📄 ঘটনা- ৪
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ও রাখালের ঘটনা।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এক সফরে পথিমধ্যে দেখতে পেলেন এক রাখাল বকরি চড়াচ্ছে। তিনি রাখালের আমানতদারি ও বিশ্বস্ততা পরীক্ষা করতে চাইলেন। তা ছাড়া এগিয়ে গিয়ে রাখালকে বললেন, আমাকে কিছু দুধ দিবে? রাখাল জবাব দিল, এ বকরিগুলো আমার নয়। আবদুল্লাহ ইবনে উমর বললেন, তা হলে এখন থেকে একটি বকরি আমার কাছে বিক্রি কর দাও। তবে আমি আমার নিজের বকরি থেকে দুটি গ্রহণ করব। রাখাল বলল, রাখাল বলল, আমি আমার মালিককে এই বকরি সম্পর্কে কী জবাব দিব? ইবনে উমর বললেন, তুমি তোমার মালিককে বলবে- একটি বকরি বাঘে খেয়ে ফেলেছে। এমন তো হতেই হয়ে থাকে। রাখাল বলল, তা হলে আল্লাহ কোথায় থাকবেন? [আল্লাহ কি দেখবেন না?!]
রাখালের মুখে এ কথা শুনে ইবনে উমর বললেন, আল্লাহর কসম! 'আল্লাহ তখন কোথায় থাকবেন?’- এ কথা আমার অধিক হকদার। এরপর তিনি ওই রাখাল ও সমস্ত বকরি মালিকের কাছ থেকে কিনে নিলেন। অতঃপর রাখালকে আযাদ করে দিয়ে সমস্ত বকরি তাকে দিয়ে দিলেন। [আল মু’জামুল কাবীর লিত-তাবারানী, হাদীস নং ১৩০৫৪]
📄 ঘটনা- ৫
উমর ও দুধ বিক্রেতা মা-মেয়ের ঘটনা।
উমর -র খেলাফতকালে ঘটনা। এক রাতে তিনি প্রজাদের হাল-হকিকত ও অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ছদ্মবেশে বিভিন্ন এলাকায়, রাস্তা-ঘাটে হাঁটছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক ঘর থেকে মা ও মেয়ের কথোপকথন শুনতে পেলেন। উমর দাঁড়িয়ে গেলেন। শুনতে লাগলেন মা ও মেয়ের কথোপকথন। তিনি শুনছেন- মা মেয়েকে বলছেন, দুধে পানি মেশাও।
মেয়ে উত্তর দিল, মা! খলিফা উমর তো এখন দেখছেন না!
মা এবারও বললেন, আপনার মেয়ে কি এই উত্তর দিয়েছিল?
উমর বললেন, আপনার মেয়ে কি বিয়ে হয়েছে?
মা উত্তর দিলেন, জ্বি না।
উমর বললেন, আপনি সম্মত হলে আপনার মেয়েকে আমার ছেলে আব্দুল্লাহর সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছি।
মা রাজি হলেন। মেয়েটির খলিফাতুল মুসলিমীন উমর -র সুযোগ্য ছেলে আব্দুল্লাহ -র স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করল। [তারীখে দিমাশক- ৭০/২৫৩]
📄 ঘটনা- ৬
জাদুকর, ধর্মযাজক ও বালকের ঘটনা।
সুহাইব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী যমানায় এক বাদশাহ ছিল। তার ছিল এক জাদুকর। বার্ধক্যে পৌঁছে সে বাদশাহকে বলল, আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, সুতরাং একজন বালককে আপনি আমার কাছে প্রেরণ করুন, যাকে আমি জাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব। অতঃপর জাদুবিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার জন্য বাদশাহ তার কাছে এক বালককে প্রেরণ করলেন।
বালকের যাত্রাপথে ছিল এক ধর্মযাজক। বালক একদিন তার কাছে বসল এবং তার কথা শুনল। ধর্মযাজকের কথা বালকের পছন্দ হল। এরপর বালক জাদুকরের কাছে যাত্রাকালে সর্বদাই ধর্মযাজকের কাছে যেত এবং তার নিকট বসত। এরপর সে যখন জাদুকরের কাছে যেত, তখন সে তাকে মারধর করত। ফলে জাদুকরের ব্যাপারে বালকের ধর্মযাজকের কাছে অভিযোগ করল। তখন ধর্মযাজক বলল, তোমার পরিবারের লোকেরা আমাকে আসতে দেয়নি। আর যদি তুমি তোমার গৃহকর্তার ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ কর, তা হলে বলবে, জাদুকর আমাকে বিলম্বে ছুটি দিয়েছে।
এমনিভাবে চলতে থাকাবস্থায় একদিন হঠাৎ বালক পথিমধ্যে একটি ভয়ানক হিংস্র প্রাণীর সম্মুখীন হল, যে লোকজনের পথ আটকে রেখেছিল। এ অবস্থায় সে বলল, আজই জানব জাদুকর উত্তম। অতঃপর একটি পাথর হাতে নিয়ে সে বলল, হে আল্লাহ! যদি জাদুকরের চাইতে ধর্মযাজক আপনার কাছে পছন্দনীয় হয়, তা হলে এ পাথর দ্বারা এই হিংস্র প্রাণীটি নিঃশেষ করে দিন, যেন মানুষজন চলাচল করতে পারে। অতঃপর একটি পাথরের প্রতি তার হাতের ছুঁড়ে মারল এবং সেটিকে মেরে ফেলল। ফলে লোকজন আবার যাতায়াত করতে শুরু করল।
এরপর সে ধর্মযাজকের কাছে এসে সম্পূর্ণ ঘটনা তুলে ধরল। ধর্মযাজক বলল, বৎস! আজ তুমি আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ। তোমার মর্যাদা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে শীঘ্রই তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। যদি পরীক্ষার মুখোমুখি হও, তবে শীঘ্রই তুমি আমার সম্পর্কে কাউকে বলবে না।
এরপর থেকে বালক আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগী আরোগ্য দান করতে লাগল এবং লোকদের যাবতীয় ব্যাধির চিকিৎসা করতে লাগল। বাদশাহর এক সভাসদ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে বালকের ব্যাপারে শুনতে পেয়ে অনেক উপঢৌকন নিয়ে বালকের কাছে এল এবং তাকে বলল, তুমি যদি আমাকে আরোগ্য দান করতে পার, তবে এ সব মাল আমি তোমাকে দিয়ে দিব। এ কথা শুনে বালক বলল, আমি তো কাউকে আরোগ্য দান করতে পারি না। আরোগ্য তো দান করেন আল্লাহ । তুমি যদি আল্লাহ ﷺ-র উপর ঈমান আন, তবে আমি আল্লাহ -র কাছে দোয়া করব, আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন।
এরপর সে আল্লাহ -র উপর ঈমান আনল। আল্লাহ তাকে রোগমুক্ত করে দিলেন। এরপর সে বাদশাহর কাছে এসে অন্যান্য দিনের মতো বসল। বাদশাহ তাকে প্রশ্ন করল, কে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছে? সে বলল, আমার পালনকর্তা। এ কথা শুনে বাদশাহ তাকে পাকড়াও করে অবিরামভাবে শাস্তি দিতে লাগল। অবশেষে সে ওই বালকের সন্ধান দিল। অতঃপর বালককে নিয়ে আসা হল। বাদশাহ তাকে বলল, হে প্রিয় বৎস! তোমার জাদু এ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তুমি অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য করতে পার! বালক বলল, আমি কাউকে নিরাময় করতে পারি না। নিরাময় করেন আল্লাহ । এ কথা বলার কারণে বাদশাহ তাকে শাস্তি দিতে লাগল। অবশেষে সে ধর্মযাজকের কথা বলে দিল। এরপর ধর্মযাজককে ধরে আনা হল। বাদশাহ ধর্মযাজককে বলল- তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো।
ধর্মযাজক তা অস্বীকার করল। ফলে তার মাথার তালুতে করাত রেখে দেহ দ্বিখণ্ডিত করা হলো। অবশেষে তার মাথা টুকরো টুকরো করা হলো। অবশেষে খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল।
বাদশাহর সভাসদও তা অস্বীকার করল। ফলে তার মাথার তালুতে করাত রেখে দেহ দ্বিখণ্ডিত করা হলো। অবশেষে খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল।
বাদশাহ আবার তাকে প্রশ্ন করল, তোমার সভাসদগণ কোথায়? বালক বলল, আল্লাহ আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছেন। অতঃপর বালক বাদশাহকে বলল, তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি আমার নির্দেশিত পথ অবলম্বন করবে। বাদশাহ বলল, সে পথটি কী? বালক বলল, একটি ময়দানে তুমি লোকদের জমায়েত কর। অতঃপর একটি কাঠের শূলিতে আমাকে উঠিয়ে আমার তীরদান থেকে থেকে একটি তীর হাতে নিয়ে শূলিতে আমাকে টাঙ্গিয়ে রেখে بِسْمِ اللهِ رَبِّ الْغُلَامِ [ এ বালকের প্রভু আল্লাহ নামে] বলে আমার দিকে তাঁর নিক্ষেপ কর। এ পন্থা অবলম্বন করলে তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে।
বালকের কথা অনুসারে বাদশাহ লোকদের এক মাঠে জমায়েত করল এবং তাকে একটি কাঠের শূলিতে চড়াল। অতঃপর তার তীরদানি থেকে একটি তীর হাতে নিয়ে শূলিতে টাঙিয়ে রেখে بِسْمِ اللهِ رَبِّ الْغُلَامِ [ আমরা এ বালকের পালনকর্তার উপর ঈমান আনলাম; আমরা এ বালকের পালনকর্তার উপর ঈমান আনলাম]
এ সংবাদ বাদশাহকে জানানো হল এবং তাকে বলা হল যে, লক্ষ্য করুন কি, আপনি যে পরিস্থিতির আশঙ্কা করছিলেন, আল্লাহর শপথ! সে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিই আপনার মাথার উপর চেপে বসেছে। সকল মানুষই বালকের পালনকর্তার উপর ঈমান এনে ফেলেছে।
এ দেখে বাদশাহ সকল রাস্তায় গর্ত খননের নির্দেশ দিল। গর্ত খনন করা হল এবং ওগুলোতে আগুন জ্বালানো হল। অতঃপর বাদশাহ আদেশ করল- যে লোক তার ধর্মমত বর্জন না করবে, তাকে ওগুলোতে নিক্ষেপ করবে। লোকেরা তা-ই করল। পরিশেষে এক মহিলা একটি শিশু নিয়ে অগ্নিকুণ্ডের পতিত হওয়ার ব্যাপারে ইতস্তত করছিল। এ দেখে দুধের শিশু [তার মাকে] বলল, ওহে আম্মাজান! সবর করুন, আপনি তো সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩০০৫]