📄 কোরআন ও দ্বীনের জরুরি বিষয় শিক্ষাদান
শরয়ী ইলম নিঃসন্দেহে আল্লাহ ﷺ-কে ভয় করার মাধ্যম। যেমন, আল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাঈ কেবল তাঁকে ভয় করে। [সূরা ফাতির : ২৮]
অতএব, একজন গৃহকর্তা যখন আপন পরিবারকে আল্লাহ ﷺ-র কিতাব এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী ইলম শিক্ষাদানের প্রতি গুরুত্বারোপ করবেন, তখন তিনি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর প্রথম ধাপে উত্তীর্ণ করে দিলেন।
ইসলামী শরীয়ত নারীদেরকে ইলম দ্বীন ও আদব শিক্ষাদানের ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছে। ইমাম বুখারী তার সহীহ বুখারীতে একটি অধ্যায়ই কায়েম করেছেন ‘নিজের দাসী ও পরিবার-পরিজনকে শিক্ষাদান’ নামে। সে অধ্যায়ে তিনি আবু মূসা আশআরী থেকে বর্ণিত একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন—
ثَلَاثَةٌ لَهُمْ أَجْرَانِ ... وَرَجُلٌ كَانَتْ عِنْدَهُ أَمَةٌ فَأَدَّبَهَا فَأَحْسَنَ تَأْدِيبَهَا وَعَلَّمَهَا فَأَحْسَنَ تَعْلِيمَهَا ثُمَّ أَعْتَقَهَا فَتَزَوَّجَهَا فَلَهُ أَجْرَانِ
তিন ধরনের লোকের জন্য দু'টি সাওয়াব রয়েছে ... [তাদের মধ্যে একজন] ওই ব্যক্তি, যার একটি বাঁদি ছিল, যার সাথে সে মিলিত হত। তারপর তাকে সে সুন্দরভাবে আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়েছে এবং ভালোভাবে দ্বীনী ইলম শিক্ষা দিয়েছে। এরপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করেছে। তার জন্য দু'টি সাওয়াব রয়েছে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৪]
ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, বাঁদি প্রসঙ্গে ‘তাদমুল বাব’ এর সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য ‘নস' দ্বারা প্রমাণিত। আর পরিবারের ব্যাপারে সামঞ্জস্য ‘কিয়াস' দ্বারা প্রমাণিত। কেননা, পরিবারের স্বাধীন সদস্যদের আল্লাহ ﷺ-র ফরয বিধানাবলি ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-র সুন্নাতসমূহ শিক্ষাদানে প্রবৃত্ত হওয়া বাঁদিকে এসব বিষয় শিক্ষাদানের প্রতি মনোযোগী হওয়ার তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। [ফাতহুল বারী : ১/১৯০]
ইমাম যাহহাক ও মুকাতিল বলেন, একজন মুসলিমের দায়িত্ব ও কর্তব্য- তার পরিবার-পরিজন, নিকটাত্মীয় ও গোলাম-বাঁদিসহ সকলকে সেসব বিষয় শিক্ষাদান করা, যা আল্লাহ তাদের উপর ফরয করেছেন এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন। [তাফসীরে ইবনে কাছীর : ৪/৫০২]
অতএব, আমাদের উপর আবশ্যক- আমাদের সন্তান-সন্ততি ও পরিবারবর্গকে দ্বীন ও প্রয়োজনীয় আদব শিক্ষাদান করা।
শরীয়ত নারীদেরকে স্বতন্ত্রভাবে শিক্ষাদানের অধিকার নিশ্চিত করেছে। যেমন, ইমাম বুখারী রহ. তার সহীহ বুখারীতে একটি অধ্যায় কায়েম করেছেন ‘নারীদের জ্ঞান লাভের জন্য আলাদাভাবে দিন নির্ধারণ করা হয় কি? অতঃপর সেখানে তিনি আবু সাঈদ খুদরী -র সূত্রে এই হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন—
قَالَتِ النِّسَاءُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَلَبَنَا عَلَيْكَ الرِّجَالُ فَاجْعَلْ لَنَا يَوْمًا مِنْ نَفْسِكَ فَوَعَدَهُنَّ يَوْمًا لَقِيَهُنَّ فِيهِ فَوَعَظَهُنَّ وَأَمَرَهُنَّ
একদিন নারীরা নবী কারীম ﷺ-কে বলল, পুরুষরা আপনার কাছে আমাদের চেয়ে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। তাই আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি দিন নির্ধারণ করে দিন। তিনি তাদের বিশেষ একটি দিনের অঙ্গীকার করলেন। সে দিন তিনি তাদের কাছে গেলেন এবং তাদের উপদেশ ও নির্দেশ দিলেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১০২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৩৪]
তদ্রুপ সুহাইল ইবনে আবি সালেহ তার পিতার সূত্রে হযরত আবু হুরায়রা -র বরাতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তাতেও এর মতো ঘটনাই বর্ণিত হয়েছে। সেখানে নবীজী ﷺ বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য প্রস্তুত স্থান হচ্ছে অমুকের ঘর। অতঃপর তিনি তাদের কাছে আগমন করলেন এবং তাদেরকে হাদীস বর্ণনা করলেন [উপদেশ-নসীহত করলেন]। [আস-সুনানুল কুবরা লিল নাসায়ী : ৩/৪৫২, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং ৩০৩৩, মুসনাদুল হুমাইদী, হাদীস নং ১০৬৭]
এ হাদীস দেখা যাচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বিশেষভাবে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ ও স্থান নির্ধারণ করেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
خَرَجْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ فِطْرٍ أَوْ أَضْحًى فَصَلَّى ثُمَّ خَطَبَ ثُمَّ أَتَى النِّسَاءَ فَوَعَظَهُنَّ وَذَكَّرَهُنَّ وَأَمَرَهُنَّ بِالصَّدَقَةِ
আমি নবীজী ﷺ-র সাথে ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার দিন বের হলাম। তিনি সালাত আদায় করলেন। অতঃপর খোতবা দিলেন। তারপর নারীদের কাছে গিয়ে তাদেরকে নসীহত করলেন এবং তাদেরকে দান-সদকার নির্দেশ দিলেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৭২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৮৪]
ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, এই হাদীসের ফায়দাসমূহের একটি হচ্ছে- নারীদেরকে ওয়াজ-নসীহত করা, উপদেশ দেওয়া, ইসলামের হুকুম-আহকাম শিক্ষা দেওয়া, তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও যিম্মাদারির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, তাদেরকে সদকার ব্যাপারে উৎসাহিত করা এবং তাদের জন্য বিশেষভাবে আলাদা মজলিসের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি সবই মুস্তাহাব; তবে শর্ত হচ্ছে তারা নিজেরা ও তাদের মজলিস সমস্ত ফেতনা-ফাসাদ ও অন্যায় থেকে নিরাপদ থাকতে হবে। [ফাতহুল বারী : ৩/৪৩৭]
অপরদিকে পুরুষদের উচিত ও উন্নতিরও হওয়া। নারীদের বিভিন্ন প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসাকে প্রশ্নমুক্তির সাথে গ্রহণ করা এবং তাদের কাছে শরীয়াতের বিশুদ্ধ জ্ঞান যথাযথরূপে পৌঁছে দেওয়া।
ইবনে আবি মুলাইকা থেকে বর্ণিত—
أَنَّ عَائِشَةَ زَوْجَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَتْ لَا تَسْمَعُ شَيْئًا لَا تَعْرِفُهُ إِلَّا رَاجَعَتْ فِيهِ حَتَّى تَعْرِفَهُ وَأَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ حُوسِبَ عُذِّبَ قَالَتْ عَائِشَةُ فَقُلْتُ أَوَلَيْسَ يَقُولُ اللهُ تَعَالَى فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا قَالَتْ فَقَالَ إِنَّمَا ذَلِكِ الْعَرْضُ وَلَكِنْ مَنْ نُوقِشَ الْحِسَابَ يَهْلِكْ
নবী কারীম ﷺ-র স্ত্রী আয়েশা কোনো কথা শুনে না বুঝলে বার বার প্রশ্ন করে তা বুঝে নিতেন। একদিন নবী কারীম ﷺ ইরশাদ করলেন ‘কেয়ামতের দিন যার কাছ থেকে হিসাব চাওয়া হবে, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে'। আয়েশা বলেন, [এ কথা শুনে] আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহ কি পবিত্র কুরআনে এই ইরশাদ করেননি ‘তার হিসাব-নিকাশ সহজে হয়ে যাবে। [সূরা ইনশিকাক : ৮] আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তখন তিনি [নবীজী ﷺ] বললেন, তা কেবল হিসাব প্রকাশ করা। কিন্তু যার হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নেওয়া হবে, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১০৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৭৬]
কেয়ামতের দিন কিছু কিছু মানুষের হিসাব নেওয়া হবে খুব সহজভাবে। তাদেরকে কোনো জেরা-জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তাদের আমল-আখলাক ও সগিরা-কবীরা গুনাহ সম্পর্কে তেমন কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।
অতঃপর খুব দ্রুতই তাদের হিসাব-নিকাশ শেষ হয়ে যাবে। তারপর তারা জান্নাতে চলে যাবে। আর যাদেরকে তাদের আমল সম্পর্কে জেরা-জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, যাবতীয় আমল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে, সগিরা-কবীরা সব বিষয়েই জেরা করা হবে, তারা সুনিশ্চিত ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
- আমরা আল্লাহ ﷺ-র দরবারে নিরাপত্তা ও পানাহ চাই।
प्रिय पाठक!
এই যে আয়েশা, তিনি একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও- যে বিষয়ে তাঁর খটকা লেগেছে, সে বিষয়ে সঠিক তথ্যও তত্ত্ব হওয়ার জন্য তার স্বামী [নবীজী ﷺ]-কে জিজ্ঞাসা করেছেন। আর নবীজীও অত্যন্ত সুন্দরভাবে তার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
-কেন যে আমাদের নারীরা তাদের দ্বীনী বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসার ব্যাপারে আয়েশা -র অনুসরণ করে না?! আর কেনই যে আমাদের পুরুষরা তাদের নারীদের দ্বীন শিক্ষাদানের ব্যাপারে নবীজী ﷺ-র অনুকরণ করে না?!
আমাদের সকলেরই জেনে রাখা উচিত- পুরুষের অবহেলা উদাসীনতা ও ত্রুটির কারণে যে মূর্খতা তার স্ত্রী-কন্যা ও বোনদের সঙ্গী যুক্ত হয়, তার দায় ওই পুরুষের কবর পর্যন্ত যায়। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত-
أَنَّ حَفْصَةَ بَكَتْ عَلَى عُمَرَ فَقَالَ مَهْلًا يَا بُنَيَّةَ أَلَمْ تَعْلَمِي أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذَّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ
উমর [যখন গুরুতর আহত হলেন] হাফসা কাঁদতেছিলেন। তখন উমর বললেন, থামো হে স্নেহের কন্যা! তুমি কি জান না, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, মৃত ব্যক্তিকে তার স্বজনদের কান্নাকাটির কারণে শাস্তি দেওয়া হয়। [বুখারী, হাদীস নং ১২৮৮, মুসলিম, হাদীস নং ৯২৭]
এ হাদীসের ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। তার মধ্যে শক্তিশালী অভিমত হচ্ছে- ব্যক্তিকে তার পরিবার-পরিজনের কান্নাকাটির কারণে] শাস্তি দেওয়া হবে- যদি সে জানত যে, বিলাপ করে কান্নাকাটি করা তার পরিবারের অভ্যাস এবং তার জানা সত্ত্বেও সে তাদেরকে বিলাপ করা হারাম হওয়ার ব্যাপারে তালিম দেয়নি এবং তার মৃত্যুর পূর্বে তাদেরকে নিষেধ করেনি। তা হলে সেক্ষেত্রে সে মারা যাওয়ার পর তাকে নিয়ে বিলাপ কান্নাকাটি করলে সে কারণে তাকে তার কবরে আযাব ভোগ করতে হবে।
- বর্ণিত হাদীসের এ ব্যাখ্যাটিই সর্বাধিক উৎকৃষ্ট।
এ ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করলেই বর্ণিত হাদীসে ধর্ম ও আল্লাহ ﷺ-র নির্দেশ পালনের মাঝে কোনো বিরোধ থাকে না, যেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন—
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। [সূরা আনআম : ১৬৪]
[টীকা- ইমাম বুখারী তার সহীহ বুখারীতে একটি অধ্যায় কায়েম করেছেন এ নামে- অধ্যায় : নবী ﷺ-র বাণী- পরিবার-পরিজনের কান্নার কারণে মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হয়, যদি বিলাপ করা তার অভ্যাস হয়ে থাকে।]
অভ্যাস হয়ে থাকে। কারণ, আল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর। [সূরা তাহরীম : ৬] আর নবী কারীম ﷺ ইরশাদ করেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
তবে তা যদি তার অভ্যাস না হয়ে থাকে, তা হলে তার বিধান হবে ওই রকম, যেমনটি হযরত আয়েশা বলেছেন- [অনুবাদ] ‘কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। [সূরা আনআম : ১৬৪] আর এ হল আল্লাহ ﷺ-র এ বাণীর ন্যায়- [অনুবাদ] ‘কোনো [গুনাহের] বহনকারী ব্যক্তি যদি অন্য কাউকে তা বহন করতে আহ্বান করে, তা হলে তা থেকে কিছুই বহন করা হবে না। [সূরা ফাতির : ১৮] তবে বিলাপ ব্যতীত শুধু ক্রন্দনের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। নবী কারীম ﷺ ইরশাদ করেছেন, অন্যকে কাউকে হত্যা করা হলে সে হত্যার অপরাধের প্রথম আদম সন্তান [কাবিল] এর উপর বর্তাবে। আর সেটা এ কারণে যে, সে-ই প্রথম ব্যক্তি, যে হত্যার প্রচলন করেছে।
একজন পুরুষের জন্য আবশ্যক- তার পরিবার-পরিজন যেসকল হুকুম-আহকাম জানার প্রতি মুখাপেক্ষী, তিনি যদি সেগুলো না জানেন, তা হলে তিনি সেগুলো বিজ্ঞ কারও কাছে জিজ্ঞাসা করে জেনে নেবেন।
আমাদের অনেক আনন্দ হয়, যখন আমরা পুরুষদের ব্যাপারে জানতে পারি- তারা কোনো আলেমদের কাছে এসে তাদের নারীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছেন। যেমন, তাদের প্রতি মাসের তাহারত-পবিত্রতা সম্পর্কে, তাদের মাহরামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে, কাদের সাথে তাদের পর্দা করতে হবে আর কাদের সাথে পর্দা করতে হবে না ইত্যাদি প্রসঙ্গে।
একজন পুরুষের এমনটা করা এ কথার প্রমাণ বহন করে- তিনি তার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে আল্লাহ ﷺ-র নির্দেশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে যত্নশীল। আল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। [সূরা তাহরীম : ৬]
এতে প্রমাণিত হয়- কার্যত তিনি তার দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন এবং তিনি তা অন্তর দিয়ে গুরুত্বসহকারে উপলব্ধি করেন। তাই তো তিনি তার স্ত্রী-পরিজন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জানতে চান, জিজ্ঞাসা করেন।
প্রিয় পাঠক!
এ পরিচ্ছেদের সমাপ্তিতে এসে আমাদের পরামর্শ ও প্রস্তাব—
* কুরআনের ব্যাপারে : পরিবারের সদস্যদের যতটুকু পরিমাণ কুরআন হিফয করাবেন, যা দিয়ে তাদের সালাত আদায় শুদ্ধ হয়। পাশাপাশি তারা যেন নিজেদের জীবনে আমল করার জন্য কুরআন নিয়ে চিন্তা-ফিকির ও গবেষণা করার মতো পুঁজি পায়। যেমন, আমপারা, সূরা মুলক, সূরা কাহফ, সূরা নূর, সূরা হুজুরাত ইত্যাদি হিফয করানো এবং সাথে সাথে এর তাফসীরও শিক্ষা দেওয়া।
এক তালিবুল ইলম তার শায়খ —শায়খ সফরে বের হওয়ার প্রাক্কালে- জিজ্ঞাসা করেছিল- মুহতারাম শায়খ! আপনি আমাকে কী উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন?
শায়খ জওয়াবে বললেন, আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহ ﷺ-র কিতাবের ব্যাপারে। এ কিতাব তুমি তেলাওয়াত করবে, এ কিতাব নিয়ে গবেষণা করবে, এ কিতাব হিফয করবে এবং এর তাফসীরের জ্ঞান লাভ করবে।
प्रिय पाठक!
মুহতারাম শায়খের এ উপদেশটি একটি বহুমুখী ও সর্বব্যাপী উপদেশ। আমাদের পরিবার-পরিজনকে তারবিয়াত করার জন্য এমন একটি উপদেশের প্রতিই আমরা মুখাপেক্ষী। অতএব, আমাদের জন্য উচিত, তাদের মাঝে মাঝে আল্লাহ ﷺ-র কালাম বাস্তবায়ন করা, তাদের অন্তরে আল্লাহ ﷺ-র কিতাবের প্রতি ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-র সুন্নাতের প্রতি গুরুত্ব ও যত্নবোধ জাগ্রত করা। যেমনটি আল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ
আল্লাহর আয়াত ও হিকমত, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তোমরা সেগুলো স্মরণ করবে। [সূরা আহযাব : ৩৪]
- আর সুন্নতই হচ্ছে হিকমত।
* হাদীসের ব্যাপারে : ইমাম নববী রহ. এর ‘আল আরবাউন’ ব্যাখ্যা করে তাদের শোনাবেন, পড়তে দিবেন, পড়তে দিবেন। পাশাপাশি তা মুখস্থ করে নিতেও উৎসাহ দিবেন।
* আকিদার ব্যাপারে : আকিদা সংক্রান্ত যেকোনো সহজ একটি কিতাব পড়তে দিবেন বা পড়াবেন। যেমন, ‘আকিদা সংক্রান্ত ২০০ প্রশ্নোত্তর’।
* ফিকহের ব্যাপারে : ফিকহের ক্ষেত্রে তাদেরকে নবীজীর ওযু ও সালাত, পাশাপাশি তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাসমূহ শিক্ষা দিবেন। যেমন, পর্দা, অলংকার ও সৌন্দর্যবর্ধন, সাজ-সজ্জা ও হায়য-নেফাসের হুকুম-আহকাম ইত্যাদি।
* সীরাতের ব্যাপারে : এ ব্যাপারে কোনো ধরনের অবহেলা বা উদাসীনতা করা যাবে না। বিশেষত ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে।
* ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশের ব্যাপারে : আমাদের দরস ও পাঠদান পদ্ধতিতে এ বিষয়টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা জরুরি। আমাদের দরসগুলো যেন কেবলই জ্ঞানসর্ব ইলম ও বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, যেখানে কেবল পড়ানো হবে- আমাদের মত এটি, অমুকের অভিমত সেটি ইত্যাদি আর সেখানে আল্লাহ ﷺ-র যিকিরের কথা থাকবে না।
📄 ফরয আদায়ে বাধ্য ও অভ্যস্ত করা
বহু মানুষ তার কঠিন ইলম তার অন্তরের রোগ নির্ণয় ও তা প্রতিকারের প্রতি মনোনিবেশ করা থেকে বিরত রেখেছে; বিমুখ করে রেখেছে, ভুলিয়ে রেখেছে। অথচ মানুষের অন্তরে মরিচা পড়ে; আর সে মরিচা দূর করা ও পরিষ্কার করার মাধ্যম হচ্ছে আল্লাহ ﷺ-র যিকির।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- আমাদের পরিবারকে তালিম ও শিক্ষাদানের এ ধারা যেন ধারাবাহিক হয়; অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। তা যেন খণ্ড ও বিচ্ছিন্নভাবে না হয়। প্রয়োজনে পরিবারের সকলের জন্য প্রতি সপ্তাহে একটি দিন নির্ধারণ করে নেওয়া হবে, যে দিনের মজলিসে সকলেরই বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকতে হবে; কোনো অবস্থাতেই তাতে অনুপস্থিত থাকা যাবে না। এ তালিম ও দরসদান আজীবন চলবে; কোনো বিরতি বা অবসর দেওয়া যাবে না।
২. ফরয আদায়ে বাধ্য ও অভ্যস্ত করা
ফরয বিধান আদায়ের ব্যাপারে পরিবারকর্তার যত্নবান হওয়া এবং তা আদায়ে স্ত্রী-পরিজন ও সন্তানদের তদারকি করা জরুরি। বিশেষত সালাতের ব্যাপারে। অতএব, তাদেরকে বাধ্য করতে হবে যাবতীয় রুকন-আরকান, শর্ত-ওয়াজিব ও সুন্নাত-মুস্তাহাবসহ ওয়াক্তমতো সালাত আদায়ের ব্যাপারে। বিশেষভাবে ফজরের সালাত।
আমি একবার শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায -কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- এক ব্যক্তি ফজরের সালাতের জন্য ঘর থেকে বের হয়েছেন। সালাতের পর তিনি মসজিদে দরসে উপস্থিত হবেন। এমতাবস্থায় তার পরিবার-পরিজন ঘুমিয়ে আছে। এখন তার করণীয় কী? তার জন্য কি ফিরে গিয়ে পরিবার-পরিজনকে ঘুম থেকে জাগানো জরুরি, যদিও তার দরসের কিছু অংশ এমনকি পুরো দরসই ছুটে যায়? না তিনি দরসে উপস্থিত হবেন?
শায়খ উত্তরে বলেছেন, না; বরং তার জন্য ফিরে যাওয়া ওয়াজিব। কেননা, পরিবার-পরিজনকে সালাতের আদেশ করা ওয়াজিব। আর দরসে উপস্থিত হওয়া মুস্তাহাব। মুস্তাহাবকে কখনোই ওয়াজিবের উপর প্রাধান্য দেওয়া যাবে না।
অথচ পরিবার-পরিজন ও সন্তানাদিকে সালাতের আদেশদান ও গুরুত্ব প্রদানের ব্যাপারে আমাদের ভূমিকা ও বাস্তবতা খুবই দুঃখজনক, বেদনাদায়ক। এক্ষেত্রে আমাদের অবহেলা ও ত্রুটি সীমাহীন, অমার্জনীয়।
ওহে মুসলিম ভাই! ওহে পরিবারকর্তা ও দায়িত্বশীল ভাই! আপনি কি জানেন আপনার সন্তান আদায় শেষে কীভাাবে? আজ আমাদের সন্তানরা একে অপর থেকে সালাত আদায়ের শেষে। তাদের প্রত্যেকেই অপরের দিকে তাকায়- সে কীভাবে সালাত আদায় করে?
এভাবে দেখে দেখে সে-ও এমনভাবে সালাত আদায় শেখে, যে সালাতে কোনো খুশুযুযু থাকে না; যেখানে সুন্নাতের কোনো গুরুত্ব থাকে না। কেন আমাদের সন্তানরা তাদের পিতার কাছ থেকে সালাত আদায় শেখে না? কেন তাদের অভিভাবকের থেকে শিখতে পারে না? আমাদের দায়িত্ব, আমাদের কর্তব্য- সালাত আদায়ে আমাদের পরিবার-পরিজনের যথাযথ তদারকি করা; তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া।
পরিবারের আরও যেসকল বিষয়ে আমাদের খোঁজ-খবর নেওয়া ও তদারকি করা জরুরি, তার একটি হচ্ছে- যাকাত আদায় করা। যদি পরিবারের কারও কাছে সম্পদ থাকে, অলংকার থাকে কিংবা ব্যবসাযিক পণ্য থাকে, যার উপর যাকাত ফরয হয়, তা হলে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য- তাকে যাকাত আদায় করতে আদেশ করা। পবিত্র কুরআনে হযরত ইসমাঈল -র ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, তিনি তাঁর পরিবারকে সালাত ও যাকাতের ব্যাপারে আদেশ করতেন। যেমন-
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِنْدَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا
এই কিতাবে ইসমাঈলের কথা বর্ণনা করুন, তিনি প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসূল, নবী। তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে সালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি তাঁর পালনকর্তার কাছে পছন্দনীয় ছিলেন। [সূরা মারইয়াম : ৫৪-৫৫]
পরিবারকর্তার আরও দায়িত্ব হচ্ছে, তার অধীনস্ত সদস্যদের রোযার ব্যাপারে তদারকি করা, খোঁজ-খবর রাখা। কোনো কারণে কোনো রমযানের কোনো রোযা ছুটে গিয়ে থাকলে সেগুলো কাযা করে নেওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করা। প্রয়োজনে তিনিও তাদের সাথে [নফল] রোযা রাখবেন। এভাবে তাদের রোযাগুলো দ্রুত কাযা করে নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করবেন।
আমাদের আরও কর্তব্য হচ্ছে, নারীদের জন্য হজ-উমরা আদায়কে সহজ করে দেওয়া। প্রয়োজনে তাদের সাথে সফর করা। যাতে তারা এই মহান দুই ইবাদত [হজ ও উমরা] আদায় করতে পারে। কারণ, মহিলাদের সফরের জন্য সঙ্গে মাহরাম থাকা আবশ্যক।
কোনো নারীর উপর হজ ফরয হলে তিনি যদি হজ আদায়ে উদ্যোগী হন এবং তার সাথে মাহরামও থাকে, তা হলে স্বামীর কর্তব্য তাকে বাধা না দেওয়া; স্বামীর পথে প্রতিবন্ধক না হওয়া।
-এক্ষেত্রে স্বামীর জন্য স্ত্রীকে ফরয হজ আদায়ে বাধা দেওয়া জায়েয নেই। এমনকি যদি [মাহরামসহ শরীয়তের যাবতীয় বিধান মেনে] যাওয়ার জন্য সক্ষম হন এবং যেতেও চান আর স্বামী তাকে যেতে নিষেধ করেন, তা হলে স্ত্রীর জন্য স্বামীর এ [অবৈধ] আদেশ মান্য করা ওয়াজিব নয়।
প্রিয় মুসলিম ভাই আমার!
ওই ঘরের হায়াত জীবন কতই না শান্তিময়, যে ঘরের প্রতিটি সদস্য আল্লাহমুখী হয়! যে ঘরের প্রতিটি সদস্য আল্লাহ ﷺ-র আদেশ মান্যকারী ও নিষিদ্ধ বিষয়ে परहेजকারী হয়।
📄 ইবাদত ও ধার্মিক জীবনের তারবিয়াত প্রদান
পুরুষের কর্তব্য পারিবারিক জীবনে পরিবারের সদস্যদের ইবাদত-বন্দেগী ও ধার্মিকতার উচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা-মেহনত করা। এক্ষেত্রে তাদের ফরয বিধানাবলি আদায়ের ব্যাপারে তদারকি ও খোঁজ-খবর নেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং তাদেরকে সুন্নাত নফল ও মুস্তাহাবসমূহ আদায়ের প্রতিও উৎসাহিত করতে হবে। যেমন, নবীজী ﷺ তাঁর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে করতেন।
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ أَحْيَا اللَّيْلَ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ وَجَدَّ وَشَدَّ الْمِئْزَرَ
রমযানের শেষ দশক শুরু হওয়ার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা রাত জেগে থাকতেন, নিজ পরিবারের সদস্যদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতেন এবং তিনি নিজে জোরালোভাবে ইবাদতে লেগে যেতেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০২৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০০৮, ভাষ্য মুসলিমের]
উম্মে সালামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَيْقَظَ لَيْلَةً فَقَالَ سُبْحَانَ اللهِ مَاذَا أُنْزِلَ اللَّيْلَةَ مِنَ الْفِتْنَةِ مَاذَا أُنْزِلَ مِنَ الْخَزَائِنِ مَنْ يُوقِظُ صَوَاحِبَ الْحُجُرَاتِ يَا رُبَّ كَاسِيَةٍ فِي الدُّنْيَا عَارِيَةٍ فِي الْآخِرَةِ
নবীজী ﷺ একরাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে বললেন, সুবহানাল্লাহ! আজ রাতে কতই না ফিতনা নাযিল করা হল! আজ রাতে কতই না [রহমতের] ভাণ্ডার নাযিল করা হল! কে জাগিয়ে দিবে হুজরাগুলোরবাসিন্দাদের? ওহে শোন! দুনিয়ায় অনেক বস্ত্র পরিহিতা আখেরাতে বিবস্ত্রা হয়ে যাবে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১০৮৮]
আয়েশা থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন—
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ فَإِذَا أَوْتَرَ قَالَ قُومِي فَأَوْتِرِي يَا عَائِشَةُ
রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে সালাত আদায় করতেন। বিতর আদায় করার সময় হলে বলতেন, হে আয়েশা! উঠো! বিতর আদায় কর। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৪৪]
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন—
رَحِمَ اللهُ رَجُلًا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّى وَأَيْقَظَ امْرَأَتَهُ فَإِنْ أَبَتْ نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ رَحِمَ اللهُ امْرَأَةً قَامَتْ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّتْ وَأَيْقَظَتْ زَوْجَهَا فَإِنْ أَبَى نَضَحَتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاءَ
আল্লাহ ওই ব্যক্তির উপর রহম করুন, যে রাত জেগে সালাত আদায় করে; অতঃপর স্বীয় স্ত্রীকে ঘুম থেকে জাগ্রত করে। আর যদি সে ঘুম থেকে উঠতে না চায়, তা হলে তার চোখে পানি ছিটিয়ে দেয় [নিদ্রাভঙ্গের জন্য]। আল্লাহ ওই নারীর উপর রহম করুন, যে রাতে উঠে সালাত আদায় করে এবং স্বীয় স্বামীকে জাগ্রত করে। যদি সে ঘুম থেকে উঠতে অস্বীকার করে, তা হলে তার চোখে পানি ছিটিয়ে দেয়। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৩০৮, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ১৬১০]
আবু ওয়াইল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
عَدَوْنَا عَلَى عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ يَوْمًا بَعْدَ مَا صَلَّيْنَا الْغَدَاةَ فَسَلَّمْنَا بِالْبَابِ فَأَذِنَ لَنَا قَالَ فَمَكَثْنَا بِالْبَابِ هُنَيْهَةً قَالَ فَخَرَجَتِ الْجَارِيَةُ فَقَالَتْ أَلَا تَدْخُلُونَ فَدَخَلْنَا فَإِذَا هُوَ جَالِسٌ يُسَبِّحُ فَقَالَ مَا مَنَعَكُمْ أَنْ تَدْخُلُوا وَقَدْ أُذِنَ لَكُمْ فَقُلْنَا لَا إِلَّا أَنَّا ظَنَنَّا أَنَّ بَعْضَ أَهْلِ الْبَيْتِ نَائِمٌ قَالَ ظَنَنْتُمْ بِآلِ ابْنِ أُمِّ عَبْدٍ غَفْلَةً قَالَ ثُمَّ أَقْبَلَ يُسَبِّحُ حَتَّى ظَنَّ أَنَّ الشَّمْسَ قَدْ طَلَعَتْ فَقَالَ يَا جَارِيَةُ انْظُرِي هَلْ طَلَعَتْ قَالَتْ لَا ثُمَّ أَقْبَلَ يُسَبِّحُ حَتَّى إِذَا ظَنَّ أَنَّ الشَّمْسَ قَدْ طَلَعَتْ قَالَ يَا جَارِيَةُ انْظُرِي هَلْ طَلَعَتْ فَقُلْتُ لَهُ طَلَعَتْ فَقَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَقَالَنَا يَوْمَنَا هَذَا وَلَمْ يُهْلِكْنَا بِذُنُوبِنَا
একদিন সকালে ফজরের সালাত আদায়ের পর আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ -র কাছে গেলাম। আমরা দরজায় দাঁড়িয়ে সালাম করলে তিনি আমাদের অনুমতি দিলেন। রাবী আবু ওয়াইল বলেন, আমরা কিছুক্ষণ দরজায় অবস্থান করলাম। তখন বাঁদি বেরিয়ে এসে বলল, আপনারা প্রবেশ করছেন না কেন? তখন আমরা তখন প্রবেশ করলাম। তিনি [আব্দুল্লাহ বসে তাসবীহ পড়ছিলেন। তিনি বললেন, তোমাদের অনুমতি দেওয়া সত্ত্বেও কিসে তোমাদের প্রবেশে বাধা দিয়েছিল? তখন আমরা বললাম, না [ তেমন কিছু নয়] তবে কিনা আমরা ধারণা করেছিলাম- ঘরের কেউ হয়তো ঘুমিয়ে রয়েছে। তিনি বললেন, ইবনে উম্মে আব্দ এর পরিবার তোমরা আলস্য ও উদাসীনতার ধারণা করলে? [তোমরা কি ধারণা করলে যে, আমার পরিবারের লোকজন ফজরের সালাতের জন্য ওঠে না? কিংবা তারা ফজরের পর আল্লাহ ﷺ-র যিকির করে না?] রাবী [আবু ওয়াইল] বলেন, এরপর তিনি তাসবীহ পাঠ শুরু করলেন। পরে যখন ধারণা করলেন- সূর্য উদিত হয়েছে, তখন বললেন, হে দাসী! দেখ তো! সূর্য উঠেছে কি না? দাসী বলল, সে নজর করে দেখল যে, এখনও সূর্য উঠেনি। তিনি আবার তাসবীহ পাঠ শুরু করলেন। অবশেষে যখন তাঁর ধারণা হল সূর্য উদিত হয়েছে, তখন বললেন, হে দাসী! দেখ তো! সূর্য উঠেছে কি? এবার সে দেখতে পেল যে, তা উদিত হয়েছে। তখন তিনি বললেন, সমস্ত প্রশংসা সেই সত্তার, যিনি আমাদের এ দিনটি ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি আমাদের পাপের কারণে আমাদের ধ্বংস করে দেননি। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮২৩]
ইমাম নববী বলেন, এ হাদীসে একজন পুরুষের স্বীয় পরিবার-পরিজন ও অধীনস্তদের দ্বীনী বিষয়ে দায়িত্ববান ও যত্নশীল হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে ফুটে ওঠে।
📄 উত্তম আখলাক, পবিত্রতা ও লজ্জাশীলতার তারবিয়াত
মুজাহিদ বলেন, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে তাকওয়া অবলম্বনে ওসিয়ত কর এবং তাদেরকে আদব শিক্ষা দাও। [সহীহ বুখারী, তা'লীকান : ৪/১৮৬৮, অধ্যায় : তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, তাই তোমরা উভয়ে তাওবা করলে ভালো হয়।]
পরিবারকর্তার উপর আবশ্যক- পরিবার-পরিজনের মাঝে উত্তম আখলাক সৃষ্টির মেহনত করা; উৎকৃষ্ট গুণাবলি বিকাশের চেষ্টা করা। উদাহরণস্বরূপ, তিনি শিক্ষা দিবেন- সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, উদারতা, বদান্যতা, অল্পেতুষ্টি, মহানুভবতা, সংযম ও ধীরস্থিরতা। আরও শিক্ষা দিবেন বিনয় ও লজ্জাশীলতা। পাশাপাশি শিক্ষা দিবেন- পিতা-মাতার সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয়।
স্ত্রী-কন্যাদের যুবকদের প্রতি লক্ষ রাখাও পরিবারকর্তার কর্তব্য। যাতে তারা গীবত, পরনিন্দা ও অন্যের দোষচর্চায় লিপ্ত হতে না পারে।
এর পাশাপাশি স্ত্রী-কন্যাদের জন্য নেককার মহিলাদের মজলিসে বসা ও তাদের সাহচর্য গ্রহণে পরিবেশ তৈরি করে দিবেন। নেককারদের ছাড়া অন্যদের সঙ্গে ওঠা বসা ও মেলামেশার পথ বন্ধ করে দিবেন। নেককার মহিলারা ব্যতীত অন্যদের জন্য ঘরে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে দিবেন। কারণ, মহিলাদের অধিকাংশ মজলিসেই ব্যাপক গুনাহের ছড়াছড়ি থাকে। পক্ষান্তরে নেককার মহিলাদের সান্নিধ্য ও সাহচর্য এ সকল গুনাহের মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
কখনও কখনও নারী-মজলিসের কোনো কোনো দুরাচারী নারী আমাদের নারীদের এমন কিছু গর্হিত কর্ম শিক্ষা দেয়, যা মানুষের সুস্থ বিবেক ও শরীয়ত কোনোটিই সমর্থন করে না। যেমন, এক ভদ্রলোক বর্ণনা করেছেন, তার স্ত্রী একদিন তাকে পায়ুপথে সঙ্গমের জন্য আহ্বান করেছে। সাথে এ-ও বলেছে- তার এক বান্ধবী তাকে জানিয়েছে, সে তার স্বামীর সঙ্গে প্রায়ই এমনটা করে থাকে! নাউযুবিল্লাহ।
আমাদের নারীদের আর যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্বর সঙ্গে সতর্ক করা উচিত, তা হচ্ছে- সময়ের হেফাযত করা। সময় নষ্ট না করা। কোনো কোনো মহিলা মোবাইলে ফোনে দীর্ঘক্ষণ অযথা কথা বলে বহু সময় নষ্ট করে ফেলেন, যে কথায় কোনো ধরনের ফায়দা নেই। অতএব, একজন সচেতন দায়িত্বশীলের উচিত, স্বীয় পরিবারের সময়ের সঠিক মূল্যায়ন ও যথাযথ কদর করার তালিম দেওয়া।
আরও দায়িত্ব হচ্ছে- অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, তার পদ্ধতি ও আদব শিক্ষা দেওয়া। পরস্পরের কথা বলা ও আলাপ-আলোচনার ক্ষতির দিক নিয়ে যথাযথভাবে সতর্ক করা। তা ছাড়া নারীরা কোনো ওলীমা-অনুষ্ঠান বা অন্যকোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে সেখানে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে নেওয়া, সেখানে কোনো ধরনের গর্হিত কাজ বা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে কি না- তার খোঁজ-খবর নেওয়া পরিবারকর্তারই দায়িত্ব।
নারীরা যে হিজাব ও পর্দা পরে বাইরে বের হন, তার ব্যাপারেও খোঁজ-খবর রাখা পরিবারকর্তার দায়িত্ব- তা শরয়ী পর্দার জন্য পর্যাপ্ত ও যথেষ্ট কি না? সম্পূর্ণ অঙ্গে তা আচ্ছাদন করতে সক্ষম কি না? সেটি ঘন, গাঢ় ও পুরু কি না? স্বচ্ছ থেকে মুক্ত কি না? পুরুষদের পোশাকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কি না? কাফের-মুশরিকরা নারীদের পোশাকের সাথে পার্থক্য ও ব্যবধান আছে কি না? যথেষ্ট প্রশস্ত ও ঢিলে কি না? অসংলগ্ন ও মোটাসোটা কি না?
অত্যন্ত আক্ষেপ ও দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, কোনো কোনো পুরুষ চরিত্রে- হাঁ, কোনো কোনো মুসলিম পুরুষের চরিত্রে বে-গায়রতি, আত্মমর্যাদাহীনতা, নষ্টা ও লম্পটের উপস্থিতি আছে। অনুভূতির দিক থেকে মৃত ও নির্বোধ! তারা তাদের স্ত্রী-কন্যাদের পবিত্রতা ও চারিত্রিক নিশ্চয়তার এতটুকু যত্নবান না! পর্দা পুষিদার কোনো তদারকি করে না। আপনি দেখবেন, এ ধরনের লোক তাদের কন্যাদের স্বাধীনতা ছেড়ে দেয়; নিজেদের ইচ্ছামত চলাফেরা করতে দেয়। মেয়েদের যখন যেখানে ইচ্ছা চলে যাচ্ছে; যার সঙ্গে ইচ্ছা চলে যাচ্ছে! তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই, ধরা-বাঁধা কোনো তত্ত্বাবধায়ক নেই। এ বিষয়ে সেসকল পুরুষকে তিরস্কার-ভর্ৎসনা করা হলে এ বলে ওজুহাত পেশ করে- সে তো এখনও অনেক ছোট! কিংবা তার ব্যাপারে আমার পূর্ণ আস্থা আছে!
কেউ কেউ স্ত্রী-পরিজন ও কন্যাদের নিয়ে বিভিন্ন পার্কে, বাগানে, বিনোদন কেন্দ্রে ঘুরতে যান। সেখানে গিয়ে তাদের লাগাম সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে দেন। তারা আপন মনে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে বেড়ান, খেলাধুলা করেন। পর্দার কোনো বালাই থাকে না। হিজাব খুলে যায়। অনেকের দেহও উন্মুক্ত হয়ে যায়। সামগ্রিকভাবে এসব বিষয়ে তারা চূড়ান্ত অবহেলা ও উদাসীনতার পরিচয় দেন।
এর চাইতেও নিকৃষ্ট ও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে- অনেকেই তাদের স্ত্রী-কন্যাদের একবার প্রশ্নও করেন না- তারা কোথায় যাচ্ছে? কোত্থেকে আসছে? বরং স্ত্রী-কন্যারা আদেশ করছে- ‘আমাদের অমুক স্থানে পৌঁছিয়ে দাও’ আর অমনিই তারা সেখানে পৌঁছিয়ে দিচ্ছেন। একবার জানতেও চাচ্ছেন না- তারা যেখানে যাচ্ছে বা যেতে চাচ্ছে, সেখানে তাদের কী কাজ? কিংবা সেখানকার অবস্থিতি বা কী? আল্লাহ বলেন, এক ব্যক্তি এ সবকিছুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা হবেন। আমাদের সকলের জন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ-র জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ ও নমুনা। দেখুন, এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ তাঁর স্ত্রীদের প্রতি কত গায়রতওয়ালা ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন! হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
دَخَلَ عَلَيَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعِنْدِي رَجُلٌ قَاعِدٌ فَاشْتَدَّ ذَلِكَ عَلَيْهِ وَرَأَيْتُ الْغَضَبَ فِي وَجْهِهِ قَالَتْ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّهُ أَخِي مِنَ الرَّضَاعَةِ قَالَتْ فَقَالَ انْظُرْنَ إِخْوَتَكُنَّ مِنَ الرَّضَاعَةِ فَإِنَّمَا الرَّضَاعَةُ مِنَ الْمَجَاعَةِ
একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার কাছে এলেন। তখন আমার কাছে একজন পুরুষ বসা ছিলেন। এতে তাঁর মন ভারাক্রান্ত হল এবং আমি তাঁর চেহারায় ক্রোধের আলামত দেখতে পেলাম। তিনি [আয়েশা] বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহ রাসূল! এ ব্যক্তি আমার দুধভাই। [আয়েশা] বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, কারা তোমাদের দুধভাই- তা তোমরা ভালো করে দেখে নিয়ো। ‘রাযাআত’ সাব্যস্ত হয় যখন দুগ্ধপানের দ্বারা সন্তানের ক্ষুধা নিবারিত হয়। [অর্থাৎ দুগ্ধপানের মেয়াদের ভিতর দুধ পান করলে রাযাআত সাব্যস্ত হয়] [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫১০২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৫৫, ভাষ্য মুসলিমের]
অর্থাৎ তোমরা কাউকে দুধভাই বলে ডাকতে থাকবে এবং তাদেরকে তোমাদের প্রবেশ করতে দেওয়ার পূর্বে খুব ভালোভাবে যাচাই করে নিবে, তাদের দুগ্ধপান কি দুগ্ধপানের মেয়াদে ভিতর হয়েছে না মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর হয়েছে। দুগ্ধপান যদি দুগ্ধপানের মেয়াদে পর হয়ে থাকে, তা হলে এ দুগ্ধপানের দ্বারা রাযাআত সাব্যস্ত হবে না। ফলে তারা তোমাদের দুধভাই বলেও বিবেচিত হবে না। আর তখন তাদের সাথে তোমাদের দেখা-সাক্ষাৎ না-জায়েয হওয়ার বিষয়টি তো বলাই বাহুল্য।