📄 পর্নাসক্তির স্তরসমূহ
আচ্ছা, প্রথমবার আপনি যখন নোংরা ভিডিওগুলো দেখেছিলেন, তখন কি ভেবেছিলেন-এতে আপনার কী কী সমস্যা হতে পারে? ভিডিওগুলো দেখতে শুরু করার পরপরেই কি সমস্যাগুলো ধরতে পেরেছিলেন, নাকি খুব সম্প্রতি তা নজরে এসেছে? সমস্যা যদি আপনার নজরে এসে থাকে, তাহলে আপনাকে অভিনন্দন। কারণ, অনেকে তো বুঝতেই পারে না, এসব দেখার ফলে তারা কোনো সমস্যার মধ্যে আছেন। এসব অশ্লীল ভিডিও দেখার দরুন তারা যখন কোনো বাজে পরিণতির (যেমন: বিব্রত অবস্থায় ধরা পড়া, চাকরি হারানো ইত্যাদি) সম্মুখীন হন, তখনই কেবল বুঝতে পারেন-এই পীড়ার মর্মবেদনা কত অতল গভীরে অথবা যখন তারা এই বাজে আসক্তি থেকে ফিরতে চান, তখন বুঝতে পারেন-এখান থেকে ফেরত আসা কতটা কঠিন。
মানুষের স্বভাব হলো-কোনো ভুল কাজ করার সময়, তার ক্ষতির পরিধিকে সে ছোটো করে দেখে। ফলে বেশিরভাগ আসক্ত ব্যক্তিরা এই ভেবে আত্মপ্রবঞ্চনায় ভোগেন, এটি মূলত ততটা খারাপ কাজ নয়। আত্মপ্রবঞ্চনার এই বিষয়টি আমার এক নারী ক্লায়েন্টের ঘটনায় দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। একদিন এই নারী আমার কাছে অভিযোগ করেন, তার স্বামীর অ্যাফেয়ার আছে। এরপর তিনি পর্নোগ্রাফির সাথে তার স্বামীর ঘনিষ্ঠতার বিষয় নিয়ে বলতে শুরু করলেন। বিষয়টি সমাধানের জন্য তিনি কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগেও দুজন থেরাপিস্টকে দেখিয়েছেন। ওই থেরাপিস্টদের কাছে তার স্বামী স্বীকারও করেছিলেন-হ্যাঁ, তিনি পর্নোগ্রাফি দেখেন; তবে নিয়মিত দেখেন না, কয়েক মাস পরপর দেখেন। এই কথা শুনে থেরাপিস্টরা আর বাড়তি প্রশ্ন করেননি; বরং তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলেছিলেন-যেহেতু কয়েক মাস পরপরই দেখেন, তাই এটি তেমন কোনো সমস্যাই না।
সময়ের পরিক্রমায় তিনি এখন আমার সামনে। আর তার স্বামী বহু বছর ধরে তার সঙ্গে মিথ্যা বলে আসছিলেন। ওগুলো দেখা ছাড়াও ভদ্রলোক একাধিক সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন এবং নিষিদ্ধ জায়গাগুলোতেও যাতায়াত করতেন। তবে তার ভয়ংকর যৌনাসক্তির একমাত্র উদ্দীপক ছিল ওই ভিভিওগুলো; কিন্তু থেরাপিস্টরা তা ঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। অবশ্য তিনি থেরাপিস্টের কাছে সবকিছু স্বীকারও করেননি। আমি প্রায়ই ভাবি, পূর্ববর্তী থেরাপিস্টরা যদি তার স্ত্রীর উদ্বেগ আমলে নিতেন এবং তার স্বামীর আসক্তি মূল্যায়নের চেষ্টা করতেন, তবে আজ ফলাফল ভিন্ন রকম হতে পারত।
এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য-পাঠকদের নিজেকে সততার সঙ্গে মূল্যায়নের সুযোগ করে দেওয়া। এই অধ্যায়ে বুঝতে পারবেন-আপনি পর্নোগ্রাফির ঠিক কোন স্তরে রয়েছেন। আমার অভিজ্ঞতা বলে-যথাযথ আন্তরিক এবং সৎ আত্মমূল্যায়নের মাধ্যমেই পর্নাসক্তি থেকে ফিরে আসা সম্ভব।
ডা. ডেভিট ডিসকোট বলেন- 'আপনি যদি সত্যনিষ্ঠ জীবনযাপন করেন, তবে আপনার জীবন নিজেই নিজেকে সুস্থ ও সুন্দর করে তুলবে।'
অর্থাৎ, যদি রিকভারি প্রসেস শুরু করতে চান, তবেই আপনি জীবনের জন্য কিছু না কিছু করতে পারবেন। পর্নোগ্রাফির মতো ভয়ংকর কাজকে সমস্যা মনে না করা এবং অন্যের ওপর এর বাজে প্রভাবকে গ্রাহ্য না করা পর্নাসক্ত ব্যক্তিদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। তাই এই অধ্যায়ে আমার মূল লক্ষ্য থাকবে, পর্নোগ্রাফির সাথে ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে আত্মসচেতনতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া।
পর্নাসক্তি নির্ণয়ের মানদণ্ড
পর্নাসক্তি নির্ণয়ের আগে আমাদের জানতে হবে 'আসক্তি' জিনিসটা কী? আসক্তি বা Addiction হলো কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া। কোনো কিছু এমনভাবে অভ্যাসের অংশ করে ফেলা, যে ওই জিনিস না থাকলে আপনি আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেই পারবেন না; অস্বাভাবিক হয়ে পড়বেন।
ঠিক তেমনি পর্নাসক্তি হলো পর্ন দেখা এবং যৌন তৃপ্তি খোঁজার মাধ্যমে (বিশেষত হস্তমৈথুনের মাধ্যমে) সংবেদনশীল চাহিদা পূরণের অমোঘ প্রচেষ্টা।
বেশ কতগুলো আচরণ রয়েছে, যা মানুষকে এসবের দিকে ধাবিত করে। আর এসব আচরণকেই বেশিরভাগ প্রফেশনাল আসক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। সাধারণ আচরণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. পর্নের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হওয়া।
২. এগুলো দেখার ফিজিওলজিক্যাল টলারেন্স (শরীরবৃত্তীয় সহ্যসীমা) বেড়ে যাওয়া অর্থাৎ দেখার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে সময়ের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং
৩. Withdrawal Symptoms-এর উপস্থিতি।
(কোনো কিছু না পেলে যে শারীরিক ও মানসিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সেটাই উইথড্রয়াল সিম্পটমস। পর্নাসক্তির ক্ষেত্রে পর্ন না দেখতে পারলে আসক্ত ব্যক্তিদের ভেতর এটা দেখা যায়।)
এই বৈশিষ্ট্য তিনটি হলো আসক্তির সাধারণ লক্ষণ। তবে এগুলো ছাড়াও আরও অনেকগুলো লক্ষণ আছে। অধিকাংশ পর্নাসক্তি নির্ণয় পদ্ধতির সঙ্গে অন্যান্য আসক্তির (মাদকাসক্তি, যৌনাসক্তি ইত্যাদি) নির্ণয় পদ্ধতির মিল থাকায় পর্নাসক্তি শনাক্ত করা বেশ কঠিন একটা ব্যাপার। আবার যৌনতা সম্পর্কিত আসক্তিগুলো নির্ণয়ের অনেক পদ্ধতিই তুলনামূলক নতুন। যেমন: যৌনাসক্তি নির্ধারণের মানদণ্ডটির আবিষ্কারে সময় এখনও ১০ বছরও হয়নি। আর এটি এখনও মেন্টাল হেলথ প্রফেশনালদের জন্য ডায়াগনস্টিক ম্যানুয়ালের অন্তর্ভুক্ত নয়। আসক্তি নির্ণয় ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ডা. প্যাট্রিক কার্নেসের তৈরি করা তালিকাটি খুবই কার্যকর। যৌনাসক্তি নিয়ে তার বর্ণিত মানদণ্ডটির সঙ্গে সমন্বয় করে নিচের তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।
পর্নাসক্তির নির্ণায়ক
১. পর্নোগ্রাফি দেখার ইচ্ছা দমনে বারবার ব্যর্থ হওয়া।
২. নির্ধারিত সময়ের চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে দেখা।
৩. একই সাথে এগুলো দেখা বন্ধ, হ্রাস বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা এবং বারবার ব্যর্থ হওয়া।
৪. পর্নোগ্রাফি সংগ্রহ, দেখা এবং যৌনক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা। এখানে যৌনক্রিয়া বলতে হস্তমৈথুনও হতে পারে আবার অন্য ব্যক্তি বা বস্তুর সাথে যৌনক্রিয়াও হতে পারে।
৫. ফ্যান্টাসি, যৌনচিন্তা এবং যৌন প্রস্তুতিমূলক ক্রিয়াকলাপে মন সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন থাকা।
৬. পেশাগত, অ্যাকাডেমিক, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে এগুলো দেখায় নিজের সময় ব্যয় করা।
৭. পরিণতি জানা সত্ত্বেও এসব দেখা অব্যাহত রাখা।
৮. সময়ের সাথে সাথে আরও ঘনঘন এবং আগের চেয়েও এক্সট্রিম ভিডিও দেখা।
৯. এসব ভিডিও সংগ্রহ করা এবং দেখার জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে সামাজিক দায়িত্ববোধকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা।
১০. যথাসময়ে ওগুলো দেখতে না পারলে যন্ত্রণা, অস্থিরতা বা বিরক্তি অনুভূত হওয়া। এ ছাড়াও মাথাঘোরা, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, নিয়ন্ত্রণহীনতা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ডিপ্রেশনসহ এমন নানা উপসর্গ দেখা দেওয়া।
ওপরের আলোচিত মানদণ্ডটি একজন পর্নাসক্ত ব্যক্তির সাধারণ লক্ষণগুলোর আওতাভুক্ত। পর্নাসক্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য কারও মধ্যে ওপরে বর্ণিত ১০টি লক্ষণের মধ্যে কমপক্ষে তিনটি উপস্থিত থাকা আবশ্যিক।
অর্থাৎ, নিয়মিত পর্ন দেখা কোনো ব্যক্তির আচরণে যদি ওপরের কমপক্ষে তিনটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়, তখন আমরা সেই ব্যক্তিকে পর্নাসক্ত হিসেবে ধরে নিতে পারি। ডা. কার্নেস দেখেছেন, বেশিরভাগ আসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ওপরের পাঁচটি লক্ষণ নিয়মিতই দেখা যায়। আর ৫০ শতাংশের বেশি লোকদের মধ্যে সাতটি লক্ষণই দেখা যায়!
এই মানদণ্ড ও আমার ব্যক্তিগত ক্লিনিক্যাল এক্সপেরিয়েন্সকে কাজে লাগিয়ে আমি একটি পরীক্ষা পদ্ধতি তৈরি করেছি, যেখানে পর্নাসক্তির মোট সাতটি পৃথক স্তর আছে। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি এই মুহূর্তে পর্ন সম্পৃক্ততার ঠিক কোন স্তরে আছেন, তা সহজেই নির্ণয় করে ফেলা সম্ভব।
আসক্তির সাত স্তর
কোনো ব্যক্তিকে আসক্ত কিংবা আসক্ত নয় বলে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। তার চেয়ে ব্যক্তির পর্ন সম্পৃক্ততা ও আসক্তির ওপর দৃষ্টিপাত করা অনেক সহজ। একজন আসক্ত ব্যক্তির আচরণের ভেতরে-বাইরে সাধারণ মানবিক আচরণগুলো দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে। আসক্তি শনাক্তকরণে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো দেখে আসক্তির স্তর নির্ণয় করা যায়।
প্রথমত, আমাদের মনে রাখতে হবে-আসক্তি একটি অমোঘ আচরণ (Compulsive Behaviors) যা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ব্যক্তির থাকে না।
দ্বিতীয়ত, আসক্তির সঙ্গে নেতিবাচক পরিণতির একটা যোগসূত্র আছে।
উভয় সংজ্ঞাতেই আমরা দেখতে পাই-একজন ব্যক্তি যখন আসক্ত হন, তখন তার আচরণগুলো আর স্থির থাকে না। তবে এটাও ঠিক, সময় ও পরিস্থিতির সাথে সাথে ব্যক্তির মধ্যে আসক্তি থেকে দূরে থাকার ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞাও দেখা দিতে শুরু করে। যেমন: কিছু ব্যক্তি আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করেন। এরপর হয়তো কয়েক দিন বা দুই এক সপ্তাহ তারা এই জিনিস থেকে দূরেও থাকেন। কিন্তু এরপর? এরপর আবারও সেই পর্নের কাছে মাথা নত করে কয়েক মাস; এমনকী কয়েক বছর নীলজগতে ডুব দেন। এখন প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক-এমন কেন হয়? এর স্পষ্ট উত্তর জানতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে, একজন আসক্ত মানুষের প্রতিটা দিন কীভাবে অতিবাহিত হয়।
পর্নাসক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক মূলত স্ট্রেস, পারিবারিক পরিস্থিতি, মানসিক সুস্থতা, সম্পর্কের অবস্থা এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ওঠানামা করে। এটি বুঝতে পারলে ওই ব্যক্তি আসক্তির ঠিক কোন স্তরে রয়েছেন-তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে। পর্নাসক্তির সাতটি স্তরের প্রতিটারই কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অন্যান্য স্তর থেকে আলাদা। একটি স্তর থেকে আরেকটি স্তরের স্পষ্ট কিছু পার্থক্য আছে। মূল পার্থক্যটা অবশ্যই অভ্যাসে। যেমন: প্রচণ্ডভাবে পর্নে ঝুঁকে পড়া, পূর্বের চেয়েও বেশি দেখা, এক্সট্রিম ভিডিও দেখা, নিজ সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিশ্বাস জন্মানো ইত্যাদি।
নোংরা ভিডিওগুলো থেকে নিজেকে আন্তরিকভাবে দূরে রাখার চেষ্টা করলে আপনার আসক্তি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। কমতে শুরু করবে আপনার আসক্তির স্তরও। অন্যদিকে যখন নিজেকে পরিবর্তন করার ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা হ্রাস পাবে, তখন দেখবেন-আপনার আসক্তির স্তরও ওপরের দিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নিচে আসক্তির সাতটি স্তর ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হলো। এখান থেকে আপনি প্রতিটা স্তর সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা পাবেন। চাইলে নিজের সাথে মিলিয়েও নিতে পারবেন, আপনার আসক্তি এই মুহূর্তে কোন অবস্থানে আছে।
১ম স্তর
২য় স্তর
৩য় স্তর
৪র্থ স্তর
৫ম স্তর
৬ষ্ঠ স্তর
৭ম স্তর
প্রথম স্তর : প্রথম স্তরে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পৃক্ততা খুব কম থাকে। সাধারণত প্রথম স্তরের ব্যক্তিদের এগুলোর সঙ্গে পরিচিতি একদম নতুন। কিংবা পরিচিতি অনেক দিনের হলেও তারা বছরে কেবল দুয়েকবার এসব দেখেন। নিশ্চিত করেই বলা যায়, এই স্তরের ব্যক্তিরা এগুলো সম্পর্কে খুব অল্প ধারণাই রাখেন; এমনকী কতবার দেখেছেন, তা-ও আঙুল গুনে বলে দিতে পারেন। তাদের দৈনন্দিন কাজে বা চিন্তায় এসবের কোনো প্রভাব দেখা যায় না। তারা কখনো পরিকল্পিতভাবে এসব দেখেনও না। হয়তো মাঝে-সাঝে হঠাৎ করে দেখে ফেলেন। যদিও এই জগতে তাদের আনাগোনা কম, তারপরেও এখান থেকে তারা যেন পরবর্তী স্তরে উপনীত না হন, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
দ্বিতীয় স্তর : দ্বিতীয় স্তরের সম্পৃক্ততাও মূলত কোনো পর্নাসক্তি নয়। কারণ, এই স্তরে থাকা ব্যক্তিরা এগুলো দেখার তীব্রতা অনুভব করে না এবং তাদের খুব বেশি সমস্যাও দেখা যায় না। সাধারণভাবে বলতে গেলে, এই স্তরের ব্যক্তিরা প্রথম স্তরের লোকজনের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় এগুলো দেখে কাটায়। নেশা থেকে না; বরং কৌতূহল থেকে বিভিন্ন সাইট বা ম্যাগাজিনগুলোতে ভিজিট করেন। এই স্তরের লোকজনের ক্ষেত্রেও ভিডিও দেখার সংখ্যা হাতে গুনে বলে দেওয়া সম্ভব। বছরে ছয়বারের বেশি দেখেন না। এসব নিয়ে চিন্তাও কম করেন, ফ্যান্টাসি বলতে গেলে একেবারেই নেই। কিন্তু ওই যে কৌতূহল, এটাই মূলত এই স্তরের জন্য সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে এই কৌতূহল বেড়েও যেতে পারে। ফলে সাবধানতার বিকল্প নেই।
তৃতীয় স্তর : তৃতীয় স্তরের সম্পৃক্ততা একটি মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকার মতো। এর একদিকে থাকে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ, আর অন্যদিকে থাকে আসক্তিমূলক স্বভাব। এই স্তরের ব্যক্তিরা সাধারণত একটা লম্বা সময় ধরে প্রতিমাসে একবার করে ভিডিওগুলো দেখেন। তারা খুব চেষ্টা করেন নিজেকে কন্ট্রোল করতে, কিন্তু মাসে ওই একবার তারা নিজেদের মনের সঙ্গে পেরে ওঠেন না; বাধ্য হন নতি স্বীকার করতে। আর একবার সিরিয়াল ব্রেক করে ফেললে তখন আবার এক বা দুই দিন ডুবে থাকেন ওই নীল জগতের আঁধারে।
আবার এই স্তরে এমন কিছু ব্যক্তিও পাওয়া যায়, যারা তাদের পর্ন সম্পৃক্ততাকে কোনো সমস্যা হিসেবে গণ্য করতে রাজি নন। তারা মনে করেন, এই অভ্যাসের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা পর্ন দেখার সময় এবং সংখ্যাকে কমিয়ে আনতে পারেন। নিজের অভ্যাসকেও পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এই ব্যক্তিরাও একটি ক্রসরোডে অবস্থান করেন। তারা যদি এর চেয়ে বেশি করে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন, তাহলে তারা আসক্তির দিকে চলে যান। সাধারণভাবে বলতে গেলে, তৃতীয় স্তরের ব্যক্তিদের পুরোপুরি পর্নোগ্রাফি ছাড়তে এক্সট্রা এফোর্ট দিতে হবে। কেননা, তারা এর মধ্যেই বেশ ভালোভাবে পর্নোগ্রাফির সাথে জড়িয়ে পড়েছেন।
ফ্যান্টাসি হলো-এ স্তরের আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্রের নাম। অনেক চেষ্টা করেও এই স্তরের লোকজন ফ্যান্টাসিকে মন থেকে দূর করতে পারে না। এসব ফ্যান্টাসি মনকে বারবার ওগুলোর দিকে প্রলুব্ধ করে। না দেখে বেশিক্ষণ থাকাও তখন কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। ঘুরেফিরে ওই চিন্তাগুলোই মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, এমনকী বেশিক্ষণ ভিডিও না দেখে থাকলে এই স্তরে কিছু Withdrawal Symptomsও পর্যন্ত দেখা যায়। ফলে এই স্তরে থাকা খুব দ্রুত পরের স্তরে উঠে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন সব সময়ই।
চতুর্থ স্তর : চতুর্থ স্তরে এসে পর্নোগ্রাফির প্রভাবে ব্যক্তিজীবনের নানা দিক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। বলতে গেলে, এই পর্যায়ে পর্ন একজন মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তোলা শুরু করে। এ স্তরের ব্যক্তিরা প্রায়ই অবাক হয়ে ভাবে-কেন তারা এসব নিয়ে এত বেশি ফ্যান্টাসিতে ভুগছেন? এমনকী তারা নিজেদের আসক্তি দেখে নিজেরাও অবাক হয়ে যান। একটা সময় গিয়ে এ আসক্তি তাদের কাজকর্ম, পড়াশোনা, পারিবারিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা শুরু করে। জীবনের বিভিন্ন সম্পর্কের প্রতি মনোনিবেশ করার ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।
এ স্তরের ব্যক্তিরা মাসে বেশ কয়েকবার পর্নোগ্রাফি দেখেন এবং সেইসঙ্গে ধীরে ধীরে এক্সট্রিম ভিডিওর দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাদের ফ্যান্টাসির পরিমাণও বেড়ে যায়। বাস্তবে সম্ভব নয়, এমন যৌনবিষয়ক ফ্যান্টাসিতে কেটে যায় অজস্র সময়। অশ্লীল যৌনতা নিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনা উচ্চমাত্রায় পৌঁছে যায়।
তবে এই ফ্যান্টাসিকে তারা তেমন খারাপ বলে মনে করেন না। কারণ, তারা মনে করেন, আমি তো শুধুই ভাবছি, দেখছি না। মূলত কোনো ব্যক্তি যখন নিয়মিত ফ্যান্টাসিও ভোগেন, তখন তা পর্ন দেখা এবং বাস্তবে তা অনুকরণের মতো স্বভাবের দিকে ধাবিত হওয়ার যথেষ্ট লক্ষণ বহন করে। এই স্তরের ব্যক্তিদের প্রতিনিয়ত এগুলো দেখার প্রতি তীব্র আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষার সাথে লড়াই করে যেতে হয়। যার দরুন Withdrawal Symptoms বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রতি সপ্তাহে একবার কিংবা তারও বেশি সময় এগুলো দেখা এই স্তরের লক্ষণ। তবে একবার দেখার পরও পুনরায় দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রায়শই প্রবল ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে-চতুর্থ স্তরের ব্যক্তিরা বহু বছর ধরে পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং বারবার না দেখার প্রতিজ্ঞা করেন। কিন্তু তাদের এ লড়াই বা প্রতিজ্ঞা বড়োজোর কয়েক সপ্তাহের জন্য স্থায়ী হয়। তারপর আবারও তারা আছড়ে পড়েন নীল সাগরের বিষাক্ত পানিতে।
আবার এ স্তরে এমন কিছু মানুষও আছেন, যারা তাদের ভেতরের বাড়তে থাকা এই আসক্তিকে অনুভব করতে পারেন। সেইসঙ্গে তারা প্রতি সপ্তাহেই এসব দেখার প্রবল নেশাও অনুভব করেন এবং এই দ্বিধাবিভক্ত মুহূর্তে এসে অধিকাংশ লোক এসবের সাথে আরও বেশি জড়িয়ে পড়েন। নিজেকে নিবৃত্ত রাখার বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও পারেন না। ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে আবারও দেখা শুরু করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে একটা তীব্র হতাশার সৃষ্টি হয়। মনে হতে থাকে-এ এক আশাহীন প্রচেষ্টা এবং তাদের পক্ষে এই জিনিস ছেড়ে থাকা কোনোদিনও সম্ভব হবে না। হতাশ হয়ে এই মানুষগুলো তখন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেন-পর্ন দেখা ছেড়ে দেওয়া তাহলে এত কঠিন? এই উপলব্ধি থেকে শেষমেশ দুই ধরনের ফলাফল আসতে পারে। কেউ কেউ এই নেশা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব মনে করে আরও বেশি জড়িয়ে পড়তে পারেন। আবার কেউ সমস্যার তীব্রতা বেশি হওয়াতে চ্যালেঞ্জ অনুভব এবং নিজেকে কিছুটা প্রতিরোধ করতে পারেন।
পঞ্চম স্তর: এই স্তরের আসক্তি ব্যক্তির জীবনে আগের স্তরের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। আসক্ত ব্যক্তি দিনের, সপ্তাহের এবং মাসের উল্লেখযোগ্য একটা সময় ব্যয় করে ফেলে এই পর্ন দেখার চিন্তাতেই। এই পর্যায়ে এসে তাদের জীবনে এমন একটা দিনও থাকে না, যে দিনটাতে তারা এই নীল ছবি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন না। যেহেতু পর্ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা বাড়ে, সেহেতু পর্ন দেখার পরিমাণও বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান বলে, এই স্তরে এসে একজন মানুষ সপ্তাহে গড়ে তিন থেকে পাঁচবার এই ভিডিওগুলো দেখেন এবং সারাদিন তারা যে সাতটা জিনিসের কথা সবচেয়ে বেশিবার ভাবেন, তার মধ্যে একটা থাকে এই পর্নোগ্রাফি।
এখন প্রশ্ন হলো-তাদের এই পর্ন দেখা বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ কি শুধুই চিন্তা-ভাবনা নাকি অন্যকিছু? উত্তর হলো-ফ্যান্টাসি। পর্ন নিয়ে অত্যধিক ভাবনা-চিন্তা তাদের মনে ফ্যান্টাসির একটা জগৎ খুলে দেয়। এই মানুষগুলো তখন হয়ে পড়ে ওই জগতের চাবি দেওয়া পুতুলের মতো। ফ্যান্টাসির প্রভাব এরা যতই ছাড়তে চায়, নীল বিষের শিকড় ততই এদের জড়িয়ে ধরতে থাকে।
আসক্ত মানুষটা অবাক হয়ে ভাবে-খেলার ছলে, নিছক বিনোদনের জন্য একদিন যে চারাগাছ সে পুঁতেছিল নিজের শরীরে, সেই বিষবৃক্ষের বিষ এত গভীরে চলে গেল? এত গভীরে যাওয়াও কি সম্ভব?
আগের স্তরগুলোতে জীবনের ওপর ব্যক্তির প্রভাব ছিল। কিন্তু এই স্তরে এসে জীবনের ওপরের নিয়ন্ত্রণটা ধীরে ধীরে আলগা হতে শুরু করে। দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা বা ধর্মীয় প্রার্থনা-কিছুই আর ঠিক থাকে না। রুটিন তছনছ হয়ে যায়। ক্যারিয়ার, জীবন সবকিছুতেই অবনতি হতে থাকে। Withdrawal Symptoms দেখা দিতে শুরু করে। পর্নকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, যেন এই ভিডিও দেখা ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। এই মনে হওয়াটাই তাকে হতাশ করে দেয়। ক্ষতি হবে জেনেও বারবার টেনে নিয়ে যায় ওই নীল জলের ভয়ংকর জোয়ারে।
সত্যি কথা বলতে গেলে-এই স্তরের আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন। বেশ কঠিন। কারণ ফ্যান্টাসি, অপরাধবোধ, বারবার ছাড়তে চেয়েও ছাড়তে না পারার হতাশাবোধ মানুষকে অনেক সময় বেপরোয়া করে দিতে পারে। বেসামাল করে নিয়ে যেতে পারে আসক্তির পরের ধাপে।
তবে কেউ যদি একান্তই বের হয়ে আসতেই চায় এখান থেকে, সেটাও অসম্ভব কিছু না। এক্সট্রা এফোর্ট আর দৃঢ় মনোবল একজন মানুষকে এই পঞ্চম ধাপের আসক্তি থেকে দূরে সরাতে পারে।
ষষ্ঠ স্তর : এই স্তরে এসে পর্নোগ্রাফি ব্যক্তির জীবনের নিয়ন্ত্রণ তার নিজের হাতে তুলে নেয়। চাকরি, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, আড্ডা থেকে আসক্ত ব্যক্তি নিজেকে সরিয়ে নিতে শুরু করে। দিনের একটা বড়ো সময় চলে যায় যৌন ফ্যান্টাসির চিন্তায়। সপ্তাহের প্রতিটা দিনই তার কাটে কোনো না কোনো ভিডিও দেখার মাধ্যমে। নিয়ন্ত্রণহীন এই জীবন একসময় দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এই স্তরে এসে মানুষ মিথ্যা বলতে শুরু করে। যেহেতু তার জীবনের কিছুই আর ঠিক থাকে না; আবার কেন ঠিক নেই, সেই উত্তরও তার কাছে নেই, সেহেতু সে মিথ্যা বলতে শুরু করে। কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের সিংহভাগ স্টোরেজ চলে যায় ওই ভিডিওগুলোর দখলে। জীবনের স্টোরেজও কি ওই পর্নোগ্রাফির ভয়াল থাবায় ঢেকে যায় না? কেউ হারান চাকরি, কেউ হারান সম্পদ কেউ বা হারায় জীবনসঙ্গী। কেউ তো আবার খোদার ওপর বিশ্বাসটাই হারিয়ে ফেলেন; কিন্তু এই সর্বনাশা নেশা থেকে সরে আসা আর হয় না। আহারে! পরম আকাঙ্ক্ষার এই মানবজনমের কী নিদারুণ অপচয়!
সপ্তম স্তর : সপ্তম স্তরে এসে আসক্ত ব্যক্তির অ্যাক্টিং আউট (Acting Out) করা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। পর্ন দেখে সেটার বাস্তবে অনুকরণকে বলা হয় অ্যাক্টিং আউট। এই কাজ করতে গিয়ে সে তার মনোযোগ দিয়ে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, প্রোডাক্টিভিটি হয়ে যায় জিরো। আসক্ত ব্যক্তির কাজ হয় সারাদিন বিভিন্ন সাইটে ভিডিও খুঁজে বের করা এবং দেখা। দিনে দিনে রুচি আরও নিচে নামতে থাকে। নোংরা থেকে নোংরাতর ভিডিওর দিকে আগ্রহ বাড়তে থাকে। আগের দেখা সাধারণ ভিডিওতে তাদের আর উত্তেজনা আসে না। তারা তখন উত্তেজিত হতে অজাচার, যৌন সহিংসতা বা পশুকামিতার ভিডিও খুঁজে খুঁজে বের করতে থাকে। মনুষ্যত্ব তখন হাবুডুবু খাচ্ছে নীল পানির জোয়ারে। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ তখন ব্যস্ত নীচে থেকে আরও নীচে নামার বিকৃত প্রতিযোগিতায়।
এই স্তরে পর্ন দেখে বাস্তবে অনুকরণের প্রতি এক গভীর বাসনা তার অন্তরে লুকিয়ে থাকে। অনেকেই ভিডিওতে দেখা জিনিস বাস্তবে অনুকরণের চেষ্টাও করে। কথায় কথায় মিথ্যা বলা আর অস্থিরতা তাদের আচরণের অন্তর্ভুক্ত হয়। কেউ কেউ অবশ্য আসক্তি কমানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু কিছুদিন চেষ্টা করার পরেই ব্যাপারটাকে অসম্ভব মনে হয়।
এ স্তরের পর্নাসক্তির বাজে পরিণতির মোকাবিলায় ব্যক্তি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তাদের 'মাইন্ড টাইম' (একা থাকা, কর্মক্ষেত্র বা অন্যদের সাথে কথা বলার সময় ব্যক্তি আপন মনে যা ভাবেন)-এর ওপর পর্নের চিন্তা আধিপত্য বিস্তার করে। যদি অ্যাক্টিং আউট করতে না পারেন, তাহলে তারা মনমতো যৌন ফ্যান্টাসিতে ডুবে যান। অ্যাক্টিং আউট আসক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর স্তরের নাম। এই স্তরের আসক্তির ফলে ব্যক্তির বেঁচে থাকার ইচ্ছা পর্যন্ত 'নাই' হয়ে যেতে পারে।
📄 নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চান
অনেকের কাছেই ওপরের এই প্রশ্নের উত্তর সহজ মনে হতে পারে। কারণ, পর্নোগ্রাফি বহু মানুষের জীবনেই মারাত্মক সব সংকট তৈরি করেছে। কারও দাম্পত্যজীবনে অশান্তির কারণ পর্নোগ্রাফি, কারও ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কেউ আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর্থিকভাবে। আবার কারও ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফি স্ত্রীর প্রতি বিতৃষ্ণাও তৈরি করেছে, সংসার ভেঙে দিয়েছে বহু মানুষের। এসব ছাড়াও এগুলোর কারণে আরও বহু ভয়ংকর শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়—এটা আমরা সবাই জানি। কাজেই কেন পর্নোগ্রাফি ছেড়ে দেওয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর ওই মানুষগুলো খুব সহজেই দিতে পারবে।
আবার কিছু লোক পর্নোগ্রাফির এসব ভয়ংকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টিনএজাররাই এ বিষয়ে অসতর্ক থাকে। তাদের কেউ কেউ অনেক সময় বাবা-মা, বড়ো ভাই-বোন অথবা শিক্ষকের কাছে ভিডিওগুলো দেখার সময় ধরাও পড়ে যায়। কিন্তু ব্যাপারগুলো তখন এতটাই স্বাভাবিক হয়ে যায় যে, তারা এটাকে তেমন কিছুই মনে করে না।
নির্মম সত্যটা হলো—আপনার যদি এখান থেকে ফিরে আসার দৃঢ় শপথ না থাকে, তবে কখনোই এই গোলকধাঁধা থেকে বের হতে পারবেন না। সত্যি বলতে—দৃঢ় শপথ ব্যতীত কোনো কাজই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। পর্নোগ্রাফি থেকে ফিরে আসাও তা-ই। আবার শুধু দৃঢ় শপথই যথেষ্ট না; বরং সাথে সাথে পর্নোগ্রাফি কেন ত্যাগ করতে হবে, এর যৌক্তিক কারণ না জানা থাকলেও কারও পক্ষে এ থেকে বের হওয়া এককথায় অসম্ভব। সুতরাং কেউ যদি এখান থেকে সত্যিই বের হয়ে আসতে চায়, তবে তার প্রথম কাজ হবে-কেন এগুলো দেখা বন্ধ করা উচিত, সেই কারণগুলো জানা। আলেকজান্ডার রোডস এ বিষয়ে একটি সুন্দর তালিকা তৈরি করে দিয়েছেন। চলুন তালিকাটি একবার দেখে আসি-
১. প্রথমেই পর্নোগ্রাফি আপনার জীবনে কী কী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা খুব মনোযোগ দিয়ে খুঁজে বের করতে হবে এবং সেগুলোর একটা তালিকা করে ফেলতে হবে। নিম্নে কয়েকটি কারণের উদাহরণ দেওয়া হলো-
• পর্নাসক্তির ফলে আপনি আপনার স্ত্রীকে ভালোবাসেন, তবুও তার প্রতি যৌন আবেদন অনুভব করেন না。
• এগুলো দেখতে গিয়ে বাবা-মার কাছে ধরা পড়েছেন। ফলে ব্যাপক লাঞ্ছিত হয়েছেন, লজ্জা পেয়েছেন。
• পর্ন ও মাস্টারবেশন আপনাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে。
• আপনার পড়াশোনায় মনোযোগ কমেছে। প্রচুর টাকা-পয়সা খরচ হয়েছে। রাতের ঘুম নষ্ট হয়ে গেছে। প্রোডাক্টিভিটি নেমেছে শূন্যের কোঠায়。
২. এবার আপনার কাজ হলো-পর্নোগ্রাফি দেখা বন্ধ করলে আপনি সাময়িক কী কী বাধার সম্মুখীন হবেন, সেগুলো লিখে ফেলা। আগেই বলা হয়েছে, পর্নাসক্তি উইথ্রডয়াল সিম্পটমস এর জন্ম দিতে পারে। ফলে হঠাৎ করে পর্ন দেখা বন্ধ করলে অনেকে সাময়িক কিছু সমস্যায় পতিত হয়। আপনার এ ধরনের কী কী সমস্যা হতে পারে বলে মনে করেন, সেই তালিকা তৈরি করুন। উদাহরণ-
• ডিপ্রেশনে পড়ে যাবেন বলে মনে করেন。
• বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বেন বলে মনে করেন。
• মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন বলে মনে করেন。
• একাকিত্ব অনুভব করবেন বলে মনে করেন。
৩. এবার এখান থেকে ফিরে এলে আপনার কী কী ইতিবাচক পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করেন, তার একটি তালিকা তৈরি করুন। তালিকাটি নিম্নরূপ হতে পারে-
• দাম্পত্যজীবন সুখে-শান্তিতে ভরে যাবে।
• হীনম্মন্যতা দূর হবে।
• ভগ্ন স্বাস্থ্য ফিরে পাবেন।
• যদি তরুণ হন, তাহলে আপনার তারুণ্যকে প্রোডাক্টিভ কাজে ব্যবহার করতে পারবেন।
কিছু সময় নিয়ে তৈরি তালিকাটি পর্যালোচনা করুন।
এবার আপনাকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। আপনি নিজেকে ঠিক কোন জায়গায় দেখতে চান।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে 'লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য' খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ব্যতীত কোনো কাজই সম্পন্ন হতে পারে না। পর্নাসক্তি থেকে মুক্তির জন্য আপনাকে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হবে।
বলা হয়-ভালো পরিকল্পনা যেকোনো কাজের অর্ধেক। সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ আপনাকে কার্যকর পরিকল্পনা নিতে সহায়তা করবে।
আমাদের সবার জীবনেরই লক্ষ্য থাকে সুন্দর একটা জীবন পাওয়া। এই লক্ষ্যটি অর্জনে পর্ন কীভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, তা নিয়েও গভীরভাবে চিন্তা করুন। কিছু উদাহরণ নিম্নরূপ-
১. আমি একজন আদর্শ স্বামী হতে চাই। (কিন্তু পর্ন আমার দাম্পত্যজীবনে অশান্তি তৈরি করেছে।)
২. আমি একজন চরিত্রবান মানুষ হতে চাই। (পর্ন আমাকে দুশ্চরিত্র বানাচ্ছে।)
৩. দৈহিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে চাই। (কিন্তু পর্ন আমাকে তা হতে দিচ্ছে না।)
এই তালিকায় আরও অনেক কিছুই যোগ করা যেতে পারে। আরও যা যা মাথায় আসে, লিখে ফেলুন। তারপর এই তালিকাটি একটি কাগজে লিখে সব সময় চোখ পড়ে এমন জায়গায় টানিয়ে রাখুন। চাইলে মানিব্যাগে রাখতে পারেন অথবা মোবাইলের ওয়ালপেপারও দিয়ে রাখতে পারেন।
এটাই আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
সুতরাং এটা সব সময় মাথায় রাখতে হবে। বইয়ের বাকি অংশ পড়ার সময়ও অবশ্যই এই কথাটি মাথায় রাখুন। মাথায় ভালো করে গেঁথে নিন পুরো বিষয়টা।
এই বইটি আপনাকে অনেকগুলো কার্যকর পদ্ধতি ও পরামর্শের সন্ধান দিতে যাচ্ছে। ঠিক কোন পরামর্শটি আপন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন, তা বুঝতে আপনার এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সহায়তা করবে।
📄 দ্য পাওয়ার অব অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনার
চলুন দুই বন্ধু লুইস ও টোলকিন-এর গল্প শুনে আসি। তারা দুজনই ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ছোটোবেলা থেকেই তারা একসাথে বড়ো হয়েছে। একসাথে কবিতা লিখেছে। ছোটো থেকেই দুজন দুজনের সাথে সবকিছু শেয়ার করতে করতে বড়ো হয়েছে; এমনকী দুজন যে লেখালিখি করত, সেসবও তারা একে অন্যের সাথে শেয়ার করত—যাতে সেগুলোর মান উন্নত হয়। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা ছিল না, যা নিয়ে তারা আলাপ করত না।
তো, দুই বন্ধু একদিন সাহিত্য হিসেবে কল্পবিজ্ঞানের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছিল। শেষমেশ তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছল—তারা দুজনই সায়েন্স ফিকশন লিখবে। একজন লিখবে মহাকাশ ভ্রমণ নিয়ে গল্প, অন্যজন সময় পরিভ্রমণ নিয়ে। কে কোনটা লিখবে, সেটা ঠিক হবে টস করার মাধ্যমে।
তাদের কথামতো Out of the Silent Planet প্রকাশের মধ্য দিয়ে লুইস তার নন-একাডেমিক লেখালিখির ক্যারিয়ার শুরু করে দেয়। পরে সে কালজয়ী ক্লাসিক Mere Christianity ও The Chronicles of Narnia প্রকাশ করে। অন্যদিকে তার বন্ধু টোলকিন সময় পরিভ্রমণ নিয়ে কোনো গল্প না লিখলেও, 'Hobbits' নামক এক জাতির কাহিনি নিয়ে এমন এক গল্প-উপন্যাস লিখে ফেলেন, যার খ্যাতিও কোনো অংশেই কম ছিল না।
বিখ্যাত হওয়ার পর সি. এস. লুইস ও জে. আর. আর. টোলকিন নামক এই বন্ধুদ্বয় পরবর্তী সময়ে অক্সফোর্ড পাবের ব্যাকরুমে আবারও সাক্ষাৎ করা শুরু করে।
তারা সেখানে আরও কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীর সাথে নিজেদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলাপচারিতা চালিয়ে যায়। তারা একসঙ্গে মিলে সায়েন্স ফিকশনের রূপরেখাই পালটে ফেলে।
সাহচর্য : জীবন বদলে দেওয়ার শক্তি
লুইস ও টোলকিন যে গোপন রহস্যের সন্ধান পেয়েছিল, তা ছিল ঐক্য-শক্তি (The Power of Community)। ফলে পরস্পরের সাহিত্যকর্মের পরিমার্জন, নিজেদের লেখা একে অন্যকে সশব্দে পড়ে শোনানো, লেখাগুলোর ঘষামাজা, সমালোচনা-সবকিছুই চলে আসত সেই আলোচনায়। এই আলোচনা করার জন্য তারা লেখালিখিবিষয়ক একটা দলই তৈরি করে ফেলছিল, যার নাম ছিল 'Inklings'। Inklings দলটা পরবর্তী সময়ে একটা সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। যে প্ল্যাটফর্ম তাদের সাহিত্যকর্ম আরও শাণিত করতে এবং সেগুলো বই হিসেবে প্রকাশে সাহায্য করত। ফলে সাহিত্যের মান বিচারে তাদের বইগুলো হতো এককথায় অসাধারণ। বিশেষ করে টোলকিন আর লুইসের বইগুলো তো ঠাঁই করে নিয়েছে কালোত্তীর্ণ ক্লাসিক হিসেবে।
নির্জন ঘরে যেমন কোলাহল থাকে না, তেমনই একা একাও মানুষ বেশি দূর যেতে পারে না। একজন মানুষ যতই প্রতিভাবান হোক না কেন, একা একা তার পক্ষে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
এখন প্রশ্ন হলো-পর্নাসক্তি থেকে বের হয়ে আসার সাথে ওপরের এই গল্পের সম্পর্ক কতটুকু?
উত্তর হলো-সবটুকুই!
পর্ন সাধারণত মানুষ একা অবস্থাতেই দেখে। কেননা, বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই এটি একটি গোপন বিষয়। এই গোপনীয়তা পর্নের আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয় হাজারগুণে।
মনোবৈজ্ঞানিক এ এল কুপার যৌনতার প্রতি মানুষের আকর্ষণের তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলে-অভিগম্য (Accessibility), সামর্থ (Affordability) ও গোপনীয়তা (Anonymity)।
নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ মজ্জাগত। লুকিয়ে লুকিয়ে ওগুলো দেখাও তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। এখান থেকে মুক্তির একটি উপায় হলো-নিজের সমস্যাটি আলোতে আনা। অর্থাৎ, জনসম্মুখে প্রচার করা।
এ ব্যাপারে অনেকগুলো সফটওয়্যার ও সংস্থা আপনাকে সাহায্য করতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম হলো-ইন্টারনেট জবাবদিহিতা (Internet Accountability)।
'Covenat Eyes' এই সেবাটি দিয়ে থাকে। এটি আপনার অনলাইন অ্যাক্টিভিটির রিপোর্ট আপনার বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তিকে ইমেইল করবে। এই বিশ্বস্ত ব্যক্তিই হলেন আপনার জবাবদিহিতার সঙ্গী (Accountability Partner)। আপনি যখনই ভুল পথে পরিচালিত হবেন, তখন এই পার্টনার আপনাকে সাহায্য করবেন। তিনি মোটেও পাহারাদারের মতো হবেন না; বরং তিনি হবেন আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল একজন বন্ধু, যিনি আপনার সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করবেন, আপনাকে সাহস জোগাবেন এবং আপনাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবেন। যার সাথে আপনি গল্প করতে পারবেন, নিজের স্বপ্নের কথা বলতে পারবেন, লক্ষ্যের কথা বলতে পারবেন। যার সাথে বসে নিজের করণীয় ও বর্জনীয় নির্ধারণ করতে পারবেন। ফলে আপনি নিজেকে ঠিক কোন জায়গায় দেখতে চান, তা নির্ধারণ সম্ভব হবে।
চলুন, আমরা আবার লুইস ও টোলকিন বন্ধু দুজনের দিকে লক্ষ করি। লুইস আর টোলকিনের বন্ধুত্ব ছিল এক দশকের। তারা নিজেদের সাহিত্যে ঐক্য-শক্তির (The power of community) কার্যকর প্রয়োগ করেছিলেন। 'Inklings'-এর কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর সদস্যরা একে অপরকে নিজের সৃজনশীল কাজগুলো পড়ে শোনাত। ফলে তারা পরস্পরের ভুল ধরতে সহায়তা করে। আর এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সাহিত্যকর্মকে আরও বেশি শাণিত করত। পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে যুদ্ধেও আমাদের এ রকম পার্টনার প্রয়োজন। একজন সৎ বন্ধু কেবল আপনাকে পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তিলাভেই সাহায্য করবে না; বরং পুরো জীবন পালটে দিতে সহায়তা করতে পারে।
সহযোগী নির্বাচন
যদি আপনি পর্নোগ্রাফি থেকে বের হয়ে আসতে চান, তাহলে আপনার কাউকে না কাউকে সহযোগী হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে। যিনি আপনার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রাখবে, সহযোগিতার সাথে আপনার জীবন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করবে। পাশাপাশি নিজের বাজে অভ্যাসগুলো থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রেও তিনি হবেন আপনার সহযোগী। এই ব্যক্তিই হবেন আপনার Accountability Partner ।
অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনার নির্বাচন
ইতোমধ্যে আপনার মাথায় হয়তো দুই-একজনের নাম চলে এসেছে। যদি এমন কারও নাম মাথায় না আসে, তবে বুঝতে হবে-আপনি হয়তো তেমন কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
আমরা আপনার সঠিক অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনার খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারি। এমন একজন অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনার (Accountability Partner) বাছাই করুন, যার নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকবে-
১. ধার্মিক : একই ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হতে হবে এবং তাকে সত্যিকার ধার্মিক হতে হবে।
২. বিশ্বস্ত : বিশ্বাস অ্যাকাউন্টিবিলিটি পার্টনার হওয়ার মূল শর্ত। বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছাড়া কাউকে Accountability Partner করা যাবে না। কারণ, আপনি তার কাছে অনেক গোপন কথা শেয়ার করবেন।
৩. মানসিকভাবে পরিপক্ব : অপরিণত মানসিকতার কাউকে Accountability Partner হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে না। এমন কাউকে খুঁজে বের করুন, যিনি আপনাকে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারবে।
৪. একই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য: আপনার ও তার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য একই হতে হবে। যেমন: ভালো মানুষ হওয়া, পরকালে মুক্তিলাভ ইত্যাদি।
৫. অনুরূপ মনমানসিকতা : দুজনকেই সম মনমানসিকতার অধিকারী হতে হবে।
বি.দ্র. বিপরীত লিঙ্গের কাউকে কোনোভাবেই Accountability Partner বানানো যাবে না।
কথোপকথন শুরু
যেহেতু আপনি Accountability Partner নির্ধারণ করে ফেলেছেন, এখন আপনার প্রথম কাজ হলো-তার সাথে যোগাযোগ (Communication) শুরু করা। আপনার Accountability partner-এর সাথে নিম্নোক্ত বিষয়ে কথোপকথন শুরু করতে হবে।
১. আপনার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য শেয়ার: পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো-আপনি ঠিক কার মতো হতে চান, তা বারবার স্মরণ করা। আপনার সবটুকু মনোযোগ এ লক্ষ্যের ওপর নিবদ্ধ রাখতে হবে।
যেমন: আপনি নবি-সাহাবিদের জীবনী পাঠ এবং তাঁদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবেন। এজন্য পাঠ করতে পারেন, আর রাহিকুল মাখতুম, মুহাম্মাদ দ্যা ফাইনাল ম্যাসেঞ্জার, মাআল মুস্তফা, ফুটস্টেপ অব প্রোফেট মুহাম্মাদ (সা.), ফিকহুস সিরাহ, মানবতার বন্ধু হজরত মুহাম্মাদ (সা.), সিরাতে ইবনে হিশাম, বিশ্বনবি, আসহাবে রাসূলের জীবনকথা (১-৬ খণ্ড), আমরা সেই সে জাতি (১-৩ খণ্ড)।-(অনুবাদক)
২. পরিকল্পনা করা: পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই একটা স্পষ্ট লক্ষ্য সামনে রাখতে হবে। যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে অগ্রসর হতে হবে। প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে, আপনার আসক্তির কারণ কী? আপনার পর্নাসক্তির কারণ যদি হয় কাজের চাপ, বিষণ্ণতা অথবা অনিদ্রা, তাহলে আপনার প্রথম কাজ হলো-এগুলো দূর করার চেষ্টা করা। আপনি ও আপনার Accountability Partner মিলে অনিদ্রা, বিষণ্ণতা ও কাজের চাপ কীভাবে দূর করা যায়, সেই উপায় নিয়ে ভাববেন, কথা বলবেন এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে ভুলে যাবেন না।
এক্ষেত্রে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। যেমন: Covenant Eyes Internet Accountability। এটি আপনার অনলাইন অ্যাক্টিভিটি বিশ্লেষণ করবে এবং আপনার Accountability Partner-কে রিপোর্ট করবে। এ ছাড়াও অনেক ধরনের সফটওয়ার দিয়ে পর্ন সাইটগুলো ব্লক করে রাখা যায়।
৩. ক্যালেন্ডারে মার্ক করুন: Inklings-এর সদস্যরা ২০ বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে দুইবার আলোচনায় বসত। মঙ্গলবার আর বৃহস্পতিবার। মঙ্গলবার তারা প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে আলেচনা-পর্যালোচনা করত। তারা একে অপরের সাথে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করত। ফলে তাদের সাহিত্যে সেসবের প্রভাব থাকত বেশি। আর প্রতি বৃহস্পতিবার তারা একত্রিত হতো লুইসের বাড়িতে। সেখানে তারা তাদের নিজেদের লিখিত সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করত এবং উচ্চৈঃস্বরে সেগুলো অন্য সদস্যদের পড়ে শোনাত। অন্য সদস্যরা মনোযোগ দিয়ে সেগুলো শুনত এবং নিজেদের মতামত দিত। ফলে নিজেদের সাহিত্যের ত্রুটি-বিচ্যুতি, অসংলগ্নতার ঘাটতি খুঁজে করা সহজ হতো এবং সেগুলো তারা শুধরেও নিত।
ফলে হতো কী, তাদের সময়গুলো হয়ে উঠত অনেক বেশি প্রোডাক্টিভ। যদিও সবাই সব দিন উপস্থিত হতে পারত না, তাই বলে মিটিংয়ের দিন-তারিখ কিন্তু সব সময়ই নির্দিষ্ট থাকত। এই জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই নির্দিষ্ট সময়ই হলো আমাদের জবাবদিহিতার চাবিকাঠি। কীভাবে? বলছি।
সপ্তাহের সব দিনে আপনার পর্নাসক্তি মারাত্মকভাবে দেখা দেবে না। এমনকী কখনো হয়তো টানা কয়েক সপ্তাহও ওগুলো আপনাকে আকর্ষিত করবে না। কিন্তু তার মানে এই না যে, আপনি মুক্তি পেয়ে গেছেন। আপনাকে কোনোভাবেই কাউন্সেলিং এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডে গ্যাপ দেওয়া চলবে না। আপনার জবাবদিহিতা বন্ধুর (Accountability Partner) সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ না থাকলে অনলাইনে যোগাযোগ করবেন, তবুও যেকোনো মূল্যে যোগাযোগটা রাখা জরুরি। সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিন তার সাথে নিজের চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আইডিয়া নিয়ে আলাপ আলোচনা চালাতে হবে। প্রতি মিটিং-এর পর পরবর্তী মিটিংয়ের সময়কাল নির্ধারণ করে ফেলতে হবে। এটা কিন্তু একান্ত জরুরি। প্রয়োজনে ক্যালেন্ডারে দিনক্ষণ মার্ক করে রাখতে পারেন। এটা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, ঠিক কত তারিখে আপনার মিটিংটা আছে।
📄 পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন
ওহিওর আপ্পালাসিয়া পর্বতমালার কাছে একটি কারাগার ছিল। এটি এমন এক জায়গা, যেখানে সমতল ভূমি পর্বতমালায় রূপান্তরিত হওয়া শুরু করে। ১৮৯৬ সালে এ কারাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শতাব্দীকাল চলার পর অমানবিক পরিবেশের কারণে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই পরিত্যক্ত অবকাঠামোতে চিত্রায়িত হয় একটি ক্লাসিক ছায়াছবি।
চলচিত্রের নায়ককে মিথ্যা অভিযোগে এই অমানবিক কারাগারে বন্দি করা হয়। তারপর সে এখানে প্রতিনিয়ত কারারক্ষী ও কয়েদিদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হতে থাকে। এমন প্রতিকূল পরিবেশেও সে তার কারাগারের পরিবেশ উন্নত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। সে নিজের সেলকে নানা রঙের পোস্টার ও কারুকার্য খচিত পাথর দিয়ে সাজায়। কারারক্ষীদের অফিসে ঢুকে গান বলা শুরু করে। এরপর কারাগারে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলতে মনোনিবেশ করে। সে সবাইকে বই পড়াতে আগ্রহী করে তোলে। কিছুদিনের মধ্যেই কারাগারে পরিবেশ আমূল বদলে যায়। এ রকম আকাশ-পাতাল পরিবর্তন ইতঃপূর্বে কেউ দেখেনি। ফলে সবাই কারাগারে আগের চেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে এবং সুন্দর পরিবেশে বসবাস করতে লাগল।
এই ঘটনা থেকে আমরা অনেক কিছুই শিখতে পারি। মূল শিক্ষণীয় বিষয় হলো—আপনি যখন আপনার চারপাশের পরিবেশকে বদলে দেবেন, তখন সেই পরিবর্তন আপনার দৈনন্দিন জীবনেও অনেক চেঞ্জ নিয়ে আসবে। কাজেই পর্নাসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হলেও আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।
মানুষের ওপর পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব
এখন এই মুহূর্তে আপনার বাসার প্রতিটি রুমের চারপাশটা ভালো করে খেয়াল করুন। কিছু জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করুন-
১. আসবাবপত্র কীভাবে সাজানো : টিভি কোন দিকে মুখ করানো? চেয়ারগুলো কি আড্ডা দেওয়ার মতো করে সাজানো? নাকি একাকী সময় কাটানোর উপযোগী করে রাখা আছে?
২. রুমটি কী দিয়ে সাজানো : প্রত্যেকটি রুমে কী কী সাজসজ্জা বিদ্যমান, তা খেয়াল করুন। ঘরের দেয়ালে কী রং করা? কোনো সেলিব্রিটির ছবি সাটানো আছে? ঘরে কি কোনো ক্যালিগ্রাফি আছে? আপনার বারান্দায় কি ফুলগাছের টব আছে?
৩. প্রত্যেক রুমের লাইটিং কেমন : আপনার রুমে কি অনেকগুলো বাতি আছে? জানালা কি বড়ো ও প্রশস্ত? ঘরে কি কোনো ডিম লাইট আছে? জানালা-দরজায় পর্দা আছে কি না? করিডোর কীভাবে আছে?
৪. প্রত্যেক রুমের প্রধান কাজ : যেমন-ডাইনিং রুম, বেডরুম ইত্যাদি।
এবার আপনি যে রুমে সচরাচর পর্নোগ্রাফি দেখেন, সে রুমটি বিশেষ মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করুন। আপনি পর্ন দেখার জন্য এ রুমটিই কেন বেছে নেন? এটি কি অন্যান্য রুমের চেয়ে একটু বেশিই প্রাইভেট? এ রুমে কি সচরাচর কোনো মানুষ আসে না?
ঘরের ভেতরকার পরিবেশের সাথে মানুষের মনস্তত্ত্বের যে সম্পর্ক আছে, এটা নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। গবেষণায় একটা জিনিস পরিষ্কার, আপনার ওপর আপনার ঘরের ডেকোরেশনের প্রভাব কত বেশি, সেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। স্বস্তির খবর হলো—ঘর সাজানোর জন্য আপনাকে বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। এখন আপনি খেয়াল করে দেখেন, আপনার সেই প্রাইভেট রুমটিতে কি কোনো অশ্লীল ছবি টানানো আছে? থাকলে আপনার মন প্রতিনিয়ত নারীকে ভোগের বস্তু হিসেবে কল্পনা করে যাচ্ছে। আরও কিছু সূক্ষ্ম বিষয়ও আছে, যেগুলো আপনার খেয়াল করা উচিত। যেমন: আপনার রুমটি যদি সব সময় অন্ধকার থাকে, তাহলে তা আপনার কাছে গোপনীয় (সিক্রেট) রুম হিসেবে প্রতীয়মান হবে।
জড় পরিবেশ ঢেলে সাজালে অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটে
যেহেতু আপনি নিজের রুম ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, এখন আপনার কাজ হলো রুমটি নতুন করে সাজানো। আপনি জীবনের কোন পর্যায়ে আছেন, তার ওপর ভিত্তি করে এই পুনর্বিন্যাসের রকমফের হতে পারে। রুমটি যদি একান্ত ব্যক্তিগত হয়, তাহলে আপনার একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো-টাকা ও সময়। নিজের রুম হলে পুরো অবস্থাটাই পরিবর্তনের অধিকার আপনার রয়েছে। অন্যদিকে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অবস্থান করেন, তাহলে হয়তো রুমের অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন করা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে না। তবে কিছু ছোটোখাটো পরিবর্তন করতেই পারেন। আর এই ছোটোখাটো পরিবর্তনও আপনার জীবনে আকাশ-পাতাল তফাত এনে দেবে।
১. ঘরের আসবাবপত্র ঢেলে সাজান: The Shawshank Redemption নামক বিখ্যাত বইয়ের লেখক স্টিফেন কিং-এর একটি স্বপ্ন ছিল। তার ইচ্ছা ছিল, ওক কাঠের বড়ো একটা টেবিল বানাবেন, যা লেখক হিসেবে নিজেকে জাহির করতে সাহায্য করবে। রুমের বেশিরভাগ অংশজুড়ে থাকবে তার টেবিল, যা তাকে বেশি বেশি সাহিত্য লিখতে উৎসাহিত করবে। কিন্তু তার স্বপ্ন যখন সত্যি হলো, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেল। তিনি বলেন- 'ছয় বছর যাবৎ আমি মদ খেয়ে অথবা বিষণ্ণ হয়ে ডেস্কের পেছনে পড়ে থাকতাম। আমার অবস্থা ছিল মাঝি ছাড়া নৌকার মতো।'
পরিশেষে তিনি নিজের রুমকে বাসস্থানে রূপান্তরিত করেন, যেখানে এক কোনায় ছোট্ট একটি ডেস্ক ছিল। রুমের ভেতর টিভি, বিছানা এবং টিভির দিকে মুখ করা সোফাসেটও ছিল। রুমটি এমন জায়গায় রূপান্তরিত হলো, যেখানে তার স্ত্রী ও বাচ্চাকাচ্চারা নিয়মিত যাতায়াত করত। মাঝে মাঝে তার স্ত্রী বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে রুমে চলে আসতেন। কখনো এমনিতেই, আবার কখনো একত্রে টিভি দেখা ও আড্ডা দেওয়ার জন্য।
স্টিফেন কিং লেখকের উপদেশ দেন এভাবে
'আপনি আপনার লেখার ডেস্ক রুমের কর্নারে রাখবেন। যখনই লিখতে বসবেন, একটা কথা স্মরণ রাখবেন-ডেস্কটি কিন্তু রুমের মাঝখানে নয়। সাহিত্যের জন্য জীবন নয়; বরং জীবনের জন্যই সাহিত্য।'
আপনার বাড়ির প্রত্যেকটি রুমের দিকে আরেকবার লক্ষ করুন। বিশেষ করে যে রুমে আপনি এসব নোংরা ভিডিওগুলো দেখেন। রুমগুলো কীভাবে সাজানো? চেয়ারগুলো কি টিভিমুখী সাজানো? নাকি একে অপরের দিকে সাজানো, যেন সহজে আড্ডা দেওয়া যায়?
এবার লেখক কিং-এর মতো নিজেকে জিজ্ঞেস করুন- 'আপনার ঘরটা কি আপনার জীবনের সাপোর্টিং হিসেবে কাজ করে নাকি পর্নোগ্রাফির?'
কানাডিয়ান ডেকোরেটর্স অ্যাসোসিয়েশন এভাবে ব্যাখ্যা করছেন 'আপনার রুম কী ধরনের ম্যাসেজ বহন করবে, তা ফার্নিচার দিয়ে প্রকাশ করুন। আপনার রুমে চারটি চেয়ার গোল করে সাজানো থাকার মানে হলো- আসুন, বসুন, রিলাক্স করুন এবং আড্ডা দিন। রুমের কর্নারে একটি দোল খাওয়া চেয়ার আপনাকে সারাদিনের পরিশ্রম শেষে বিশ্রাম নিতে প্রলুব্ধ করে।'
আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঘরের ফার্নিচারগুলো পুনর্বিন্যাস করতে সহায়তা করবে। লক্ষ্য যদি হয় শ্রেষ্ঠ স্বামী ও পিতা হওয়া, তাহলে আপনার প্রিয় চেয়ারকে ঘরের কেন্দ্রে রাখুন এবং আপনার সন্তানকে ঘরে খেলার মতো পর্যাপ্ত জায়গা দিন। স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে যথেষ্ট সময় কাটান। আপনি যদি ছাত্র হয়ে থাকেন; আর লক্ষ্য যদি হয় ডাক্তার হওয়া, তাহলে ডেস্কটি এমনভাবে সাজান, যেন পড়তে আনন্দ পান। এটাও মাথায় রাখুন, পড়ার সময় কোনো কিছু যেন আপনার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত না করে। বিভিন্নভাবে আসবাবপত্র সাজিয়ে দেখুন, কোনটি আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
১. রুমে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা: রুমে আলো বৃদ্ধি করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন। অন্ধকার রুম নির্জনতায় উৎসাহিত করে; অন্যদিকে আলোকোজ্জ্বল রুম সরলতার অন্যরূপ। আলো সব সময়ই অন্ধকার থেকে শ্রেয়। আলোকোজ্জ্বল রুম প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধিতে সহায়ক। Chloe Taylor বলেন-
'মানুষের বাসস্থানের সার্বিক পরিবেশের ওপর আলোর প্রভাব অনস্বীকার্য। সবচেয়ে ভালো আলোর উৎস হলো সূর্য। সুতরাং ঘরের জানালার সাইজ ও সংখ্যা ব্যক্তির সুখ-দুঃখকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে; এমনকী দুশ্চিন্তা কম-বেশির সাথেও এটির সম্পর্ক রয়েছে। ২০০২ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, দিনের আলো মানুষের প্রোডাক্টিভিটি ও পারফরমেন্স বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তাই দিনের বেলা পর্দা খুলে দিন, যেন আলো ঘরে প্রবেশ করতে পারে এবং রাতে জ্বালানোর জন্য পর্যাপ্ত বাতির ব্যবস্থা করুন। ইঁদুরের গল্পটির মতো 'আইসোলেটেড' রুম থেকে 'ওপেন' পার্কে পরিণত করতে যা প্রয়োজন, তা-ই করুন।
২. রুমে সাজসজ্জা পরিবর্তন: ধরে নিই আপনি প্রতিটি রুম নিয়ে আবারও চিন্তা-ভাবনা করেছেন এবং আসবাবপত্র সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন। এবার আপনার কাজ হলো-ডেকোরেশন বা সাজসজ্জার মাধ্যমে রুমকে আরও আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা।
প্রথমেই আপনাকে সমস্যাযুক্ত সাজসজ্জা থেকে মুক্তি পেতে হবে।
সুনির্দিষ্টভাবে রুম থেকে বেপর্দা নারীর ছবি, মূর্তি বা পোস্টার দূর করতে হবে। অশ্লীল কোনো ম্যাগাজিন থাকলে তা-ও ফেলে দিতে হবে। ফোন থেকে সব নারীর ছবি ডিলিট করে ফেলুন। কম্পিউটারে যত আজেবাজে ছবি/ভিডিও আছে-সব ডিলিট করে ফেলুন।
কাজগুলো করার পর দেখবেন, আপনার রুমের ওয়ালে অনেক জায়গা খালি হয়েছে। রুমে সুন্দর সুন্দর প্রাকৃতিক ছবি এবং আর্ট দিয়ে ভরিয়ে ফেলুন। এখানে মহান আল্লাহর নামসংবলিত ক্যালিগ্রাফি সহজে স্থান পেতে পারে, চাইলে আপনার বাবা-মায়ের নামও দেয়ালে টানিয়ে দিতে পারেন। এই অধ্যায়ের শুরুতে আপনি যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন, তা দেয়ালে পোস্টার আকারে ঝুলিয়ে রাখতে পারেন। আপনি যদি লেখক হতে চান, তাহলে ঘরে বিখ্যাত লেখকদের লেখা রাখতে পারেন। রুমে টবে করে ফুলগাছ রাখতে পারেন। একটি সমীক্ষা বলে, চারপাশে ফুলগাছ থাকলে মানুষের মানসিক অবস্থা ভালো থাকে, মন প্রফুল্ল থাকে, দুঃখ কমে। পাতাবাহার গাছ স্মৃতিশক্তি ও প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। রুমে গাছ রাখতে অসুবিধা হলে কৃত্রিম ফুলগাছ রাখতে পারেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্র ও পর্বতমালার ছবিসংবলিত রুম আমাদের মানসিক প্রশান্তি দান করে এবং দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে প্ররোচিত করে। একই সঙ্গে কুরআনের আয়াত এবং নবিজির হাদিস পোস্টার করে দেয়ালে টানিয়ে রাখতে পারেন।
যেভাবেই ঘর সাজান না কেন, খেয়াল রাখতে হবে-এটি যেন দিনশেষে আপনার চক্ষু শীতল করে এবং প্রশান্তির কারণ হয়।
৩. মোবাইল ও ল্যাপটপ রাখার স্থান: আপনার রুমের আসবাবপত্র রদবদল ও সাজানোর মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-টেকনোলজিক্যাল ডিভাইস রাখার স্থান। স্মার্টফোন সব সময় আমাদের কাছেই থাকে। আর প্রায় সময় মানুষ স্মার্টফোনেই পর্ন দেখে। মাঝে মাঝে হয়তো বাথরুমে গিয়েও দেখে। রুমকে সাজিয়ে-গুছিয়ে কীভাবে খুশি থাকা যায়, তা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। এখন আমাদের মোবাইল-ল্যাপটপ রাখার উপযুক্ত স্থানও নির্বাচন করতে হবে।
একটি সহজ পরামর্শ হলো-কম্পিউটার এমনভাবে রাখুন, যেন যে কেউ যেকোনে সময় রুমে ঢুকে দেখতে পারে-আপনি কী করছেন।
কিন্তু এই কৌশলটি কেবল কম্পিউটারের ক্ষেত্রেই খাটে; মোবাইল-ল্যাপটপের ক্ষেত্রে না। আমরা বেশিরভাগ সময় মোবাইলেই ইন্টারনেট ব্রাউজ করি। এক্ষেত্রে অন্য পদ্ধতির সাহায্য নিতে হবে।
প্রথমেই পূর্বের পরিচ্ছেদে বর্ণিত Covenant Eyes ইন্সটল করে নিতে হবে। ইন্টারনেট অ্যাকাউন্টিবিলিটির আরও অনেক সফটওয়্যার আছে, যা এক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করতে পারে। আপনাকে আরও কিছু পদ্ধতির সাহায্য নিতে হবে।
ইন্টারনেটে অ্যাডাল্ট সাইট ব্লক করার বহু রকম সফটওয়্যার আছে, সেগুলো ইন্সটল করে নিতে হবে।
এরপর আপনি একটি টেকনোলজি বাস্কেট তৈরি করুন। সাধারণ একটি ঝুড়ি কিনে তাতে মোবাইল, ট্যাব ইত্যাদি রাখতে পারেন। পরিবারের সাথে ডিনার অথবা টয়লেটে যাওয়ার সময় মোবাইল ও ট্যাব এখানে রেখে যাবেন। বাস্কেটটি বেডরুমের বাইরে রাখুন। শোয়ার সময় কখনোই মোবাইল সাথে রাখবেন না।
আশা করছি, এই পদ্ধতি আপনাকে পর্নাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ দেখাবে।
Withdrawal Symptoms
ধরে নিচ্ছি, এই নোংরা কাজ থেকে আপনি নিশ্চয় ইতোমধ্যেই দূরে থাকছেন। এবার তাহলে Withdrawal Symptoms-এর সাথে পরিচয় করাই। পর্ন ও মাস্টারবেশন ছেড়ে দেওয়ার পর বেশ কিছুদিন অনিদ্রা, বিরক্তি, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, চামড়া ফেটে যাওয়া এবং যৌনাঙ্গে অস্বস্থি বা ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। এসবই মূলত Withdrawal Symptoms। এটার সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো-পর্ন ত্যাগের পর দুই থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত এই লক্ষণগুলো স্থায়ী হতে পারে। কিন্তু এসব দেখে কোনোভাবেই ভড়কে যাওয়া যাবে না। সাময়িক অস্বস্তি থেকে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বা আপনার বোধ হয় কিছুই ঠিক নেই-এমনটা ভাবা যাবে না।
Withdrawal Symptom কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো-আসক্তি সংশ্লিষ্ট আবেগকে মোকাবিলা করা। কোনো ব্যক্তি যখন আসক্তি ত্যাগ করে, তখন তাকে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। যেহেতু Withdrawal Symptoms অনেক জটিল, তাই ব্যক্তির আবার রিল্যান্স শুরু হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন আসক্ত ব্যক্তির যখন ঘুম আসে না, তখন সে এই সমস্যার কীভাবে সমাধান করবেথসেটা বুঝতে পারে না। সে তখন পর্নোগ্রাফিকেই সবকিছুর সমাধান ভাবতে শুরু করে। মনে করে, যদি সে আসক্তির কাথে মাথা নত করে অর্থাৎ পর্ন দেখে, তাহলে হয়তো সহজেই ঘুমিয়ে পড়তে পারবে। এই ভুল ধারণা একজন মানুষকে পর্নোগ্রাফির ফাঁদ থেকে মুক্ত হতে দেয় না।
মূলত withdrawal Symptoms-কে বোঝার জন্য এবং সমাধান করার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে।
এক. প্রত্যেক ব্যক্তিকে অবশ্যই তার ব্যক্তিগত Withdrawal Symptoms-কে বুঝতে ও শনাক্ত করতে হবে।
দুই. Withdrawal Symptoms অনুভব করার সময় তিনি কী করবেন, সম্পর্কে তার একটি অ্যাকশন প্লান আগেই তৈরি করে রাখতে হবে। প্রতি ব্যক্তির জন্য Withdrawal Symptoms শনাক্ত করা প্রয়োজন। কারণ, রিকভারি প্রসেসের বড়ো একটি অংশজুড়ে আছে এই সচেতনতা। Withdrawal হলে এমন এক সেতু, যার মধ্য দিয়ে প্রত্যেক আসক্ত ব্যক্তিকেই যেতে হবে। যা কম লোকেই বুঝতে পারেন, পর্নোগ্রাফি তাদের মনের ভেতরে কতটা জীবন্ত বাসনার সৃষ্টি করে। কাজেই সচেতনতা না থাকলে এই তীব্রতা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। যারা এ আসক্তির সাথে লড়ছেন, তারা অনেকেই স্বীকার করেন-এটি তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। যাহোক এই একই লোকেরা আবার মনে করেন, এ আসক্তি কাটিয়ে ওঠা তাদের জীবনের সেরা কাজ।
Withdrawal Symptom-গুলো হলো-
ক. মাথাঘোরা
খ. শরীর ব্যথা
গ. মাথাব্যথা
ঘ. নিদ্রাহীনতা
ঙ. অস্থিরতা
চ. ক্রোধ
ছ. মুড সুইং ইত্যাদি