদমে। এক মাসের মধ্যেই অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ছাড়াই বেশ ভালোভাবে দিন কাটাতে পারছিলাম। কোনো দুঃখবোধই ছিল না। ভেতরের পশুটার মধ্যে যে ফ্যান্টাসিগুলো ছিল, সেগুলো এক-দেড় মাসের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। কারণ, পুরাতন জিনিস আর কতদিন চলবে। এদিকে নতুন আসার সুযোগই ছিল না। ইন্টারনেটের প্রয়োজন পড়লে যার ডিভাইস নিতাম, তার সামনে বসে ব্যবহার করতাম। ফলে খারাপ কিছু দেখার বা পড়ার সুযোগই ছিল না।

পরে সাত মাস, হ্যাঁ সাত মাস পর আমি মোবাইল হাতে পেয়েছিলাম। আমার অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল। ইংরেজি শাইখদের লেকচার শুনে ও পর্নোগ্রাফি থেকে দূরে থাকার নানান টিপস দেখে দেখে মোবাইল দিয়ে যেন পর্ন সাইটে প্রবেশ না করা যায়, তা সেট-আপ করে দিলাম।

আর যেহেতু একটা আলাদা জীবনচক্রে ইতোমধ্যে অভ্যস্ত ছিলাম, তাই মোবাইল আর খুব বেশি প্রভাব খাটাতে পারল না। আমি ততদিনে বইয়ের জগতের মজা পেয়ে গিয়েছিলাম। রাতে হাঁটাহাঁটি করতেও ভালো লাগত।

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সেই নীল অক্টোপাসের জাল থেকে আমাকে মুক্ত করেছেন। আল্লাহর দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া। পর্নোগ্রাফির আড়ালে থেমে যাওয়া মানবতাকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন। আমার সামান্য বিকৃত তৃপ্তির জন্য হাজারো চোখের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছেন। সেই ভাই ছিলেন আমার অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনার। তিনি ছাড়া আমার ফিরে আসা অনেক কঠিন হতো।

সময়কাল ২০১৬।

বছরটা ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। মোটামুটি ধার্মিক টাইপ আমি তখন মাত্রই দ্বীনের স্বাদ অনুভব করতে শুরু করেছি।

এমনিতে আমি চাপা ধরনের ছেলে। বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না টাইপের। ভেতরে কী চলছে, আমার মুখ দেখে কেউ বুঝতেও পারত না। এদিক দিয়ে অভিনয়টা বেশ ভালোই পারি। ভেতরে খুন হয়ে গেলেও বাইরে খুব সুন্দর হাসতে পারি।

আমার জন্ম ১৯৯৮-এর মাঝামাঝিতে। এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার বয়স ছিল ১৪। খুব ছোটো বয়সে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। ফলে দেখা যেত, অন্যান্য বন্ধুদের চেয়ে আমার ম্যাচুরিটি ছিল বেশ কম কিংবা মেয়েলি ব্যাপারগুলোতেও আমি ছিলাম অজ্ঞ। অনেক কিছুই বুঝতাম না তাদের আলোচনার। এর ফলে একটু দেরিতে পর্নোগ্রাফিতে অ্যাডিক্টেড হয়েছিলাম।

পর্নের হাতেখড়ি বাকি সবার মতোই। চাচাতো ভাই এসব দেখাত। সেখান থেকেই শুরু। আর মাস্টারবেট করা শিখেছি দুই বন্ধুর কাছে। বলা যায়, আমাদের ক্লাসের বেশিরভাগ ছেলেদের মাস্টারবেশনের ওস্তাদ তারা দুজন।

এসএসসি পর্যন্ত আমি বেশ ভদ্রই ছিলাম বলা চলে। নিজেরও স্মার্টফোন ছিল না আবার বন্ধুদের সঙ্গেও কখনো পর্নোগ্রাফির বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করিনি। সবাই আমাকে ভদ্র ও ভালো ছেলে হিসেবে জানত কি না? নিজের সুনাম খোয়ানোর ইচ্ছেও হয়নি কখনো। এসএসএসি-তে বেশ ভালো রেজাল্ট করলাম। উপহার হিসেবে ইন্টারমিডিয়েটে উঠার পর আমাকে অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে দেওয়া হলো।

অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল চালানো শুরু করার পর আমাকে আর পায় কে? আমি বেপরোয়া হয়ে গেলাম। দোকান থেকে মেমোরি কার্ডে ওসব জঘন্য ভিডিও ভর্তি করে আনতাম। দুটো মেমোরি কার্ড ছিল আমার। একটায় শুধু ওসবই ছিল। প্রতিমাসেই একবার লোড করে নিয়ে আসতাম।

এদিকে পড়াশোনা শিকেয় উঠল। সারাদিন মোবাইলে বুঁদ হয়ে টেপাটিপি করা আর ওসব দেখাই ছিল আমার মূল কাজ। এমনও হয়েছে, কোনো কোনোদিন আম্মা আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছেন আর আমি দিব্যি পাশে শুয়ে ওসব দেখে মাস্টারবেট করছি। এখন ভাবতেও ঘৃণা লাগে!

ভালো কিংবা খারাপই হোক, কিছু ঘটনা মনে থেকেই যায়। পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত এমন অনেক ঘটনাই আমি ভুলতে পারি না। এত জঘন্য সেসব স্মৃতি।

একদিন আমি ঘরের দরজা লাগিয়ে মাস্টারবেট করছিলাম। এমন সময় দাদি এসেছেন। দাদুবাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ-ছয় বাড়ি পার হয়ে। আমি দরজা না খুলে দাদির সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছিলাম আবার একই সঙ্গে মাস্টারবেটও চালিয়ে গিয়েছি। এখনও মনে পড়লে ঘৃণায় আমার শরীর শিউরে উঠে!!

পড়ার টেবিলে বসেও কত যে মাস্টারবেট করেছি-তার ইয়ত্তা নেই। দেখা গেল আমি মাস্টারবেট করছিলাম, ভুলে দরজা লাগাইনি। ঘরে আব্বু ঢুকে পড়েছেন। আমি লুঙ্গি দিয়ে যতটুকু পারা যায় আড়াল করে চালিয়ে গেছি; অথচ আব্বু তখনও ঘরে!

ইন্টারনেট আর অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল আমাকে তিলে তিলে শেষ করে ফেলছিল। গভীর রাত তো দূরের কথা, আসক্তি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, আমি সবার সামনে বসে ওসব দেখতাম। লজ্জা বলতে যে একটা জিনিস থাকা দরকার-সেটার কোনো ছিটেফোঁটাও আমার ভেতরে ছিল না। দিন-রাত ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকতাম। এমনও হয়েছে, নামাজে দাঁড়িয়েও (সচরাচর নামাজ পড়তাম না। মাঝেমধ্যে অনিয়মিতভাবে জুমার নামাজে যাওয়া হতো।) ওইসব নোংরা দৃশ্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। সিজদাতে গিয়েছি, তখনও একই অবস্থা। এত পরিমাণে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, শয়নে-স্বপনে শুধু ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো-এসব নিয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ততা ছিল না। আর থাকবেই-বা কেন? মুসলিম আচরণের ছিটেফোঁটাও তো আমার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না! আমি তখন চাবি দেওয়া একটা পুতুল, মানুষের পরিচয় ফেলে এসেছি অনেক পেছনে!

এভাবে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ভর্তি কোচিং করতে গেলাম ঢাকায়। উঠলাম কয়েকজন সিনিয়রের সঙ্গে। তারা ছিলেন সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দিনের বেলা ক্লাস শেষ করে নানান ঝামেলা মিটিয়ে মেসে ফিরতে রাত হয়ে যেত ভাইদের। বাসায় আমি সারাদিন একা। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। মফস্বলের লিমিটেড ইন্টারনেটের জগৎ থেকে এসে পড়েছি ওয়াই-ফাইয়ের আনলিমিটেড জগতে। সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকি।

এই সময় কীভাবে যেন ফেসবুকের নীল জগতের খোঁজ পেলাম। ফেইক আইডি খুলে আঁটসাঁট বেঁধে প্রবেশ করলাম সেখানে। ফেসবুককে তো আমরা খুব ভালো চোখে দেখি। কিন্তু আমরা কি জানি-ফেসবুকে দ্বীনি সার্কেল যেমনটা অ্যাভেইলেবল, খারাপ সার্কেল এর চেয়েও বেশি হাতের নাগালে? এমন হাজারো প্রাইভেট গ্রুপ আছে, যেগুলো খোলার উদ্দেশ্যই শুধু পর্ন আদান-প্রদান করা। এমন অজস্র প্রোফাইল আছে, যাদের কাজই হচ্ছে নানান ভিডিও বানিয়ে আপলোড করা। গ্রুপগুলোয় ম্যাসেজ দিয়ে উলটাপালটা কথাবার্তার বিনিময় হতো। ভিডিও আদান-প্রদান হতো। যৌনসঙ্গী খোঁজার এক অদ্ভুত এবং সহজ উপায়ও ছিল এই গ্রুপগুলো।

টুইটারের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ফেসবুকে নগ্নতা ইত্যাদি কেউ পোস্ট করতে পারে না। কিন্তু টুইটারে এই রকম কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। টুইটার যেন নিজেই একটা পর্নসাইট।

পর্নসাইট, টুইটার, ফেসবুকের বিষাক্ত দুনিয়ায় ডুবে গেলাম পুরোপুরিভাবে। সারাদিনের একাকিত্ব কাটাতাম ওসব দেখে দেখে। সাথে মাস্টারবেশন তো মাস্ট। ফলে পড়াশোনা শিকেয় উঠল। ভর্তি পরীক্ষার সময়টা কাজে লাগাতে পারলাম না। ফলাফল? মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে পারলাম না। খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। হতাশা কাটানোর জন্য আরও বেশি বেশি পর্ন ভিডিও দেখা শুরু করলাম। স্বাভাবিকভাবেই মাস্টারবেশনের পরিমাণও বেড়ে গেল।

এত বেশি মাস্টারবেশনের পরিণাম হলো ভয়াবহ। শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। দুর্বল হয়ে গেলাম। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যেতাম। জার্নি সিকনেস তৈরি হলো। রাতের ঘুমের বারোটা বেজে গেল। গ্যাস্ট্রিকের আধার বানালাম নিজেকে। এভাবেই কাটতে থাকল দিন।

২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। র‍্যাগিং ও বন্ধুদের উলটাপালটা কথাবার্তা সেক্সুয়্যাল ফ্যান্টাসিকে চরমে নিয়ে গেল। একদিনে চারবার পর্যন্ত মাস্টারবেশন করেছি। শরীরের যা হাল করেছিলাম, এখনও ভাবলে লজ্জা লাগে, কষ্টও লাগে।

যাহোক, এর মাঝেই মরুভূমির জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো কয়েকজন ভালো সিনিয়র ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো। কিছু ভালো বন্ধুর সঙ্গেও মেশা শুরু করলাম। তাদের সংস্পর্শে এসে নিজের বিশ্বাসকে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করলাম। নিজেকে মুসলিম বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত হলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তখনও আমি যেন এক বন্য অমানুষ! গোপন পাপকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণই করতে পারছিলাম না। কত যে কান্নাকাটি করেছি, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। দুই দিন কষ্ট করে থাকি তো পরের দিন আবার দেখে ফেলি। মাস্টারবেশনও হয়ে যায়। এরপর আবারও হতাশা চলে আসত। হতাশার সাথে সাথে ফিরে আসত পর্নোগ্রাফির সেই জগৎটাও!!

বাথরুম আমার কাছে এক বীভৎসতার অন্য নাম। গোসল ছিল পাপে লিপ্ত হওয়ার মোক্ষম সময়। গোসলে গেলেই মাস্টারবেশন করে ফেলতাম! থামাতেই পারতাম না। সময়টা ছিল আমার জন্য অতলে ডুবে যাওয়ার সময়। যে অতল গহ্বরের কথা মনে পড়লে আজও শিউরে উঠি!

কিন্তু এই ২০১৬ সালটাই আমার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। অতল গহ্বরে এনে দিয়েছিল আলোর রেখা। এই বছরেই আমি অন্ধকার সেই নীল জগৎ থেকে বের হতে পেরেছিলাম।

একদিন এক ভাইয়ের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে চা খাচ্ছি। তিনি খট করে আমাকে খুবই অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসলেন। প্রশ্নটা হলো-আমি পর্নোগ্রাফি দেখি কিনা? প্রশ্নটা শুনেই ঝিম ধরে থাকলাম। কিছুই বললাম না। বলবই-বা কীভাবে? এতদিনে লড়তে লড়তে আমি পরিশ্রান্ত। প্রাণপণ সাঁতার কেটেও কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না। খড়কুটো হলেও কিছু একটার আশ্রয় চাচ্ছিলাম, যেন কোনোক্রমে বেঁচে যাই। জানেনই তো, ডুবন্ত ব্যক্তি খড়কুটো আঁকড়ে ধরে হলেও বাঁচতে চায়।

ঠিক অমন একটা সময়ে আমাকে তিনি এই প্রশ্নটা করেছিলেন। প্রশ্নটা শোনার পর মনে হলো—আমি তো এই দিনটার অপেক্ষাতেই ছিলাম। খুব করে চেয়েছিলাম, কেউ একজন আমার গল্পটা শুনুক। পথ বাতলে দিক। এতদিন ধরে বুকের ভেতরে জেঁকে বসা পাথরটা সরানোর জন্য কেউ আমার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিক।

আমার মৌনতাকেই তিনি সম্মতি হিসেবে ধরে নিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমিও একসময় দেখতাম।' পরিবেশ সহজ করার জন্য হেসে হেসে তার ওই অবস্থার কিছু বর্ণনাও দিলেন।

আমি তখন খুব বেশি বাজে অবস্থায় ছিলাম। সামান্য কোনো ঘটনা (যেমন : চুম্বন) আমার কামভাব জাগ্রত করতে পারত না। সারাদিন পর্ন দেখলে যা হয় আর কী!!

প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে নিয়মিত নামাজ পড়ছি। দ্বীনের বুঝ আসতে শুরু করেছে। কিন্তু ওসব ছাড়তে পারিনি। অনুতপ্ততা যে কম, তাও না। ইন্টারনেট ও মোবাইলের জন্য পারছিলাম না দূরে থাকতে। কোনো না কোনোভাবে সুযোগ পেলেই ওসব দেখি; হোক তা রাতের অন্ধকারে কিংবা দিনের আলোতে।

মূলত সে সময় আমার মনোবল অতটা চাঙ্গা ছিল না। বন্যার তোড়ে ভেঙে যাওয়া নদীর পাড়ের মতো ছিলাম আমি। অল্প স্রোত এসে মাটিকে টেনে নিয়ে নদীর গর্তে ফেলে দিত। কত চেষ্টা করছিলাম এসব নোংরামো থেকে দূরে থাকার, কিন্তু হচ্ছিল না।

ভাইয়ের আলাপ আমাকে যেন আবার জীবনীশক্তি দিলো। তৎক্ষণাৎ সব শেয়ার করলাম ভাইয়ের সঙ্গে। সেদিন যদি সব শেয়ার না করতাম, তবে আমি আজও হয়তো সেই নীল অক্টোপাসের জালে বন্দি থাকতাম। ভাই সব শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। নীরবতা ভেঙে বললেন, 'তোমার কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি।' ভাইয়ের কণ্ঠে আন্তরিকতা ও আবেগ যেন ঠিকরে পড়ছিল। সেই আবেগ স্পর্শ করল আমাকেও!!

ভাই তখনও বলে চলেছেন তার জীবনের অন্ধকার সময়ের গল্প— 'আমিও তোমার মতোই আসক্ত ছিলাম। হয়তো-বা এক্সট্রিম কিছু দেখতাম না। সে সময় এত সুযোগ ছিল না। একা চেষ্টা করে আমি এ থেকে বেরোতে পারিনি। কারণ, অতল সাগরে ডুব দেওয়ার পর কারও সাহায্য ছাড়া ওপরে উঠে আসা খুব কঠিন। আমি যদি তোমাকে সাহায্য করতে চাই এবং এ ব্যাপারে কোনো কিছুতে জোর করি, তুমি কি তা মানবে?'

ভাইয়ের কণ্ঠের জোর এতটাই বেশি ছিল যে, আমি সাথে সাথেই বলেছিলাম, 'পারব ভাই।'

ওই রেস্টুরেন্টেই ভাই আমার অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলটা নিয়ে নিয়েছিলেন। একটা সাধারণ মোবাইল আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, 'আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমার ইশারা বুঝতে পারছ। আমি আজ থেকে ঠিক ছয় মাস পর তোমাকে মোবাইলটা ফেরত দেবো। তোমার মেসের সবাইকে বলে দেবো, যেন তারা তোমাকে তাদের মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ একা ছেড়ে না দেয়। তোমার প্রতিও অনুরোধ, অনলাইনে কোনো কাজ থাকলে তাদের সামনে বসে করার। নিজের দায়িত্ব পালনের স্বার্থে ঘরে একা কখনোই বসে না থেকে মানুষের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করো। কারও সঙ্গে মিশতে ভালো না লাগলে একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াও। নানান রকম লোকজনের আচার-আচরণ পরখ করো। তাও যেন একা ঘরে বসে থাকতে না দেখি বা শুনি। কাজ নাই, কী করব? এটা বলতে যেন না শুনি।'

ভাইয়ের কথাগুলো আমার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত ছিল। হ্যাঁ, আমার প্রথম কয়েকদিন খুবই কষ্ট হয়েছিল। এমনও হয়েছে, রাতে ঘুমোতেই পারছিলাম না, আমার মোবাইল নেই এই দুঃখে। ভাইকে গালিগালাজ যে কম করেছি, তাও না।

যে আমি চব্বিশ ঘণ্টা মোবাইল হাতে নিয়ে থাকতাম, তার এখন একটা সাধারণ দায়সারাবার মতো মোবাইল। কথাবার্তা ও বার্তা আদান-প্রদান ব্যতীত কিছুই করা যেত না। তাহলে সময় কীভাবে কাটাব আমি?

ভাইয়ের কথা অনুযায়ী হয় মানুষের সঙ্গে মিশব, না হয় রাস্তায় ঘুরে বেড়াব।

আমি এই দুইটার সঙ্গে আরেকটা বিষয় যুক্ত করেছিলাম-বই পড়া। অর্থাৎ, আমি তিনটি কাজ করব : বই পড়ব, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব এবং মানুষের সঙ্গে মিশব।

ঘরকুনো আমি আর ঘরকুনো থাকলাম না। রাস্তার ফকির থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা সবার সঙ্গেই কথা বলতাম। আর নানান উদ্ভট পরীক্ষা করে বেড়াতাম। সবই সময় কাটানোর ধান্দায়।

যেমন-কয়েকদিন মাস্টারবেট না করেই নিজেকে সাধু মনে হতে লাগল। অর্থাৎ আমি ভালো ও নিষ্পাপ হয়ে গেছি টাইপ ফিলিংস কাজ করে মাথায়।

অনেককে মনে মনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা শুরু করলাম। অহংকার এলো নিজের মধ্যে। ব্যাপারটা একদিন ধরতে পারলাম। এখন অহংকার দূর করা যাবে কিভাবে? ভালো একটা উপায় মাথায় এলো। টয়লেট পরিষ্কারের কাজকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজের একটা ধরা হয়। সে হিসেবে নিকৃষ্ট কেউ এই কাজ করে। যেই ভাবা সেই কাজ। লেগে পড়লাম। বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়র যার মেসেই যেতাম, তাদের অজান্তেই টয়লেট পরিষ্কার করে দিয়ে আসতাম। আলহামদুলিল্লাহ, এই পদ্ধতি বেশ কাজের ছিল।

এরপর দেখলাম, আমি দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারছি না। অথচ আমার চেয়ে পিচ্চি পিচ্চি ছেলে-মেয়েরা ডাস্টবিনে খাবার খোঁজে কিংবা প্লাস্টিক আলাদা করে জমা করে। সব দুর্গন্ধময় জিনিস। পরে নিয়ম করে সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ট্রাকের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, নির্দিষ্ট রিদম মেনে।

এসবের পাশাপাশি হাঁটাহাঁটি ও বই পড়া চলছিল পুরোদমে। এক মাসের মধ্যেই অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ছাড়াই বেশ ভালোভাবে দিন কাটাতে পারছিলাম। কোনো দুঃখবোধই ছিল না। ভেতরের পশুটার মধ্যে যে ফ্যান্টাসিগুলো ছিল, সেগুলো এক-দেড় মাসের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। কারণ, পুরাতন জিনিস আর কতদিন চলবে। এদিকে নতুন আসার সুযোগই ছিল না। ইন্টারনেটের প্রয়োজন পড়লে যার ডিভাইস নিতাম, তার সামনে বসে ব্যবহার করতাম। ফলে খারাপ কিছু দেখার বা পড়ার সুযোগই ছিল না।

পরে সাত মাস, হ্যাঁ সাত মাস পর আমি মোবাইল হাতে পেয়েছিলাম। আমার অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল। ইংরেজি শাইখদের লেকচার শুনে ও পর্নোগ্রাফি থেকে দূরে থাকার নানান টিপস দেখে দেখে মোবাইল দিয়ে যেন পর্ন সাইটে প্রবেশ না করা যায়, তা সেট-আপ করে দিলাম।

আর যেহেতু একটা আলাদা জীবনচক্রে ইতোমধ্যে অভ্যস্ত ছিলাম, তাই মোবাইল আর খুব বেশি প্রভাব খাটাতে পারল না। আমি ততদিনে বইয়ের জগতের মজা পেয়ে গিয়েছিলাম। রাতে হাঁটাহাঁটি করতেও ভালো লাগত।

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সেই নীল অক্টোপাসের জাল থেকে আমাকে মুক্ত করেছেন। আল্লাহর দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া। পর্নোগ্রাফির আড়ালে থেমে যাওয়া মানবতাকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন। আমার সামান্য বিকৃত তৃপ্তির জন্য হাজারো চোখের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছেন। সেই ভাই ছিলেন আমার অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনার। তিনি ছাড়া আমার ফিরে আসা অনেক কঠিন হতো।

📘 নীল বিষ > 📄 নীল বিষের ছোবল

📄 নীল বিষের ছোবল


১২ বছর বয়সি মোটামুটি রক্ষণশীল পরিবারের কোনো কিশোরকে যদি কেউ পর্নোগ্রাফি দেখায়, তবে তার প্রতিক্রিয়া হবে—‘তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! এসব কী বিচ্ছিরি! ওয়াক থু!’ প্রথমবার ওসব দেখার সময় আমার প্রতিক্রিয়া ঠিক এমনই ছিল। পাড়ার এক বড়ো ভাই আমাকে এই নোংরা ভিডিও দেখিয়েছিল। পেশায় তিনি ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রী। যখনকার কথা বলছি, তখন ছিল দ্বিতীয় মোবাইলের জামানা।

২০১৩ সালের কথা। ১৩ বছর বয়সি আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। সে সময় সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না। আমার বয়সি কিছু ছেলে দ্বিতীয় মোবাইল ব্যবহার করত। তবে ওরা পাড়ায় ও স্কুলে পরিচিত ছিল বেয়াদব নামে। ওই ছেলেদের একদিন দেখি স্কুলের টয়লেটের দরজায় লেখা একটা ইংরেজি শব্দ নিয়ে খুব হাসাহাসি করছে। এর মর্মার্থ আমি সেদিন বুঝতে পারিনি।

সেখানে আরও একটা শব্দ পাশাপাশি লেখা ছিল। ছোটো পকেট ডিকশনারিতে অনেক খুঁজেও এটি পেলাম না। স্যারকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। স্যার একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন আমার প্রশ্ন শুনে। তিনি বললেন, 'এটা কোথায় পেয়েছ?' আমি বললাম- 'টয়লেটের দরজায়।' স্যার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেলেন। এরপর হঠাৎ একদিন দেখি দরজায় নতুন রং করা হয়েছে। টয়লেটের দরজায় সেই লেখাটাও আর চোখে পড়েনি।

২০১৪ সালে আবারও টয়লেটে কিছু লেখা চোখে পড়ল। আগের শব্দগুলো তো ছিলই, সাথে নতুন কিছু শব্দ যোগ হয়েছিল। ততদিনে আমি ইন্টারনেটের সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। আব্বু বিদেশ থেকে একটি টাচস্ক্রিন ফোন পাঠিয়েছিলেন ঘরে ব্যবহারের জন্য। আম্মু মোবাইল খুব একটা ব্যবহার করতেন না। এ কারণে আমার কাছেই ফোনটা থাকত।

স্কুলের টয়লেটে দেখা শব্দগুলো এবার আর কাউকে জিজ্ঞেস না করে ডাইরেক্ট গুগল করি। রেজাল্টে যা এলো, আমার চোখ এক্কেবারে কপালে। দেখামাত্রই অপরাধবোধ ও উত্তেজনা একই সরলরেখায় চলা শুরু করেছিল। এখনও ওই ভয়াবহ অনুভূতিটা স্মরণ করতে পারি। ছি!

আমি কিছুটা হলেও ধার্মিক ছিলাম। মানে দৈনিক তিন-চার ওয়াক্ত নামাজ পড়া হতো। কিন্তু সেদিন আমার উত্তেজনা অপরাধবোধকে ছাপিয়ে গেল। আর এগোয়নি। এরপর থেকেই ওসব দেখার শুরু। গোপনে, একটু সংযতভাবে বিচরণ করতে থাকলাম এই জগতে। মাস্টারবেশনও শুরু করলাম। এটা চলত রুটিনমাফিক। নিয়মিত রুটিন ছিল সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন। বিকৃত এই ভিডিওগুলো দেখা ও মাস্টারবেশন; যুগপভাবে।

প্রায় ছয় মাস চলেছিল এ রকম। কিছু টাকা জমিয়ে মেমোরি কার্ড কিনলাম। এরপর দোকানে গিয়ে কার্ডভর্তি ভিডিও লোড করে আনলাম। যখন দেখতে ইচ্ছে হতো, মেমোরি ঢুকিয়ে নিতাম ফোনে। ইন্টারনেটে সরাসরি দেখে সুবিধা হচ্ছিল না বিভিন্ন কারণে।

একদিন বাথরুমে ফোন নিয়ে গেলাম এই উদ্দেশ্যে। হঠাৎ রিংটোন বেজে উঠলে তা আম্মুর কর্ণগোচর হলো। বাথরুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তিনি জেরা করা শুরু করলেন। বাথরুমে ফোনের কী কাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি আমতা আমতা করে বললাম, 'পকেটে ছিল, খেয়াল করিনি।' সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও আম্মুর মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল।

আরেক দিন বাথরুমে থাকাকালীন সময় ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। সেদিন খালা বেড়াতে এসেছিলেন। মা হয়তো খেয়াল করেছিল, কিন্তু আমাকে কিছু বলেননি। এরপর গোসল সেরে বের হওয়ার পর খালা আমাকে ডেকে এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি ঠিক এ রকমই বলেছিলেন—'আব্বু, এই বয়সটায় খুবই খারাপ সময় পার করতে হয়। মোবাইল একটু কম ঘাঁটাঘাঁটি করিস। খারাপ ছেলেদের সাথে মেলামেশা করিস না, আজেবাজে ভিডিও দেখিস না। তুই ভালো ছেলে, ভালো ছেলের মতো চলবি।' আমি কোনোভাবে পাশ কাটিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। মূলত আমি ফোন থেকে মেমোরি কার্ড সরাতে ভুলে গিয়েছিলাম। ফলে পুরো ব্যাপারটাই খালা আর আম্মু ধরে ফেলেছিলেন!

এদিকে জেসএসি পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছিল। তাই ওসব দেখার ভূত মাথা থেকে কিছুদিনের জন্য চলে গেল। ভেবেছিলাম এবার বোধহয় এই নেশা থেকে নিস্তার পাব, কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক যেতে না যেতেই আবারও ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করার তাড়না অনুভব করতে লাগলাম।

কিন্তু আম্মু মোবাইল সব সময় তার কাছে রাখতেন। তাই ওগুলো দেখার সুযোগও আর থাকল না। যদিও ব্যাপারটা আমার জন্য ভালো হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হলো উলটোটা। আমি ইতোমধ্যে যা দেখেছি, সেগুলো কল্পনায় নিয়ে আসতাম। সেই দৃশ্যগুলো কল্পনা করার মাধ্যমে মাস্টারবেশন করতাম। ফলে মাস্টারবেশন করার জন্য সরাসরি বিকৃত ভিডিওগুলো আর দেখতে হতো না। এভাবে চলতে থাকল দিন। ফ্যান্টাসি, মাস্টারবেশন কিছুই থেমে থাকল না।

দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট হলো। ভালো ছাত্র ছিলাম, বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন বা স্কুলের শিক্ষকরা আশা করেছিলেন আমি জিপিএ ৫ পাব; কিন্তু সবাইকে হতাশ করে রেজাল্ট এলো ৪.৫০। অবস্থা বেশ বেগতিক হয়ে পড়ল। এত ভালো একটা ছাত্রের এ রকম খারাপ রেজাল্ট কেউ মেনে নিতে পারবে না-এটাই স্বাভাবিক। এবার আম্মু মুখ খুললেন। আজও কানে ভাসছে সেদিনের কথাগুলো—‘পড়ালেখা না করে সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে ছিলি না! ন্যাংটা মেয়েগুলোর ছবি দেখতি না বাথরুমে গিয়ে! যাহ, এই নে মোবাইল। আরও দেখ গিয়ে! আমার সাথে আর কথা বলবি না। জাহান্নামে যা বেয়াদব।’

মায়ের এই রাগ স্বাভাবিক ছিল। যেহেতু রোল এক ছিল, আব্বু ভাবতেন আমি খুব পড়ুয়া ছেলে। রেজাল্ট নিঃসন্দেহে ভালো হবে; কিন্তু রেজাল্ট তো আর ভালো হয়নি। আম্মু আব্বুকে কীভাবে এই বাজে রেজাল্টের খবর দেবেন, তা নিয়ে রীতিমতো খুব টেনশনে ছিলেন। আমিও ভীষণ হতাশ ও দুঃখিত ছিলাম। মনে মনে স্থির করলাম, ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করা ছেড়ে দেবো। ভালো হয়ে যাব। যেভাবেই হোক পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতেই হবে।

এরপর প্রায় দুই মাস এগুলো থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলাম। শুধু জিদের বসে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত এত ফলপ্রসূ হয়েছিল। মূলত এই নোংরা কাজ থেকে মুক্তি পেতে একটা জেদ অনেক সাহায্য করে। নামাজ পড়তে শুরু করেছিলাম নিয়মিত। আমার সাথে আম্মুর আচরণও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

কিন্তু একদিন...

টিভিতে একটা মুভি দেখছিলাম। একপর্যায়ে খারাপ একটা দৃশ্য চলে আসে। আমি সামান্য এই দৃশ্যও সহ্য করতে পারলাম না। এতটুকুতেই উত্তেজিত হয়ে সোজা বাথরুমে গিয়ে মাস্টারবেশন করে ফেললাম। আর এরপর আবারও সেই অনুশোচনা। এ কী করলাম আমি! মনে মনে আবারও প্রতিজ্ঞা করি, 'আর নাহ! এটাই শেষবার।'

কিন্তু শেষবার হওয়াটা এতই সহজ? তার পরদিন আবারও মাস্টারবেশন। টাইটানিক সিনেমার সেই অশ্লীল দৃশ্য মাথায় ঘুরঘুর করছিল। এভাবে করে পর্নোগ্রাফির অশরীরী প্রেতাত্মা আবারও আমার ঘাড়ে চেপে বসল।

আবারও মাস্টারবেশনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। নিয়মিত অপরাধবোধে ভুগতাম। আর নিয়মিতই প্রতিজ্ঞা করতাম-এই শেষ; আর করব না। আমার এই পচে যাওয়া কারও চোখে পড়েনি। ততদিনে মাও বিশ্বাস করা শুরু করেছিলেন। ফলে আরও অবারিত সুযোগ। আমি ইউটিউবে পড়া দেখব বলে মোবাইল নিয়ে ডুব দিতাম নোংরা জগতে। বিকৃত ভিডিওগুলোতে যা দেখতাম, সেগুলো ক্যাশ করে মোবাইল মায়ের হাতে দিয়ে কিছুক্ষণ পরে বাথরুমে যেতাম, যাতে বুঝতে না পারে।

অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন আমাকে উত্তেজিত করার জন্য একটা চুম্বন দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি আরও বিকৃতমনা হয় গেলাম। হরেক রকম স্টাইল কিংবা এক্সট্রিম কিছু ছাড়া আমার জমত না। এভাবেই পার হতে থাকল দিন। আর আমি পরিণত হচ্ছিলাম আস্ত এক পশুতে।

এভাবেই পার হয়ে গেল আরও দুই বছর। এসএসসি পরীক্ষার বাকি আর তিন মাস। তখন জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলের কথা স্মরণ হওয়ায় অনেক বেশি ধার্মিক হয়ে উঠি। হেব্বি পড়াশোনা শুরু করে দিই। জঘন্য কাজগুলোও বন্ধ করি। এই রেশ ছিল রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত। রেজাল্ট বেরোল। এবার জিপিএ ৫.০০ পেলাম। সবাই খুশিতে আত্মহারা। আব্বু ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা তোমার কী লাগবে? তা যদি চাঁদও হয়, আমি এনে দেবো।' আমার ল্যাপটপ কেনার ইচ্ছে ছিল। আমতা আমতা করে সেটা বলে ফেললাম। এর ঠিক এক মাস পর চাঁদ তথা ল্যাপটপ এসে হাজির। এরপর শহরে চলে যাই পড়াশোনার জন্য।

শহরে গিয়ে মেসে উঠি। ওয়াই-ফাইয়ের সাথে বই মারফত পূর্ব পরিচিতি থাকলেও এবার প্র্যাকটিক্যালি পরিচিত হই। একাই একটা রুম নিয়ে নিই। ফেসবুকে একটি মুভিসংশ্লিষ্ট গ্রুপের সাথে যুক্ত হই। এবার আমার মুভি দেখার নতুন আসক্তি শুরু হয়। যেকোনো মুভিতেই এখন ছোটোখাটো যৌন দৃশ্য থাকে। আর এগুলাই আমার জন্য কাল হলো। প্রায় পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর আবারও পুনঃঅবনতি ঘটে আমার।

পর্নোগ্রাফি দেখলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন আর আমি ভালো রেজাল্ট করতে পারব না, এই ভয়ে বেশ কিছুদিন এই জঘন্য কাজ হতে নিজেকে বিরত রেখেছিলাম। কিন্তু আমি আবারও অকৃতজ্ঞ হলাম। আনলিমিটেড ইন্টারনেট পাওয়ায় আবারও বিষাক্ত নীল দুনিয়ায় ডুব দিলাম। এবার আর আগের মতো অনুশোচনা হলো না। প্রায় প্রতিদিনই গোসলের আগে নোংরা ভিডিওগুলো দেখতাম ও মাস্টারবেশন করতাম। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটা চলে।

ইতোমধ্যে লক্ষ করি, আমার নাইট ইমিশন হচ্ছে না। হঠাৎ নিজেকে নিয়ে চিন্তা শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার শারীরিক অবনতি টের পাই। কিন্তু ততদিনে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা খুইয়ে বসেছি। না চাইলেও খানিক সময়ের জন্য হলেও জানোয়ারে পরিণত হতাম। দেখা গেল, কয়েক সেকেন্ডেই আমার বীর্যপাত হয়ে যায়।

(নাইট ইমিশন; আমরা একে স্বপ্নদোষ বলে জানি। আদতে এটা দোষের কিছু নয়। ছেলেদের আল্লাহ প্রদত্ত অন্যতম একটি নিয়ামত এই নাইট ইমিশন। অবিবাহিত কারও নিয়মিত নাইট ইমিশন সুস্থ যৌন স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয়।)

এসব সমস্যার কথা কাউকে যে বলব, এমন কেউই ছিল না। বাস্তবিকভাবে আমার স্কুলের সব বন্ধুই খুব ভালো ছিল। কথায়, চালচলনে তাদের খুঁত ধরা ছিল অসম্ভব। বাহ্যিকভাবে যতটুকু দেখেছি, তারা ছিল পারফেক্ট। সুতরাং তাদের সাথে একসাথে বসে এই নোংরা ভিডিওগুলো দেখা সম্ভব ছিল না। কেউ এসব দেখে বলে জানতামও না। অফলাইন দুনিয়ায় আমি বড়োই ভদ্রসদ্র এক ছেলে; ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানি না। পাড়ায়, আত্মীয়স্বজন, সর্বমহলে ভদ্র ছেলে হিসেবে আমার ব্যাপক সুখ্যাতি আছে। কিন্তু স্ক্রিনের সামনে এলেই আমি খুব বেহায়া, বেশরম হয়ে পড়তাম।

নিজের শারীরিক, মানসিক অবনতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমি আর আমি নেই; নিকৃষ্ট এক পশুতে পরিণত হয়েছি।

করে চেয়েছিলাম, এই ভয়াল চক্র থেকে যেন মুক্তি পাই। স্ক্রিনের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে কাটাতে পারলেও বাস্তবে কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে পারতাম না। কারণ, স্ক্রিনের বাইরের দুনিয়ায় আমি ছিলাম খুবই লাজুক একটা ছেলে। সব সময় মাথায় কাজ করত-পাছে লোকে কিছু ভাবে কিনা! আদতে আমি ছিলাম ভদ্র মুখোশ পরা এক আস্ত পশু! নিজের এই বিপরীতমুখী আচরণে নিজেকে ভণ্ড, জাল মনে হতো। মানসিক যাতনা বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশি। খুব করে এই জাল থেকে মুক্তি চাইছিলাম; তা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।

ঠিক এ সময় মেসে একটা নতুন ছেলে আসে। বেশ নম্র, ভদ্র ও ধার্মিক। ভেতরে-বাইরে সাদা ও ভালো মনের এই ছেলেটি বেশ মিশুক ছিল। ফলে অল্পদিনেই আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একদিন আমাকে কী বুঝে সে একটি বই দেয়। সূচিপত্র দেখে বুঝে যাই, এতে হয়তো আমার মেডিসিন থাকতে পারে।

খুব দ্রুত পুরো বইটি শেষ করি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার প্রেসক্রিপশন পেয়ে যাই। পর্নোগ্রাফি কেন ছাড়ব? এই একটি প্রশ্ন বিগত কিছুদিন ধরে নিজেকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি। 'কিন্তু যে কোটি কোটি স্পার্ম আমার হারাম কামনার কবলে পড়ে শেষ হয়ে গেল, সেগুলো থেকে তো অগণিত ভ্রূণ সৃষ্টি হতে পারত, তার হিসাব কি দেওয়া সম্ভব?' এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিজেকে করা হয়নি।

অন্তরে আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার প্রচণ্ড ভয় ঢুকে গেল। আমার সেই বন্ধুর সঙ্গে বেশি বেশি সময় কাটাতে শুরু করলাম। তাকে অনুরোধ করলাম আমার রুমে চলে আসার। এতে জঘন্য কাজ থেকে দূরে থাকা সহজ হবে।

সেও চলে আসে। সে আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাত। আমিও অনলাইনে টুকটাক ইসলাম নিয়ে পড়াশোনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। পর্নোগ্রাফি নামক টক্সিকের বিরুদ্ধে টনিক হিসেবে কাজ করেছিল কিছু কুরআনের আয়াত ও নবিজির হাদিস। যেমন- 'তোমরা অশ্লীলতার ধারে কাছেও যেয়ো না।' তারপর অশ্লীলতা থেকে ইউসুফ (আ.)-এর পালিয়ে বাঁচাতে দৌড়ে যাওয়া, এক সাহাবির ঘটনা, যিনি গোসলরত এক মহিলাকে দেখার পর যে উপায়ে অনুশোচনা করে সেই ঘটনা... আরও অনেক। আরও একটি হাদিসের কথা মনে পড়ছে। যেখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-'তোমার যদি লজ্জা না থাকে, তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।'

নামাজ শেষে মোনাজাতে পুরোটা সময়জুড়ে এতদিনের কৃত পাপের ক্ষমা চাইতাম। কিছু টেকনিকও অনুসরণ করতাম। যেমন: খুব ভোরে অর্থাৎ ফজর নামাজ আদায় শেষেই গোসল সেরে নিতাম। সব সময় অজু অবস্থায় থাকতাম, যেন ভেতরে পবিত্র অনুভব করতে পারি। কামভাব জাগলে প্রস্রাব করে ফেলতাম, এখনও করি। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কিনা জানি না, কিন্তু এটা খুবই কার্যকর ছিল।

নতুন করে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করলাম। বাইরে ঘোরাঘুরিতে আমার প্রচুর এলার্জي ছিল। যে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা, বাইরের আলোকিত জীবন তার কী আর ভালো লাগার কথা? তাই অনেকটা নিজের সাথে জোর খাটিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার অভ্যাস করি।

মুভিতে ব্যাপকহারে আসক্ত ছিলাম। এটা কোনোক্রমেই ছাড়তে পারছিলাম না। তাই প্রথমে মুভি রিলেটেড গ্রুপ থেকে বের হই। গুগল করে পিজি ১৩ মুভির লিস্ট বের করি। এমন নয় যে, এগুলোতে মডেলরা হিজাব পরিধান করত। তবে আমি অতিমাত্রায় আসক্ত ছিলাম। আগেই বলেছি, আমার চাহিদা ছিল অধিক জঘন্য কিছু (কারণ, আমি এক্সট্রিম পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম)। তাই একটা চুম্বন দৃশ্য আমাকে উত্তেজিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

তবুও একা একা মুভি দেখতাম না। এমনভাবে দেখতাম, যেন সবাই দেখে যে আমি কী দেখছি। নিজের কাছে টাচস্ক্রিন ফোন রাখি না। মায়ের ফোনটা অবশ্য প্রায়ই নিই, তবে সেটা ফেসবুকিং করার জন্য।

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি বেশ। আজ প্রায় তিন বছর পূর্ণ হতে চলল পর্নোগ্রাফি ও মাস্টারবেশনমুক্ত সুস্থ জীবনের। আমার স্বাভাবিক নাইট ইমিশন হচ্ছে এখন। অন্তিম নিশ্বাস পর্যন্ত এভাবেই চলুক, এটাই কামনা।

১২ বছর বয়সি মোটামুটি রক্ষণশীল পরিবারের কোনো কিশোরকে যদি কেউ পর্নোগ্রাফি দেখায়, তবে তার প্রতিক্রিয়া হবে—‘তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! এসব কী বিচ্ছিরি! ওয়াক থু!’ প্রথমবার ওসব দেখার সময় আমার প্রতিক্রিয়া ঠিক এমনই ছিল। পাড়ার এক বড়ো ভাই আমাকে এই নোংরা ভিডিও দেখিয়েছিল। পেশায় তিনি ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রী। যখনকার কথা বলছি, তখন ছিল দ্বিতীয় মোবাইলের জামানা।

২০১৩ সালের কথা। ১৩ বছর বয়সি আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। সে সময় সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না। আমার বয়সি কিছু ছেলে দ্বিতীয় মোবাইল ব্যবহার করত। তবে ওরা পাড়ায় ও স্কুলে পরিচিত ছিল বেয়াদব নামে। ওই ছেলেদের একদিন দেখি স্কুলের টয়লেটের দরজায় লেখা একটা ইংরেজি শব্দ নিয়ে খুব হাসাহাসি করছে। এর মর্মার্থ আমি সেদিন বুঝতে পারিনি।

সেখানে আরও একটা শব্দ পাশাপাশি লেখা ছিল। ছোটো পকেট ডিকশনারিতে অনেক খুঁজেও এটি পেলাম না। স্যারকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। স্যার একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন আমার প্রশ্ন শুনে। তিনি বললেন, 'এটা কোথায় পেয়েছ?' আমি বললাম- 'টয়লেটের দরজায়।' স্যার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেলেন। এরপর হঠাৎ একদিন দেখি দরজায় নতুন রং করা হয়েছে। টয়লেটের দরজায় সেই লেখাটাও আর চোখে পড়েনি।

২০১৪ সালে আবারও টয়লেটে কিছু লেখা চোখে পড়ল। আগের শব্দগুলো তো ছিলই, সাথে নতুন কিছু শব্দ যোগ হয়েছিল। ততদিনে আমি ইন্টারনেটের সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। আব্বু বিদেশ থেকে একটি টাচস্ক্রিন ফোন পাঠিয়েছিলেন ঘরে ব্যবহারের জন্য। আম্মু মোবাইল খুব একটা ব্যবহার করতেন না। এ কারণে আমার কাছেই ফোনটা থাকত।

স্কুলের টয়লেটে দেখা শব্দগুলো এবার আর কাউকে জিজ্ঞেস না করে ডাইরেক্ট গুগল করি। রেজাল্টে যা এলো, আমার চোখ এক্কেবারে কপালে। দেখামাত্রই অপরাধবোধ ও উত্তেজনা একই সরলরেখায় চলা শুরু করেছিল। এখনও ওই ভয়াবহ অনুভূতিটা স্মরণ করতে পারি। ছি!

আমি কিছুটা হলেও ধার্মিক ছিলাম। মানে দৈনিক তিন-চার ওয়াক্ত নামাজ পড়া হতো। কিন্তু সেদিন আমার উত্তেজনা অপরাধবোধকে ছাপিয়ে গেল। আর এগোয়নি। এরপর থেকেই ওসব দেখার শুরু। গোপনে, একটু সংযতভাবে বিচরণ করতে থাকলাম এই জগতে। মাস্টারবেশনও শুরু করলাম। এটা চলত রুটিনমাফিক। নিয়মিত রুটিন ছিল সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন। বিকৃত এই ভিডিওগুলো দেখা ও মাস্টারবেশন; যুগপভাবে।

প্রায় ছয় মাস চলেছিল এ রকম। কিছু টাকা জমিয়ে মেমোরি কার্ড কিনলাম। এরপর দোকানে গিয়ে কার্ডভর্তি ভিডিও লোড করে আনলাম। যখন দেখতে ইচ্ছে হতো, মেমোরি ঢুকিয়ে নিতাম ফোনে। ইন্টারনেটে সরাসরি দেখে সুবিধা হচ্ছিল না বিভিন্ন কারণে।

একদিন বাথরুমে ফোন নিয়ে গেলাম এই উদ্দেশ্যে। হঠাৎ রিংটোন বেজে উঠলে তা আম্মুর কর্ণগোচর হলো। বাথরুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তিনি জেরা করা শুরু করলেন। বাথরুমে ফোনের কী কাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি আমতা আমতা করে বললাম, 'পকেটে ছিল, খেয়াল করিনি।' সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও আম্মুর মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল।

আরেক দিন বাথরুমে থাকাকালীন সময় ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। সেদিন খালা বেড়াতে এসেছিলেন। মা হয়তো খেয়াল করেছিল, কিন্তু আমাকে কিছু বলেননি। এরপর গোসল সেরে বের হওয়ার পর খালা আমাকে ডেকে এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি ঠিক এ রকমই বলেছিলেন—'আব্বু, এই বয়সটায় খুবই খারাপ সময় পার করতে হয়। মোবাইল একটু কম ঘাঁটাঘাঁটি করিস। খারাপ ছেলেদের সাথে মেলামেশা করিস না, আজেবাজে ভিডিও দেখিস না। তুই ভালো ছেলে, ভালো ছেলের মতো চলবি।' আমি কোনোভাবে পাশ কাটিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। মূলত আমি ফোন থেকে মেমোরি কার্ড সরাতে ভুলে গিয়েছিলাম। ফলে পুরো ব্যাপারটাই খালা আর আম্মু ধরে ফেলেছিলেন!

এদিকে জেসএসি পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছিল। তাই ওসব দেখার ভূত মাথা থেকে কিছুদিনের জন্য চলে গেল। ভেবেছিলাম এবার বোধহয় এই নেশা থেকে নিস্তার পাব, কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক যেতে না যেতেই আবারও ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করার তাড়না অনুভব করতে লাগলাম।

কিন্তু আম্মু মোবাইল সব সময় তার কাছে রাখতেন। তাই ওগুলো দেখার সুযোগও আর থাকল না। যদিও ব্যাপারটা আমার জন্য ভালো হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হলো উলটোটা। আমি ইতোমধ্যে যা দেখেছি, সেগুলো কল্পনায় নিয়ে আসতাম। সেই দৃশ্যগুলো কল্পনা করার মাধ্যমে মাস্টারবেশন করতাম। ফলে মাস্টারবেশন করার জন্য সরাসরি বিকৃত ভিডিওগুলো আর দেখতে হতো না। এভাবে চলতে থাকল দিন। ফ্যান্টাসি, মাস্টারবেশন কিছুই থেমে থাকল না।

দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট হলো। ভালো ছাত্র ছিলাম, বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন বা স্কুলের শিক্ষকরা আশা করেছিলেন আমি জিপিএ ৫ পাব; কিন্তু সবাইকে হতাশ করে রেজাল্ট এলো ৪.৫০। অবস্থা বেশ বেগতিক হয়ে পড়ল। এত ভালো একটা ছাত্রের এ রকম খারাপ রেজাল্ট কেউ মেনে নিতে পারবে না-এটাই স্বাভাবিক। এবার আম্মু মুখ খুললেন। আজও কানে ভাসছে সেদিনের কথাগুলো—‘পড়ালেখা না করে সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে ছিলি না! ন্যাংটা মেয়েগুলোর ছবি দেখতি না বাথরুমে গিয়ে! যাহ, এই নে মোবাইল। আরও দেখ গিয়ে! আমার সাথে আর কথা বলবি না। জাহান্নামে যা বেয়াদব।’

মায়ের এই রাগ স্বাভাবিক ছিল। যেহেতু রোল এক ছিল, আব্বু ভাবতেন আমি খুব পড়ুয়া ছেলে। রেজাল্ট নিঃসন্দেহে ভালো হবে; কিন্তু রেজাল্ট তো আর ভালো হয়নি। আম্মু আব্বুকে কীভাবে এই বাজে রেজাল্টের খবর দেবেন, তা নিয়ে রীতিমতো খুব টেনশনে ছিলেন। আমিও ভীষণ হতাশ ও দুঃখিত ছিলাম। মনে মনে স্থির করলাম, ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করা ছেড়ে দেবো। ভালো হয়ে যাব। যেভাবেই হোক পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতেই হবে।

এরপর প্রায় দুই মাস এগুলো থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলাম। শুধু জিদের বসে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত এত ফলপ্রসূ হয়েছিল। মূলত এই নোংরা কাজ থেকে মুক্তি পেতে একটা জেদ অনেক সাহায্য করে। নামাজ পড়তে শুরু করেছিলাম নিয়মিত। আমার সাথে আম্মুর আচরণও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

কিন্তু একদিন...

টিভিতে একটা মুভি দেখছিলাম। একপর্যায়ে খারাপ একটা দৃশ্য চলে আসে। আমি সামান্য এই দৃশ্যও সহ্য করতে পারলাম না। এতটুকুতেই উত্তেজিত হয়ে সোজা বাথরুমে গিয়ে মাস্টারবেশন করে ফেললাম। আর এরপর আবারও সেই অনুশোচনা। এ কী করলাম আমি! মনে মনে আবারও প্রতিজ্ঞা করি, 'আর নাহ! এটাই শেষবার।'

কিন্তু শেষবার হওয়াটা এতই সহজ? তার পরদিন আবারও মাস্টারবেশন। টাইটানিক সিনেমার সেই অশ্লীল দৃশ্য মাথায় ঘুরঘুর করছিল। এভাবে করে পর্নোগ্রাফির অশরীরী প্রেতাত্মা আবারও আমার ঘাড়ে চেপে বসল।

আবারও মাস্টারবেশনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। নিয়মিত অপরাধবোধে ভুগতাম। আর নিয়মিতই প্রতিজ্ঞা করতাম-এই শেষ; আর করব না। আমার এই পচে যাওয়া কারও চোখে পড়েনি। ততদিনে মাও বিশ্বাস করা শুরু করেছিলেন। ফলে আরও অবারিত সুযোগ। আমি ইউটিউবে পড়া দেখব বলে মোবাইল নিয়ে ডুব দিতাম নোংরা জগতে। বিকৃত ভিডিওগুলোতে যা দেখতাম, সেগুলো ক্যাশ করে মোবাইল মায়ের হাতে দিয়ে কিছুক্ষণ পরে বাথরুমে যেতাম, যাতে বুঝতে না পারে।

অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন আমাকে উত্তেজিত করার জন্য একটা চুম্বন দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি আরও বিকৃতমনা হয় গেলাম। হরেক রকম স্টাইল কিংবা এক্সট্রিম কিছু ছাড়া আমার জমত না। এভাবেই পার হতে থাকল দিন। আর আমি পরিণত হচ্ছিলাম আস্ত এক পশুতে।

এভাবেই পার হয়ে গেল আরও দুই বছর। এসএসসি পরীক্ষার বাকি আর তিন মাস। তখন জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলের কথা স্মরণ হওয়ায় অনেক বেশি ধার্মিক হয়ে উঠি। হেব্বি পড়াশোনা শুরু করে দিই। জঘন্য কাজগুলোও বন্ধ করি। এই রেশ ছিল রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত। রেজাল্ট বেরোল। এবার জিপিএ ৫.০০ পেলাম। সবাই খুশিতে আত্মহারা। আব্বু ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা তোমার কী লাগবে? তা যদি চাঁদও হয়, আমি এনে দেবো।' আমার ল্যাপটপ কেনার ইচ্ছে ছিল। আমতা আমতা করে সেটা বলে ফেললাম। এর ঠিক এক মাস পর চাঁদ তথা ল্যাপটপ এসে হাজির। এরপর শহরে চলে যাই পড়াশোনার জন্য।

শহরে গিয়ে মেসে উঠি। ওয়াই-ফাইয়ের সাথে বই মারফত পূর্ব পরিচিতি থাকলেও এবার প্র্যাকটিক্যালি পরিচিত হই। একাই একটা রুম নিয়ে নিই। ফেসবুকে একটি মুভিসংশ্লিষ্ট গ্রুপের সাথে যুক্ত হই। এবার আমার মুভি দেখার নতুন আসক্তি শুরু হয়। যেকোনো মুভিতেই এখন ছোটোখাটো যৌন দৃশ্য থাকে। আর এগুলাই আমার জন্য কাল হলো। প্রায় পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর আবারও পুনঃঅবনতি ঘটে আমার।

পর্নোগ্রাফি দেখলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন আর আমি ভালো রেজাল্ট করতে পারব না, এই ভয়ে বেশ কিছুদিন এই জঘন্য কাজ হতে নিজেকে বিরত রেখেছিলাম। কিন্তু আমি আবারও অকৃতজ্ঞ হলাম। আনলিমিটেড ইন্টারনেট পাওয়ায় আবারও বিষাক্ত নীল দুনিয়ায় ডুব দিলাম। এবার আর আগের মতো অনুশোচনা হলো না। প্রায় প্রতিদিনই গোসলের আগে নোংরা ভিডিওগুলো দেখতাম ও মাস্টারবেশন করতাম। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটা চলে।

ইতোমধ্যে লক্ষ করি, আমার নাইট ইমিশন হচ্ছে না। হঠাৎ নিজেকে নিয়ে চিন্তা শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার শারীরিক অবনতি টের পাই। কিন্তু ততদিনে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা খুইয়ে বসেছি। না চাইলেও খানিক সময়ের জন্য হলেও জানোয়ারে পরিণত হতাম। দেখা গেল, কয়েক সেকেন্ডেই আমার বীর্যপাত হয়ে যায়।

(নাইট ইমিশন; আমরা একে স্বপ্নদোষ বলে জানি। আদতে এটা দোষের কিছু নয়। ছেলেদের আল্লাহ প্রদত্ত অন্যতম একটি নিয়ামত এই নাইট ইমিশন। অবিবাহিত কারও নিয়মিত নাইট ইমিশন সুস্থ যৌন স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয়।)

এসব সমস্যার কথা কাউকে যে বলব, এমন কেউই ছিল না। বাস্তবিকভাবে আমার স্কুলের সব বন্ধুই খুব ভালো ছিল। কথায়, চালচলনে তাদের খুঁত ধরা ছিল অসম্ভব। বাহ্যিকভাবে যতটুকু দেখেছি, তারা ছিল পারফেক্ট। সুতরাং তাদের সাথে একসাথে বসে এই নোংরা ভিডিওগুলো দেখা সম্ভব ছিল না। কেউ এসব দেখে বলে জানতামও না। অফলাইন দুনিয়ায় আমি বড়োই ভদ্রসদ্র এক ছেলে; ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানি না। পাড়ায়, আত্মীয়স্বজন, সর্বমহলে ভদ্র ছেলে হিসেবে আমার ব্যাপক সুখ্যাতি আছে। কিন্তু স্ক্রিনের সামনে এলেই আমি খুব বেহায়া, বেশরম হয়ে পড়তাম।

নিজের শারীরিক, মানসিক অবনতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমি আর আমি নেই; নিকৃষ্ট এক পশুতে পরিণত হয়েছি।

করে চেয়েছিলাম, এই ভয়াল চক্র থেকে যেন মুক্তি পাই। স্ক্রিনের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে কাটাতে পারলেও বাস্তবে কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে পারতাম না। কারণ, স্ক্রিনের বাইরের দুনিয়ায় আমি ছিলাম খুবই লাজুক একটা ছেলে। সব সময় মাথায় কাজ করত-পাছে লোকে কিছু ভাবে কিনা! আদতে আমি ছিলাম ভদ্র মুখোশ পরা এক আস্ত পশু! নিজের এই বিপরীতমুখী আচরণে নিজেকে ভণ্ড, জাল মনে হতো। মানসিক যাতনা বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশি। খুব করে এই জাল থেকে মুক্তি চাইছিলাম; তা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।

ঠিক এ সময় মেসে একটা নতুন ছেলে আসে। বেশ নম্র, ভদ্র ও ধার্মিক। ভেতরে-বাইরে সাদা ও ভালো মনের এই ছেলেটি বেশ মিশুক ছিল। ফলে অল্পদিনেই আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একদিন আমাকে কী বুঝে সে একটি বই দেয়। সূচিপত্র দেখে বুঝে যাই, এতে হয়তো আমার মেডিসিন থাকতে পারে।

খুব দ্রুত পুরো বইটি শেষ করি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার প্রেসক্রিপশন পেয়ে যাই। পর্নোগ্রাফি কেন ছাড়ব? এই একটি প্রশ্ন বিগত কিছুদিন ধরে নিজেকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি। 'কিন্তু যে কোটি কোটি স্পার্ম আমার হারাম কামনার কবলে পড়ে শেষ হয়ে গেল, সেগুলো থেকে তো অগণিত ভ্রূণ সৃষ্টি হতে পারত, তার হিসাব কি দেওয়া সম্ভব?' এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিজেকে করা হয়নি।

অন্তরে আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার প্রচণ্ড ভয় ঢুকে গেল। আমার সেই বন্ধুর সঙ্গে বেশি বেশি সময় কাটাতে শুরু করলাম। তাকে অনুরোধ করলাম আমার রুমে চলে আসার। এতে জঘন্য কাজ থেকে দূরে থাকা সহজ হবে।

সেও চলে আসে। সে আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাত। আমিও অনলাইনে টুকটাক ইসলাম নিয়ে পড়াশোনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। পর্নোগ্রাফি নামক টক্সিকের বিরুদ্ধে টনিক হিসেবে কাজ করেছিল কিছু কুরআনের আয়াত ও নবিজির হাদিস। যেমন- 'তোমরা অশ্লীলতার ধারে কাছেও যেয়ো না।' তারপর অশ্লীলতা থেকে ইউসুফ (আ.)-এর পালিয়ে বাঁচাতে দৌড়ে যাওয়া, এক সাহাবির ঘটনা, যিনি গোসলরত এক মহিলাকে দেখার পর যে উপায়ে অনুশোচনা করে সেই ঘটনা... আরও অনেক। আরও একটি হাদিসের কথা মনে পড়ছে। যেখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-'তোমার যদি লজ্জা না থাকে, তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।'

নামাজ শেষে মোনাজাতে পুরোটা সময়জুড়ে এতদিনের কৃত পাপের ক্ষমা চাইতাম। কিছু টেকনিকও অনুসরণ করতাম। যেমন: খুব ভোরে অর্থাৎ ফজর নামাজ আদায় শেষেই গোসল সেরে নিতাম। সব সময় অজু অবস্থায় থাকতাম, যেন ভেতরে পবিত্র অনুভব করতে পারি। কামভাব জাগলে প্রস্রাব করে ফেলতাম, এখনও করি। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কিনা জানি না, কিন্তু এটা খুবই কার্যকর ছিল।

নতুন করে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করলাম। বাইরে ঘোরাঘুরিতে আমার প্রচুর এলার্জي ছিল। যে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা, বাইরের আলোকিত জীবন তার কী আর ভালো লাগার কথা? তাই অনেকটা নিজের সাথে জোর খাটিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার অভ্যাস করি।

মুভিতে ব্যাপকহারে আসক্ত ছিলাম। এটা কোনোক্রমেই ছাড়তে পারছিলাম না। তাই প্রথমে মুভি রিলেটেড গ্রুপ থেকে বের হই। গুগল করে পিজি ১৩ মুভির লিস্ট বের করি। এমন নয় যে, এগুলোতে মডেলরা হিজাব পরিধান করত। তবে আমি অতিমাত্রায় আসক্ত ছিলাম। আগেই বলেছি, আমার চাহিদা ছিল অধিক জঘন্য কিছু (কারণ, আমি এক্সট্রিম পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম)। তাই একটা চুম্বন দৃশ্য আমাকে উত্তেজিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

তবুও একা একা মুভি দেখতাম না। এমনভাবে দেখতাম, যেন সবাই দেখে যে আমি কী দেখছি। নিজের কাছে টাচস্ক্রিন ফোন রাখি না। মায়ের ফোনটা অবশ্য প্রায়ই নিই, তবে সেটা ফেসবুকিং করার জন্য।

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি বেশ। আজ প্রায় তিন বছর পূর্ণ হতে চলল পর্নোগ্রাফি ও মাস্টারবেশনমুক্ত সুস্থ জীবনের। আমার স্বাভাবিক নাইট ইমিশন হচ্ছে এখন। অন্তিম নিশ্বাস পর্যন্ত এভাবেই চলুক, এটাই কামনা।

১২ বছর বয়সি মোটামুটি রক্ষণশীল পরিবারের কোনো কিশোরকে যদি কেউ পর্নোগ্রাফি দেখায়, তবে তার প্রতিক্রিয়া হবে—‘তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! এসব কী বিচ্ছিরি! ওয়াক থু!’ প্রথমবার ওসব দেখার সময় আমার প্রতিক্রিয়া ঠিক এমনই ছিল। পাড়ার এক বড়ো ভাই আমাকে এই নোংরা ভিডিও দেখিয়েছিল। পেশায় তিনি ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রী। যখনকার কথা বলছি, তখন ছিল দ্বিতীয় মোবাইলের জামানা।

২০১৩ সালের কথা। ১৩ বছর বয়সি আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। সে সময় সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না। আমার বয়সি কিছু ছেলে দ্বিতীয় মোবাইল ব্যবহার করত। তবে ওরা পাড়ায় ও স্কুলে পরিচিত ছিল বেয়াদব নামে। ওই ছেলেদের একদিন দেখি স্কুলের টয়লেটের দরজায় লেখা একটা ইংরেজি শব্দ নিয়ে খুব হাসাহাসি করছে। এর মর্মার্থ আমি সেদিন বুঝতে পারিনি।

সেখানে আরও একটা শব্দ পাশাপাশি লেখা ছিল। ছোটো পকেট ডিকশনারিতে অনেক খুঁজেও এটি পেলাম না। স্যারকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। স্যার একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন আমার প্রশ্ন শুনে। তিনি বললেন, 'এটা কোথায় পেয়েছ?' আমি বললাম- 'টয়লেটের দরজায়।' স্যার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেলেন। এরপর হঠাৎ একদিন দেখি দরজায় নতুন রং করা হয়েছে। টয়লেটের দরজায় সেই লেখাটাও আর চোখে পড়েনি।

২০১৪ সালে আবারও টয়লেটে কিছু লেখা চোখে পড়ল। আগের শব্দগুলো তো ছিলই, সাথে নতুন কিছু শব্দ যোগ হয়েছিল। ততদিনে আমি ইন্টারনেটের সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। আব্বু বিদেশ থেকে একটি টাচস্ক্রিন ফোন পাঠিয়েছিলেন ঘরে ব্যবহারের জন্য। আম্মু মোবাইল খুব একটা ব্যবহার করতেন না। এ কারণে আমার কাছেই ফোনটা থাকত।

স্কুলের টয়লেটে দেখা শব্দগুলো এবার আর কাউকে জিজ্ঞেস না করে ডাইরেক্ট গুগল করি। রেজাল্টে যা এলো, আমার চোখ এক্কেবারে কপালে। দেখামাত্রই অপরাধবোধ ও উত্তেজনা একই সরলরেখায় চলা শুরু করেছিল। এখনও ওই ভয়াবহ অনুভূতিটা স্মরণ করতে পারি। ছি!

আমি কিছুটা হলেও ধার্মিক ছিলাম। মানে দৈনিক তিন-চার ওয়াক্ত নামাজ পড়া হতো। কিন্তু সেদিন আমার উত্তেজনা অপরাধবোধকে ছাপিয়ে গেল। আর এগোয়নি। এরপর থেকেই ওসব দেখার শুরু। গোপনে, একটু সংযতভাবে বিচরণ করতে থাকলাম এই জগতে। মাস্টারবেশনও শুরু করলাম। এটা চলত রুটিনমাফিক। নিয়মিত রুটিন ছিল সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন। বিকৃত এই ভিডিওগুলো দেখা ও মাস্টারবেশন; যুগপভাবে।

প্রায় ছয় মাস চলেছিল এ রকম। কিছু টাকা জমিয়ে মেমোরি কার্ড কিনলাম। এরপর দোকানে গিয়ে কার্ডভর্তি ভিডিও লোড করে আনলাম। যখন দেখতে ইচ্ছে হতো, মেমোরি ঢুকিয়ে নিতাম ফোনে। ইন্টারনেটে সরাসরি দেখে সুবিধা হচ্ছিল না বিভিন্ন কারণে।

একদিন বাথরুমে ফোন নিয়ে গেলাম এই উদ্দেশ্যে। হঠাৎ রিংটোন বেজে উঠলে তা আম্মুর কর্ণগোচর হলো। বাথরুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তিনি জেরা করা শুরু করলেন। বাথরুমে ফোনের কী কাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি আমতা আমতা করে বললাম, 'পকেটে ছিল, খেয়াল করিনি।' সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও আম্মুর মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল।

আরেক দিন বাথরুমে থাকাকালীন সময় ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। সেদিন খালা বেড়াতে এসেছিলেন। মা হয়তো খেয়াল করেছিল, কিন্তু আমাকে কিছু বলেননি। এরপর গোসল সেরে বের হওয়ার পর খালা আমাকে ডেকে এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি ঠিক এ রকমই বলেছিলেন—'আব্বু, এই বয়সটায় খুবই খারাপ সময় পার করতে হয়। মোবাইল একটু কম ঘাঁটাঘাঁটি করিস। খারাপ ছেলেদের সাথে মেলামেশা করিস না, আজেবাজে ভিডিও দেখিস না। তুই ভালো ছেলে, ভালো ছেলের মতো চলবি।' আমি কোনোভাবে পাশ কাটিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। মূলত আমি ফোন থেকে মেমোরি কার্ড সরাতে ভুলে গিয়েছিলাম। ফলে পুরো ব্যাপারটাই খালা আর আম্মু ধরে ফেলেছিলেন!

এদিকে জেসএসি পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছিল। তাই ওসব দেখার ভূত মাথা থেকে কিছুদিনের জন্য চলে গেল। ভেবেছিলাম এবার বোধহয় এই নেশা থেকে নিস্তার পাব, কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক যেতে না যেতেই আবারও ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করার তাড়না অনুভব করতে লাগলাম।

কিন্তু আম্মু মোবাইল সব সময় তার কাছে রাখতেন। তাই ওগুলো দেখার সুযোগও আর থাকল না। যদিও ব্যাপারটা আমার জন্য ভালো হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হলো উলটোটা। আমি ইতোমধ্যে যা দেখেছি, সেগুলো কল্পনায় নিয়ে আসতাম। সেই দৃশ্যগুলো কল্পনা করার মাধ্যমে মাস্টারবেশন করতাম। ফলে মাস্টারবেশন করার জন্য সরাসরি বিকৃত ভিডিওগুলো আর দেখতে হতো না। এভাবে চলতে থাকল দিন। ফ্যান্টাসি, মাস্টারবেশন কিছুই থেমে থাকল না।

দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট হলো। ভালো ছাত্র ছিলাম, বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন বা স্কুলের শিক্ষকরা আশা করেছিলেন আমি জিপিএ ৫ পাব; কিন্তু সবাইকে হতাশ করে রেজাল্ট এলো ৪.৫০। অবস্থা বেশ বেগতিক হয়ে পড়ল। এত ভালো একটা ছাত্রের এ রকম খারাপ রেজাল্ট কেউ মেনে নিতে পারবে না-এটাই স্বাভাবিক। এবার আম্মু মুখ খুললেন। আজও কানে ভাসছে সেদিনের কথাগুলো—‘পড়ালেখা না করে সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে ছিলি না! ন্যাংটা মেয়েগুলোর ছবি দেখতি না বাথরুমে গিয়ে! যাহ, এই নে মোবাইল। আরও দেখ গিয়ে! আমার সাথে আর কথা বলবি না। জাহান্নামে যা বেয়াদব।’

মায়ের এই রাগ স্বাভাবিক ছিল। যেহেতু রোল এক ছিল, আব্বু ভাবতেন আমি খুব পড়ুয়া ছেলে। রেজাল্ট নিঃসন্দেহে ভালো হবে; কিন্তু রেজাল্ট তো আর ভালো হয়নি। আম্মু আব্বুকে কীভাবে এই বাজে রেজাল্টের খবর দেবেন, তা নিয়ে রীতিমতো খুব টেনশনে ছিলেন। আমিও ভীষণ হতাশ ও দুঃখিত ছিলাম। মনে মনে স্থির করলাম, ওসব দেখা ও মাস্টারবেশন করা ছেড়ে দেবো। ভালো হয়ে যাব। যেভাবেই হোক পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতেই হবে।

এরপর প্রায় দুই মাস এগুলো থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলাম। শুধু জিদের বসে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত এত ফলপ্রসূ হয়েছিল। মূলত এই নোংরা কাজ থেকে মুক্তি পেতে একটা জেদ অনেক সাহায্য করে। নামাজ পড়তে শুরু করেছিলাম নিয়মিত। আমার সাথে আম্মুর আচরণও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

কিন্তু একদিন...

টিভিতে একটা মুভি দেখছিলাম। একপর্যায়ে খারাপ একটা দৃশ্য চলে আসে। আমি সামান্য এই দৃশ্যও সহ্য করতে পারলাম না। এতটুকুতেই উত্তেজিত হয়ে সোজা বাথরুমে গিয়ে মাস্টারবেশন করে ফেললাম। আর এরপর আবারও সেই অনুশোচনা। এ কী করলাম আমি! মনে মনে আবারও প্রতিজ্ঞা করি, 'আর নাহ! এটাই শেষবার।'

কিন্তু শেষবার হওয়াটা এতই সহজ? তার পরদিন আবারও মাস্টারবেশন। টাইটানিক সিনেমার সেই অশ্লীল দৃশ্য মাথায় ঘুরঘুর করছিল। এভাবে করে পর্নোগ্রাফির অশরীরী প্রেতাত্মা আবারও আমার ঘাড়ে চেপে বসল।

আবারও মাস্টারবেশনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। নিয়মিত অপরাধবোধে ভুগতাম। আর নিয়মিতই প্রতিজ্ঞা করতাম-এই শেষ; আর করব না। আমার এই পচে যাওয়া কারও চোখে পড়েনি। ততদিনে মাও বিশ্বাস করা শুরু করেছিলেন। ফলে আরও অবারিত সুযোগ। আমি ইউটিউবে পড়া দেখব বলে মোবাইল নিয়ে ডুব দিতাম নোংরা জগতে। বিকৃত ভিডিওগুলোতে যা দেখতাম, সেগুলো ক্যাশ করে মোবাইল মায়ের হাতে দিয়ে কিছুক্ষণ পরে বাথরুমে যেতাম, যাতে বুঝতে না পারে।

অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন আমাকে উত্তেজিত করার জন্য একটা চুম্বন দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি আরও বিকৃতমনা হয় গেলাম। হরেক রকম স্টাইল কিংবা এক্সট্রিম কিছু ছাড়া আমার জমত না। এভাবেই পার হতে থাকল দিন। আর আমি পরিণত হচ্ছিলাম আস্ত এক পশুতে।

এভাবেই পার হয়ে গেল আরও দুই বছর। এসএসসি পরীক্ষার বাকি আর তিন মাস। তখন জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলের কথা স্মরণ হওয়ায় অনেক বেশি ধার্মিক হয়ে উঠি। হেব্বি পড়াশোনা শুরু করে দিই। জঘন্য কাজগুলোও বন্ধ করি। এই রেশ ছিল রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত। রেজাল্ট বেরোল। এবার জিপিএ ৫.০০ পেলাম। সবাই খুশিতে আত্মহারা। আব্বু ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা তোমার কী লাগবে? তা যদি চাঁদও হয়, আমি এনে দেবো।' আমার ল্যাপটপ কেনার ইচ্ছে ছিল। আমতা আমতা করে সেটা বলে ফেললাম। এর ঠিক এক মাস পর চাঁদ তথা ল্যাপটপ এসে হাজির। এরপর শহরে চলে যাই পড়াশোনার জন্য।

শহরে গিয়ে মেসে উঠি। ওয়াই-ফাইয়ের সাথে বই মারফত পূর্ব পরিচিতি থাকলেও এবার প্র্যাকটিক্যালি পরিচিত হই। একাই একটা রুম নিয়ে নিই। ফেসবুকে একটি মুভিসংশ্লিষ্ট গ্রুপের সাথে যুক্ত হই। এবার আমার মুভি দেখার নতুন আসক্তি শুরু হয়। যেকোনো মুভিতেই এখন ছোটোখাটো যৌন দৃশ্য থাকে। আর এগুলাই আমার জন্য কাল হলো। প্রায় পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর আবারও পুনঃঅবনতি ঘটে আমার।

পর্নোগ্রাফি দেখলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন আর আমি ভালো রেজাল্ট করতে পারব না, এই ভয়ে বেশ কিছুদিন এই জঘন্য কাজ হতে নিজেকে বিরত রেখেছিলাম। কিন্তু আমি আবারও অকৃতজ্ঞ হলাম। আনলিমিটেড ইন্টারনেট পাওয়ায় আবারও বিষাক্ত নীল দুনিয়ায় ডুব দিলাম। এবার আর আগের মতো অনুশোচনা হলো না। প্রায় প্রতিদিনই গোসলের আগে নোংরা ভিডিওগুলো দেখতাম ও মাস্টারবেশন করতাম। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটা চলে।

ইতোমধ্যে লক্ষ করি, আমার নাইট ইমিশন হচ্ছে না। হঠাৎ নিজেকে নিয়ে চিন্তা শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার শারীরিক অবনতি টের পাই। কিন্তু ততদিনে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা খুইয়ে বসেছি। না চাইলেও খানিক সময়ের জন্য হলেও জানোয়ারে পরিণত হতাম। দেখা গেল, কয়েক সেকেন্ডেই আমার বীর্যপাত হয়ে যায়।

(নাইট ইমিশন; আমরা একে স্বপ্নদোষ বলে জানি। আদতে এটা দোষের কিছু নয়। ছেলেদের আল্লাহ প্রদত্ত অন্যতম একটি নিয়ামত এই নাইট ইমিশন। অবিবাহিত কারও নিয়মিত নাইট ইমিশন সুস্থ যৌন স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয়।)

এসব সমস্যার কথা কাউকে যে বলব, এমন কেউই ছিল না। বাস্তবিকভাবে আমার স্কুলের সব বন্ধুই খুব ভালো ছিল। কথায়, চালচলনে তাদের খুঁত ধরা ছিল অসম্ভব। বাহ্যিকভাবে যতটুকু দেখেছি, তারা ছিল পারফেক্ট। সুতরাং তাদের সাথে একসাথে বসে এই নোংরা ভিডিওগুলো দেখা সম্ভব ছিল না। কেউ এসব দেখে বলে জানতামও না। অফলাইন দুনিয়ায় আমি বড়োই ভদ্রসদ্র এক ছেলে; ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানি না। পাড়ায়, আত্মীয়স্বজন, সর্বমহলে ভদ্র ছেলে হিসেবে আমার ব্যাপক সুখ্যাতি আছে। কিন্তু স্ক্রিনের সামনে এলেই আমি খুব বেহায়া, বেশরম হয়ে পড়তাম।

নিজের শারীরিক, মানসিক অবনতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমি আর আমি নেই; নিকৃষ্ট এক পশুতে পরিণত হয়েছি।

করে চেয়েছিলাম, এই ভয়াল চক্র থেকে যেন মুক্তি পাই। স্ক্রিনের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে কাটাতে পারলেও বাস্তবে কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে পারতাম না। কারণ, স্ক্রিনের বাইরের দুনিয়ায় আমি ছিলাম খুবই লাজুক একটা ছেলে। সব সময় মাথায় কাজ করত-পাছে লোকে কিছু ভাবে কিনা! আদতে আমি ছিলাম ভদ্র মুখোশ পরা এক আস্ত পশু! নিজের এই বিপরীতমুখী আচরণে নিজেকে ভণ্ড, জাল মনে হতো। মানসিক যাতনা বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশি। খুব করে এই জাল থেকে মুক্তি চাইছিলাম; তা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।

ঠিক এ সময় মেসে একটা নতুন ছেলে আসে। বেশ নম্র, ভদ্র ও ধার্মিক। ভেতরে-বাইরে সাদা ও ভালো মনের এই ছেলেটি বেশ মিশুক ছিল। ফলে অল্পদিনেই আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একদিন আমাকে কী বুঝে সে একটি বই দেয়। সূচিপত্র দেখে বুঝে যাই, এতে হয়তো আমার মেডিসিন থাকতে পারে।

খুব দ্রুত পুরো বইটি শেষ করি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার প্রেসক্রিপশন পেয়ে যাই। পর্নোগ্রাফি কেন ছাড়ব? এই একটি প্রশ্ন বিগত কিছুদিন ধরে নিজেকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি। 'কিন্তু যে কোটি কোটি স্পার্ম আমার হারাম কামনার কবলে পড়ে শেষ হয়ে গেল, সেগুলো থেকে তো অগণিত ভ্রূণ সৃষ্টি হতে পারত, তার হিসাব কি দেওয়া সম্ভব?' এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিজেকে করা হয়নি।

অন্তরে আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার প্রচণ্ড ভয় ঢুকে গেল। আমার সেই বন্ধুর সঙ্গে বেশি বেশি সময় কাটাতে শুরু করলাম। তাকে অনুরোধ করলাম আমার রুমে চলে আসার। এতে জঘন্য কাজ থেকে দূরে থাকা সহজ হবে।

সেও চলে আসে। সে আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাত। আমিও অনলাইনে টুকটাক ইসলাম নিয়ে পড়াশোনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। পর্নোগ্রাফি নামক টক্সিকের বিরুদ্ধে টনিক হিসেবে কাজ করেছিল কিছু কুরআনের আয়াত ও নবিজির হাদিস। যেমন- 'তোমরা অশ্লীলতার ধারে কাছেও যেয়ো না।' তারপর অশ্লীলতা থেকে ইউসুফ (আ.)-এর পালিয়ে বাঁচাতে দৌড়ে যাওয়া, এক সাহাবির ঘটনা, যিনি গোসলরত এক মহিলাকে দেখার পর যে উপায়ে অনুশোচনা করে সেই ঘটনা... আরও অনেক। আরও একটি হাদিসের কথা মনে পড়ছে। যেখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-'তোমার যদি লজ্জা না থাকে, তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।'

নামাজ শেষে মোনাজাতে পুরোটা সময়জুড়ে এতদিনের কৃত পাপের ক্ষমা চাইতাম। কিছু টেকনিকও অনুসরণ করতাম। যেমন: খুব ভোরে অর্থাৎ ফজর নামাজ আদায় শেষেই গোসল সেরে নিতাম। সব সময় অজু অবস্থায় থাকতাম, যেন ভেতরে পবিত্র অনুভব করতে পারি। কামভাব জাগলে প্রস্রাব করে ফেলতাম, এখনও করি। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কিনা জানি না, কিন্তু এটা খুবই কার্যকর ছিল।

নতুন করে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করলাম। বাইরে ঘোরাঘুরিতে আমার প্রচুর এলার্জي ছিল। যে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা, বাইরের আলোকিত জীবন তার কী আর ভালো লাগার কথা? তাই অনেকটা নিজের সাথে জোর খাটিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার অভ্যাস করি।

মুভিতে ব্যাপকহারে আসক্ত ছিলাম। এটা কোনোক্রমেই ছাড়তে পারছিলাম না। তাই প্রথমে মুভি রিলেটেড গ্রুপ থেকে বের হই। গুগল করে পিজি ১৩ মুভির লিস্ট বের করি। এমন নয় যে, এগুলোতে মডেলরা হিজাব পরিধান করত। তবে আমি অতিমাত্রায় আসক্ত ছিলাম। আগেই বলেছি, আমার চাহিদা ছিল অধিক জঘন্য কিছু (কারণ, আমি এক্সট্রিম পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম)। তাই একটা চুম্বন দৃশ্য আমাকে উত্তেজিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

তবুও একা একা মুভি দেখতাম না। এমনভাবে দেখতাম, যেন সবাই দেখে যে আমি কী দেখছি। নিজের কাছে টাচস্ক্রিন ফোন রাখি না। মায়ের ফোনটা অবশ্য প্রায়ই নিই, তবে সেটা ফেসবুকিং করার জন্য।

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি বেশ। আজ প্রায় তিন বছর পূর্ণ হতে চলল পর্নোগ্রাফি ও মাস্টারবেশনমুক্ত সুস্থ জীবনের। আমার স্বাভাবিক নাইট ইমিশন হচ্ছে এখন। অন্তিম নিশ্বাস পর্যন্ত এভাবেই চলুক, এটাই কামনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00