📄 প্রোডাক্টিভ অভ্যাস গঠন
জ্ঞানের মূল সার্থকতা তার প্রয়োগে। জ্ঞান অর্জনের পর সেই জ্ঞানকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারাকেই আমরা প্রজ্ঞা বলি। একদিন একটা কাজ করে আর দশ দিন কোনো খবর নেই, এমন হলে সেটাকে বড়োজোর হুজুগ বলা যায়, জ্ঞান নয়। যখন আপনি আজকের কাজটাকে কাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারবেন, কালকেরটাকে পরশু পর্যন্ত টেনে নিতে পারবেন, তখনই বুঝবেন- আপনার জ্ঞান সার্থক।
অভ্যাস এমন একটা জিনিস, যা আপনার সফলতা তৈরি করতে অথবা আপনার সাফল্যকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। সময়ের সাথে সাথে গড়ে উঠা অভ্যাসগুলোই নির্ধারণ করে দেয়, আপনি কি আর দশজন মানুষের মতো গড়পড়তার জীবন কাটাবেন, নাকি ব্যতিক্রমী একটা জীবনযাপন করবেন। কাজেই, ধারাবাহিক হওয়াটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দুঃখজনকভাবে এর তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। প্রোডাক্টিভিটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বেশ কিছু সময় ধরে লেগে থাকলেই কেবল এটি অর্জন করা যায়। আর সত্যিকারের পরিবর্তন আসে আপনার প্রতিদিনের ছোটো ছোটো সিদ্ধান্তগুলো থেকে।
সেই সিদ্ধান্তগুলো কেমন? চলুন একটু দেখে নিই-
• আমি আজ ফজরের জন্য ঘুম থেকে উঠব, নাকি উঠব না?
• কুরআন পড়ব, নাকি পড়ব না?
• ব্যায়াম করব, নাকি করব না?
• আমি আজ রোজা রাখব, নাকি রাখব না?
• সকালে গুরুত্বপূর্ণ কাজটিতে আমি মনোনিবেশ করব, নাকি করব না?
আমরা কিন্তু প্রতিটি দিনেই এই সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি হই। তবে বেশিরভাগ সময়েই এই সিদ্ধান্তগুলো আমরা সচেতনভাবে নিতে পারি না; বরং অধিকাংশ সময়ে এই সিদ্ধান্তগুলো নেয় আমাদের গড়ে ওঠা অভ্যাসেরা। *
একবার একদল শিক্ষিত ধার্মিক লোকজনের কাছে জানতে চাওয়া হয়-'আজান শুরু হওয়ার সাথে সাথে আপনারা কীভাবে মসজিদে উপস্থিত হন?' জবাবে তারা বলেন-
'এটা আমাদের কৈশোরে গড়ে তোলা অভ্যাস। বৃদ্ধ হলেও এই অভ্যাস ত্যাগ করা সম্ভব নয়।'
২০০৫ সালে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের ৪০% হচ্ছে অভ্যাস। অর্থাৎ, আপনি প্রতিদিন যত কাজ করেন, তার প্রায় অর্ধেকই করেন অভ্যাসবশত। এটা একই সঙ্গে সুসংবাদ আবার দুঃসংবাদও। সুসংবাদ; কারণ, আপনি যদি প্রোডাক্টিভ অভ্যাস গঠন করতে পারেন, আপনি অটোপাইলটের মতো প্রতিদিন ওই কাজগুলো করতেই থাকবেন। আর দুঃসংবাদ হলো-আপনি যদি প্রোডাক্টিভ কাজে অভ্যস্ত না হয়ে অর্থহীন কাজে অভ্যস্ত হন, তাহলে ওই অর্থহীন কাজও আপনার রুটিনের ভেতরে ঢুকে যাবে। অভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। দৃঢ় মনোবল থাকলে আপনি আপনার অভ্যাস সহজেই পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন।
এই অধ্যায়ের আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হলো অভ্যাস। কীভাবে আপনি দৈনন্দিন জীবনে প্রোডাক্টিভ অভ্যাস শুরু করবেন এবং প্রোডাক্টিভিটিকে অটোপাইলটের মতো জীবনের অংশ বানিয়ে নেবেন, সেটা নিয়েই এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
অভ্যাস মূলত কী?
অভ্যাস বা অভ্যাসের প্রকৃত সংজ্ঞা নিয়ে অস্থির হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে কাজটা আপনি নিয়মিত করেন, সেটাই অভ্যাস। অভ্যাস অনেকটাই অটোমেটিক; অর্থাৎ, আপনি কাজটি সম্পর্কে খুব একটা চিন্তা না করে জাস্ট করে ফেলেন।
নিউরোসায়েন্টিস্টরা মনে করেন-অভ্যাসের এই অটোমশন আমাদের মস্তিষ্কের একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া আমাদের মস্তিষ্ককে চিন্তার পরিশ্রম থেকে মুক্তি দেয়। খেয়াল করে দেখবেন-একটা কাজ অভ্যাসে পরিণত হলে সেটা নিয়ে আপনাকে আর চিন্তা-ভাবনা করতে হয় না, সিদ্ধান্তও নিতে হয় না।
কীভাবে নতুন অভ্যাস গড়ে তুলবেন
চার্লস ডুহিগ তার The power of habit The Power বইতে অভ্যাসের সাত-সতেরো তুলে ধরেছেন। যেকোনো নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে চাইলে তিনটি বিষয় আপনাকে মাথায় রাখতে হবে-
• একটি অভ্যাস তৈরি হতে সময় নেয়। রাতারাতি অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
• তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে একটি অভ্যাস গড়ে ওঠে। উপাদান তিনটি হলো-ট্রিগার, রুটিন ও পুরস্কার। এই তিনটি উপাদান হ্যাবিট-লুপ গঠনে একসঙ্গে কাজ করে।
• সবচেয়ে স্বস্তির খবর হলো-অভ্যাসে পরিবর্তন আনা যায় এবং এটাকে মানিয়েও নেওয়া যায়।
অভ্যাস পরিবর্তন
এখন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-আমাদের বর্তমান অভ্যাসগুলো পরিবর্তন এবং নতুন করে প্রোডাক্টিভ অভ্যাস গড়ে তুলতে আমরা কী করতে পারি? এক্ষেত্রে তিনটি কৌশল সর্বাধিক কার্যকর বলে প্রমাণিত-
• ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ।
• অভ্যাস সার্কেল।
• প্রতিস্থাপন পদ্ধতি।
৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ : ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ৩০ দিন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অভ্যাসের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে অগ্রসর হতে বাধ্য করা; যতক্ষণ না আচরণটি আপনার মধ্যে সহজাত হয়ে যায়। ব্যাপারটা খুব সহজ নয়, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে সম্ভব-
ধাপ-১-এমন একটি অভ্যাস বেছে নিন, যা আপনি পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে পরিবর্তন করতে চান বা ভেঙে ফেলতে চান। একসঙ্গে অনেকগুলো অভ্যাস টার্গেট করবেন না। যেকোনো একটা অভ্যাস বেছে নিন, যাতে আপনার জন্য পরিবর্তনটা সহজ হয়।
ধাপ-২-এবার যে অভ্যাসটি তৈরি করতে চাইছেন, সেটি লিখে ফেলুন। প্রতিদিন অভ্যাসটির অনুশীলন করার পর নিজেকে একটি করে টিক মার্ক দিন। আপনার লক্ষ্য হচ্ছে, এক মাসে অন্তত ২৫টি টিক মার্ক অর্জন করা।
ধাপ-৩-৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ শেষ হলে থেমে যাবেন না; বরং আরও জোরেশোরে অভ্যাসটি চালিয়ে যেতে থাকুন। কখনো যদি ট্র্যাক থেকে বিচ্যুত হয়েই যান, তবে ওপরের প্রক্রিয়াটি আবার অনুসরণ করুন।
যেকোনো চ্যালেঞ্জের প্রথম তিন সপ্তাহে (প্রায় ২১ দিন) বেশ কঠিনই হয়। কোনো নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে এই ২১ দিন আপনাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হবে। দৃঢ় মনোবল না থাকলে এই ধাপে টিকে থাকা বেশ কঠিন। যদি টিকে থাকতে পারেন, তখন চতুর্থ সপ্তাহে গিয়ে (এবং তার পরে) ওই নতুন আচরণটি আপনার রুটিনের অংশ হয়ে যাবে। তখন আর কাজটা করতে কঠিনও লাগবে না। সহজেই আপনার মস্তিষ্ক অটোমেটিক করে ফেলবে। আর যদি ৩০ দিনই চালিয়ে যেতে পারেন, তবে আপনাকে অভিনন্দন। আপনি অত্যন্ত সফলতার সাথে আপনার লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন।
একটা কথা মাথায় রাখবেন, এই ৩০ দিনের কষ্ট আপনার জীবনের একটা ছোট্ট বিনিয়োগ, কিন্তু এর লাভের হিসাবটা অনেক বড়ো। একটা সুন্দর অভ্যাস আপনার জীবন পর্যন্ত পালটে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
অভ্যাস সার্কেল :
আগেই একবার বলেছি-অভ্যাস তিনটি অংশে গঠিত : ট্রিগার, রুটিন এবং পুরস্কার। আপনি যদি আপনার কোনো অভ্যাস পরিবর্তন করতে চান, তবে আপনাকে এই তিনটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই যেতে হবে।
চলুন, তার আগে অভ্যাস সার্কেলের উপাদান তিনটি সম্পর্কে জেনে নিই-
ট্রিগার: ট্রিগার মানে যে জিনিসগুলো আপনাকে রুটিনাইজ হতে প্রেরণা জোগাবে। ট্রিগার বাহ্যিকও হতে পারে (অ্যালার্ম ঘড়ি, দিনের সময়, সপ্তাহের দিন ইত্যাদি)। আবার অভ্যন্তরীণও হতে পারে (আবেগ, মানসিক অবস্থা ইত্যাদি)।
রুটিন : রুটিন মানে আপনার দিনের গতিপথ। একটা দিন আপনি কীভাবে কাটাবেন, তার একটা চিত্রকল্প তৈরি করে নেওয়া। যে কাজের অভ্যাস গড়তে চান, সেই কাজটাকে অবশ্যই আপনার রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পুরস্কার : পুরস্কার রুটিনের পরের ধাপ। ধরুন, আপনি নতুন অভ্যাসটা ঠিকঠাক রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেন। এখন আপনার দায়িত্ব হলো-এই করতে পারার জন্য নিজেই নিজেকে গিফট করা। এর ফলে পরের দিনও কাজটা ঠিক সময়ে করার জন্য আপনার ভেতরে একটা তাড়না সৃষ্টি হবে।
একটু কঠিন হয়ে গেল বোধহয়। উদাহরণ দিয়ে বোঝাই- ধরুন, আপনি যদি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে একটি অভ্যাস গ্রহণ করতে চান, সেক্ষেত্রে আপনার অভ্যাসের উপাদান হবে এ রকম-
ট্রিগার: প্রতি সপ্তাহে শনি ও রোববার সকাল ৬:০০টা।
রুটিন: ধরে নিচ্ছি, আপনার নতুন অভ্যাসটা হলো জগিং করা। এখন আপনার কাজ কী? প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে জগিংয়ের পোশাক পরে নেবেন, জুতা পায়ে দেবেন এবং ৩০ মিনিটের জন্য দৌড়াবেন। (একেক দিন একেক সময় না দৌড়ে নির্দিষ্ট সময় বেধে দৌড়ালে রুটিন মেইনটেইন করতে সুবিধা হবে।)
পুরস্কার : প্রতিদিন দৌড়ের ফলে যখন আপনার ওজন কমে যাবে, হালকা বোধ করবেন এবং নিয়মিত ভালো ঘুম হবে, তখন এগুলোই হবে আপনার পুরস্কার। আরও সুস্থ থাকার তাড়নাও তখন আপনার ভেতরে এসে যাবে।
এবার চলুন আমরা আরেকটা উদাহরণ দেখে আসি। মনে করুন, এবার আপনি আপনার একটা খারাপ অভ্যাস ছাড়ার চেষ্টা করছেন। যেমন হতে পারে আপনি কাজ থেকে বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই টিভির সামনে দাঁড়িয়ে যান এবং চকলেট, আইসক্রিম, চিপসের বাটি নিয়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় নষ্ট করেন। আপনি কীভাবে আপনার এই অভ্যাস পরিবর্তন করবেন? প্রথমে আপনাকে এখনকার অভ্যাস সার্কেলটি দেখতে হবে। আপনার সার্কেলটা অনেকটা এমন-
ট্রিগার: বাসায় ফেরা।
রুটিন : টিভি চালু করা। রান্নাঘর থেকে আইসক্রিম ও বিস্কুট নিয়ে আসা। বসা ও টিভি দেখা।
পুরস্কার : সাময়িক তৃপ্তি আমোদ ও কিছুটা সুখ সুখ অনুভব হওয়া।
এখানে ট্রিগার হলো বাসায় ফেরা। বাসায় যেহেতু আপনাকে ফিরতেই হবে, কাজেই এখানে আপনার কিছু করার নেই। তাই চলুন, রুটিন ও পুরস্কারের দিকে নজর দিই। কারণ, এই দুটো জায়গায় পরিবর্তন আনার সুযোগ আছে।
নতুন রুটিন: গোসল করে ফ্রেস হয়ে নিন। রান্নাঘর থেকে সালাদ বা স্বাস্থ্যকর নাশতা (বাদাম, ছোলা প্রভৃতি) খান। বাসায় ফলমূল এনে রাখুন। চিপসের প্যাকেট না রাখার চেষ্টা করুন। খাওয়া শেষে টিভির রিমোট হাতে না নিয়ে বুকশেলফ থেকে বই হাতে তুলে নিন। পত্রিকা বা ম্যাগাজিনও নেওয়া যেতে পারে। পছন্দের কোনো বই পড়ে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিন। বই পড়া শেষ হলে সৃজনশীল কোনো আলোচনা দেখতে পারেন বা বিকেলটা আপনার পরিবারের সাথে খোশগল্পে সময় কাটিয়ে দিন।
নতুন পুরস্কার: আপনি আগের চেয়ে বেশি সজীব এবং মানসিকভাবে উদ্দীপিত হবেন। আপনার শরীর ভালো থাকবে এবং পরিবারের সাথে আপনার সম্পর্কের উন্নতিটা নিজে নিজেই বুঝতে পারবেন।
ওপরের দুটি উদাহরণই বাহ্যিক অভ্যাস গড়ে তোলা বা ছেড়ে দেওয়ার সময় হ্যাবিট সার্কেল কীভাবে কাজ করে, তার উদাহরণ। এবার ধরে নিই-আপনি একটি অভ্যন্তরীণ অভ্যাস পরিবর্তন করতে চান। যেমন: হিংসা, গিবত, মিথ্যা বলা ইত্যাদি। এই দোষগুলোও কিন্তু আপনার অভ্যাসই এবং আপনি চাইলে হ্যাবিটস লুপের সাহায্যে দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য ক্ষতিকর এই দোষগুলোও ছেড়ে দিতে পারেন! কীভাবে? চলুন, হিংসাকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে দেখা যাক-
ট্রিগার : আপনি এমন কাউকে দেখলেন, যার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা আপনার চেয়ে উঁচুতে।
রুটিন : আপনি হিংসায় ছারখার হোন (হয়তো, আপনি তার ক্ষতিসাধনে ষড়যন্ত্রও করে বসেন)।
পুরস্কার: অত্যধিক হিংসা এবং অন্যকে ছোটো করতে পারার নেতিবাচক অনুভূতি।
এখন এই অভ্যাসকে ছাড়তে হলে আপনাকে নতুন অভ্যাস গড়তে হবে। সার্কেলটি দেখতে এমন হবে-
ট্রিগার : আপনি এমন কাউকে লক্ষ করুন, যার পেশাগত ও সামাজিক অবস্থান আপনার চেয়ে উঁচু।
রুটিন: আপনি বলুন, মাশাআল্লাহ, লা-হাওলা ওয়া লা-কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (এটা আল্লাহর ইচ্ছা, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই)! দুআ করুন, যাতে লোকটি আরও বেশি সফলতা পায়। সেইসঙ্গে আপনার কল্যাণের জন্যও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।
পুরস্কার : কাজটা করা কঠিন, তবে এই কাজটা যদি করতে পারেন, তাহলে অন্যরকম একটা সুখ নিজের ভেতরে অনুভব করতে পারবেন।
এবার চলুন, মিথ্যাচারের উদাহরণটা দেখি-
ট্রিগার: সত্য বলার চেয়ে মিথ্যা বলাটা সহজ।
রুটিন: মিথ্যা বলা।
পুরস্কার : পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকা। সাময়িক আনন্দ লাভ করা।
এখন এই অভ্যাস কীভাবে বদলে দেবেন?
ট্রিগার: সত্য কথা বলার চেয়ে মিথ্যা কথা বলাটা সহজ।
রুটিন: সত্য বলুন।
পুরস্কার: স্মরণ করুন, নবিজি বলেছেন-
'সততা সৎকর্মের দিকে পথপ্রদর্শন করে, আর সৎকর্ম জান্নাতের পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোনো মানুষ সত্য কথা বলায় সত্যবাদী হিসেবে (তার নাম) লিপিবদ্ধ হয়। আর অসত্য পাপের পথপ্রদর্শন করে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তি মিথ্যায় রত থাকলে পরিশেষে মিথ্যাবাদী হিসেবেই (তার নাম) লিপিবদ্ধ করা হয়।' মুসলিম : ৬৫৩১
এ সবগুলো উদাহরণেই একটা জিনিস কমন। তা হলো-প্রতিটি বদভ্যাসের 'তথাকথিত পুরস্কারের' বিপরীতে আখিরাতে আমাদের জন্য আছে ভয়াবহ পরিণাম এবং আমাদের ভেতর এই অনুভূতিটা জাগ্রত করতে হবে-এই পৃথিবীই আমাদের আসল ঠিকানা নয়। মরণ একদিন মুছে দেবে সকল পরিচয়। একদিন আমাদের আখিরাতের জীবনে পদার্পণ করতে হবে। সেখানে আমাদের প্রতিটি কাজ ও কথার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
প্রতিস্থাপন পদ্ধতি :
অভ্যাস পরিবর্তনের তৃতীয় পদ্ধতিকে 'প্রতিস্থাপন পদ্ধতি’ বলা হয়। এই পদ্ধতি আপনার ক্ষতিকর একটা অভ্যাসকে নতুন উপকারী একটা অভ্যাসে বদলে দেয়।
কল্পনা করুন, আপনি চরমভাবে আপনার স্মার্টফোনে আসক্ত এবং প্রতিরাতে আপনি পাঁচ ঘণ্টা এর পেছনে ব্যয় করেন। এখন কীভাবে এই অভ্যাসটিতে পরিবর্তন নিয়ে আসবেন? মোবাইল আপনার জন্য ক্ষতিকর সন্দেহ নেই; কিন্তু হঠাৎ মোবাইল থেকে দূরে সরে গেলে আপনার ওই পাঁচ ঘণ্টা সময় আপনি কীভাবে কাটাবেন? কিছু করার না থাকলে হয়তো দেখা যাবে-দুই দিন পর আবারও ফোন হাতে তুলে নিয়েছেন। মানুষের ব্রেইনকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা, সে কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকতে পারে না।
কাজেই, এই অভ্যাসটা পরিবর্তন করতে হলে আপনাকে নতুন কিছু কাজ ওই সময়ে করতে হবে। যে কাজগুলো একই সঙ্গে হবে উপকারী ও আনন্দদায়ক। যেমন : গল্পের বই পড়া বা কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে যাওয়া ভালো একটা বিকল্প হতে পারে।
ইচ্ছাশক্তি
একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, অভ্যাস পরিবর্তন বা নতুন অভ্যাস তৈরি করা সহজ কোনো ব্যাপার না; এর জন্য চাই দৃঢ় ইচ্ছা। চাই অবিরাম লেগে থাকার মতো ধৈর্যশক্তি। অভ্যাস পরিবর্তিত হওয়া পর্যন্ত ইচ্ছাশক্তি ধরে রাখতে কিছু টিপস শেয়ার করছি-
নিয়্যাত : আমাদের ইচ্ছাশক্তি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রাখে আমাদের নিয়্যাত। আপনি যদি একটা কাজের নিয়্যাত ঠিকঠাক না করেন, তবে নিশ্চিতভাবেই কাজটি আপনি করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যদি শুরুতেই একটা কাজের নিয়্যাত করে ফেলেন এবং ক্রমাগত নিজেকে আপনার নিয়্যাতের কথা মনে করিয়ে দেন, তখন কাজটা করা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে।
ছোটো ছোটো পরিবর্তন: রাতারাতি আপনার সমস্ত অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন না। এতে খুব সহজেই হাল ছেড়ে দেবেন এবং আগের অবস্থায় ফিরে যাবেন। ধীরে ধীরে সমন্বয় করুন। জীবন বদলে ফেলার জন্য বিশাল বড়ো পরিবর্তনের দরকার নেই; বরং ছোট্ট একটুখানি পরিবর্তনও আপনার জীবনের গতিপথে এক বিশাল পার্থক্য তৈরি করতে পারে। প্রতিমাসে পরিবর্তন করার জন্য খুব বেশি হলে একসঙ্গে তিনটি অভ্যাস টার্গেট করুন। প্রমাণ করুন, আপনি এই পরিবর্তনে আন্তরিক। ছোটো ছোটো অর্জনে সচেতন হোন। একসঙ্গে অনেকগুলো অভ্যাস ঠিক করতে গিয়ে ভজকট করে ফেলার কোনো মানে হয় না।
স্পষ্ট নির্দেশনা : আপনার নতুন রুটিনের জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা স্থির করুন। আপনি যদি নিয়মিত ব্যায়াম করার ইচ্ছে করেন, তাহলে জিমে যাওয়ার সুনিদিষ্ট দিন-তারিখ নির্ধারণ করুন। সেখানে গিয়ে আপনি কী অনুশীলন করবেন এবং কতক্ষণ থাকবেন, সেটাও ঠিক করুন। চূড়ান্ত মাত্রায় সুনির্দিষ্ট হোন।
প্রিয়জনদের কাছে অঙ্গীকার: আপনার কাছের কাউকে আপনার নতুন লক্ষ্যের কথা জানান। প্রতিদিন কতটুকু আগালেন, সেই আপডেট তাদের জানান। আমরা নিজেদের হতাশ করতে পারি; কিন্তু যাদের অধিক পছন্দ করি, তাদের হতাশ করা অনেক কঠিন। প্রিয়জনের কাছে অঙ্গীকার আপনাকে আপনার লক্ষ্য পূরণে সাহায্যই করবে।
দোয়া করুন: আপনি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনটির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। শেষ পর্যন্ত তিনিই একমাত্র সত্তা; যিনি সবকিছু সহজ করে দিতে পারেন। অভ্যাস পরিবর্তনের কঠিন এই যাত্রাপথ আপনার জন্য সহজ হয়ে যেতে পারে, যদি আল্লাহ তায়ালা আপনার প্রতি সদয় হোন।
ইসলাম ও অভ্যাস
ইসলামের রীতিনীতিগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখবেন, এর প্রায় সবগুলোই একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট নিয়মে পালন করতে হয় এবং এভাবে ইসলামের সব নিয়মই একটা সময় পালন করতে করতে অভ্যাসে পরিণত হয়। এখান থেকেই আমরা বুঝতে পারি-ইসলাম ভালো অভ্যাস তৈরিতে কতটা গুরুত্ব দেয়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো-প্রতিদিনের নামাজ, সকাল-সন্ধ্যার দুআ, রোজা-সব ইবাদাতকেই ইসলাম সুন্দর একটা মেকানিজমের মধ্যে দিয়ে দিয়েছে।
এই মেকানিজমেও অদ্ভুতভাবে ট্রিগার, রুটিন আর পুরস্কারের ব্যবস্থা আছে। বলা যেতে পারে, এই ইবাদতগুলোও ওই হ্যাবিটস লুপের মাধ্যমেই আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। কয়েকটি উদাহরণ দেখলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে-
সালাত : দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সম্ভবত একজন মুসলিমের জীবনের সবচেয়ে বড়ো অভ্যাস, যা তার জীবনের সাথে একেবারে মিশে যায়। নামাজি মানুষটাকে কখনোই নামাজে যাব কি যাব না, এই সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। আজান শোনার সাথে সাথেই অটোমেটিক সে নামাজের প্রস্তুতি শুরু করে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
'নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্যই কর্তব্য।' সূরা নিসা : ১০৩
এই অভ্যাসটির পেছনেও কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সার্কেল আছে।
ট্রিগার : আজান শোনা। হতে পারে সেটা নিকটবর্তী মসজিদের আজান, অ্যাপস অথবা প্রেয়ার-ওয়াচের ভার্চুয়াল আজান।
রুটিন : অজু করা, কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো, হাত বাঁধার নিয়ম, দাঁড়ানোর পদ্ধতি, কীভাবে রুকুতে যাবেন এবং সিজদাহ করবেন, প্রতিটি অবস্থানে আপনাকে কী পড়তে হবে, এ সবকিছুই মূলত রুটিন ওয়ার্কের ভেতরেই পড়ে।
পুরস্কার : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ নিয়মিত সালাত আদায়কারীদের প্রতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছেন-
'বলো তো, যদি তোমাদের কারও বাড়ির সামনে একটি নদী থাকে, আর সে তাতে প্রত্যহ পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার দেহে কোনো ময়লা থাকবে?' তাঁরা বললেন, 'তার দেহে কোনোরূপ ময়লা বাকি থাকবে না।' আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'এ হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের উদাহরণ। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।' বুখারি : ৫২৮
তা ছাড়া আরও শারীরিক ও মানসিক পুরস্কার নামাজের সাথে সম্পৃক্ত। নামাজ পড়ার পর যেমন চাপমুক্ত ফুরফুরে একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়, এটাও পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত।
রোজা: শুধু ইচ্ছাশক্তি আর নিয়্যাত থাকলে কী করা যায়, তার বড়ো একটা প্রমাণ হলো রোজার অভ্যাস। কোনো কিছু না খেয়ে দীর্ঘক্ষণ থাকা বা অন্যান্য খারাপ কাজ থেকে দীর্ঘ একটা সময় সংযম করা, ব্যাপারটা অসম্ভবের পর্যায়েই বলা চলে। কিন্তু দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের কারণে পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলিম এই কঠিন অভ্যাসকেও জীবনের অংশ করে নিয়েছে।
এই ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জের বাইরে নবিজি আমাদের সোম ও বৃহস্পতিবার অথবা ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতিমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এবং যথারীতি এখানেও অভ্যাস সার্কেলের ব্যবহার আছে-
ট্রিগার: সোমবার বা বৃহস্পতিবার অথবা আরবি মাসের ১৩/১৪/১৫ তারিখ।
রুটিন: ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাদ্য, পানীয়, খারাপ কাজ এবং যৌনক্রিয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
পুরস্কার : আধ্যাত্মিক ও শারীরিক প্রতিদানসমূহ।
প্রতিদিনকার সাতটি অভ্যাস যা আপনার আধ্যাত্মিক জীবনকে সুন্দর করে তুলবে।
নিচের সাতটি 'আধ্যাত্মিক অভ্যাস' আপনার দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করার চেষ্টা করুন। এগুলো একজন প্রোডাক্টিভ মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অভ্যাসগুলো একদিকে যেমন আপনার প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি করবে, তেমনই আল্লাহর প্রতি আপনার ভালোবাসা ও বিশ্বাসও বাড়িয়ে তুলবে, ইনশাআল্লাহ।
এই সাতটি আধ্যাত্মিক অভ্যাসকে নফল ইবাদত হিসেবে নোট করে ফেলুন। নিয়্যাত করে ফেলুন যে, আপনি এই আচরণগুলো আপনার অভ্যাসে পরিণত করবেনই। এটুকু করতে পারলেই আপনি আপনার কর্তব্যগুলো পূরণ করছেন। যেমন : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
'নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বলেন-“যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুতা করবে, তার বিরুদ্ধে আমার যুদ্ধের ঘোষণা থাকল। আমার বান্দা যে সমস্ত জিনিস দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার নিকট প্রিয়তম জিনিস হলো-তার ওপর ফরজ করা বিষয়গুলো। (অর্থাৎ, ফরজ আমল দ্বারা নৈকট্য লাভ করা আল্লাহর নিকটে বেশি পছন্দনীয়।) আর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। পরিশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। অতঃপর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার ওই কান হয়ে যাই, যার দ্বারা সে শোনে; তার ওই চোখ হয়ে যাই, যার দ্বারা সে দেখে; তার ওই হাত হয়ে যাই, যার দ্বারা সে ধরে এবং তার ওই পা হয়ে যাই, যার দ্বারা সে চলে। আর সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, তাহলে আমি তাকে দিই এবং সে আমার আশ্রয় চাইলে আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।” বুখারি : ৬৫০২
একটা কথা মনে রাখবেন, আপনার জীবনের মূল লক্ষ্য হবে আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা অর্জন করা। আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা যদি একবার অর্জন করে ফেলতে পারেন, পর্নোগ্রাফি কেন, পৃথিবীর যেকোনো খারাপ অভ্যাস ওই ভালোবাসার স্রোতে খড়কুটার মতো ভেসে যাবে। নিচের এই অভ্যাসগুলো আপনাকে আল্লাহ তায়ালার কাছাকাছি নিয়ে যাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
সাতটি প্রোডাক্টিভ অভ্যাস হলো-
সুন্নত নামাজ আদায়: ফরজ নামাজ শেষ করে তাড়াহুড়ো করে মসজিদ থেকে দ্রুতবেগে বেরিয়ে যাওয়ার অভ্যাসটা আমাদের অনেকেরই থাকে! কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই সুন্নত আদায়ের পুরস্কারটাও কতটা বিশাল? যখন সুন্নত নামাজ ত্যাগ করাতে পুরস্কার হারানোর বিষয়টি উপলব্ধি করব, তখন আমরা সেগুলোও ছেড়ে যাব না। নিয়মিত সুন্নত নামাজ পড়ার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো-ফরজের মতো এগুলোকেও অভ্যাসে পরিণত করে ফেলা। তখন দেখবেন-চাইলেও আপনি ফরজ শেষেই মসজিদ থেকে দৌড় দিতে পারবেন না। সুন্নত না পড়লে আপনার কাছে নামাজটাকেই অসম্পূর্ণ মনে হবে।
সালাত শেষে জিকির : আবারও বলি, ব্যস্ততার কারণে নামাজ শেষে তাড়াহুড়ো করাটা সহজ। কিন্তু নামাজের পর অল্প একটু জিকির করা কি খুব বেশি কঠিন? সম্ভবত না। নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন তো, নামাজের পরের জিকিরগুলো করতে কত সময় লাগে? উত্তর হলো-সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাত মিনিট। এই পাঁচ মিনিটের একটা অভ্যাস যদি আপনার সামনে রহমতের বিরাট দিগন্ত খুলে দেয়, তাহলে এই অভ্যাস করতে আপনার আর দ্বিধা কীসের?
সকাল-সন্ধ্যার জিকির : সকাল দিয়েই আমাদের দিনের শুরু হয়, সন্ধ্যা দিয়ে শুরু হয় রাতের। এই দুই শুরু যদি দুআ দিয়ে করা যায়, তবে কতই-না ভালো হয়! নবিজিও সকালে ও সন্ধ্যায় চমৎকার কিছু দুআ পড়তেন। এই দুআগুলো একদিকে আপনার মানসিক চাপ কমিয়ে দেয়, অন্যদিকে আপনার মন থেকে হতাশার শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দেয়। চাপ আর হতাশা জীবন থেকে দূর করতে পারলে পাপও আপনাআপনিই আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে।
রাতের সালাত : রমজান মাসে সাধারণত মানুষ পাপে কম জড়ায়। রোজা ছাড়াও রাতের তারাবির নামাজ এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। রমজানের পরেও চাইলে আমরা এই রাতের নামাজটা জারি রাখতে পারি। রাতের শেষ প্রহরে খোদার সামনে দাঁড়ানোর চেয়ে সুন্দর কোনো কিছু এই পৃথিবীতে আছে কি না, তা আমি জানি না। যে রাত আপনার কাছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, রবের অবাধ্যতায়, তাহাজ্জুদ সেই রাতকে রহমতের রাত বানিয়ে দিতে পারে। প্রথম প্রথম কষ্ট হবে, কিন্তু ৩০ দিনের একটা অভ্যাস আপনার রাতগুলোকে পালটে দেবে, পালটে দেবে আপনার জীবনের গতিপথকেও।
দুহা সালাত : তাহাজ্জুদের নামাজ যেমন আপনার রাতকে রঙিন করে, তেমনই দুহার সালাত আপনার দিনকে করে তোলে আরও বেশি প্রোডাক্টিভ। সূর্য ওঠার পর থেকে জোহরের ৩০ মিনিট আগের সময়টাতে দুই রাকাত নামাজ আপনার সারাদিনের জ্বালানি হতে পারে। চাইলে আপনি আপনার ক্লাস বা মিটিং-এ যাওয়ার আগের সময়টা ট্রিগার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। বের হওয়ার আগে, অজু করে, রেডি হয়ে, দুই রাকাত নামাজ পড়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন সহজেই।
ঘুমাতে যাওয়ার দুআ : দীর্ঘ ক্লান্তিকর একটা দিনের শেষ, রাতের শুরু। আপনার ক্লান্ত শরীর প্রস্তুত বিছানায় শুয়ে পড়ার জন্য। কিন্তু বালিশে মাথা রাখার আগে, মাত্র ১০টা মিনিটের দুআ আপনাকে দিতে পারে সুন্দরতম ঘুমের অভিজ্ঞতা। দিতে পারে শয়তানের ওয়াসওয়াসামুক্ত রাতের প্রতিশ্রুতি। দিতে পারে ফজরের আজান শুনে সঠিক সময়ে উঠে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস। মাত্র ১০টা মিনিট। খুব বেশি মনে হচ্ছে এখন? অভ্যাসটা করে ফেলতে পারেন কিন্তু!
প্রতিদিন ৩০ মিনিটের কুরআন তিলাওয়াত : না, ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আপনাকে আমি প্রতিদিন পুরো একটা পারা বা পুরো একটা সূরা পড়ে ফেলতে বলছি না। আপনি একটা আয়াতই নাহয় বুঝে বুঝে ৩০ মিনিট ধরে পড়ুন। এই ৩০ মিনিট অভ্যাস হিসেবে আপনার জীবনের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। দেখবেন, ৩০ মিনিটের একটা অভ্যাস আপনার জীবনকে কতখানি পালটে দিতে পারে।
ওপরের সাতটি অভ্যাসই শেষ কথা নয়। শেষ কথা হলো-যেকোনো মূল্যে আপনাকে বাজে অভ্যাস ছাড়তে হবে এবং ভালো অভ্যাসের অনুশীলন বাড়াতে হবে। আপনার কাছে যদি আরও ভালো ভালো অভ্যাসের আইডিয়া থাকে, আপনি সেগুলোও প্র্যাকটিস করতে পারেন।
আধ্যাত্মিকতা মানুষকে দুনিয়ার ভোগবিলাস থেকে বের করে নিয়ে স্রষ্টার প্রেমের মজনু হতে শেখায়। পর্নোগ্রাফির ভয়াবহ ভোগবাদ থেকে বের হতে এই আধ্যাত্মিকতা আপনার জন্য হতে পারে অত্যন্ত কার্যকর এক অস্ত্র।
আর আপনার আধ্যাত্মিকতার তরবারিতে শান দেওয়ার কাজটা করে দেবে ওপরে উল্লেখ করা ওই সাতটি অভ্যাস। আপনি যেখানেই যান কেন, বছরে এ সাতটি অভ্যাস গড়ে তোলার শুরুটা চিন্তা করে ফেলতে পারেন!
আজ থেকেই কিংবা এখন থেকেই!
টিকাঃ
* এই অধ্যায়টি প্রোডাক্টিভ মুসলিম বই থেকে নেওয়া হয়েছে।
জ্ঞানের মূল সার্থকতা তার প্রয়োগে। জ্ঞান অর্জনের পর সেই জ্ঞানকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারাকেই আমরা প্রজ্ঞা বলি। একদিন একটা কাজ করে আর দশ দিন কোনো খবর নেই, এমন হলে সেটাকে বড়োজোর হুজুগ বলা যায়, জ্ঞান নয়। যখন আপনি আজকের কাজটাকে কাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারবেন, কালকেরটাকে পরশু পর্যন্ত টেনে নিতে পারবেন, তখনই বুঝবেন- আপনার জ্ঞান সার্থক।
অভ্যাস এমন একটা জিনিস, যা আপনার সফলতা তৈরি করতে অথবা আপনার সাফল্যকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। সময়ের সাথে সাথে গড়ে উঠা অভ্যাসগুলোই নির্ধারণ করে দেয়, আপনি কি আর দশজন মানুষের মতো গড়পড়তার জীবন কাটাবেন, নাকি ব্যতিক্রমী একটা জীবনযাপন করবেন। কাজেই, ধারাবাহিক হওয়াটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দুঃখজনকভাবে এর তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। প্রোডাক্টিভিটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বেশ কিছু সময় ধরে লেগে থাকলেই কেবল এটি অর্জন করা যায়। আর সত্যিকারের পরিবর্তন আসে আপনার প্রতিদিনের ছোটো ছোটো সিদ্ধান্তগুলো থেকে।
সেই সিদ্ধান্তগুলো কেমন? চলুন একটু দেখে নিই-
• আমি আজ ফজরের জন্য ঘুম থেকে উঠব, নাকি উঠব না?
• কুরআন পড়ব, নাকি পড়ব না?
• ব্যায়াম করব, নাকি করব না?
• আমি আজ রোজা রাখব, নাকি রাখব না?
• সকালে গুরুত্বপূর্ণ কাজটিতে আমি মনোনিবেশ করব, নাকি করব না?
আমরা কিন্তু প্রতিটি দিনেই এই সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি হই। তবে বেশিরভাগ সময়েই এই সিদ্ধান্তগুলো আমরা সচেতনভাবে নিতে পারি না; বরং অধিকাংশ সময়ে এই সিদ্ধান্তগুলো নেয় আমাদের গড়ে ওঠা অভ্যাসেরা। *
একবার একদল শিক্ষিত ধার্মিক লোকজনের কাছে জানতে চাওয়া হয়-'আজান শুরু হওয়ার সাথে সাথে আপনারা কীভাবে মসজিদে উপস্থিত হন?' জবাবে তারা বলেন-
'এটা আমাদের কৈশোরে গড়ে তোলা অভ্যাস। বৃদ্ধ হলেও এই অভ্যাস ত্যাগ করা সম্ভব নয়।'
২০০৫ সালে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের ৪০% হচ্ছে অভ্যাস। অর্থাৎ, আপনি প্রতিদিন যত কাজ করেন, তার প্রায় অর্ধেকই করেন অভ্যাসবশত। এটা একই সঙ্গে সুসংবাদ আবার দুঃসংবাদও। সুসংবাদ; কারণ, আপনি যদি প্রোডাক্টিভ অভ্যাস গঠন করতে পারেন, আপনি অটোপাইলটের মতো প্রতিদিন ওই কাজগুলো করতেই থাকবেন। আর দুঃসংবাদ হলো-আপনি যদি প্রোডাক্টিভ কাজে অভ্যস্ত না হয়ে অর্থহীন কাজে অভ্যস্ত হন, তাহলে ওই অর্থহীন কাজও আপনার রুটিনের ভেতরে ঢুকে যাবে। অভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। দৃঢ় মনোবল থাকলে আপনি আপনার অভ্যাস সহজেই পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন।
এই অধ্যায়ের আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হলো অভ্যাস। কীভাবে আপনি দৈনন্দিন জীবনে প্রোডাক্টিভ অভ্যাস শুরু করবেন এবং প্রোডাক্টিভিটিকে অটোপাইলটের মতো জীবনের অংশ বানিয়ে নেবেন, সেটা নিয়েই এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
অভ্যাস মূলত কী?
অভ্যাস বা অভ্যাসের প্রকৃত সংজ্ঞা নিয়ে অস্থির হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে কাজটা আপনি নিয়মিত করেন, সেটাই অভ্যাস। অভ্যাস অনেকটাই অটোমেটিক; অর্থাৎ, আপনি কাজটি সম্পর্কে খুব একটা চিন্তা না করে জাস্ট করে ফেলেন।
নিউরোসায়েন্টিস্টরা মনে করেন-অভ্যাসের এই অটোমশন আমাদের মস্তিষ্কের একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া আমাদের মস্তিষ্ককে চিন্তার পরিশ্রম থেকে মুক্তি দেয়। খেয়াল করে দেখবেন-একটা কাজ অভ্যাসে পরিণত হলে সেটা নিয়ে আপনাকে আর চিন্তা-ভাবনা করতে হয় না, সিদ্ধান্তও নিতে হয় না।
কীভাবে নতুন অভ্যাস গড়ে তুলবেন
চার্লস ডুহিগ তার The power of habit The Power বইতে অভ্যাসের সাত-সতেরো তুলে ধরেছেন। যেকোনো নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে চাইলে তিনটি বিষয় আপনাকে মাথায় রাখতে হবে-
• একটি অভ্যাস তৈরি হতে সময় নেয়। রাতারাতি অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
• তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে একটি অভ্যাস গড়ে ওঠে। উপাদান তিনটি হলো-ট্রিগার, রুটিন ও পুরস্কার। এই তিনটি উপাদান হ্যাবিট-লুপ গঠনে একসঙ্গে কাজ করে।
• সবচেয়ে স্বস্তির খবর হলো-অভ্যাসে পরিবর্তন আনা যায় এবং এটাকে মানিয়েও নেওয়া যায়।
অভ্যাস পরিবর্তন
এখন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-আমাদের বর্তমান অভ্যাসগুলো পরিবর্তন এবং নতুন করে প্রোডাক্টিভ অভ্যাস গড়ে তুলতে আমরা কী করতে পারি? এক্ষেত্রে তিনটি কৌশল সর্বাধিক কার্যকর বলে প্রমাণিত-
• ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ।
• অভ্যাস সার্কেল।
• প্রতিস্থাপন পদ্ধতি।
৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ : ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ৩০ দিন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অভ্যাসের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে অগ্রসর হতে বাধ্য করা; যতক্ষণ না আচরণটি আপনার মধ্যে সহজাত হয়ে যায়। ব্যাপারটা খুব সহজ নয়, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে সম্ভব-
ধাপ-১-এমন একটি অভ্যাস বেছে নিন, যা আপনি পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে পরিবর্তন করতে চান বা ভেঙে ফেলতে চান। একসঙ্গে অনেকগুলো অভ্যাস টার্গেট করবেন না। যেকোনো একটা অভ্যাস বেছে নিন, যাতে আপনার জন্য পরিবর্তনটা সহজ হয়।
ধাপ-২-এবার যে অভ্যাসটি তৈরি করতে চাইছেন, সেটি লিখে ফেলুন। প্রতিদিন অভ্যাসটির অনুশীলন করার পর নিজেকে একটি করে টিক মার্ক দিন। আপনার লক্ষ্য হচ্ছে, এক মাসে অন্তত ২৫টি টিক মার্ক অর্জন করা।
ধাপ-৩-৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ শেষ হলে থেমে যাবেন না; বরং আরও জোরেশোরে অভ্যাসটি চালিয়ে যেতে থাকুন। কখনো যদি ট্র্যাক থেকে বিচ্যুত হয়েই যান, তবে ওপরের প্রক্রিয়াটি আবার অনুসরণ করুন।
যেকোনো চ্যালেঞ্জের প্রথম তিন সপ্তাহে (প্রায় ২১ দিন) বেশ কঠিনই হয়। কোনো নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে এই ২১ দিন আপনাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হবে। দৃঢ় মনোবল না থাকলে এই ধাপে টিকে থাকা বেশ কঠিন। যদি টিকে থাকতে পারেন, তখন চতুর্থ সপ্তাহে গিয়ে (এবং তার পরে) ওই নতুন আচরণটি আপনার রুটিনের অংশ হয়ে যাবে। তখন আর কাজটা করতে কঠিনও লাগবে না। সহজেই আপনার মস্তিষ্ক অটোমেটিক করে ফেলবে। আর যদি ৩০ দিনই চালিয়ে যেতে পারেন, তবে আপনাকে অভিনন্দন। আপনি অত্যন্ত সফলতার সাথে আপনার লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন।
একটা কথা মাথায় রাখবেন, এই ৩০ দিনের কষ্ট আপনার জীবনের একটা ছোট্ট বিনিয়োগ, কিন্তু এর লাভের হিসাবটা অনেক বড়ো। একটা সুন্দর অভ্যাস আপনার জীবন পর্যন্ত পালটে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
অভ্যাস সার্কেল :
আগেই একবার বলেছি-অভ্যাস তিনটি অংশে গঠিত : ট্রিগার, রুটিন এবং পুরস্কার। আপনি যদি আপনার কোনো অভ্যাস পরিবর্তন করতে চান, তবে আপনাকে এই তিনটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই যেতে হবে।
চলুন, তার আগে অভ্যাস সার্কেলের উপাদান তিনটি সম্পর্কে জেনে নিই-
ট্রিগার: ট্রিগার মানে যে জিনিসগুলো আপনাকে রুটিনাইজ হতে প্রেরণা জোগাবে। ট্রিগার বাহ্যিকও হতে পারে (অ্যালার্ম ঘড়ি, দিনের সময়, সপ্তাহের দিন ইত্যাদি)। আবার অভ্যন্তরীণও হতে পারে (আবেগ, মানসিক অবস্থা ইত্যাদি)।
রুটিন : রুটিন মানে আপনার দিনের গতিপথ। একটা দিন আপনি কীভাবে কাটাবেন, তার একটা চিত্রকল্প তৈরি করে নেওয়া। যে কাজের অভ্যাস গড়তে চান, সেই কাজটাকে অবশ্যই আপনার রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পুরস্কার : পুরস্কার রুটিনের পরের ধাপ। ধরুন, আপনি নতুন অভ্যাসটা ঠিকঠাক রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেন। এখন আপনার দায়িত্ব হলো-এই করতে পারার জন্য নিজেই নিজেকে গিফট করা। এর ফলে পরের দিনও কাজটা ঠিক সময়ে করার জন্য আপনার ভেতরে একটা তাড়না সৃষ্টি হবে।
একটু কঠিন হয়ে গেল বোধহয়। উদাহরণ দিয়ে বোঝাই- ধরুন, আপনি যদি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে একটি অভ্যাস গ্রহণ করতে চান, সেক্ষেত্রে আপনার অভ্যাসের উপাদান হবে এ রকম-
ট্রিগার: প্রতি সপ্তাহে শনি ও রোববার সকাল ৬:০০টা।
রুটিন: ধরে নিচ্ছি, আপনার নতুন অভ্যাসটা হলো জগিং করা। এখন আপনার কাজ কী? প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে জগিংয়ের পোশাক পরে নেবেন, জুতা পায়ে দেবেন এবং ৩০ মিনিটের জন্য দৌড়াবেন। (একেক দিন একেক সময় না দৌড়ে নির্দিষ্ট সময় বেধে দৌড়ালে রুটিন মেইনটেইন করতে সুবিধা হবে।)
পুরস্কার : প্রতিদিন দৌড়ের ফলে যখন আপনার ওজন কমে যাবে, হালকা বোধ করবেন এবং নিয়মিত ভালো ঘুম হবে, তখন এগুলোই হবে আপনার পুরস্কার। আরও সুস্থ থাকার তাড়নাও তখন আপনার ভেতরে এসে যাবে।
এবার চলুন আমরা আরেকটা উদাহরণ দেখে আসি। মনে করুন, এবার আপনি আপনার একটা খারাপ অভ্যাস ছাড়ার চেষ্টা করছেন। যেমন হতে পারে আপনি কাজ থেকে বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই টিভির সামনে দাঁড়িয়ে যান এবং চকলেট, আইসক্রিম, চিপসের বাটি নিয়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় নষ্ট করেন। আপনি কীভাবে আপনার এই অভ্যাস পরিবর্তন করবেন? প্রথমে আপনাকে এখনকার অভ্যাস সার্কেলটি দেখতে হবে। আপনার সার্কেলটা অনেকটা এমন-
ট্রিগার: বাসায় ফেরা।
রুটিন : টিভি চালু করা। রান্নাঘর থেকে আইসক্রিম ও বিস্কুট নিয়ে আসা। বসা ও টিভি দেখা।
পুরস্কার : সাময়িক তৃপ্তি আমোদ ও কিছুটা সুখ সুখ অনুভব হওয়া।
এখানে ট্রিগার হলো বাসায় ফেরা। বাসায় যেহেতু আপনাকে ফিরতেই হবে, কাজেই এখানে আপনার কিছু করার নেই। তাই চলুন, রুটিন ও পুরস্কারের দিকে নজর দিই। কারণ, এই দুটো জায়গায় পরিবর্তন আনার সুযোগ আছে।
নতুন রুটিন: গোসল করে ফ্রেস হয়ে নিন। রান্নাঘর থেকে সালাদ বা স্বাস্থ্যকর নাশতা (বাদাম, ছোলা প্রভৃতি) খান। বাসায় ফলমূল এনে রাখুন। চিপসের প্যাকেট না রাখার চেষ্টা করুন। খাওয়া শেষে টিভির রিমোট হাতে না নিয়ে বুকশেলফ থেকে বই হাতে তুলে নিন। পত্রিকা বা ম্যাগাজিনও নেওয়া যেতে পারে। পছন্দের কোনো বই পড়ে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিন। বই পড়া শেষ হলে সৃজনশীল কোনো আলোচনা দেখতে পারেন বা বিকেলটা আপনার পরিবারের সাথে খোশগল্পে সময় কাটিয়ে দিন।
নতুন পুরস্কার: আপনি আগের চেয়ে বেশি সজীব এবং মানসিকভাবে উদ্দীপিত হবেন। আপনার শরীর ভালো থাকবে এবং পরিবারের সাথে আপনার সম্পর্কের উন্নতিটা নিজে নিজেই বুঝতে পারবেন।
ওপরের দুটি উদাহরণই বাহ্যিক অভ্যাস গড়ে তোলা বা ছেড়ে দেওয়ার সময় হ্যাবিট সার্কেল কীভাবে কাজ করে, তার উদাহরণ। এবার ধরে নিই-আপনি একটি অভ্যন্তরীণ অভ্যাস পরিবর্তন করতে চান। যেমন: হিংসা, গিবত, মিথ্যা বলা ইত্যাদি। এই দোষগুলোও কিন্তু আপনার অভ্যাসই এবং আপনি চাইলে হ্যাবিটস লুপের সাহায্যে দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য ক্ষতিকর এই দোষগুলোও ছেড়ে দিতে পারেন! কীভাবে? চলুন, হিংসাকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে দেখা যাক-
ট্রিগার : আপনি এমন কাউকে দেখলেন, যার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা আপনার চেয়ে উঁচুতে।
রুটিন : আপনি হিংসায় ছারখার হোন (হয়তো, আপনি তার ক্ষতিসাধনে ষড়যন্ত্রও করে বসেন)।
পুরস্কার: অত্যধিক হিংসা এবং অন্যকে ছোটো করতে পারার নেতিবাচক অনুভূতি।
এখন এই অভ্যাসকে ছাড়তে হলে আপনাকে নতুন অভ্যাস গড়তে হবে। সার্কেলটি দেখতে এমন হবে-
ট্রিগার : আপনি এমন কাউকে লক্ষ করুন, যার পেশাগত ও সামাজিক অবস্থান আপনার চেয়ে উঁচু।
রুটিন: আপনি বলুন, মাশাআল্লাহ, লা-হাওলা ওয়া লা-কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (এটা আল্লাহর ইচ্ছা, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই)! দুআ করুন, যাতে লোকটি আরও বেশি সফলতা পায়। সেইসঙ্গে আপনার কল্যাণের জন্যও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।
পুরস্কার : কাজটা করা কঠিন, তবে এই কাজটা যদি করতে পারেন, তাহলে অন্যরকম একটা সুখ নিজের ভেতরে অনুভব করতে পারবেন।
এবার চলুন, মিথ্যাচারের উদাহরণটা দেখি-
ট্রিগার: সত্য বলার চেয়ে মিথ্যা বলাটা সহজ।
রুটিন: মিথ্যা বলা।
পুরস্কার : পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকা। সাময়িক আনন্দ লাভ করা।
এখন এই অভ্যাস কীভাবে বদলে দেবেন?
ট্রিগার: সত্য কথা বলার চেয়ে মিথ্যা কথা বলাটা সহজ।
রুটিন: সত্য বলুন।
পুরস্কার: স্মরণ করুন, নবিজি বলেছেন-
'সততা সৎকর্মের দিকে পথপ্রদর্শন করে, আর সৎকর্ম জান্নাতের পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোনো মানুষ সত্য কথা বলায় সত্যবাদী হিসেবে (তার নাম) লিপিবদ্ধ হয়। আর অসত্য পাপের পথপ্রদর্শন করে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তি মিথ্যায় রত থাকলে পরিশেষে মিথ্যাবাদী হিসেবেই (তার নাম) লিপিবদ্ধ করা হয়।' মুসলিম : ৬৫৩১
এ সবগুলো উদাহরণেই একটা জিনিস কমন। তা হলো-প্রতিটি বদভ্যাসের 'তথাকথিত পুরস্কারের' বিপরীতে আখিরাতে আমাদের জন্য আছে ভয়াবহ পরিণাম এবং আমাদের ভেতর এই অনুভূতিটা জাগ্রত করতে হবে-এই পৃথিবীই আমাদের আসল ঠিকানা নয়। মরণ একদিন মুছে দেবে সকল পরিচয়। একদিন আমাদের আখিরাতের জীবনে পদার্পণ করতে হবে। সেখানে আমাদের প্রতিটি কাজ ও কথার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
প্রতিস্থাপন পদ্ধতি :
অভ্যাস পরিবর্তনের তৃতীয় পদ্ধতিকে 'প্রতিস্থাপন পদ্ধতি’ বলা হয়। এই পদ্ধতি আপনার ক্ষতিকর একটা অভ্যাসকে নতুন উপকারী একটা অভ্যাসে বদলে দেয়।
কল্পনা করুন, আপনি চরমভাবে আপনার স্মার্টফোনে আসক্ত এবং প্রতিরাতে আপনি পাঁচ ঘণ্টা এর পেছনে ব্যয় করেন। এখন কীভাবে এই অভ্যাসটিতে পরিবর্তন নিয়ে আসবেন? মোবাইল আপনার জন্য ক্ষতিকর সন্দেহ নেই; কিন্তু হঠাৎ মোবাইল থেকে দূরে সরে গেলে আপনার ওই পাঁচ ঘণ্টা সময় আপনি কীভাবে কাটাবেন? কিছু করার না থাকলে হয়তো দেখা যাবে-দুই দিন পর আবারও ফোন হাতে তুলে নিয়েছেন। মানুষের ব্রেইনকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা, সে কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকতে পারে না।
কাজেই, এই অভ্যাসটা পরিবর্তন করতে হলে আপনাকে নতুন কিছু কাজ ওই সময়ে করতে হবে। যে কাজগুলো একই সঙ্গে হবে উপকারী ও আনন্দদায়ক। যেমন : গল্পের বই পড়া বা কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে যাওয়া ভালো একটা বিকল্প হতে পারে।
ইচ্ছাশক্তি
একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, অভ্যাস পরিবর্তন বা নতুন অভ্যাস তৈরি করা সহজ কোনো ব্যাপার না; এর জন্য চাই দৃঢ় ইচ্ছা। চাই অবিরাম লেগে থাকার মতো ধৈর্যশক্তি। অভ্যাস পরিবর্তিত হওয়া পর্যন্ত ইচ্ছাশক্তি ধরে রাখতে কিছু টিপস শেয়ার করছি-
নিয়্যাত : আমাদের ইচ্ছাশক্তি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রাখে আমাদের নিয়্যাত। আপনি যদি একটা কাজের নিয়্যাত ঠিকঠাক না করেন, তবে নিশ্চিতভাবেই কাজটি আপনি করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যদি শুরুতেই একটা কাজের নিয়্যাত করে ফেলেন এবং ক্রমাগত নিজেকে আপনার নিয়্যাতের কথা মনে করিয়ে দেন, তখন কাজটা করা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে।
ছোটো ছোটো পরিবর্তন: রাতারাতি আপনার সমস্ত অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন না। এতে খুব সহজেই হাল ছেড়ে দেবেন এবং আগের অবস্থায় ফিরে যাবেন। ধীরে ধীরে সমন্বয় করুন। জীবন বদলে ফেলার জন্য বিশাল বড়ো পরিবর্তনের দরকার নেই; বরং ছোট্ট একটুখানি পরিবর্তনও আপনার জীবনের গতিপথে এক বিশাল পার্থক্য তৈরি করতে পারে। প্রতিমাসে পরিবর্তন করার জন্য খুব বেশি হলে একসঙ্গে তিনটি অভ্যাস টার্গেট করুন। প্রমাণ করুন, আপনি এই পরিবর্তনে আন্তরিক। ছোটো ছোটো অর্জনে সচেতন হোন। একসঙ্গে অনেকগুলো অভ্যাস ঠিক করতে গিয়ে ভজকট করে ফেলার কোনো মানে হয় না।
স্পষ্ট নির্দেশনা : আপনার নতুন রুটিনের জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা স্থির করুন। আপনি যদি নিয়মিত ব্যায়াম করার ইচ্ছে করেন, তাহলে জিমে যাওয়ার সুনিদিষ্ট দিন-তারিখ নির্ধারণ করুন। সেখানে গিয়ে আপনি কী অনুশীলন করবেন এবং কতক্ষণ থাকবেন, সেটাও ঠিক করুন। চূড়ান্ত মাত্রায় সুনির্দিষ্ট হোন।
প্রিয়জনদের কাছে অঙ্গীকার: আপনার কাছের কাউকে আপনার নতুন লক্ষ্যের কথা জানান। প্রতিদিন কতটুকু আগালেন, সেই আপডেট তাদের জানান। আমরা নিজেদের হতাশ করতে পারি; কিন্তু যাদের অধিক পছন্দ করি, তাদের হতাশ করা অনেক কঠিন। প্রিয়জনের কাছে অঙ্গীকার আপনাকে আপনার লক্ষ্য পূরণে সাহায্যই করবে।
দোয়া করুন: আপনি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনটির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। শেষ পর্যন্ত তিনিই একমাত্র সত্তা; যিনি সবকিছু সহজ করে দিতে পারেন। অভ্যাস পরিবর্তনের কঠিন এই যাত্রাপথ আপনার জন্য সহজ হয়ে যেতে পারে, যদি আল্লাহ তায়ালা আপনার প্রতি সদয় হোন।
ইসলাম ও অভ্যাস
ইসলামের রীতিনীতিগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখবেন, এর প্রায় সবগুলোই একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট নিয়মে পালন করতে হয় এবং এভাবে ইসলামের সব নিয়মই একটা সময় পালন করতে করতে অভ্যাসে পরিণত হয়। এখান থেকেই আমরা বুঝতে পারি-ইসলাম ভালো অভ্যাস তৈরিতে কতটা গুরুত্ব দেয়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো-প্রতিদিনের নামাজ, সকাল-সন্ধ্যার দুআ, রোজা-সব ইবাদাতকেই ইসলাম সুন্দর একটা মেকানিজমের মধ্যে দিয়ে দিয়েছে।
এই মেকানিজমেও অদ্ভুতভাবে ট্রিগার, রুটিন আর পুরস্কারের ব্যবস্থা আছে। বলা যেতে পারে, এই ইবাদতগুলোও ওই হ্যাবিটস লুপের মাধ্যমেই আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। কয়েকটি উদাহরণ দেখলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে-
সালাত : দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সম্ভবত একজন মুসলিমের জীবনের সবচেয়ে বড়ো অভ্যাস, যা তার জীবনের সাথে একেবারে মিশে যায়। নামাজি মানুষটাকে কখনোই নামাজে যাব কি যাব না, এই সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। আজান শোনার সাথে সাথেই অটোমেটিক সে নামাজের প্রস্তুতি শুরু করে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
'নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্যই কর্তব্য।' সূরা নিসা : ১০৩
এই অভ্যাসটির পেছনেও কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সার্কেল আছে।
ট্রিগার : আজান শোনা। হতে পারে সেটা নিকটবর্তী মসজিদের আজান, অ্যাপস অথবা প্রেয়ার-ওয়াচের ভার্চুয়াল আজান।
রুটিন : অজু করা, কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো, হাত বাঁধার নিয়ম, দাঁড়ানোর পদ্ধতি, কীভাবে রুকুতে যাবেন এবং সিজদাহ করবেন, প্রতিটি অবস্থানে আপনাকে কী পড়তে হবে, এ সবকিছুই মূলত রুটিন ওয়ার্কের ভেতরেই পড়ে।
পুরস্কার : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ নিয়মিত সালাত আদায়কারীদের প্রতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছেন-
'বলো তো, যদি তোমাদের কারও বাড়ির সামনে একটি নদী থাকে, আর সে তাতে প্রত্যহ পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার দেহে কোনো ময়লা থাকবে?' তাঁরা বললেন, 'তার দেহে কোনোরূপ ময়লা বাকি থাকবে না।' আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'এ হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের উদাহরণ। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।' বুখারি : ৫২৮
তা ছাড়া আরও শারীরিক ও মানসিক পুরস্কার নামাজের সাথে সম্পৃক্ত। নামাজ পড়ার পর যেমন চাপমুক্ত ফুরফুরে একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়, এটাও পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত।
রোজা: শুধু ইচ্ছাশক্তি আর নিয়্যাত থাকলে কী করা যায়, তার বড়ো একটা প্রমাণ হলো রোজার অভ্যাস। কোনো কিছু না খেয়ে দীর্ঘক্ষণ থাকা বা অন্যান্য খারাপ কাজ থেকে দীর্ঘ একটা সময় সংযম করা, ব্যাপারটা অসম্ভবের পর্যায়েই বলা চলে। কিন্তু দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের কারণে পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলিম এই কঠিন অভ্যাসকেও জীবনের অংশ করে নিয়েছে।
এই ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জের বাইরে নবিজি আমাদের সোম ও বৃহস্পতিবার অথবা ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতিমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এবং যথারীতি এখানেও অভ্যাস সার্কেলের ব্যবহার আছে-
ট্রিগার: সোমবার বা বৃহস্পতিবার অথবা আরবি মাসের ১৩/১৪/১৫ তারিখ।
রুটিন: ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাদ্য, পানীয়, খারাপ কাজ এবং যৌনক্রিয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
পুরস্কার : আধ্যাত্মিক ও শারীরিক প্রতিদানসমূহ।
প্রতিদিনকার সাতটি অভ্যাস যা আপনার আধ্যাত্মিক জীবনকে সুন্দর করে তুলবে।
নিচের সাতটি 'আধ্যাত্মিক অভ্যাস' আপনার দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করার চেষ্টা করুন। এগুলো একজন প্রোডাক্টিভ মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অভ্যাসগুলো একদিকে যেমন আপনার প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি করবে, তেমনই আল্লাহর প্রতি আপনার ভালোবাসা ও বিশ্বাসও বাড়িয়ে তুলবে, ইনশাআল্লাহ।
এই সাতটি আধ্যাত্মিক অভ্যাসকে নফল ইবাদত হিসেবে নোট করে ফেলুন। নিয়্যাত করে ফেলুন যে, আপনি এই আচরণগুলো আপনার অভ্যাসে পরিণত করবেনই। এটুকু করতে পারলেই আপনি আপনার কর্তব্যগুলো পূরণ করছেন। যেমন : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
'নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বলেন-“যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুতা করবে, তার বিরুদ্ধে আমার যুদ্ধের ঘোষণা থাকল। আমার বান্দা যে সমস্ত জিনিস দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার নিকট প্রিয়তম জিনিস হলো-তার ওপর ফরজ করা বিষয়গুলো। (অর্থাৎ, ফরজ আমল দ্বারা নৈকট্য লাভ করা আল্লাহর নিকটে বেশি পছন্দনীয়।) আর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। পরিশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। অতঃপর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার ওই কান হয়ে যাই, যার দ্বারা সে শোনে; তার ওই চোখ হয়ে যাই, যার দ্বারা সে দেখে; তার ওই হাত হয়ে যাই, যার দ্বারা সে ধরে এবং তার ওই পা হয়ে যাই, যার দ্বারা সে চলে। আর সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, তাহলে আমি তাকে দিই এবং সে আমার আশ্রয় চাইলে আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।” বুখারি : ৬৫০২
একটা কথা মনে রাখবেন, আপনার জীবনের মূল লক্ষ্য হবে আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা অর্জন করা। আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা যদি একবার অর্জন করে ফেলতে পারেন, পর্নোগ্রাফি কেন, পৃথিবীর যেকোনো খারাপ অভ্যাস ওই ভালোবাসার স্রোতে খড়কুটার মতো ভেসে যাবে। নিচের এই অভ্যাসগুলো আপনাকে আল্লাহ তায়ালার কাছাকাছি নিয়ে যাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
সাতটি প্রোডাক্টিভ অভ্যাস হলো-
সুন্নত নামাজ আদায়: ফরজ নামাজ শেষ করে তাড়াহুড়ো করে মসজিদ থেকে দ্রুতবেগে বেরিয়ে যাওয়ার অভ্যাসটা আমাদের অনেকেরই থাকে! কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই সুন্নত আদায়ের পুরস্কারটাও কতটা বিশাল? যখন সুন্নত নামাজ ত্যাগ করাতে পুরস্কার হারানোর বিষয়টি উপলব্ধি করব, তখন আমরা সেগুলোও ছেড়ে যাব না। নিয়মিত সুন্নত নামাজ পড়ার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো-ফরজের মতো এগুলোকেও অভ্যাসে পরিণত করে ফেলা। তখন দেখবেন-চাইলেও আপনি ফরজ শেষেই মসজিদ থেকে দৌড় দিতে পারবেন না। সুন্নত না পড়লে আপনার কাছে নামাজটাকেই অসম্পূর্ণ মনে হবে।
সালাত শেষে জিকির : আবারও বলি, ব্যস্ততার কারণে নামাজ শেষে তাড়াহুড়ো করাটা সহজ। কিন্তু নামাজের পর অল্প একটু জিকির করা কি খুব বেশি কঠিন? সম্ভবত না। নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন তো, নামাজের পরের জিকিরগুলো করতে কত সময় লাগে? উত্তর হলো-সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাত মিনিট। এই পাঁচ মিনিটের একটা অভ্যাস যদি আপনার সামনে রহমতের বিরাট দিগন্ত খুলে দেয়, তাহলে এই অভ্যাস করতে আপনার আর দ্বিধা কীসের?
সকাল-সন্ধ্যার জিকির : সকাল দিয়েই আমাদের দিনের শুরু হয়, সন্ধ্যা দিয়ে শুরু হয় রাতের। এই দুই শুরু যদি দুআ দিয়ে করা যায়, তবে কতই-না ভালো হয়! নবিজিও সকালে ও সন্ধ্যায় চমৎকার কিছু দুআ পড়তেন। এই দুআগুলো একদিকে আপনার মানসিক চাপ কমিয়ে দেয়, অন্যদিকে আপনার মন থেকে হতাশার শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দেয়। চাপ আর হতাশা জীবন থেকে দূর করতে পারলে পাপও আপনাআপনিই আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে।
রাতের সালাত : রমজান মাসে সাধারণত মানুষ পাপে কম জড়ায়। রোজা ছাড়াও রাতের তারাবির নামাজ এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। রমজানের পরেও চাইলে আমরা এই রাতের নামাজটা জারি রাখতে পারি। রাতের শেষ প্রহরে খোদার সামনে দাঁড়ানোর চেয়ে সুন্দর কোনো কিছু এই পৃথিবীতে আছে কি না, তা আমি জানি না। যে রাত আপনার কাছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, রবের অবাধ্যতায়, তাহাজ্জুদ সেই রাতকে রহমতের রাত বানিয়ে দিতে পারে। প্রথম প্রথম কষ্ট হবে, কিন্তু ৩০ দিনের একটা অভ্যাস আপনার রাতগুলোকে পালটে দেবে, পালটে দেবে আপনার জীবনের গতিপথকেও।
দুহা সালাত : তাহাজ্জুদের নামাজ যেমন আপনার রাতকে রঙিন করে, তেমনই দুহার সালাত আপনার দিনকে করে তোলে আরও বেশি প্রোডাক্টিভ। সূর্য ওঠার পর থেকে জোহরের ৩০ মিনিট আগের সময়টাতে দুই রাকাত নামাজ আপনার সারাদিনের জ্বালানি হতে পারে। চাইলে আপনি আপনার ক্লাস বা মিটিং-এ যাওয়ার আগের সময়টা ট্রিগার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। বের হওয়ার আগে, অজু করে, রেডি হয়ে, দুই রাকাত নামাজ পড়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন সহজেই।
ঘুমাতে যাওয়ার দুআ : দীর্ঘ ক্লান্তিকর একটা দিনের শেষ, রাতের শুরু। আপনার ক্লান্ত শরীর প্রস্তুত বিছানায় শুয়ে পড়ার জন্য। কিন্তু বালিশে মাথা রাখার আগে, মাত্র ১০টা মিনিটের দুআ আপনাকে দিতে পারে সুন্দরতম ঘুমের অভিজ্ঞতা। দিতে পারে শয়তানের ওয়াসওয়াসামুক্ত রাতের প্রতিশ্রুতি। দিতে পারে ফজরের আজান শুনে সঠিক সময়ে উঠে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস। মাত্র ১০টা মিনিট। খুব বেশি মনে হচ্ছে এখন? অভ্যাসটা করে ফেলতে পারেন কিন্তু!
প্রতিদিন ৩০ মিনিটের কুরআন তিলাওয়াত : না, ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আপনাকে আমি প্রতিদিন পুরো একটা পারা বা পুরো একটা সূরা পড়ে ফেলতে বলছি না। আপনি একটা আয়াতই নাহয় বুঝে বুঝে ৩০ মিনিট ধরে পড়ুন। এই ৩০ মিনিট অভ্যাস হিসেবে আপনার জীবনের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। দেখবেন, ৩০ মিনিটের একটা অভ্যাস আপনার জীবনকে কতখানি পালটে দিতে পারে।
ওপরের সাতটি অভ্যাসই শেষ কথা নয়। শেষ কথা হলো-যেকোনো মূল্যে আপনাকে বাজে অভ্যাস ছাড়তে হবে এবং ভালো অভ্যাসের অনুশীলন বাড়াতে হবে। আপনার কাছে যদি আরও ভালো ভালো অভ্যাসের আইডিয়া থাকে, আপনি সেগুলোও প্র্যাকটিস করতে পারেন।
আধ্যাত্মিকতা মানুষকে দুনিয়ার ভোগবিলাস থেকে বের করে নিয়ে স্রষ্টার প্রেমের মজনু হতে শেখায়। পর্নোগ্রাফির ভয়াবহ ভোগবাদ থেকে বের হতে এই আধ্যাত্মিকতা আপনার জন্য হতে পারে অত্যন্ত কার্যকর এক অস্ত্র।
আর আপনার আধ্যাত্মিকতার তরবারিতে শান দেওয়ার কাজটা করে দেবে ওপরে উল্লেখ করা ওই সাতটি অভ্যাস। আপনি যেখানেই যান কেন, বছরে এ সাতটি অভ্যাস গড়ে তোলার শুরুটা চিন্তা করে ফেলতে পারেন!
আজ থেকেই কিংবা এখন থেকেই!
টিকাঃ
* এই অধ্যায়টি প্রোডাক্টিভ মুসলিম বই থেকে নেওয়া হয়েছে।
জ্ঞানের মূল সার্থকতা তার প্রয়োগে। জ্ঞান অর্জনের পর সেই জ্ঞানকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারাকেই আমরা প্রজ্ঞা বলি। একদিন একটা কাজ করে আর দশ দিন কোনো খবর নেই, এমন হলে সেটাকে বড়োজোর হুজুগ বলা যায়, জ্ঞান নয়। যখন আপনি আজকের কাজটাকে কাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারবেন, কালকেরটাকে পরশু পর্যন্ত টেনে নিতে পারবেন, তখনই বুঝবেন- আপনার জ্ঞান সার্থক।
অভ্যাস এমন একটা জিনিস, যা আপনার সফলতা তৈরি করতে অথবা আপনার সাফল্যকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। সময়ের সাথে সাথে গড়ে উঠা অভ্যাসগুলোই নির্ধারণ করে দেয়, আপনি কি আর দশজন মানুষের মতো গড়পড়তার জীবন কাটাবেন, নাকি ব্যতিক্রমী একটা জীবনযাপন করবেন। কাজেই, ধারাবাহিক হওয়াটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দুঃখজনকভাবে এর তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। প্রোডাক্টিভিটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বেশ কিছু সময় ধরে লেগে থাকলেই কেবল এটি অর্জন করা যায়। আর সত্যিকারের পরিবর্তন আসে আপনার প্রতিদিনের ছোটো ছোটো সিদ্ধান্তগুলো থেকে।
সেই সিদ্ধান্তগুলো কেমন? চলুন একটু দেখে নিই-
• আমি আজ ফজরের জন্য ঘুম থেকে উঠব, নাকি উঠব না?
• কুরআন পড়ব, নাকি পড়ব না?
• ব্যায়াম করব, নাকি করব না?
• আমি আজ রোজা রাখব, নাকি রাখব না?
• সকালে গুরুত্বপূর্ণ কাজটিতে আমি মনোনিবেশ করব, নাকি করব না?
আমরা কিন্তু প্রতিটি দিনেই এই সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি হই। তবে বেশিরভাগ সময়েই এই সিদ্ধান্তগুলো আমরা সচেতনভাবে নিতে পারি না; বরং অধিকাংশ সময়ে এই সিদ্ধান্তগুলো নেয় আমাদের গড়ে ওঠা অভ্যাসেরা। *
একবার একদল শিক্ষিত ধার্মিক লোকজনের কাছে জানতে চাওয়া হয়-'আজান শুরু হওয়ার সাথে সাথে আপনারা কীভাবে মসজিদে উপস্থিত হন?' জবাবে তারা বলেন-
'এটা আমাদের কৈশোরে গড়ে তোলা অভ্যাস। বৃদ্ধ হলেও এই অভ্যাস ত্যাগ করা সম্ভব নয়।'
২০০৫ সালে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের ৪০% হচ্ছে অভ্যাস। অর্থাৎ, আপনি প্রতিদিন যত কাজ করেন, তার প্রায় অর্ধেকই করেন অভ্যাসবশত। এটা একই সঙ্গে সুসংবাদ আবার দুঃসংবাদও। সুসংবাদ; কারণ, আপনি যদি প্রোডাক্টিভ অভ্যাস গঠন করতে পারেন, আপনি অটোপাইলটের মতো প্রতিদিন ওই কাজগুলো করতেই থাকবেন। আর দুঃসংবাদ হলো-আপনি যদি প্রোডাক্টিভ কাজে অভ্যস্ত না হয়ে অর্থহীন কাজে অভ্যস্ত হন, তাহলে ওই অর্থহীন কাজও আপনার রুটিনের ভেতরে ঢুকে যাবে। অভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। দৃঢ় মনোবল থাকলে আপনি আপনার অভ্যাস সহজেই পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন।
এই অধ্যায়ের আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হলো অভ্যাস। কীভাবে আপনি দৈনন্দিন জীবনে প্রোডাক্টিভ অভ্যাস শুরু করবেন এবং প্রোডাক্টিভিটিকে অটোপাইলটের মতো জীবনের অংশ বানিয়ে নেবেন, সেটা নিয়েই এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
অভ্যাস মূলত কী?
অভ্যাস বা অভ্যাসের প্রকৃত সংজ্ঞা নিয়ে অস্থির হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে কাজটা আপনি নিয়মিত করেন, সেটাই অভ্যাস। অভ্যাস অনেকটাই অটোমেটিক; অর্থাৎ, আপনি কাজটি সম্পর্কে খুব একটা চিন্তা না করে জাস্ট করে ফেলেন।
নিউরোসায়েন্টিস্টরা মনে করেন-অভ্যাসের এই অটোমশন আমাদের মস্তিষ্কের একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া আমাদের মস্তিষ্ককে চিন্তার পরিশ্রম থেকে মুক্তি দেয়। খেয়াল করে দেখবেন-একটা কাজ অভ্যাসে পরিণত হলে সেটা নিয়ে আপনাকে আর চিন্তা-ভাবনা করতে হয় না, সিদ্ধান্তও নিতে হয় না।
কীভাবে নতুন অভ্যাস গড়ে তুলবেন
চার্লস ডুহিগ তার The power of habit The Power বইতে অভ্যাসের সাত-সতেরো তুলে ধরেছেন। যেকোনো নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে চাইলে তিনটি বিষয় আপনাকে মাথায় রাখতে হবে-
• একটি অভ্যাস তৈরি হতে সময় নেয়। রাতারাতি অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
• তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে একটি অভ্যাস গড়ে ওঠে। উপাদান তিনটি হলো-ট্রিগার, রুটিন ও পুরস্কার। এই তিনটি উপাদান হ্যাবিট-লুপ গঠনে একসঙ্গে কাজ করে।
• সবচেয়ে স্বস্তির খবর হলো-অভ্যাসে পরিবর্তন আনা যায় এবং এটাকে মানিয়েও নেওয়া যায়।
অভ্যাস পরিবর্তন
এখন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-আমাদের বর্তমান অভ্যাসগুলো পরিবর্তন এবং নতুন করে প্রোডাক্টিভ অভ্যাস গড়ে তুলতে আমরা কী করতে পারি? এক্ষেত্রে তিনটি কৌশল সর্বাধিক কার্যকর বলে প্রমাণিত-
• ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ।
• অভ্যাস সার্কেল।
• প্রতিস্থাপন পদ্ধতি।
৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ : ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ৩০ দিন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অভ্যাসের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে অগ্রসর হতে বাধ্য করা; যতক্ষণ না আচরণটি আপনার মধ্যে সহজাত হয়ে যায়। ব্যাপারটা খুব সহজ নয়, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে সম্ভব-
ধাপ-১-এমন একটি অভ্যাস বেছে নিন, যা আপনি পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে পরিবর্তন করতে চান বা ভেঙে ফেলতে চান। একসঙ্গে অনেকগুলো অভ্যাস টার্গেট করবেন না। যেকোনো একটা অভ্যাস বেছে নিন, যাতে আপনার জন্য পরিবর্তনটা সহজ হয়।
ধাপ-২-এবার যে অভ্যাসটি তৈরি করতে চাইছেন, সেটি লিখে ফেলুন। প্রতিদিন অভ্যাসটির অনুশীলন করার পর নিজেকে একটি করে টিক মার্ক দিন। আপনার লক্ষ্য হচ্ছে, এক মাসে অন্তত ২৫টি টিক মার্ক অর্জন করা।
ধাপ-৩-৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ শেষ হলে থেমে যাবেন না; বরং আরও জোরেশোরে অভ্যাসটি চালিয়ে যেতে থাকুন। কখনো যদি ট্র্যাক থেকে বিচ্যুত হয়েই যান, তবে ওপরের প্রক্রিয়াটি আবার অনুসরণ করুন।
যেকোনো চ্যালেঞ্জের প্রথম তিন সপ্তাহে (প্রায় ২১ দিন) বেশ কঠিনই হয়। কোনো নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে এই ২১ দিন আপনাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হবে। দৃঢ় মনোবল না থাকলে এই ধাপে টিকে থাকা বেশ কঠিন। যদি টিকে থাকতে পারেন, তখন চতুর্থ সপ্তাহে গিয়ে (এবং তার পরে) ওই নতুন আচরণটি আপনার রুটিনের অংশ হয়ে যাবে। তখন আর কাজটা করতে কঠিনও লাগবে না। সহজেই আপনার মস্তিষ্ক অটোমেটিক করে ফেলবে। আর যদি ৩০ দিনই চালিয়ে যেতে পারেন, তবে আপনাকে অভিনন্দন। আপনি অত্যন্ত সফলতার সাথে আপনার লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন।
একটা কথা মাথায় রাখবেন, এই ৩০ দিনের কষ্ট আপনার জীবনের একটা ছোট্ট বিনিয়োগ, কিন্তু এর লাভের হিসাবটা অনেক বড়ো। একটা সুন্দর অভ্যাস আপনার জীবন পর্যন্ত পালটে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
অভ্যাস সার্কেল :
আগেই একবার বলেছি-অভ্যাস তিনটি অংশে গঠিত : ট্রিগার, রুটিন এবং পুরস্কার। আপনি যদি আপনার কোনো অভ্যাস পরিবর্তন করতে চান, তবে আপনাকে এই তিনটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই যেতে হবে।
চলুন, তার আগে অভ্যাস সার্কেলের উপাদান তিনটি সম্পর্কে জেনে নিই-
ট্রিগার: ট্রিগার মানে যে জিনিসগুলো আপনাকে রুটিনাইজ হতে প্রেরণা জোগাবে। ট্রিগার বাহ্যিকও হতে পারে (অ্যালার্ম ঘড়ি, দিনের সময়, সপ্তাহের দিন ইত্যাদি)। আবার অভ্যন্তরীণও হতে পারে (আবেগ, মানসিক অবস্থা ইত্যাদি)।
রুটিন : রুটিন মানে আপনার দিনের গতিপথ। একটা দিন আপনি কীভাবে কাটাবেন, তার একটা চিত্রকল্প তৈরি করে নেওয়া। যে কাজের অভ্যাস গড়তে চান, সেই কাজটাকে অবশ্যই আপনার রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পুরস্কার : পুরস্কার রুটিনের পরের ধাপ। ধরুন, আপনি নতুন অভ্যাসটা ঠিকঠাক রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেন। এখন আপনার দায়িত্ব হলো-এই করতে পারার জন্য নিজেই নিজেকে গিফট করা। এর ফলে পরের দিনও কাজটা ঠিক সময়ে করার জন্য আপনার ভেতরে একটা তাড়না সৃষ্টি হবে।
একটু কঠিন হয়ে গেল বোধহয়। উদাহরণ দিয়ে বোঝাই- ধরুন, আপনি যদি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে একটি অভ্যাস গ্রহণ করতে চান, সেক্ষেত্রে আপনার অভ্যাসের উপাদান হবে এ রকম-
ট্রিগার: প্রতি সপ্তাহে শনি ও রোববার সকাল ৬:০০টা।
রুটিন: ধরে নিচ্ছি, আপনার নতুন অভ্যাসটা হলো জগিং করা। এখন আপনার কাজ কী? প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে জগিংয়ের পোশাক পরে নেবেন, জুতা পায়ে দেবেন এবং ৩০ মিনিটের জন্য দৌড়াবেন। (একেক দিন একেক সময় না দৌড়ে নির্দিষ্ট সময় বেধে দৌড়ালে রুটিন মেইনটেইন করতে সুবিধা হবে।)
পুরস্কার : প্রতিদিন দৌড়ের ফলে যখন আপনার ওজন কমে যাবে, হালকা বোধ করবেন এবং নিয়মিত ভালো ঘুম হবে, তখন এগুলোই হবে আপনার পুরস্কার। আরও সুস্থ থাকার তাড়নাও তখন আপনার ভেতরে এসে যাবে।
এবার চলুন আমরা আরেকটা উদাহরণ দেখে আসি। মনে করুন, এবার আপনি আপনার একটা খারাপ অভ্যাস ছাড়ার চেষ্টা করছেন। যেমন হতে পারে আপনি কাজ থেকে বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই টিভির সামনে দাঁড়িয়ে যান এবং চকলেট, আইসক্রিম, চিপসের বাটি নিয়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় নষ্ট করেন। আপনি কীভাবে আপনার এই অভ্যাস পরিবর্তন করবেন? প্রথমে আপনাকে এখনকার অভ্যাস সার্কেলটি দেখতে হবে। আপনার সার্কেলটা অনেকটা এমন-
ট্রিগার: বাসায় ফেরা।
রুটিন : টিভি চালু করা। রান্নাঘর থেকে আইসক্রিম ও বিস্কুট নিয়ে আসা। বসা ও টিভি দেখা।
পুরস্কার : সাময়িক তৃপ্তি আমোদ ও কিছুটা সুখ সুখ অনুভব হওয়া।
এখানে ট্রিগার হলো বাসায় ফেরা। বাসায় যেহেতু আপনাকে ফিরতেই হবে, কাজেই এখানে আপনার কিছু করার নেই। তাই চলুন, রুটিন ও পুরস্কারের দিকে নজর দিই। কারণ, এই দুটো জায়গায় পরিবর্তন আনার সুযোগ আছে।
নতুন রুটিন: গোসল করে ফ্রেস হয়ে নিন। রান্নাঘর থেকে সালাদ বা স্বাস্থ্যকর নাশতা (বাদাম, ছোলা প্রভৃতি) খান। বাসায় ফলমূল এনে রাখুন। চিপসের প্যাকেট না রাখার চেষ্টা করুন। খাওয়া শেষে টিভির রিমোট হাতে না নিয়ে বুকশেলফ থেকে বই হাতে তুলে নিন। পত্রিকা বা ম্যাগাজিনও নেওয়া যেতে পারে। পছন্দের কোনো বই পড়ে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিন। বই পড়া শেষ হলে সৃজনশীল কোনো আলোচনা দেখতে পারেন বা বিকেলটা আপনার পরিবারের সাথে খোশগল্পে সময় কাটিয়ে দিন।
নতুন পুরস্কার: আপনি আগের চেয়ে বেশি সজীব এবং মানসিকভাবে উদ্দীপিত হবেন। আপনার শরীর ভালো থাকবে এবং পরিবারের সাথে আপনার সম্পর্কের উন্নতিটা নিজে নিজেই বুঝতে পারবেন।
ওপরের দুটি উদাহরণই বাহ্যিক অভ্যাস গড়ে তোলা বা ছেড়ে দেওয়ার সময় হ্যাবিট সার্কেল কীভাবে কাজ করে, তার উদাহরণ। এবার ধরে নিই-আপনি একটি অভ্যন্তরীণ অভ্যাস পরিবর্তন করতে চান। যেমন: হিংসা, গিবত, মিথ্যা বলা ইত্যাদি। এই দোষগুলোও কিন্তু আপনার অভ্যাসই এবং আপনি চাইলে হ্যাবিটস লুপের সাহায্যে দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য ক্ষতিকর এই দোষগুলোও ছেড়ে দিতে পারেন! কীভাবে? চলুন, হিংসাকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে দেখা যাক-
ট্রিগার : আপনি এমন কাউকে দেখলেন, যার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা আপনার চেয়ে উঁচুতে।
রুটিন : আপনি হিংসায় ছারখার হোন (হয়তো, আপনি তার ক্ষতিসাধনে ষড়যন্ত্রও করে বসেন)।
পুরস্কার: অত্যধিক হিংসা এবং অন্যকে ছোটো করতে পারার নেতিবাচক অনুভূতি।
এখন এই অভ্যাসকে ছাড়তে হলে আপনাকে নতুন অভ্যাস গড়তে হবে। সার্কেলটি দেখতে এমন হবে-
ট্রিগার : আপনি এমন কাউকে লক্ষ করুন, যার পেশাগত ও সামাজিক অবস্থান আপনার চেয়ে উঁচু।
রুটিন: আপনি বলুন, মাশাআল্লাহ, লা-হাওলা ওয়া লা-কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (এটা আল্লাহর ইচ্ছা, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই)! দুআ করুন, যাতে লোকটি আরও বেশি সফলতা পায়। সেইসঙ্গে আপনার কল্যাণের জন্যও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।
পুরস্কার : কাজটা করা কঠিন, তবে এই কাজটা যদি করতে পারেন, তাহলে অন্যরকম একটা সুখ নিজের ভেতরে অনুভব করতে পারবেন।
এবার চলুন, মিথ্যাচারের উদাহরণটা দেখি-
ট্রিগার: সত্য বলার চেয়ে মিথ্যা বলাটা সহজ।
রুটিন: মিথ্যা বলা।
পুরস্কার : পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকা। সাময়িক আনন্দ লাভ করা।
এখন এই অভ্যাস কীভাবে বদলে দেবেন?
ট্রিগার: সত্য কথা বলার চেয়ে মিথ্যা কথা বলাটা সহজ।
রুটিন: সত্য বলুন।
পুরস্কার: স্মরণ করুন, নবিজি বলেছেন-
'সততা সৎকর্মের দিকে পথপ্রদর্শন করে, আর সৎকর্ম জান্নাতের পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোনো মানুষ সত্য কথা বলায় সত্যবাদী হিসেবে (তার নাম) লিপিবদ্ধ হয়। আর অসত্য পাপের পথপ্রদর্শন করে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তি মিথ্যায় রত থাকলে পরিশেষে মিথ্যাবাদী হিসেবেই (তার নাম) লিপিবদ্ধ করা হয়।' মুসলিম : ৬৫৩১
এ সবগুলো উদাহরণেই একটা জিনিস কমন। তা হলো-প্রতিটি বদভ্যাসের 'তথাকথিত পুরস্কারের' বিপরীতে আখিরাতে আমাদের জন্য আছে ভয়াবহ পরিণাম এবং আমাদের ভেতর এই অনুভূতিটা জাগ্রত করতে হবে-এই পৃথিবীই আমাদের আসল ঠিকানা নয়। মরণ একদিন মুছে দেবে সকল পরিচয়। একদিন আমাদের আখিরাতের জীবনে পদার্পণ করতে হবে। সেখানে আমাদের প্রতিটি কাজ ও কথার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
প্রতিস্থাপন পদ্ধতি :
অভ্যাস পরিবর্তনের তৃতীয় পদ্ধতিকে 'প্রতিস্থাপন পদ্ধতি’ বলা হয়। এই পদ্ধতি আপনার ক্ষতিকর একটা অভ্যাসকে নতুন উপকারী একটা অভ্যাসে বদলে দেয়।
কল্পনা করুন, আপনি চরমভাবে আপনার স্মার্টফোনে আসক্ত এবং প্রতিরাতে আপনি পাঁচ ঘণ্টা এর পেছনে ব্যয় করেন। এখন কীভাবে এই অভ্যাসটিতে পরিবর্তন নিয়ে আসবেন? মোবাইল আপনার জন্য ক্ষতিকর সন্দেহ নেই; কিন্তু হঠাৎ মোবাইল থেকে দূরে সরে গেলে আপনার ওই পাঁচ ঘণ্টা সময় আপনি কীভাবে কাটাবেন? কিছু করার না থাকলে হয়তো দেখা যাবে-দুই দিন পর আবারও ফোন হাতে তুলে নিয়েছেন। মানুষের ব্রেইনকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা, সে কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকতে পারে না।
কাজেই, এই অভ্যাসটা পরিবর্তন করতে হলে আপনাকে নতুন কিছু কাজ ওই সময়ে করতে হবে। যে কাজগুলো একই সঙ্গে হবে উপকারী ও আনন্দদায়ক। যেমন : গল্পের বই পড়া বা কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে যাওয়া ভালো একটা বিকল্প হতে পারে।
ইচ্ছাশক্তি
একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, অভ্যাস পরিবর্তন বা নতুন অভ্যাস তৈরি করা সহজ কোনো ব্যাপার না; এর জন্য চাই দৃঢ় ইচ্ছা। চাই অবিরাম লেগে থাকার মতো ধৈর্যশক্তি। অভ্যাস পরিবর্তিত হওয়া পর্যন্ত ইচ্ছাশক্তি ধরে রাখতে কিছু টিপস শেয়ার করছি-
নিয়্যাত : আমাদের ইচ্ছাশক্তি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রাখে আমাদের নিয়্যাত। আপনি যদি একটা কাজের নিয়্যাত ঠিকঠাক না করেন, তবে নিশ্চিতভাবেই কাজটি আপনি করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যদি শুরুতেই একটা কাজের নিয়্যাত করে ফেলেন এবং ক্রমাগত নিজেকে আপনার নিয়্যাতের কথা মনে করিয়ে দেন, তখন কাজটা করা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে।
ছোটো ছোটো পরিবর্তন: রাতারাতি আপনার সমস্ত অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন না। এতে খুব সহজেই হাল ছেড়ে দেবেন এবং আগের অবস্থায় ফিরে যাবেন। ধীরে ধীরে সমন্বয় করুন। জীবন বদলে ফেলার জন্য বিশাল বড়ো পরিবর্তনের দরকার নেই; বরং ছোট্ট একটুখানি পরিবর্তনও আপনার জীবনের গতিপথে এক বিশাল পার্থক্য তৈরি করতে পারে। প্রতিমাসে পরিবর্তন করার জন্য খুব বেশি হলে একসঙ্গে তিনটি অভ্যাস টার্গেট করুন। প্রমাণ করুন, আপনি এই পরিবর্তনে আন্তরিক। ছোটো ছোটো অর্জনে সচেতন হোন। একসঙ্গে অনেকগুলো অভ্যাস ঠিক করতে গিয়ে ভজকট করে ফেলার কোনো মানে হয় না।
স্পষ্ট নির্দেশনা : আপনার নতুন রুটিনের জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা স্থির করুন। আপনি যদি নিয়মিত ব্যায়াম করার ইচ্ছে করেন, তাহলে জিমে যাওয়ার সুনিদিষ্ট দিন-তারিখ নির্ধারণ করুন। সেখানে গিয়ে আপনি কী অনুশীলন করবেন এবং কতক্ষণ থাকবেন, সেটাও ঠিক করুন। চূড়ান্ত মাত্রায় সুনির্দিষ্ট হোন।
প্রিয়জনদের কাছে অঙ্গীকার: আপনার কাছের কাউকে আপনার নতুন লক্ষ্যের কথা জানান। প্রতিদিন কতটুকু আগালেন, সেই আপডেট তাদের জানান। আমরা নিজেদের হতাশ করতে পারি; কিন্তু যাদের অধিক পছন্দ করি, তাদের হতাশ করা অনেক কঠিন। প্রিয়জনের কাছে অঙ্গীকার আপনাকে আপনার লক্ষ্য পূরণে সাহায্যই করবে।
দোয়া করুন: আপনি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনটির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। শেষ পর্যন্ত তিনিই একমাত্র সত্তা; যিনি সবকিছু সহজ করে দিতে পারেন। অভ্যাস পরিবর্তনের কঠিন এই যাত্রাপথ আপনার জন্য সহজ হয়ে যেতে পারে, যদি আল্লাহ তায়ালা আপনার প্রতি সদয় হোন।
ইসলাম ও অভ্যাস
ইসলামের রীতিনীতিগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখবেন, এর প্রায় সবগুলোই একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট নিয়মে পালন করতে হয় এবং এভাবে ইসলামের সব নিয়মই একটা সময় পালন করতে করতে অভ্যাসে পরিণত হয়। এখান থেকেই আমরা বুঝতে পারি-ইসলাম ভালো অভ্যাস তৈরিতে কতটা গুরুত্ব দেয়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো-প্রতিদিনের নামাজ, সকাল-সন্ধ্যার দুআ, রোজা-সব ইবাদাতকেই ইসলাম সুন্দর একটা মেকানিজমের মধ্যে দিয়ে দিয়েছে।
এই মেকানিজমেও অদ্ভুতভাবে ট্রিগার, রুটিন আর পুরস্কারের ব্যবস্থা আছে। বলা যেতে পারে, এই ইবাদতগুলোও ওই হ্যাবিটস লুপের মাধ্যমেই আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। কয়েকটি উদাহরণ দেখলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে-
সালাত : দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সম্ভবত একজন মুসলিমের জীবনের সবচেয়ে বড়ো অভ্যাস, যা তার জীবনের সাথে একেবারে মিশে যায়। নামাজি মানুষটাকে কখনোই নামাজে যাব কি যাব না, এই সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। আজান শোনার সাথে সাথেই অটোমেটিক সে নামাজের প্রস্তুতি শুরু করে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
'নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্যই কর্তব্য।' সূরা নিসা : ১০৩
এই অভ্যাসটির পেছনেও কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সার্কেল আছে।
ট্রিগার : আজান শোনা। হতে পারে সেটা নিকটবর্তী মসজিদের আজান, অ্যাপস অথবা প্রেয়ার-ওয়াচের ভার্চুয়াল আজান।
রুটিন : অজু করা, কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো, হাত বাঁধার নিয়ম, দাঁড়ানোর পদ্ধতি, কীভাবে রুকুতে যাবেন এবং সিজদাহ করবেন, প্রতিটি অবস্থানে আপনাকে কী পড়তে হবে, এ সবকিছুই মূলত রুটিন ওয়ার্কের ভেতরেই পড়ে।
পুরস্কার : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ নিয়মিত সালাত আদায়কারীদের প্রতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছেন-
'বলো তো, যদি তোমাদের কারও বাড়ির সামনে একটি নদী থাকে, আর সে তাতে প্রত্যহ পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার দেহে কোনো ময়লা থাকবে?' তাঁরা বললেন, 'তার দেহে কোনোরূপ ময়লা বাকি থাকবে না।' আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'এ হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের উদাহরণ। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।' বুখারি : ৫২৮
তা ছাড়া আরও শারীরিক ও মানসিক পুরস্কার নামাজের সাথে সম্পৃক্ত। নামাজ পড়ার পর যেমন চাপমুক্ত ফুরফুরে একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়, এটাও পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত।
রোজা: শুধু ইচ্ছাশক্তি আর নিয়্যাত থাকলে কী করা যায়, তার বড়ো একটা প্রমাণ হলো রোজার অভ্যাস। কোনো কিছু না খেয়ে দীর্ঘক্ষণ থাকা বা অন্যান্য খারাপ কাজ থেকে দীর্ঘ একটা সময় সংযম করা, ব্যাপারটা অসম্ভবের পর্যায়েই বলা চলে। কিন্তু দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের কারণে পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলিম এই কঠিন অভ্যাসকেও জীবনের অংশ করে নিয়েছে।
এই ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জের বাইরে নবিজি আমাদের সোম ও বৃহস্পতিবার অথবা ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতিমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এবং যথারীতি এখানেও অভ্যাস সার্কেলের ব্যবহার আছে-
ট্রিগার: সোমবার বা বৃহস্পতিবার অথবা আরবি মাসের ১৩/১৪/১৫ তারিখ।
রুটিন: ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাদ্য, পানীয়, খারাপ কাজ এবং যৌনক্রিয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
পুরস্কার : আধ্যাত্মিক ও শারীরিক প্রতিদানসমূহ।
প্রতিদিনকার সাতটি অভ্যাস যা আপনার আধ্যাত্মিক জীবনকে সুন্দর করে তুলবে।
নিচের সাতটি 'আধ্যাত্মিক অভ্যাস' আপনার দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করার চেষ্টা করুন। এগুলো একজন প্রোডাক্টিভ মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অভ্যাসগুলো একদিকে যেমন আপনার প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি করবে, তেমনই আল্লাহর প্রতি আপনার ভালোবাসা ও বিশ্বাসও বাড়িয়ে তুলবে, ইনশাআল্লাহ।
এই সাতটি আধ্যাত্মিক অভ্যাসকে নফল ইবাদত হিসেবে নোট করে ফেলুন। নিয়্যাত করে ফেলুন যে, আপনি এই আচরণগুলো আপনার অভ্যাসে পরিণত করবেনই। এটুকু করতে পারলেই আপনি আপনার কর্তব্যগুলো পূরণ করছেন। যেমন : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
'নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বলেন-“যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুতা করবে, তার বিরুদ্ধে আমার যুদ্ধের ঘোষণা থাকল। আমার বান্দা যে সমস্ত জিনিস দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার নিকট প্রিয়তম জিনিস হলো-তার ওপর ফরজ করা বিষয়গুলো। (অর্থাৎ, ফরজ আমল দ্বারা নৈকট্য লাভ করা আল্লাহর নিকটে বেশি পছন্দনীয়।) আর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। পরিশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। অতঃপর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার ওই কান হয়ে যাই, যার দ্বারা সে শোনে; তার ওই চোখ হয়ে যাই, যার দ্বারা সে দেখে; তার ওই হাত হয়ে যাই, যার দ্বারা সে ধরে এবং তার ওই পা হয়ে যাই, যার দ্বারা সে চলে। আর সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, তাহলে আমি তাকে দিই এবং সে আমার আশ্রয় চাইলে আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।” বুখারি : ৬৫০২
একটা কথা মনে রাখবেন, আপনার জীবনের মূল লক্ষ্য হবে আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা অর্জন করা। আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা যদি একবার অর্জন করে ফেলতে পারেন, পর্নোগ্রাফি কেন, পৃথিবীর যেকোনো খারাপ অভ্যাস ওই ভালোবাসার স্রোতে খড়কুটার মতো ভেসে যাবে। নিচের এই অভ্যাসগুলো আপনাকে আল্লাহ তায়ালার কাছাকাছি নিয়ে যাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
সাতটি প্রোডাক্টিভ অভ্যাস হলো-
সুন্নত নামাজ আদায়: ফরজ নামাজ শেষ করে তাড়াহুড়ো করে মসজিদ থেকে দ্রুতবেগে বেরিয়ে যাওয়ার অভ্যাসটা আমাদের অনেকেরই থাকে! কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই সুন্নত আদায়ের পুরস্কারটাও কতটা বিশাল? যখন সুন্নত নামাজ ত্যাগ করাতে পুরস্কার হারানোর বিষয়টি উপলব্ধি করব, তখন আমরা সেগুলোও ছেড়ে যাব না। নিয়মিত সুন্নত নামাজ পড়ার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো-ফরজের মতো এগুলোকেও অভ্যাসে পরিণত করে ফেলা। তখন দেখবেন-চাইলেও আপনি ফরজ শেষেই মসজিদ থেকে দৌড় দিতে পারবেন না। সুন্নত না পড়লে আপনার কাছে নামাজটাকেই অসম্পূর্ণ মনে হবে।
সালাত শেষে জিকির : আবারও বলি, ব্যস্ততার কারণে নামাজ শেষে তাড়াহুড়ো করাটা সহজ। কিন্তু নামাজের পর অল্প একটু জিকির করা কি খুব বেশি কঠিন? সম্ভবত না। নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন তো, নামাজের পরের জিকিরগুলো করতে কত সময় লাগে? উত্তর হলো-সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাত মিনিট। এই পাঁচ মিনিটের একটা অভ্যাস যদি আপনার সামনে রহমতের বিরাট দিগন্ত খুলে দেয়, তাহলে এই অভ্যাস করতে আপনার আর দ্বিধা কীসের?
সকাল-সন্ধ্যার জিকির : সকাল দিয়েই আমাদের দিনের শুরু হয়, সন্ধ্যা দিয়ে শুরু হয় রাতের। এই দুই শুরু যদি দুআ দিয়ে করা যায়, তবে কতই-না ভালো হয়! নবিজিও সকালে ও সন্ধ্যায় চমৎকার কিছু দুআ পড়তেন। এই দুআগুলো একদিকে আপনার মানসিক চাপ কমিয়ে দেয়, অন্যদিকে আপনার মন থেকে হতাশার শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দেয়। চাপ আর হতাশা জীবন থেকে দূর করতে পারলে পাপও আপনাআপনিই আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে।
রাতের সালাত : রমজান মাসে সাধারণত মানুষ পাপে কম জড়ায়। রোজা ছাড়াও রাতের তারাবির নামাজ এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। রমজানের পরেও চাইলে আমরা এই রাতের নামাজটা জারি রাখতে পারি। রাতের শেষ প্রহরে খোদার সামনে দাঁড়ানোর চেয়ে সুন্দর কোনো কিছু এই পৃথিবীতে আছে কি না, তা আমি জানি না। যে রাত আপনার কাছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, রবের অবাধ্যতায়, তাহাজ্জুদ সেই রাতকে রহমতের রাত বানিয়ে দিতে পারে। প্রথম প্রথম কষ্ট হবে, কিন্তু ৩০ দিনের একটা অভ্যাস আপনার রাতগুলোকে পালটে দেবে, পালটে দেবে আপনার জীবনের গতিপথকেও।
দুহা সালাত : তাহাজ্জুদের নামাজ যেমন আপনার রাতকে রঙিন করে, তেমনই দুহার সালাত আপনার দিনকে করে তোলে আরও বেশি প্রোডাক্টিভ। সূর্য ওঠার পর থেকে জোহরের ৩০ মিনিট আগের সময়টাতে দুই রাকাত নামাজ আপনার সারাদিনের জ্বালানি হতে পারে। চাইলে আপনি আপনার ক্লাস বা মিটিং-এ যাওয়ার আগের সময়টা ট্রিগার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। বের হওয়ার আগে, অজু করে, রেডি হয়ে, দুই রাকাত নামাজ পড়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন সহজেই।
ঘুমাতে যাওয়ার দুআ : দীর্ঘ ক্লান্তিকর একটা দিনের শেষ, রাতের শুরু। আপনার ক্লান্ত শরীর প্রস্তুত বিছানায় শুয়ে পড়ার জন্য। কিন্তু বালিশে মাথা রাখার আগে, মাত্র ১০টা মিনিটের দুআ আপনাকে দিতে পারে সুন্দরতম ঘুমের অভিজ্ঞতা। দিতে পারে শয়তানের ওয়াসওয়াসামুক্ত রাতের প্রতিশ্রুতি। দিতে পারে ফজরের আজান শুনে সঠিক সময়ে উঠে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস। মাত্র ১০টা মিনিট। খুব বেশি মনে হচ্ছে এখন? অভ্যাসটা করে ফেলতে পারেন কিন্তু!
প্রতিদিন ৩০ মিনিটের কুরআন তিলাওয়াত : না, ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আপনাকে আমি প্রতিদিন পুরো একটা পারা বা পুরো একটা সূরা পড়ে ফেলতে বলছি না। আপনি একটা আয়াতই নাহয় বুঝে বুঝে ৩০ মিনিট ধরে পড়ুন। এই ৩০ মিনিট অভ্যাস হিসেবে আপনার জীবনের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। দেখবেন, ৩০ মিনিটের একটা অভ্যাস আপনার জীবনকে কতখানি পালটে দিতে পারে।
ওপরের সাতটি অভ্যাসই শেষ কথা নয়। শেষ কথা হলো-যেকোনো মূল্যে আপনাকে বাজে অভ্যাস ছাড়তে হবে এবং ভালো অভ্যাসের অনুশীলন বাড়াতে হবে। আপনার কাছে যদি আরও ভালো ভালো অভ্যাসের আইডিয়া থাকে, আপনি সেগুলোও প্র্যাকটিস করতে পারেন।
আধ্যাত্মিকতা মানুষকে দুনিয়ার ভোগবিলাস থেকে বের করে নিয়ে স্রষ্টার প্রেমের মজনু হতে শেখায়। পর্নোগ্রাফির ভয়াবহ ভোগবাদ থেকে বের হতে এই আধ্যাত্মিকতা আপনার জন্য হতে পারে অত্যন্ত কার্যকর এক অস্ত্র।
আর আপনার আধ্যাত্মিকতার তরবারিতে শান দেওয়ার কাজটা করে দেবে ওপরে উল্লেখ করা ওই সাতটি অভ্যাস। আপনি যেখানেই যান কেন, বছরে এ সাতটি অভ্যাস গড়ে তোলার শুরুটা চিন্তা করে ফেলতে পারেন!
আজ থেকেই কিংবা এখন থেকেই!
টিকাঃ
* এই অধ্যায়টি প্রোডাক্টিভ মুসলিম বই থেকে নেওয়া হয়েছে।