📄 উত্তম আখলাক, পবিত্রতা ও লজ্জাশীলতার তারবিয়াত
মুজাহিদ বলেন, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে তাকওয়া অবলম্বনে ওসিয়ত কর এবং তাদেরকে আদব শিক্ষা দাও। [সহীহ বুখারী, তা'লীকান : ৪/১৮৬৮, অধ্যায় : তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, তাই তোমরা উভয়ে তাওবা করলে ভালো হয়।]
পরিবারকর্তার উপর আবশ্যক- পরিবার-পরিজনের মাঝে উত্তম আখলাক সৃষ্টির মেহনত করা; উৎকৃষ্ট গুণাবলি বিকাশের চেষ্টা করা। উদাহরণস্বরূপ, তিনি শিক্ষা দিবেন- সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, উদারতা, বদান্যতা, অল্পেতুষ্টি, মহানুভবতা, সংযম ও ধীরস্থিরতা। আরও শিক্ষা দিবেন বিনয় ও লজ্জাশীলতা। পাশাপাশি শিক্ষা দিবেন- পিতা-মাতার সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয়।
স্ত্রী-কন্যাদের যুবকদের প্রতি লক্ষ রাখাও পরিবারকর্তার কর্তব্য। যাতে তারা গীবত, পরনিন্দা ও অন্যের দোষচর্চায় লিপ্ত হতে না পারে।
এর পাশাপাশি স্ত্রী-কন্যাদের জন্য নেককার মহিলাদের মজলিসে বসা ও তাদের সাহচর্য গ্রহণে পরিবেশ তৈরি করে দিবেন। নেককারদের ছাড়া অন্যদের সঙ্গে ওঠা বসা ও মেলামেশার পথ বন্ধ করে দিবেন। নেককার মহিলারা ব্যতীত অন্যদের জন্য ঘরে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে দিবেন। কারণ, মহিলাদের অধিকাংশ মজলিসেই ব্যাপক গুনাহের ছড়াছড়ি থাকে। পক্ষান্তরে নেককার মহিলাদের সান্নিধ্য ও সাহচর্য এ সকল গুনাহের মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
কখনও কখনও নারী-মজলিসের কোনো কোনো দুরাচারী নারী আমাদের নারীদের এমন কিছু গর্হিত কর্ম শিক্ষা দেয়, যা মানুষের সুস্থ বিবেক ও শরীয়ত কোনোটিই সমর্থন করে না। যেমন, এক ভদ্রলোক বর্ণনা করেছেন, তার স্ত্রী একদিন তাকে পায়ুপথে সঙ্গমের জন্য আহ্বান করেছে। সাথে এ-ও বলেছে- তার এক বান্ধবী তাকে জানিয়েছে, সে তার স্বামীর সঙ্গে প্রায়ই এমনটা করে থাকে! নাউযুবিল্লাহ।
আমাদের নারীদের আর যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্বর সঙ্গে সতর্ক করা উচিত, তা হচ্ছে- সময়ের হেফাযত করা। সময় নষ্ট না করা। কোনো কোনো মহিলা মোবাইলে ফোনে দীর্ঘক্ষণ অযথা কথা বলে বহু সময় নষ্ট করে ফেলেন, যে কথায় কোনো ধরনের ফায়দা নেই। অতএব, একজন সচেতন দায়িত্বশীলের উচিত, স্বীয় পরিবারের সময়ের সঠিক মূল্যায়ন ও যথাযথ কদর করার তালিম দেওয়া।
আরও দায়িত্ব হচ্ছে- অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, তার পদ্ধতি ও আদব শিক্ষা দেওয়া। পরস্পরের কথা বলা ও আলাপ-আলোচনার ক্ষতির দিক নিয়ে যথাযথভাবে সতর্ক করা। তা ছাড়া নারীরা কোনো ওলীমা-অনুষ্ঠান বা অন্যকোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে সেখানে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে নেওয়া, সেখানে কোনো ধরনের গর্হিত কাজ বা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে কি না- তার খোঁজ-খবর নেওয়া পরিবারকর্তারই দায়িত্ব।
নারীরা যে হিজাব ও পর্দা পরে বাইরে বের হন, তার ব্যাপারেও খোঁজ-খবর রাখা পরিবারকর্তার দায়িত্ব- তা শরয়ী পর্দার জন্য পর্যাপ্ত ও যথেষ্ট কি না? সম্পূর্ণ অঙ্গে তা আচ্ছাদন করতে সক্ষম কি না? সেটি ঘন, গাঢ় ও পুরু কি না? স্বচ্ছ থেকে মুক্ত কি না? পুরুষদের পোশাকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কি না? কাফের-মুশরিকরা নারীদের পোশাকের সাথে পার্থক্য ও ব্যবধান আছে কি না? যথেষ্ট প্রশস্ত ও ঢিলে কি না? অসংলগ্ন ও মোটাসোটা কি না?
অত্যন্ত আক্ষেপ ও দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, কোনো কোনো পুরুষ চরিত্রে- হাঁ, কোনো কোনো মুসলিম পুরুষের চরিত্রে বে-গায়রতি, আত্মমর্যাদাহীনতা, নষ্টা ও লম্পটের উপস্থিতি আছে। অনুভূতির দিক থেকে মৃত ও নির্বোধ! তারা তাদের স্ত্রী-কন্যাদের পবিত্রতা ও চারিত্রিক নিশ্চয়তার এতটুকু যত্নবান না! পর্দা পুষিদার কোনো তদারকি করে না। আপনি দেখবেন, এ ধরনের লোক তাদের কন্যাদের স্বাধীনতা ছেড়ে দেয়; নিজেদের ইচ্ছামত চলাফেরা করতে দেয়। মেয়েদের যখন যেখানে ইচ্ছা চলে যাচ্ছে; যার সঙ্গে ইচ্ছা চলে যাচ্ছে! তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই, ধরা-বাঁধা কোনো তত্ত্বাবধায়ক নেই। এ বিষয়ে সেসকল পুরুষকে তিরস্কার-ভর্ৎসনা করা হলে এ বলে ওজুহাত পেশ করে- সে তো এখনও অনেক ছোট! কিংবা তার ব্যাপারে আমার পূর্ণ আস্থা আছে!
কেউ কেউ স্ত্রী-পরিজন ও কন্যাদের নিয়ে বিভিন্ন পার্কে, বাগানে, বিনোদন কেন্দ্রে ঘুরতে যান। সেখানে গিয়ে তাদের লাগাম সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে দেন। তারা আপন মনে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে বেড়ান, খেলাধুলা করেন। পর্দার কোনো বালাই থাকে না। হিজাব খুলে যায়। অনেকের দেহও উন্মুক্ত হয়ে যায়। সামগ্রিকভাবে এসব বিষয়ে তারা চূড়ান্ত অবহেলা ও উদাসীনতার পরিচয় দেন।
এর চাইতেও নিকৃষ্ট ও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে- অনেকেই তাদের স্ত্রী-কন্যাদের একবার প্রশ্নও করেন না- তারা কোথায় যাচ্ছে? কোত্থেকে আসছে? বরং স্ত্রী-কন্যারা আদেশ করছে- ‘আমাদের অমুক স্থানে পৌঁছিয়ে দাও’ আর অমনিই তারা সেখানে পৌঁছিয়ে দিচ্ছেন। একবার জানতেও চাচ্ছেন না- তারা যেখানে যাচ্ছে বা যেতে চাচ্ছে, সেখানে তাদের কী কাজ? কিংবা সেখানকার অবস্থিতি বা কী? আল্লাহ বলেন, এক ব্যক্তি এ সবকিছুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা হবেন। আমাদের সকলের জন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ-র জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ ও নমুনা। দেখুন, এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ তাঁর স্ত্রীদের প্রতি কত গায়রতওয়ালা ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন! হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
دَخَلَ عَلَيَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعِنْدِي رَجُلٌ قَاعِدٌ فَاشْتَدَّ ذَلِكَ عَلَيْهِ وَرَأَيْتُ الْغَضَبَ فِي وَجْهِهِ قَالَتْ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّهُ أَخِي مِنَ الرَّضَاعَةِ قَالَتْ فَقَالَ انْظُرْنَ إِخْوَتَكُنَّ مِنَ الرَّضَاعَةِ فَإِنَّمَا الرَّضَاعَةُ مِنَ الْمَجَاعَةِ
একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার কাছে এলেন। তখন আমার কাছে একজন পুরুষ বসা ছিলেন। এতে তাঁর মন ভারাক্রান্ত হল এবং আমি তাঁর চেহারায় ক্রোধের আলামত দেখতে পেলাম। তিনি [আয়েশা] বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহ রাসূল! এ ব্যক্তি আমার দুধভাই। [আয়েশা] বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, কারা তোমাদের দুধভাই- তা তোমরা ভালো করে দেখে নিয়ো। ‘রাযাআত’ সাব্যস্ত হয় যখন দুগ্ধপানের দ্বারা সন্তানের ক্ষুধা নিবারিত হয়। [অর্থাৎ দুগ্ধপানের মেয়াদের ভিতর দুধ পান করলে রাযাআত সাব্যস্ত হয়] [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫১০২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৫৫, ভাষ্য মুসলিমের]
অর্থাৎ তোমরা কাউকে দুধভাই বলে ডাকতে থাকবে এবং তাদেরকে তোমাদের প্রবেশ করতে দেওয়ার পূর্বে খুব ভালোভাবে যাচাই করে নিবে, তাদের দুগ্ধপান কি দুগ্ধপানের মেয়াদে ভিতর হয়েছে না মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর হয়েছে। দুগ্ধপান যদি দুগ্ধপানের মেয়াদে পর হয়ে থাকে, তা হলে এ দুগ্ধপানের দ্বারা রাযাআত সাব্যস্ত হবে না। ফলে তারা তোমাদের দুধভাই বলেও বিবেচিত হবে না। আর তখন তাদের সাথে তোমাদের দেখা-সাক্ষাৎ না-জায়েয হওয়ার বিষয়টি তো বলাই বাহুল্য।
📄 চক্রান্তকারীদের চক্রান্ত সম্পর্কে সতর্ক করা
সত্য, স্থিতি ও স্খলনের হাত থেকে পরিবারকে রক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ একটি পন্থা হচ্ছে- পরিবারের সদস্যদেরকে চক্রান্তকারীদের চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও তাদের জঘন্য ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে অবহিত করা। ঘর, সংসার ও পরিবার ধ্বংস করা এবং পরিবারের সদস্যদের পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করার জন্য তারা যেসব চক্রান্ত ও জঘন্য কর্মকাণ্ড করে চলেছে, সে সম্পর্কে পরিবারকে সতর্ক করা। চক্রান্তকারীরা তাদের চক্রান্ত বাস্তবায়ন করার জন্য মধুর মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে! সত্য, নোংরামি ও নষ্টামিকে সমাজের সামনে উপস্থাপন করছে বাহ্যত সুন্দর মোড়কে! এসবকে অভিহিত করছে আসল রূপ ও নাম আড়াল করে ভিন্ন ভিন্ন চটকদার নামে!
আমাদের নারীদের যেসব বিষয়ে গুরুত্বের সাথে সতর্ক করা উচিত, তার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হচ্ছে নিম্নোক্ত দু'টি বিষয়। যথা-
এক. চক্রান্তকারীরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে- নারী থেকে পর্দা খুলে ফেলতে; পর্দা ও নারীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিতে। নারীকে ঘরের নিরাপদ আশ্রয় থেকে টেনে বাইরে বের করে আনতে। যাতে তাদেরকে ব্যবসার জন্য আর কোনো সামগ্রী আনতে পারে। আর একেই তারা অভিহিত করে ‘নারী স্বাধীনতা' নামে।
দুই. তারা চাচ্ছে ইসলামী পরিবার-ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে; পারিবারিক সুন্দর চিত্র মুছে ফেলতে। যেকোনো উপায়ে মুসলিম উম্মাহর সংখ্যা কমিয়ে আনতে। আর একে তারা নামকরণ করছে ‘পরিবার পরিকল্পনা' নামে।
এ সকল চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার জন্য বহু স্যাটেলাইট চ্যানেল চালু করা হয়েছে। যে চ্যানেলগুলোর জন্মই হয়েছে মানুষের আখলাক-চরিত্র নষ্ট করার জন্য; আত্মিক পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতাকে গলা টিপে হত্যা করার জন্য; সর্বোপরি মুসলিম পরিবার ও ইসলামী পরিবার-ব্যবস্থাকে সমূলে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য।