📘 নীল বিষ > 📄 গোপনীয়তা থেকে স্বাধীনতা

📄 গোপনীয়তা থেকে স্বাধীনতা


সাম্প্রতিককালে পর্নোগ্রাফিবিরোধী আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবকরা পর্নাসক্তি দূর করার কিছু অসাধারণ ও কার্যকর উপায় আবিষ্কার করেছেন।

এক্ষেত্রে দুজন ব্যক্তির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তারা হলেন জে স্ট্রিংগার ও আলেকজান্ডার রোডস।

জে স্ট্রিংগার একজন পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও পর্নবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। পর্নোগ্রাফিসহ সকল প্রকার মানসিক রোগের চিকিৎসায় অসামান্য অভিজ্ঞতা আছে তার। সাম্প্রতিককালে তিনি পর্নাসক্তি নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এই গবেষণা করতে গিয়ে আসক্ত ব্যক্তিদের মানসিক অবস্থা তিনি গভীরভাবে নিরীক্ষা করেছেন। জে স্ট্রিংগার বলেন-'একজন আসক্ত ব্যক্তি নিজেকে ব্যর্থ, পাপী ও দুর্ভাগা মনে করে। ফলে তারা পর্নোগ্রাফির চোরাবালিতে নির্মমভাবে আটকে যায়।'

তার মতে, হতাশা ও উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপনই পর্নাসক্তির অন্যতম প্রধান কারণ।

আলেকজান্ডার রোডস পর্নোগ্রাফিবিরোধী অনলাইন সংস্থা নোফ্যাপ (NoFap)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। নোফ্যাপ মূলত আসক্তি দূর করতে অনলাইননির্ভর কাজ করে। তাদের তথ্যানুসারে, আসক্তি থেকে সফলভাবে মুক্তিলাভ করা প্রত্যেক ব্যক্তি চিকিৎসার অংশ হিসেবে খেলাধুলা, সমাজসেবা, শৌখিন কাজ ইত্যাদিকে বেছে নিয়েছিল। এসবের মাধ্যমে একটা সময় গিয়ে তারা এই আসক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে।

একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে।

হাতিটি লক্ষ করুন। হাতিটির দিকে মনোযোগ সহকারে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকুন। এর আকৃতি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। এমনভাবে দেখুন, যেন চোখ বন্ধ করে হাতিটি সম্পূর্ণরূপে কল্পনা করতে পারছেন। কমপক্ষে দুই মিনিট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকুন। দেখা শেষ হলে এবার ফোনের স্টপওয়াচ বের করে দুই মিনিট সময় সেট করুন। এই দুই মিনিট আপনার কাজ শুধু একটাই, আর সেটা হলো-আপনি কোনোভাবেই একটু আগে দেখা হাতিটির কথা চিন্তা করতে পারবেন না।

হাতিটি নিয়ে একটুও ভাবতে পারবেন না। হাতিটির শুঁড়, চোখ, কান, পা ইত্যাদি কেমন, তা নিয়েও কিছু ভাবতে পারবেন না। দুই মিনিট, মাত্র দুইটা মিনিট হাতিটি নিয়ে না ভেবে থাকার চেষ্টা করে দেখেন তো!

ফলাফল? হাতিটির কথা চিন্তা না করে আপনি কি দুই মিনিট থাকতে পেরেছেন?

না, পারেননি। আপনি হাতিটির কথা একবার হলেও ভেবেছেন। কারণ, আপনি একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে হাতিটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফলে আপনার মনে হাতিটার ছবি গেঁথে গেছে। তাই না ভাবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও আপনার মনে বারবার হাতিটির কথা চলে এসেছে। আপনি আপনার মন থেকে হাতিটার কথা সরাতে পারেননি।

আর যদি আপনার মাথায় হাতিটির কথা না এসে থাকে, তাহলে আপনি হয়তো হাতিটি ঠিকমতো পর্যবেক্ষণই করেননি। অথবা হাতিটি দেখার সময় আপনার মন অন্যদিকে ছিল। নয়তো হাতিটির কথা মাথায় আসার সাথে সাথেই আপনি আপনার চিন্তাকে অন্য কিছুতে পরিবর্তিত করতে ফেলতে পেরেছিলেন।

কাজেই ওপরের এই উদাহরণগুলো থেকে আমরা বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্টর পাই। যে ফ্যাক্টরগুলো আমার আপনার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করতে পারে।

মনোযোগ

অনেক সময় আমরা পর্ন না দেখার ওপর বেশি মনোযোগ দিতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি। মনের মধ্যে বারবার ঘুরপাক খায়—'পর্ন দেখা যাবে না, এটা পাপ কাজ।' কিন্তু এতবার ভাবার পরও এ থেকে মুক্তি মেলে না; বরং আমরা বারবার শপথ করেও আবার ওই নীল জগতে ঘুরপাক খেতে থাকি। এর কারণ কী? কারণ, আমাদের ওই পর্ন দেখা যাবে না, পর্ন দেখা যাবে না জপমালা। এটা হয়তো সাময়িকভাবে কাজ করতে পারে। তবে এর থেকে খুব বেশিদিন ভালো ফল পাওয়া যায় না। কারণ, আমরা যখন কোনো জিনিস না করার কথা বারবার ভাবতে থাকি, তখন এই চিন্তাই ওই জিনিসকে বারবার মনে করিয়ে দেয়। তাই কোনো কিছু না করার সিদ্ধান্ত বারবার মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে দেওয়া যাবে না।

এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী ডেনিয়াল ওয়েনগান ১৯৮০ সালে ব্যাপক গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হন।

প্রথম একদল লোককে ১০ মিনিট একটি সাদা ভালুক সম্পর্কে চিন্তা না করতে বলা হলো। তারপর পাঁচ মিনিট ভাবতে বলা হয়।

দ্বিতীয় আরেক দল লোককে শুধু পাঁচ মিনিট সাদা ভালুক সম্পর্কে ভাবতে বলা হলো।

পরীক্ষায় দেখা গেল, প্রথম দলের লোকজনই বেশিবার ওই সাদা ভালুকটিকে স্মরণ করেছে।

কেন এমন হলো?

এমন হওয়ার কারণ—আমরা কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা না করতে চাইলে সেই বিষয়টিই আরও বেশি করে মাথায় ঘুরপাক খায়।

এর প্রতিকার কী?

প্রতিকার হলো—আমাদের মনোযোগকে অন্যদিকে পরিচালিত করা।

কোনো কিছু চিন্তা না করার বিষয়টা বেশ মারাত্মক। বলা হয়, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন-'প্রকৃতি শূন্যস্থান ঘৃণা করে।' কিছু চিন্তা না করে থাকাটা এককথায় অসম্ভব। যদি কোনো ভালো চিন্তা না করেন, তবে আপনার অবচেতন মন অবশ্যই কোনো না কোনো বাজে কাজে আপনাকে ব্যস্ত করে ফেলবে।

পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তি পাওয়া একজন নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে বলেন- 'এই আসক্তি থেকে বের হওয়ার কারণে আমি বিবাহবিচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা পাই। সুন্দর চিন্তা আমাকে এটি পরিত্যাগে সাহায্য করেছে।'

আচ্ছা, আপনাদের কি সেই মাদকাসক্ত ইঁদুরটির কথা মনে আছে? সে কীভাবে ও কেন মাদক পরিত্যাগ করেছিল? এর মূল কারণ ছিল তিনটি-
১. সে নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পেয়ে সামাজিক পরিবেশে ফিরে গিয়েছিল।
২. অন্ধকারাবদ্ধ খাঁচা থেকে মুক্তি পেয়ে বসবাসের জন্য অসাধারণ একটা পরিবেশ পেয়েছিল।
৩. নতুন উদ্যানটিতে সময় কাটানোর অনেক অনুষঙ্গ পেয়েছিল।

আপনি যদি সত্যিকারার্থে আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে চান, তাহলে শুধু পর্ন না দেখার সিদ্ধান্তই আপনার জন্য যথেষ্ট না; বরং এর সাথে সাথে আরও কিছু কাজ করা জরুরি। যেমন: আপনাকে নিঃসঙ্গতা পরিহার করতে হবে। আমরা জানি, পরিবার হলো অদম্য ভালোবাসার এক চিরন্তন জায়গা। নিঃসঙ্গতা থেকে পরিত্রাণ পেতে আপনাকে পরিবার, সমাজ ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে হবে। পরিবেশ বদল করতে হবে। নতুন নতুন অভ্যাসের মাধ্যমে পুরোনো বাজে অভ্যাস দূর করতে হবে।

কীভাবে এসব করবেন, এ বইটিতে সেগুলোর বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। আশা করি বইটি মনোযোগ সহকারে পড়লে পর্নোগ্রাফির নীল থাবা থেকে আপনি সহজেই মুক্তি পাবেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00