📘 নীল বিষ > 📄 আপনি ঠিক তা-ই, যা খাবার হিসেবে গ্রহণ করেন

📄 আপনি ঠিক তা-ই, যা খাবার হিসেবে গ্রহণ করেন


Covenant Eyes-এর একজন কর্মকর্তা, স্কট তার বাসায় প্রতি সপ্তাহে ধর্মগ্রন্থ চর্চা করত। একসঙ্গে কয়েকজন মিলে বাইবেল পড়ত। কোনো এক সপ্তাহে তারা সিদ্ধান্ত নিল, বাইবেল চর্চা বন্ধ করে বিনোদনমূলক কিছু দেখা যায় কি না। সিদ্ধান্ত নিল, তারা এখন থেকে ক্লাসিক কমেডি মুভি দেখবে। যেই ভাবা, সেই কাজ। সবাই মিলে মুভি দেখতে বসল। মুভিতে যখনই কোনো অশ্লীল দৃশ্য সামনে আসত, স্কট তখনই তা স্কিপ করার জন্য রিমোট হাতে নিত অথবা ভিডিও অফ করে দিত। তারা এমন বিব্রতকর অবস্থা এড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে লাগল।

একবার স্কট সিনেমা টেনে দিতে গিয়ে একটু বেশি এগিয়ে গেল। ফলে তারা এতক্ষণ যা এড়ানোর চেষ্টা করছিল অর্থাৎ অশ্লীল দৃশ্য, তা সামনে এসে গেল। এভাবে তিন-চারবার অশ্লীল দৃশ্য দেখার পর তাদের সবার কাছেই বিষয়টি কেমন যেন গা সওয়া হয়ে গেল। সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যেত এমন দৃশ্যও তারা অনায়াসে দেখতে শুরু করল। কিছুদিন আগেও যে দৃশ্যগুলো তাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করত, এখন সেই দৃশ্যগুলোই তারা উপভোগ করতে শুরু করে দিলো।

ন্যাচারাল ফুড
ফাস্ট ফুড

সিনেমা, গান ও ভিডিও গেমসের মাধ্যমে আমরা যেসব ম্যাসেজ পাই, সেসব আমাদের ওপর বেশ শক্ত একটা প্রভাব ফেলে। এগুলো আত্মার খোরাক হিসেবে কাজ করে; সচেতনভাবে অথবা অবচেতন মনে। এই ম্যাসেজগুলো আমাদের মন শুধু গ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকে না; বরং এগুলো আপনার কাজের মাধ্যমেও ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে।

এ সম্বন্ধে সলমন বলেন- 'হৃদয়কে সতর্ক রাখুন। যদিও আপনি সুচরিত্রের চূড়ায় থাকেন।'

আমরা যদি এমন মুভি দেখি, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রধান লক্ষ্য থাকে নারীদের সাথে যেকোনোভাবে যৌন সম্পর্ক করা, তাহলে আমরাও বিশ্বাস করতে শুরু করব, এটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি এমন গান শুনি, যা অবৈধ মেলামেশাকে উৎসাহিত করে, তবে আমরাও অবৈধ মেলামেশায় আগ্রহী হয়ে উঠব। পর্নোগ্রাফি এটিরই একটি চূড়ান্ত পরিণতি।

বলা হয়, সপ্তাহে তিন ঘণ্টা পর্নোগ্রাফি দেখলে নারীদের ব্যাপারে আপনার নীচু দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে এবং আপনি নিজের স্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্টি হারিয়ে ফেলবেন।

যতগুলো বিষয় আপনাকে পর্নোগ্রাফির দিকে পরিচালিত করতে পারে, তার মধ্যে একটা হলো আপনার পছন্দের বিনোদন। আপনার পছন্দের বিনোদনও আপনাকে পর্নোগ্রাফি বা অন্যান্য অসামাজিক কাজে পরিচালিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মুভির কথা চিন্তা করা যাক। মুভিতে প্রায়সই নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অনেক ভিডিও গেমসেও নারী চরিত্রকে যৌন আবেদনময়ী অবস্থায় দেখানো হয়। অ্যানিমেশনে বিকৃত চরিত্রগুলো মজার মাধ্যমে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হয়। গানগুলো ভরা থাকে অশ্লীল যৌনতায়। কমিক্স বইয়ে ফিমেইল সুপার হিরোকেও একরকম পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে যেকোনো ধরনের অশ্লীল যৌনতা থেকে দূরে থাকতে হবে। তাই নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়-এমন সকল বিষয় পরিহার করতে হবে। অর্থাৎ, আপনি যদি পর্নোগ্রাফি থেকে বাঁচতে চান, তবে জীবন থেকে কিছু মুভি ও গেমস আপনাকে চিরতরে বাদ দিতে হবে।

পূর্বের অধ্যায়গুলো থেকে কিছু পরামর্শ

প্রভাবক (Triggers) চিহ্নিত করুন : যেসব প্রভাবক আপনাকে ওই জঘন্য ভিডিওগুলো দেখতে উৎসাহিত করে, তা নির্ণয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কখন কখন, কোন কোন মিডিয়াগুলো বন্ধ করতে হবে-এই বিষয়টা অবশ্যই আপনাকে স্পষ্ট করে জানতে হবে। যেমন: যারা আসক্তি থেকে বের হতে চেষ্টা করছেন, তাদের প্রেমবিষয়ক মুভি থেকে দূরে থাকা উচিত। কখনো কখনো এই মুভি বা নাটকগুলো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় না; বরং প্রচ্ছন্নভাবে মানুষকে যৌনতার দিকে আহ্বান করে। তাই তাদের চিহ্নিত করা বেশ কষ্টকর হয়ে পড়ে। এই কষ্টকর কাজে সহজ সমাধান হলো-যদি কোনো রোমান্টিক মুভি দেখার পর আপনার বাজে সাইটগুলোতে ভিজিট করতে ইচ্ছে করে, তাহলে আপনাকে ওই টাইপের মুভি দেখা ছেড়ে দিতে হবে।

অতএব, প্রথমেই আপনাকে জানতে হবে-ঠিক কোন কোন বিষয়গুলো আপনাকে পর্নের দিকে পরিচালিত করছে। কারণগুলো আবেগীয় হতে পারে আবার শারীরিক বা মানসিকও হতে পারে (এ ব্যাপারে আমরা প্রথমের দিকে আলোচনা করেছি)। আবার এখানে অনেক সূক্ষ্ম বিষয়ও উঠে আসতে পারে। আপনি কি মুভিতে কোনো ঘনিষ্ঠ দৃশ্য দেখার পর পর্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ হন? নাকি ইন্সট্রাগ্রাম চালানোর পর দেখেন? নাকি ওয়েব কমিক পড়ার পর?

আরও কিছু বিষয় চিন্তা করুন। আপনি প্রতিদিন কত সময় এসবের পেছনে ব্যয় করেন, তা নিয়ে ভাবুন। ফেসবুকে দৈনিক কত সময় ব্যয় করেন? ভিডিও গেম খেলে কতটা সময় অপচয় করেন? মুভি দেখতে দৈনিক বা সপ্তাহে কত ঘণ্টা ব্যয় হয়? এ বিষয়ে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আপনাকে পর্নের বদলে অন্য কোনো ভালো শখ (Hobbies) আবিষ্কার করতে সহায়তা করবে।

এটা আপনাকে এমন সব প্রভাবক আবিষ্কার করতে সহায়তা করবে, যা হয়তো আপনি কখনো চিন্তাও করেননি।

সুস্থ বিনোদন খুঁজুন: সুস্থ বিনোদন খুঁজে বের করতে আপনার Accountability Partner-এর সাথে সময় করে বসুন। আপনার যত চিত্তবিনোদনের মাধ্যম আছে, সবকিছুর একটা তালিকা তৈরি করুন। সিভি, ডিভিডি, মেমোরি কার্ড, টিভি, স্মার্টফোন, ফেসবুক, ইউটিউব-সবকিছুর একটা তালিকা তৈরি করুন। তারপর দুজন মিলে সেই তালিকা নিয়ে বসুন। আর এ মিটিংটি আপনার রুমে করলেই সবচেয়ে ভালো হবে।

আপনাকে অবশ্যই ভালো ও নিরাপদ বিনোদনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে নিতে হবে। কিছু মানদণ্ড নিম্নরূপ-

১. টিভি অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখতে হবে, এটি সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বার্তা দেয় কি না।

২. বিনোদন অনুষ্ঠানে নারীদের ব্যক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে; ভোগ্যপণ্য হিসেবে নয়।

৩. যৌনতার দৃশ্য থাকতে পারবে না।

৪. গানের কথায় যেন যৌনতা ভরা না থাকে।

৫. নারী নির্যাতনজাতীয় কিছু যেন না থাকে।

সামগ্রিকভাবে আপনাকে দুটো বিষয়ের ওপর লক্ষ রাখতে হবে-
ক. বিনোদনের মাধ্যমটি কী ম্যাসেজ বহন করে,
খ. তা আপনাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌনতার দিকে প্রভাবিত করে কি না।
উদাহরণস্বরূপ অনেক কিশোর গোয়েন্দা সিরিজের কথা বলা যায়। যেগুলোর মূল ম্যাসেজ খুবই সাদামাটা হলেও ভেতরে সূক্ষ্মভাবে অশ্লীলতা প্রোথিত থাকে।

আপনার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বিনোদনের মিডিয়াগুলোকে নিম্নের চারটি ভাগে ভাগ করুন-

১. আমার জন্য উপকারী মিডিয়া; রান্নাবান্নার অনুষ্ঠান, ধর্মীয়, ঐতিহাসিক বই/ডিভিডি ইত্যাদি।

২. উপকারী নয়, কিন্তু ক্ষতিকরও নয়; বিভিন্ন ফুড রেসিপি, ক্লাসিক উপন্যাস, অ্যাডভেঞ্চারের গল্প ইত্যাদি।

৩. অন্যদের জন্য ভালো, তবে আপনার জন্য ক্ষতিকর; ভিডিও গেমসে নারী চরিত্র যদি আপনাকে প্রলুব্ধ করে, তবে গেম খেলা বাদ দিতে হবে।

৪. যেসব মিডিয়া সবার জন্য ক্ষতিকর; যৌন উত্তেজনার বিষয়গুলো। এ জাতীয় সব বিষয় ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে হবে।

অনলাইন মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ : বর্তমান সময়ে শুধু ভৌত উপাদানের নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়; আপনাকে নিজের অনলাইন অ্যাক্টিভিটিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

কোনো মুভি দেখার আগে তা সম্পর্কে জানুন : মুভিটি আদৌ দেখার উপযোগী কি না, তা আগে জানার চেষ্টা করুন। এ ব্যাপারে আপনাকে সহায়তা করতে পারে Pluggeding (http://www.pluggedin.com)। এটি আপনাকে যেকোনো কন্টেন্ট সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেবে। আপনি যেন বুঝতে পারেন-এটি আপনার রুচির বাইরে কি না। ভিডিও গেমের ক্ষেত্রে আগে যারা খেলেছে, তাদের থেকে জেনে নিতে পারেন।

নতুন কিছু পরামর্শ

একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে-যে বিনোদন আপনার জীবনকে সংকীর্ণ করে ফেলে, সেটা কোনো বিনোদন না; বরং যে বিনোদন আপনাকে নির্মল আনন্দ দিতে পারে, সেটাই প্রকৃত বিনোদন। আরও একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, শুধু খারাপ কাজকে ঘৃণা করাই যথেষ্ট নয়; বরং ভালো কাজকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে হবে। আপনার জীবনের খারাপ অভ্যাসগুলোকে ভালো অভ্যাস দিয়ে পরিবর্তন করতে হবে।

টলামস লোয়া বলেন-
'আমরা যখন সুন্দরের দিকে ধাবিত হই, তখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি উচ্চতর হয়। বিশেষভাবে মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক দিকে পরিচালিত হয়। জীবনের সকল বিষয় শিল্প হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, যেন আমরা প্রতিটি কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পারি। এটা আমাদের সকল ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করে। সকলের সাথে ভালো আচরণেও এর ভূমিকা রয়েছে।'

সুন্দরের অনুশীলন ব্যতীত আপনি কখনোই চরিত্রবান হতে পারবেন না। বিনোদনের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। কারণ, আপনার বিনোদন মাধ্যমগুলো সূক্ষ্মভাবে আপনার কাজ বা আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে। নির্মল বিনোদন মানুষকে যেমন সুন্দরের দিকে নিয়ে যায়, অশ্লীল বিনোদন তেমনই মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

তাই আমাদের এমন বিনোদনই বেছে নিতে হবে, যা আমাদের কল্যাণের দিকে ধাবিত করে।১

টিকাঃ
১. এক্ষেত্রে হালাল বিনোদন নামক বইটা পড়তে পারেন। তা ছাড়া থ্রিলার হিসেবে সাইমুম সিরিজও হালাল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বেশ কাজের।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00