📘 নীল বিষ > 📄 বুদ্ধিবৃত্তিক শৌখিনতার প্রতি আগ্রহ

📄 বুদ্ধিবৃত্তিক শৌখিনতার প্রতি আগ্রহ


মানুষ স্বভাবতই কৌতূহলী প্রাণী, কৌতূহল আমাদের জীবনেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। শৈশবে কৌতূহলী মনই মানুষের মধ্যে জানার এক অদম্য স্পৃহা তৈরি করে দেয়। সেই কৌতূহল থেকেই মানুষের জানার শুরু, নতুন সবকিছু আবিষ্কারেরও শুরু। কৌতূহল না থাকলে জ্ঞান-বিজ্ঞান আজকের এই উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারত না।

শিশুকালের কথাই চিন্তা করুন। কোনো শিশুকে যখন তার মা গরম পাতিল ধরতে নিষেধ করে, তখন সে আরও বেশি গরম পাতিলের দিকে আকৃষ্ট হয়। সে বুঝতে চায়, গরম কী। সে জানতে চায়, এটা কতটা ক্ষতিকর। সে হয়তো গরম পাতিলটি স্পর্শ করেই ফেলে। যখন সে গরম পাতিল স্পর্শ করে, তখনই বুঝতে পারে গরমটা মূলত কী। বিল গেটস, মার্ক জুকারবার্গ, ইলন মাস্ক প্রমুখ ব্যক্তিগণ দুনিয়াবি সফলতার প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেও এই কৌতূহল এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিয়ে থাকেন।

আমাদের শৈশবের সেই কৌতূহলী মন বড়ো হতে হতে কীভাবে যেন হারিয়ে যায়। এ কারণে আমাদের দিয়ে সৃজনশীল কোনো কাজ করাও সম্ভব হয়ে ওঠে না। অবশ্য এই কৌতূহল চলে যাওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণও আছে। হয়তো বাবা-মা বা আশেপাশের মানুষজন আপনার কৌতূহলী মনের প্রশ্ন উপেক্ষা, অবজ্ঞা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। আবার আমাদের শিক্ষকরাও ক্লাসে বা ক্লাসের বাইরে বেশি প্রশ্ন করা পছন্দ করতেন না। সবকিছু মিলিয়েই আমাদের কৌতূহলের দরজায় পড়ে যায় নিষেধাজ্ঞার তালা।

বয়ঃসন্ধিকালে মানুষের মনে যৌনতা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে। বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করতে ভয় পায়। ফলে যে শিক্ষা তার বাবা-মার কাছ থেকে পাওয়ার কথা ছিল, তা পায় সমবয়সি বন্ধু, ইন্টারনেট ইত্যাদি থেকে। অশ্লীলতার দিকে বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের প্রথম হাতেখড়ি হয় গুগলে যৌনবিষয়ক সার্চ করার ফলে। কারণ, বর্তমানে সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন। ফলে কিছু বুঝে উঠার আগেই শিশু-কিশোরদের চারিত্রিক অধঃপতন শুরু হয়। এরা আসক্ত হয়ে যেতে শুরু করে।

পর্নাসক্তির ফলে নারীকে তারা কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে দেখতে থাকে। ফলে সমাজে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, ইভটিজিং ইত্যাদি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এবং এর অনেক কিছুই ঘটে শুধু অজ্ঞতার কারণে, ভুল ধারণার কারণে।

এই ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে মা-বাবাকেই। বন্ধু বা ইন্টারনেটের থেকে ভুল জ্ঞান পাওয়ার আগেই প্রত্যেক বাবার উচিত ছেলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সাথে সাথে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যৌনতার সমস্ত বিষয় খুলে বলা।

পর্নোগ্রাফি মানুষকে এই দুনিয়ার বিশালত্ব থেকে গাফেল রাখে। মানুষকে বেঁধে ফেলে নীলের জালে। দৃষ্টিভঙ্গিকে কেবল যৌনতায় সীমাবদ্ধ করে দেয়। একজন পর্নাসক্ত মানুষ এই পৃথিবীকে দেখে যৌনতার নীল চশমা দিয়ে। এই চশমা খুলে ফেলে, সুন্দর এই পৃথিবীর সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারলেই পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে লেখাপড়া
আপনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্যটি পুনরায় দেখুন, কী লিখেছিলেন? আপনি ঠিক কী হতে চান, সে বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে কিছু সময় সাবজেক্ট রিলেটেড স্টাডির জন্য ব্যয় করুন। যদি আপনার লক্ষ্য থাকে ভালো একজন স্বামী এবং বাবা হওয়া, তাহলে বিয়ে ও পরিবারবিষয়ক বই বেশি বেশি পড়তে হবে। ধর্মীয় স্কলারদের বক্তব্যও এক্ষেত্রে ভালো কাজে দেবে। আপনি যদি শিল্পী হতে চান, তাহলে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে গভীর পড়াশোনা করুন। যদি ধর্মীয় স্কলার হতে চান, তাহলে ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করুন। যা-ই হতে চান না কেন, অনুসন্ধানী মন নিয়ে প্রতিদিন স্টাডি করুন।

অনলাইন রিসোর্স

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। যেকোনো তথ্য-উপাত্ত নিমিষেই আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসে। পৃথিবী এখন আর বিশাল পৃথিবী নেই, পরিণত হয়েছে ছোট্ট একটা গ্লোবাল ভিলেজে। চাইলেই আমি বা আপনি ঘরে বসেই আমেরিকান একজন লেখকের লেখা পড়ে ফেলতে পারি, কানাডার একজন বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করতে পারি, ঘরে বসেই পৃথিবীর বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির কোর্স করে ফেলতে পারি বা নিজের ল্যাপটপ দিয়ে বাংলাদেশে বসেই আপনি পৃথিবীর অন্য প্রান্তের যেকোনো কোম্পানির জন্য কাজ করে টাকা আয় করতে পারেন। সব মিলিয়ে এটাকেই বলা হচ্ছে গ্লোবাল ভিলেজ। পুরো পৃথিবীটাই পরিণত হয়েছে একটা গ্রামে।

সব জিনিসেরই ভালো ও মন্দ দিক আছে। এটিও এর ব্যতিক্রম নয়। আমরা অবশ্যই একে ভালো কাজে ব্যবহার করব। এক ক্লিকে মুহূর্তেই আপনি আপনার পছন্দের টপিক্সের সমস্ত তথ্য পেয়ে যাবেন। আপনার পছন্দের টপিকের ওপর শত শত আর্টিকেল বিনামূল্যে পেয়ে যাবেন, যা একসময় ছিল কল্পনাতীত। অনেক ভার্সিটি বিভিন্ন বিষয়ে ফ্রি অনলাইন কোর্স করায়। ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদিতে অসংখ্য বিশেষজ্ঞরা স্ব-স্ব বিষয়ে ফ্রি লেকচার দিয়ে থাকে।

কিন্তু গুগলে সার্চ দিতে গিয়ে অনেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অশ্লীল ওয়েবসাইটে চলে যান। এজন্য অবশ্যই Covenant Eyes Internet Accountability-সহ এ জাতীয় আরও অনেক অ্যাপ ব্যাবহার করতে হবে।

বই পড়া

বইকে বলা হয় মানুষের সর্বোত্তম বন্ধু। সব সময় সব বন্ধু পাশে না থাকলেও বই এমন এক বন্ধু, যা সব সময় সব পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে থাকে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে মানুষের বই পড়ার আগ্রহ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

২০১৪ সালের একটি গবেষণা দেখায়, ২৮% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বছরে মাত্র ১১টি বই পড়ে। মাসে একটির চেয়েও কম। ২৪% মানুষ বই খুলেই দেখে না। এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে দায়ী। শৈশবে জোর করে পড়ানো বই পড়ার উৎসাহ কমার জন্য দায়ী। বইভীতি তৈরিতে কিছু শিক্ষকেরও ভূমিকা রয়েছে। ননফিকশন বই যেকোনো বিষয়ে গভীর জ্ঞান তৈরিতে সাহায্য করে। ক্লাসিক সাহিত্যগুলো আমাদের সৃজনশীলতা, চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বিল গেটস, টিম চ্যালিস প্রমুখ বিখ্যাত ব্যক্তিরা বাৎসরিক বই পাঠ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। এক বছরে কতটি বই পড়বেন, তার লিস্ট জনগণের সামনে প্রকাশ করেন। নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে টানা কয়েকটা বই পড়ে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ। প্রতিমাসে কোন কোন বই পড়ে শেষ করবেন-এমন একটা লিস্ট তৈরি করুন। এটি আপনাকে বই পড়তে উৎসাহিত করবে।

বই আপনার মাথা থেকে আজেবাজে কল্পনাকে মুছে ফেলে সেখানে অনিন্দ্য সুন্দর একটা কল্পনার জগৎ তৈরি করে দেবে। শুধু পর্নোগ্রাফিই না; বই পড়ার অভ্যাস আপনাকে আরও হাজার ধরনের বাজে কাজ থেকে বিরত রাখবে। বিশ্বাস না হয়, চেষ্টা করেই দেখুন!!

ধাঁধা
ধাঁধা শব্দটা শুনলেই কেমন ম্যাজিক ম্যাজিক একটা অনুভূতি হয় তাই না? ছোটোবেলায় কত আগ্রহ নিয়েই না আমরা ধাঁধা সমাধান করতাম! অথচ বড়ো হয়ে আরও অনেক অভ্যাসের মতো এই অভ্যাসটাও আমরা হারিয়ে ফেলি। ধাঁধা জাতীয় বিষয়গুলো তৈরি অথবা সমাধান আমাদের মন বা মস্তিষ্কের ওপর দারুণ প্রভাব ফেলে। ইংরেজিতে এটাকে বলে ব্রেইনস্টর্মিং। একদিকে যেমন ধাঁধা আপনার ব্রেইনকে ব্যস্ত রাখবে, আরেকদিকে আপনার চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে। কাজেই, যখনই পর্নোগ্রাফির ভূত মাথায় চাপার চেষ্টা করবে, তখনই ওঝা হিসেবে ধাঁধা নিয়ে বসে পড়বেন। আশা করা যায়, পর্নোগ্রাফির ভূত মাথা ছেড়ে পালিয়ে যাবে দ্রুতই।

ভাষা শিক্ষা
ভাষা শেখাও কিন্তু অসাধারণ একটা শৌখিন কাজ হতে পারে। মাতৃভাষা ছাড়াও একাধিক ভাষা শিক্ষা আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ব্রেইনের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। আবার একাধিক ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি সৃজনশীল ও বুদ্ধিমান হয়। অনলাইন কোর্সের সাহায্যে সহজেই ইংরেজি, আরবি, উর্দু, তুর্কি, হিন্দি ইত্যাদি ভাষা শেখা সম্ভব। ইউটিউবে সার্চ করলেই এমন অসংখ্য টিউটোরিয়াল পাওয়া যাবে।

ভ্রমণ
আরও একটা কার্যকর ও প্রোডাক্টিভ শৌখিনতা হতে পারে ভ্রমণ। দেশ বিদেশের নানা প্রান্তে আপনি যখন একের পর এক ট্যুর দিতে থাকবেন, সেটা একই সঙ্গে যেমন আপনার অভিজ্ঞতা বাড়াবে, তেমনি আপনার দেখার চোখও পালটে দেবে। ভ্রমণ মানুষকে নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে বের করে বাইরের বিশাল রঙিন জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

নিঃসন্দেহে ভ্রমণ একটি আনন্দদায়ক বিষয়ও। ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষ যখন নতুন নতুন জায়গা পরিদর্শন করে, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়, সেই আনন্দের কোনো তুলনা হয় না। এ ছাড়া পরিবেশ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সমাজ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানুষ কেবল ভ্রমণের মাধ্যমেই জানতে পারে। মানুষ কোনো স্থান ভ্রমণ করলে সেই ভ্রমণকাহিনি ও অভিজ্ঞতা সারাজীবনের জন্য তার মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে থাকে।

আপনাকে সব সময় যে দূরেই ঘুরতে যেতে হবে, এমন কিছু না। বাইরে হাঁটতে বেড়ানোও অনেক ভালো একটা কাজ। রোদে বের হলে দেহে ভিটামিন ডি পাবেন। ভিটামিন ডি ছাড়াও ঘুরতে বের হওয়ার শারীরিক, মানসিক অনেক উপকারিতা আছে। যখনই পর্নোগ্রাফি দেখার ইচ্ছা জাগবে, তখনই বাইরে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুন। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে নিতে পারলে আরও ভালো হয়। মূলত পৃথিবী কতটা বড়ো, কতটা সুন্দর, এই চিন্তাই মানুষকে সকল বাজে কাজ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম। আর এই চিন্তা আসে কেবল ভ্রমণের মাধ্যমেই।

স্রষ্টার সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা

ছোটোবেলায় একটা কবিতা আমরা সবাই পড়েছি—
'এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, মিঠা নদীর পানি, খোদা, তোমার মেহেরবানি।'

এই যে আমরা আমাদের চারপাশে এত এত সৃষ্টি, এত কিছু—এগুলো নিয়ে কি ভেবেছি কোনোদিন? চারপাশের এত মানুষ দেখি, কারও সাথে কারও মিল নেই; এমনকী আমাদের নিজেদের দুটি হাতের রেখার মধ্যেও কোনো মিল নেই। কত শত বৈচিত্র্যতা! এ ছাড়াও কত লাখো-কোটি সৃষ্টি আছে আমাদের চারপাশে। কে সৃষ্টি করল এই বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিকে? এসব নিয়ে কি কোনোদিন ভেবেছি? এই মহাবিশ্ব, মহাজগৎ নিয়ে কি কোনোদিন কোনো চিন্তা উদয় হয়েছে আমাদের মনে? কখনো কি তুলনা করে দেখেছি, এই বিশাল মহাকাশের তুলনায় আমার অবস্থান কোথায়? যদি এগুলো না করে থাকেন, তাহলে এক্ষুনি শুরু করে দিন। তবে এমন চিন্তা-ভাবনা করার জন্য কোলাহলমুক্ত পরিবেশ দরকার। পৃথিবী যখন নিশ্চুপ, তখন; বিশেষ করে গভীর রাতে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে পারেন। শেষ রাত্রির এই ভাবনাগুলো আপনাকে দুনিয়া থেকে বহুদূরে নিয়ে যেতে সক্ষম।

📘 নীল বিষ > 📄 কেমন হতো, যদি সাধারণ জিনিসে আনন্দ পাওয়া যেত

📄 কেমন হতো, যদি সাধারণ জিনিসে আনন্দ পাওয়া যেত


ডাল ম্যানস ক্লাব (Dull Mens Club) নামে একটি আন্তর্জাতিক ক্লাব আছে। ব্রিটেন ও ইউরোপে এই ক্লাবের সদস্য সংখ্যা অনেক। এই ক্লাবের ৫,০০০ সদস্য দাবি করেছেন, তারা খুব ছোটো ছোটো বিষয় থেকেও আনন্দ পান।

একজন দুধের বোতল সংগ্রহ করেন।

অন্য একজন হয়তো পুরো দুনিয়ার বিখ্যাত সব গোরস্থানের ছবি তুলে বেড়ান।

আরেকজন হয়তো তুলেন ট্রাফিক সিগনালের ছবি ।

এই ক্লাবের একজন ক্লাব মেম্বার দাবি করেন- 'নিস্তেজ হওয়ার মধ্যেই শান্তি আছে।' আপাতদৃষ্টিতে এটা নির্বোধের কাজ বলে মনে হতে পারে; কিন্তু এখান থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। এই ক্লাবের লোকজন বিশেষ কিছুর ভেতরে না; বরং সাধারণ জিনিসের বৈচিত্র্যের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পায়। যেমন ধরুন, বিভিন্ন দেশের দুধের বোতলে হরেক রকমের ডিজাইন ও লোগো থাকে। আবার একেক দেশের ট্রাফিক সিগনাল একেক রকম হয়। অনেকে বিভিন্ন দেশের রং-বেরঙের ডাকটিকিট সংগ্রহ করে। সাধারণ একটা দুধের বোতল বা ডাকটিকেটও যে আনন্দের উৎস হয়ে উঠতে পারে, ডাল ম্যানস ক্লাব আমাদের সেটাই শেখায়। শেখায়, শখের মূল্য আসলেই লাখ টাকা। ভালোবাসা আর যত্ন থাকলে ঘরের পাশের শিশির বিন্দুও আপনার জন্য হয়ে উঠতে পারে দারুণ সৌন্দর্যের প্রতীক।

ঠিক এখানেই শখ আর পর্নোগ্রাফির মধ্যে মূল পার্থক্য। পর্নোগ্রাফি যেখানে কাজ করে মাদকের মতো, শখ তখন করে ওষুধের কাজ। পর্নোগ্রাফি দেখা শুরু করলে দিন দিন আরও আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময় পর্নের চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু প্রকৃতি সম্পর্কে অনুসন্ধান আমাদের ছোটো ছোটো বিষয়েও আনন্দ পেতে শেখায়। পর্নোগ্রাফি একজন মানুষকে ধীরে ধীরে নৈতিকতাহীন এক পশুতে পরিণত করে। অন্যদিকে প্রকৃতি আপনাকে শেখাবে, কীভাবে জীবনকে ভালোবাসতে হয়, মানুষকে ভালোবাসতে হয়। পর্নাসক্ত ব্যক্তি দাম্পত্যজীবনে সুখী হয় না। এক সংগীত সে বিরক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে শৌখিন মানুষ সহজেই আনন্দ খুঁজে নিতে পারে। আনন্দ পাওয়ার জন্য তাকে সঙ্গীর সাথে প্রতারণা করতে হয় না। পর্নোগ্রাফি যখন সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, প্রকৃতি আর শৌখিনতা তখন সমাজে ফোটায় সুন্দরের ফুল। যে ফুলের সুবাসে ভরে যায় সমাজ, দেশ এবং পৃথিবী। আপনিও যদি সেই সুন্দরের ফুল ফোটাতে চান, তবে আপনিও একজন অনুসন্ধানকারী হয়ে উঠুন। হয়ে উঠুন একজন মুসাফির। বেরিয়ে পড়ুন সুন্দরের খোঁজে!!

পর্নোগ্রাফির প্রতি আকর্ষণের অন্যতম একটা কারণ হলো, এর গোপনীয়তা। স্বাভাবিকভাবেই গোপন বিষয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি থাকে। গোপন বিষয় দেখলে এডরিনালিন নিঃসরণ হয়, যা আমাদের মনে ভালো লাগার অনুভূতি সৃষ্টি করে। নিয়মিত এসব দেখা শুরু করলে আরও আকর্ষণীয় ও ভয়ংকর পর্নের চাহিদা তৈরি হয়। পর্নাসক্ত বেশিরভাগ ব্যক্তি একটা সময় গিয়ে পরিণত হয় একেকজন পটেনশিয়াল রেপিস্টে।

একসময় অল্প এডরিনালিন তাদের মনে আর আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে না। তাদের আনন্দ পাওয়ার জন্য আরও বেশি এডরিনালিন প্রয়োজন হয়। এখন এই বাড়তি এডরিনালিন আসবে কোথা থেকে? এই বাড়তি এডরিনালিনের জোগান পেতে তখন আসক্ত ব্যক্তিরা পাগলের মতো আচরণ করে, পর্ন দেখেও একসময় আর এডরিনালিন-এর চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। ফলে এবার তারা আশেপাশের নারীদের দিকে লালসার দৃষ্টি ফেলতে শুরু করে। এক পাপ এভাবেই খুলে দেয় আরও হাজারটা পাপের দরজা।

অথচ চাইলেই এই এডরিনালিনের চাহিদা বৈধ উপায়েও মেটানো যায়। চাইলেই বিকৃত পথে নয়; বরং সুন্দরের পথেও আপনি আনন্দের দেখা পেতে পারেন।

তবে এজন্য আপনাকে হতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু। একজন মুসাফির।

বাড়ির বাইরে, আশেপাশে, বনবাদাড়ে একজন অভিযাত্রীর মন নিয়ে অন্বেষণ করতে শুরু করুন। চাঁদের পাহাড়ের সেই শংকরের মতোই হয়ে যান না কিছুদিনের জন্য!! আপনার বাসস্থানের কাছাকাছি কোনো প্রাকৃতিক ছোটোখাটো বন আছে? ঘুরতে চলে যান। সাইকেল আছে বাসায়? চালাতে পারেন? চড়ে বসুন একদিন। চলে যান অনেক দূরে। বাড়ির আশেপাশে নদী আছে? কোনো এক রাতে কয়েকজন মিলে নৌকা বিলাস করে ফেলুন, কে নিষেধ করেছে? ভরা পূর্ণিমায় নদীর কালো জলের ওপরে জোনাকির খেলা যে কোনোদিন দেখেনি, সে সুন্দরের মর্ম কীভাবে বুঝবে?

কবি বলেছেন—'দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে দু'পা ফেলিয়া।' আপনার বাসস্থানের কাছাকাছিও হয়তো এমন অনেক সুন্দর জায়গা আছে, যা এখনও আপনার দেখা হয়নি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সহজেই এসব জায়গা থেকে ঘুরে আসতে পারেন।

শুধু ছোটো ট্যুর নয়; বরং সময় আর সুযোগ থাকলে বড়ো ট্রিপ দেওয়ার জন্যও মনস্থির করুন। পাঁচ-সাত দিনের জন্য দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে হারিয়ে যান। কোনো একদিন, কোনো এক পাহাড়ে উঠতে উঠতে আপনি হঠাৎ-ই আবিষ্কার করবেন, পাহাড় জয়ের চেয়ে আনন্দদায়ক কাজ দুনিয়াতে খুব বেশি নেই। চাইলে ঘুরতে পছন্দ করে, আপনার এমন বন্ধুদের নিয়ে একটা ট্যুর গ্রুপ বানিয়ে ফেলতে পারেন অথবা যারা নিয়মিত ট্যুর দেয়, তাদের সাথেই নতুন বন্ধুত্বও করতে পারেন।

মনে-প্রাণে একজন পর্যটক হয়ে উঠুন

আপনার বর্তমান বাসস্থানে কত বছর ধরে বসবাস করছেন? আপনার নিজের শহরকেই বা আপনি কতটা চেনেন? যে গ্রাম বা শহরের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছেন, সেই জায়গাকে কতটা আপন করে চিনতে শিখেছেন? আমরা অনেকেই নিজেদের একটি ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলি; বাসা, অফিস, স্কুল, মসজিদ, হাতেগোনা কিছু দোকানপাট ও রেস্টুরেন্টের গণ্ডিতেই আটকে থাকে আমাদের চলাফেরা। অথচ দেশের অনেক বড়ো শহর; এমনকী ছোটো শহরগুলোতেও কত জাদুঘর আছে, পার্ক আছে, প্রাকৃতিক জায়গা আছে, ঐতিহাসিক কত স্থান আছে, সেগুলো ঘুরে দেখার চেষ্টা করেছেন কখনো?

প্রতিমাসে আপনার হাতে মোট চারটি বা পাঁচটি শুক্রবার থাকে। কোনো এক শুক্রবারে নিজের সাইকেলটা নিয়ে বা বাইকটা নিয়ে বা রিকশায় উঠেই বসুন না!! একা একা না গিয়ে পরিবারের কাউকে সাথে নিন বা কোনো বন্ধুকে সাথে নিয়েই শহরের ছোটো জাদুঘরটা ঘুরে আসেন। চিড়িয়াখানাটা ঘুরে আসেন। নদীর ধারটা ঘুরে আসুন। দেখবেন, এসব ছোটো ছোটো জায়গাতেও কত বড়ো বড়ো আনন্দ আর রিফ্রেশমেন্ট লুকিয়ে আছে।

এসব প্ল্যান প্রোগ্রাম করা ট্যুর যদি আপনার কাছে খুব বেশিই ফর্মাল মনে হয়, তবে হিমু হয়ে যেতে পারেন। রাতের শহর বা ভোরের গ্রামে হেঁটে বেড়াতে পারেন উদ্দেশ্যহীন। রাস্তার মোড়ের টং দোকান বা ছায়া ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যাওয়া দুটি পাখিও হয়তো আপনাকে মুগ্ধ করবে। আপনার মনে এনে দেবে প্রশান্তির পরশ!!

আপনি যদি গ্রামের মানুষ হন, তাহলে শিশির পড়া ভোরে বের হতে পারেন হাতের স্মার্টফোনটা নিয়ে। সূর্য উঠার আগেই মাঠে যাওয়া কৃষক, ধানের শিষে বসে থাকা ঘাসফড়িং বা পানির পাম্পে তৈরি হওয়া ঝরনা, কত সুন্দরই তো আপনার চারপাশে ডানা মেলে আছে, শুধু আপনার খুঁজে নেওয়ার অপেক্ষায়।

জানি, কিছু কিছু পরামর্শ আপনার কাছে খুবই অদ্ভুত মনে হচ্ছে। হয়তো ভাবছেন, এভাবে কি ফিরে আসা সম্ভব? উত্তর হলো, হ্যাঁ, সম্ভব। যেহেতু পর্নোগ্রাফির নীল জগতে আপনার দৃষ্টি সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে, তাই এখন আপনার জগৎকে যথাসম্ভব বড়ো করে ফেলতে হবে। আগের দৃষ্টিভঙ্গি ছুড়ে ফেলে নতুন চোখে পৃথিবীকে দেখতে হবে। সেই নতুন পৃথিবীই আপনাকে দেবে নতুন একটা জীবনের সন্ধান।

📘 নীল বিষ > 📄 বাস্তবে কখনো মহৎ কাজ প্রত্যক্ষ করেছেন

📄 বাস্তবে কখনো মহৎ কাজ প্রত্যক্ষ করেছেন


রাস্তায় কোনো পথচারী অ্যাক্সিডেন্ট করলে অপরিচিত লোকের সাহায্য দেখেছেন নিশ্চয়ই? ঘূর্ণিঝড়ের পর বিভিন্ন সংস্থা, ক্লাব বা সংগঠনের ত্রাণ কার্যক্রমও নিশ্চয়ই দেখেছেন? এ ধরনের মহৎ কাজ ধূসর মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো। এগুলো হলো আল্লাহর দেওয়া ভালোবাসার প্রতিফলন।

বিপরীতে পর্নোগ্রাফি দেখা দুনিয়ার সব থেকে স্বার্থপরমূলক কাজ। এগুলোর মধ্যে এক ফোঁটাও মহত্ত্ব নেই। এগুলো আপনাকে শিক্ষা দেয়—যৌন তৃপ্তিই জীবনের সব। আপনি আর যৌনতা ছাড়া এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই। এই ইন্ডাস্ট্রি সবচেয়ে বড়ো ভিক্টিম হলো নারী আর শিশুরা। এখানে যে দৃশ্যগুলো দেখানো হয়, ওসব কিন্তু স্বাভাবিক যৌনতা নয়; বরং বিকৃত যৌনাচার। বাস্তবতার সাথে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে যে বিশেষ দৃশ্যগুলো অনেক লম্বা সময় ধরে দেখানো হয়, ওগুলোও কৃত্রিম। মূলত এটা করা হয় বিভিন্ন ক্ষতিকর ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে।

সবচেয়ে নিষ্ঠুর ব্যাপার হলো—বেশিরভাগ সময়ই এসব ওষুধ সেবন করতে অভিনেতা বা অভিনেত্রীদের বাধ্য করা হয়। আপনার আনন্দের উৎস এই ইন্ডাস্ট্রি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কাছে এক মূর্তিমান বিভীষিকার মতোই। আপনাকে আনন্দ দিতে গিয়ে কখনো অতিরিক্ত হরমোন বা অতিরিক্ত ড্রাগ নেওয়ার কারণে বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী প্রতিবছর মারাও যায়। স্বার্থপরতার কী নিকৃষ্ট উদাহরণ! মানবজীবনের কী নিদারুণ অপচয়! যে আনন্দ অন্যের মৃত্যুর কারণ হয়, সেই আনন্দকে কি আনন্দ বলে? নাকি অসভ্যতা বলে?

পর্ন দেখে আনন্দ পাওয়ার সবচেয়ে বড়ো সংকটের জায়গা হলো-পর্নোগ্রাফিকে বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে ফেলা। পর্নাসক্তরা তাদের আশেপাশের মানুষগুলোকে পর্নস্টার হিসেবে দেখে এবং তাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পর্নস্টারদের সাথে তুলনা করে নানা ধরনের ফ্যান্টাসিতে ভোগে। বৈবাহিক জীবনেও সে রকম সঙ্গীই কল্পনা করে। কিন্তু যখন প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মেলবন্ধন ঘটে না, তখনই জীবনে নেমে আসে ডিপ্রেশনের অন্ধকার।

অনেক সময় আসক্ত ব্যক্তি বৈবাহিক জীবনে পর্নোগ্রাফির মতো করেই বিকৃত যৌনাচারের চেষ্টা চালায়। ফলাফলস্বরূপ, এরা সঙ্গীর প্রতি হয়ে উঠে অমানবিক। পারিবারিক জীবন বা বৈবাহিক জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। আবার পর্নাসক্তি ব্যক্তির যৌন ক্ষমতাকেও ব্যাপকভাবে হ্রাস করে। কাজেই, যেকোনো মূল্যে আমাদের এই পর্নোগ্রাফির জগৎ ছাড়তেই হবে। কিছু ছোটো ছোটো কাজ, কিছু শৌখিনতা কীভাবে আমাদের এ থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে, সেটা জানা থাকলে আমাদের এই ভয়ংকর জাল থেকে মুক্তি পাওয়াটা সহজ হবে।

নিজের পরিবারের সেবা করুন
পর্নোগ্রাফি মানুষের দায়িত্ববোধ কেড়ে নেয়। বিশেষ করে আসক্ত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ লোপ পায়। মনে করে দেখুন তো, শেষ কবে স্বেচ্ছায় আপনি আপনার ঘরটা পরিষ্কার করেছিলেন? সর্বশেষ কবে আপনি পরিবারের শিশুদের হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করেছেন? শেষ কবে আপনি আপনার পরিবারের জন্য খাবার প্রস্তুত করেছিলেন?

কোনো পরিবারেরই নিষ্ক্রিয় কোনো সদস্যের দরকার নেই; দরকার কর্মঠ, দায়িত্বশীল সদস্যের। পরিবারের সদস্যদের অবশ্যই আপনার সময়, ভালোবাসা বা সেবা পাওয়ার অধিকার আছে।

একই সঙ্গে, আপনি যদি আপনার সন্তান অথবা ছোটো ভাইকেও আপনার মতো আসক্ত হিসেবে দেখতে না চান, তাহলে অবশ্যই তাদের খেয়াল রাখতে হবে, সময় দিতে হবে। বেশি কঠোর হওয়াও চলবে না, আবার একেবারে নরম-সরম হলেও চলবে না; মধ্যমপন্থা অনুসরণ করতে হবে।

জে স্টিনগার বলেন- 'উদ্ভট যৌনাচার অনেক সময় আমাদের পিতা-মাতার কঠোর শাসনের কারণে হয়। আবার শাসন না করার কারণেও হয়।'

অর্থাৎ, আপনাকে বাচ্চাদের সাথে খেলতে হবে। তাদের সময় দিতে হবে। আপনার সন্তানের জন্য আপনাকে আপনার ধারণার চেয়েও বেশি দরকার।

মোদ্দাকথা, আপনাকে পরিবারের প্রতি আচরণে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। একইভাবে হোস্টেলের রুমমেটদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। এই সম্পর্ক আপনার জন্যও দরকার। একদিন সবাই মিলে বাসার চারপাশ পরিষ্কার করতে লেগে যান। একদিন সবার জন্য রান্না করার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিন। বিকেলে বা সন্ধ্যায় চা খেতে খেতে পরিবারের সবার সাথে দিয়ে ফেলুন একটা বৈকালিক আড্ডাও। পর্নোগ্রাফির বিষে আপনার পরিবারের সাথে আপনার যে দূরত্বটা তৈরি হয়েছে, সেই দূরত্ব কমিয়ে ফেলতে চেষ্টা করুন। একদিনে হয়তো পারবেন না, কিন্তু চেষ্টা করলে একদিন ঠিকই পারবেন।

গোপনে সেবাদান

কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থানের ব্যর্থতা মানুষকে পর্নের দিকে নিয়ে যেতে পারে, আবার কাজ করে স্বীকৃতি না পাওয়াও মানুষকে পর্নাসক্ত করে ফেলতে পারে। মনে রাখতে হবে, পর্নোগ্রাফিও মাদকের মতোই এবং পৃথিবীর সব মাদকে মানুষের হাতেখড়ি হয় হতাশার হাত ধরে।

আপনি হয়তো অনেক কষ্ট করে একটা প্রজেক্ট সম্পাদন করলেন; অথচ আপনার বস সেটা উপেক্ষা করল অথবা প্রাপ্য ক্রেডিটটুকু দিলো না। আপনি হয়তো বাড়ির একটি জটিল সমস্যার সমাধান করে ফেললেন, কিন্তু আপনার স্ত্রী সেটাকে ঠিকভাবে মূল্যায়ন করল না। এই স্বীকৃতি না পাওয়া আপনার মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করতে পারে।

কাজের স্বীকৃতি পাওয়ার লোভ সবার মধ্যে কাজ করে। আর যখনই সেই স্বীকৃতি পাই না, তখনই আমরা হতাশায় ভুগী। সেই হতাশা ভুলে থাকার চেষ্টা করি পর্নোগ্রাফির ভেতরে।

এই সমস্যার কোনো সহজ সমাধান নেই। আমাদের হাতে এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই, যে কাঠির সাহায্যে আমরা পৃথিবীর সব মানুষকে কৃতজ্ঞ মানুষে পরিণত করে ফেলতে পারব। আপনার স্ত্রী বা আপনার বস এসে আপনাকে আপনার কাজের ক্রেডিট দিয়ে যাবে; বরং এই সমস্যার সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো-স্বীকৃতির আশা ছেড়ে দিন। কাজ করার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে নিন, স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকার দরকার নেই। যদিও এটা বলা যতটা সহজ করা ততটা সহজ না, কিন্তু চেষ্টা করতে দোষ কী?

আমাদের কাজ থেকে পরিতৃপ্তি নেওয়া শিখতে হবে; প্রশংসা পাক বা না পাক। এটি অর্জনের উপায় হলো-গোপনে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা।

আপনার এলাকায় যদি আর্তমানবতার সেবা করে এমন কোনো সংস্থা থাকে, তাহলে সেখানে যোগ দিন। এসব সংস্থা বন্যার্তদের ত্রাণ দেয়, অসুস্থকে চিকিৎসা দেয়, শীতের সময় শীতবস্ত্র বিতরণ করে এবং নদী ভাঙনের শিকার মানুষকে সহায়তা করে। আন্তরিকতার সাথে এসব সংস্থায় সময় দিন এবং অবশ্যই নিভৃতে। কারও থেকে প্রশংসার আশা করবেন না। আল্লাহ সব দেখছেন এবং তিনিই আপনাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন।

আপনার এলাকায় যদি এ রকম স্বেচ্ছাসেবক দল না থাকে, তাহলেও হতাশ হওয়ার দরকার নেই। আশেপাশের প্রতিবেশীদের সহায়তার সুযোগ খুঁজতে থাকুন। বাইরে বের হওয়ার সময় প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে বের হতে পারেন। রাস্তায় কোনো প্লাস্টিকের বোতল পেলে তা কুড়িয়ে নিন, ব্যাগে ভরে ফেলুন এবং ডাস্টবিনে ফেলে দিন। এসব কাজ লোক দেখানোর জন্য করবেন না; করবেন নিজের জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। বয়স্ক প্রতিবেশীর খোঁজ নিন এবং তাদের সেবা করুন। ভালো কাজ করাই মূল বিষয়; স্বীকৃতি নয়।

মনোযোগ দিয়ে কথা শুনুন

পর্নোগ্রাফি মানুষের মনুষ্যত্ব কেড়ে নেয়। আসক্ত ব্যক্তিরা নারীকে শুধু নিজেদের যৌন তৃষ্ণা মেটানোর বস্তু হিসেবেই দেখে, মানুষ হিসেবে দেখে না। তাই যারা আসক্ত, তাদের মনুষ্যত্ব পুনরুদ্ধার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।

নারীকে যৌন তৃষ্ণা নিবারণের বস্তু না ভেবে মানুষ ভাবা শিখতে হবে। এই মানসিকতা অর্জনের একটা উপায় হলো-নিঃস্বার্থভাবে আর্তের সেবা করা। এমন মানুষের সেবা করা, যারা কখনোই আপনাকে এর বিনিময়ে কিছু দিতে পারবে না অথবা তাদের থেকে কোনো প্রতিদান পাওয়ার আশাও নেই।

Mাসে দুয়েকদিন শহরের বস্তিতে চলে যান। সেখানকার মানুষের সাথে কিছু সময় কাটান। তাদের দুঃখ-দুর্দশা, জীবন-সংগ্রামের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। কথা বলার সময় সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে কথা বলুন। হাসিমুখে তাদের যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করুন। ভিক্ষুককে আমরা অনেকেই অসম্মান করে তাড়িয়ে দিই, আপনি তাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলুন। এসব মানুষকে খাদ্য, পোশাক অথবা টাকা দিয়ে সাহায্য করুন। নিজের জন্য তাদের কাছে দুআ চান। এসব অসহায় মানুষের নাম জিজ্ঞেস করে তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিন। আপনার ছোটো একটি কথা তাদের মনে জোর বাড়াতে অনেক সাহায্য করবে। মূলত, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহারে নিজেও ভালো থাকা যায়। মনে রাখবেন, পর্নোগ্রাফির এই থাবা থেকে বের হয়ে আসতে মনুষ্যত্ব হবে আপনার অনেক বড়ো একটা অস্ত্র।

📘 নীল বিষ > 📄 সামাজিক কাজের মাধ্যমে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ

📄 সামাজিক কাজের মাধ্যমে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ


পৃথিবীতে মানুষের জনসংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের চারপাশের মানুষ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু দিনদিন আমরা সবাই কেমন যেন একা হয়ে যাচ্ছি। এটার অন্যতম প্রধান নিয়ামক হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। যেমন : আমাদের স্মার্টফোন; সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একটি সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যারা যত বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করেন, তাদের একাকিত্ব তত বেশি। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ঘোরাঘুরি, আড্ডা, কোলাকুলি, হ্যান্ডশেক ইত্যাদির গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। এর বদলে ভার্চুয়াল সম্পর্কের দিকে ধাবিত করছে। অথচ ভার্চুয়াল সম্পর্ক কখনোই রিয়েল লাইফের সম্পর্কগুলোর মতো হতে পারে না। যেহেতু ফেসবুক কখনোই এগুলোর প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়, সেহেতু মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে এবং পর্নের দিকে ধাবিত হয়।

প্রযুক্তিগত উন্নতি দেরিতে বিয়েরও একটা কারণ

১৯৬০ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী ৩০ বছর বয়সের মধ্যে ৮০% পুরুষ বিয়ে করে। ১৯৮০-তে তা কমে দাঁড়ায় ৭০%। ২০০১-এ ৫৫% এবং ২০১৩-তে মাত্র ৪০% পুরুষ মানুষকে ৩০-এর আগে বিবাহিত পাওয়া যায়।

এমনকী অনেক বিবাহিতও আজকাল প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পর্নাসক্তিতে আটকা পড়ে আছেন।

এই অধ্যায়ে আমরা সম্পর্কের গভীরতার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করব। ভার্চুয়াল সম্পর্কের সংকট আপনাকে দেখিয়ে দেবো। বন্ধুত্ব কীভাবে আপনার আসক্তিকে কমিয়ে দিতে পারে, কথা বলব সেই বিষয়েও। আশা করি, এর মধ্যেই আপনি আগের শিখে আসা নতুন অভ্যাসগুলোর অনুশীলন শুরু করে দিয়েছেন এবং এতদিনে অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনারের সাথেও ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছেন।

রিয়েল লাইফের বন্ধুদের সাথেই আপানার ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। না, সবাই আপনার ক্লোজ হবে না। তার দরকারও নেই। জীবনে চলার পথে কিছু বন্ধু হারিয়ে যাবে, কিছু নতুন বন্ধু আসবে-এটাই স্বাভাবিক। তাই নতুন নতুন বন্ধু বানানো চালিয়ে যান। একটি সমীক্ষায় জানা যায়, যাদের বেশি ভালো বন্ধু আছে, তারা সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে এবং অসুস্থ কম হয়। এর সাথে সাথে বন্ধুত্ব আপনার মানসিক চাপ কমায়। আর মানসিক চাপমুক্ত থাকলে পর্নের দিকে ধাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

যদিও বয়স্কদের জন্য নতুন বন্ধু বানানো কঠিন, তবে তারা পুরোনো বন্ধুত্বগুলো জোরদার করতে পারেন। চাইলে ছোট্ট একটা গেট টুগেদার বা আড্ডার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের ফিরিয়েও আনতে পারেন।

ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও পাঠচক্র

নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ মানুষের মনকে প্রশান্ত রাখে এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে রাখে। তাই নিয়মিত ধর্মীয় বই-পুস্তক পাঠ করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় কয়েকজন মিলে একটা পাঠচক্র বানিয়ে ফেলুন। সমমনা ভাই কিংবা বন্ধুদের নিয়ে একটি সার্কেল তৈরি করে ফেলতে পারেন, যারা বই পড়তে আগ্রহী। প্রতি সপ্তাহে কিছু বই নির্দিষ্ট করে নিতে পারেন। পড়ার পর কে কী বুঝলেন, তা শেয়ার করবেন সবার সাথে। একবার শুরু করলে অবশ্যই প্রতি সপ্তাহে এটি চালিয়ে যেতে হবে। ধর্মীয় বইয়ের বাইরেও সাহিত্যপ্রেমীদের একটা গ্রুপ করে নিতে পারেন, যারা একত্রে প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন বসে সাহিত্য নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবেন।

চাইলে জুম অ্যাপসের মাধ্যমেও সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করা যায়।

ইনডোর গেমস

পরিবারের সবাই মিলে বিভিন্ন ইনডোর গেমস খেলতে পারেন। এতে যেমন ফ্যামিলি বন্ডিং বাড়বে, তেমনই মানসিকভাবেও প্রশান্তি লাভ করবেন।

ভাষা শিক্ষা/প্রোগ্রামিং কোর্স

বিভিন্ন ধরনের কমিউনিটি কোর্স রয়েছে, যা আমাদের এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। সময়-সুযোগমতো ভাষা শিক্ষা, প্রোগ্রামিং কোর্স ইত্যাদিতে ভর্তি হয়ে যান। এটাকে শখ হিসেবে নিন। পাশাপাশি নতুন নতুন বন্ধুও তৈরি করুন।

অনলাইন কমিউনিটি

ফেসবুকে গ্রুপ/পেজ চালানোকে কেন্দ্র করে বহু গ্রুপ গড়ে ওঠে। সৃজনশীল কোনো গ্রুপ/পেজের মডারেটর/অ্যাডমিন হতে চেষ্টা করুন। তাহলে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকবেন।

ম্যাসেঞ্জারে স্কুলফ্রেন্ডদের নিয়ে গ্রুপ খুলতে পারেন। পুরোনো স্মৃতির আলোচনা করুন। সবাই মিলে গেট টুগেদার করুন। লক্ষ রাখুন, গ্রুপের সবাই যেন চরিত্রবান হয়; নাহলে তারা এমন কিছু গ্রুপে শেয়ার করবে, যা আপনাকে সেক্স ড্রাইভ দেবে। সচরাচর এমনটিই হয়ে থাকে।

অসৎসঙ্গ পরিহার
মোটিভেশনাল স্পিকার জিম বলেন- 'আপনি হচ্ছেন পাঁচজন মানুষের গড়, যাদের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান।'

আপনার ক্লোজ ফ্রেন্ড কারা? কাদের সাথে বেশি সময় কাটান? তারা কোন দিকে আপনাকে মোটিভেট করে? অথবা আপনার নৈতিক চরিত্রে তাদের প্রভাব কতদূর?

আপনার হয়তো দীর্ঘ সময়ের এমন কিছু বন্ধু আছে, যারা আপনাকে পথ চলতে সাহস জোগায়। কিন্তু অন্যদিকে এরাই আপনাকে কুৎসিত ভিডিওগুলো দেখতেও উৎসাহিত করে।

এমনটি হলে তাদের পরিত্যাগ করতে হবে। আমি প্রথমেই বাদ দিতে বলছি না। বন্ধুদের বোঝান, আপনার জীবনে একটা পজিটিভ পরিবর্তন আনতে চাচ্ছেন। এ বিষয়ে তাদেরও সাহায্য চান। তাও যদি কাজ না হয়, তাহলে পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ, 'সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ।'

পরিশেষে আপনার জীবন আপনাকে অনেক ধরনের কথাই শোনাবে। হয়তো আপনার অফিসের বস আপনাকে বলবে-আপনি ভালো কর্মচারী নন। শিক্ষক বলবে-আপনি ভালো ছাত্র হতে পারেননি। বাবা-মা বলবে-সারাজীবনে তুমি কিছুই করতে পারোনি। হয়তো স্ত্রীও আপনাকে বলবে-আপনি ব্যর্থ মানুষ, আপনি যথেষ্ট স্মার্ট মানুষ না।

জানি, এসব কথা আপনাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যায়। হতাশায় ডুবিয়ে দেয়, পৃথিবীর কাছে নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, আপনি স্রষ্টার অনন্য ও অমূল্য এক সৃষ্টি। আপনার জীবন, আপনার পৃথিবী অনেক বড়ো। মানুষের কথায় নিজের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করবেন না, নিজেকে অন্যের কথার ওপর ছেড়ে দেবেন না। এই পৃথিবীতে আপনার নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। আপনার নির্দিষ্ট কাজ আছে। আপনার জন্য এই পৃথিবীতে ভালোবাসাও বরাদ্দ আছে। আপনাকে শুধু হতাশ না হয়ে সেই ভালোবাসাটাকে খুঁজে নিতে হবে।

লেখক জোনাথন রগার বলেন-
'লোকে কী বলে, তার পালটা জবাব দেওয়ার নামই তো সৃজনশীলতা।'

কাজেই, আপনাকে কোনোভাবেই হতাশ হওয়া চলবে না। ভালো অভ্যাস ও আচার-আচরণ দিয়েই আপনাকে পৃথিবীর সকল নেগেটিভিটির বিরুদ্ধে লড়তে হবে। কবিতা শোনেননি?
'আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যে বা, আমি বাঁধি তার ঘর,
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই, যে মোরে করেছে পর।
যে মোরে দিয়েছে বিষে ভরা বাণ, আমি দেই তারে বুকভরা গান,
কাটা পেয়ে তারে ফুল করি দান, সারাটি জনম ভর।
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই, যে মোরে করেছে পারে।'

জীবনে চলার পথে অনেক কাঁটাই পাবেন। সেই কাঁটাকে ফুল করে তোলার মধ্যেই জীবনের সমস্ত সার্থকতা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00