📘 নীল বিষ > 📄 সামাজিক কাজের মাধ্যমে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ

📄 সামাজিক কাজের মাধ্যমে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ


পৃথিবীতে মানুষের জনসংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের চারপাশের মানুষ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু দিনদিন আমরা সবাই কেমন যেন একা হয়ে যাচ্ছি। এটার অন্যতম প্রধান নিয়ামক হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। যেমন : আমাদের স্মার্টফোন; সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একটি সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যারা যত বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করেন, তাদের একাকিত্ব তত বেশি। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ঘোরাঘুরি, আড্ডা, কোলাকুলি, হ্যান্ডশেক ইত্যাদির গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। এর বদলে ভার্চুয়াল সম্পর্কের দিকে ধাবিত করছে। অথচ ভার্চুয়াল সম্পর্ক কখনোই রিয়েল লাইফের সম্পর্কগুলোর মতো হতে পারে না। যেহেতু ফেসবুক কখনোই এগুলোর প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়, সেহেতু মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে এবং পর্নের দিকে ধাবিত হয়।

প্রযুক্তিগত উন্নতি দেরিতে বিয়েরও একটা কারণ

১৯৬০ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী ৩০ বছর বয়সের মধ্যে ৮০% পুরুষ বিয়ে করে। ১৯৮০-তে তা কমে দাঁড়ায় ৭০%। ২০০১-এ ৫৫% এবং ২০১৩-তে মাত্র ৪০% পুরুষ মানুষকে ৩০-এর আগে বিবাহিত পাওয়া যায়।

এমনকী অনেক বিবাহিতও আজকাল প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পর্নাসক্তিতে আটকা পড়ে আছেন।

এই অধ্যায়ে আমরা সম্পর্কের গভীরতার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করব। ভার্চুয়াল সম্পর্কের সংকট আপনাকে দেখিয়ে দেবো। বন্ধুত্ব কীভাবে আপনার আসক্তিকে কমিয়ে দিতে পারে, কথা বলব সেই বিষয়েও। আশা করি, এর মধ্যেই আপনি আগের শিখে আসা নতুন অভ্যাসগুলোর অনুশীলন শুরু করে দিয়েছেন এবং এতদিনে অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনারের সাথেও ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছেন।

রিয়েল লাইফের বন্ধুদের সাথেই আপানার ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। না, সবাই আপনার ক্লোজ হবে না। তার দরকারও নেই। জীবনে চলার পথে কিছু বন্ধু হারিয়ে যাবে, কিছু নতুন বন্ধু আসবে-এটাই স্বাভাবিক। তাই নতুন নতুন বন্ধু বানানো চালিয়ে যান। একটি সমীক্ষায় জানা যায়, যাদের বেশি ভালো বন্ধু আছে, তারা সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে এবং অসুস্থ কম হয়। এর সাথে সাথে বন্ধুত্ব আপনার মানসিক চাপ কমায়। আর মানসিক চাপমুক্ত থাকলে পর্নের দিকে ধাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

যদিও বয়স্কদের জন্য নতুন বন্ধু বানানো কঠিন, তবে তারা পুরোনো বন্ধুত্বগুলো জোরদার করতে পারেন। চাইলে ছোট্ট একটা গেট টুগেদার বা আড্ডার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের ফিরিয়েও আনতে পারেন।

ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও পাঠচক্র

নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ মানুষের মনকে প্রশান্ত রাখে এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে রাখে। তাই নিয়মিত ধর্মীয় বই-পুস্তক পাঠ করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় কয়েকজন মিলে একটা পাঠচক্র বানিয়ে ফেলুন। সমমনা ভাই কিংবা বন্ধুদের নিয়ে একটি সার্কেল তৈরি করে ফেলতে পারেন, যারা বই পড়তে আগ্রহী। প্রতি সপ্তাহে কিছু বই নির্দিষ্ট করে নিতে পারেন। পড়ার পর কে কী বুঝলেন, তা শেয়ার করবেন সবার সাথে। একবার শুরু করলে অবশ্যই প্রতি সপ্তাহে এটি চালিয়ে যেতে হবে। ধর্মীয় বইয়ের বাইরেও সাহিত্যপ্রেমীদের একটা গ্রুপ করে নিতে পারেন, যারা একত্রে প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন বসে সাহিত্য নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবেন।

চাইলে জুম অ্যাপসের মাধ্যমেও সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করা যায়।

ইনডোর গেমস

পরিবারের সবাই মিলে বিভিন্ন ইনডোর গেমস খেলতে পারেন। এতে যেমন ফ্যামিলি বন্ডিং বাড়বে, তেমনই মানসিকভাবেও প্রশান্তি লাভ করবেন।

ভাষা শিক্ষা/প্রোগ্রামিং কোর্স

বিভিন্ন ধরনের কমিউনিটি কোর্স রয়েছে, যা আমাদের এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। সময়-সুযোগমতো ভাষা শিক্ষা, প্রোগ্রামিং কোর্স ইত্যাদিতে ভর্তি হয়ে যান। এটাকে শখ হিসেবে নিন। পাশাপাশি নতুন নতুন বন্ধুও তৈরি করুন।

অনলাইন কমিউনিটি

ফেসবুকে গ্রুপ/পেজ চালানোকে কেন্দ্র করে বহু গ্রুপ গড়ে ওঠে। সৃজনশীল কোনো গ্রুপ/পেজের মডারেটর/অ্যাডমিন হতে চেষ্টা করুন। তাহলে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকবেন।

ম্যাসেঞ্জারে স্কুলফ্রেন্ডদের নিয়ে গ্রুপ খুলতে পারেন। পুরোনো স্মৃতির আলোচনা করুন। সবাই মিলে গেট টুগেদার করুন। লক্ষ রাখুন, গ্রুপের সবাই যেন চরিত্রবান হয়; নাহলে তারা এমন কিছু গ্রুপে শেয়ার করবে, যা আপনাকে সেক্স ড্রাইভ দেবে। সচরাচর এমনটিই হয়ে থাকে।

অসৎসঙ্গ পরিহার
মোটিভেশনাল স্পিকার জিম বলেন- 'আপনি হচ্ছেন পাঁচজন মানুষের গড়, যাদের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান।'

আপনার ক্লোজ ফ্রেন্ড কারা? কাদের সাথে বেশি সময় কাটান? তারা কোন দিকে আপনাকে মোটিভেট করে? অথবা আপনার নৈতিক চরিত্রে তাদের প্রভাব কতদূর?

আপনার হয়তো দীর্ঘ সময়ের এমন কিছু বন্ধু আছে, যারা আপনাকে পথ চলতে সাহস জোগায়। কিন্তু অন্যদিকে এরাই আপনাকে কুৎসিত ভিডিওগুলো দেখতেও উৎসাহিত করে।

এমনটি হলে তাদের পরিত্যাগ করতে হবে। আমি প্রথমেই বাদ দিতে বলছি না। বন্ধুদের বোঝান, আপনার জীবনে একটা পজিটিভ পরিবর্তন আনতে চাচ্ছেন। এ বিষয়ে তাদেরও সাহায্য চান। তাও যদি কাজ না হয়, তাহলে পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ, 'সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ।'

পরিশেষে আপনার জীবন আপনাকে অনেক ধরনের কথাই শোনাবে। হয়তো আপনার অফিসের বস আপনাকে বলবে-আপনি ভালো কর্মচারী নন। শিক্ষক বলবে-আপনি ভালো ছাত্র হতে পারেননি। বাবা-মা বলবে-সারাজীবনে তুমি কিছুই করতে পারোনি। হয়তো স্ত্রীও আপনাকে বলবে-আপনি ব্যর্থ মানুষ, আপনি যথেষ্ট স্মার্ট মানুষ না।

জানি, এসব কথা আপনাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যায়। হতাশায় ডুবিয়ে দেয়, পৃথিবীর কাছে নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, আপনি স্রষ্টার অনন্য ও অমূল্য এক সৃষ্টি। আপনার জীবন, আপনার পৃথিবী অনেক বড়ো। মানুষের কথায় নিজের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করবেন না, নিজেকে অন্যের কথার ওপর ছেড়ে দেবেন না। এই পৃথিবীতে আপনার নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। আপনার নির্দিষ্ট কাজ আছে। আপনার জন্য এই পৃথিবীতে ভালোবাসাও বরাদ্দ আছে। আপনাকে শুধু হতাশ না হয়ে সেই ভালোবাসাটাকে খুঁজে নিতে হবে।

লেখক জোনাথন রগার বলেন-
'লোকে কী বলে, তার পালটা জবাব দেওয়ার নামই তো সৃজনশীলতা।'

কাজেই, আপনাকে কোনোভাবেই হতাশ হওয়া চলবে না। ভালো অভ্যাস ও আচার-আচরণ দিয়েই আপনাকে পৃথিবীর সকল নেগেটিভিটির বিরুদ্ধে লড়তে হবে। কবিতা শোনেননি?
'আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যে বা, আমি বাঁধি তার ঘর,
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই, যে মোরে করেছে পর।
যে মোরে দিয়েছে বিষে ভরা বাণ, আমি দেই তারে বুকভরা গান,
কাটা পেয়ে তারে ফুল করি দান, সারাটি জনম ভর।
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই, যে মোরে করেছে পারে।'

জীবনে চলার পথে অনেক কাঁটাই পাবেন। সেই কাঁটাকে ফুল করে তোলার মধ্যেই জীবনের সমস্ত সার্থকতা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00